আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৫
নাবিলা ইষ্ক
বর্তমান –
২০২৪, নভেম্বর।
লিভিংরুম জুড়ে নীরবতা নেমেছে। অনেকটা সময় যাবত বৃষ্টির আওয়াজ ভেসে বেড়াল আনাচেকানাচে। অতীতের ওমন নৃশংস ঘটনা পুনরাবৃত্তি করে ভালো নেই জুলেখা বেগম। সেই পুরোনো ক্ষত যে আবারও উন্মুক্ত হয়েছে। বহুদিনের শুকিয়ে যাওয়া ব্যথাগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। যন্ত্রণায় নীল হয়ে গিয়েছে উপস্থিত সকলের সমগ্র অস্তিত্ব। মনে হলো হৃৎপিণ্ডে ফাটল ধরেছে, গলগল করে ঝরে পড়ছে রক্ত। জুলেখা বেগম নিজেকে সামলালেন। বয়স হয়েছে তো। অভিজ্ঞতা বেড়েছে। বিজ্ঞ চোখে তাকালেন রোযার দিকে।
নড়চড় নেই রোযার। মাথাটা একদম নোয়ানো। মুখ আড়াল হয়ে আছে। স্বাভাবিক লাগছে সবটা। তবে তার কোলে থাকা ফর্সা, উন্মুক্ত হাত দুটোয় চোখের জল পড়েছে কয়েক ফোঁটা। এতেই যেন প্রশান্তিতে ভরে উঠল জুলেখা বেগমের হৃদয়। স্বস্তি পেলেন। পুরনো ক্ষত তিনি তো এভাবে এভাবে পুনরাবৃত্তি করেননি। করেছেন নিজের আদিল বাবার জন্য। মায়া থেকেইতো ভালোবাসা জন্মায়। ভালোবাসা থেকে জন্মায় মগ্নতা। জুলেখা বেগম চান রোযার আদিলের জন্য মায়া জন্মাক অন্তত। ভালোবাসাটা নাহয় চলে আসবে পরপরই। সম্পর্কে মায়া থাকা যে বীজ। আজীবন এই বীজ পাকাপোক্ত ভাবে গেঁথে রাখে দুটো সত্তাকে। মায়া মানুষকে সারাজীবন একসাথে রাখতে পারে ভালোবাসা না পারলেও।
জুলেখা বেগম হাত বাড়ালেন। ছুঁয়ে দিলেন রোযার হাতহাতটা কাঁপছে। আঙুল গুলো মুষ্টিবদ্ধ করল ধীরে ধীরে। জুলেখা বেগম কিছু বলবেন এরপূর্বেই মাথা তুলে তাকায় রোযা। চোখ দুটো র ক্ত লাল, ফর্সা মুখে লাল চোখ দুটো ধারালো ভাবে চোখে লাগছে। ফুলে গেছে বাজেভাবে। রোযা চেয়েছে সোজা শান্তর দিকে।ভঅধৈর্য্য কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল তৎক্ষণাৎ –
‘আর ওই জানো য়ার? ও কি এখনো বেঁচে আছে? মে রে ফেলেনি? শাস্তি দিয়েছে না?’
ছলছল করা চোখদুটো কেবলই মুছতে হাত উঠিয়েছিল শান্ত। মুছতে পারল কোথায় আর! চমকে উঠল যে! ঠিক বুঝতে পারল কোন জানোয়ারের কথা জিজ্ঞেস করছে রোযা। মন্ত্রী রেজওয়ান মাহমুদ তো! শান্ত স্তব্ধ চোখে তাকায় রোযা মুখের দিকে। কান্নারত মুখজুড়ে অস্থিরতা। জানার আকাঙ্ক্ষা। এমন প্রশ্ন শান্ত আশা করেনি। পরপরই মুগ্ধতা বিরাজ করে তার চোখদুটোতে। তাদের ম্যাডাম তো এমনই হওয়া চাই। ঠিক এমন! সিংহের, বাঘিনী! শান্তর চোখেমুখে তৃপ্তি ভেসে ওঠে। জবাবটা সে সঙ্গে সঙ্গে দিলো –
‘আমার বস ওকে দুনিয়াতেই জাহান্নাম দেখিয়েছে, ম্যাডাম। তিলেতিলে মে রেছে। যতগুলো বছর বেঁচে ছিল নিজের মৃ ত্যু ভিক্ষা চেয়ে বেঁচেছে।’
রোযা দম ছাড়ল। ক্ষো ভ কমল। দৃষ্টির সাথে সাথে নুইয়ে এলো কাঁধ। তার মস্তিষ্কে ভাসছে ওসমান মির্জা, গুলনাহার আর আদিল। একটা হাসিখুশি পরিবার ছিল। মিষ্টি, প্রাণোচ্ছল। চোখে ভাসে আদিলের অতীত। এখনকার এই শক্তপোক্ত মানুষটার সাথে যে কোনোরকমের মিল নেই অতীতের সেই চঞ্চল আদিলের সাথে। থাকবেই বা কীভাবে? যার জীবন থেকে প্রাণই কেড়ে নেয়া হয়েছে সে যে বেঁচে আছে এইতো অনেক! রোযার কানে বাজল সে রাতে আদিলের বলা কথাটুকু। যার ওজন সে আজ অনুভব করতে পারল বেশ –
‘আঠারো বসন্ত সুখের চাদরে কাটিয়ে বাকিটা বসন্ত জীবিত লা শের মতন কাটিয়েছি। স্বর্গ থেকে নেমে পড়েছি নরকের মতন এই কালো দুনিয়ায়। বাদবাকিটা জীবন কাটাতে এই নরককেই স্বর্গ বানিয়ে দেব তুমি পাশে থাকলে।’
আদিলের বলা বাক্য, তার করা কাণ্ড সবই চোখের পাতায় ভেসে বেড়াল অনেকটা সময় ধরে। রোযার কোলে আদিলের মাথা রাখা, চুলে হাত বুলিয়ে দেবার আবদার করা। সবকিছুই তাকে আজ পীড়া দিচ্ছে। রোযার এমন অবস্থা লক্ষ্য করে সরে যাচ্ছে সবাই। রয়ে গিয়েছে শুধু জুলেখা বেগম আর নূরজাহান। নূরজাহান চোখমুখ মুছে নিজেকে শান্ত করে এগিয়ে গেল রোযার পাশে। কাঁধ ছুঁয়ে ভীষণ রহস্যময় কণ্ঠে আওড়াল –
‘যা হয়ে গিয়েছে তা অতীত, ম্যাডাম। বর্তমান, ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে আছে। চাইলেই তা আমরা আনন্দে ভরিয়ে দিতে পারি।’
রোযা বুঝল সে কথার মানে। পুনরায় কানে বাজল আদিলের সেদিনের কথাগুলো –
‘ওসমান মির্জার মতো ভালো হওয়ার বোকামি আমি কখনো করব না। কখনো পিছু ফিরব না। আমি তোমায় ভালোবেসে আরও জঘন্য হব, আরও নিচে নামব। যতটা নামলে আরও শক্তিশালী হব, যতটা হলে তোমায় বুকের ভেতর নিয়ে বাকিটা জীবন সহিসালামত কাটাতে পারব।’
রোযা কোনোভাবেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। দুহাতের মধ্যে মুখ গুঁজে ফেলল। তার কাঁধের কম্পন দেখে থমকাল নূরজাহানের বাড়ানো হাতটা। জুলেখা বেগম চোখের ইশারা করলে, নূরজাহান তার সাথে সরে যায়। সময় দেয় রোযাকে শান্ত হতে। সময় পেরুল, পেরিয়েই গেল। ম্যানশনের বিশাল দেয়াল ঘড়ির কাঁটা ঘুরছিল রাত দুটোয়। বাইরে তখনো প্রলয়ঙ্কারী বৃষ্টি নেমে যাচ্ছে। বৃষ্টির আওয়াজ ভেসে বেড়াচ্ছে ম্যানশন জুড়ে। কতক্ষণ পরে কারও পায়ের শব্দ শুনল জানা নেই। মাথা তুলে তাকাল রোযা। চোখ ফুলে করুণ দেখাচ্ছে। জুলেখা বেগম এসে দাঁড়িয়েছেন। পেছনে নূরজাহান ট্রে হাতে দাঁড়ানো। চোখমুখ আনন্দে চিকচিক করছে জুলেখা বেগমের –
‘বাবা উঠেছে, বউমা। জ্বর নেমেছে। যাবে না দেখতে? স্যুপটা নিয়ে গেলে কেমন হয়?’
রোযা চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। ইতস্তত করল সামান্য। আয়না না দেখেও ঠিক জানে তার চোখমুখ ফোলা।
‘ম্যাডাম?’
নূরজাহানের ডাকে সাড়া দিলো রোযনিঃশব্দে তার হাত থেকে স্যুপের ট্রে নিয়ে এগুল, সিঁড়ি বেয়ে বেশ দ্রুত উঠে এলো ওপরে। পেছনে নূরজাহান হাসছে। হাসলেন জুলেখা বেগমও। বিড়বিড় করলেন –
‘আমার বাবার জীবনটা আনন্দে ভরে উঠুক মাবুদ। এতটুকুই চাওয়া আমার।’
বেডসাইড ল্যাম্পের হলদে মৃদু আলোতে দেখা মেলে আদিল মির্জার শক্তপোক্ত বুক, কাটকাট মুখ। অস্বস্তি, বিরক্তি নিয়ে টনটন করা কপাল ডলে তাকায় আধো অন্ধকারে। আশেপাশে চেয়ে রোযাকে না দেখে কপালে ভাঁজ পড়ে কয়েক! সদ্য ঘুম ভাঙা সে শোয়া থেকে উঠে বসতেই নিচ্ছিল তখুনি রুমের বাতি জ্বলে ওঠে। আদিলের চোখ বুজে আসে হঠাৎ ভারিক্কি আলো চোখে পড়ায়। পুনরায় যখন দরজার দিকে তাকাল, চোখ আর ফেরাতে পারল না। স্থির হয়ে রইল সামনে। রোযা এগিয়ে আসছে। পরনে আকাশী রঙের জামদানি। চুলে খোঁপা করা। হাতে ট্রে। সবমিলিয়ে আদিলের চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে গেল। পুরনো স্মৃতি ভেসে উঠল চোখের পাতায়। ছোটো আদিলটা সেদিন অসুস্থ ছিলো। ঠান্ডা, তীব্র জ্বর। মা গুলনাহার খাবার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে প্রবেশ করেছিলেন রুমে।
ছেলেকে বুকে জড়িয়ে দুহাতে চোখমুখ ছুঁয়ে বলে গিয়েছিলেন –
‘আমার বাবুর জ্বর নেমেছে? দেখি দেখি! আমার সোনা বাবাটা! মায়ের কথাই শোনে না।’
আদিল চোখ বুজল সাথে সাথে। মাথা চিলিক দিয়ে উঠেছে বাজেভাবে। রোযা অস্থির ভাবে তড়িঘড়ি করে প্রবেশ করে স্যুপের ট্রে-টা টেবিলের ওপরে রাখল। চটজলদি একটা বালিশ বেডের হেডবোর্ডে দিয়ে সাহায্য করল আদিলকে হেলান দিয়ে বসার জন্য। জিজ্ঞেস করে গেল ভীষণ ব্যস্ত কণ্ঠে –
‘খারাপ লাগছে? মাথা ব্যথা করছে? ডক্টর মোজাফফরকে আসতে বলব?’
আদিল চোখ মেলে তাকাল। রোযার চিন্তিত মুখখানা তার সামনে। আদিলের ধূসর মণির দৃষ্টি গাঢ় থেকে সুগভীর হতে থাকল ক্রমশ। মনোমুগ্ধের ন্যায় শুধু বাধ্যভাবে আস্তে করে উত্তরে মাথা নাড়াল। বোঝাল লাগছে না। তার সবসময়ের পরিপাটি থাকা চুলগুলো অগোছালো হয়ে কপালে পড়ে আছে। রোযা হাত বাড়িয়ে চুলগুলো সরিয়ে কপালে হাত রাখল। উষ্ণতা মেপে স্বস্তির শ্বাস ফেলে আওড়াল –
‘জ্বর নেমেছে।’
আদিল হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে আছে। এলোমেলো চুল কপালে পড়ে আছে। পরনের কালো সিল্কের শার্টটা পুরোপুরি খোলা। শক্তপোক্ত বুকখানা দৃশ্যমান। সেভাবেই আদিল নিঃশব্দে শুধু চেয়ে দেখল রোযার ব্যস্ত শরীর, চিন্তিত মুখ, রক্তিম চোখ। মায়ের শাড়ি চিনতে তেমন সময়ের প্রয়োজন পড়ল না তার। মায়ের এই শাড়িতে রোযাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। স্নিগ্ধ, আভিজাত্যপূর্ণ। চোখ গেল টেবিলে রাখা ট্রে-তে, গরম গরম চিকেন ক্লিয়ার স্যুপের বাটি, তা থেকে ধোঁয়া উড়ছে। রোযা স্যুপের বাটি হাতে তুলে নিয়ে এগিয়ে রলো বেডের কাছে। চামিচ দিয়ে স্যুপ নাড়তে নাড়তে বসল বেডে, আদিলের একদম পাশে। না চেয়েই এক চামচ স্যুপ তুলে আদিলের মুখের সামনে ধরে তবেই এবারে খেয়াল করল আদিলের ধারালো দৃষ্টি। যা অনড়ভাবে তার মুখে নিবদ্ধ। রোযার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে-ঝাপিয়ে বুঝি গলায় চলে এলো। দমবন্ধ করে দিলো। বোধ ফিরল এমন ভাবেই দৃষ্টি দ্রুত নামিয়ে, সামান্য কেশে উঠল। আদিলের মুখের সামনে বাড়িয়ে রাখা হাতটা নামাতে চাইলে অনুভব করল উষ্ণ, রুক্ষ হাতটা শক্ত করে ধরেছে তার চামিচ ধরা হাত। একই স্থানে রেখে আদিল মাথা নোয়াল অল্প। খেলো নিঃশব্দে।
রোযা স্থির হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ থমকে রইল। তাকিয়ে থাকল ঠিক নিজের হাতের দিকে। আদিল একটা শব্দ বলেনি এখন পর্যন্ত। চেয়েই আছে শুধু। রোযা তাকাল, চোখে চোখ রেখে বুঝল যা বোঝার। অতঃপর দৃষ্টি নুইয়ে পুনরায় চামিচ ভরতি স্যুপ বাড়িয়ে ধরল আদিলের মুখের সামনে। আদিল আগের মতোই খেলো। রোযা খাইয়ে গেল আর উপেক্ষা করল একজোড়া ধারালো চোখের অস্তিত্ব। যা তাকেই একদৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছে। রোযাকে ক্রমান্বয়ে অস্থির করে তুলছে।
‘কেঁদেছো!’
আদিলের কণ্ঠ আরও গভীর, গম্ভীর শোনাল। অসুস্থতায় কণ্ঠ বসে গেছে। এতো কাছ থেকে শব্দটা ভীষণ কানে লাগল রোযার। শিরশির করল সর্বাঙ্গ। জবাব না পেয়ে আদিলের কণ্ঠ দৃঢ় হলো, ‘কেনো?’
পুনরায় চামিচ ভরতি স্যুপ মুখের সামনে ধরে রোযা বলল, ‘কান্না করিনি। ঠান্ডা লেগেছে।’
আদিল খেলো, স্যুপটুকু গিলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শুধু। অবশেষে হাত বাড়িয়ে রোযার ফুলো চোখ ছুঁয়ে দিলো। দেখল রোযা চোখ বুজে ফেললেও আগের মতো সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে না। তার স্পর্শ এড়াচ্ছে না। চোখ ছুঁয়ে আদিলের হাতটা ঘাড়ে গিয়ে থামে। রোযার মাথা নিজের কাছে এনে ভালোভাবে দেখল মুখখানা। রোযা চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে ফেলেছে। সে র ক্তিম রক্তিম চোখে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে আওড়ে বসল আদিল –
‘একটু শক্ত ছুঁলে দাগ বসে যায়। একটু কাঁদলে চোখ ফুলে যায়। এমন ননির পুতুল কোথায় রাখব আমি?’
রোযা চমকে তাকাল সঙ্গে সঙ্গে। ভীষণ কাছাকাছি তারা দুজন। চোখে চোখ পড়তেই রোযার নিশ্বাস আটকে গেল গলায়। হৃৎপিণ্ড লাফাতে লাগল। আদিল আওড়ে গেল-
‘বুকে নাকি মাথায়, হুম…?’
রোযা চোখের দৃষ্টি নামিয়ে ফেলে। আদিলের মুঠো হালকা হতেই সরে আসে। কিছু হয়নি এমনভাবে বাটির শেষটুকু স্যুপ খাইয়ে সে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে –
‘শরীর দুর্বল আপনার। শুয়ে পড়ুন, অন্তত আজ রাতটুকুর জন্য।’
‘কার শাড়ি পরেছেন, জানেন?’
রোযা সবে ট্রেতে বাটি রেখে হাতে তুলে নিয়েছিল। থমকাল আদিলের প্রশ্নে! ফিরে না চেয়েই জবাবে বলল –
‘মায়ের!’
আদিল স্তব্ধ হয়ে গেল। রোযা আর দাঁড়াল না। ট্রে হাতে রুম থেকে বেরিয়ে এলো দ্রুতো। যেন পালাতে চাইছে। দেখল সবাই দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধ ভাবে। তার বেরুনোর অপেক্ষাই বোধহয় করা হচ্ছিল। শান্ত, এলেন, ক্লান্ত আর আনোয়ার খন্দকার হুড়োহুড়ি করে ঢুকেছেন রুমের ভেতরে। তিনজনের মধ্যে কে আগে ঢুকতে পারে এর এক অদেখা যুদ্ধ হলো! শান্তর উচ্চ কণ্ঠের ডাক রোযা শুনতে পারছে –
‘বস! বস!’
বিপরীতে আদিলের বিশ্ববিখ্যাত জবাব, ‘হুম…’ শোনা গেল।
নূরজাহান রোযার হাত থেকে ট্রে নিয়ে আস্তে করে বলল, ‘রাত হলো ম্যাডাম, আপনি তো কিচ্ছুটি খেলেন না!’
রোযা মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘খাব না চাচি।’
জুলেখা বেগম জোর করেন না। ট্রে নিয়ে চলে গেলেন নূরজাহানের সাথে। রোযার দৃষ্টি ঘুরে বেড়ায় ম্যানশনের দেয়াল জুড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরিয়ে এসেছে শান্তরা। রোযা দেখে বুঝে এখন সবগুলো বেশ চাঙ্গা হয়ে আছে। বস সুস্থ মানে তার চ্যালাপেলা সব সুখী মানুষ! শান্ত যাওয়ার আগে আস্তে করে জানায় –
‘বস আপনাকে ডাকছে, ম্যাডাম।’
রোযা শ্বাস টেনে নিলো বড়ো করে। চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘হৃদি ঘুমাচ্ছে তো?’
‘ঘুমাচ্ছে। ওঠেনি। একটু আগেই কল করলাম। চিন্তা করবেন না ম্যাডাম।’
রোযা মাথা দুলিয়ে প্রবেশ করল রুমে। আদিল এলোমেলো ভঙ্গিতে আগের মতোই আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ডান হাতের আঙুলের ভাঁজে এখন একটা সিগারেট। রোযা এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। কী করবে বুঝে পেলো না! তাই গিয়ে বিছানার একপাশে চুপ করে বসে পড়ল। নীরবতা ভাঙল আদিলের হঠাৎ তীব্র কাশিতে। রোযা হকচকিয়ে উঠে গেলো কাছে। ভ্রুদ্বয়ের মধ্যিখানে ভাঁজ পড়ে কয়েক। আদিলের হাতের সিগারেট নিয়ে ফেলে দিয়ে ভীষণ বিরক্ত কণ্ঠে বলল –
‘অসুস্থতা নিয়ে এমন ছাইপাঁশ গিলছেন কেনো! অপেক্ষা করা যাচ্ছে না!’
আদিলকে হতবাক করে রোযা পুনরায় ব্যস্ত হয়ে কপাল ছুঁয়ে আর্তনাদ করে উঠল, ‘আবার জ্বর এসেছে!’
রোযা তখুনি ঘুরে কদম বাড়াতে চাইল, গলা তুলে ডাকতে চাইল কাউকে। তার আগেই আদিল হাত টেনে ধরল। সাথে সাথে একটানে এনে ফেলল নিজের উষ্ণ বুকের ওপরে। রোযা চমকে ওঠে। হৃৎপিণ্ড লাফিয়েঝাপিয়ে সংস্পর্শে গিয়ে মিইয়ে যায়। পরমুহূর্তেই নিজেকে শান্ত করে ওঠার চেষ্টা করে বুঝল, আদিল তার ঘাড় ধরে রেখেছে। রোযার ঘাড় ভীষণ সংবেদনশীল। ওখানে ছুঁলেও শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। অথচ আদিল বারবার ওখানেই ছুঁবে, ঘাড়েই ধরবে। রোযার মুখটা নিজের মুখের সামনে নিয়ে বলল –
‘তুমি সাথে থাকো। চলে যাবে।’
রোযা চোখে তাকা্য না। আদিলের তীক্ষ্ণ চোয়ালে চেয়েই বলে, ‘আমি মেডিসিন নই। আর নাইবা ডক্টর।’
‘আমার জন্য তো দুটোই।’
রোযা আর কিছু বলার শব্দ খুঁজে পায় না। ছটফটও করে না, ওঠার চেষ্টাও না। ওসময়ই আদিলের মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। চিনচিন করছে ভেতরে। রোযা অনুভব করে তাকায় সঙ্গে সঙ্গে। কাছ থেকে দেখল শুকনো মুখটা। আওড়াল –
‘শুয়ে পড়ুন।’
আদিল আচমকা উল্টাল, রোযাকে শুইয়ে তার ওপরে শুয়ে পড়ল। ভারি শরীরের নিচে করুণ ভাবে পিষে গেল রোযা। আদিল মাথাটা গুঁজল রোযার সংবেদনশীল ঘাড়ে। দাড়ি, ঠোঁট ক-বার ছুঁয়ে শান্ত ভঙ্গিতে পড়ে রইল। তার আর নড়চড় নেই। রোযা চোখমুখ খিঁচিয়ে ছিল। অনেকটা সময় পেরুলে বুঝল আদিল ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছে। রোযা চাইল ঘুমন্ত মানুষটাকে আস্তে করে নিজের ওপর থেকে সরাতে চাইতেই আদিল গোঙাল –
‘উহুঁম…’
রোযা কেঁপে উঠল। তার হৃৎপিণ্ড স্বাভাবিক হতে সময় নিলো। একপর্যায়ে তাকাতে চাইল, আদিলের চোয়ালটা শুধু দেখা গেলো। পুরো মুখটাই যে ডুবে আছে তার ঘাড়ে। এলোমেলো চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে আছে। কয়েকটা চুল সোজা দাঁড়িয়ে আছে। রোযা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাত বাড়াল চুলগুলো ঠিক করে দিতে। ঠিক করতে গিয়ে বুঝল আদিলের ছোটো চুলগুলো কী ভীষণ নরম আর সিল্কি! আনমনাই তার আঙুলগুলো ডুবল চুলের ভাঁজে ভাঁজে।
পরদিন, রোযাকে বাড়িতে পৌঁছে আদিল মির্জা এসে পৌঁছেছে ফাইভস্টার রেস্টুরেন্টের প্রাইভেট রুমের সামনে। কাঁচের দরজাটা মেলে ধরল শান্ত। আদিল প্রবেশ করতেই ভেতরের গুঞ্জন থামে তৎক্ষণাৎ। প্রাইভেট রুমে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আদিলের ওপরেই। দিকপাল চ্যাটার্জি খানিক চিন্তা নিয়েই শুধালেন –
‘শুনলাম তুমি অসুস্থ ছিলা? কী হইছিল?’
বলতে বলতে তিনি চেপে সোফায় বসার জায়গা করে দিলেন। আইনমন্ত্রী আব্দুল মান্নান চোখ রাঙিয়ে তাকালেন দিকপাল চ্যাটার্জির দিকে। গাধাটা কি দেখেনি তিনি জায়গা রেখেছেন দস্যুটার জন্যে? ওপরে তিনি মিষ্টি করে হেসে গদগদ ভঙ্গিতে বললেন –
‘নির্বাচনের ঝামেলায় বাপজান আপনার খবরাখবর নেয়া হয়নি। কেমন বোধ করছেন এখন? আমার মুখটায় তাকিয়ে বলেন।’
আদিল বসতে বসতে তাকাল মান্নান সাহেবের দিকে। আপদমস্তক তাকে দেখে জানাল, ‘এবারের ফেশিয়ালটা অন পয়েন্ট। উজ্জ্বলতায় পুরো রুম জ্বলজ্বল করছে।’
মুখটা গোমড়া হলো আব্দুল মান্নান সাহেবের। তিনি মনে মনে এই বদমাশটাকে বকে দিলেন। অসুস্থ হয়েও মুখের ধার কমল না! মুখে বললেন, ‘আমার এবারের বউটা ছোটো। তাই একটু বয়সটা কমাতে আরকী!’
পায়ের ওপরে অলস ভঙ্গিতে পা রেখে সিগারেটটা ধরাতে ধরাতে আদিল বলে –
‘বয়স আরও বেড়ে গেছে।’
মেঘ জমল আব্দুল মান্নান সাহেবের মুখে। দিকপাল চ্যাটার্জি সহ বাকিরা হাসলেও হাসছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন আবেদীন আর তার ছোটো ভাই জয়নাল আবেদীন। তাদের মুখ নির্বিকার। আদিল সিগারেটে টান বসিয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। মনে পড়ল কাল রাত থেকে এই পর্যন্ত সে সিগারেট ছুঁতে পারেনি। সেই যে রোযা হাতের সিগারেট কেড়ে নিয়ে ফেলেছে এরপর আরে আদিল সিগারেট ধরায়নি!
‘আইজিপি তো ঝামেলা করতেসে!
আইনমন্ত্রীর কথায় একটা হাত সোফার হাতলে রাখতে রাখতে আদিল তাকাল। বলল –
‘মন্ত্রী সাহেব, কোটিকোটি টাকা তো আর আমি এইভাবে আপনার পেছনে ঢালতেসি না। একটা সামান্য আইজিপি আপনার দ্বারা সামলানো না গেলে কীভাবে কী? নামান ওটাকে! নাকি আমি ব্যবস্থা নিব?’
জয়নাল তাকিয়েইছিল। তার হাতে ড্রিংকের গ্লাস। আদিলকে দেখতেই তার পিত্তি জ্বলে ওঠে। নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলে গেলো, ‘ওর ভাগ্নে পুড়িয়ে মা রলা। বিপরীতে ও অ্যাকশন নিবে না?’
আদিল তাকাল না সেদিকে। উত্তরও করল না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ভাই, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী তো আর না। পাত্তা দিতে তার বয়েই গিয়েছে। আদিলের নির্বিকার ভাব দেখে জয়নাল দাঁতে দাঁত পিষল। হঠাৎ ভ্রু নাচিয়ে বলে বসল –
‘সিয়ামের অবশ্য দোষ নেই। ওমন বউ থাকলে তো একটু ঝামেলা হবেই।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী থমকে গেলেন। থমকালেন আইনমন্ত্রী আব্দুল মান্নানও। একটা গোরু যেতে না যেতেই আবার আরেকটা হাজির! আদিল এবারে তাকাল। তার ধূসর মণিদুটো কেমন জ্বলজ্বল করল –
‘আর ওমন ঝামেলা আমি এভাবেই পুড়িয়ে ফেলি, মিস্টার জয়নাল। হোপ ইউ ওউন্ট হ্যাভ টু ফাইন্ড আউট হোয়াট দ্যাট ফিলস লাইক।’
চ্যাঁচিয়ে ওঠেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। তার সামনে তার ছোটো ভাইকে পুড়িয়ে ফেলার হুমকি তিনি কীভাবে সহ্য করবেন!
‘আদিল!’
আদিল উত্তরে নীরব। দৃষ্টি শূন্যে ফেলে চুপ রইল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলেন দিকপাল চ্যাটার্জি। আইনমন্ত্রীও ভিন্ন আলাপে চলে গেলেন। তিনি তার মহামূল্যবান সময় পানি ঢালতে দেবেন না। সামনে নির্বাচন। পার্টিতে ঝামেলা চলছে। টাকা আর টাকার খেলা। আদিল মির্জা ছাড়া নিরাপত্তা আর টাকা কীভাবে সম্ভব?
কালো গাড়িগুলো রাস্তা পিষে ছুটছে বাংলোর দিকে। ওখানে কাজ আছে গুরুত্বপূর্ণ। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা হতে চলল প্রায়। আদিল ব্যাকসিটে মাথা এলাল। চোখের পাতায় ভাসল রোযার মুখ। গতকাল রাতের চিত্রগুলো চোখের পাতায় ভেসে উঠতেই কঠিন মুখের দৃষ্টি নরম হয়ে এলো। পাশ থেকে ল্যাপটপ তুলে অন করল। প্রবেশ করল সিসিটিভি ফিডে। কয়েকটা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল।
একটা লিভিংরুমে স্থির। ওখানে দুটো ব্যস্তদেখা যাচ্ছে। ওটাই বড়ো করলে পুরো ল্যাপটপ স্ক্রিভরে ওঠে। আদিলের চোখ সেঁটে থাকল রোযার শরীরের ওপরেই। গতকালের পর থেকে অদ্ভুত এক পরিবর্তন তার মধ্যে আদিল লক্ষ্য করেছে। ল্যাপটপে ভাসছে –
রোযার হাতে প্লান্ট। ওটা সেন্টারে সাজাচ্ছে, সাহায্য করার নামে উল্টো এলোমেলো করছে হৃদি। রোযা পরে আছে শুভ্র রঙের একটা গাউন, পায়ের গোড়ালির ওপরে তা। তার ব্রাউন রঙের চুলগুলোতে বিনুনি করা। মোটা একটা বিনুনি! মায়ের মতন সুন্দর একটা শুভ্র রঙের ফ্রোক পরেছে হৃদিও। চুলে দুটো ভিন্ন ধাঁচের বিনুনি। সে পাখির মতন কিচিরমিচির করছে –
‘মম, ক্যান উই ডু দ্যাট!’
রোযার কণ্ঠ ভীষণ নরম, নিভু নিভু শোনাল, ‘ডু হোয়াট?’
‘আংকেল যা করছেন!’
রোযা বোঝাল, ‘আংকেল গাছ লাগাচ্ছেন।’
হৃদি হাঁসফাঁস করে গেলো, ‘আমি তোমার সাথে গার্ডেনে গাছ লাগাব।’
‘আচ্ছা। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। আগামীকাল লাগাব।’
হৃদি দমল না, ‘কিন্তু মম, কাল অবধি আমার মনে থাকবে না।’
রোযার ধৈর্যের সাথে বলে যায়, ‘আমি মনে করিয়ে দেব।’
‘তোমারও যদি মনে না থাকে?’
বলেই হৃদি উপস্থিত সবার দিকে তাকাল। নূরজাহান, মরিয়ম বেগম, শাপলা বেগম সহ অনেকেই হাসছে মুখ টিপে। হৃদি বলে গেলো, ‘কারও যদি মনে না থাকে?’
রোযা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার হাতে মাটি লেগেছে। নাহয় দুহাতে হৃদির গাল সে টেনে দিতো। বলল –
‘তোমার ড্যাডকে বলে রাখব। তার মনে থাকবে। তার ব্রেইন তো শার্প, মনে করিয়ে দেবে। নিশ্চয়ই তোমার ড্যাড ভুলবে না?’
হৃদি সন্তুষ্ট হলো। মুচকি হেসে রোযার গায়ের সাথে ঘেঁষে গালে গাল ছুঁয়ে বলল, ‘ড্যাড কিচ্ছু ভোলে না। ড্যাডের সব মনে থাকে।’
রোযা মৃদু হাসল। হাতের কাজটা শেষ করে বেসিনের দিকে গেল হাত ধুতে। হৃদি পাখির মতন পিছুপিছু ছুটছে। রোযা রান্নাঘরে গেলে সেও রান্নাঘরে যাচ্ছে। আদিল স্থির চোখে দেখল অনেকটা সময় ধরে। যখন ল্যাপটপ বন্ধ করে দৃষ্টি তুলে তাকাল দেখল শান্ত ফিরে চেয়ে মিটমিট করে হাসছে। ওই হাসিতে রাজ্যের মশকরা এসে জমেছে মনে হলো। আদিল নির্বিকার মুখে তাকাল সামনে। শান্ত মুখটা বাড়িয়ে ডাকল –
‘বস…’
‘বল!’
শান্ত ফ্যাচফ্যাচ করে বলে, ‘বস, আপনার আইসবার্গ তো গলতে শুরু করেছে।’
আদিল বুঝল। চোখা রাঙিয়ে তাকিয়েও শান্তকে থামাতে পারল না। সে বলে গেলো –
‘বস, ম্যাডাম ত তার লাভারকে ধোকা দিয়ে আপনাকে মওকা দিয়ে দিয়েছে!’
আদিলের কানে বাজল ওই অদ্ভুত গানটা। বুঝে সাথে হাত উঠিয়ে শান্তর মাথায় আঙুলের গোড়ালি দিয়ে টোকা মা রল।
‘চোপ!’
শান্ত হুশ শব্দ করে মাথা ধরে সরে যেতে যেতেও হাসছে। শব্দ করে। এলেন মুখে হাত দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু হাসি আটকাতে পারল না। তাদের হাসির ধ্বনিতে কাঁপল গাড়ির ভেতরটা। ড্রাইভারও চেষ্টা করছে না হাসার।
শান্ত গাড়িতে গান ছাড়ল। মোবাইলে টুকটুক করে মেসেজ করছে কাউকে। আদিল তখন ফাইলে মনোযোগ ফেলেছে। মনোযোগ দিয়ে শব্দগুলো পড়ছিল। গানের লিরিকস গুলো যখন ভেসে বেড়াল গাড়ির ভেতরে, আদিলের হাত থমকাল –
‘দিওয়ানা, এই দিল যাচ্ছে ভেসে,
দিওয়ানা, তোকে ভালোবেসে..’
আদিলের মনে হলো কোনো না কোনো ভাবে ওই গানগুলো তার হৃদয় বলছে। সে আওড়ালও।
–
রাত অনেক হলো বাড়িতে ফিরতে। আদিল বাড়ি পৌঁছে আশ্চর্যজনক ভাবে জানল রোযা বাড়িতে নেই। তার অনুমতি ব্যতীত গাড়ি বেরুনোও নিষেধ। সেখানে রোযা বেরিয়েছে! আদিল গর্জে ওঠে! শান্ত আশেপাশে তাকাল। ক্লান্ত, স্বপন, রাদিন কেউই নেই। বডিগার্ড একটা এসে ভয়ে আস্তে করে জানাল –
‘ম্যাডামের আম্মু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। খবর শোনামাত্র অস্থির হয়ে গিয়েছিলেন। আটকানো যাচ্ছিল না, তাই ক্লান্ত – স্বপন – রাদিন ওরা গিয়েছে সাথে।’
এতে শান্ত হলো আদিল। তবে তার রাগ কমল না। এইজন্য তাকে জানাবে না? তখুনি শান্ত তার আর তার বসের ফোন দুটো চেক করে বেলুনের মতো চুপসে গেল। পার্সোনাল ফোন যে সাইলেন্ট করেছিল খেয়ালই নেই। বসের ক্রোধান্বিত মুখে চেয়ে ঢোক গিলে বলল –
‘বস, ক্লান্ত কল দিয়েছিল!’
‘কখন বেরিয়েছে?’
‘দু ঘণ্টা হচ্ছে।’
আদিল আদেশ করল, ‘ক্লান্তকে কল কর।’
আদিল পুনরায় গাড়িতে উঠে বসলে তড়িঘড়ি করে ওঠে শান্ত, এলেনও। তাদের গাড়ি বেরিয়ে গেল দ্রুত গতিতে। নভেম্বরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামছে। রাস্তাঘাট ভেজা। আধঘন্টার পথ তাদের পেরুতে হয় না। মাঝরাস্তাতেই দেখা মিলল। দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। টায়ার পাংচার দুটোরই। ক্লান্তর হাতে পিস্তল। ও কোথাও একটা তাঁক করে রেখেছে। দুটো গু লি ছেড়েছে। রোযাকে দেখা গেল পাশেই। সন্ধ্যায় সিসিটিভিতে দেখা সেই ড্রেসেই। তার মাথার ওপরে স্বপন ছাতা ধরে রেখেছে।
আদিল বেরুল ঝড়ের গতিতে। শান্ত বসের জন্য ছাতাও ধরতে পারল না। ক্লান্ত শান্ত হয়েছে বসকে দেখে। ধারালো বৃষ্টি পেরিয়ে রোযার দৃষ্টি পড়ল আদিলের ওপরে। পরনে সাদা প্যান্ট আর সাদা শার্ট। একমুহূর্তে ভিজে গায়ে মিশে আছে। সঙ্গে সঙ্গে রোযার চিন্তা হলো। গতকালই সুস্থ হয়ে উঠল জ্বর ছেড়ে। আবার বৃষ্টিতে ভিজলে খারাপ অবস্থা হতে পারে। দ্রুত এগুতে নিয়ে বলতে চাইল –
‘ভিজছেন কেনো…’
পুরো কথা শেষ করতে পারেনি রোযা। জুতোর হিল বেঁকে যাওয়াতে পা বেঁকে প্রায় মচকেই বুঝি গেল। তাল সামলাতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়তে নিলে, একজোড়া শক্তপোক্ত হাত তাকে আগলে নিলো। গুরুগম্ভীর আদেশ পড়ল –
‘গলা ধরো…’
রোযা সঙ্গে সঙ্গে দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরতেই আদিল জুতোজোড়া একহাতে নিয়ে অন্য একহাতে তুলে নিলো কোলে। ব্যস্ত কদমে এগুলো গাড়ির দিকে। আদেশ পড়ল তার –
‘ধাওয়া কর, ধরতে পা রলে মে রে ফেলবি।’
এলেন, ক্লান্ত আর স্বপন ছুটেছে গাড়ি নিয়ে। শান্ত আদিলের পেছনে। রোযা একপল তাকাল খুব কাছে থাকা ভেজা মুখে। পরপরই দৃষ্টি নামাল। আদিলের জলদগম্ভীর কণ্ঠ ভেসে বেড়াল –
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৪
‘এমন ঘটনা দ্বিতীয় বার চাই না। আমার অপেক্ষা করবে তুমি। ডু ইউ হিয়ের মি, রোজআ?’
রোযা কিছু বলতে চেয়েও মাথা দোলাল। বেশ বাধ্য! এতো বাধ্য! বৃষ্টি আদিলের পাপড়ি থেকে রোযার গালে পড়ল। সে দৃশ্য দেখে আদিলের কণ্ঠ এইগভীর রহস্যময় রাতের চেয়েও রহস্যময় শোনাল –
‘সাচ ওবিডিয়েন্স… হ্যাভ ইউ ফাইনালি সারেন্ডার্ড, মাই বিলাভড?’
