প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬১
জান্নাত নুসরাত
শুক্রবার সকাল। আজকে অনিকা আর আরশের বিয়ের দিন৷ সকাল থেকেই উৎফুল্লভাবে তোড়জোড় করছেন বাড়ির সবাই। অনিকা আর তাদের পরিবার এসেছে এগারোটার দিকে। হাসি হাসি মুখ সবার৷ ঘরোয়া অনুষ্ঠান করে বিয়ের আয়োজন করা হলেও সাদা গোলাপ দিয়ে সাজানো হয়েছে পুরো বাড়িটা। ও বাড়ি থেকে ছুটে আসছে ইরহাম, সৌরভি। কখনো এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ছুটে যাচ্ছে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, ছুটাছুটি করে শরীর গরম করে ফেলেছে। রুহিনী বেগম অনিকাকে দেখেই ভ্রু নাচালেন। কিচেনের দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলেন,”অনুভূতি কী?
মেয়েটা চোখের পাতা ফেলে সৌজন্য রক্ষার্থে হাসল। কী অনুভূতি উত্তর দিতে পারল না। তার খুশিতে কান্না চলে আসছে! এটা বললে সবাই হাসবে তাকে নিয়ে! রুহিনী বেগম কিচেনে চলে গেলেন। ড্রয়িং রুমে বসা অনিকার সাথে সৈয়দ বাড়ির যে কারোর চোখাচোখি হলে মিষ্টি হাসি বিনিময় করছে। কেউ আর আজ তাকে দেখে মুখের ভাবগতি বদলাচ্ছে না। নাক চূড়ায় তুলছে না। মেয়েটার ভালো লাগছে! রুমি খান নিজেও হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন। বাড়ির বউয়েরা আজ মানা করল না, উনাকে ও গছিয়ে দিল কাজ। জাদুঘর থেকে কাচের বাটি প্লেট বের করার দায়িত্ব পড়ল রুমি খানের ঘাড়ে। ভদ্রমহিলা কথা বলছেন, তার সাথে হাসি মুখে কথা বলছেন রুহিনী বেগম৷ আফসোস নিয়ে বললেন,”ইস,স আমার একটা মেয়ে যদি থাকত, তাহলে মাহাদির সাথে বিয়ে দিয়ে দিতাম।
রুমি খানের চলন্ত হাত থামল সেকেন্ড কয়েকের জন্য। রুহিনী আড়চোখে তা দেখলেন, মনে করলেন ভদ্রমহিলা তার কথায় অসন্তুষ্ট হয়েছেন, কিন্ত তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে তিনি বললেন,”মমো আছে তো, ওর সাথে দেখুন পারেন কিনা!
রুহিনী ভ্রু উচিয়ে হেসে ফেললেন। বললেন,”শ্বাশুড়ী রাজী যখন, তাহলে পাত্রী রাজী করতে খুব একটা কষ্ট করতে হবে না।
“মমো মনে হয় রাজী হবে না, এর আগেও আমরা সম্বন্ধ দিয়েছিলাম ভাইয়ের কাছে। ও রাজী হয়নি।
রুহিনী বেগম নিজের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন, বললেন,”আমার উপর ছেড়ে দিন ভাবী, এক চুটকিতে রাজী করিয়ে দিব। এমন ব্ল্যাকমেইল করা দিব, ও কী, ওর মরা দাদা রাজী হয়ে যাবে।
ঝর্ণা বেগম পেছন থেকে উদয় হলেন হঠাৎ করেই। কাঁধ জড়িয়ে ধরলেন জা এর। জিজ্ঞেস করলেন,”কী করবি তুই, ছোট? কান্না করবি?
রুহিনী বেগম মাথা দোলালেন। বললেন,”প্রয়োজন হলে কান্না করব৷ মাটিতে গড়াগড়ি খাব। বড় ভাইয়ার মতো আত্মহত্যা করার হুমকি দিব। ওদের থেকে বেশি জেদ যে আমার তা বুঝিয়ে দিব। মানতেই হবে ওকে! এতো সুন্দর ছেলে পাবে কোথায়? ঘরে বসে বসে এখন একটা ছেলে পেয়ে যাওয়া কী ফেলনা?
রুহিনী বেগমের কথায় ঝর্ণা বেগম হেসে ফেললেন৷ কাজ করতে করতে এই সেই নিয়ে আলোচনা করলেন নিজেদের ভেতর। তাদের আলোচনা সভার ব্যাঘাত ঘটাতে শোহেব সাহেব হাঁক ছুঁড়লেন,”ঝর্ণা, এইই ঝর্ণা, আমার কাপড় কই রাখছো?
ঝর্ণা বেগম নিচ থেকেই উত্তর দিলেন,”এসে বের করে দিচ্ছি। অপেক্ষা করুন!
তবুও শোহেব সাহেবের হাঁক ছোঁড়া বন্ধ হলো না, একবার ডাকলেন এইই ঝর্ণা, একবার ইরহামের মা, আহানের মা এসব বলে বলে ডেকেই চললেন, স্বামীর রেডিও অফ হতে না দেখে মাথার ওড়না সামলে ভদ্রমহিলা ছুটলেন উপরে। রুহিনী বেগম পেছন থেকে খিল্লি উড়ালেন,”যাও, যাও আপা৷ এই বয়সে ভাইয়া প্রেম করার জন্য তোমাকে এভাবে ডাকতেছে।
ঝর্ণা বেগম সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে উঠতে ধমকালেন,”চুপ, একদম চুপ! সবাইকে নিয়ে মজা উড়ানো স্বভাব হয়ে গিয়েছে তোর তাই না?
সেই কথার উত্তর আর শোনা হলো না, ছুটতে হলো দিশেহারা হয়ে রুমে। শোহেব সাহেব একাই চেচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেললেন।
আরশকে বুধবারে বলা হয়েছিল পাত্রীর সাথে একান্তে একবার দেখা করে আসার জন্য, কিন্তু সে যায়নি। শুক্রবার সকাল থেকেই লাগাতার বাড়ির পুরুষেরা বললেন দেখা করার জন্য তবুও আরশ গেল না। হেলাল সাহেব জিভ আর দাঁত দিয়ে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করলেন। বললেন,”ভীষণ আফসোস করবে আরশ, ভীষণ আফসোস করবে।
আরশ আফসোস করবে কী নিয়ে সেটাই ভেবে পেল না। এই বিয়ে নিয়েই তো আফসোস করছে সে, তার জীবনে কী আফসোস করার অভাব আছে? তাই বাবার কথা আমলে নিল না, নির্লিপ্ত মুখ নিয়ে গোসলে ঢুকল। জায়িন নক করল দরজায়। ভেতর থেকে আরশের গলার স্বর ভেসে এলো,”কী চাই?
জায়িন হেলাল সাহবের মতো করে বলল,”এখনো সময় আছে আরশ, একবার নববধুর সাথে দেখা করে আয়। কিছু বলার থাকলে বলে দে ও’কে!
আরশ চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে মানা করে দিল। গোসলে থাকতে থাকতে কয়েকবার দরজায় টোকা পড়ে গেল। একবার লিপি বেগম, একবার শোহেব সাহবে, একবার ঝর্ণা বেগম, একবার রুহিনী এসে বললেন নববধূর সাথে দেখা করে আসতে। আরশ ভেবে পেল না নিয়ম করে এমন নববধূর সাথে দেখা করে আসার কথা কেন বলা হচ্ছে! তার সেই মনের ভেতর দলা পাঁকানো প্রশ্নগুলো মনেই দলা পাঁকিয়ে রইল। গোসল শেষে বের হয়ে সাদা পাঞ্জাবি গায়ে চড়াল। আতর শরীরে লাগিয়ে নিয়ে, মাথায় টুপি পরে বের হলো রুম থেকে। গা হতে বের হওয়া আতরের গন্ধে মো মো করে উঠল চারপাশ। সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসতে আসতে দেখল সবাই এসে সোফার উপর বসে গেছেন। আরশ এগিয়ে গেল। লিপি বেগম বললেন,”দোয়া নিয়ে নাও আরশ, নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছো তুমি।
আরশ মানা করে দিতে চাইল, লিপি বেগমের অসহায় দৃষ্টির তোপে পড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে দোয়া নিল সবার কাছ থেকে। সবার একটাই দোয়া, সুখী ও সুন্দর দাম্পত্যের সে যেন পায়। লিপি বেগম কপালে চুমে একে দিলেন। রুহিনী বেগম কাঁধ চাপড়ে দিয়ে হাসলেন। বললেন,”যে ঝড় নিয়ে আসতে যাচ্ছো, তাকে নিয়ে সুখী জীবন কাটাও৷
আরশ গম্ভীর মুখে দোয়া গ্রহণ করল। একে একে বের হলো বাড়ি থেকে সবাই। সৈয়দ বাড়ির সামনে নাছির সাহেব আর ইরহামকে দাঁড়ানো পাওয়া গেল। দু-জনের গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। ভদ্রলোকের হাস্যজ্বল চেহারা দেখে, লজ্জায় আরশ মাথা ঝুঁকিয়ে নিল। নাছির সাহেব বললেন,”জীবনে সুখী হও, যাকে পাওনি তাকে নিয়ে কষ্ট পেয়ো না, যাকে পাচ্ছো তাকে নিয়েই ঝঞ্জাটহীন, সুখী জীবন শুরু করো।
আরশ চোখ উপরে তুলল না। তার মস্তিষ্ক অসাড় হয়ে আসছে। যাকে চেয়েছিল খুব করে তাকে তো পায়নি, যাকে কখনো চায়নি সে আসছে তার জীবনে! কত করে খোদার কাছে চাইল বিয়েটা ভেঙে যাক, কিন্তু তার দোয়াটা কবুল হয়নি। আজ নাকি তার বিয়ের দিন! সবাই কী খুশি! নুসরাতের বাবা, তার মেঝ বাবা নাকি এই বিয়েতে তাকে খুশি হতে বলছে! লোকটা নিজের মেয়ের জামাইকে বলছে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিতে! সবাই এত পাষাণ হয়ে যাচ্ছে কেন! আরশের কষ্ট কী তাদের চোখে লাগছে না! না, লাগছে না! লাগলে কী আরশকে তার নিজের বাবা আত্মহত্যার হুমকি দিতে পারত! নুসরাতকে সামান্য মেয়ে বলতে পারত? না বলতে পারত না!
ওই পঁচিশ সালটা আরশের জন্য কুফা জাহির হবে কে জানত? যেদিন নুসরাতের সাথে তার দেখা হলো সরাসরি,সে ভেবেছিল ওটা নুসরাত! কিন্তু ওই মেয়েটা তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বলে ওঠল, সে সেই ব্যক্তি না। আরশ মেয়েটার আচরণে ওকে খোঁজতে লাগল। সে খুব করে চাইত, সে যাকে ভেবেছে, সেই মেয়েটা যেন ও হয়। আর আরশ বিশ্বাস করতে পারেনি যেদিন জানতে পেরেছে সে যাকে নুসরাত ভেবেছিল, সেই ও! ওর আচরণে ছোট বেলার নম্র ভদ্র মেয়েটার কোনো আঁচই পাওয়া যেত না৷ এ মেয়ে তো সারাদিন লাফায়, চ্যাঁচায়, গালিগালাজ করে, যার রগে রগে চঞ্চলতা। যে আরশকে দেখলে হাসে দাঁত বের করে। টিটকারি মেরে ডাকে, এইইই আরশ ভাই! ওর গলার স্বর, ওর মুখ, ওর নখ, ওর লম্বা লম্বা আঙুল, শীর্ণ হাত, হাত নাড়িয়ে কথা বলার ধরণ, ওই মেয়েটার সবকিছু আরশের ভীষণ পছন্দের। পুরো মানুষটাই আরশের ভীষণ পছন্দের। আরশ জাহির করতে পারিনি কখনো, ওই অভাল আকৃতির মেয়েলি মুখটা পুরো আদর আদর ঠেকত তার কাছে। দেখলেই ইচ্ছে হতো গাল দুটো টেনে দিতে, নাহয় দুটো চুল টেনে দিতে। আরশ খুব বেশি তাকাত না ওই মুখের দিকে। অনেক সাহিত্যিকদের বলতে শুনছে সে মেয়েদের মুখের দিকে বেশি তাকালে নাকি ভালোবাসা হয়ে যায়। আরশ তাই সরাসরি ওই মুখে তাকায়নি। দূর হতে কখনো তকালেই নুসরাত ঠেলে দিত তার চেহারা। বিরক্ত হয়ে বলত,”আরশ ভাই, এভাবে তাকাবেন না, অস্বতি হয়। নুসরাতের সেই কথা শোনে সে জেদ ধরে তাকিয়ে থাকত। আর ওই তাকিয়ে থাকায় তার মরণ হয়েছে৷ উচিত হয়নি এভাবে জেদ ধরা। এত জেদ ধরা উচিত হয়নি! আরশ মস্তিষ্ক বারবার বলেছে, কোনোদিন চায়নি নুসরাতের সাথে তার কিছু হোক, কিন্তু সে নিজের সেই চাওয়ার বাহিরে বেরিয়ে গিয়ে আবারো চেয়েছিল মেয়েটা একান্ত রুপে পুরোটা তার হোক।
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয় আরশ। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে৷ চোখ ঘোলাটে হয়ে আসছে সময়ের সাথে। পানি পিপাসা পাচ্ছে তার! পায়ে খুব একটা ভর পাচ্ছে না। তবুও পা টেনে নিয়ে চলল সামনে। কপালের কাছে ভিজা চুলোগুলো এসে লেপ্টে আছে। চোখ ঢেকে ফেলছে একগাছি দুগাছি চুল বেরিয়ে এসে। কান্না আসছে ভীষণ! হৃদযন্ত্র মুখিয়ে আছে চিৎকার করার জন্য। গলার কাছে কান্নারা দলা পাঁকিয়ে নিজেদের বিস্তার ঘটাচ্ছে। ঠোঁটগুলো কেঁপে উঠল থিরথির করে। নত রাখা মাথাটা আরো বেশি নত হলো। থুতনি লেগে গেল কন্ঠদেশের সাথে। পুরুষালি উঁচু কন্ঠদেশের উঠানামা বাড়ল। নিজেকে সামলানোর জন্য বারংবার ঢোক গিলল সে। হয়ে উঠল না। হাত দিয়ে ভর খুঁজল। আশেপাশে ভর হিসেবে কিছু পাওয়া গেল না। ডানহাত দিয়ে বামহাত শক্ত করে চেপে ধরে নিজেকে ঠিক রাখার চেষ্টা করল। তবুও কংক্রিটের রাস্তায় এক ফোটা, দু-ফোটা করে গড়িয়ে পড়ল চোখের নোনা জল। পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনাগুলো টেলিকাস্ট হলো। বৃষ্টির রাতে রেস্টুরেন্টের সামনে নুসরাতকে এভাবে ফেলে আসা ঠিক হয়নি মনে হলো! কেন সে নুসরাতকে ফেলে আসলো! একবার কেন জানতে চাইল না সে কেন এসেছে নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে? হয়তো সেদিন পূর্ব নুসরাতের হাত ধরেছিল, নুসরাত ধরেনি! হয়তো সবকিছু তার দেখার ভুল ছিল!
কেন সেদিন সে একটু সময় নিয়ে নুসরাতের সাথে আলোচনায় বসল না! কেন মিটমাট করল না! ধুম করে তালাকের সিদ্ধান্তে চলে যাওয়া একদম উচিত হয়নি! একদম উচিত হয়নি! আরশ দু-পাশে পাগলের মতো মাথা নাড়াল। নুসরাতটা তো একটু রাগী, তার উচিত ছিল মেয়েটাকে বোঝা, ওতো বুঝিয়ে বলত, কেন সে জানতে চাইল না? কেন নাদানের মতো আচরণ করল সে! ঠিক হয়নি এতটা সিনক্রিয়েট করা! কিছুই ঠিক হয়নি! ছেলেটার মনে হলো তার শ্বাস আটকে আসছে, সে মরে যাবে। আফসোস হলো, ভীষণ আফসোস হলো! বুকের কাছে মুঠি পাঁকিয়ে আলগোছে কিল বসাল। শ্বাসটা ঠিকমতো বের হচ্ছে না। নাকের ডগা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। হাতের তালু দিয়ে স্পর্শ করতেই আটাল ঠেকল। আরশ তাচ্ছিল্য করে সেদিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। মসজিদে ঢোকে আবারো ওযু করল। নাক ভালো করে পরিস্কার করতে গিয়ে বুঝল সাধারণ দিনের তুলনায় আজ বেশি রক্ত বেরোচ্ছে। ঠোঁট বাঁকিয়ে তিক্ত হাসি হাসল। রুমাল দিয়ে নাক মুছে ফেলতেই মসজিদের সামনে দেখল নুসরাত দাঁড়িয়ে আছে। পরণে সাদা রঙের সেলোয়ার কামিজ। মাথায় ওড়না টানা! কী সুন্দর লাগছিল তা শব্দের দ্বারা আরশ ব্যক্ত করতে পারবে না। রক্ত বর্ণের পা টা মসজিদের টাইলস স্পর্শ করতেই, নুসরাত তার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,”আরশ ভাইইই, আমার আরশ ভাই, আপনি বিয়ে করে ফেলছেন? আমাকে ছেড়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলছেন? আপনি তো দেখি মিথ্যুক, আরশ ভাই! মিথ্যে কথা বলেছিলেন আমায়?
আরশ ঠোঁট চেপে চোখ সরিয়ে নেয়। নুসরাত চেপে ধরে তার হাত শক্ত করে। আঙুলের গাটগুলো আস্তে আস্তে সাদা বর্ণ ধারণ করে। নুসরাত তবুও তার হাত ছাড়ে না। চোখ দুটো দিয়ে আরশকে করুনা করে। ভীষণ তাচ্ছিল্য করে শুধায়,”বিয়ে করে নিচ্ছেন? আপনি ও সেসব চিরাচারিত বাঙালি পুরুষ তাই না, যারা বউ মরার সপ্তাহ পর বিয়ে করে নেয়? আমি তো আপনাকে এমন ভাবিনি, আরশ ভাই! আপনি না আমার আরশ ভাই? হ্যাঁ, আপনি আমাকে রেখে বিয়ে করে নিতে পারেন কীভাবে? আরশ ভাই, এইইই আরশ ভাই…
আরশ তাকিয়ে থাকে ওই মুখটার দিকে। নুসরাতের মুখটা পাঁচ বছর পূর্বে দেখেছিল শেষ! এরপর পাঁচ বছরে কেমন হয়েছে ওই মুখ,আরশ জানে না। নিশ্চয়ই আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে। তার সামনে এখন সেদিনকার বৃষ্টির সময় রাগে লাল টকটকে হয়ে যাওয়া নুসরাতের মুখটা ভাসছে৷ তার চিন্তার ভেতর সাদা কামিজ শেলোয়ার পরিহিত মেয়েটা তার কলারের আস্তিন চেপে ধরল। লাল হতে দেখা গেল আঁখি যুগল,”আপনি বলেননি, আমার কাছে খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবেন, হ্যাঁ? বলেননি? তাহলে এই মিথ্যাটা কেন বললেন? মিথ্যে বললেন কেন? আপনি মিথ্যুক আরশ ভাই, আপনি মিথ্যুক! আপনি জানেন না, আমি হিংসে করি অন্য মহিলাদের আপনার পাশে? আপনি জানতেন না? এই আরশ ভাই, উত্তর দিন!
আরশ উত্তর দিতে পারল না, তার চোখ দুটো আবারো ভরে আসছে। নুসরাত থেমেছে, তাকে থামতে হয়েছে। শ্বাস আটকে আসছে তার। আবারো লম্বা শ্বাস টেনে বলল,”পুরুষ মানুষের চার বিয়ে জায়েজ তাই বলে আপনাকে দুই বিয়ে করতে হবে? আরশ ভাইইইই.. বিয়েতে মানা করে দেন!
আরশ মাথা নাড়িয়ে বলল,”আচ্ছা, মানা করে দিব। তুই বলেছিস মানা করে দিতে, তাই মানা করে দিব।
নুসরাত গালে হাত ঠেকিয়ে বিষন্ন স্বরে বলল,”না থাক মানা করবেন না। মেয়েটার বিয়ের দিন বিয়ে ভেঙে গেলে লোকে খারাপ বলবে। বিয়ে করে নিন, আরশ ভাই! আপনি বিয়ে করে নিলে আমি আর আপনার সামনে আসব না।
আরশের চোখ দুটো তড়াক করে বড় বড় হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল,”কেন আসবি না?
নুসরাত সে কথার উত্তর দেয় না, হঠাৎ করে তার গায়ের কাপড়, শরীর, মাথা, পা, হাত ছাইয়ের মতো মিলিয়ে যায়। আরশ ধরতে গিয়ে টের পায় কিছুই নেই সেখানে। মসজিদের রেলিঙ ছাড়া। কানে ভেসে আসে হুজুরের ওয়াজ। মানুষের গমগম, আর পানির শব্দ। আরশ ঢোক গিলে এগিয়ে যায় মসজিদের ভেতর। যত তার পা সামনে আগায় ততো যেন মানুষের সমাগম কমে যায়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে আল্লাহর ঘর। চোখ দুটো তুলে সেদিকে তাকিয়ে থাকে শূন্য নয়নে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ হয় না আরশের, মস্তিষ্ক, মনের দাবানলে বুকটা ভার হয়ে আসে। আল্লাহর ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে সে তৃষ্ণার্ত নজরে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ঝরঝর করে কান্নারা। মুক্তো দানার মতো তা পুরুষালি গাল বেয়ে ঝড়ে পড়ে। ধারাল থুতনিতে আটকে থাকে। দাগ থেকে যায়! আরশ ভুলে বসে সে কোথায়! শুধু তার মনে হয় বুকের ভারটা কমানো দরকার। মসজিদের ভেতর বসেছিলেন অনেকে। চুপচাপ বসে ইমাম সাহেবের ওয়াজ শুনছিলেন। ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দে মসজিদের ইমাম নিজের ওয়াজ থামিয়ে দেন। অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় পুরো সোসাইটির মানুষ ও ঘুরে তাকায় নিজেদের পেছনে৷ অনেকে স্তম্ভিত নয়নে তাকিয়ে থাকে, অনেকের চোখে সহানুভূতি। কেউ এগিয়ে আসলো না। হেলাল সাহেব আগাতে চাইলেন সামনে, আরশকে সামলানোর জন্য, জায়িন থামিয়ে দিল। বলল,”ছেড়ে দাও ওকে ওর উপর, কেঁদে নিক। এরপর আর কাঁদবে না।
আরশের কান্নার শব্দরা বাড়ল না। ধীরে ধীরে তা কমে গিয়ে গলার কাছে চেপে গেল। আল্লাহর কাছে সে নিজের অনুভূতি গুলো বলল,”আমি চাইনি ওকে আমার জীবনে, তুমি দিয়েছ! তুমি ভাগ্যে রেখেছিলে ওকে আমার। ভাগ্যের জন্য জুড়ে দিয়েছ ওর সাথে আমাকে! যদি জুড়ে দিলে তাহলে পুরোপুরি দিলে না কেন? আমার কথায় অভিযোগ প্রকাশ পাচ্ছে আমি জানি! আমি তুমি ছাড়া আর কার কাছে অভিযোগ করব, বলো? তুমি তো তোমার বান্দাদের বলেছ তোমার কাছে দু-হাত পেতে চাইতে, তুমি নাকি তাদের ফিরিয়ে দিতে লজ্জিত হও, আমি তো চাইলাম, দু-হাত মেলে তোমার রহমত চাইলাম। তোমার এক বান্দীকে আমি চাইলাম, আমার স্ত্রীকে চাইলাম, তুমি আমাকে দিলে না! আমাকে ফিরিয়ে দিলে! যাকে চাইলাম না, তাকেই দিয়ে দিলে। ওই মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। বিয়ে হলো তোমার রহমত। আমার মতো একটা ছেলের সাথে বিয়ে হলে মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। আমি জানি তুমি উত্তম পরিকল্পনাকারী! তবুও, আমি চেয়েছিলাম নুসরাত আমার হোক, এখনো চাচ্ছি নুসরাত আমার হোক। ইয়া রব, ইয়া আমার আল্লাহ, আমার সৃষ্টিকর্তা, আমি নিজের ভগ্ন হৃদয় নিয়ে হাজারবার তোমার কাছে ওকে চেয়েছি, যখন থেকে বুঝেছি ওকে ছাড়া আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না, তুমি ছাড়া আর কারোর কাছে ওকে চাইলে আমি পাব না, তখন থেকে প্রতিটা মোনাজাতে আমি তোমার কাছে ওকে চেয়েছি, ওর সুস্থতা কামনা করেছি, তবুও কেন তুমি আমাকে খালি হাতে ফিরালে? আমার কষ্ট হচ্ছে, তোমার বান্দা কষ্ট পাচ্ছে! সে তোমার কাছে আবারো আশা নিয়ে হাজির হয়েছে, আমি জানি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিবে না। আমি আবারো তোমার কাছে নুসরাত নাছিরকে চাচ্ছি, আবারো চাচ্ছি। জানি ও বেঁচে নেই, ও মৃত, এই দু-হাতে আমি ওকে মাটিতে রেখে এসেছি, তার শেষ ঠিকানায় রেখে এসেছি, তবুও আমি চাচ্ছি নুসরাত নাছিরকে।
আরশ ঠোঁট কামড়ে ধরল। গলার আওয়াজ আটকে আসছে। কানারা শ্বারুদ্ধ করে দিচ্ছে। ঠোঁট দিয়ে কথা বের হচ্ছে না তার। তবুও বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করল,” যখন দিবেই না, ভাগ্যেই রাখোনি, তখন কেন ওর সাথে আমার দেখা করালে? আমি তো ঠিক ছিলাম, আমার জীবন নিয়ে, কিন্তু তোমার প্ল্যান ভিন্ন ছিল, তাই না? তোমাকে আমি বলেছিলাম ওকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, তুমি ওকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দেখাচ্ছ আমি বাঁচতে পারি ওকে ছাড়া। আমাদের দেখা না হলেও পারত। আমাদের বিয়েটা না হলেও পারত! আমাদের কোনো কিছুই না হলে পারত। আমি আরশ হেলাল না হলে হতো, ও নুসরাত নাছির না হলেও হতো! আমাদের দেখা না হলেও পারত। আমাদের এই অধ্যায় এর শুরু না হলেই পারত।
অনিকা লাল রঙের লেহেঙ্গাটা দো-তলার ড্রয়িং রুম থেকে নিয়ে নিচে নেমে আসলো। মমো একপাশে ধরে রেখেছে। লিপি বেগম এগিয়ে এসে হাসলেন। একহাতে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলেন গালে। বললেন,”কিছু মনে করো না মা, খেয়াল রাখতে পারছি না। ওই বাড়িতে চলে যাও লেহেঙ্গা নিয়ে, ওখানে গিয়ে রেডি হয়ে যাও। মেঝো আছে সেখানে, সে তোমার খেয়াল রাখতে পারবে।
অনিকা বিনয়ী ভঙ্গিতে হাসল। বলল,”জ্বি আন্টি, কোনো সমস্যা নেই। আমি ও বাড়ি চলে যাচ্ছি।
ডার্ক রেড কালার লেহেঙ্গা সে আর মমো।একা ধরে আগাতে পারল না। বলল,”একটু সাহায্য করো, আমিরা!
আমিরা বিনা বাক্য ব্যয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসলো। ডলের উপর পরানো লেহেঙ্গা নিয়ে চলে গেল নাছির মঞ্জিলে। সেখানে প্রবেশ করতেই ইসরাতের সাথে দেখা হলো অনিকার। দু-জনে হাসল ঠোঁট টিপে। অনিকা শুধাল,’”কেমন আছেন, ইসরাত?
ইসরাত মাথা দুলিয়ে বলল,”আলহামদুল্লিলাহ ভালো! বসুন আপনি! রেডি এখন হবেন নাকি সবাই মসজিদ থেকে আসার পর হবেন?
অনিকা সোফায় আরাম করে বসতে বসতে বলল,”ড্রেসিং রুমে নিয়ে লেহেঙ্গা রেখে দিন। আমি পরে গিয়ে রেডি হচ্ছি। একটু কিছু খাওয়া প্রয়োজন। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি।
ইসরাত অবাক হওয়ার ভান করল। মজা উড়িয়ে বলল,”ওমা, নববধূকে কেউ খাবার দিল না দেখি!
ইসরাত কথাটা শেষ করেই ক্ষীন স্বরে হাসল। সাথে করে অনিকা হাসল। সৌরভি এনে তার হাতে ড্রিংকো ধরিয়ে দিতে দিতে বলল,”নিন মেঝো ভাবী, একটু ঠান্ডা খেয়ে রেডি হতে যান।
অনিকা হাত বাড়িয়ে নিল। তার হেজেল বর্ণের নয়ন জোড়া ভীষণ উজ্জ্বল, চেহারায় আলাদা জৌল্যুস খেলে যাচ্ছে। সেই জৌত্যির কারণ কী কেউ জানে না! অনিকা এক ঢোকে পুরো গ্লাস সাবার করে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ডলসহ লেহেঙ্গা টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল,”লেহেঙ্গাটা দারুণ মানাবে না?
ইসরাত মাথা দোলাতেই অনিকা হাসল একটু। ঠোঁটে উপর সূক্ষ্ম টোল পড়ল তার। বলল,”ড্রেসিং রুমে যাচ্ছি। আপনারা সবাই আপনাদের কাজ করুন। একেবারে প্রিপায়ার হয়ে বের হবো।
অনিকা একাই লেহেঙ্গা টেনে নিয়ে যেতে লাগল। মমো জিজ্ঞেস করল,”আমি সাহায্য করতে আসব? ধরার জন্য লাগবে?
অনিকা মানা করে দিল। বলল,”একাই পারব। তাড়াতাড়ি তো সবকিছু করতে হবে, নাহলে কখন সবাই চলে আসে।
সবাই থামজ-আপ দেখিয়ে চলে গেল নিজ নিজ কাজে। নাজমিন বেগম নামাজ পড়া শেষে সালাম ফিরিয়েছেন মাত্র। ইসরাত গিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই তিনি ইশারায় কাছে ডাকলেন তাকে। দোয়া পরে মাথার উপর দুয়েকটা ফু দিলেন। হাত বুলিয়ে দিলেন। ইসরাত মাথা নাজমিন বেগমের কাঁধে ফেলে রাখলো। আবদার করল,”আম্মু শাড়ী পরো আজ, বিয়ে বাড়িতে, এভাবে সালোয়ার কামিজ পরে থেকো না।
নাজমিম বেগম ইসরাতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন,”আচ্চা পরব। তোর কী শরীর খারাপ লাগছে?
ইসরাত দু-পাশে মাথা দোলাল। শরীর খারাপ লাগছে না বললেও মাথা ফেলে পড়ে রইল মায়ের কোলের উপর। কী হলো বোঝা গেল না, একটু পর হুহু করে কেঁদে উঠল।
মসজিদের ভেতর নামাজ শেষ হওয়ার পর আরশকে একপাশে বসিয়ে সকলে তাকে গোল করে বসলেন। মাথার টুপিটা জায়িন ঠিক করে দিল। নাছির সাহেব এক কোণায় বসা। আরশ চোখ তুলে তাকাতে পারল না। কারোর সাথে দৃষ্টি মিলাতে পারল না। কান্না করায় চোখের পাপড়িগুলো ঘন ঘন দেখাচ্ছে। ইমাম সাহেব পড়াতে শুরু করলেন নিকাহনামা। মেয়ের বাবার নাম, মায়ের নাম, মেয়ের নাম, ঠিকানা, সবকিছু। আরশের কানে কিছুই আসলো না। সে তো মেঝের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক না ফেলে। ইমাম সাহেব বললেন,”এই বিবাহে রাজী থাকলে, বলো বাবা আলহামদুলিল্লাহ কবুল!
আরশ কিছুই বলল না৷ নুসরাত নাছির এই তো তার পাশে এসে বসেছে। অনিকাকে বিয়ে করছে কীনা তা জিজ্ঞেস করছে! বেইমানি করবে যখন তাহলে তাকে কথা দিল কেন এসব বলছে। আরশ এক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে রইল মেঝের দিকে।জায়িন ধাক্কা দিল তাকে আস্তে করে। আরশ নড়ল না। জায়িন আবারো ধাক্কা দিল, এবার একটি নড়েচড়ে উঠল সে। ভড়কে উঠে চোখের পাতা ফেলল। জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে?
জায়িন কিছুপল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। বলল,”যা বলতে বলেছেন ইমাম,তা বল!
আরশ অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”ইমাম কী বলেছেন?।
ইমাম সাহেব ছেলের মানুসিক স্থিতি ভালো নেই বুঝলেন। তাই আবারো প্রথম থেকে শুরু করলেন বিবাহনামা পাঠ করা। আরশ এবারো কিছু শুনল না। তার চোখে নুসরাত ভাসছে। কানে শুধু নুসরাতের গলার স্বর ভাসছে। ইমাম সাহেব বললেন,’”রাজী থাকলে বলো বাবা আলহামদুলিল্লাহ কবুল!
আরশ যন্ত্রের ন্যায় ঠোঁট নাড়িয়ে বলে ওঠল,”আলহামদুলিল্লাহ কবুল!
পাত্রের তিনবার সম্মতি নেওয়ার পর শাহেদ খান, নাছির সাহেব, হেলাল সাহেব, শোহেব সাহেব আরো কিছু মানুষ পাত্রীর সম্মতি নেওয়ার জন্য বেরিয়ে গেলেন। মসজিদে থেকে গেল মাহাদি, জায়িন, ইরহাম, আহান, আর সোহেদ সাহেব। অনেকক্ষণ আরশকে বোঝালেন ভদ্রলোক। আরশ টু শব্দ করল না। চুপচাপ বসে রইল, শুনল সবার কথা। শেষে সোহেদ সাহেব বললেন,”উঠো, নতুন বউ ভীষণ আশা নিয়ে আসছে আমাদের বাড়িতে, তাকে কষ্ট দেওয়া ঠিক হবে না। উঠো আরশ, এত হতাশ হতে নেই। যা হয় ভালোর জন্য হয়। তোমার ভাগ্যে যে আছে, সে হাজারো সমস্যা হলেও তোমার ভাগ্যেই থাকবে। যে নেই সে কিছুতেই থাকবে না। এটা বোঝো তো তুমি, তাহলে জেদ ছাড়ো, আর উঠে দাঁড়াও।
আরশ উঠে দাঁড়াল না। অনেকক্ষণ বোঝানোর পরও যখন উঠে দাঁড়াল না, সোহেদ সাহেব টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করালেন। উঁচু লম্বা পুরুষালি শরীরটা উঠে দাঁড়াতেই দুলে উঠল। জায়িন আঁকড়ে ধরল বাহু। টানটান শরীরের গায়ে জড়ানো পাঞ্জাবির জায়গায় জায়গায় ভাঁজ পড়েছে। মসজিদের বাহিরে বেরিয়ে স্লিপার পায়ে ঢোকাল সে। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এগিয়ে চলল বাড়ির দিকে। সৈয়দ বাড়িতে ঢুকতে যাবে, জায়িন থামিয়ে দিল। বলল,”ও বাড়িতে নববধূ।
আরশ এবার রাগে ফেটে পড়ে। মুখ ঘুরিয়ে তাকায় ভাইয়ের দিকে। সব রাগ, জেদ গিয়ে পড়ে জায়িনের উপর। হাতের মুঠি পাকিয়ে ঘুষি বসায় পরপর দুটো। চিৎকার করে উঠে,”ও বাড়িতে কেন সবকিছু? ওই বাড়ির মানুষগুলোর উপর দিয়ে কী যাচ্ছে কেউ বুঝতে পারছ না? তাদের মেয়ে জামাই বিয়ে করছে, আর তাদের বাড়িতেই নতুন বউকে সাজাতে পাঠিয়ে দিয়েছ তোমরা?তোমাদের চিকিৎসার প্রয়োজন! কমনসেন্স কোথায় সবার?আমার লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে, আমি চোখ মেলাতে পারছি না, ওই বয়স্ক লোকটার সাথে! এখন আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে? আমাকে কী কারোর মানুষ মনে হয় না? আমি ও মানুষ, আমি মানুষ! আমারো অনুভূতি আছে৷
আরশের ঘুষিতে জায়িন দু-পা পিছিয়ে যায়। ঝুঁকে নাকে হাত দিতেই দেখে রক্ত। আরশ চ্যাঁচাচ্ছে। সব শোনে জায়িন। এবার উঠে দাঁড়ায় সে। শুভ্র চেহারাটা লাল বর্ণ ধারণ করেছে রাগে। কপাল কুঁচকে কিছুক্ষণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে, ফিরিয়ে বসায় ঘুষি ভাইয়ের গালে, নাকে। দাঁত লেগে আরশের ঠোঁট কেঁটে যায়। কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই জায়িন কলার চেপে ধরে চ্যাঁচিয়ে ওঠে ,”এত যদি পছন্দ করতিস, এত যদি চাইতিস, তাহলে কেন ছেড়ে দিয়েছিলি? কেন তালাক নিয়ে ছিলি? কেন ওই বাড়ির মেয়েকে রেখে বিদেশ গিয়েছিলি? এই, এইই জবাব দে। তোর একার জেদ আছে, আমাদের নেই? তুই একা মানুষ, আমাদের মানুষ মনে হয় না?
জায়িনকে টেনে ছাড়িয়ে নিলেন সোহেদ সাহেব। দু-জনকে ধমকে উঠলেন,”কী শুরু করেছ কী দু-জনে? এগুলো কোনো আচরণ হলো? রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া করছ, মরামারি করছ? একজন আরেকজনে নাক মুখ ফাটিয়ে ফেলছ, হু?
জায়িন কিছু বলতে নিবে সোহেদ সাহেব ঠোঁটের উপর আঙুল চাপলেন। বললেন,”চুপ, একদম চুপ জায়িন! চুপচাপ আগাও! নাহলে এই বয়সে তোমাদের গায়ে হাত তুলতে আমার একটুও বুক কাঁপবে না। তুমি আর আরশ আমার কাছে আহান আর ইরহামের মতো।
জায়িন ঠোঁট বাঁকিয়ে শ্বাস ফেলল। হাতের তালু দিয়ে ঠোঁট মুছতে মুছতে আগাল সামনে। সোহেদ সাহেবের সাথে হেঁটে গেল আহান, ইরহাম, আরশ।
নাছির মঞ্জিলের ভেতর প্রবেশ করার পর শোনা গেল পাত্রী স্বীকারোক্তি নেওয়া হচ্ছে। ইমাম সাহেব জিজ্ঞেস করছেন,”এই বিবাহে রাজী থাকলে বলো মা, আলহামদুলিল্লাহ কবুল!
অপাশ হতে কোনো শব্দ ভেসে এলো না। লাল রঙের লেহেঙ্গা পরিহিত মেয়েটার মুখটা সামনের দিকে ঘুরানো। আরশ শুধু পিঠ দেখতে পেল। ইমাম আবারো স্বীকারোক্তি চাইলেন নববধূর কাছে। উত্তর আসলো না৷ অতঃপর সময় নিয়ে, খুব আস্তে ধীরে উচ্চারণ হলো,”আলহামদুলিল্লাহ কবুল!
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬০
আরশ শুনতেই পেল না গলার স্বরটা, এতটাই ক্ষীন ছিল সেই গলার কবুল উচ্চারণ। বাতাসের বেগে বারি খেয়ে হারিয়ে গেল শব্দগুলো কোথাও। সে এক পা দু-পা করে এগিয়ে গেল। পায়ের তালুতে ঠান্ডা মেঝের স্পর্শ পাচ্ছে। মেয়েটার মাথার উপর দেওয়া পাতলা দোপাট্টায় তার খুলে রাখা চুল দেখা যাচ্ছে। আরশ এগিয়ে যেতে যেতে বিবাহ পড়ানো শেষ করে ফেললেন ইমাম সাহেব। ভদ্রলোক নিজের দাড়ি হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,”বিবাহ সম্পূর্ণ হলো। ইসলামী শরিয়ত মতে আজ থেকে আপনারা স্বামী স্ত্রী। স্বামীকে সবসময় সম্মান করো কিন্তু, মা। তাকে নারাজ হতে দিও না কখনো!
