মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৮ (২)
jannatul firdaus mithila
চোখেচোখে কথা বলতে হলে চোখের ভাষা জানতে হয়। বুঝতে হয় একে-অপরের মনস্তত্ত্ব! অথচ কান্ড দেখো!সর্বক্ষণ দা-কুমড়োর ন্যায় সম্পর্ক যাদের তারা কি-না আজ চোখেচোখে কথা বলছে! সপ্তদশীর সর্বমুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট। ঘটনাচক্রে ভ্রু-দ্বয় স্থানান্তরিত হয়েছে কপালে, বিস্ময়ে গোল হয়েছে চশমা ঢাকা চোখদুটো। নরম তুলতুলে অধরযুগলের দুরত্ব বেড়েছে খানিক, মৃদু হাওয়ার দুলুনিতে দুলতে থাকা পত্রপল্লবের ন্যায় কাঁপছে সপ্তদশীর গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা ওষ্ঠপুট। নিষ্পলক দৃষ্টি কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে গ্রাউন্ড ফ্লোরের গোলাকার অংশে সটানভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধের পানে। যুবক স্থির!
বলিষ্ঠ হাতদুটো গুঁজে রাখা প্যান্টের পকেটে। শক্তপোক্ত গায়ে ভীষণ কষ্টে চেপেচুপে আছে একখানা কালো রঙা শার্ট। গাঢ় বাদামি চোখজোড়া যেন নিখাঁদ এক ঘন-জঙ্গল! তা দিয়েই যুবক কেমন গভীর দৃষ্টে তাকিয়ে আছে তিন তলার করিডর পানে। ডান-দিকের পিয়ার্সিং করা ভ্রু-টা খানিক উঁচিয়ে রেখেছেন সুদর্শন, বাঁদিকের পিয়ার্সিং করা বাদামি ঠোঁটটা তার আঁটকে আছে ক্যানাইন দাঁতের নিচে। তার মুখভঙ্গি বড্ড শান্ত আজ। যেন খুউব বড়ো এক প্রশান্তিময় কাজ মাত্রই সম্পন্ন করে এসেছেন জনাব। সপ্তদশীর হতবাক চাহনি দেখে আবিভূত মুগ্ধ, আলগোছে ঘাড় নামিয়ে কদম বাড়ালো এলিভেটরের দিকে। ওদিকে সপ্তদশীর দৃষ্টি স্থির, যুবক চক্ষু আড়াল হলেও তার ঘোর ভাঙেনি এখনো। বোকার ন্যায় উঁকি দিয়ে আছে রেলিঙের দ্বারে দাঁড়িয়ে। সময় বোধহয় পেরিয়েছে মিনিট পাঁচেক। এরইমধ্যে একজোড়া ব্যুট পরিহিত কদম আলগোছে এসে দাঁড়িয়েছে সপ্তদশীর সন্নিকটে। অথচ ঘোরে ডুবে থাকা সপ্তদশীর সেদিকে হুঁশ নেই। তবে অচিরেই তার ঘোরের সুক্ষ্ম সুতোয় চিড় ধরল যুবকের কর্কশ কন্ঠে!
“ লাফ দিবি নাকি বান্দীর মেয়ে?”
হুটহাট বাক্যে ভড়কায় মাহি। নিরব মস্তিষ্ক হুট করে ধ্যান ফিরে পাওয়ায় সামান্য কম্পিত হলো সপ্তদশীর ক্ষুদ্র দেহ। দেহের অর্ধেকটা আগে থেকেই রেলিঙের উপরদিকে ঝুঁকে থাকায় মুহুর্তেই বাঁধল আরেক বিপত্তি! দোদুল্যমান ক্ষুদ্র দেহখানি তার, হঠাৎ তাল সামলাতে না পেরে সম্মুখে ঝুঁকে পড়তে গেলেই পেছন থেকে একখানা শক্তপোক্ত হাত এগিয়ে এসে আচমকা সপ্তদশীর পাতলা কোমর আঁকড়ে ধরে শূন্যে তুললো সপ্তদশীর টলমল কদমদুটো। ঘটনাপ্রবাহে ভীতসন্ত্রস্ত মাহি! তৎক্ষনাৎ ভয়ার্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠে, কুঁচকে নিয়েছে চোখমুখ। বোকা সপ্তদশী মুখ গুঁজেছে হাতের আড়ালে। পাদু’টো তার শুন্যে দোদুল্যমান, এহেন অদ্ভুত ব্যাপার অনুভুত হতেই ভয় কাটলো মাহি’র। ধীরে ধীরে হাতের পর্দা সরতে লাগলো তার কোমল মুখখানার ওপর থেকে। চোখদুটো পুরোপুরি অনাবৃত হতেই সপ্তদশীর দৃষ্টি আটকালো সম্মুখে। একি! সে এখনো আগের জায়গাতেই আছে? এখনো পড়ে যায়নি? মাহি কেমন হতবাক হলো। ধীরেসুস্থে ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিজ বদনে দৃষ্টি তাক করতেই দেখল — তার সরু এবং মৃণালতুল্য কটিদেশ আঁকড়ে আছে একখানা শক্তপোক্ত হাতের বাঁধনে। চোখদুটো তক্ষুনি কপাল ছুঁলো মাহি’র। বোকার ন্যায় ঘাড় বাঁকাতেই হুট করে তার সরু নাকের ডগাটা গিয়ে ঘষা খেল যুবকের প্রশস্ত বুকের সঙ্গে। ইশশ্! সপ্তদশী নাক কুঁচকায় ফের। পাতলা নাকের ডগাটা বুঝি এক্ষুণি ভেঙে পড়বে তার। সপ্তদশী হাত দিয়ে অনবরত ডলে যাচ্ছে নাক। পরক্ষণে ঘাড়ের পেশী সামান্য কুঁচকে মাথা তুলতেই চোখাচোখি হলো রূঢ় মানবের বাদামী চোখদুটোর সঙ্গে। ভড়কায় মাহি! শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে আমতা আমতা করতে লাগল বোকা মেয়ে। বোকার ন্যায় বলেই বসল,
“ আপনি? এখানে কখন এলেন!”
সপ্তদশীর এহেন বিস্ময়াহত কন্ঠ শুনেও গম্ভীর মুগ্ধ। তক্ষুনি এক হেঁচকা টানে মাহি’র ক্ষুদ্র বদনখানি রেলিঙের দ্বার থেকে টেনে এনে, এক ঝটকায় আলগা করল নিজ হাতের বাঁধন। গুরুগম্ভীর মুখে স্পষ্ট নাখোশের ছাপ ফুটিয়ে গমগমে গলায় আওড়াল,
“ অতিরিক্ত খুশিতে রেলিঙ টপকে ঝাপ দেবার প্ল্যান করছিলি নাকি বান্দীর মেয়ে?”
হতভম্ব মাহি! চোখদুটো বিরক্তিতায় সরু করেছে পরক্ষণেই। কন্ঠে একরাশ তেঁতো ভাব ঢেলে সে কেমন গাল ফুলিয়ে শুধালো,
“ মুখ খুললেই যা-তা বলতে হয় তাই না মিঃ বিস্ট? আপনাকে কে বলল আমি ঝাপ দেবার পায়তারা করছিলাম?”
সঙ্গে সঙ্গে কোনো প্রতিত্তোর করা মনস্টারের ধাঁচে নেই। আজও তার ব্যতিক্রম হলোনা। যুবক প্রতিত্তোর না করে কেমন শক্ত মুখে প্রস্থান ঘটাতে উদ্যোত হলো। দু’টো কদম সম্মুখে ফেলতেই আবার কি মনে করে থেমে গেল মাঝপথে। শক্তপোক্ত ঘাড়টা সামান্য বাঁকিয়ে রাশভারী কন্ঠে আওড়াল,
“ করিডোরের বা-দিকে লাইব্রেরী! বই পড়তে ইচ্ছে হলে সেখান থেকে পড়বি।”
ছোট ছোট বাক্য দুয়েক আওড়ানো শেষে আর থামেনি রূঢ় মানব। কেমন ধুপধাপ শব্দ তুলে চলে গেল সম্মুখ থেকে। অন্যদিকে অবাকের শীর্ষে দাঁড়িয়ে আছে সপ্তদশী। থমকেছে তার মুখো অভিব্যাক্তি। নির্দয় লোকটা কি বলে গেল? সে লাইব্রেরী বানিয়েছে? কিন্তু কার কথায় বানিয়েছে? মাহি’র সামান্য একটা বই চাওয়ায় বানিয়েছে? একের পর এক প্রশ্ন গিজগিজ করছে সপ্তদশীর মাথায়। তবে উত্তর মিলবার জো নেই তেমন। মাহি সন্দিগ্ধ ভঙ্গিমা ফুটিয়েছে সর্বমুখে। কপালের চামড়া গুছিয়ে আপনমনে ভাবছে —
“ আপনার ইদানিং এর কর্মকাণ্ডগুলো বড্ড রহস্যময় ঠেকছে মিঃ বিস্ট। পরিশেষে কি করতে চাচ্ছেন আপনি?”
হাওয়ার বেগ বাড়ছে ক্রমশ। বিশাল আকাশের বুকে মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুৎ ঝলকানি। কয়েকজোড়া সর্তক কদম ধীরে ধীরে এগোচ্ছে জঙ্গলের দূর্গম পথ দিয়ে। পরনে বিদঘুটে কালো রঙা ব্যাগি প্যান্ট, একইরঙা শার্টখানা ইন করে রাখা পেটের ধারে। হাতে বিশাল স্নাইপার, যার গোড়া ঠেকিয়ে রাখা প্রত্যেকের বুকের কাছে। সবার মুখ ঢেকে আছে সবুজ রঙের পাতলা রাউন্ড মাস্কে। ভেজা পথে এগোচ্ছে তারা। পায়ের ব্যুটজুতোর পাটাতন পানিভর্তি কাঁদায় পড়তেই চপচপ শব্দ তুলছে চারপাশে। প্রত্যেকে বড্ড সর্তক। বারংবার ঘাড় বাকিয়ে এদিক-ওদিক দৃষ্টি বুলাচ্ছে। আর কিছুটা এগোলেই মনস্টার’স হিডেন প্যারাডাইস। গন্তব্যস্থল খুব বেশি দূরে নেই বুঝতেই সকলের চোখদুটো কেমন চিকচিক করে উঠল খুশিতে। পায়ের গতিতে আরও খানিকটা জোর ঢেলে তারা কেমন এগোচ্ছে দেখো। বিশাল বিশাল ওক গাছগুলোকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই বা-দিকের মস্তবড়ো ওক গাছের পেছন থেকে ঘাড় বের করে আনে আরেক সুদর্শন। মুখাবয়বে একরাশ শঙ্কিত ভাব ঢেলে সে কেমন আপনমনে বিড়বিড় করল,
“ কারা এরা? আমাদের আগে মনস্তারের প্যালেসে হামলা চালাতে চলে এলো যে! কমান্ডার তো এ বিষয়ে কিছুই বললো না।”
K.M (Kill Monster) মিশনে কর্মরত জাপানিজ সুদর্শন, কমান্ডার মায়াঙ্ক পাঠানের তত্বাবধানে ঘাঁটি বেঁধেছে এই গহীন জঙ্গলে। শুধু কি সে? তার সঙ্গে যে আরও ১৫জন আছে। তবে যুবক এ অন্ধকারে বেরিয়েছিল গুপ্ত পথ খুঁজতে। কিন্তু মাঝপথেই তার চোখ আটকালো অন্য কিছু অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের দিকে। তারা কেমন বিচক্ষণতার সঙ্গে এগোচ্ছে প্যালেসের দিকে। জাপানিজ সুদর্শন কিয়তক্ষন একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। ভাগ্যিস অন্ধকার ছিলো! নয়তো বেচারা ঠিক ধরা পড়তো। এমনিতেই গায়ে যা জেল্লা তার। যুবক তক্ষুনি পা চালায় উল্টোপথে। এহেন গরম একটা খবর কমান্ডারের কানে না পৌঁছুলে কি আর চলে?
জঙ্গলের আদ্যপ্রান্তে পা রাখতেই আকাশের বুক চিঁড়ে ঝপঝপিয়ে নামলো মুষলধারে বৃষ্টি। সাতজন অস্ত্রধারী যোদ্ধারা তৎক্ষনাৎ নিজেদের স্নাইপারের চাবিতে টান বসালেন। একযোগে লম্বা এক নিশ্বাস টেনে, সাহস যোগালেন বুকভর্তি। অতঃপর পূর্ব অবগতদের ন্যায় একযোগে পা ঘোরালেন প্যালেসের পেছন দিকে। প্ল্যান মতে তারা প্যালেসে ঢুকবেন পেছনের রাস্তা দিয়ে, যা থেকেই তাদের জন্য উম্মুক্ত করে রাখা হয়েছে। প্রায় মিনিট তিনেক ধরে হাঁটছেন বলিষ্ঠদেহী সাতপুরুষ। আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে কাউকেই তেমন দেখতে না পেয়ে কপাল গোছালেন দুয়েকজন। কেউ কেউ তো ইতোমধ্যেই নিজ মনে প্রশ্ন ছুড়েঁছে,
“ এতোবড় একটা প্যালেসের পেছনদিকে গার্ড নেই কেনো?”
মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া প্রশ্নের সঠিক উত্তরের অপেক্ষা করেননি কেউই। উল্টো নিজেদের ভাগ্য ভালো এরূপ মেকি দোহাই দিয়ে এগোলেন সামনে। পথ শেষ! পা ঘুরিয়ে যেই না সকলে প্যালেসের পেছন দরজার পানে ঘুরবে ওমনি সম্মুখে এক মুখোশধারীকে দেখে থমকে গেলেন সবাই। প্যালেসের পেছন দরজার দুটো সিঁড়ির উপরে বিশাল দেহ নিয়ে বসে আছেন এক বলিষ্ঠদেহী। গায়ে স্রেফ কালো রঙা ওভারকোট, তার ভেতরে কিচ্ছু নেই। উদোম ফর্সা পেটানো দেহখানা স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর। যুবকের মাথার ওপর গোলাকার টুপি! সম্পূর্ণ মুখমন্ডল কালো রঙা মাস্কের খোলসে আবৃত। সে কেমন বসে আছে মাথা নুইয়ে। একহাতে তার একখানা চকচকে সিলভারের কুড়াল, মাঝেমধ্যে ঘটে যাওয়া বিদ্যুৎ ঝলকানিতে তকতক করে ওঠে সিলভারের তীক্ষ্ণ ত্বক। যুবককে ওমনভাবে বসে থাকতে দেখে ভয়ে তটস্থ সাত যোদ্ধা! কারো কারো হাঁটুর হাড় টলমল, কারো বা হাতের। কেউ কেউ এতো বৃষ্টির মধ্যেও ঢোক গিলছে বারংবার। তবে সাতজনের মধ্যে একজন বোধহয় বীরপুরুষ। অদূরের ভয়ংকর মানবকে বিলকুল তোয়াক্কা না করে তক্ষুনি হাতে থাকা স্নাইপারের চাবিতে আঙুল ঢোকালেন তিনি। বন্দুকের ধাতব নলটা যুবকের পানে তাক করে কন্ঠ উঁচিয়ে হুংকার ছুঁড়ে বললেন,
“ হু দ্য ফা’ক ইউ্য আর?”
কথাটা আওড়ানোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বীরপুরুষের কপালের ঠিক মধ্যিখানে সম্মুখ থেকে উড়ে এসে বসল ধারালো কুড়ালের কোপ। চোখের পলকে ঘটল ঘটনাটা! পাশে থাকা ছ’জন বোধহয় হতভম্বতায় ডুব দিয়েছেন একযোগে। এদিকে বীরপুরুষ ততক্ষণে দূর্বল হয়েছে। বলিষ্ঠ হাতদুটো হারিয়েছে কর্মক্ষমতা! দূর্বল টলমল পাদু’টো দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না আর। তক্ষুনি হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল ঘাস আবৃত জমিনে। পানিতে থৈথৈ করছে চারপাশ! সে পানিতে বীরপুরুষের উষ্ণ তাজা লহু মিলেমিশে একাকার হলো। কপালের মধ্যিভাগ চিঁড়ে ফিনকি দিয়ে গড়াচ্ছে লহু, ব্যথায় অবশ হয়েছে সম্পূর্ণ মস্তক। বাদবাকি ছ’জনের ঘোর ভাঙল এতক্ষণে। সঙ্গীর এরূপ করুণ দশা দেখে তারা বড়ো উদ্বিগ্ন হলো। তৎক্ষনাৎ নিজেদের স্নাইপারের ধাতব নল অদূরের যুবক পানে তাক করতেই পেছন থেকে বেশ কয়েকজন এগিয়ে এসে আচমকা ছ’জনের মাথার খুলি বরাবর চেপে ধরল বন্দুকের নল। এক গম্ভীর পুরুষ পেছন থেকে কটমট কন্ঠে শুধালেন,
“ পুট ইউ্যর গান ডাউন বাস্টার্ডস।”
মুহুর্তেই স্থির হলেন যোদ্ধারা। হাতে থাকা স্নাইপারের চাবি থেকে সরিয়ে নিলেন আঙুল। ওদিকে সিঁড়ির ওপর বসে থাকা বলিষ্ঠ পুরুষ এতক্ষণে নড়েচড়ে উঠে বসলেন বসা ছেড়ে। ভীষণ দাম্ভিকতার সাথে দু’হাত পকেটে পুরে এগোলেন কয়েক কদম। ব্যুট পরিহিত পাদুটো কেমন দাম্ভিকতার সঙ্গে পিষে যাচ্ছে পানিভর্তি ঘাসের গা। মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কালো রঙা টুপিটার গায়ে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তেই তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে চারপাশে। দাম্ভিক পুরুষের গা ভিজে একাকার অবস্থা! তবুও বৃষ্টির পানির কি আর ওতো সাধ্যি আছে দ্য শ্যাডো মনস্টারকে কাবু করার? সে পারেনি। অদম্য যুবক হুট করেই পা থামালেন ভিজে জমিনে হাঁটু গেঁড়ে কাতরাতে থাকা বীরপুরুষের মুখোমুখি এসে। ঘাড়টা সামান্য কাত করে সে আলগোছে হাত রাখল কুড়ালের হাতলে। অতঃপর মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে মুখ নামিয়ে আনলো বীরপুরুষের মুখের কাছে। আহত মানবের দৃষ্টিযুগল নিবুনিবু। সে দৃষ্টিতে নজর রাখল মনস্টার। মাস্কের আড়ালে এক অদ্ভুত অহংকারী কন্ঠে ভীষণ শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“ ওয়ান্না নো হু দ্য ফা’ক এম আই? দ্যান লিসেন — আ’ম ইউ্যর ফা’কিং ড্যাডি।”
কথাটা শেষ করা মাত্রই যুবক শীরঁদাড়া সোজা করে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর একটানে আহতের কপাল থেকে কুড়ালটা বের করে আনতেই আহত কেমন চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়ল সিক্ত জমিনে। সে-কি আর্তনাদ তার! থরথর করে কাঁপছে সর্বাঙ্গ। নির্দয় মানব সরু চোখে দেখল তা। পরক্ষণে এগিয়ে এসে জোরালো চাপে নিজ ডান পায়ের ব্যুট জুতোর স্যোল ঠেকাল আহতের বুক বরাবর। বিরতিহীন কায়দায় একের পর এক কুড়ালের ঘা এ ছিন্ন ভিন্ন করতে লাগল বীরপুরুষের বক্ষপিঞ্জর। প্রতিটি ঘায়ে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে আহত যুবকের লহু। পরাণ পাখি এতক্ষণে নিশ্চয়ই দেহ খাঁচা থেকে উড়ে গিয়েছে তার। তবুও নির্দয় মাফিয়া বিস্ট থামছেনা। নিজ জোরালো শক্তিতে ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছেন আহত যুবককে।
প্রায় মিনিট পাঁচেকের পৈ শা চি ক ক র্ম কাণ্ডের পর থামল মুগ্ধ। র ক্ত রঞ্জিত ধারালো কুড়ালটা হাতে নিয়ে আলগোছে ঘাড় কাত করে তাকাল পাশে। বাকি ছ’জন যুবকের ওমন ঘাড় বাঁকানো দেখে নিশ্বাস আঁটকে নিয়েছেন বোধহয়। নিজেদের বাঁচানোর একমাত্র সম্বল হিসেবে নিয়ে আসা স্নাইপার বন্দুকগুলো ইতোমধ্যেই হাতছাড়া হয়েছে তাদের। এ নিয়ে যন্ত্রণার শেষ নেই বেচারাদের। মুগ্ধ কেমন গাল বাঁকাল মনে হচ্ছে! মাস্কের আড়ালে তা অবশ্য অস্পষ্ট। যুবক পা এগোচ্ছে বাকিদের দিকে। তার ফর্সা উদোম পেটানো দেহখানায় ছিটেফোঁটা র ক্তের উপস্থিতি বড্ড জোরালো। ফর্সা হাতদুটোর অবস্থাও একই। তাকে সম্মুখে অগ্রসর হতে দেখে বাকি ছ’জন কেমন হাউমাউ জুড়েছে দেখো। দু’জন তক্ষুনি জ্ঞান হারানোর নাটক জুড়ে জমিনে ছেড়েছে গায়ের ভর। মুগ্ধ প্রতিক্রিয়াহীন। বিরতীহীন কদমে এগিয়ে এসে আচমকা পায়ের রুষ্ট চাপে পিষে ধরল জমিনে নাটক করে পড়ে থাকা যুবকের বুক। যুবক তক্ষুনি আর্তনাদ জুড়ল। দু’হাতে খামচে ধরল মুগ্ধের ব্যুট পরিহিত কদম। গলায় ভীষণ অপরাধীত্ব ঢেলে করুণ অনুনয় জুড়ে বলল,
“ মা’রবেন না। প্লিজ মা’রবেন না। ক্ষমা করুন মনস্তার!”
মাথা ঝাঁকায় মুগ্ধ। ডান দিকে হাত বাড়াতেই গম্ভীর মুখো এডউইন নতমুখে মনস্টারের দিকে এগিয়ে দিলো একখানা রাশিয়ান বেস্ট স্নাইপার বন্দুক। মুগ্ধ একটানে বন্দুকটা কাঁধে তুলে চাবিতে টান বসালো। পরমুহূর্তেই বন্দুকের ধাতব নল দিয়ে বেরুলো বৃষ্টির ন্যায় অগ্নি সীসা। আগুনের ছাপ ফুটিয়ে বিকট ধ্বনিতে বিদ্য হতে লাগল পড়ে থাকা যুবকের গায়ে। মুহুর্তেই ঝাঁঝরা হয়ে গেল যুবকের বক্ষপিঞ্জরসহ সর্বাঙ্গ। দীর্ঘক্ষণ অগ্নী সীসা বর্ষণে লালাভ আবরণ ফুটেছে স্নাইপারের নলে। মুগ্ধ থামল এবার। বন্দুকের গোড়া কাঁধে ঠেকিয়ে রেখেই ঘুরে দাঁড়াল বাকিদের দিকে। তক্ষুনি থরথর করে কেঁপে ওঠে বাকিরা। মুগ্ধ ঠোঁট কামড়ে হাসলো বোধহয়। শত্রুদের চোখে ভয় এবং কাতরতা দু’টোই বড়ো পছন্দ তার। যুবক রয়েসয়ে এগিয়ে এলো বাকিদের দিকে। চারজন যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে একসঙ্গে। প্রত্যেকের হাতদুটো পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা। মুগ্ধ সম্মুখে থাকা ব্যাক্তির মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো। সম্মুখের বলিষ্ঠদেহীর তুলনায় উচ্চতায় পাহাড়সম হওয়ায় সে নিজ উদ্যোগে ঘাড় নামালো খানিক। অতঃপর লোকটার বুকের কাছে নজর রেখে হাত উঁচিয়ে এক অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ হ্যালো নিক! হাউ আর ইউ্য?”
ক্যামেরার ওপাশে থাকা সুদর্শন কেঁপে উঠল তক্ষুনি। তড়িঘড়ি করে এক ঝটকায় কয়েক কদম সরে দাঁড়ালো বিশালাকার টিভির সম্মুখ হতে। সাতজন লোকের শার্টের বোতামের সঙ্গে হিডেন ক্যামেরা পাঠিয়েছিল সে। উদ্দেশ্য ছিলো মনস্টারের প্যালেস অব্ধি পৌঁছানোর সকল গুপ্ত রাস্তা সম্বন্ধে জানা। তবে মনস্টার যে তার চাইতেও বিচক্ষণ! কি সুন্দর করে ধরে ফেলল ব্যাপারটা। ওদিকে মনস্টার কেমন বিকট ধ্বনিতে হাসছে দেখো! হাসতে হাসতেই একপর্যায়ে হুট করে থেমে গেল সে হাসি। ক্যামেরার দিকে আবারও আড়ালে থাকা দৃষ্টি তাক করে তাকিয়ে রইলো নিরবে। ওপাশে থাকা নিক ভড়কায় ফের। তক্ষুনি এগিয়ে এসে সুইচ অফ করল টিভির। রাগ-ক্ষোভে এক আছাড় বসালো হাতের রিমোটটায়। দাঁতে দাঁত চেপেছে যুবক। রাগে কাঁপছে শরীর। গলায় চিৎকার উঁচিয়ে বলতে লাগল,
“ এটাই শেষ নয় মনস্তার! এটাই শেষ নয়। মনে রাখবি, তোর জন্য শেষ চালটা আমিই চালব। তোকে কিভাবে ধ্বংস করতে হয় তা আমি ঠিক খুঁজে বের করব।”
সর্বাঙ্গে অন্যের উষ্ণ লহুর ছিটেফোঁটা! হাতে এখনো র ক্তা ক্ত কুড়াল। যা হতে চুইয়ে পড়ছে লহু। মনস্টার নামক নির্দয় মানব দাড়িয়ে আছে গ্রাউন্ড ফ্লোরের চার সিঁড়ির নিচের লাউঞ্জে। বেসমেন্টের দুয়ার খোলা হয়েছে। ক্ষুধার্ত মাং সাশী হাঙর গুলো মানব শরীরে তাজা লোহুর ঘ্রাণ পেয়ে উম্মাদের ন্যায় লাফাচ্ছে। লাফানোর গতি বড্ড তীব্র তাদের, সুইমিংপুলের পানিগুলো কেমন উপচে পড়ছে বাইরে। ভয়ার্ত এডউইন গা বাঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুইমিংপুল থেকে চার হাত দুরত্বে। বেচারা হাওরগুলোকে বড্ড ভয় পায়। কয়েকজন সেফটি স্যুট পরুয়া গার্ড ধীরেসুস্থে ছিন্নভিন্ন মানব দে হ গুলো ধীরেসুস্থে ফেলে দিচ্ছেন সুইমিংপুলে। খাবার পেয়ে কি খুশিটাই না হয়েছে হাঙরগুলো! ধারালো দাঁতের কটমট শব্দ তুলে কেমন কুড়কুড়িয়ে চিবুচ্ছে মানব হাড়। সে শব্দ কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই গায়ে হিম ধরে গেল এডউইনের। ভয়ার্ত মানব ফের কদম পেছালেন আলগোছে।
লাউঞ্জের চার নম্বর সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া বিস্ট একদৃষ্টে দেখছে সব। গা এখন পুরোপুরি উম্মুক্ত তার। নাভি কমলের বড্ড নিচে ট্রাউজারের স্থান। পেটের ছয়টি হাড় সুস্পষ্ট তাতে। তার সর্বাঙ্গে লেপ্টে আছে তাজা লোহু, একহাতের আঙুলের ভাঁজে সিগার চেপে ফুঁকছে অনবরত। যুবকের ঘাড় সমান এলোমেলো সিক্ত বাদামী চুলগুলো কোনরকমে টেনেটুনে ঝুঁটি বেঁধে রাখা। বেশ সময় নিয়ে বৃষ্টি ভেজায় যুবকের গায়ের ত্বক বুঝি আজ চাদেঁর স্নিগ্ধতাকে হার মানাবে। শুভ্র রঙা মুখখানায় বাদামী ঠোঁটজোড়া যেন এক দক্ষ কারিগরের হাতে তৈরী নিখুঁত ভাস্কর্য। যুবক আলগোছে পা নামায় সিঁড়ি থেকে। দাম্ভিক কদমে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো এডউইনের ঠিক পাশে। এদিকে তার উপস্থিতি পেয়ে তক্ষুনি নড়েচড়ে দাঁড়ায় এডউইন। বাধ্যতায় নুইয়ে নেয় ঘাড়। মুগ্ধের কুঞ্চিত দৃষ্টি সম্মুখে। সিগারে লম্বা লম্বা টান বসিয়ে সে কেমন গম্ভীর গলায় আওড়াল,
“ জাস্ট ইমেজিন এডউইন, হাঙরদের খাবার হিসেবে আজ ছিন্নভিন্ন মানব দে হে র বদলে তুই থাকলি! তাও আবার জীবন্ত অবস্থায়। ওরা তোর হাড়গোড় কুড়কুড় শব্দ তুলে ভাঙল। তোর সর্বাঙ্গ নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করে যে আগে পেলো সে খেলো। ব্যাপারটা কেমন হয় বলতো? ইন্টারেস্টিং না?”
ভয়ে আত্মা উড়ে যাবার যোগাড় এডউইনের। বেচারার পাদু’টো কাঁপছে থরথর। ভাগ্যিস ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে ছিলো, নয়তো ইজ্জতের ফালুদা হতে খুব একটা সময় লাগতো না। এডউইন ঢোক গিলল শুকনো। তক্ষুনি হড়বড়িয়ে অনুনয় জুড়ে বলল,
“ ক্ষমা করুন মনস্তার! ক্ষমা করুন। এমন চিন্তাভাবনা আমি দুঃস্বপ্নেও করতে পারব না।”
মুগ্ধ প্রতিক্রিয়াহীন! সিগারে টান বসাতে বসাতে আচমকা মনটা লাফিয়ে উঠল কাউকে একপলক দেখার জন্য। তবে রূঢ় মানব নিজের এরূপ ইচ্ছেকে পরাস্ত করলেন। কপাল গুছিয়ে একের পর এক লম্বা লম্বা টান বসালেন সিগারে। তবে বালাইষাট! তার বেহায়া মনের উচাটন বাড়ছে বৈ কমছে না মোটেও। মস্তিষ্ক বড়ো বিরোধ করলেও মন ছুটে যাচ্ছে বেহায়া চিন্তায়। একপলক দেখতে চাচ্ছে ঘাড়ত্যাড়া মেয়েটাকে। মন-মস্তিষ্কের এরূপ দোলাচালে অবশেষে মস্তিষ্ক ক্ষুব্ধ হলো। আগুন জ্বালিয়ে দিলো যুবকের মাথার তালুতে। গা ভর্তি রাগ ঢেলে দিলেও যুবকের মন নিজ বাক্যে অটল। অবশেষে মুগ্ধ রাজি হলো। একপলক মেয়েটাকে দেখে নিলে কি’বা হয়ে যাবে? মন এরূপ কথা তুললেও মস্তিষ্ক ফোড়ন কাটলো ফের। আচমকা নির্দয় মানবকে বলল,
“ ঠিক আছে! যা, ঐ বান্দীর মেয়েকে দেখে আয় একপলক। হাতে কুড়ালটা নিয়ে যাবি। দরকার পড়লে আজকেই ওর সানডে-মানডে ক্লোজ করে ফেলবি।”
প্রস্তাবটুকু বুঝি বড্ড মনে ধরল রূঢ় মানবের। এহেন চিন্তার পরিক্রমায় সে পা ঘোরায়। সিগারের কলুষিত ধোঁয়া মুখপুরে নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়তে ছাড়তে এগোলো এলিভেটরের দিকে। পেছন থেকে আড়দৃষ্টে তাকিয়ে আছে এডউইন। যুবকের ঠোঁটের কোণে কেন যেন হুট করেই ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ।
শীতল আবহে ছেয়ে আছে মৃদু আলোয় ডুবে থাকা কক্ষটা। সিক্ত দেহ নিয়ে কক্ষে ঢুকল মুগ্ধ। ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজেছে চার নম্বর মোটা সিগার। বাহাতে তার এখনো ধরে রাখা ধারালো কুড়ালটা। সে নিরবে এগোচ্ছে বিছানার ধারে। আজও বিছানার চারপাশে সফেদ রঙা মসলিন ফিনফিনে পর্দা ফেলে রাখা। যার ওপাশ দিয়ে মৃদুমন্দ দেখা যাচ্ছে সপ্তদশীকে। মুগ্ধ শক্ত করল চোয়াল। হাতের মুঠোয় চেপে রাখা কুড়ালের হাতলটা আরেকটু তুলে নিলো ওপরে। অতঃপর এগিয়ে এসে ডানহাতে আলতো করে পর্দাগুলো সরিয়ে ঘুমন্ত সপ্তদশীর পানে শক্ত দৃষ্টি তাক করতেই ফের দৃষ্টিতে পরিবর্তন নামলো মুগ্ধের। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের উপচে পড়া হিং স্র তাটুকু সরে গিয়ে সেথায় লেপ্টে গেল একরাশ মুগ্ধতা। কপালের চামড়ায় নামলো অদ্ভুত শিথিলতা। শক্ত চোয়ালখানা ছেড়ে দিলো পেশীগুচ্ছ। ঠোঁটের ফাঁকে জ্বলতে থাকা সিগারটা নিজে নিজেই ক্ষয় হতে লাগল। হতবিহ্বল যুবক টান বসাতে ভুলে গিয়েছে বোধহয়। বাহাতের শক্ত মুঠো ক্রমশ নরম হচ্ছে।
ধারালো কুড়ালের হাতলখানা হাতের মুঠো থেকে অবহেলায় গড়িয়ে পড়তে নিলেই যুবক শেষ সময়ে ধরে ফেলল তাকে। মুখাবয়বে একরাশ প্রশান্তি ঢেলে সে মেরুদণ্ড বাঁকাতেই হুট করে তার দৃষ্টি গিয়ে আটকালো কাত হয়ে শুয়ে থাকা সপ্তদশীর দু’হাতের বাঁধনের পানে। ঘুমন্ত মাহি’র বালিশের একপাশে একখানা খোলা বই, বোধহয় বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে মায়াবিনী। চোখ থেকে এখনো চশমা খোলা হয়নি তার। যুবক ভ্রু গোটায়। আলতো করে ডানহাতটা সম্মুখে বাড়িয়ে, ধীরে সুস্থে ঘুমন্ত মাহি’র চোখের ওপর থেকে চশমাটা খুলে এনে রেখে দিলো বইয়ের ওপর। যুবক হয়তো নিজেও জানেনা তার এমনটা করার কারণ। তাছাড়া জানবেই বা কি করে? সে-তো ইদানিং মেয়েটার কাছে এলেই দিনদুনিয়া ভুলে বসে। মুগ্ধ ঘুমন্ত সপ্তদশীর দিকে আরেকটু ঝুঁকে আসতে গেলেই হঠাৎ মাহি’র নরম বক্ষপিঞ্জরের কাছ থেকে খানিক দুলে উঠল পশমি কিছু। মুগ্ধ স্থির হলো তক্ষুনি। কপাল কুঁচকে ঘাড় কাত করতেই দেখল — কিউটি ঘুমচ্ছে মাহি’র উষ্ণ আবেশে।
হুট করেই মাথার তালু জ্বলে উঠল মুগ্ধের। প্রাণীটা কেন মাহি’র বুকে গিয়ে ঘুমবে? বিছানায় কি জায়গার অভাব পড়েছে? মুহুর্তেই নাকের পাটা ফুললো মুগ্ধের। নাকের সরু ছিদ্র দিয়ে বের হচ্ছে রাগান্বিত ধোঁয়া। দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করেছে মুগ্ধ। এক অদ্ভুত হিংসায় জ্বলতে থেকে কেমন হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত কিউটির বেরিয়ে থাকা একপা ধরে আলগোছে টেনে বের করে আনল মেয়েটার উষ্ণ আবেশ থেকে। অতঃপর নিজ রুক্ষ হাতের আঙুল দিয়ে ঘুমন্ত কিউটির লেজের দিকে সামান্য চাপ দিতেই ছোট্ট এক নলাকার মাংসপিণ্ড বেরিয়ে এলো। তা দেখামাত্রই গা-পিত্তি জ্বলে উঠল মুগ্ধের। কতোবড় সাহস, একটা ব্যাটা জাত প্রাণী তার বান্দীর মেয়ের বুক ঘেঁষে ঘুমচ্ছে। রাগে সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করছে শ্যাডো মনস্টার। তাও আবার নিজ অজান্তে এক ভিত্তিহীন কারণে। সে তৎক্ষনাৎ নিজ রুক্ষ হাতের মুঠোয় ঘুমন্ত পশমি বোবা প্রাণীটাকে আঁকড়ে ধরল। কিউটির নরম তুলতুলে গালে আঙুলের টোকায় থাপ্পড় দিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ এ্যাই বান্দীর ছেলে ওঠ! ওর বুকে কি তোর?”
হুটহাট আক্রমণে ঘুম ভাঙল কিউটির। লালচে চোখদুটো ধীরে ধীরে খুলছে সে। একপ্রকার অবোধের ন্যায় তাকাল সম্মুখে। মুগ্ধ ফোঁস ফোঁস করে গালমন্দ করছে কিউটিকে। অথচ ছোট্ট পশমি কিউটি থোড়াই বুঝলো রূঢ় মানবের চাপা স্বরের খিটমিট বাক্য! বেচারা কেমন নিবুনিবু চোখে ঢুলছে দেখো। চোখ ভর্তি রাজ্যসম ঘুম তার। মালকিনের উষ্ণ বক্ষদেশে মুখ লুকিয়ে সে-কি প্রশান্তির ঘুম ঘুমচ্ছিল বেচারা, তবে সে সুখ কি আর দীর্ঘস্থায়ী হয়! কার পাকা ধানে সে মই দিয়েছিল কে জানে! বেচারাকে ঘুমের মধ্যে ওমন টেনেহিঁচড়ে মালকিনের উষ্ণ আলিঙ্গন থেকে বের করে আনাটা কি খুব দরকার ছিল? কিউটি এখনো ঢুলছে! এরইমধ্যে মুগ্ধের শক্তপোক্ত হাতের রুক্ষ মুঠো আচমকা কিউটি বেচারাকে শূন্যে তুলে নিলো। এরূপ অতর্কিত কান্ডে ভড়কায় কিউটি। চোখদুটো বিস্ফোরিত আকারে খুলে রাখতেই সম্মুখে দেখল এক সুদর্শন পা গ ল হিউম্যান তার দিকে কেমন কেমন কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সে বলছে,
“ প্রাণে বাঁচতে চাইলে আমার চাশমিসের কাছ থেকে যথাসম্ভব দূরে দূরে থাকবি বান্দীর ছেলে! খবরদার যখন-তখন ওর গা ঘেঁষবি না। বুকের কাছে তো ভুলেও এগোবি না। নাহলে এক আছাড় মে’রে না ড়ি ভু ড়ি বের করে ফেলব। মাইন্ড ইট!”
ছোট্ট পশমি মানব ভাষা জানেনা। মুখ গহব্বরে জিভ থাকা স্বত্বেও মানব ভাষা উচ্চারণ করার প্রয়োগ সম্বন্ধে অবগত নয় সে। নয়তো বেচারা বোধহয় এক্ষুণি প্রতিত্তোরে বলত,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩৮
“ কেন বে তাড়ছ্যাড়া হিউম্যান? আমার আম্মুর বুকে আমি যাব, তাতে তোর বাপের কী? তুই কি আমার বাপ লাগিস যে আমায় এভাবে ধমকাচ্ছিস? নিজে যেতে পারবি না আর আমি যাচ্ছি বলে জ্বলে তাই না?”
