প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৯
জান্নাত নুসরাত
নুসরাতকে কবরে শায়িত করে রেখে আসার পরপরই অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি হলেন নাছির সাহেব আর আরশ। ঘটনাক্রমে ডাক্তারের কাছ থেকে জানা গেল আরশের শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণ ক্যানাবিস ড্রাগ পাওয়া গেছে। সেটা শোনে যতটা হতবাক হলো সবাই তার থেকে বেশি অবাক হলো গত দু-বছর ধরে সে নিয়মিত সেগুলো নিচ্ছে, এবং লক্ষণ প্রকাশ পায়নি। এমনকি কেউ বুঝেইনি নিয়মিত সে ড্রাগ নিচে। লিপি বেগম মুখে হাত রেখে বসে পড়লেন। হেলাল সাহেব চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলেন,”কোন কারণে ড্রাগ নিচ্ছে এর কারণ কী?
ডাক্তার সে কথার উত্তর দিলেন না, জানতে চাইলেন,”মিস্টার আরশ কী রাতে ঘুমাতে পারেন না?
লিপি বেগম না ভঙ্গিতে মাথা দুলালেন বললেন,”দেশ থেকে ফেরার পর ঘুম হয় না বলত, সকালে ঘুমাত।
ডাক্তার সৌজন্যতা বজায় রেখে হাসলেন,”মিস্টার আরশেত ড্রাগ নেওয়ার কারণ হচ্ছে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া, যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে ড্রাগ নিচ্ছেন তাই শরীরে অনেক ক্ষতি হয়েছে আর..
কথা কেটে দিল জায়িন। বলল,”কীভাবে এর থেকে বের করা যাবে সেটা বলুন?
ডাক্তার বললেন,”এই ক্ষেত্রে আমাদের বা আপনাদের বিশেষ কিছু করার নেই, রোগী যদি নিজ ইচ্ছে ড্রাগ নেওয়া বন্ধ না করেন তাহলে আর কোনো উপায় নেই। তাই উনাকে সময় দিন, কোনো জিনিস নিয়ে প্যানিক হতে দিবেন না, চোখে চোখে রাখবেন। শরীর কিছুটা সুস্থ হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এর কাছে পাঠাবেন কাউন্সিলিং এর জন্য। আর আমি কিছু ঘুমের ওষধ লিখে দিচ্ছি তা খাওয়াবেন।
ডাক্তার কথা শেষে চলে গেলেন। কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই আরশের ঘুমন্ত মুখ দেখা গেল। হাতে স্যালাইনের ক্যানেল লাগানো। লিপি বেগম ঠোঁট টিপলেন। হাতের হাতায় চোখ মুছে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন ছেলের দিকে তাকিয়ে।
শীতের মিহি সকাল। চারিদিকে কুয়াশা ঢেকে আছে। রোদ নেই। মেঘলা আকাশটায় কালো মেঘ লেপ্টে। সেই সুন্দর সকালটা কালো মেঘের বিদীর্ণতা ছড়িয়ে দিতে নাহিয়ানের কানে এসে পৌঁছালো নুসরাতের মৃত্যুর খবর। যেখানে বোমা হামলায় মৃত্যুর খবরটা চারিদিক তোলপাড় করে রেখেছে সেখানে নাহিয়ানের নিকট এতদেরীতে খবর পৌঁছালো তা অবাককরই বটে। এই নিয়ে একচোঁট চিৎকার চেচামেচি করল নাহিয়ান তৌফের উপর। তৌফ রেগেমেগে নিজেও চ্যাঁচাল,”এতক্ষণে পুরো পৃথিবীর মানুষ জেনে গেছে এই খবর আর আপনি জানলেন না কেন ভাই? এটা অবাককর বিষয় না, আপনি জানেন না, ভাবীআম্মা মারা গেছেন?’
তৌফের কথার বিপরীতে আর কোনো কথা না বলেই যত দ্রুত সম্ভব ছুটে আসলো পারিবারিক কবরস্থানটায়। টার্টেল নেক সোয়েট টি-শার্ট এর উপর গাঢ় বাদামি রঙের অভার কোট পরা। গলায় মাফলার প্যাঁচিয়ে রাখা, তবুও শীতের প্রকোপে কান লাল হয়ে আছে। মুখের সৌন্দর্য বর্দক উচু নাকটাও একইসাথে ঠান্ডায় লাল বর্ণ ধারণ করেছে। মিহি বাতাসে চিরনি না লাগানো উষ্ক খুষ্ক চুল গুলো উড়ে এসে কপালজুড়ে ছড়িয়ে। চোখের উপর এক দু গাছি চুল পড়ায় হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিল নাহিয়ান। পায়ের জুতোর গায়ে একগাদা কাদা লেগেছে, সেদিকে ধ্যান দেওয়ার সময় নেই তার। চোখ পড়ল পাশাপাশি অনেকগুলো কবরে। পারিবারিক কবরস্থান হওয়ায় বংশের সবার কবর সেখানে। সৈয়দ আকবর আলীর পাশের কবর সৈয়দ আজমল আলীর এবং তার কবরের পাশের কবর মেহেরুন নেছার৷ নাহিয়ান কবরগুলো পাশকাটিয়ে মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে গেল সামনে।
চোখে পড়ল কিছুটা দূরের কবরটা। দেখেই মনে হচ্ছে নতুন কবর। নাহিয়ান চোখ তীক্ষ্ণ করে তাকাল৷ গুটি গুটি অক্ষরে সাদা ফলকের উপর জন্ম, মৃত্যু লিখা। পা বাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই তার শ্বাস আটকে আসলো। সে শ্বাস নিতে পারল না। অনেকক্ষণ সেই গুটি গুটি অক্ষরের দিকে তাকিয়ে রইল। বাশের কঞ্চি দিয়ে চারিপাশ বেরি দিয়ে রাখা। হাঁটু গেড়ে বসে হাত ছোঁয়াল লিখার উপর। মাটি পুরোনো হয়ে শুকিয়ে গিয়ে ঝড়ঝড়ে হয়ে গিয়েছে। ফলকটা হয়তো গতকাল বসানো হয়েছে, চকচক করছে। সাদা রঙের সিমেন্টের উপর কালো রঙের গুটি গুটি অক্ষরে লিখে রাখা…
নাম:-সৈয়দা নুসরাত নাছির
স্বামী:-সৈয়দ আরশ হেলাল
পিতা:-সৈয়দ নাছির উদ্দিন
মাতা:-নাজমিন চৌধুরী
জন্ম-মৃত্যু:-৩১-১২-২০০৫ —০৮-১২-২০৩০
সেই লিখাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় চোখ ঘোলা হয়ে আসলো তার। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নোনাজল। কবরের মাটিতে হাত দিয়ে স্পর্শ করল। চোখ দুটো রক্ত বর্ণ ধারণ করেছে বহুপূর্বে। একদলা মাটি হাতের মুঠোয় চেপে ধরে অশ্ররুদ্ধ কাতর স্বরে বিড়বিড় করল,”সব দোষ আমার। আমার জন্য সব হয়েছে।
ইসরাত নামাজ শেষ করে হাত তুলল দোয়ার জন্য। নিষ্প্রাণ নয়নে চেয়ে রইল হাতের দিকে। বুকটা কাঁপছে ধীরে ধীরে। অনেকক্ষণ হাতের দিকে শূন্য নয়নে চেয়ে কয়েকপল কাটল। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি হাতের তালু দিয়ে মুছে দোয়া শেষ করে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা ঝিমিয়ে উঠল। সামনের দেয়ালটা অন্ধকারে এক মুহুর্তের মধ্যে ডুবে গেল। ইসরাত চোখ বুজে নিজেকে সামলে নিল। অতঃপর জায়নামাজ নিজ জায়গা রেখে রুমের বাহিরে হেঁটে গেল। নাজমিন বেগমের রুমে টোকা দিল, একবার, দু-বার! কোনো সারাশব্দ অপাশ থেকে না পেয়ে উঁকি দিল৷ দেখল মা ছবির অ্যালবাম নিয়ে বসে আছেন৷ নীরবে ছবিগুলো পরখ করছেন। ইসরাত ধীর পায়ে আগাল। বাতাসে বিরিয়ানির গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষের হইহই শোনা যাচ্ছে। চারদিনের সিন্নী করা হচ্ছে। ইসরাত বসল মায়ের পায়ের কাছে। অপলক চেয়ে রইল। পায়ে স্পর্শ করল, তবুও অপাশ হতে কোনো নড়াচড়া আসলো না। জিজ্ঞেস করল,”কিছু অনুভব করতে পারছ?
চোখের পলক ফেলে বললেন ভদ্রমহিলা,”না!
ইসরাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাথা ঠেকাল মায়ের হাঁটুর কাছে। চোখ বুজতেই একফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। মাকে শুধোল,”ও এত তাড়াতাড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেল কেন মা? আমরা থাকব কীভাবে ওকে ছাড়া?
প্রশ্নের কোনো জবাব এলো না, বাড়ির চার-দেয়ালে শব্দ গুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে আবারো ফিরে আসলো।
আহানের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আমিরা। মুখে অপরাধবোধের ছায়া। লম্বা, সুঠাম দেহি ছেলেটার মুখটা রাগে লাল হয়ে মরিচের মতো হয়ে আছে। হাতের মুঠি পাঁকিয়ে একহাতে অন্য হাত চেপে রেখেছে যাতে কোনোভাবে সামনের মেয়েটাকে থাপ্পড় না মেরে বসে। রাগে চোখে অন্ধকার দেখছে সে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে ব্যর্থ হলো। ধমকে ওঠল মারি চেপে,”কীসের ইনজেকশন পুশ করছিলে তুমি, আমিরা? কার কথায় এসব করছ, হু?
আমিরা কেঁপে ওঠে দু-পা পিছু সরে গেল। আহান এসবের কিছুই দেখল না। বাহু চেপে ধরে টেনে আনলো তার কাছে। থুতনি একহাতে চেপে ধরে নিচু মুখটা তুলে ধরল তার দিকে,”উত্তর দাও, আমিরা!
আমিরার শুভ্র চেহারাখানা ফ্যাকাশে রঙ ধারণ করেছে। মাথা ঝুঁকিয়ে নিতে চাইল, চোয়ালে হাতের চাপ বাড়ল,”কী হয়েছে, উত্তর দিচ্ছো না কেন?
আমিরাকে কাচুমাচু করতে দেখে ভ্রু বাঁকাল সামান্য। গলা নিচে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,”ভুলে যেও না আমিরা,আমি তোমাকে কেন বিয়ে করেছি। তোমাকে তোমার ভাইদের হাত থেকে যেহেতু আমি রক্ষা করে নিয়ে এসেছি, সেহেতু তোমার কোনো রাইট নেই আমার থেকে কিছু লুকানোর৷ যদি তা করার চেষ্টা করো, আমি এক লহমায় তোমাকে ছেড়ে আসব তোমার বাড়িতে।
আমিরা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। আমতা আমতা করে ওঠল। আহান তাড়া দিয়ে ভ্রু যুগল উচাল উত্তর দেওয়ার জন্য। আমিরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে ঢোক গিলে বলে ওঠে,”আগে কথা দিন চিৎকার চেচামেচি করবেন না!
আহান খ্যাক করে উঠতে গিয়ে থেমে গেল। তীক্ষ্ণ চোখে আমিরাকে কয়েক সেকেন্ড দেখে নিয়ে বলল,”আচ্চা।
আমিরা আহানকে বিশ্বাস করল না। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,”আচ্চা না, প্রমিস করুন আগে।
বিরক্তিতে তেতে উঠল ছেলেটা। চিরবির করে ওঠে বলল,”প্রমিস। এবার বলো, কে বলেছে আমাকে ইনজেকশন পুশ করতে?
আমিরা অপরাধ বোধ নিয়ে চোখ নোয়াল, বলল,“বড় আপু বলেছে।
আহান কথাটা শেষ হতেই ধুপধাপ পায়ে বেরিয়ে গেল রুমের বাহিরে, পেছন থেকে আমিরা থামানোর চেষ্টা করল, তার ধার ধারল না সে। দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে যাওয়া লোকটাকে আটকাতে হাতের বাহু চেপে ধরল আমিরা। আহান চোখ দুটো খিঁচিয়ে রাগে চ্যাঁচাল,”হাত ছাড়ো, আমিরা!
আমিরা গো ধরে বলল,”না ছাড়ব না। আপনি আমাকে কথা দিয়েছেন চ্যাঁচাবেন না।
“রাখো তোমার কথা তোমার কাছে, আজ আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।
আহান টেনে নিজের বাহু থেকে আমিরাকে ছাড়াতে চাইল, মেয়েটা ছাড়ল না তাকে, বাঁদরের মতো ঝুলে পড়ল একপ্রকার। একবার তাচ্ছিল্যের নজরে আমিরাকে পরখ করে নিয়ে শুধাল,”এই পাটকাঠির মতো শরীর নিয়ে তুমি আমাকে আটকাবে, আমিরা ?
উত্তর আসলো ঝটপট তার নিকট থেকে, “প্রয়োজন পড়লে অবশ্যই।
আহান শ্লেষ করে হাসল একপেশে। তারপর নিজের বাহুতে করে টেনে নিয়ে চলল আমিরাকে। আহানকে আটকানোর চেষ্টা করে ও পারল না সে, তাকেসহ টেনে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে চলল আহান।
ড্রয়িং রুমে আসতেই টেবিলের উপর কাগজে মোড়া সাদা রঙের একটা ফলক চোখে পড়ল। ইসরাতের রুমে যাওয়ার আগে দেখে নিবে ভেবে পা বাড়াল সেদিকে। চোখ কুঁচকে ফলক হাতে তুলে নিল। কাগজের টুকরোগুলো ছিঁড়ে ফেলতেই ফলকে গুটিগুটি অক্ষরে লিখা গুলো চোখের সামনে ভাসল। চোখ বুলিয়ে রেখে দিতে যাবে এমন সময় চোখে পড়ল স্বামীর নামের জায়গায় আরশের নাম লেখা দেখে। যেখানে তালাক হয়ে গিয়েছে, সেখানে আবার আরশের নাম এখানে দেওয়া হবে কেন! ওই লোকের নাম কে দিয়েছে এখানে! চিৎকার করে উঠল ফলকটা হাতে তুলে, দেয়ালে দেয়ালে সে চিৎকার প্রতিধ্বনি হলো,”এখানে ওই লোকের নাম কে দিয়েছে?
ইসরাত নিচ থেকে আহানকে চিৎকার করতে শুনে নাজমিন বেগমের রুম থেকে ছুটে বেরিয়ে আসলো। দো-তলার করিডোর থেকেই জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে?
আহান সেই কথার উত্তর না দিয়ে শূণ্যে তুলল সিমেন্টের ফলকটা ভেঙে ফেলার জন্য, ইসরাত দৌড়ে নিচে নামতে নামতে ক্ষীণ স্বরে চ্যাঁচাল,”বলবি তো কী হয়েছে? মাথার উপর ওঠা তুলেছিস কেন? পাগল হয়ে গিয়েছিস? নামা, নিচে নামা আহান।
গর্জে উঠল আহান,“হ্যাঁ পাগল হয়ে গিয়েছি! এখানে ওই লোকের নাম কী করে!
ইসরাত এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল,” কোন লোকের নাম এখানে? আর কেন পাগল হয়েছিস?
আহান হিসহিসিয়ে বলে ওঠল,”আরশ ভাইয়ের নাম কেন ফলকে?
ইসরাত কপাল কুঞ্চন করল,”থাকলে সমস্যা কী তোর?
আহান ঠোঁট বাঁকাল। কটাক্ষ করে বলল,”থাকলে কী সমস্যা? তুমি আমায় জিজ্ঞেস করছ কী সমস্যা আপু?
“হ্যাঁ আমি জিজ্ঞেস করছি, কী সমস্যা বল আমায়?
আহান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল,”ওদের ডিভোর্স হয়ে গেছে, তালাক হয়ে গেছে, তুমি কী ভুলে গেছো, এরপর ও আরশ ভাইয়ের নাম দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত আমি বুঝতে পারছি না।
আহানের এত কথা ইসরাত শুনল না, উত্তর দেওয়ার ও প্রয়োজন বোধ করল না, শুধু বলল,”রাখ এটা, যেখান থেকে তুলছিস ওখানে রাখ।
“রাখব না, এটা আমি ভেঙে নতুন করে বানিয়ে নিয়ে আসব।
ইসরাত ক্ষেপে গেল। ঠোঁট চেপে শ্বাস ফেলল তপ্ত। শান্ত স্বরে বলল,”তুই রাখবি ওইটা, যা জানিস না তা নিয়ে লাফাবি না, আহান।
ধৈর্য্যের বাধ ভাঙল আহানের। ইসরাতের কথার উপর চ্যাঁচিয়ে উঠল উঁচু গলায় প্রথমবারের মতো,“কী জানি না আমি, সব তো আমার সামনেই হলো। তালাক দেয়নি আপু, দেয়নি? আমি তো নিজ চোখে দেখলাম তালাকের পেপার সাইন করেছে তারা।
ঢোক গিলল ইসরাত। বলল,”সবসময় চোখের দেখা ভুল হয়, আহান।
আহান চিৎকার করে উঠল,“তুমি পুরো পরিবারের সামনে ঘটা ঘটনাকে ভুল বলতে পারবে না আপু?
ইসরাত কন্ঠস্বর চেপে হিসহিসিয়ে বলল,” হ্যাঁ বললাম, সবসময় চোখের দেখা যে সঠিক হয় তা কখনোই না, কখনো কখনো তা ভুল হয়!
ছেলেটা ইসরাতের কথা কানে তুলল না। চোয়াল শক্ত করে হাতে ধরা ফলকটা নিয়ে বেরিয়ে যেতে নিবে ভাঙার জন্য তার পূর্বেই তার বাহু চেপে ধরে ইসরাত থামিয়ে দিল। চোখ, মুখ,চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল আহানের দিকে৷ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,”তুই ওটা রাখবি না, আহান?
আহান জেদ ধরে বলল,”রাখব না৷
“শেষবারের মতো বলছি যেখান থেকে তুলেছিস সেখানে রাখ নাহলে…
কথা কেটে দিয়ে আহান বলল,”নাহলে কী করবে?
আমিরা দু-ভাই বোনের মধ্যে হা করে দাঁড়িয়ে রইল। দু-জনকে সমান হারে চিৎকার করতে দেখে একবার ননাসের দিকে তাকাল একবার স্বামীর দিকে। কে জিতবে কে হারবে ধারণা করা মুশকিল, কিন্তু ননাসের তিরিক্ষি আওয়াজে ধারণা করা যায় ননাসই জিতবে। কিন্তু যেভাবে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে তারা মনে হচ্ছে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে৷ যদি হাতাপাই হয়ে যায়? আহানকে দেখে মনে হচ্ছে ষাঁড়ের মতো তাড়া করে বসবে, তাই দু-জনকে থামানোর জন্য মিনমিনিয়ে বলল সে,”রেখে দিন, জেদ করছেন কেন?
মুখোমুখি দাঁড়ানো দু-ভাই বোন এক সেকেন্ডের জন্য নিজেদের চোখ সরাল না একে অপরের থেকে। আমিরার মিনমিনে কথাটা বলা শেষ হতেই আহান শাসাল,’”আমাদের ভাই বোনের মধ্যে কথা বলবে না, আমিরা। এখানে তোমার কোনো কাজ নেই,রুমে যাও।
আহানের কথা শোনে দু-পা পিছিয়ে গেল আমিরা। মাথা ঝুঁকিয়ে নিল, এতগুলো মানুষের সামনে ধমক দেওয়ায়। মুখ গোমড়া করে যেই রুমে ফিরে যেতে নিবে অমনি তার হাত ধরে ইসরাত থামিয়ে দিল তাকে। তার চিন্তাভাবনার বাহিরে গিয়ে আরেকটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। ড্রয়িং রুমের মানুষের পরোয়া না করেই ইসরাত বাজিয়ে একটা থাপ্পড় বসাল সামনের পাহাড় সমান লম্বা লোকটার গালে। আমিরা মুখে হাত চেপে ভয়ে চিৎকার করে ওঠল। দু*পা পেছনে সরতে চাইল, পারল না, তার হাত যে চেপে ধরে রেখেছে ইসরাত। কানে ভেসে এলো ইসরাতের কন্ঠস্বর,”তোর আর ওদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, নিজের বউকে তুই যেখানে সম্মান করতে জানিস না সেখানে আমার বোনের ব্যাপারে তোর নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই, যা সামনে থেকে সর। নাহলে তোকে আমি পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলব। জানোয়ার…
ইসরাত টেনে আহানের হাত থেকে ফলকটা নিয়ে চলে গেল। যেতে যেতে শাসিয়ে গেল চোখ দিয়ে। আমিরাকে উদ্দেশ্য করে বলল,”সময় থাকতে এই পাগলা ষাঁড়ের লাগাম টেনে ধরো, আমিরা। স্ত্রীকে কীভাবে সম্মান করতে হয় তা শিখাও!
আমিরা হতবিহ্বল চোখে ইসরাতের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল। অতঃপর চোরের মতো মুখ বানিয়ে আড়চোখে আহানের দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দু-জনের। হনুমানের মতো মুখ করে এদিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট টিপে হাসি আটকানোর বৃথা প্রচেষ্টা করল সে, হয়ে ওঠল না। দম আটকানো হাসির তোড়ে কেঁপে ওঠল তার সমগ্র বদন। তিরিক্ষি কন্ঠে আহান জিজ্ঞেস করল,”খুব হাসি পাচ্ছে, হু? হিহি করা শুরু করো, অসভ্য মেয়ে!
কথা শেষ হলো না ছেলেটার সত্যি সত্যি আমিরা হিহি করে হেসে উঠল। আহান দাঁতে দাঁত চেপে দু-পা আগাতেই আমিরা ভোঁ দৌড় দিল।
নুসরাতের মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্ণ হলো যেদিন সেইদিন দুপুরে জানা গেল সিলেটের মেয়র নাহিয়ান আবরার পূর্ব গ্রেফতার হয়েছেন। এর সাথে জানা গেল ইউনিমার্টে হামলার পেছনে নাহিয়ান আবরার পূর্ব পরোক্ষভাবে যুক্ত, এমনকি কালো বাজারে বাচ্চা শিশুদের কিডনি, লিভার, চোখ, দামি দামি অঙ্গ প্রতঙ্গ পাচার করেন তিনি। যেদিন এই ঘটনা সামনে আসলো সেদিন থেকেই মানুষের বদদোয়া দেওয়া শুরু হলো। প্রথমে যে নাহিয়ান আবরার পূর্ব ছিলেন মানুষের কাছে প্রিয়জন, যাকে স্বর্গের দূত মনে করত মানুষ তারাই গালি দেওয়া শুরু করল। নাহিয়ানকে গ্রেফতার করার দু-দিন পর মামলাটা আদালতে তোলা হলো। তার মধ্যে একদিন দুপুরে তার সাথে সিলেট সেন্ট্রাল জেলে দেখা করতে আসলো অনাকাঙ্ক্ষিত এক মেহমান। তাকে দেখে নাহিয়ানের বিভ্রম হলো। মুখ ফেড়ে বেরিয়ে আসলো পুরুষালি কাতর স্বরটা,”নুসরাত!
ইসরাত হাসল। মুখোমুখি বসল নাহিয়ানের। হিজাব প্যাঁচানো সুশ্রী মুখটা জ্বল জ্বল করে উঠল,”কেমন আছেন, পূর্ব?
নাহিয়ানের আবারো বিভ্রম হলো চোখের সামনে। ইসরাতের দিকে তাকিয়ে থাকল নির্মিশেষ। ইসরাত আবারো জিজ্ঞেস করল,”ভালো আছেন?
সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কাঁচের অপাশ হতে শুধাল সে,”কেমন আছি তা জিজ্ঞেস করে তাচ্ছিল্য করছেন?
ইসরাত নির্ভেজাল হাসল,”তা কেন করতে আসব, দেখতে এসেছি আপনাকে, আমার বোনের খুনী শিকের ওপাশে দেখতে কেমন দেখায়!
নাহিয়ান কাঁপা হাতে শিক চেপে ধরল। কাঁপা গলায় বলল,”আমি খুনী নই!
“আপনিই খুনী, পূর্ব! আমার বোনসহ অনেকের খুনী! এসব করে কী লাভ হলো? হাজার হাজার মানুষ মরল বিনা কারণে।
নাহিয়ানের মস্তিষ্ক সেই কথা মেনে নিতে পারল না। হতবাক মুখে চেয়ে রইল ইসরাতের দিকে। ইসরাতের মুখটা সরে গিয়ে আবারো নুসরাতের চেহারা সেখানে বসে গেল। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় একটা কথা মনে হলো, একবার নুসরাতকে সে জিজ্ঞেস করেছিল,”মেয়ে মানুষ হয়ে এত দুঃসাহস আর অহংকার করো, মাঠে মারা পড়বে তার ভয় নেই তোমার?
সেদিন নুসরাতের উত্তর ছিল এমন,”এটাই তো আমার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ। অহংকার আর দুঃসাহস হলো আমার মতো মেয়ে লোকের অলংকার। যদি না থাকে তাহলে এই পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকা তো বৃথা, পূর্ব।
দু-পাশে মাথা দুলিয়ে ওঠে বলল সে,”এত অহংকার, এত দুঃসাহস কোথা থেকে আসে আপনাদের?
ইসরাত ঈষৎ হাসে,”সেটা না জানলেও আপনার চলবে।
নাহিয়ান তাকিয়ে রইল। আবারো বিভ্রম শুরু হলো। চোখের পলকে দৃশ্যপট পালটে গিয়ে সেখানে রেস্টুরেন্ট চলে আসলো। সে আর নুসরাত মুখোমুখি বসে। নুসরাত হাসছে তার দিকে তাকিয়ে। মিহি স্বরে শুধাল,”খারাপ কাজ করেন, পূর্ব?
নাহিয়ান চমকাল বৈকি একটু। নুসরাতের দিকে দৃষ্টি তুলে চাইতেই আবারো মেয়েটা হাসল। এই মেয়ে এত হাসে কেন, নাহিয়ান জানে না! আগে কখনো এত হাসত না তাকে দেখে, কিন্তু গতবার আর এইবারের দেখা হওয়ায় একটু বেশি হাসছে। একটু আগেই যে হেসে হেসে একটা কঠিন সত্য কথা জিজ্ঞেস করে ফেলল তা কেউ দূর থেকে দেখে ঠাহর করতেই পারবে না। নাহিয়ান হাসি মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল সেকেন্ড কয়েকের জন্য। তারপর দৃষ্টি নামিয়ে নিল নিচে। মেয়েটা আবারো ডাকল একইসুরে,”পূর্ব…
নাহিয়ান তাকাল আবারো নুসরাতের দিকে। ছিপছিপে গড়ণের মেয়ে। সাধারণ বাংলাদেশী, বাঙালি নারী। তেমন বিশেষত্ব কিছু নেই। একটু ব্যতিক্রম আছে শুধু। যখন সে কথা বলে, হোক সেটা উল্টাপাল্টা, পাশের জন কখনো তার কথা শোনা থেকে থামাতে পারবে না। মানুষকে নিজের কথা দ্বারা আকর্ষণ করতে পারে সামনের মেয়েটা। নাহিয়ান ভেবে পায় না যেখানে বাঙালি নারীদের চাল-চলন পোশাক,আশাক, আদব কায়দা এমন না, বাঙালি নারীরা যেখানে কখনো পায়ের উপর পা তুলে বসে না নিজের থেকে বড় এর সামনে, সেখানে তার সামনের ব্যক্তি তা করে অনায়াসে। কে কী বলল, মনে করল, তাতে তার কিছু এসে যায় না। এই জন্য কী এই মেয়েকে তার ভালো লেগেছে? পছন্দ হয়েছে? সাধারণ এর মধ্যে অসাধারণ এই ভদ্রমহিলা।
বিকেলের ঝিমানো কমলাটে রোদ এসে গ্লাস দিয়ে প্রবেশ করে সরাসরি নুসরাতের টেবিলের উপর পড়ছে, কিছু কিছু আলো বিচ্ছিন্নভাবে পড়ছে নুসরাতের মুখের ওপর। তাতে দেখতে বেশ মিষ্টি লাগছে তাকে। শ্যামলা ত্বক জ্বলজ্বল করে উঠছে। নাহিয়ানকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নুসরাত ভ্রু উপরে তুলল। হেসে হেসে জিজ্ঞেস করল,”কী দেখছেন?
নাহিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে মৃদু হাসল। নুসরাত মুখে একছিপ কেকের টুকরো তুলে নিল। আলগোছে মুখ নাড়িয়ে খেতে লাগল। ভীষণ মনোযোগ দিয়ে কেকের আরেকটুকরো কেটে সে মুখে তুলল, এত মনোযোগ কেকের দিকে দেখে নাহিয়ান শুধাল,”আপনার মিষ্টি জিনিস পছন্দ?
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,”ভীষণ!
নুসরাতের উত্তরের বিপরীতে আবারো প্রশ্ন করল “কতটা পছন্দ?
ত্যাড়া উত্তরের আশা করল, এই পর্যন্ত তাদের যতবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে নুসরাতের কাছ থেকে শুধু ত্যাড়াই উত্তর বেশি পেয়েছে, কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে নুসরাত দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল,” মিষ্টি জিনিসের লোভ দেখিয়ে যে কেউ অপহরণ করে নিয়ে যেতে পারে। টপ সিক্রেট, পূর্ব পশ্চিম, ফাঁস যেন না হয়!
নাহিয়ান মাথা দোলাল। হাত তুলে ওয়েটারকে ডাক দিল। লোকটা এগিয়ে আসতেই বলল,”একটা পেস্ট্রি, অতিরিক্ত হুইপড ক্রিম দিয়ে৷ মিষ্টি ও বেশি করে দিয়ে দিবেন।
ওয়েটার অর্ডার গ্রহণ করে চলে গেল। নুসরাত ফর্ক দিয়ে খেতে খেতে হাসল মুখ তুলে। নাহিয়ান জানতে চাইল,”আমি ও কী আপনাকে অপহরণ করতে পারি মিষ্টি জিনিসের লোভ দেখিয়ে?
“অবশ্যই, করতেই পারেন, দেখুন পাসড হোন কী না।
নুসরাতের কথা শেষ হতেই নাহিয়ান তার ঠোঁটের কোণের দিকে ইশারা করে বলল,”ওখানে লেগে গেছে।
“কোথায়?
নাহিয়ান হাত বাড়িয়ে মুছে দেওয়ার আগেই নুসরাত টিস্যু তুলে ঠোঁটের আশপাশ ভালো করে মুছে নিল। সময় নিয়ে ডাকল এবার,“পূর্ব…
‘“হু..!
কয়েক সেকেন্ড কাটল। নুসরাত জিজ্ঞেস করল,“খারাপ কাজ করেন কেন? উত্তর দিলেন না যে?
নাহিয়ান মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলল। নুসরাত আবারো বলল,” মানুষ আপনাকে কী ভক্তি করে আর আপনি তাদের পিঠ পিছে ছুরি চালাচ্ছেন। ধোঁকা দিচ্ছেন তাদের, লজ্জা লাগে না?
“এ বিষয়ে আমরা কথা না বলি।
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,” বেশ এই ব্যাপারে কথা বলছি না, শুধু বলুন কবে ভালো হচ্ছেন?
নুসরাত থামল, তারপর আবার বলল,”জানেন তো, অন্যের সাথে খারাপ করলে নিজের সাথেও হয়। তাই আগেভাগেই ভালো হয়ে যান।
নাহিয়ান উত্তর দিল না। এর মধ্যে পেস্ট্রি নিয়ে হাজির হলো ওয়েটার। তাতে স্বস্থির শ্বাস ফেলল সে। নুসরাত আর সেই বিষয়ে কথা বলল না, গোলাপি কালার অতিরিক্ত হুইপড ক্রিম দিয়ে রাখা কেকটা খেতে ব্যস্ত হলো। একটা প্রশ্ন বারবার নাহিয়ানের মনে উঁকি দিল কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারল না৷
ইসরাত নাহিয়ানকে হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিব্রত বোধ করল, তাই উঠে দাঁড়াল ফিরে যাওয়ার জন্য। কোনো কথা না বলে চেয়ে চেয়ে তাকে অস্বস্তিতে ফেলছে লোকটা। এক পা বাড়াতেই পিছন থেকে প্রশ্ন ভেসে এলো,”চলে যাচ্ছেন?
“জ্বি দেখতে এসেছিলাম দেখা শেষ, এবার চলে যাচ্ছি।
নাহিয়ান জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। বলল,”একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যান, আমার কী শাস্তি আশা করেন আপনি?
“যাবত জীবন কারাদণ্ড!
সামান্য বিস্মিত হলো। ঠান্ডা চোখে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে শুধাল,“ কিন্তু সবাই তো আমার মৃত্যুদন্ড চাচ্ছে, আপনি কেন কারাদণ্ড চাচ্ছেন?
ইসরাত নিষ্প্রাণ চোখ দুটো কুঁচকে হেসে ফেলল। বলল,“আমার বোন যেভাবে তিলে তিলে মরেছে আপনি ও সেভাবে শিকের অপাশে তিলে তিলে কীভাবে মরবেন তা আমি দেখতে চাই। এত মানুষের হত্যাকারী একবারে শাস্তি পেয়ে গেলে কীভাবে হয়, তাই না পূর্ব?
নাহিয়ান হেসে ফেলল ইসরাতের পানে তাকিয়ে থেকে। ইসরাত নিজেও হেসে ফেলল। দু-জনের হাসির শব্দ অশরীরীর মতো চার দেয়ালে বারি খেয়ে ফিরে আসলো আবারো ভেতরে।
নাহিয়ানের সাথে দেখা করার সময় শেষ হতেই ইসরাত ফিরে আসলো সোজা নাছির মঞ্জিলে। বাড়ির ভেতর পা রাখতে পারল না, তার হাতটা চেপে ধরল কেউ একজন। ইসরাত জানে কে চেপে ধরেছে, তাই আলগোছে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ঠান্ডা অবয় চোখে রেখে তাকাল জায়িনের দিকে। লোকটা আবারো তার হাত ধরতে চাইল, সে গুটিয়ে নিল নিজেকে। কঠোর স্বরে বলল,”আমার থেকে দূরে থাকুন!
জায়িন সে কথা কানে না তুলে আবারো ইসরাতের হাত চেপে ধরল। চোখ তীক্ষ্ণ করে জানতে চাইল,”কোথায় গিয়েছিলেন?
“সেটা জানার আপনার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা।
“কেন?
ইসরাত শ্বাস ফেলল শব্দ করে,”আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই।
“আপনি বাধ্য ইসরাত!
ইসরাত ভ্রু বাঁকাল। শ্লেষ, কটাক্ষ দুইয়ের মিশ্রণে এমন করে হাসল যেন জায়িনকে নর্দমার কোনো কীট মনে করছে।
“ আমি বাধ্য? আমি? কীসব ননসেন্স কথা বলছেন আপনি?
“অবশ্যই আপনি বাধ্য, আপনি আমার স্ত্রী।
ইসরাত দু-পাশে মাথা দুলিয়ে তাচ্ছিল্যের সহিত হাসতে লাগল। জায়িনের কথা তার নিকট কোনো জোকস মনে হলো। নিজের হাত ছাড়ানোর বৃথা প্রচেষ্টা করল, সে জানে এই লোক যতক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বে না সে ছাড়াতে পারবে না৷ শ্লেষ করে বলল
“স্ত্রী? আমি? পাঁচ বছর আগে যে সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছে সেই সম্পর্ক টেনে আনছেন আমাদের মাঝে?
“সম্পর্ক শেষ হয়নি, আমি তোমাকে তালাক দেইনি।
“ তো কী হয়েছে, সেই অধিকার আপনার নেই, আপনি সেই অধিকার খুঁইয়েছেন।
জায়িন ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,“কেন নেই?
ইসরাত ব্যঙের মতো হা করে ফাঁপা নিঃশ্বাস ফেলল। এসব নাটক মোটেও তার ভালো লাগছে না। শরীরটা এত দখল মেনে নিচ্ছে না, একটু ঘুমানো উচিত, কতদিন হয় বিছানায় গা এলানো হয়নি। জায়িনের হাত একটু ঢিলে হতেই নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল সে। বলল,”ডেফিনেশন চাইছেন? আপনি জানেন না সম্পর্ক কেন শেষ?
ইসরাতের তাচ্ছিল্যে মাথা ঘামাল না মোটেও জায়িন। বলল,”না জানি না, আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি রেই!
“মোটেও আমাকে ওই নামে ডাকবেন না, জায়িন! আমি আপনার স্ত্রী নেই। শুনেছেন আপনি? আমি আর আপনার স্ত্রী নেই!
“ কিন্তু আমার কাছে লিগ্যাল পেপার আছে, আপনি আমার স্ত্রী।
“ওই দু-আনার পেপারের কোনো দাম আমার কাছে নেই।
“ কেন নেই দাম?
“দাম কেন নেই, তাই না? যখন আমার বাপ মরার সাথে লড়ছিল তখন আপনি কোথায় ছিলেন? যখন আমার পুরো পরিবার ভঙুর আপনি কোথায় ছিলেন? বিয়ের সময় তো অনেক বড় বড় ওয়াদা করেছিলেন, কখনো আমার চোখ থেকে পানি পড়তে দিবেন না, এই করবেন না, সেই করবেন না, তাহলে বিয়ের একুশদিনের দিন কে নিজের ওয়াদা ভুলে গিয়ে আমাকে ফেলে রেখে চলে গেছে? কে সেই ব্যক্তি যে নিজের ওয়াদা রক্ষা করেনি? আমি তো বলিনি এত বড় বড় ওয়াদা করুন, যদি পালন না করতেই পারবেন তাহলে ওয়াদা করেছেন কেন? জায়িন, আপনি কাপুরুষ। এই পরিবারের এক একটা ছেলে হলো কাপুরুষ। যেই শয়তানগুলা বড় বড় ওয়াদা করতে পারে কিন্তু সেগুলো পূরণ করতে পারে না৷ আপনার সাথে আমার ওই একুশদিনের সংসার ছিল, আর সেই একুশদিনের সংসার পাঁচ বছর আগে শেষ হয়ে গিয়েছে। যখন আপনাকে আমার প্রয়োজন ছিল তখন আপনি আমার সাথে ছিলেন না, এখন আপনাকে আমার প্রয়োজন নেই। যখন আমার ভাইকে আমাকে একা টেনে হসপিটালে নিয়ে যেতে হয়েছিল তখন আপনি কোথায় ছিলেন? আমার মা, আমার মা তার পায়ে শক্তি পায় না, আবার বাপ একবার হার্ট অ্যাটাক করেছে, এখন নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে না। আপনি তো কখনো আমার বিপদে পাশে ছিলেন না, তাহলে আমি কোন ভরসায় আপনার সাথে যাব? হু? বলুন কোন ভরসায়?
জায়িন ইসরাতের কাঁধ চেপে ধরে কাছে টেনে আনল। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করায় হাপিয়ে উঠেছে, শ্বাস নিচ্ছে টেনে টেনে। জায়িন শান্ত স্বরে বলল,“ইসরাত আপনি আপনার জায়গায় ঠিক, কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে আমার পরিবারটা ও তো তখন কী সাফার করেছে?
ইসরাত খ্যাঁকিয়ে ওঠল,“কেন, আরশ ভাইয়াকে দেশে রেখে চিকিৎসা করানো যেত না? আমি আপনাকে সঙ্গ দিতাম। আপনি আমার কাঁধ হতেন , আমি আপনার কাঁধ হতাম। একে অন্যকে ভরসা যোগাতাম। কিন্তু আপনি কী করলেন, প্যারিস চলে গেলেন, সকল দায়িত্বের ভার গছিয়ে দিয়ে গেলেন আমার উপর৷ পরিস্থিতির মোকাবেলা না করে গা বাঁচিয়ে পালিয়েছিলেন আপনারা। কেন? কেন? হু? অন্যদের কী বলব! আমার ঘরেই তো আরেকটা বেইমান আছে, ওইটা তো আরো বড় স্বার্থপর! নিজে উড়াল দিয়েছে আর আমাকে এই দুনিয়ার জাহান্নামে ফেলে গিয়েছে। সবাই স্বার্থপর, আপনি, আপনার বাবা, মা, আমার বাবা মা, আমার বোন, ইরহাম, আহান, সবগুলা স্বার্থপর। এখন আমিও স্বার্থপর হবো। কারোর পরোয়া করব না। বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকুক, মরলে মরুক, আমি কোনো কিছুর পরোয়া করব না। আমি স্বাধীন হয়ে ঘুরব।
দীর্ঘক্ষণ কথা বলায় হাপিয়ে উঠল ইসরাত। সময় নিয়ে শ্বাস ফেলল গাল ভরে। ঘরে ফেরার জন্য ঘুরতে নিবে জায়িন তার বাহু চেপে ধরল শক্ত হাতে। বলল,”নিজের অভিযোগ গুলো প্রকাশ করলে আমার অভিযোগ শুনবেন না আপনি?
ইসরাত কথা কেটে দিতে চাইল, কিন্তু জায়িন শক্ত হাতে তার বাহু চেপে ধরে থামিয়ে দিল,”এখন আমি বলব আপনি শুনবেন। এই যে আপনার এত অভিযোগ প্রকাশ করলেন আমার অভিযোগগুলো শুনবেন না?
“আপনার অভিযোগ কার প্রতি, আমার প্রতি? কিন্তু আমার জানামতে আমি এমন কিছু করিনি যার জন্য আপনি আমার প্রতি অভিযোগ প্রকাশ করবেন। আপনি তো আমার অপরাধী।
জায়িন চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল। ইসরাতের কথার উত্তর না দিয়ে বলতে শুরু করল,”নুসরাত আর আরশের ডিভোর্স হওয়ার পর আরশের শরীর খারাপ হতে শুরু করল, দেশে থাকতেই সে লক্ষণ প্রকাশ পেল। সারাদিন রুমের মধ্যে বসে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকত, এমনকি খাবার খেতে বসলে একটা টেবিল খালি রাখত। দিন দিন আরশের শরীর খারাপ হতে লাগল। আপনি নিজে দেখেছেন, রুম থেকে বের হতো না, খেত না, কারোর সাথে কথা বলত না, শুধু নুসরাত নুসরাত করত। আম্মু আরশের চিন্তায় নিজেও অসুস্থ হয়ে গেল। আব্বু তাড়া দিল দেশে থাকলে নুসরাতের স্মৃতি বেশি মনে করবে, চোখের সামনে দেখলে কষ্ট বেশি হবে তাই টিকেট এর ডেইট পিছিয়ে আনার জন্য। আমি প্রথমে না করি, বলি দেশে থেকে চিকিৎসা করান, কিন্তু আব্বু শুনেননি, তিনি ফিরে যাবেন। এমনকি কসম কেটে দিলেন আমাকে। আমি যেদিন টিকেটের ডেইট পিছিয়ে আনলাম সেদিনই জানালাম। আপনি রাগ করে বসে গেলেন, আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আপনি ইমম্যাচুর এর মতো পালটা আচরণ করে ফিরিয়ে দিলেন। ইসরাত আমি উনাদের বড় সন্তান, বাবা মায়ের ছোটদের থেকে বড়দের প্রতি আশা ভরসা আকাঙ্ক্ষা বেশি থাকে। আমি আমার বয়স্ক বাবার কথায় না করতাম কীভাবে!
এত এত চিন্তার ভীরে আমি বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলাম, মন মেজাজ ক্যাটক্যাটে হয়ে উঠল। সেদিন আপনাকে আমি ওইভাবে বলতে চাইনি, কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন তিক্ত কথাগুলো বেরিয়ে আসলো। ভাবলাম হসপিটালে গিয়ে আপনাদের সাথে দেখা করে আসব, যা ভুল বোঝাবোঝি হয়েছে তা মিটিয়ে আসব কিন্তু সেদিনই আরশ আত্মহত্যার চেষ্টা করল। হাতের রগ কেটে পড়ে রইল মেঝেতে। আম্মুর অবস্থা ভয়ানক। কেঁদে কেটে নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ল। আব্বু আম্মুকে নিয়ে ছুটল, আমি আরশকে। বাড়ির সবাই তখন মেঝ বাবার কাছে৷ একা হাতে সামলাতে গিয়ে হিমিশিম খেলাম। আরশকে অবজারভেশনে রাখা হলো। যখন হুঁশ ফিরল হাসল একটু। বোঝালাম আত্মহত্যার মতো জঘন্য কাজ না করতে, ধমকালাম না যদি হিতে বিপরীত হয়। কথা শেষ হওয়ার পর কিছুক্ষণ তাকিয়ে ঘুমে ঢলে পড়ল৷ ডাক্তার ইনজেকশন দেওয়ায় আবারো ঘুমিয়ে পড়েছিল। সারাদিনের ক্লান্তিতে আমার ও ঘুম নামল চোখে, ঘুম থেকে উঠলাম যখন তখন দেখি আবার ছুরি হাতে নিয়ে বসে আছে। রাগে ফেটে পড়ে বসালাম থাপ্পড়, জিজ্ঞেস করলাম আত্মহত্যার চেষ্টা করছে কেন? কী হয়েছে ওর? শুধু হাসে আমার কথার বিপরীতে, এবারো হাসল। কোনো বাক্য উচ্চারণ করল না৷ সাথে আছেই তো বারবার নুসরাতকে নিয়ে হ্যালুসেনেশন, যেখানে যাচ্ছে সেখানেই নিয়ে যাচ্ছে। এই অবনতি দেখে আম্মু আরো ভেঙে পড়ল।
রক্ত চাপ বাড়ল, সময়ে অসময়ে কান্না করত মুখে কাপড় চেপে, তাই ডাক্তার বলল এমন হতে থাকলে হার্ট অ্যাটাক হবে রোগীর, দু-জনকে ভালো আবহাওয়ায় নিয়ে যেতে। ডাক্তারের কথামতো আরশকে আর আম্মুকে ওই অবস্থায় নিয়ে দেশ থেকে পাড়ি জমালাম। তখন আমার মাথায় কিছু ছিল না! আম্মুর কান্না, আরশের আত্মহত্যার চেষ্টা, আব্বুর ভঙুর শরীর, আমি কী করতাম! একা হাতে সামলাতে সামলাতে আমি হাঁপিয়ে উঠলাম। মাহাদির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলাম, সম্ভব হয়ে উঠল না। প্যারিস ফিরার দু-সপ্তাহ পর মাহাদি যোগাযোগ করল, জানা গেল শাহেদ আঙ্কেল অসুস্থ। ডায়বেটিস বেড়েছে, কিডনিতে পাথর হয়েছে৷ এক সাথে সবধরণের রোগ ব্যাধি এসে ধরা দিয়েছে সবার ঘাড়ে। এত এত খারাপ খবরের ভেতর দেশ থেকে একটা ভালো খবর আসলো, মেঝ বাবা সুস্থ হয়ে ফিরেছেন, সাথে ইরহাম। আমি স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললাম৷ ভাবলাম আরশ ঠিক হলে দেশে আসব, এসে আপনাকে মানিয়ে যাব, সবার কাছে ক্ষমা চাইব এভাবে ফেলে রেখে যাওয়ার জন্য, কিন্তু অ্যাসাইলেমে পাঠানোর দু-মাস পর তাকে অ্যাসাইলেমের সদস্যরা এসে রেখে গেল বাড়িতে। বলল রোগীকে রাখা সম্ভব না। অত্যাধিক এগ্রোসিভ ব্যবহার করেন তিনি। বাসায় রাখলাম।
ততদিনে আর আত্মহত্যার চেষ্টা করেনি, ভাবলাম সুস্থ হয়ে গিয়েছে, আমার সেই ভাবনা বদলে গেল একরাতে।। ওর বিছানার নিচে একগাদা হুইস্কি, বদকার বোতল পাওয়া গেল৷ মাথা ঠিক থাকল না, গায়ে হাত তুললাম। আমার হাতে মার খেয়ে হাসল শুধু। মাহাদি কয়েকদিন পর আসলো। যখন সব ঘটনা জানল, বলল আরশকে নিয়ে হলিডেতে ঘুরতে যাবে৷ আমি সায় দিলাম। আমেরিকায় ঘুরতে গেল। ফিরে আসার দিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল, এপাশ হতে অপাশে যাওয়ার জন্য, হঠাৎ বাস দেখে তার নিচে নাকি লাফ দিয়ে দিল। আল্লাহর রহমতে বেশি ক্ষতি হলো না, পায়ে ফ্যাকচার পড়ল। ফাইন কেটে দিল, সেগুলো পরিশোধ করল মাহাদি। সুস্থ হওয়ার পর আবারো নিয়ে গিয়ে ইমারজেন্সি অ্যাসাইলেমে ভর্তি করে আসলাম। আটমাস পর সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে ফিরল। ভাবলাম এবার দেশে ফিরব, কিন্তু সময় আর সুযোগ কোনোটাই হয়ে উঠল।
ইসরাত এতক্ষণ চুপচাপ কথা শুনলেও, এবার জিজ্ঞেস করল,“তাই বলে পাঁচ বছর লেগে গেল ফিরে আসতে?
জায়িন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার কাছে এর জবাব নেই। চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল মেয়েটা। বলল,”জায়িন, আপনি আপনার জায়গায় ঠিক, আমি আমার জায়গায় ঠিক, আপনি ওই সময় আপনার ফ্যামেলিকে ফেলতে পারেননি, একজন সুপুত্র হয়েছেন, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আপনি না ইনসাফি করেছেন। ব্যালেন্স করতে পারেননি, পরিবার আর আমার মধ্যে।
জায়িন কাতর স্বরে বলল,”একটা সুযোগ দেওয়া যায় না?
‘“না জায়িন, সুযোগ দেওয়া যায় না। আপনার দিকে তাকালেই আমার সেই স্বার্থবাদী কথাগুলো মনে হয়। সম্ভব না।
জায়িন শুকিয়ে যাওয়া গলা ঢোক গিলে ভিজিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,” সম্ভব না কেন ইসরাত, চেষ্টা করলেই সম্ভব।
ইসরাত হাসল বেদনামিশ্রিত,”যা ছিল তা পাঁচবছর আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে।
“একবার ভেবে দেখা যায় না?
“ভাবতে গেলেই আমার সেই স্বার্থবাদী জায়িনের কথা মনে পড়ে।
“তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করোনি?
“ ক্ষমা করার মালিক তো আল্লাহ, আমি আপনি কে! আপনার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই জায়িন, আমাদের পথচলা ওইটুকুই ছিল।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৮
জায়িন ইসরাতের হাত চেপে ধরল। বলল,“আমাদের একটা সংসার হতে পারে ইসরাত, এত নিষ্ঠুর হবেন না!
“আমাদের সংসার হয়েছে জায়িন, ওই একুশদিনের, যে সংসারটা উত্তাল সমূদ্রে নাবিক ছাড়া ঢিঙ্গি নৌকার মতো ডুবে গিয়েছে, ওইটাই আমাদের সংসার ছিল।
