Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬০

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬০

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬০
জান্নাত নুসরাত

নুসরাতের কাপড় গরীবদের ভাগ বাটোয়ারা করে দিবেন নাজমিন বেগম, তাই সৌরভির ঘাড়ে তা গোছানোর দায়িত্ব পড়েছে। ডিভোর্সের পরপরই রুমের সাথে লাগোয়া করে ওয়াড্রব রুম বানিয়েছে সে। সাধারণ রুমগুলোর তুলনায় বড়। চারিদিকে কাপড় রাখা। সারিরতভাবে ওভার কোট, লেদার জ্যাকেট, কার্ডিগান, উলের জাম্পার, সোয়েটার রাখা। জুতোর রেকে লেমিটেড এডিশনের হাই হিল, বুট হিল, ব্লক হিল, বোট, পেন্সিল হিল, স্টিলেটো, স্লিপার, ফ্ল্যাট জুতো, স্নিকার্স, লোফার। কালো আর ডার্ক রেড কালারের ভীরে চোখ ঝাঁঝিয়ে উঠল সৌরভির। হেঁটে হেঁটে দেখল পুরো রুমটা। যেদিকে গেল লাইট গুলো জ্বলে ওঠল নিজে নিজে। মিররে পাশে ব্যানেটি ওয়াড্রবে গুচ্ছির লিমিটেড এডিশন ব্যাগ রাখা। উপরে এবড়োখেবড়ো হাতের লিখা,’আমার জিনিসে হাত দিবি না কেউ।

সৌরভি মৃদু হাসল। চোখ পড়ল ঘড়ির কালেকশনের দিকে। এই চাকচিক্য জিনিসের প্রতি মোটেও লালসা আসলো না। নুসরাতের পছন্দের প্রশংসা করল নিজ মনে। হ্যালো কিট্টির অভার সাইজড টি-শার্ট গুলো হ্যাঙার করে রাখা ছিল, সেগুলো নিচে নামিয়ে রাখল। নাজমিন বেগমের কথামতো সবগুলো ভাঁজ করল একটা একটা করে। কাজ শেষে ফিরে যাবে এমন সময় কালো মুরকে মোড়ানো একটা জিনিস ডাসবিনের কাছে ফেলে রাখা দেখল। ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল সে। মেঝে থেকে হাতে তুলে নিতেই চোখ কুঁচকাল আরো বেশি। শক্ত কাগজটা সরাতেই গুটি গুটি অক্ষরে লিখা কিছু শব্দ ভাসল অক্ষিকোটরে। সৌরভি পড়তে শুরু করল,’ একবার দাদা, ওহ হ্যাঁ দাদা বলতে বোঝাচ্ছি আমার দাদার স্ত্রীকে, আই মিন মেহেরুন নেছাকে। উনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন আমি নাকি জীবনে ডায়রি লিখতে পারব না৷ কিন্তু উনি হয়তো জানেন না, নুসরাত নাছির পারে না এমন কোনো কিছু এই পৃথিবীতে নেই।
এইটুকু লিখা, পৃষ্ঠার শেষে গুটি গুটি অক্ষরে লিখা,

“Nothing in this world perfect… except me.”
যেই যাই বলুক না কেন, নুসরাত নাছির জন্ম থেকেই
পারফেক্ট!”
এটা দিয়ে শুরু করলাম লিখা।
সৌরভি পরের পৃষ্টা উল্টাল,” কী বকর চকর লিখতে বসেছি খোদা জানে, মেহেরুন নেছার সাথে চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেসে গিয়েছি। তবুও এই চ্যালেঞ্জে আমিই জিতব।
এরপরে আর কিছু লিখা নেই। ফুল, পাখি আর মাছের চিত্র আঁকা।। কিছু কিছু জায়গায় গ্রামের দৃশ্য আঁকানো। সৌরভি একবার রেখে দিতে চাইল কিন্তু কী ভেবে থেমে গেল যেন। মাঝের পৃষ্টার দিকে যেতেই গুটি গুটি অক্ষরে লিখা চোখে ভাসল। উপরে বড় করে লিখা,”কারোর অনুমতি ব্যতীত, তার ডায়রি পড়া অভদ্রতা। আর আপনি সেই অভদ্রতা নিশ্চয়ই করবেন না, তাই না?

সৌরভি এসব লিখার ধার ধারল না। পড়তে শুরু করল। তারিখ ও লিখে রাখা। বহুদিন পূর্বের লিখা হওয়ায় ছোপ ছোপ দাগ পড়ে গেছে,”যেদিন আমাদের বিয়ে হলো দাদার কথায় সেদিন আব্বা এত খুশি হয়েছিল যে প্রায় কান্নার দারপ্রান্তে ছিল। যেদিন ওই বাড়ি থেকে আমরা বের হয়ে আসলাম আব্বু কাঁদছিল। আমি সেসব আমলে নেয়নি। কীভাবে নিব তখন ছোট ছিলাম। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে যখন তিন রুমের ওই বাসায় উঠলাম আমার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছিল! একদিকে পরিবারকে রেখে আসার হতাশা, অন্যদিকে নতুন এক পরিবেশে আসায় আমি খুশিতে আত্মহারা। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হতে হতেই বোঝলাম ওই বাড়ির মানুষগুলোকে আমি খুব করে মিস করছি। যেই সেই মিস করা না, ইচ্ছে করছিল গাড়িতে উঠে চলে যেতে। আম্মা চাচিদের রেখে আসার কারণে ওড়না চেপে চেপে কাঁদত। কয়েকদিন যাওয়ার পর সব ঠিক হয়ে যাবে ভাবলাম, হলো না। আরো তীব্রভাবে তাদের মনে পড়তে শুরু করল। সন্ধ্যার পর একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া, চাচিদের হাতের রান্না, ঘরদোর পরিস্কার, এত মানুষ একবাড়িতে থাকা একটা রমরমে ভাব বিরাজ সেগুলো মনে হাতছানি দিত। আব্বার বড় ভাইকে ওই সময় শয়তান লোক ছাড়া আমার কাছে আর কিছু-ই মনে হতো না। মুখ তেতো হয়ে যেত ওই লোকের কথা মনে পড়লেই। ইচ্ছে করত লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আসি। কীভাবে কীভাবে যেন আমার সেই আশা পূরণ হয়ে গেল। এবার দেশে আসার পর চোর ভেবে আমি আর আব্বা ওই লোককে পিটিয়ে ফেললাম।

ছোটবেলায় একটু সিনেমাটিক ভাবতাম বসে বসে। চোখের সামনে টেলিকাস্ট হতো সেসব। আমার কাছে একটা জ্বীনের চেরাগ আছে, চেরাগ ঘষতেই সেখান থেকে জ্বীনটা বের হবে, মুখটা গুলুমুলু, মাথায় এক গাছি চুল, পা গুলো মাছের লেজের মতো, মাথার উপর উড়ে সে। চেরাগ হতে বের হয়েই বলবে,’আমার মালিক, বলুন আপনার তিনটা ইচ্ছে।’ আমি তখন বলতাম,’সৈয়দ বাড়িতে যেন হেলাল সাহেব আর তার ছেলেরা হলিডেতে বেড়াতে না আসে, আমাদের বিয়ে যেন না হয় , সব যেন ঠিক থাকে। তখন চেরাগের জ্বীন আমার কথা শোনে সব ঠিক করে দেবে। ভেবেই আনন্দ লাগত। গালে হাত ঠেকিয়ে অনেক সময় ভাবতাম এরা যদি দেশেই না আসত, আমাদের বিয়ে না হতো! সেসব ভেবে ভেবে দিনকাল যেতে শুরু করল। ছোট বেলায় সবার অনেক কিছু হওয়ার ইচ্ছে থাকে আমার ও ছিল। ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলাম নিজ মনে। সেই অনুযায়ী পড়াশোনা করতে লাগলাম। বছর খানেক পেরিয়ে যাওয়ার পর এক বিকেলে খবর আসলো আজমল আলী আর বেঁচে নেই। আম্মা ছুটে যেতে চাইল দাদার কাছে ওই বাড়িতে, কিন্তু আব্বা যেতে দিল না।

জেদ ধরে রইল। আমিও আব্বার পক্ষে থাকলাম। আজমল আলীকে হসপিটালের নেওয়ার পর মৃত্যু হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হসপিটালে গিয়ে শেষ দেখা দেখে আসলো। দাদাকে জানাজা পড়িয়ে কবর দেওয়া হলো। তখনো নিষ্ঠুর লোকগুলো দেশে আসলো না। ভালোই হলো! কয়েক বছর কেটে গেল। যেহেতু আমাদের ছোটবেলা থেকে কিশোরী পর্যন্ত কেটেছে তিন রুমের ওই বাসায়, তাই আব্বা কিনে ফেললেন বাসাটা। উইল করা হলো আম্মার নামে। আজমল আলী মরার আগে নিজের জায়গা জমি ভাগ বাটোয়ারা করলেন ছেলেদের নামে। সৈয়দ আকবর আলী আব্বার দাদা উনি ছিলেন প্রতাপশালী একজন লোক। যেহেতু আমাদের দাদা একাই এক সন্তান ছিলেন তাই তখনকার কয়েকশো টাকার সম্পত্তি রেখে গিয়েছিলেন দাদার জন্য, যা এখনকার সময়ে কয়েক কোটি টাকা হয়ে গিয়েছে। কিছু সম্পত্তি মমোর নামে দেওয়া হলো। সৈয়দ বাড়ির পাশের জায়গাটা যেখানে এখন নাছির মঞ্জিল তা আমার আর ইসরাতের নামে করে দিলেন আজমল আলী। দাদিকে ও দুটো ফ্ল্যাট দিলেন। সবথেকে বেশি সম্পত্তি দিয়েছেন সৈয়দ জায়িন হেলালকে আর সৈয়দ আরশ হেলালকে। প্রথম নাতী হওয়ায়। আমার হিংসে হয়, আমাদের কেন দিল না! বুড়ো মরার আগেও বৈষম্য করে গিয়েছে, ভালো হবে না বুড়োর বাচ্চা।

যাই হোক, আব্বা মিরাবাজার থাকা আমাদের নামে একটা বাসা বিক্রি করে দিল। সেই টাকা দিয়ে নাছির মঞ্জিল তৈরি করল। যখন মিরাবাজার দিয়ে যাই, ওই বাসার দিকে আমি তাকিয়ে থাকি। আজ এটা আমার নামে থাকত। কোনো বিষয় না। এস-এস-সি পরীক্ষা দেওয়ার পর আমি আর ইরহাম মিলে ভ্রু এর উপর পিয়ার্সিং করে ফেললাম। একইসাথে নাকে, কানেও করলাম। ইরহামকে কুঃপ্ররোচনা দিলাম কানে পিয়ার্সিং করার জন্য, ও বলল ওকে নাকি,’ডন লাগবে। মটু পাতলুর যে জন বানে গা ডন ওর মতো।

এইটুকু পড়ে সৌরভি হেসে ফেলল। সময় নিয়ে আবারো পড়া শুরু করল,”বাড়িতে যখন দু-জন এসে সারপ্রাইজ দিলাম দেখো দেখো আমরা পিয়ার্সিং করেছি তখন আম্মা তার রোবটিক্স জুতো দিয়ে দু-জনকে উদোম কেলানি দিল। আব্বা বলল,’সুন্দর লাগছে, থাকুক না!’ আম্মা ক্ষেপে গেল, যদি আই-ভ্রু এর উপর আমাদের পিয়ার্সিং থাকে সে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। আমি আরেকজায়গায় পিয়ার্সিং করেছিলাম তা চেপে গেলাম। ওইটা জানলে আম্মা আমাকে লাত্থি মেরে বাড়ির বাহিরে ফেলে দিবে। কোথায় আরেকটা করেছি তাই না? উপরের নাভিতে পিয়ার্সিং করেছি। যা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। এমনকি আমার ক্রাইম পার্টনার, আমার বোন ও জানে না। জানলে নিশ্চয়ই অজ্ঞান হয়ে যেত। আইভ্রু পিয়ার্সিং টিকল না আম্মার যাতাকলে পড়ে, অকালেই সেটা মিটে গেল।

এভাবেই দু-বছর আমার ইরহামের নকটামি করে কেটে গেল। আমাদের সংঘতে এসে যোগ দিল আহান। আমরা কখনো বয়সের তফাৎ করতাম না। পাঁচ বছরের বাচ্চা ও যদি আমাদের সংঘতে যুক্ত হতে চাইত তাকেও আমাদের সাথে যোগ করে নিতাম। আমি আহান, আর ইরহাম অভদ্রদের মধ্যে ভদ্রমহিলা ছিল ইসরাত, মমো, সৌরভি। কোনোদিন যদি রাতে ইচ্ছে হতো বের হওয়ার আব্বার গাড়ি নিয়ে বের হয়ে যেতাম লং ড্রাইভে। কখনো সখনো গাড়ি ঠুকে আসতাম কোনো প্লটে, নাহয় কোনো উচ্ছবিলাসী লোকের গাড়িতে। আমাদএর দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল। না ছিল কোনো চিন্তা, না ছিল চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল। আমার এইচ এস সি পরীক্ষা ছিল। উচ্চতর গণিতের আগের দিন আব্বা একদিন বমি করতে শুরু করল। তখন তিনি অফিসে ছিলেন। কর্মচারীরা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর জানা গেল কিডনিতে পাথর হয়ে গেছে। সেগুলো বড় বড়৷ অপারেশন করতে হবে। আর নিয়মিত লেবু পানি খেতে বলল। সেদিন বই নিয়ে বসলেও মন বসল না পড়ায়। ঠিকঠাক কোনো অংকের সমাধান করলাম না। ম্যাট্রিক্স, ভেক্টর, সরলরেখা, বৃত্ত, কিছু কিছু পারলেও ত্রিকোণমিতি, ফাংশন আর অধ্যায়টার নাম ভুলে গেছি, এর কিছু পারিনা। আমি মাথা ঘামালাম না। পরীক্ষায় গিয়ে কী লিখেছি খোদা জানে, রেজাল্ট বের হলো আমি ফেইল। আমার কিছু এলো গেল না। পড়াশোনা না করলেও আমার লাইফ সেট। আজমল আলী যেসব জায়গা আমার নামে দিয়েছে সব বিক্রি করে খেয়ে নিব। পরেরবার পরীক্ষায় বসার আগে আব্বা একদিন গম্ভীর মুখে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। বলল,’তোমার ভবিষ্যৎ ব্রাইট হতে পারে, ঠিকমতো পড়াশোনা করো। বাহিরে যেতে পারবে ভালো একটা রেজাল্ট পেলে। যদি এবার খারাপ রেজাল্ট হয় এক বাচ্চার বাপের সাথে বিয়ে দিয়ে দিব।

আব্বার এই কথায় আমি ত্যাড়ামি করে পড়াশোনাই করলাম না। পরে রেজাল্ট বের হলে এবার ও ডাব্বা। ইরহাম অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে আর আমি এইচ এস সি ফেইল। বিষয়টা দারুণ।
মেহেরুন নেছার এর মধ্যে হাজার নাটক শুরু হলো। বড়জনকে দেশে আনার জন্য। একবার কোমায় চলে যাচ্ছেন তো একবার ছড়খাতে। আমাদের সুন্দর গোছাল জীবনটা হয়তো এবড়োখেবড়ো করতেই ওই লোক আবারো দেশে আসলো। আবারো সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল তারা। আমাদের সুখী সংসারটার চারিদিকে শুধু রয়ে গেল দুঃখ, হতাশা, আর কষ্ট৷

সৌরভির আর ইরহামের যেদিন বিয়ে হলো ইরহাম কান্না করেছিল। ও পছন্দ করত ওকে, ধীরে ধীরে পছন্দ বেড়ে গিয়ে তীব্র রুপ নিল। ওর চোখের দিকে তাকালেই সেসব বোঝা যেত। আহানের মতো পিচ্চিটা জানত ইরহামের মনে কী। চোখের দৃষ্টির দিকে তাকালেই আমার নিজের মিশ্র অনুভূতি হতো। এত প্রখর ছিল ওর অনুভূতিগুলো। মুখের উপর স্পষ্ট ভেসে থাকত তা। আমরা ভাই বোন কখনো একে অন্যকে খুব আয়োজন করে বলিনি ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, কিন্তু একে অন্যকে ভালোবাসতাম তা বোঝতাম। আমাদের ভেতরের অনুভূতি এতটাই প্রখর ছিল যে, কখনো একে অন্যকে কষ্ট দিয়ে আরাম পেতাম না। মনে কিছু একটা খোঁচাত। ইরহাম আমাকে থাপ্পড় মারলে বা আমি ইরহামকে থাপ্পড় মারলে কখনোই ক্ষমা চাইতাম না। মুখ ফুলিয়ে ঘুরতাম, তারপর আবার মিল হয়ে যেত। বিয়ের পর সৌরভি আর ইরহামের রোজকার ঝগড়াঝাটিতে আমার ইচ্ছে করত দুটোকেই নদীতে ফেলে আসতে। একটা থাকবে না, আরেকটা ছাড়বে না। ধরাধরি ছোঁয়াছুঁয়ির এই সম্পর্ক ভেঙে দিত চাইল সবাই, কিন্তু প্রেমিক পুরুষ ইরহাম ছাড়তে চাইল না তার প্রেমিকাকে। আমরা আলোচনায় বসলাম কী করা যায়। আমি বুড়ো মহিলাদের মতো করে বললাম,’বাচ্চা নিয়ে নে, এভরিথিং উইল বি ফাইন।’ আমার এই কথা শোনে ইরহাম কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে হু হু করে হেসে উঠল। বলল,”সৌরভি আমাকে খুন করে ফেলবে। আবলামি আইডিয়া দিবি না। আমাকে মারতে চাস তুই?

আমি ও হাসলাম ইরহামের কথায়। যেদিন সৌরভি ইরহামকে বিষ দিয়েছিল সেই কথা জানতে পেরে আমি শুধু দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে থামিয়েছি। আমার গলার কাছে আমার জান এসে আটকে ছিল। কঠিন, কঠিন কথা বলতে চাইলাম, একটা শব্দ বেরোল না মুখ দিয়ে। কান্না ও আসলো না। পায়ে শক্তি পেলাম না। অসাড় ছিল আমার দেহ। ইরহামের ওই ফ্যাকাশে চেহারাটার কথা এখনো ভাবলে আমার রুহ কেঁপে ওঠে। আমার ভাইটা পড়ে রইল বেডে জীর্ণ দেহটা নিয়ে! আমি আমার স্যালাইন লাগানো হাত দুটো চেপে ধরে রাখলাম নিজের সাথে। মৃর্গী রোগীর ন্যায় থরথর করে কাঁপছিল আমার সমগ্র শরীর। আল্লাহর কসম করে বলছি যদি আমার গায়ে স্যালাইন লাগানো না থাকত, আর ইরহামের কিছু হতো আমি আমাদের বন্ধুত্বের ধার ধারতাম না, গলা টিপে সৌরভিকে মেরে ফেলতাম নাহয় কোদাল দিয়ে কুপিয়ে ওকে হত্যা করতাম। কত বড় সাহস ওই মেয়ের! বন্ধুত্ব যাক জলে আমি আমার রক্তকে এমন করে মরতে দেখতে পারতাম না।

ইরহাম আর আব্বাকে নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসার পর জানা গেল ও বাড়ির সবাই দেশের বাহিরে চলে গিয়েছে। বাতাসে খবর আসলো ওই লোক নাকি পাগলামি করছে। করুক, যার ডিভোর্স পেপারি সাইন করতে হাত কাঁপেনি তার পাগল হওয়াই উচিত। পাগলামি করা উচিত, আব্বার শরীর কিছুটা ভালো হলো। নিয়মিত ডাক্তারের চেকআপ করানোতে জানা গেল শরীর আগের তুলনায় ভালো আছে। কিন্তু কোনোভাবে চাপ নেওয়া যাবে না উনার, স্পষ্ট রুপে ডাক্তার বলে দিল। আমি মানলাম ডাক্তারের কথা। আব্বাকে বললাম সৈয়দ চয়েস আমি সামলাব৷ আব্বা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। এর আগেও আমাকে অনেকবার বলেছিল একজন পার্ট টাইম ওয়ারকার হিসেবে ঢোকার জন্য কিন্তু আমি মানা করে দিয়েছি। ইউ নো না, জেন-জি রা কতটা অলস হয়। আমার আর আরশ ভাইয়ের একই জেনারেশনে জন্ম হয়ে ভুল হয়ে গেছে। এটা স্বীকার করতে আমার বিন্দুমাত্র লজ্জা লাগছে না যে আমি টক্সিক! আরশ ভাই ও টক্সিক। আজমল আলী এখানেই সমস্যা করে ফেলেছেন। আমার জন্য একজন গ্রিন ফরেস্ট এনে দেওয়ার জায়গায় উনি আমাকে রেড ফ্ল্যাগ ধরিয়ে দিলেন। আ আয়ায়ায়ায়ায়া… ওই কুত্তার বাচ্চা আমাকে কোন সাহসে ডিভোর্স দিয়েছে! আমি ওকে সামনে পেলে খুন করব। ও কী মনে করে আমাকে ডিভোর্স দিয়ে বেঁচে যাবে? উঁহু, আমি ওর মাথায় সারাক্ষণ ঠান্ডব করে বেড়াব৷ মরে গেলে পেত্নী হয়ে ওর পিছু নিব।

এইটুকু লিখা শেষে আর কিছু নেই। সৌরভি আরো দু-য়েক পাতা উল্টাল। শেষের দিকে এক পেইজে লাল কলম দিয়ে লিখে রাখা,’আমাদের যেদিন ডিভোর্স হলো সেদিন আমি কোনোরকম শরীরটা টেনে এনে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আরশ ভাইয়ের প্রতি আমার অনুভুতিটা ঠিক কী আমি জানি না! ভালোবাসা? আবেগ? মায়া? নাকি অন্যকিছু, কিছুই জানি না! সেদিন আমি বুঝতে পারলাম আরশ ভাইয়ের প্রতি আমার অনুভূতিটা প্রখর… ভালোবাসার। এইটুকু লিখতে গিয়ে আমার হাত কাঁপছে৷ এটাই কী তবে ভালোবাসা? যে লোকটাকে আমি আমার হৃদয়ের কাছে রেখেছিলাম তার কাছ থেকে ওই শব্দগুলো আশা করিনি, এজন্য আমি ভেঙে পড়েছি। আমার চোখের পাতা ভিজে আসছে, গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকাচ্ছে, শব্দের ভান্ডার পূর্ণ তবুও আমি বাকহারা শূণ্য, কিছুই লিখতে পারছি না। আমি স্বীকার করছি, আরশ ভাই যদি সেদিন রেগে আমাকে চরিত্রহীন না বলত আমি কখনো ডিভোর্সের কথা মুখেই আনতাম না।

ডিভোর্সের কথা ভাবলেই আমার শরীরের থেকে বুক কাঁপে বেশি। আমার হাতটা কাঁপছে একইসাথে। কলম অনেক কষ্টে চেপে ধরে রেখেছি।। আমি নিজের থেকে নিজে পালাচ্ছি, আমি নিজেকে নিজে ভুল বোঝাচ্ছি, আমি সব জানি, সব উপলব্ধি করি। নাহলে নাহিয়ান আবরার পূর্ব এর মতো এত সুদর্শন একটা লোককে কেন আমার ভালো লাগেনি! পূর্বের কাছে দাঁড়ালে আরশ ভাই কিছুই না, তবুও আমার কাছে আরশ ভাইয়ের থেকে সুদর্শন লোক আর কাউকে মনে হয় না। আমার বাপ চাচার পরে ওই লোককে আমার সবথেকে বেশি ভালোলাগে, আমি কী তবে লোকটাকে ভালোবাসি! ভালোবাসার অনুভূতি কী এমন হয়? আমি জানি না, আমি কিছুই জানি না, আমি শুধু জানি ওই লোককে খুব করে চেয়েছিলাম আমি নিজের করে, কিন্তু নিয়তি আমার ভাগ্যে তাকে রাখেনি। মুখ ফুটে কখনো এই কথা বলতে না পারলেও আমার মস্তিষ্ক আমার হৃদয় জানে সবকিছু। আমি নিজেকে যতটা সাহসী দেখাই আমার ভেতর জানে আমি কতটা ভীতু। যে নিজের অনুভূতি স্বীকার করতে ভয় পায়। আমি কী ন্যাকামি করছি এসব লিখে! জানি না, ন্যাকামি হলে ন্যাকামি, একদিন ন্যাকামি করলে কিছু আসবে না, যাবে না। একদিন না হয় আমি আমার ন্যাকামিকে প্রশয় দিলাম।

আমার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে এই সময়, কিন্তু আমি কাঁদতে পারছি না। চেয়ার থেকে উঠে বেডে গিয়ে শোয়ার শক্তিটুকু নেই আমার। আমি যতই বলি আরশ ভাইয়ের সাথে আমার দেখা না হলে ভালো হতো, যতই বলি ওরা দেশে না আসলে ভালো হতো, আমার মন জানে, আমার খোদা জানে, ওসব মিথ্যা, আমি ডাহা মিথ্যাবাজ। যে নিজের সাথে, নিজের অনুভূতির সাথে নাটক করে। আরশ ভাইকে আমি একবার বলেছিলাম তার সাথে আমার যদি দেখা না হতো, তাহলে ভালো হতো। এটা ও মিথ্যা কথা! আমি জানি তার সাথে দেখা না হলে কখনো আমি ওই অনুভূতির সম্মুখীন হতাম না! তাকে বিয়ে করে কোনোদিন আমি পস্তাইনি, কিন্তু ডিভোর্স পেপারে সিগনেচার করে আমি পস্তাচ্ছি, আমি ভীষণ করে পস্তাচ্ছি, আমি কেন একটু ঠান্ডা মেজাজের হলাম না? আমি কেন একটু নরম হলাম না? এই রাত্রি প্রথম প্রহরে আমি ভেঙে পড়ছি। আমার সামনে জ্বালানো মোমের আলোটা প্রায় নিভু নিভু। আমার ভয় হচ্ছে যদি কেউ এসে দেখে ফেলে আমি কাঁদছি, আমি দরজা লক করিনি, অথবা কেউ যদি এই ডায়রি পড়ে নেয়, ভাবতেই আমার গা কাঁপছে, শরীরে শিহরণ বয়ে যাচ্ছে, কেউ না পড়ুক এই ডায়রি, নাহলে আমি ভীষণ হীনমন্যতা ভোগব, কেউ যেন এই ডায়রি আমি ব্যতীত স্পর্শ না করে। আমি নিজে আজ যা লিখছি তা আর দ্বিতীয়বার কখনো পড়ব না। আমি জানি এইটুকু পড়লে আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হবো, আমার কাছে আমার আত্মসম্মান অনেক উপরে। দুনিয়া উলটে যাক তবুও আমি তা ছাড়ব না, কিন্তু এই অনুভূতিটা পায়ে ঠেলে ফেলা যাচ্ছে না, আমি ঝেড়ে ফেলতে পারছি না, পিছু ছাড়াতে পারছি না, এটাই কী তবে ভালোবাসার অনুভূতি? যদি ভালোবাসার অনুভূতি এটাই হয়, তাহলে আমি কেন আগে সেটা উপলব্ধি করলাম না? সব শেষ হওয়ার পর এখন উপলব্ধি করার মানে কী! আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে, আমি কী করব! ওহ আল্লাহ…

গালে হাত ঠেকিয়ে খাবার টেবিলে বসে আছেন হেলাল সাহেব। কোনোভাবেই ছেলের এই অধঃপতন মেনে নিতে পারছেন না। পারলে ধরে একটা বিয়ে দিয়ে দেন।। মাথায় চিন্তাটা খেলে যেতেই মুখে খুশির আলো জ্বলে উঠল। কিন্তু আরশকে বিয়েতে রাজী করাবেন কীভাবে ভেবে পেলেন না! সে তো দেবদাস হয়ে ঘুরছে! ফ্রান্স যাওয়ার পর চেষ্টা করেছিলেন বিয়ে দেওয়ার বলেছে আত্মহত্যা করে ফেলবে জোর করে বিয়ে দিলে। আত্মহত্যার কথা মাথায় আসতেই চুটকি বাজালেন। সারাদিন ভাবলেন কী করে প্ল্যান কাজে লাগানো যায় কোনো উপায় খুঁজে পেলেন না। রাত আটটা ছুঁই ছুঁই তখন ঘড়িতে। আরশের রুমের দরজায় নক করলেন হেলাল সাহেব। নড়াচড়া না পেয়ে আলগোছে দরজা খুলে উঁকি দিলেন ভেতরে। স্বামীকে এমন দরজার সামনে উঁকি দিতে দেখে লিপি বেগম ও এগিয়ে আসলেন। ভ্রু কুঁচকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবেন হেলাল সাহেব ঠোঁটে হাত রেখে মানা করলেন কথা বলতে। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলেন। আরশ রুমে নেই। বারান্দা থেকে কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছে। আবারো কল্পনা করছে ভেবে বারান্দায় যেতেই নজর কাড়ল জায়িন। দু-জনে পাশাপাশি বসে দাবা খেলছে।। বেতের সোফায় বসলেন হেলাল সাহেব আর লিপি বেগম। শব্দ হতে চোখ তুলে এক পলক তাকাল আরশ। তারপর আবার
খেলায় মনোযোগ দিল। দু-জনের খেলা শেষ হতে হতে নয়টা বেজে গেল। দাবার গুটি গুছিয়ে রাখতে দেখে কথা পারলেন হেলাল সাহেব,”আরশ.. শরীর এখন কেমন আছে তোমার?
আরশ মাথা দোলাল, ভালো আছে বলে। হেলাল সাহেব বললেন,”ভালোই হলে ভালো, আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ভাবলাম তোমাকে জানিয়ে দিই।

মুখটা ভীষণ সিরিয়াস রাখলেন। দেখে মনে হলো না কোনো খাপছাড়া কথা বলবেন। তাই জায়িন আরশ দু-জনেই নড়েচড়ে বসল। ভেবে পেল না কেউ কী বলবেন। এমনকি লিপি বেগম ও। প্রশ্নাত্মক তিন জোড়া দৃষ্টির মুখে পড়েও একটুও টললেন না হেলাল সাহেব। গম্ভীর স্বরে বললেন,”তোমার বিয়ে ঠিক করেছি আমি অনিকার সাথে।
আরশ ঠাট্টা করে সে কথা উড়িয়ে দিল৷ বলল,”মজা করছেন?
“মজা করছি না, আমি সিরিয়াস।
আরশ কপাল কুঁচকাল। নাকের পাটাতন ফুলিয়ে শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,” অনিকা আমাকে বিয়ে করবে? আমাকে?

“তো তোমাকে বিয়ে করতে পারবে না এমন কোনো কথা আছে?
“ও কী ম্যাড হয়ে গিয়েছে, একজন বিবাহিত মানুষকে বিয়ে করবে।
“ ও পাগল হয়নি পাগল তুমি হয়ে গিয়েছ। তোমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে৷ তারপরেও তুমি নিজেকে বিবাহিত দাবী করছ কীভাবে?
“ওকে ডান,আমি বিবাহিত না ডিভোর্সী, তারপরও ওই নির্লজ্জ মেয়ে কীভাবে আমার মতো ডিভোর্সি লোককে বিয়ে করতে রাজী হলো? ওর কী লজ্জা শরম নেই?
হেলাল সাহেব চ্যাঁচিয়ে উঠলেন,‘“আরশ, মুখ সামলে কথা বলো। তুমি অনিকাকে বিয়ে করছ আর এটাই শেষ কথা।
“আমি কাকে বিয়ে করব আর করব না সেটা আপনি ঠিক করে দিতে পারেন না পাপা।
“ অবশ্যই আমি করে দিব। তুমি উচ্ছ্বনে যাচ্ছো। সামান্য একটা মেয়ের জন্য কেঁদেকেটে মরে যাচ্ছো।
আরশের কপালে ভাঁজ পড়ল। হিসহিসিয়ে শুধাল,“সামান্য মেয়ে কাকে বলছেন, কথা বলার আগে একটু সাবধান হোন, ও আমার স্ত্রী হয়।
“ফর ইউ্যের কাইন্ড ইনফরমেশন, স্ত্রী হয় না, স্ত্রী ছিল!
আরশ কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলল। গর্জানোর স্বর বলল“আমি ওকে তালাক দেইনি। আই ডিডে’ন্ট সে ডেট আমি তোমাকে তালাক দিচ্ছি, বা ও আমার থেকে খোলা নেয়নি। তাহলে তালাক হলো কীভাবে?

“আইনিভাবে হয়ে গিয়েছে।
“ ওই দু-আনার পেপারে দাম আমার কাছে একটুকরো নেই। বুঝেছেন আপনি? তখন আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম, কেন যে ওই পেপারে সিগনেচার করেছিলাম, ওই ভুল আমাকে এখনো তাড়া করে বেড়ায়। একটা কথা সবাই শুনে রাখুন, ও আমার স্ত্রী ছিল, হয়, এবং সামনেও থাকবে। ওকে আমি এই জীবনে ছাড়ছি না।
“বেয়াদবি করছ তুমি?

আরশ শান্ত স্বরে উত্তর দিল,“আপনি আমার স্ত্রীকে টেনে আনছেন কেন? না আনলেই তো আমি বেয়াদবি করব না।
জায়িন শাসানোর স্বরে বলল,”সম্মান দিয়ে কথা বল আরশ, বাবা হয় উনি। এত এগ্রোসিভ হচ্ছো কেন?
আরশ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল জায়িনের দিকে। জিভ দিয়ে গাল ঠেলে তপ্ত শ্বাস ফেলল। এর মধ্যে হেলাল সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। নাটকীয় স্বরে বললেন,”এই ছেলের কাছে আমার কোনো দাম নেই৷ আজ পর্যন্ত যা চেয়েছ তোমরা দু-ভাই আমি কী কিছুতে মানা করেছি, কিন্তু আমার বেলায়ই তোমরা দু-জন স্বার্থপর হয়ে যাও৷ কখনো কিছু চাইলে তা পূরণ করতে চাও না। আমি কী বলেছি, শুধু বলেছি অনিকাকে বিয়ে করার কথা, এতেও আমার ভুল ধরছ দু-জনে। যাও আর থাকব না তোমাদের মাঝে৷ আমি না থাকলেই তো তোমরা খুশি, চলে যাব সব ছেড়ে।
কথা শেষে দ্রুত পদক্ষেপে হেলাল সাহেব চলে গেলেন। জায়িন আর লিপি বেগম উনার পিছু পিছু দৌড় দিল। হেলাল সাহেবকে থামানোর জন্য পেছন থেকে হাক ছুঁড়ল কিন্তু উনি থামলেন না। দো-তলার শোরগোলে রুহিনী বেগম, ঝর্ণা বেগম, শোহেব সাহেব, সোহেদ সাহেব ছুটে আসলেন। জায়িন যখনই বলতে যাবে উনাকে আটকান, তখনই ধপাস করে রুমের দরজা আটকে দিলেন হেলাল সাহেব।
শোহেব সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,”কী হয়েছে?

লিপি বেগম বললেন,”আরশের সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে৷ বলেছেন সবাইকে ছেড়ে চলে যাবেন।
রুহিনী বেগম আতকে ওঠে বললেন,”বড় ভাইয়া কী আত্মহত্যা করতে চলে গেছেন? ও মাই গড…
রুমের জানালা বাহিরের দিকে হওয়ায় শোহেব সাহেব সেদিকে ছুটলেন। ঝর্ণা বেগম আর রুহিনী বেগম দরজায় আঘাত করছেন, আর বলছেন,”ভাইয়া দরজা খুলুন, ভাইয়া…
লিপি বেগম বললেন,”জায়িনের আব্বায়ায়া, দরজা খুলুন, রাগ করে কেউ এই বয়সে এসব বাচ্চামো করে?
হেলাল সাহেব দরজার অপাশে বিরক্ত হলেন স্ত্রীর উপর। হাতের দড়িখানা সিলিং ফ্যানে ঝোলাতে ঝোলাতে ত্যক্ত শ্বাস ফেললেন। এই বয়সে উনার হয়েছে যত জ্বালা৷ কত নাটক করতে হচ্ছে। বাচ্চাদের বিয়েতে রাজী করানোর জন্য বাচ্চামো ব্ল্যাকমেইল করতে হচ্ছে৷ ঘি সোজা আঙুলে না উঠলে চামচ দিয়ে তুলে নিতে হয়। কিন্তু এই উক্তিটা কে তৈরি করেছে। দু-পাশে মাথা ঝাড়লেন ভদ্রলোক, এখন এসব ভাববার সময় নেই, নাটকে মনোযোগ দিতে হবে।
শোহেব সাহেব আর সোহেদ সাহেবের দৌড়াদৌড়িতে আরশ এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির বাহিরে। প্রথমে অতোটা পাত্তা না দিলেও এখন একটু একটু মনে কিছু একটা খোঁচাচ্ছে। যদি জেদের বসে কিছু করে ফেলেন। শোহেব সাহেব মই টেনে আনলেন। আরশকে ইশারা করে বললেন,”তাড়াতাড়ি উপরে উঠো। ক্ষমা চাও বড় ভাইয়ার কাছে।
আরশ অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”আমি উঠব?

সোহেদ সাহেব তিরিক্ষি মেজাযে বললেন,”তুমি উঠবে না তো কী, এই বয়সে আমরা উঠব?
আরশ ধীরে ধীরে পা ফেলে উপরে উঠতে লাগল। পেছন থেকে শোহেব সাহেব আর সোহেদ সাহেব তাড়া দিচ্ছেন। থাই গ্লাস লাগানো জানালা হওয়ায় দূর হতে হেলাল সাহেব দেখতে পেলেন আরশ উঠে আসছে। তাই গলায় দড়ি প্যাঁচিয়ে নিলেন। আরশ উপরে উঠে এসে জানালা খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু লক করে রাখায় তা খোলা গেল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে চ্যাঁচাল,”পাপা বাচ্চামো করবেন না। এই বয়সে আপনাকে এসব মানায়?
হেলাল সাহেব শুনলেন না, প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে ভয়েজ মেসেজ পাঠালেন, “কী বলেছ বুঝিনি!
“ বলেছি নেমে আসুন ওখান থেকে।
“না নামব না, আগে বলো বিয়ে করবে?
আরশ তপ্ত শ্বাস ফেলল। বলল,”না পারব না।
“হয় আমার কথা মানো নয়তো আমাকে আত্মহত্যা করতে দেখো।

বলেই মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে ফেললেন। সত্যি সত্যি গলার মধ্যে রশি প্যাঁচিয়ে পা দিয়ে চেয়ারটা ফেলে দিলেন। আরশ সর্বশক্তি দিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল,”পাপাআয়ায়া, আমি বিয়ে করব, আমি বিয়ে করব। ওয়াদা করছি বিয়ে করব, আপনি প্লিজ নেমে আসুন। এমন করবেন না!পাপায়ায়া
আরশের কথা শুনতেই ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ভেসে উঠল হেলাল সাহেবের। এর মধ্যে সামনের দরজা ভেঙে জায়িন এসে ভেতরে প্রবেশ করল। বড় ছেলের এমন কান্ডে একটু বিরক্ত হলেন বটে। একটু আগে এলেই তো সব পন্ড হয়ে যেত। ভাবনার ভেতর গলায় টান পড়তেই চোখ উলটে আসলো উনার। পা শূণ্যে ভাসতে দেখে বুঝলেন অভিনয় করতে গিয়ে সত্যি সত্যি তিনি এখন মৃত্যুর দারপ্রান্তে। জানটা বেরিয়ে যাবে যাবে এমন সময় পায়ের নিচে ভর আসলো। গলার টানটা হালকা হয়ে আসলো। চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। তারপর সবকিছু সামনের অন্ধকার হয়ে আসলো।

হেলাল সাহেবের জ্ঞান ফেরার পর যখন আরশ বিয়ে করতে মানা করে দিতে যাবে তখন তাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করলেন ভদ্রলোক। সৈয়দ বাড়ির সবাই মনে মনে বিরক্ত হলেও টু শব্দটি করল না৷ তারা প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল একজায়গায়। হেলাল সাহেবের তোড়জোড়ে এই সামনের শুক্রবারে বিয়ের তারিখ রাখা হলো। খুব ঘটা করে বিয়ে হবে না পারিবারিকভাবে বিয়ে হবে। নববধূকে এই বাড়িতে এনেই বিয়ে পড়িয়ে নেওয়া হবে। কাছের আত্মীয় ছাড়া তেমন কাউকে দাওয়াত দিবেন না। বিয়ের মিষ্টি পুরো সোসাইটিতে আয়োজন করে ভাটা হলো। ইসরাতকে যখন আহান মিষ্টির বক্স নিয়ে দিল, তখন মেয়েটা ভীষণ অবাক হলো। মিষ্টি একটা তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,”কীসের মিষ্টি?

আহান তখন নিরুদ্বেগ কন্ঠে আওড়াল,”আরশ ভাইয়া আর অনিকা আপুর বিয়ের মিষ্টি।
হাতে নেওয়া মিষ্টিটা ইসরাত মুখে তুলতে পারল না, আলগোছে রেখে দিয়ে টিস্যুতে হাত মুছে নিল। মুখে কোনো অনুভূতির ছাপ ভেসে উঠল না। শান্ত স্বরে বলল,”যেখান থেকে মিষ্টি তুলে এনেছিস সেখানেই ফেলে আয়।
ইসরাতের কথা মতো আহান তাই করল। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেইঅনিকার খুশি দেখে কে! খুশিতে তার পা মাটিতে পড়ল না। এত বছরের অপেক্ষার ফল সে পেয়েছে। আল্লাহ তাকে খালি হাতে ফিরাননি। গতকাল রাতে আরশ তাকে নক করেছিল, বলেছে দেখা করার জন্য।
মনে মনে হাজারো আশার দানা বেঁধে অনিকা প্রস্তুত হলো আরশের সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু তার আনন্দ উল্লাস মিটিয়ে দিতে আরশ যে অপাশে অপেক্ষা করছে তার মোটেও ধারণা নেই মেয়েটার।

খুশি মনে সিঁড়ি বেয়ে অনিকাকে নামতে দেখে মাহাদি বাদামি, সবুজের মিশ্রণের গভীর চোখগুলো তাকাল। ওইদিকে তাকিয়ে থেকে ভীষণ আফসোস হলো। তার বাবাকে বারবার এই বিয়ে থেকে সরানোর চেষ্টা করেছে সে, এমনকি বোনকেও, কেউই তার কথা কানে তুলছে না। এতবার করে বোঝাল আরশকে বিয়ে করতে মানা করে দিতে, কিন্তু অনিকা ড্যাং ড্যাং করে বিয়েতে রাজী হয়ে গেল। বাবা মায়েরা একটু লোভী প্রকৃতির হয় সেটা মাহাদি জানে, সে নিজেই বাচ্চার বাবা হলে নিজের বাচ্চার ভালো দেখত, কিন্তু যেখানে তার বোন সুখীই হবে না সেখানে কীভাবে ওই বিয়ে সে মেনে নেবে! আরশের সাথে এই বিষয়ে কথা বলেছে সে, আজ যে অনিকার খুশিতে ভাটা পড়বে তা ভেবেই বিরক্তিতে মস্তিষ্ক সহ পুরো দেহ তার ঝাঁঝিয়ে উঠল। তার বোনের জন্য কী পাত্রর অভাব হবে! আরশকে সে জন্মের পর থেকে চিনে! কী পরিমাণ রেড ফ্ল্যাগ ওই ছেলে সে সম্পর্কে ধারণা আছে তার খুব ভালোভাবে। নিজের জিনিস নিজের করে পেতে সবধরণের পথ অবলম্বন করবে, যেখানে নুসরাতের মতো মেয়ে তার এসব সহ্য করতে পারেনি, সেখানে তার নাজুক বোনটা এসব সহ্য করবে কীভাবে! আরশ যখন অনিকাকে মূল্যায়ন না করে অতীত নিয়ে পড়ে থাকবে তখন কার বেশি কষ্ট হবে? ওরই তো! তাহলে এই কথাগুলো মেয়েটা ভাবছে না কেন? আবেগ দিয়ে জীবন চলে না এসব বোঝে না কেন অনিকা! বোনকে শেষবারের মতো বোঝানোর জন্য উঠে দাঁড়াল মাহাদি। ভিক্টরকে সাথে নিবে না বলে জেদ করছে। মাহাদিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভিক্টর নালিশ ঠুকল,”ম্যাম আমাকে তার সাথে নিয়ে যাবেন না বলছেন। উনি নাকি একা একা যাবেন, স্যারের সাথে দেখা করতে।
মাহাদি বোনের দিকে সরাসরি তাকাল। জিজ্ঞেস করল,”ভিক্টরকে সাথে নিচ্ছিস না কেন?
অনিকা ঠোঁট ফুলিয়ে মাহাদির কাঁধ আকড়ে ধরল। বলল,”মাহাদিইই, আমি একা আরশের সাথে দেখা করে আসতে চাই, প্লিজ আজ শুধু একা যাই। প্লিজ..

অনিকার জন্ম ফ্রান্সে হওয়ায় কথা বলতে গেলে ফরাসি এক্সেন্ট উচ্চারিত হয়। মাহাদি নিষ্পলক পানপাতার মতো ঢলঢলে মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। বলল,”বিয়েতে মানা করে দে, অনিকা।
অনিকা নাক ফোলাল। বলল,”না, পারব না।
“আরশ কখনো তোকে সুখী রাখবে না।
অনিকা জেদ ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। ভিক্টর পিছু সরে দু-ভাই বোনকে স্পেস দিয়ে দেয় কথা বলার। মাহাদির পুরুষালি হাত দুটো তুলে নেয় বোনের মুখটা দু-হাতের আজলায়,”অনিকা, বোন আমার, ভাইয়ার জান, না করে দে না বিয়েতে, জেদ করে না সোনা, তুই কেন বুঝতে পারছিস না…

অনিকা মাহাদির দিকে ছলছল নয়নে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে,”তুই কেন বুঝতে চাচ্ছিস না, মাহাদি, আমি এই দিনের জন্য এত বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। আমি আমার ব্যক্তিত্বের বাহিরে গিয়ে চেয়েছি আরশ আর নুসরাতের ডিভোর্স হয়ে যাক, না হয় নুসরাত মরে যাক, নুসরাত মরে গেলে আরশ আমার হয়ে যাবে। তুই দেখতে পাচ্ছিস না, এতদিন পর আমার সুখ এসে আমার কাছে ধরা দিচ্ছে৷ তাহলে তুই কেন তা সরানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস!
“অনিকা আরশ একটা রেড ফ্ল্যাগ, নুসরাতের অবস্থা কী হয়েছিল দেখেছিস? আমার কী হবে তোর কিছু হয়ে গেলে? বোন আমার সময় থাকতে না করেদে। এখনো হাতের বাহিরে কিছুই যায়নি, না করে দে সোনা। ভাইয়ার কথা শোন, ভাইয়া তোকে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর ছেলেটা এনে দিব। তুই চাইলে আমরা…

অনিকা মাহাদির কথা কেটে দিল। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেলার মতো করে বলল,”আমার কাউকে চাই না, আমার আরশকে চাই। এত কষ্ট, এত অপেক্ষার পর আমি ওকে পেয়েছি, আমি নুসরাতের মতো ওকে ছেড়ে দিব না। নিজের করেই নিব! মাহাদি, মাহাদি, শোন আমার কথা, আমি আরশকে আমার করে নিব, বিশ্বাস কর।
মাহাদি অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। বোনকে বোঝানোর চেষ্টা করল,”আরশ কখনো তোর হবে না, অনিকা। তোর লাইফ হেল হয়ে যাবে, ধ্বংস করে দিবে সবকিছু, ভাইয়ের কথাটা রাখ! দেখবি সামনে ভালো কিছু হবে।
অনিকা মাহাদির একটা কথা রাখল না। দু-পাশে মাথা দোলাতে দোলাতে কান্নায় ভেঙে পড়ল। স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল,”আমি এই বিয়েতে মানা করব না। আরশকে আমি বিয়ে করবই। হয়ে যাক আমার জীবন ধ্বংস, আমি শেষ হয়ে যাই, তবুও আমি ওই রেড ফ্ল্যাগ লোকটাকে বিয়ে করব। আরশ শুধু আমার!

দু-হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে হাঁটা ধরল মেয়েটা সম্মুখে। পেছনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা মাহাদির ফিরে তাকায় না সে, যদি ভেঙে পড়ে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়, গলা কাছে দলা পাঁকানো কান্নারা যেন গলা চেপে ধরে আছে, তবুও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে অনিকা৷ সে বিয়ে করবে আরশকে, আরশকে তার হতেই হবে, যেকোনো মূল্যে। অনিকা নিজের নৈতিকতা ভুলে অই লোকের স্ত্রী মরে যাক সেই দোয়া করেছে, এখন সে পিছু হাটবে না।
রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামিয়ে পার্ক করল পার্কিং এড়িয়ায় গাড়িটা। নিজের হ্যান্ড ব্যাগ তুলে নিয়ে হাঁটা ধরল সম্মুখে। ঠোঁটে সৌজন্য মূলক হাসি ঝোলাল। ভেতরে প্রবেশ করে রিসিপশনের দিকে আগাল সে। মেয়েটা জিজ্ঞেস করল,”ম্যাম, কী নামে রেজিস্ট্রার?

“সৈয়দ আরশ হেলাল, অনিকা এহসান খান..
মেয়েটা বলল,”ডানে গিয়ে সোজা চলে গেলে সিঁড়ি পাবেন, ওই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলেই টেরিস পাবেন, আপনাদের টেবিল নাম্বার সিক্সটি!
অনিকা সামান্য হেসে মাথা দোলাল। এক মেয়ে থামিয়ে দিল। অনিকা ভ্রু উচাতেই সে বলল,”চোখে ল্যান্স ইউজ করেছেন ম্যাম?
না ভঙ্গিতে অনিকা মাথা দোলাতেই রিসিপশনের মেয়েটা প্রশংসা করে ওঠে,”আপনার চোখগুলো অনেক সুন্দর, ম্যাম!
ধন্যবাদ জানিয়ে অনিকা চুপচাপ চলে যায় উপরে।
ষাট নাম্বার টেবিল একদম কোণার দিকে৷ শীতের মৌসুম হওয়ায় মিষ্টি রোদ এসে পড়ছে। চেয়ার টেনে বসে পড়ে সে, আরশ এখনো আসেনি। অপেক্ষা করল প্রায় পনেরো মিনিটের মতো। এরপর দেখা মিলল আরশের। কালো হুডি গায়ে ঝোলানো, কালো রঙের ব্যগি প্যান্ট, মুখটা গম্ভীর করে রাখা। দেখে ধারণা করার উপায় নেই এই লোকের বয়স প্রায় ত্রিশ, দিন দিন যেন আরো সুন্দর হচ্ছে। বয়স বাড়ছে না কমছে বোঝার উপায় নেই! অনিকা না চাইতেও চোখ সরিয়ে আনে, এমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে অন্যকে অস্বস্তিতে ফেলা তার সাথে যায় না। তআর নিজেরও বয়স বাড়ছে, কিশোরীদের মতো করলে হবে না। ঠোঁট কামড়ে বসে থাকতেই কানে ভেসে এলো ফরাসি শব্দগুলো,”সালু…(হ্যালো)
অনিকা মাথা নাড়িয়ে, মৃদু হেসে বলল,”সালু!
আরশ চেয়ার টেনে বসল। হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,”দুঃখিত, পনেরো মিনিট লেইট।

“ইট’স ওকে!
আরশ নড়েচড়ে বসল। অনিকার দিকে একবারের জন্য তাকাল না, যেন সামনে মেয়েটা বসে নে,।বলল,” আনুষ্ঠানিকতা বাদ দেই নাইলা..
কথা থামিয়ে দিল মেয়েটা। বলে ওঠল,”নাইলা নই অনিকা!
“হ্যাঁ স্যরি অনিকা..
আরশের স্যরি বলার ধরণ দেখে বোঝা গেল তার মনোভাব পরিষ্কার, ভদ্রতা বজায়ে স্যরি বলেছে সে। গলা খাঁকারির শব্দে নিজের চিন্তা গুলো একপাশে ফেলে কথাগুলো শুনতে ধ্যান দিল সে,”আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়ে কথা বলি, নুসরাত আর আমার ডিভোর্স হয়নি। জানেন সেটা আপনি?
“হ্যাঁ জানি!

“পাপা আমাকে জোর করছে আপনাকে বিয়ে করার জন্য, কিন্তু আমি এই ব্যাপারে রাজী না। ভদ্রলোক আমাকে ইমোশনাল, মেন্টাল, সবধরণের ব্ল্যাকমেইল করছেন যাতে আপনাকে আমি বিয়ে করে নিই। আমি বিয়েতে মানা করলেও শুনছেন না, তাই আপনি এই বিয়েতে মানা করে দিন। আপনি মানা করে দিলে আমি সারাজীবন আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব। আপনাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা আমি দিতে পারব না।
সংকোচবিহীন ঝটপট কথা বলে শেষ করল আরশ। অনিকার পানপাতার মতো মুখটা থমথমে। কঠোর স্বরে বলল,”আপনি নুসরাতকে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করছেন, যেখানে আপনাদের একদিনের ও সংসার হয়নি, সেখানে এই বিয়ের কোনো মূল্যই নেই।
আরশ হেসে ফেলে অনিকার কথায়। কটাক্ষ, শ্লেষ মিশ্রিত চোখ দুটো তুলে শূণ্যে তাকিয়ে রয় দূরে। এক ঝাঁক পাখি উড়ে যায় নীল আকাশে। বিষাদে ভরা কন্ঠে বলে,”সংসার না হলেই বা কী, আমি ওর কথা ভেবে এক জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। কখনো আপনাকে স্ত্রীর জায়গা দিতে পারব না, নিজের প্রাপ্য সম্মান পাবেন না। তারপর ও এমন একজনকে আপনি বিয়ে করবেন?
অনিকা একটুও দ্বিধা করল না আরশের কথার উত্তর দিতে,”জ্বি, হ্যাঁ করব! আমার চাই না স্ত্রীর প্রাপ্য সম্মান, আপনার স্ত্রী হওয়ার আশা পূরণ হবে সেটাই আমার একমাত্র চাওয়া পাওয়া।
“তাহলে আপনাকে স্বাগতম আমার জীবনে, আগেই বলে দিচ্ছি, আমার সম্পত্তির এক ভাগও আমি আপনাকে দিব না, নিনা।

‘“নিনা নই, আমি অনিকা।
আরশ গা ছাড়া কন্ঠে বলল,”নিনা, নাইলা, অনিকা সব একই, একটা বললেই হবে। তাহলে আপনি বিয়েতে মানা করছেন না?
অনিকা এবার একটু দ্বিধায় ভুগল। আরশের দিকে তাকাল, আরশ উঠে দাঁড়াচ্ছে। এতক্ষণ যে তারা বসেছিল এক কাপ কফি এই লোক অর্ডার করেনি, জিজ্ঞেস করেনি তাকে পানি খাবে নাকি না। কী অভদ্র এই লোক! জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে সে ও উঠে দাঁড়াল। প্যান্টের পকেট হাতড়াচ্ছে লোকটা। পকেট থেকে সিগারেট বের করতে নিবে, হাত লেগে কার্ড, ওয়ালেট, মোবাইল পড়ল নিচে। আরশ ঝুঁকে তোলার আগেই অনিকা তুলে নিল। মোবাইলের পাওয়ার বাটনে চাপ পড়তেই স্ক্রিনটা ভেসে ওঠে, ঝাপসা, এক ঝলকের জন্য সে দেখতে পায় একটা মেয়ের ছবি সেখানে, ওইটা কী নুসরাত ছিল! নাকি চোখের ভুল, মোবাইল ফিরিয়ে দিয়ে হাতের ওয়ালেটটার দিকে তাকায়। এখানেও নুসরাত! নুসরাত, নুসরাত, নুসরাত! এই নুসরাত সবজায়গায়! মরে গিয়েও একটা লোককে বেঁধে রেখেছে নিজের সাথে। মেয়েটার হৃৎপিন্ডের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়৷ সে জানে না ওই সময় তার হৃৎস্পন্দন এর কী হয়েছিল, কিন্তু খুব ভালো করে টের পেল আরশ কখনো তার হবে না! যে লোক তার নামকে নিনা, নাইলা বলে, যে লোক প্রাক্তন স্ত্রীর ছবি নিয়ে ঘুরে, যে লোক প্রাক্তন স্ত্রীকে কিছুক্ষণ ভুলে ঘুমাতে ড্রাগ নেয়, যে লোক প্রাক্তন স্ত্রীকে নিয়ে হাঁটতে, বসতে, হ্যালুসেনেশন করে, সেই লোক তার হবে কীভাবে! জিরো % শিওরিটি এই লোক তার হবে!

গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার চোখের সামনে তখনকার ভাবনাটা ভেসে উঠল। গাড়ি রাস্তার পাশে থামিয়ে মাথা ঠেকাল হুইলের উপর। ভদ্রতা খাতিরে ওই লোক জিজ্ঞেস করতেই পারত তাকে, পানি খাবেন? কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করল না। হঠাৎ তার মাথায় একটা ভাবনা আসলো। লাস্ট দেশে আসার পর যখন আরশ আর নুসরাতের ডিভোর্স হলো, তার আগে খবর পেয়েছিল, আরশ তার সেভিংস থেকে ষোলো লাখ টাকা নুসরাতকে দিয়েছে। গুচ্ছির লিমিটেড এডিশনের হ্যান্ড ব্যাগ কিনার জন্য। আর তাকে এক বোতল পানি খাওয়াল না এই লোক। ঘুরে ফিরে এইসব ভাবনা মাথার নিউরণে নিউরণে ঘুরতে লাগল। নুসরাতের সাথে তুলনা করল নিজেকে! কোনদিক থেকে ওই মেয়ের থেকে সে কম, সে তো নুসরাতের থেকে বেশি সুন্দরী, ওই মেয়েই তো তার কাছে দাঁড়ালে অপূর্ণ মনে হবে। সাধারণ বাঙালি এক নারী। কী দেখেছে আরশ ওই মহিলার ভেতর! এতটা পাগল, এতটা ভালোবাসা… থেমে গেল অনিকা, ভালোবাসা.. হ্যাঁ হ্যাঁ আরশ নামক লোকটা নুসরাত নামের মেয়েটাকে ভালোবাসে। তাই তো তার মতো একজন নারী আরশের কাছে কিছুই মনে হচ্ছে না। তার দিকে ওই লোক ফিরে তাকায় না, দেখেও না তার চেহারা। অনিশ্চয়তা কেঁদে ফেলল সে। হাউমাউ করে বদ্ধ উন্মাদের মতো দু-পাশে মাথা দোলাল, আর কাঁদল, বেচারি মেনে নিতে পারল না এসব। মরা এক নারীর কাছে সে হেরে গেছে। হীনমন্যতা ভুগল, মাথা হুইলের উপর বারি মারল। তবুও কান্না থামল না। গ্লাস আটকানো গাড়িতে কান্নার তোড়ে দম আটকে আসছে অনিকার। শুভ্র চেহারাটা লাল হয়ে ওঠল সময়ের সাথে। তবুও কান্না থামল না।

সপ্তাহ খানেক পর…
আদালতে আজ নাহিয়ানের কেসের শুনানি দেওয়া হবে। তাই একদল লোক জমা হয়েছে। গত সপ্তাহে তার বিরুদ্ধে করা প্রতিটা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত করছেন ডিফেন্স লইয়ার। সকাল নয়টা ত্রিশ বাজতেই ভেতরে প্রবেশ ঘটে বিচারকের। তিনি নিজের জায়গায় বসে গম্ভীর স্বরে বলেন,”আদালতের কার্যকর্ম শুরু করা হোক!
ধীরে ধীরে সবাই শুরু করল নিজেদের বয়ান দেওয়া। যেইটুকু নাহিয়ানের উপর অভিযোগ ছিল তা মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে প্রসিকিউটর লয়ারকে কোণঠাসা করে ফেললেন ডিফেন্স লইয়ার। বিচারক যখন নিজের শুনানি দেওয়ার জন্য তৈরি হলেন, বলতে শুরু করলেন,”নাহিয়ান আবরার পূর্বের উপর সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ হওয়ায়…
নাহিয়ান কথা কেটে দিল। বলল,”আমার কিছু বলার ছিল।

গম্ভীর চেহারটা কয়েকদিনে ভেঙে পড়েছে। অগোছালো চুল, কাপড়। সদা পরিপাটি থাকা লোকটাকে দেখলে মায়া হয় সবার। সবার দৃষ্টি চলে গেল নাহিয়ানের দিকে। নাহিয়ান স্বীকারোক্তি দিল আজ পর্যন্ত যা যা করেছে সে, বাচ্চাদের অঙ্গ প্রতঙ্গ পাচার থেকে শুরু করে বিভিন্ন কালো বাজারিতে তার হাত ছিল, বোমা হামলায় তার হাত কতটুকু, সে কতটা জড়িত, সবকিছুর স্বীকার আসল নির্দ্বিধায়। সকল সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিচারক কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। কী বলবেন ভেবে পেলেন না। নাহিয়ানকে থামানোর চেষ্টা করে ডিফেন্স লইয়ার বারবার ইউ্যের লর্ড, মাই লর্ড বললেন, তবুও কিছুতে কিছু হলো না। বিচারক নাহিয়ানের স্বীকারোক্তি শোনে কলম দিয়ে কিছু লিখলেন খাতার মধ্যে। দিনের গুমোট বাতাবরণটা ভেদ করে ভদ্রলোকের গলার স্বর ভেসে এলো,

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৯

“উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, জব্দকৃত আলামত এবং আসামির স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আদালত এই মর্মে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, আসামি নাহিয়ান অধিক হত্যার অপরাধে দোষী। অতএব তাকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অধীনে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। আইন অনুযায়ী তাকে মৃত্যুদন্ডের শাস্তি প্রদান করা হবে শীগ্রই।
আদালতকক্ষে ভারী নীরবতা নেমে এলো। বিচারক শেষবার নথির দিকে তাকালেন। অতঃপর নিচের হাতুরি দিয়ে টক টক করে শব্দ তুলে বললেন,”The case is closed.

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here