বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫২
ইশরাত জাহান
কিছুক্ষণ পর শোভাকে মুক্ত করলো দর্শন।শোভা জোরে জোরে নিশ্বাস ছাড়তে ব্যাস্ত।দর্শন মৃদু হেসে বলে,“ভয় পেয়েছিলে ওয়াইফি?”
শোভা চমকে তাকালেও লজ্জায় সাথে সাথে মুখ সরিয়ে নিলো।মুখে কিছু বলল না।দর্শন বলতে শুরু করে,“আমি ব্যতীত অন্য কাউকে দেখার অধিকার তোমার নেই।কথাটা ব্রেনে ভালোভাবে সেট করে রাখো।”
শোভা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝিয়ে দিলো।কয়েক সেকেন্ড পর হুশ ফিরতে একটু জোরে ও তেজি সুরে বলে,“অন্য কাউকে বলতে?আমি কাকে দেখছিলাম?”
“ভার্সিটির ওই গোলাপি পোশাক পরা ছেলের প্রতি তোমার আকর্ষণ বেড়েছিল।ওর প্রতি তো তোমার ইন্টারেস্ট বেশি ছিল।তোমার সাহস হলো কীভাবে ওসবের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট আনার?”
শোভা নরম সুরে শান্ত হয়ে প্রশ্ন করে,“আমার কি সেই অধিকার নেই?”
দর্শন ভ্রু কুচকালো অতঃপর জানায়,“না নেই।”
“কেন নেই?আপনি আমাকে অধিকার দেখানোর কে?”
“আমি তোমার স্বামী।”
শোভা চেয়ে আছে দর্শনের মুখপানে।মনে মনে খুশি হয়। তারপরও মনকে পরিপূর্ণ শান্তনা দিতে ইচ্ছাকৃত বলে,“আপনি আমার স্বামী।আপনি আমার উপর যখন যা ইচ্ছা অধিকার ফলাতে পারবেন কিন্তু আমি?আমি কি?আমি কি আপনার বউ না?আমার কি আপনার উপর কোনো অধিকার নেই?আমার কি অধিকার নেই আপনার বউ হয়ে চলার?আপনার থেকে সম্মান পাওয়ার অধিকার কি আমার নেই?আপনার থেকে ভালোবাসা…
বলতে গিয়েও থেমে গেলো শোভা।দর্শন বুঝতে পারলো শোভার অবজেকশন।ঠোঁট প্রসারিত করে বলে,“আমার থেকে ভালোবাসা….এরপর কি?”
শোভা চুপ করে আছে।দর্শন চেয়ে আছে শোভার দিকে।শোভা উত্তর দিচ্ছে না।দর্শন কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে শেষমেষ বিরক্ত।ওর মধ্যে উত্তেজিত কাজ করছে।ওর তো এটা একদম সহ্য হয়না।ওকে কেউ অপেক্ষায় রাখবে এটা মানতে পারে না।দর্শন চায় শোভা বাকিগুলো গড়গড় করে বলে দিক।শোভাকে চুপ থাকতে দেখে দর্শন উত্তেজিত হয়ে আরও বেশি শক্ত করে চেপে ধরলো শোভাকে।শোভা ব্যাথা পেয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নেয়।শক্ত কণ্ঠে বলে,“এত জোরে চেপে ধরার কি আছে?”
দর্শন রাগী দৃষ্টিতে বলে,“তুমি জানো না আমি কোনো প্রশ্ন করলে তার উত্তর সাথে সাথে না পেলে রেগে যাই?তবুও কেন অপেক্ষা করাও আমাকে?”
শোভা মাথা নিচু করে বলে,“বাকি কথা বলতে পারব না দুঃখিত।”
দর্শন মাথা দুলিয়ে বলে,“উহু।কোনো দুঃখিত না ওয়াইফি।আমি বাকিটা শুনতে চাই।”
শোভা লাজুক চাহনি দিয়ে বলে,“না বললে হয়না?”
দর্শন এবার মাথাটা শোভার দিকে ঝুঁকে নেয়।ঠোঁটে বাকা হাসি ফুটিয়ে বলে,“না হয়না।”
শোভা কথা এড়াতে বলে,“দাদাজান নিচে অপেক্ষা করছেন। দিজা জানালো দিদার ভাই নাকি সারপ্রাইজ দিবে আমাদের।তাড়াতাড়ি নিচে যেতে হবে।”
দর্শন কথাগুলো ঘুরিয়ে বলে, “আই ডোন্ট কেয়ার। আই এম নট ইন্টারেস্টেড এবাউট দেয়ার সারপ্রাইজ।”
শোভা কাপা কণ্ঠে বলে,“তাহলে কিসে ইন্টারেস্টেড?”
দর্শন চোখে নেশালো ভাব ফুটিয়ে বলে,“নাউ আই হ্যাভ অনলি ইন্টারেস্টেড এবাউট মাই ওয়ান এন্ড ওনলি ওয়াইফি।”
শোভা থমকে গেলো।গা শিরশিরিয়ে উঠছে শোভার।হাতে লোম দাঁড়ানো দৃশ্য দেখা দিচ্ছে।দর্শন চোখ বুলিয়ে দেখলো সেখানে।মৃদু হাসলো।শোভার এবার ঠোঁট কাপছে।কাপা কাপা ঠোঁটে বলে,“আমি ভুলে গেছি।”
দর্শন মাথা নাড়িয়ে বলে,“না,তুমি ভোলোনি।তুমি শুধু ব্যাপারটা এড়িয়ে যাচ্ছো ওয়াইফি।বাকিটা শেষ করো।”
শোভা অবাকের সাথে বলে,“আপনি খুব ভালোভাবেই জানেন আমি কি বলতে চাই!”
দর্শন হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ালো।শোভা অভিমানের সাথে বলে,“তবুও কেন শুনতে চান?”
“আমি শুনতে ইন্টারেস্টেড যে তুমি আমার থেকে ভালোবাসা চাও ওয়াইফি।”
শোভা লজ্জা পাচ্ছে কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছে না।ওর সাথে দর্শনের সম্পর্ক এখনও পরিপূর্ণ সংসারের মত না। আর চার পাঁচটা সাভাবিক স্বামী স্ত্রীর মত এরা চলেনি।তার মধ্যেও যেনো কতগুলো মিষ্টি মধুর মুহূর্ত পার করেছে।শুধু মিষ্টি মধুর না তিক্ত মুহূর্তও আছে।সব মিলিয়ে শোভাকে গুলিয়ে ফেলে।সবথেকে বড় কথা শোভার কাছে দর্শনকে সাহেব সাহেব লাগে আর নিজেকে দর্শনের কাছে নিচু।দর্শনের অর্থ সম্পদ বেশ ভালো।দর্শন অতি শিক্ষিত।দর্শন নিজ পায়ে দাঁড়ানো একজন ছেলে।সেই সাথে দর্শন বদমেজাজি,রাগী।সেখানে শোভা কি?কিছুই তো না।এখন এই পরিস্থিতে নিজে থেকে এই লোকের থেকে ভালোবাসার দাবি করলে আত্মসম্মানে লাগবে না?লাগতেই পারে।নারীদের এই আত্মসম্মান অনেক বড়।শোভা কান্না কান্না নয়ন দিয়ে দর্শনকে দেখে বলে,“আপনি আমাকে নিচু করতে খুব ভালোবাসেন তাই না?”
দর্শন অবাক হয়ে গেলো।ওর প্রতিটা স্টেপ শোভাকে নিচু করা বোঝায় কিন্তু দর্শন তো ওকে নিচু করে না।ওর মধ্যে এসব ভাবনা আসে না।তাই অবাক হয়ে বলে, “মানে?”
“আপনি সবসময় আমাকে অপমান করেন।আমাকে গ্রহণ করতে আপনার অসুবিধা আছে।কেন আছে এটা আমি জানি কিন্তু আপনি আমাকে সেই কারণে বারবার নিচু করতে পারেন না।আমিও মানুষ।আমার কি সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার অধিকার নেই?”
দর্শন শোভার দিকে চেয়ে আছে।চুপ করে আছে।একদম চুপ হয়েগেলো শোভার কথা শুনে।শোভা এবার দর্শনকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলে,“কি হলো?এবার আপনার মুখ বন্ধ কেন?আপনি কেন উত্তর দিচ্ছেন না?একমাত্র আপনি প্রশ্নের উত্তর সাথে সাথে পেতে চান।এটা তো হয়না।আমারও কিছু জানার আছে।আমারও তো নিজের জীবন নিয়ে ভাবনা আছে।আপনি যেভাবে হেলাফেলা করছেন আমাকে নিয়ে আমি সেভাবে নিজেকে হেলাফেলায় রাখতে পারব না।”
দর্শন এবার নরম চাহনি দিয়ে বলে,“আমি তোমাকে হেলাফেলায় রাখছি?”
শোভা এবার ঠোঁট বাকা করলো।দর্শনের প্রতি অভিমানের এক হাসি ফুটে উঠল শোভার ঠোঁটে।দর্শন স্পষ্ট বুঝতে পারছে এই হাসির অর্থ।শোভার চোখ বেয়ে পানি পড়ল সাথে সাথে।দর্শন সেই পানির দিকে চেয়ে আছে।শোভা বলে উঠল,“অল্প বয়সে বিয়ে হলো আমার।কলঙ্কিত হয়ে বিয়ে।যে আমি কোনো পুরুষের সম্মুখে যাই না সেই আমি এক রাতে নষ্টা হয়ে গেলাম নষ্টামি না করেই।ওই সময় আমি আপনি যেসব অপমানজনক কথা শুনেছিলাম তাতে আপনি শুধু আমার দিকেই আঙুল তুলেছিলেন।আপনার কি মনে হয় আমার কি খুব ভালো লাগছিল প্রতিবেশীদের থেকে বাজে মন্তব্য পেতে?আমার ভয়ে যেমন মুখ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা ছিল ঠিক তেমনি মনে মনে রাগ ও ঘৃণাও ছিলো। মন তো আমারও করছিল ওদেরকে খুন করে দেই।ওদের সাহস হলো কীভাবে আমার দিকে বাজে আঙুল তোলার?কিন্তু আমি তো নিরুপায়।আপনার মত প্রভাবশালী না।আমার চলাফেরা শিক্ষাদীক্ষা কোনকিছুই শক্তপোক্ত ছিলো না।আমার জীবন আপনার জীবন আলাদা।এই কারণে ওই রাতে আপনি হিংস্র হয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও আমি পারিনি।কিন্তু এখানেও আমার একটা প্রশ্ন আছে।আপনি তো ভালোই প্রতিবাদ করেছিলেন ওই রাতে।সবার সাথে তর্ক করেছিলেন।পুলিশের হুমকি অব্দি দিয়েছিলেন।তাও কি ঠেকাতে পারলেন আমাদের বিয়েটা?পারলেন না তো।তাহলে আমার একার কেন দোষ এই বিয়েতে?আমি আমার রান্নাঘরে গিয়েছিলাম।যেখানে আপনি ছিলেন বাইরের মানুষ।একটা দুর্ঘটনা।যেখানে আমার উচিত আপনাকে দায়ী করা সেখানে প্রতিনিয়ত আপনি আমাকে দায়ী করেন।
কেন করেন?কোন হিসাবে করেন?আমি মেয়ে বলে?নাকি আমি গরিব প্রতিবাদ করতে পারব না বলে?আমার ভাই আছে সে থেকেও না থাকার মতো এসব ক্ষেত্রে।এই জন্য আমাকে বারবার কথা শুনতে হয়।আপনি তো পালিয়ে গেলেন বিদেশে।আমি বিবাহিত হয়েও সুরক্ষিত ছিলাম না।স্বামী নেই কাছে।লোকের কাছে এটাই যেনো বেশি কু দৃষ্টির হয়েগেলো।এলাকার বাজে ছেলেরা সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলো।যে মেয়ের স্বামী খোঁজ নেয়না বিবাহিত হয়েও থাকে একা সেসব মেয়েদের গোপনে কত বাজে প্রস্তাবে পড়তে জানেন আপনি?আমি জেনেছি এই চারটা বছরের মধ্যে।এই সবকিছুর দায়ী কে?একমাত্র আপনি।আমার মায়ের মৃত্যুর সময় আপনার পরিবার ও আমার কিছু প্রতিবেশী পাশে ছিল ঠিকই কিন্তু তার মধ্যেও সবাই এসে এসে আমার মাথায় হাত দিয়ে খোঁচা মেরে কথা বলে গেলো।আমি আমার মায়ের লাশের সামনে যখন মায়ের বিদায়ের কান্না করছিলাম তখনও আমি আশেপাশের লোকেদের থেকে তিরস্কার পেয়েছিলাম।সবাই আমাকে নিয়ে হাহাকার করছিল ঠিক কিন্তু তাদের কথার মধ্যে ছিল আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করার মত।শুধুমাত্র আপনার পরিবারের দয়াতে আমার এতদূর ধৈর্য ধরে এগিয়ে আসা।কিন্তু পরিবার কি আমার জন্য সব? নাকি যাকে আমি বিয়ে করেছি সে আমার সব?
আমার আপন বলতে কে এই ফরাজি বাড়িতে?আমি তো শুনেছি একটা মেয়ে বিয়ে করে শশুর বাড়িতে যায় স্বামীর হাত ধরে।ওই স্বামীর কারণেই সে সবাইকে আপন করে নেয়।তাহলে আমার বেলায় কেন উল্টো নিয়ম?আমি আমার মায়ের মৃত্যুর দিনেও আমার জীবনের কলঙ্ক নিয়ে কথা শুনেছি।আমি কলেজে গেলে প্রতিবেশী দুটো মেয়ে সবাইকে বলে বেড়াতো আমাকে নিয়ে।এক এক করে কত মানুষ জানতে পারে আমার ব্যাপারে আপনার সেই ধারণা নেই।আমি কি ইচ্ছাকৃত এমন?আমি কেন সবার কাছে হাসির পাত্রী হয়ে থাকি?আপনার জন্য একমাত্র আপনার জন্য আমাকে হাসির পাত্রী হতে হয়েছে।তবুও আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম।কারণ আমি যে আপনাকেই তিন কবুল বলেছিলাম।আপনার নাম ধরে কাজী আমাকে বিয়ে পড়িয়েছিল।আমি সবকিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে শুধু ভেবেছিলাম আপনি দেশে ফিরবেন আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কের টানে।ঠিক যেমন আমি অপেক্ষায় আছি এই সম্পর্কের টানে।যে মানুষকে আমি চিনি না তার সাথে সংসার করার অদম্য ইচ্ছা বেড়েছিল।আপনাকে না চিনেই আপনার সাথে সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম।কারণ আমি তো মেনেই নেই আপনি আমার স্বামী। এই স্বামীর মূল্য একজন নারীর জীবনে কি এটা আমাকে শিখিয়েই গেলো সবাই।
প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে শেখানো হয়েছে আমি বিবাহিত আমার স্বামী আমার সব।স্বামীর স্থান সবার উপরে।আপনাকে সেই স্থানে রাখতে গিয়ে আমি কি পেলাম?আপনার থেকে তিরস্কার।মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আপনি আমাকে গ্রহণ করেছেন কিন্তু আবার হুট করে এমন আচরণ করেন যেনো সব পাল্টে যায়।এমনটা কেন হয়?আপনাকে নিয়ে আমি এখন দোটানায় কেন ভুগছি?একটা স্থির সিদ্ধান্ত নেই কেন আমাদের মাঝে?একবার মনে হয় আপনি চাপা স্বভাবের বলেই আমার যত্ন নিচ্ছেন মেনে নিয়েছেন কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছেন না আবার যখন আপনি বদলে যান তখনই যেনো আমার ভাবনা পাল্টে যায়।মনে হয় সেই আগের দর্শন ফরাজি ফিরে এসেছে।এমনটা হলে আমি সংসার করবো কীভাবে?আপনি আসলে কী চান আমার বুঝতে খুব অসুবিধা হয়।আপনি পারলে আমাকে সরাসরি জানিয়ে দিন আপনি কি চান?আমি আপনার উপর জোর করে এই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাব না।আমি কথা দিলাম।”
শোভার প্রতিটা কথা মন দিয়ে শুনল দর্শন।শোভা হাঁপাচ্ছে।হাঁপাতে হাঁপাতে কথাগুলো বলেছিলো এতক্ষণ।দর্শন যখন দেখলো শোভার হাঁপানির সাথে এবার চোখের পানি অতিরিক্ত ঝরছে শোভার গাল কান্না করতে করতে লাল টুকটুকে হয়ে এসেছে তখনই দর্শন তাকে জড়িয়ে ধরলো।শোভাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে দর্শন।শোভা এতক্ষণ মনের কথাগুলো প্রকাশ করলেও এবার চুপ হয়ে গেলো।দর্শন শোভাকে জড়িয়ে ধরে বলে,“এত অভিযোগ দিলে অথচ এটা বললে না যে তুমি আমার ভালোবাসা চাও।যেটার জন্য তুমি চার বছর অপেক্ষা করেছো।যেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য তোমার মন ছটফট করছে।”
শোভা দুর্বল হয়েগেলো।হাত দুটো নিচের দিকে ঝুলে আছে।শরীর হালকা লাগছে নিজের কাছেই।সব ভার দর্শন নিয়ে আছে।শোভা মুখ কাপাতে থাকলো।কিছু বলার জন্য।চাপা কান্না করছে বলে বলতেও পারছে না।অনেক কষ্টে কাপা কাপা ঠোঁটে বলে,“স্বামীর থেকে ভালোবাসা চাওয়াটা কি অন্যায়?”
দর্শন মাথা নাড়িয়ে বলে,“একদমই না।স্বামীর থেকেই তো বউয়েরা ভালোবাসা চাইবে।”
শোভার ঠোঁট এর মাঝেই প্রসারিত হলো।দর্শন আবারও বলে,“তবে শুধু স্বামীর থেকে বউ না বউয়ের থেকেও স্বামীরা ভালোবাসা চায়।একতরফা ভালোবাসা দিয়ে কি সংসার গড়ে ওঠে?”
শোভা আবারও থমকে গেলো।দর্শন শোভাকে ছেড়ে এবার শোভার মুখটা দেখলো।শোভার চোখের লেপ্টানো পানি হাত দিয়ে মুছে জিজ্ঞাসা করে,“আমি তোমাকে ভালোবাসা দিবো।বিনিময়ে তুমি কি আমাকে ভালোবাসতে পারবে না?”
শোভার মুখটা বন্ধ করতে যেনো দর্শনের এই কথাটাই যথেষ্ট।শোভা কি বলতে বুঝতে পারছে না।ফয়সালা করতে গিয়ে লজ্জায় নুয়ে পড়ছে কেন?আজকে ফয়সালা হয়ে যাওয়াই তো ভালো।এরকম দোটানার সংসার জীবনের থেকে তো ভালো হয় বিচ্ছেদ নাহয় সুখের সংসার।শোভাও মনে মনে বলছে,“আমি তো আপনাকে কবেই ভালোবেসেছি।শুধু প্রকাশের বেলায় অকেজো হয়ে পড়ছি।আমি কিভাবে স্বীকার করবো আমি আপনাকে ভালোবাসি?আমার যে বলতে গিয়ে গলা আটকে আসছে।”
দর্শন আবারও শোভাকে ধাক্কা দিয়ে বলে,“কি হলো বলো?তুমি কি আমাকে ভালোবাসা দিবে না?”
শোভা লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে বলে,“চেষ্টা করব।”
দর্শন অধৈর্য হবার মতো করে বলে,“তোমার বেলায় আমি ভালোবাসা দিতে রাজি হয়ে গেলাম আর আমার বেলায় তুমি শুধু চেষ্টা করবে!এটা কেমন হয়ে গেলো?আমার সাথে বড় অন্যায় হয়ে গেলো না ওয়াইফি?”
শোভা নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,“আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের বদলা আগে শেষ হোক তারপর নাহয় আমি বাকিটা দেখব।”
দর্শন ভ্রু কুঁচকে বলে, “আর ইউ শিওর?”
শোভা মাথা হ্যাঁ বোধক নাড়িয়ে বলে,“হুমমম।”
দর্শন শোভার দুইহাত ধরে হাতের পিঠে আলতো চুম্বন দিয়ে শোভার লাজুক মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হেঁসে বলে,“তবে তাই হোক।আজ এমনকি এই মুহূর্ত থেকে আমি দর্শন ফরাজি আমার ওয়াইফিকে শুধু ভালোবাসা দিয়েই যাবো।সেই সাথে আমার ওয়াইফি আমার থেকে স্বামীর হক জমানোর সাহস পেলো।আমি তাকে সম্পূর্ণ সাহস দিয়ে দিলাম।শুধু তাই না।আমার ওয়াইফি আমাকে যে রূপে দেখতে চায় আমি তার সাথে সেই রূপেই থাকবো।”
শোভা ঠোঁটে চওড়া হাসি দিলো।দর্শন নিজেও মৃদু হেঁসে আবারও বলে,“তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
শোভা হাসি থামিয়ে আতঙ্কের সাথে বলে,“কি শর্ত?”
“আমি ব্যতীত কোনো যুবককে দেখে তুমি আকর্ষিত হতে পারবে না।আজকেই তোমার লাস্ট চান্স এটা।তোমার সকল আকর্ষণ আমাকে দেখেই হবে।আমি টোলারেট করব না আমার ওয়াইফি অন্য কাউকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছে।”
শোভা বেক্কল বনে বলে,“মানে কি?আজকে লাস্ট চান্স মানে কি?আমি কবে কখন কোন যুবককে দেখে আকর্ষিত হয়েছি?আপনি আবার?আবার সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন?আমি কিন্তু সহ্য করব না এসব।”
দর্শন নিজেও অবাক হয়ে বলে,“আজকে ভার্সিটিতে তুমি পিংক শার্ট পরা যুবককে দেখে ওর নাম জিজ্ঞাসা করেছিলে দিজার কাছে।এমনকি তুমি ওর কাছে ওই যুবককে নিয়ে প্রশংসা করছিলে।”
শোভা একটু ভেবে থমকে গেলো।অতঃপর মুখ ফসকে হেঁসে দিয়ে বলে,“আপনি ভেবেছেন আমি অন্য যুবক দেখে ওমন করছিলাম?”
দর্শন কপালে ভাঁজ ফেলে বলে, “তা নয়তো কি?”
শোভা জানায়,“ওখানে গোলাপি রংয়ের ফুল গাছ ছিল।আমি নাম জানি না।এমনকি ওই গাছের উপর একটা পাখি ছিল ওই পাখিটারও নাম জানতাম না।তাই ওগুলো নিয়ে কথা বলছিলাম।”
দর্শনের নজরে গোলাপি রংয়ের ফুল আসেনি।সে জেলাস হয়ে যেদিকে নজর রেখেছিল মাথার মধ্যে সেগুলোই ছিল।তাই শোভার বলা গাছটা চিনতে পারল না তবে শোভার কথা বিশ্বাস করে নিলো।যার কারণে নিজের মাথায় হালকা একটা চাপড় দিলো।
নিচ থেকে দাদাজানের ডাক শুনল দুজনে।শোভা বলে ওঠে,“ভাইজান এসেছে সারপ্রাইজ নিয়ে।তাড়াতাড়ি চলুন নিচে।”
বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫১
বলেই শোভা মাথায় হিজাব দিতে নিবে দর্শন শোভার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসলো। শোভার মাথা ঠেকলো দর্শনের বুকেতে।শোভা প্রশ্ন ছুড়লো,“কি হলো?”
দর্শন নির্দ্বিধায় বলে,“আজ থেকে আমার উপর হক জমানোর সম্পূর্ণ অধিকার আছে তোমার।আমি যেমন তোমার উপর অধিকার জমাই তুমিও আমার উপর নির্দ্বিধায় অধিকার জমাবে।”
শোভা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলে,“মনে থাকবে।”
