প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৮
জান্নাত নুসরাত
চোখ বন্ধ করার পূর্বে মানবী হাসল একটু। সেই হাসির সাথে নিভে গেল তার মনের সকল দুঃখ। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে গেল মনের ভেতর জ্বলতে থাকা আকাশসম কষ্ট। ঠোঁটের ফাঁক গলে বেরিয়ে গেল ফাঁপা দীর্ঘশ্বাস। পৃথিবীর প্রতি একরাশ দুঃখ নিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করল নুসরাত নাছির। শরীরের একাংশ পুড়ে গিয়ে খসে পড়ল পুড়া মাংস। যে জীবনের কাছে হেরে গিয়েছিল, যার অস্তিত্ব মাত্র পঁচিশ বছর ছিল এই পৃথিবীর বুকে, যে মরে যাওয়ার পর মনে রাখেনি তাকে কেউ, যার হারিয়ে যাওয়ায় পৃথিবীর কিছু এসে গেল না। আকাশের বুক থেকে শুকতারার হারিয়ে যায় তেমন করে হারিয়ে গেল নুসরাত নাছির। ঠোঁটের কোণে ঠেকে রইল বিষাদের হাসি। শেষ সময়ে যে কোনো পরিবারের সদস্যের সংস্পর্শ পায়নি। কেউ বাড়িয়ে দেয়নি ভরসার হাত তার দিকে৷ এই এক জীবন থেকে পেয়েছে সে কী! দুঃখ, দুঃখ আর দুঃখ! আকাশসম দুঃখ খোদা তার ভাগ্যে লিখে রেখেছিল কে জানত! এখন নুসরাত নাছির জেনে গিয়েছে! নুসরাত নাছিরদের কখনো হ্যাপি এন্ড হয় না, তাদের অকালেই ঝড়ে পড়ে যেতে হয় বটবৃক্ষের পাতার ন্যায়। এভাবেই শেষ হয় তাদের জীবনের অধ্যায়!
আকাশে কালো ধোঁয়ার আস্তরণে ঢেকে গিয়েছে পুরোটুকু। চারিপাশে মানুষের রক্ত ও পুড়ার আশাটে গন্ধ। ইউনিমার্টের বিল্ডিমংটা আর অক্ষত নেই, দেয়াল ভেঙে গিয়েছে। একটু আগে চকমক করতে থাকা বিল্ডিংটার চারপাশের রঙ উঠে গিয়ে ভুতুড়ে রুপ ধারণ করেছে। টেরোরিস্টরা যখন বুঝতে পারল পুলিশ তাদের কথা পরোয়া না করেই ভেতরে প্রবেশ করবে তখন তাদের শেষ চালটা দিয়ে দিল। তারা কখনো আত্মসমর্পণ করে না আইনের নিকট৷ হয় মরবে না হয় মারবে! আজ এই সময় এসে তারা ঠিক করল পুলিশের কাছে স্যারেন্ডার করার তুলনায় বুক উচিয়ে এভাবে মরে যাওয়া ঢের ভালো তাদের নিকট, তাই পুরো বিল্ডিংটা এক লহমায় শেষ করে দিল, সাথে শেষ করে দিল নির্দয়ের মতো একাধিক মা ও শিশুকে।
দুপুর দুটো বাজতে বাজতে বাংলাদেশের সকল নিউজ চ্যানেলে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। নিউজ চ্যানেলের শিরোনাম জুড়ে নিল: টেরোরিস্ট এর বোমা হামলায় ও গুলিতে নিহত সৈয়দা নুসরাত নাছির।
পত্রিকাগুলোতে প্রথম পাতায় ছাপল টেরোরিস্ট এর বোমা হামলায় নিহত সৈয়দ চয়েসের সিও সৈয়দা নুসরাত নাছির। কোনো কোনো পত্রিকায় মোটা করে নুসরাতের ছবি দিয়ে তার সম্পর্কে লিখা। কেউ কেউ তো তার পুরো জীবনী তুলে ধরেছে। অনেকে সেসব নিয়ে বিরক্ত হলো, অনেকে আবার দুঃখ প্রকাশ করল, কিন্তু মলের ভেতর যে সাধারণ জনগণ মরল তা নিয়ে কারোর কোনো মাতামাতি বা ভ্রুক্ষেপ দেখা গেল না, তারা এলিট পর্যায়ের ধনৈঢ্য পরিবারের মেয়েটাকে নিয়ে পড়ে রইল।
বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে পড়ল সেই খবর চারিদিকে। কিন্তু তখনো সৈয়দ পরিবারের সবাই অজ্ঞ এই বিষয়ে। তারা নতুন বউ বরণ করার কাজে মেতে আছে। নিউজ চ্যানেলের লাইভ টেলিকাস্টে দেখা গেল ইউনিমার্টের দেয়াল খসে খসে পড়ছে। ভেতর থেকে মানুষের পুড়া লাশের খণ্ডবিখণ্ড টুকরো নিয়ে বেরিয়ে আসছে একদল মানুষ। সেই চাঞ্চল্যকর খবর শুধু বাংলাদেশের নিউজ চ্যানেলে আটকে রইল না, আন্তর্জাতিক নিউজ পেপার, নিউজ চ্যানেল পর্যন্ত নিমেষেই পৌঁছে গেল হৃদয়বিদারক, লোমহর্ষক খবরটা।
ঘড়ির কাটা টিকটিক করে চলছে। ঠান্ডা, নিস্তব্ধ বাড়িতে সেই শব্দটাই যেন বজ্রপাতের মতো মনে হচ্ছে। বৃষ্টি তখনো থামেনি। অবিরাম ধারায় টিপটিপ করে পড়ছে ধরণীর বুকে। নীল আকশটা কালো মেঘের প্রলেপে অন্ধকার হয়ে আছে। জোহরের আজান দিয়েছে মাত্র। নাছির সাহেব গোসল থেকে বের হয়ে মাথায় টুপি পরলেন। ওযুর পানি মুখে লেগে আছে। তা উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করছে। জায়নামাজ পশ্চিম দিকে বিছিয়ে নামাজ শুরু করলেন৷ দীর্ঘ সময় নিয়ে সিজদাহ্ দিলেন। সাধারণ দিনের তুলনায় আজ সময় বেশি নিলেন সালাত আদায়ে। সকাল থেকেই মনে কিছু একটা হচ্ছে! আরাম পাচ্ছেন না! বুক ভার হয়ে আছে। কিছু একটা নেই নেই উপলব্ধি হচ্ছে। সেই নেইটা কী তিনি বুঝতে পারলেন না। তাই চিন্তিত ভঙ্গিতে মোবাইল হাতে নিয়ে প্রথমে নুসরাতকে কল দিলেন। মেয়েটা ছন্নছাড়া, কখন কী করে বলা মুশকিল! ইসরাত নিজেকে সামলে নিতে জানে তাই ইসরাতকে নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। নুসরাতকে নিয়েই যত দুশ্চিন্তা, এত উগ্র আর বেপরোয়া হলে জীবন চলে না! শীগ্রই ভালো দেখে একটা ছেলের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিবেন। এভাবে আর কতদিন! বয়স তো বাড়ছে! পঁচিশ বছর হয়ে যাবে সামনের ত্রিশ তারিখে। এতবড় হয়ে গিয়েছে তারপরও জেদি মেয়েটা একটু বদলায়নি। কল আজ বাজল না, রিং ও হলো না,অপাশ থেকে ভেসে এলো সংযোগ সম্ভব হচ্ছে না। নাছির সাহেব চিন্তিত বদনে হেঁটে গিয়ে বসলেন সোফায়। এর মধ্যে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলেন নাজমিন বেগম। ইসরাতের সাথে কথা বলছেন তিনি। জিজ্ঞেস করছেন,”বউ নিয়ে আসবি কখন এ বাড়িতে?
অপাশ থেকে হৈ হুল্লোড় এর শব্দ শোনা যাচ্ছে। ইসরাত চ্যাঁচিয়ে উত্তর দিল মায়ের প্রশ্নের,”আসছি আধঘন্টা সময় দাও।
সোফায় গিয়ে বসে নাছির সাহেব টিভি চালালেন। রিমোট চেপে নিউজ চ্যানেলে ঢোকতেই আজকের তাজা খবর দেখলেন। শিরোনামের দিকে চোখ গেল না, চোখ গেলে হয়তো এতক্ষণ বসে থাকতে পারতেন না। টিভির সামনে একটা মুখ দেখা গেল। গলায় আইডি কার্ড ঝোলানো, হাতে মাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রমহিলা। পেছনে পুড়া শপিং মল দেখা যাচ্ছে। কালো আকাশের বুক চিড়ে উড়ে যাচ্ছে কালো রঙের কয়েকটা কাক! নাছির সাহেব স্ক্রিনে দিকে তাকিয়ে রইলেন, মহিলাটা কথা বলছে আজকের বিষয় বস্তু নিয়ে। এর মধ্যে হঠাৎ পাগলের মতো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসলো আহান। এসেই হাত থেকে টেনে নিল রিমোটটা। রিমোট চেপে বন্ধ করে দিল টিভি। নাছির সাহেব অবাক চোখে তাকালেন তার দিকে। রক্তশূণ্য চেহারাটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কী হয়েছে?
আহান উত্তর দিল না, তার সারা শরীর কাঁপছে। থরথর করছে হাতদুটো। ছেলের এমন হাবভাব দেখে নাজমিন বেগম নিজেও শঙ্কিত হলেন। মনের ভেতর কু ডাক দিল। একই প্রশ্ন শুধালেন তিনি ও,”কী হয়েছে আহান? রিমোট নিয়েছিস কেন?
আহান প্রতিত্তোর করল না। রক্তাভ চোখে চেয়ে রইল নাছির সাহেবের দিকে। নাজমিন বেগম নিজের হাতের মোবাইলটা সেন্টার টেবিল থেকে তুলে নিতেই আহান আবারো সেটা কেড়ে নিল। ভদ্রমহিলা কিছুটা এতে চটলেন। রিমোট, মোবাইল সব কেড়ে নিচ্ছে কেন এই ছেলে? কিছু বলতে নিবেন এর মধ্যেই ল্যান্ডলাইনে কল আসলো। নাছির সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। আহান আটকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু গরম চোখের তোপে পড়ে আর সেই সাহস হলো না।
ফোন কানে লাগিয়ে নাছির সাহেব সালাম করলেন,”আসসালামু ওয়ালাইকুম, কে বলছেন?
অপাশ থেকে তৎপর গলা ভেসে এলো এক লোকের,”ওয়ালাইকুমুস সালাম, মিস নুসরাত নাছিরের বাবার সাথে কথা বলছি?
“জ্বি হ্যাঁ, বলুন কীভাবে সাহায্য করতে পারি!
অপাশের লোকটা দুঃখ প্রকাশ করল। সাহায্যের কথা উড়িয়ে দিয়ে বলল,”আমি নুসরাত নাছির এর ক্লাইন্ট, খবরটা আমি পেয়েছি। আপনাদের এই দুঃখের সময়ে আমি উপস্থিত হতে পারেনি, তাই খুব দুঃখিত! জানি খুব কষ্টের সময় পাড় করছেন, কিন্তু তাড়াতাড়ি এই শোক যাতে কাটিয়ে উঠতে পারেন সেই দোয়া থাকবে।। আজ তাহলে রাখি।
নাছির সাহেব হতবম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। লোকটা কীসের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছে তার কোনো কারণই খুঁজে পেলেন না। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দাঁড়ানো একবার আহান আর নাজমিন বেগমকে দেখলেন। মোবাইল কেড়ে নিয়ে এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলাতেই কিছু একটা খটকা লাগল, তাই ফোন রেখে দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন আহানকে,”কী হয়েছে আহান, খুলে বল!
নাজমিন বেগম আতঙ্কিত চোখে তাকালেন আহানের দিকে। আহান তখনো নিশ্চুপ।
“আহান, কী হয়েছে বলবি তুই!
আহান একবার তাকাল মেঝ মায়ের দিকে। ভদ্রমহিলা শঙ্কা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ঠোঁট টিপল সে। চোখের তারায় জল ছলছল করে ওঠল। নাজমিন বেগমের প্রশ্নাত্মক চাহনি এড়িয়ে গিয়ে হাত চেপে ধরল সে। অতঃপর অনাকাঙ্ক্ষিত সেই খবরটা দিল,”ছোট আপু আর নেই আমাদের মাঝে মেঝ মা, মেঝ বাবা।
নাছির সাহেব বিশ্বাস করতেই পারলেন না। আহানের কথা উড়িয়ে দিলেন বাতাসে। তার হাত থেকে রিমোট টেনে নিয়ে টিভিটা অন করলেন। নাজমিন বেগম তখনো মনে মৃদু আশা নিয়ে দাঁড়িয়ে। টিভিতে সেই সময় সাংবাদিক বলে ওঠলেন,”অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো হচ্ছে যে বোম ব্লাস্টে বিজনেস ওয়াল্ডের সফল ব্যবসায়ী সৈয়দা নুসরাত নাছিরের মৃত্যু হয়েছে। তার ডেডবডি মাত্রই সিটি সিলেট হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এরপরই স্ক্রীনে ভেসে উঠল নুসরাতের হাসিমাখা চেহারাটা। নাছির সাহেব স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না ধপ করে বসে পড়লেন সোফার উপর। আর নাজমিন বেগম? তিনি খবরটা দেখার পর চৈতন্য হারিয়ে ডলে পড়েছেন আহানের গায়ের উপর।
পৃথিবীর এক কোণে মরে যাওয়া নুসরাত নাছিরের জন্য পৃথিবী থমকে থাকল না। বিকেল তিনটার আশপাশ স্পর্শ করতেই সবকিছু ঠান্ডা হয়ে গেল। এতক্ষণের হুলোস্থল হৈ, হুল্লোড় থেমে গিয়েছে। আকাশ হয়তো আজ খুব অভিমান করেছে তাই থেকে থেকে কাঁদছে। সকাল থেকে সূর্যের দেখা মিলছে না। শীতের দিনে এমন আষাঢ়িয়া মেঘের কারণ কী ভাবা মুশকিল! অনেকে বলল, সকাল থেকে এই মেঘলা পরিবেশ দেখেই ধারণা করেছে খারাপ কিছু একটা হবে। আর দেখো এখন খারাপ কিছু হয়ে গেছে।
হসপিটালের ভেতর এখনো পর্যন্ত যতজন রোগী নিয়ে আসা হয়েছে তাদের কারোর শরীর অবশিষ্ট নেই। কারোর হাত আছে পা নেই, কারোর মাথা নেই শরীর আছে, কারোর তো শুধু মাংশখন্ড পাওয়া গেছে। তা দেখে কিছু কিছু নতুন হওয়া নারী ডাক্তার বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
বিকেল তিনটে ঘড়ির কাটায় বাজলেও ধরণীর বুকে যেন সন্ধ্যার শেষ প্রহর নেমে এসেছে। কিছু সময়ের জন্য বৃষ্টি থেমে গিয়ে ধুম করে আবারো বারিধারা নিয়ে তারা পতিত হয়েছে। সেই বৃষ্টিতে ভেজা শরীর নিয়ে সৈয়দ বাড়ির অধিকাংশ মানুষ এসে হাজির হয়েছে হসপিটালের অভিমুখে। সকলের চেহারা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। চোখে মুখ বিমর্ষ! অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় সকলের আত্মার পানি শুকিয়ে গিয়েছে৷
মেহেরুন নেছার মৃত্যুর পর হসপিটালের করিডোরে পা পড়েছে ইসরাতের এই দ্বিতীয় বারের মতো। ফিনাইলের গন্ধ নাকে এসে ঠেকছে। চারদিক থেকে ভেসে আসছে মানুষের কান্না আর হাহাকারের শব্দ। করিডোর দিয়ে যেতে যেতে শত মানুষের হাহাকার ভরা আর্তনাদ কানে আসলো ইসরাতের। চোখ দুটো ভরে উঠল। হাতের তালুতে মুছে নিল। নির্জীব, নিস্পৃহ বদনে এগিয়ে গেল রিসেপশনের দিকে। একজন সাদা কাপড় পরিহিত ভদ্রমহিলার কাছে জানতে চাইল নুসরাতের কথা। ভদ্রমহিলা বললেন,”লাশের নাম কী?
কান্নায় ভেঙে পড়া ইসরাত এক মুহুর্তের জন্য থমকাল। একটু পূর্বে জীবিত থাকা মেয়েটা এখন লাশ হয়ে গেছে। যে গম্ভীর গলায় পুলিশ স্টেশনে বসে ধমকে এসেছিল আহানের নব স্ত্রীকে। পৃথিবীর কাছে সে মৃত লাশ। তার কোনো অস্তিত্ব নেই এই পৃথিবীতে। যার শেষ সময়ে কেউ তার পাশে ছিল না। কেউ তার হাত চেপে ধরেনি, কেউ ভরসা যোগায়নি! নুসরাতদের কেন পৃথিবীতে এত দুঃখ পেতে হয়? তারা কখনো কেন অন্যদের মতো সুখী হতে পারে না! তারা মনের ভেতর একরাশ অভিমান জমিয়ে রেখে পাড়ি জমায়, শেষ সময়ে সেই অভিমান ও প্রকাশ করতে পারে না। এভাবেই অভিমান মনে চাপা রেখে হাজারো নুসরাত নাছির হারিয়ে যায়।
কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ইসরাত প্রবেশ করতেই গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। পুরো শরীর পুড়ে গিয়ে মাংস খসে খসে পড়েছে দেহ হতে৷ চেহারা বোঝার যো নেই। পুড়ে যাওয়া শীর্ণ হাতের মধ্যে সেলিন ব্রান্ডের ব্রেসলেট জ্বলজ্বল করছে। কাপড় শরীরের চামড়ার সাথে লেগে গিয়েছে। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় কতটা কষ্ট হয়েছে মানবীর তা ভাবতে গিয়ে ইসরাতের শরীর কাটা দিল। দু-হাতের আজলায় টেনে নিল শীর্ণ দেহটা। গায়ে জড়িয়ে নিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। মনে হলো গলার ভেতর হাজারটা কাটা কেউ বেঁধে দিয়েছে। কন্ঠস্বরটা গলায় আটকে যায় কথা বলতে গিয়ে। বিমর্ষ গলায় চিৎকার করে ওঠল,”এইই এইই শুনতে পাচ্ছিস, বোন আমার! শোন, শোন, তাকা! এই তাকা আমার দিকে! কী হয়েছে তোর, চোখ খোল! এমন শুয়ে থাকিস না! দেখ! দেখ, এদিকে তাকা, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, চোখ খোল, সোনা। হাস, একটু হাস!
ইসরাতের চিৎকারে কেঁপে উঠল পুরো কেবিনটা। ইসরাত বুঝতে চাইল না, নুসরাত আর নেই। গা ধরে ঝাঁকাল, ডাকল অবিরত।
বাহিরে এসে মাত্র দাঁড়ানো মৃন্ময় ভয়ে হকচকিয়ে উঠেছিল ইসরাতের আর্তনাদে। এর মধ্যে দেখতে পেল আরেকটা পাগল হুরমুরিয়ে ঢুকছে কেবিনের ভেতরে। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে পাগলটার। মানুষ বলে পুরুষ মানুষ কাঁদে না, কে বলেছে পুরুষ কাঁদে না! এই তো সৈয়দ বাড়ির বাউন্ডুলে, হাজারটা প্রেম করা ছেলেটা কাঁদছে। হাউমাউ করে কাঁদছে! চিৎকার করে শরীর ধরে ঝাঁকাচ্ছে মেয়েটার।
“এইই বেইমান, তুই বলেছিলি না আমাদের ফাঁকি দিবি না কখনো! কখনো আমাদের একা করে পালিয়ে যাবি না! তাহলে একা করে কোন সাহসে গেলি! চোখ খোল, কোন সাহসে তুই আমাদের ছেড়ে গিয়েছিস! তোকে এই অধিকার কে দিয়েছে! চোখ খোল নুসরাত, তাকা একবার আমার দিকে। অভিমান করেছিস আমার সাথে, অভিমান করিস না…
ইরহামের গলার কাছে কথা পাঁকাল। পুড়া আটাল মুখটায় একাধিক চুমু খেল। মুখটায় দু-হাতের আজলায় ভরে নিয়ে নতুন উদ্যোমে ঝাঁকাল,”বোন আমার চোখ খোল, অভিমান করে এভাবে ছেড়ে চলে গেলি তুই! এই অসভ্য, বেয়াদব, চোখ খোল!
ইসরাতের বুকের পাশটা শূণ্য, ফাঁপা। ইরহামের মতো গায়ে জড়িয়ে অসংখ্যা চুমু খেল সে ও। নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা মানবীকে ডাকল,”বোন আমার, এই এইইই… দেখ বুকটা জ্বালা করছে, চোখ খোল! তুই না আমার বোন, এত অভিমান করেছিস কেন! অভিমানী করেছিস বলে চলে যাবি।
ইসরাতের ডাকে, ইরহামের চিৎকারে নিস্তেজ নুসরাত সোজা হলো না, হেসে উঠল না। প্রাংক করছি বলে ঠাট্টা করল না৷ টেনে নিল না ভাই বোনকে বুকের কাছে। পড়ে রইল সাদা কাপড়ে মুরিয়ে বেডের মধ্যে। একজায়গায় একদম নিস্তব্ধ! উঠে বসে অভিযোগ করল না আর! নুসরাতদের পৃথিবীর প্রতি কোনো অভিযোগ থাকে না। কারোর প্রতি কোনো অভিযোগ থাকে না, তারা হাজারো অভিমান অভিযোগ মনের ভেতর চেপে দুনিয়া ছেড়ে যায়।
কেবিনে বাহিরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চোখ মুছলেন শোহেব সাহেব৷ সোহেদ সাহেব মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তত তাড়াতাড়ি জানাজা পড়াতে হবে। নাহলে এতে লাশের কষ্ট বাড়ে। নিজের শেষ ঠিকানায় যত তাড়াতাড়ি পারা যায় তত তাড়াতাড়ি রেখে আসা উচিত৷ চোখদুটো লাল হয়ে আছে। ফর্মালিটি পূরণ শেষ করতে করতে চোখের পানি একাধিক বার মুছেছেন তিনি। ঝর্ণা বেগম আর রুহিনী বেগমকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে। আমিরা আর সৌরভি কী করছে, কতটুকু ওইদিক সামলাতে পারছে কে জানে! মেঝ ভাইয়ের অবস্থা-ই বা কী! জানেন না কিছুই! খবর পাওয়া মাত্র তারা ছুটে এসেছেন হসপিটালে।
সোহেদ সাহেব রেসিপশনিস্ট এর কাছে জানতে চাইলেন,”মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব কখন?
এক ছেলে বলল,
”লাশ রাতের মধ্যেই নিয়ে যেতে পারবেন। আপনারা আইডেন্টিটি ভালো করে চেক করতে চাইলে লাশের..
কথা শেষ হতে পারল না, মুখের মধ্যে একাধিক পড়ল ঘুষি। একের পর এক, লাগাতার। কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে আহান হামলে পড়ল ছেলেটার ওপর। হিংস্র প্রাণির মতো হিসহিস করে ওঠে শুধাল,’”লাশ কে? লাশ কে? কাকে লাশ বলছিস তুই? লাশ কী? হ্যাঁ? লাশ বলবি না!
চোখ দুটো উত্তপ্ত আগুনের মতো। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠছে ক্ষণে ক্ষণে। শক্ত চোয়াল করে একাধিক ঘুষি বসাল। ছেলেটার নাক দিয়ে রক্ত বেরোল, তবুও আহান ছাড়ল না, পাগলের মতো শুধু জিজ্ঞেস করল,”লাশ কে, লাশ কে! লাশ বলবি না! আপু বেঁচে আছে! বেঁচে আছে—”
আহানের সেই কথা কী সত্য হলো? না.. নুসরাত নাছির আর বেঁচে নেই, এই কঠিন সত্য না চাইতে মেনে নিতে হবে তাদের৷ সোহেদ সাহেব সম্ভিত ফিরে পেতেই ছেলের কাঁধ ধরে টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু বয়স্ক লোকটা মাত্র তাগড়া হওয়া ছেলের শক্তির সাথে পেরে উঠলেন না। ডাক্তাররা ছুটে এসে টেনে হিঁচড়ে আহানের হাত থেকে ছেলেটাকে বাঁচাল৷ তবুও হিংস্রাত্মক চোখ মুখে চেয়ে রইল সে, পারলেই ঝাপিয়ে পড়বে। এতটাই এগ্রোসিভ আর উত্তেজিত হয়ে উঠল যে শেষে ইনজেকশন পুশ করে বেডরেস্টে রাখা হলো তাকে।
ইসরাতের হাজারো ডাকে সারা দিল না নুসরাত। উঠে বসল না গম্ভীর। বলল না,”রঙলীলা করছিস দুটো? চপ্, প্যানপ্যান করে মরে যাচ্ছে! আমি কী মরেছি, এত হেঁদিয়ে মরছিস কেন? ন্যাককা মেয়ে মানুষ…
নির্লিপ্ত নুসরাত বেডে শুয়ে থাকে অভাবেই। নরম শুভ্র, রক্তাভ পা দুটো রক্তের ছাপ, রক্ত শুকিয়ে বসে গিয়েছে। নাকের নোজ রিংটা সবসময়ের মতো জ্বলজ্বল করে জানান দিচ্ছে না। কেমন কালো রঙ ধারণ করেছে। মুখ চৌচির হয়ে আছে, লাবণ্যতা নেই। নেই কষ্টের ছাপ। ইসরাত তাকিয়ে রইল মুখটার দিকে নির্মিশেষ। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোটা দু ফোটা পানি৷ খুব করে বলতে ইচ্ছে হলো,
‘বা-রে স্বার্থপরের মতো সবকিছু থেকে মুক্তি নিয়ে নিলি তুই? কই আমার তো একটা শেষ আবদার রাখলি না? আরো চাপিয়ে দিয়ে গেলি দু-জন মানুষের ভর। সেই মানুষ দুটোকে আমি সামলাব কীভাবে? আগে শিখিয়ে দিয়ে যেতি কীভাবে ওদের সামলাব, তারপর না হয় পাড়ি জমাতি! লজ্জা করল না, একা আমাকে এভাবে মাঝ সমূদ্রে ফেলে যেতে— ছি্হ.. নুসরাত নাছির তোমার বড়ই লজ্জা কম! নির্লজ্জ তুমি… আমার কী কম কষ্ট! কই আমি তো মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করিনি! কিন্তু তুমি তা করেছ! আমার ঘাড়ে গুরু দায়িত্ব ঝুলিয়ে দিয়ে তুমি পৃথিবী থেকে পালিয়ে গেলে। কেন এটা করলে তুমি! তোমার কী একবারো আমার কথা মনে হয়নি! দুটো মানুষের কথা মনে হয়নি! তারা তোমাকে হারিয়ে কীভাবে বাঁচবে সেটা বুঝলে না, একটুক্ষণের জন্য উপলব্ধি করলে না! নুসরাত নাছির… স্বার্থপর! ভীষণ স্বার্থপর তুমি! কাউকে যাওয়ার আগে একবারো বলে যাওনি, আর এই পৃথিবী-ই কিনা তোমাকে তোমার শেষ ঠিকানায় পাঠানো নিয়ে হাজারো আয়োজন করছে। কই নুসরাত নাছির, তুমি দেখছ না আমি কাঁদছি! তোমার বোন কাঁদছে! তুমি শুনতে পেলে না, জানতে পারলে না, তোমার চলে যাওয়ায় কারোর কিছু না এসে গেলে ইসরাত নাছির এর অনেক কিছু এসে গিয়েছে৷ বয়স্ক লোক সৈয়দ নাছির উদ্দিনের এসে যায়, বয়স্ক মহিলা যে তোমার দশমাস দশদিন পেটে ধরে জন্ম দিয়েছিল, মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও হাজারো মানুষের বিরুদ্ধে লড়ে গিয়েছিল, সেই মানুষটার এসে যায়৷ তাদের কথা একবার মনে করলে না। শোনো নুসরাত নাছির, তুমি স্বার্থপরের মতো পৃথিবীকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেও তোমার প্রতি আমার অভিমান অনেক৷ অনেক… তোমাকে আমি কখনো ক্ষমা করব, হাশরের ময়দানে তার জবাবদিহিতা করতে হবে, কেন আমার উপর গুরু দায়িত্বগুলো চাপিয়ে চলে গেলে? তুমি ও বেইমান, মেহেরুন নেছার মতো তুমিও বেইমানি করলে —”
ইসরাতের সেই ভেতরের কথা নুসরাত শুনল কী! না শুনল না, মৃত মানুষ সেসব শোনে না। তাদের মস্তিষ্ক হৃদয়ের সকল চলাচল থেমে যায়, সাত মিনিট পাড় হওয়ার মধ্যেই। ইসরাত নাছিরের হাজারো অভিযোগ শোনার জন্য নুসরাত নাছির বেঁচে রইল না। ইসরাত নাছির ও জানতে পারল না, মরার পূর্বে নুসরাত নাছির ও তাদের কথা ভেবেছে। তাদেরকে শেষ বারের মতো দেখার জন্য তার মন কাননে ইচ্ছারা উকি দিয়েছে, সেই ইচ্ছে তার পূরণ হয়নি, অচিরেই হারিয়ে যেতে হয়েছে।
ক্যালেন্ডারের পাতায় আট ডিসেম্বর। রাতের অন্তিম প্রহর। তুষারপাত হচ্ছে অবিরাম। নিস্তব্ধ সেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তিন তলার একটা বিল্ডিং এর দো-তলার রুম থেকে ভেসে আসছে এক মানবের চিৎকার। সেই চিৎকারে বিল্ডিং প্রতিটা দেয়াল কাঁপছে। বারংবার ফ্লাইট বুক করার কথা বলে গর্জাচ্ছে সে। অতঃপর হুমকি দিল, যদি আগামীকালের ভেতর তাকে যাওয়ার ব্যবস্থা না করে দেওয়া হয়, তাহলে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে নিজের জীবন নিজে নিয়ে নিবে। সেই কথা হয়তো কাজ করল, তাই কয়েক লাখ টাকা খরচ করে, নয় ডিসেম্বর দুপুরের ফ্লাইট বুকড করে দেওয়া হলো।
পাঁচটা ঊনষাট মিনিট। মাগরিবের আজান দিয়েছে বহুপূর্বে। ইসরাত গতকাল থেকেই বসে আছে নুসরাতকে যে কেবিনে রাখা হয়েছিল, সেখানে। এখনো পর্যন্ত তাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়নি। পুলিশের ঝামেলা এসে ঠেকেছে ঘাড়ে। তাই লাশ যাতে পচে না যায়, সেজন্য ফ্রিজে রাখা হয়েছে।
বাড়ির কী অবস্থা সেই বিষয়ে অজ্ঞ সে! শুধু শোনেছে নাছির সাহেব নাকি কারোর সাথে কথা বলছেন না। মানুষ অতি শোকে পাথর হয়ে যায়, তেমনি হয়ে গেছেন। আহান আর নাজমিন বেগম এর একই অবস্থা। দু-জনেই হুঁশ ফিরলেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। তাই ইনজেকশন পুশ করে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। ঘন্টাখানেক পরপর মৃন্ময়ের দেখা পাওয়া যাচ্ছে৷ এই সেই বলে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু ইসরাতের সেই সান্ত্বনার প্রয়োজন নেই। সে নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছে, নুসরাত চলে গিয়েছে, ফিরে আসবে না সে! তবুও কেন যেন পড়ে রয়েছে নুসরাতের তখনকার বেড আকড়ে ধরে কে জানে!
দশ ডিসেম্বর রাতে আলৌকিক একটা ঘটনা ঘটল। তখন রাতের প্রথম প্রহর। তুফান শুরু হয়েছে। ইসরাত বৃষ্টিকে ভীষণ ভয় পায়। যখনই বৃষ্টি হয় তখনই এক একটা অঘটন ঘটে। সেই বৃষ্টির দিনে ও মেহেরুন নেছা হারিয়ে গেলেন, আর আবার একই বৃষ্টির দিনে নুসরাত ও হারিয়ে গেল। সেই বৃষ্টির রাতে ভেজা শরীর নিয়ে, হুরমুর করে হসপিটালে এক পাগল লোক ঢোকল। উদভ্রান্ত তার দৃষ্টি। চোখ দুটো ঘোলাটে। উষ্কখুষ্ক চুল দেখে কেউই বুঝে পাবে না লোকটা কোনো ভালো ঘরের সন্তান।
প্রাইভেট হসপিটাল হওয়ায় সেখানে রোগীর আত্মীয় ছাড়া কাউকে ইনফোরমেশন দেওয়া হয় না। আরশ যখন জানতে চাইল কেবিন নাম্বার কত, তখন তাকে জানানো হলো না। সেই নিয়ে হুলোস্থূল কান্ড ঘটালো সে।
এক সময় দেখা মিলল ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ইসরাতের, যে ঘাড় বাঁকা করে হেঁটে আসছে এইদিকে। আরশকে দেখে মোটেও যেন অবাক হলো না। নিস্তেজ গলায় জানিয়ে দিল নুসরাতকে কোন রুমে রাখা হয়েছে। লোকটা ছুটল, পাগলের মতো ছুটে গেল দিকনির্দেশনার দিকে, কিন্তু তাতে ভ্রুক্ষেপহীন ইসরাত! কই ,বেঁচে ছিল যখন তখন তো এমন করে ছুটে আসলো না, এখন মরার পর আসছে সবাই।
চোখ গেল হসপিটালের ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের দিকে সেখানে দাঁড়িয়ে হেলাল সাহেবের পরিবার। ইসরাত দেখেও যেন দেখল না, অশরীরীর মতো হেঁটে চলে গেল অন্যদিকে। গায়ের ওড়নার একপাশ গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে।
আরশ যখন ধীর পায়ে বরফ শীতল রুমটায় প্রবেশ করল তখন বুকটা ধ্বক করে উঠলো। ওই তো সাদা বিছানায় নুসরাত শুয়ে আছে। আরশকে দেখে উঠে বসছে না। গায়ে জড়ানো সাদা রঙের একটা কাপড়। গ্লাস ঠেলে ধীর পায়ে প্রবেশ করতেই গা কাটা দিয়ে উঠল মানবের। নুসরাত তখনো শুয়ে, চোখ বন্ধ করে নিজ আত্মমগ্নতায় বিভোর হয়ে। ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে আরশ সহজ গলায় মেয়েটাকে বলল,”মি আমোর, এসেছি আমি, চোখ খোল, চোখ খুলে তাকা একবার!
নুসরাত তাকাল না, চোখ বন্ধ করে পড়ে রইল। নিস্তেজ দেহে। আরশ এগিয়ে গিয়ে দু-হাতে আগলে ধরল রমনীর জীর্ণ শরীরটা। নড়াচড়া খেতেই পুড়া শরীর থেকে একদলা মাংশ খসে পড়ল। আরশ আঁতকে উঠল তাতে, বাচ্চাদের মতো করে জানতে চাইল,”ব্যথা পেয়েছিস? খুব ব্যথা পেয়েছিস নুসরাত? সত্যি তোকে আমি ব্যথা দিতে চাইনি!
আরশের কথার প্রতিত্তোর আসলো না। ঝলসে যাওয়া চেহারাটার দিকে তাকিয়ে নীরব কয়েকপল কাটল। আরশ ঢোক গিলল। গলার কাছে কথাগুলো দলা পাঁকিয়ে যাচ্ছে, হৃদপিঞ্জরে ধামাধামা শব্দ হচ্ছে। কিছু একটা বলতে গিয়ে বারবার আটকে যাচ্ছে সে। কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছে না। তাই আরশ তাকিয়ে রইল মানবীর দিকে নির্মিশেষ। কখনো তাকানো হয়নি এভাবে। ভালো করে তাকাতে পারত না কখনো সে নুসরাতের দিকে, মেয়েলি অহংঃ আবৃত মুখটার দিকে পাঁচ সেকেন্ডের বেশি কখনো তাকিয়েছে বলে তার মনে পড়ে না!। যদি কোনো অঘটন ঘটে যায় সেই ভেবে, কিন্তু সেই অঘটন তবুও ঘটল তার মধ্যে। পুরুষালি প্রেমিক সত্তাটা তৎপর হলো মেয়েটার জন্য। আরশ নিজেকে যতই বলুক সে মেয়েটাকে ঘৃণা করে, কিন্তু তার হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দন জানে সে তাকে কতটা ভালোবাসে, কতটা নিজের করে চায়। কখনো বলতে পারেনি! সৈয়দ বংশে জন্ম নেওয়ায় জেদ এতটা প্রখর ছিল যে কখনো মাথা ঝোঁকানোর কথা মস্তিষ্কে আসেনি। সে যদি সেই বছর নুসরাতের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলত, তাহলে আজ এইদিন আসত না! তার হৃদয়ের গভীরে ঘাপটি মেরে থাকা মেয়েটাকে এভাবে অচিরে হারাতে হতো না। মানব নিজেকে দোষ দিল, মেয়েটার এমন হওয়ার জন্য সে দায়ী। অশ্রুরুদ্ধ স্বরে প্রেয়সীর কাছে সহসা স্বাগোতক্তি করল,” সব আমার জন্য হয়েছে, সব দোষ আমার। আমাকে ক্ষমা করবি না কখনো, বুঝেছিস!
অতঃপর কয়েকপল কাটল নুসরাতের চেহারা অবলোকন করতে করতে। বাহিরে ধুম বৃষ্টি হচ্ছে৷ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শীতের প্রখরতায় পাতলা শার্ট পরিহিত আরশের ব্রিটিশ পুরুষদের মতো উঁচু নাকটা লাল হয়ে আছে। ঠোঁট দুটো একই সাথে রক্তাভ! আকস্মিক সেই চীর নিস্তব্ধতা ভেদ করে ভেসে এলো মানবের কঠিন, অশ্রুরুদ্ধ স্বরের সহজ ভালোবাসার স্বীকারক্তি,”আই লাভ ইউ, আই লাভ ইউ.. আই লাভ ইউ মোর দেন এনিথিং.. তুই শুনতে পাচ্ছিস তাই না,নুসরাত? কথা বল, কথা বলছিস না কেন?
মানবের কাতর স্বরের কন্ঠ থামল সেকেন্ডের জন্য, সে জানতে পারল না তার প্রেয়সী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বে এই শব্দগুলো শুনতে চাইছিল। পুরুষালি, শক্ত সামর্থ স্বরটা ভঙ্গুর, আবারো তা প্রতিধ্বনি হলো,”মাই প্রিসিসিয়াস গর্জেস লেডি.. চোখ খোলো, প্লিজ… অভিমান করে থাকে না এভাবে… হেই নুসরাত —”
আরশ দু-হাতের অঞ্জলিতে পুরে নেয় প্রেয়সীর সমগ্র বদন। ভরাট স্বরটা কান্নারা প্রায় গিলে নিয়েছে। চোখ দুটো ক্ষণে ক্ষণে লাল হয়ে আসছে। বয়স বাড়ার সাথে এলার্জি বাড়ছে তরতর করে। নাক দিয়ে সরু রক্তের দ্বারা বয়ে চলেছে৷ হাতের তালু দিয়ে বিতৃষ্ণা নিয়ে তা মুছে নিল সে। ডাকল আবারো কাতর স্বরে,”হেই, হেইই ওপেন ইউ্যের আইজ, লুক এট মি ,এই এইই নুসরাত! চোখ খোল! কথা বল! কথা বলছিস না কেন? স্পিক আপ..! …প্রাংক করবি না একদম.. আই হেইট প্রাংক’স, এসব নিয়ে মজা করে না জান,”
থেমে গিয়ে নুসরাতের নাম ধরে গর্জায় লোকটা,”নুসরাত —”
কিন্তু নুসরাত নড়ে না। আরশ প্রেয়সীর শীর্ণ হাত পুরে নেয় নিজের হাতের মুঠোয়। চিৎকার করে ডাকে প্রেয়সীর নাম ধরে, তবুও অপাশ হতে শব্দ ভেসে আসে না, নিস্তব্ধ থাকে সবকিছু। আরশ হাল ছেড়ে দেয়, মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে এসে দাঁড়ায় কাঁচের গ্লাসের সামনে। সমানে বৃষ্টি হচ্ছে, এই বৃষ্টি থামার নয়। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে নরম স্বরে আওড়ায় সে,”ইউ নো না নুসরাত, হাউ মাচ আই হেইটস ইউ! আই হেইট ইউ!”
আরশ থামে, শ্বাস নেয়, শীতিল স্বরে, নমনীয়তার সাথে ডাকে নুসরাতকে, অবিরাম ডেকে চলে মেয়েটাকে। অপরপাশ তখনো নির্লিপ্ত, কোনো উত্তর পায় না সে তার থেকে, জেদি মেয়েটার এহেন নির্লিপ্ততায় রাগ চেপে ধরে আরশকে। ক্রোধানিত কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়,”তোকে বলেছিলাম না সুখে থাকতে, সুখে থাকলি না কেন? সবাইকে এমন মাঝ সমূদ্রের ফেলে দিয়ে তুই কেন পালালি? এই কথা বল, এই বেইমান! এইইই..—”
সেকেন্ড কয়েকের জন্য থামল। নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে তখনো তার,’”আমাকে বিশ্বাস করিস না তুই? আমার অপেক্ষা করলি না কেন? আমি তো ফিরে আসতাম, আসতাম না? আসতাম, অপেক্ষা করলি না কেন! এমন না ফিরার দেশে পালালি কেন? স্পিক আপ, ড্যাম ইট!
আরশের চিৎকারে নুসরাতের কিছু এসে গেল না। স্বার্থপরের ন্যায় গা এলিয়ে শুয়ে রইল তার কোলে। আরশকে ভেঙ্গিয়ে হেসে উঠল না। বলল না,”আরশ ভাই, কাঁদছেন আপনি? কাঁদছেন, তাই না? ইস’’স..” আরশ তাকিয়ে রইল নুসরাতের দিকে। শীতকাল অপছন্দ নুসরাতের, আর সেই অপছন্দের মাসে সে পাড়ি জমিয়েছে সবাইকে ছেড়ে অপারে। গলার কাছে আবারো কিছু দলা পাঁকাচ্ছে আরশের। হৃদযন্ত্রে কথা বলার উদ্যেগ হলো ভীষণ। পুরুষালি অশ্রুসিক্ত কন্ঠস্বরটা বড় কাতর শোনাল,”তুই বারবার বলতি না, শীতকআল অপছন্দ করিস, আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। আমার শীত পছন্দ ছিল বলে,.. নুসরাত,—”
থামল সে। ঢোক গিলে নিয়ে নিজেকে শান্ত করার প্রচেষ্টা করল। বলল,” শীত আমার ভীষণ পছন্দ, আর আজ দেখ, সেই শীত আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়েছে, তোকে কেড়ে নিয়েছে আমার থেকে।
সোসাইটির মসজিদে এনাউন্সমেন্ট হচ্ছে। ধীরে ধীরে তা পরিস্কার হয়ে আসলো। ইমামের গলার স্বর ব্যথিত সামান্য,”ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি’’র রাজিউন! ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি’র রাজিউন! সৈয়দ নাছির উদ্দিনের দ্বিতীয় কন্যা সৈয়দা নুসরাত নাছির বোধবার দুপুর একটা পনেরো নাগাদ, সিলেট সিটি ইউনিমার্ট মলের সামনে ইন্তেকাল করেছেন। আজ বাদ আছর বড় মসজিদ প্রাঙ্গণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেই জানাজার নামাজে আপনাদের উপস্থিতি ও দোয়া কামনা করি। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি’’র রাজিউন…—”
আজ জানানো হয়েছে মমোকে নুসরাত আর নেই। ঢাকা থেকে সিলেটের ফ্লাইট বুকড করেছে সে। বিকাল তিনটায় এসে পৌঁছাবে সিলেটে এয়ারপোর্টে। ঘন্টাখানেক লাগবে তাহলে নাছির মঞ্জিলে আসতে। মমো কী মামা বাড়িতে ফিরে নুসরাতকে দেখতে পারবে কে জানে! ভাবতে গিয়েই কপাল ঘেমে যায়। কান্নারা গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে।
নাছির মঞ্জিলের সামনের বড় গেটটা খুলে দেওয়া হয়েছে। একদল মহিলা এসে জড়ো হয়েছে বাড়ির সামনে। হায় হায় করে দুঃখ প্রকাশ করছে। নাছির সাহেব হুইল চেয়ারে বসে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই। বয়স্ক লোকটা মেয়ে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পা দুটো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এখন সঙ্গী হয়েছে হুইলচেয়ার। গায়ে সাদা পাঞ্জাবী জড়ানো। মেয়ে হারানোর শোকে গত দু-দিনে মুখে বয়সের ছাপ বেড়েছে। হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ায় ইরহাম। শেষ গোসল দিয়ে খাটিয়ায় শোয়ানো হয়েছে নুসরাতকে। খাটিয়ার কাছে এগিয়ে এসে বসল আরশ। শেষ বারের মতো জলে গিয়ে চৌচির হওয়া চেহারাটা দেখে নিল। নরম স্বরে কানের কাছে আওড়াল,”অপারে আমার জন্য অপেক্ষা করিস, আমি খুব তাড়াতাড়ি তোর কাছে চলে আসব। আর শোন নুসরাত, তোর প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৭
অতঃপর আরশ খাটিয়ার একপাশ কাঁধে তুলে নিল। অন্যপাশ শোহেব সাহেব। নাছির সাহেব উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। নিজের অক্ষমতায় কটাক্ষ করলেন। বাবা মায়ের আগে সন্তানের মৃত্যু বাবা মা কখনো মেনে নিতে পারেন না, আর এই মেয়ে জলজ্যান্ত সেদিন বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে আর ফিরে আসলো লাশের গাড়িতে করে।
ইসরাত চুপচাপ বসে দেখল সবকিছু। উঠে গিয়ে থামানোর ইচ্ছে হলো কিন্তু থামিয়ে কী হবে? সবারই শেষ ঠিকানা তো ওই সাড়ে তিনহাত কবরটা। আহান আর নাজমিন বেগম দু-জনেই কথা বলছেন না। পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন তারা। দু-জনের একজনের দেখা মিলল না কোথাও! গেট দিয়ে খাটিয়া নিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখা গেল জায়িন, আরশ, শোহেব সাহেব, আর সোহেদ সাহেবকে। ক্ষণে ক্ষণে চোখের পানি মুছছেন পাঞ্জাবীর হাতায় সবাই। তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে চললেন নাছির সাহেব আর ইরহাম। পেছনে শুধু পড়ে রইল ইসরাতের শূণ্য দৃষ্টি, আর খালি বাড়িটার হাহাকার!

এটা কি হলো আপু তুমি এমন করবে কখনো ভাবিনি তুমি এরকম না করলেও পারতে 😔💔
আপু তাড়া তাড়ি করে পরের পার্ট টা দাও 😭😩😩😩
Sob lekhok-lekhika abar amader kada nor jonno e asche 😭😢
আর কোনদিন দিবেন ভাই অপেক্ষা করতে করতে জীবন শেষ