Home বাবুই পাখির সুখী নীড় বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৪

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৪

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৪
ইশরাত জাহান

শোভাকে বিছানার উপর বসিয়ে দেয় দর্শন।শোভার সামনের দিকে চলে আসা লম্বা চুলগুলো আঙুলের ভাজে নিয়ে শোভার চোখের দিকে তাকালো।শোভা স্তব্ধ হয়ে দেখছে দর্শনকে।চুলগুলো পিছনে সরিয়ে দেয়।শোভা ডাগর ডাগর চোখে দেখছে শুধু।মনে মনে বলে,“তবে এটাই কি ভালোবাসা?যেটা আমি ওনার থেকে চেয়েছিলাম।”
খাবারের প্লেট শোভার সামনে রেখে দর্শন বলে,“আমার দিকে এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তোমার সারারাত কেটে যাবে ওয়াইফি।তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।কারণ আমার দিকে তাকাতে তাকাতে এক সময় তুমি আমার প্রেমে পড়ে যাবে।কিন্তু আমার দিকে তাকাতে গিয়ে যে রাতের খাওয়া ভুলে যাচ্ছ এতে আমার সমস্যা আছে।আমার এই স্লিম ওয়াইফি আরো বেশি রোগাটে হয়ে যাবে।এমনিতেও তুমি মাসের কুড়িদিন থাকো অসুস্থ,দুর্বল।এবার না খেয়ে থাকলে তো শরীরের এমন অবস্থা হবে যে সামান্য বাতাস এলেই তুমি আমার সামনে থেকে হাওয়া হয়ে যাবে।”

দর্শনের কথা শুনে শোভা চটে গেলো।ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,“আমি রোগা,আমি দুর্বল!”
“এই তো তুমি নিজেই স্বীকার করলে।”
“কোথায় স্বীকার করলাম?”
“নিজ মুখেই তো বললে তুমি রোগা,তুমি দুর্বল।”
“আমি স্বীকার করিনি আমি বলছি আপনি আমাকে এগুলো বললেন।”
“এবার থেকে কি আমার কথাগুলো তুমি রিপিট করে দিবে?দেটস ইন্টারেস্টিং।আমার ওয়াইফি আমার কথাগুলো আওড়াবে।”
“আপনি কথা পাল্টাচ্ছেন।”
“কখন পাল্টালাম?”
“এই তো এই মাত্র।আপনি আমার কথার অন্য অর্থ বের করছেন কিন্তু।”
“আমি কখন আমার ওয়াইফির কথার অন্য অর্থ বের করলাম?”
“আপনি আমাকে রোগা,দুর্বল বলে আবার তাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমার উপর মজা নিচ্ছেন।”
“হুশ!ওয়াইফির উপর মজা নেওয়া যায় নাকি?আমি তো ওয়াইফির পিছনে থাকতে চাই।”
শোভা চোখ বড় বড় করে বলে,“আপনি খুব চালাক।”
দর্শন বাকা হাসি দিয়ে বলে,“যদিও আমি জানি আমি চালাক।চালাক নাহলে তো দেশের বাইরেও আমার শোরুম থাকতো না।তবুও তোমাকে এরজন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ওয়াইফি।দিনশেষে তোমার থেকে ভালো একটা কমেন্ট তো পেলাম।”

শোভা ভেংচি কেটে বলে,“আমি ভালো কমেন্ট করিনি।”
“কাউকে চালাক বলা কি খারাপ কমেন্ট?”
“না,আপনাকে উদ্দেশ্য করে চালাক বলাটা ছিল ভিন্ন।”
“যেমন?”
“যেমন আপনি আমাকে কথার জালে ফাঁসাচ্ছেন।”
“আর তুমি ফেঁসে যাচ্ছো?আসলেই তো তুমি দুর্বল ওয়াইফি।”
“আবার আপনি আমাকে দুর্বল বললেন!”
“হুমমম বললাম।দুর্বলকে তো দুর্বল বলতেই হয়।এই যেমন আমি চালাক তাই তুমি আমাকে চালাক বলছো।”
“আপনি শুধু চালাক না আপনি হলেন শেয়ানা চালাক।”
“তুমিও তো শুধু দুর্বল না তুমি হলে রোগা প্লাস দুর্বল।”
“ধুর আপনার সাথে কথাই বলব না আমি।”
বলেই উঠতে নেয় শোভা।দর্শন তার হাত ধরে নিজের হাঁটুর উপর বসিয়ে দিলো।শোভা কিছু বলার আগেই শোভার কপালে চুম্বন দিয়ে দেয়।শোভার রাগী রাগী ভাব উবে যায়।দর্শন মৃদু হেঁসে বলে,“তুমি ভাবলে কীভাবে এই দুর্বল শরীরে আমার থেকে পালাতে পারবে?”

শোভা চোখ কুঁচকে বলে,“আবার!”
দর্শন ফিসফিস করে বলে,“আবার কি?আবার কিস করব নাকি?”
শোভা হা হয়ে যায়।বলে,“আমি এটা বুঝাইনি।”
“কোনটা বুঝাওনি?”
“এই যে যেটা বললেন।”
“কোনটা বলেছি।”
শোভা হাত দিয়ে দর্শনকে আলতো ধাক্কা দেয়।দর্শনের মজবুতভাবে ধরার কারণে শোভা নড়তেও পারল না।দর্শন শোভার কানের পিছনের চুম্বন দিয়ে বিড়বিড় করে বলে,“বললাম না পালাবে না।এমনিতেই তুমি দুর্বল যদি পালাবার চেষ্টা করো আই সোয়ার আমি তোমাকে আরো বেশি দুর্বল করে দিবো।”
শোভা কেঁপে উঠল।ভয়ে ভয়ে তাকালো।যেনো দর্শন তাকে ধমক দিচ্ছে।দর্শনের চোখের দিকে তাকালে তেমনই ঠেকলো।দর্শন হাতটা শোভার গালে রেখে বলে, “ডোন্ট ওরি ওয়াইফি।আমি তোমাকে আমার ভালোবাসা দিয়ে দিয়ে দুর্বল করে দিবো।”

শোভা শুকনো ঢোক গিলে বলে,“আপনার ভালবাসা আমার চাই না।”
শোভাকে শক্ত করে জড়িয়ে নিলো দর্শন।শোভা যেনো দর্শনের কাছ থেকে সরে যেতে না পারে তাই।শোভার মধ্যে ধড়ফড় অনুভব করছে দর্শন।শোভা আস্তে করে বলে,“ছাড়ুন।”
দর্শন ছাড়ল না উল্টো বলল,“আমার ভালোবাসা না চাইলে কার থেকে চাও ভালোবাসা?”
“কি আশ্চর্য!আমি অন্য কারোর থেকেই ভালোবাসা চাই না।”
“কিন্তু আমি তো ভালোবাসবোই।”
“আপনার ভালোবাসার স্বাদ পেয়েগেছি আমি।”
“কেমন স্বাদ?”
“ভয়ানক।”
দর্শন শোভার আড়ালে মৃদু হাসলো।দর্শনের ভালোবাসা আসলেই ভয়ানক।ও মানুষটাই যে ভয়ানক এটা তো শোভা জানে না।শোভা ও দর্শনের মাঝে কেউ আসতে পারবে না কেউ না।যে আসবে তার বিনাস করে দিবে দর্শন।
শোভাকে আর কিছু না বলে ছেড়ে দিলো দর্শন।শোভা অবাক হয়ে গেলো।দর্শন খাবারের প্লেট দেখিয়ে বলে,“খাবার ঠান্ডা হয়েগেছে।এভাবে চলতে চলতে রাত পার হয়ে যাবে তবু খাওয়া আর হবে না।তাই আগে খেয়ে নেওয়া যাক।”
শোভা সম্মতি দিয়ে প্লেট নিতে গেলে দেখে প্লেট একটাই আছে।শোভা ধীর কন্ঠে প্রশ্ন করে,“একটাই প্লেট?”

“হুমমম।”
“আমি খাবো না?”
“অবশ্যই খাবে।তোমাকে না খাইয়ে রাখতে পারি নাকি আমি?”
“আপনি খাবেন না?”
“আমিও খাবো।”
“তাহলে প্লেট একটা কেন?”
“কারণ একটা প্লেটেই খাবো।”
“দুজনেই?”
“হুমমম ওয়াইফি।”
“কিভাবে?”
“ক্রস হ্যান্ড করে।”
“ক্রস হ্যান্ড?”
“আমার হাত দিয়ে তুমি খাবে,তোমার হাত দিয়ে আমি খাবো।”
“এটা কেমন খাওয়া!”
“ভালোবাসা আদান প্রদান করে খাওয়া দাওয়া।স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হবার প্রথম স্টেপ।”
“আপনাকে কে বলল?”
“রোমান্টিক ফিল্ম।”
“আপনি রোমান্টিক ফিল্ম দেখেন?”

“হ্যাঁ কিন্তু আগে রোমান্টিক ফিল্ম দেখতাম না।বিজনেস,ফাইটিং,থ্রিলার এসব দেখতাম।তোমাকে ভালোবাসা দেবার কথা ভেবে রোমান্টিক ফিল্ম দেখা শুরু করেছি।”
“তাহলে আমিও দেখব।”
“আমাকে ভালোবাসো দেবার জন্য?”
শোভা লজ্জা পেলো।মাথা নিচু করে বলে,“তেমন কিছু না।”
আসলে তো শোভাও কিছু শিখতে চায়।দর্শনের দিনদিন হুট করে পরিবর্তনের মাধ্যম জেনে শোভার যেনো উপকার হলো। সেও চায় রোমান্টিক ফিল্ম দেখে দর্শনের উপর কিছু এপ্লাই করতে।দর্শন ভাত মাখাতে মাখাতে বলে,“তাহলে ওসব ফিল্ম তোমাকে দেখতে হবে না।”

“কেন?”
“কারণ ওগুলো ভালো না।”
“সমস্যা নেই আমি ওদের মত হব না।”
দর্শন ভ্রুকুটি করে জিজ্ঞাসা করলো,“কাদের মত?”
“ওই যে সংসারে কূটনীগিরি করে।আমি শুনেছি সিনেমাতে বউ,শাশুড়ি ও ননদের মধ্যে শয়তানি চাল চালানো হয়।এগুলো আমাকে ভাবী বলেছে।এসব শোনার পর আমি সিনেমাই দেখি না।যেখানে ভালো কিছু শেখার নেই সেখানে আগ্রহ দেখিয়ে কি বা হবে!”
দর্শন মনে মনে হাসলো।দর্শন যে ফিল্মের কথা বলছে সেগুলো শোভা আন্দাজ করতে পারেনি।কারণ ও এসব বিষয়ে অবগত না।বাড়িতে নেই টিভি।মোবাইল তাও একটা শামীমের কাছ থেকে নিজে সুরা শুনতো আর মৌলিকে নিয়ে মাঝেমধ্যে কার্টুন দেখতো।তাই এতকিছু মেয়েটা বুঝতে পারল না।শোভার মুখের সামনে খাবার তুলে দর্শন বলে,“তোমাকে কারো মতোই হতে হবে না।তুমি তোমার মতোই ঠিক আছো।আমার তো এসবে আপত্তি নেই।”
শোভা খাবার গালে নিয়ে প্লেটের দিকে হাত বাড়াতে নেয় কিন্তু আবার হাত থেমেও যায়।এই প্রথমবার খাওয়াতে যাচ্ছে।শোভার হাত থমকে আছে দেখে দর্শন ভ্রু নাচিয়ে বলে,“কি হলো,আমাকে খাইয়ে দিবে না?”
শোভা মিনমিন করে বলে,“আসলে…

“আসলে?”
“আমি তো এসবে অভ্যস্ত না।”
“চেষ্টাও কি করবে না?”
“করব তো।করতে চাই তো।”
“তাহলে?”
“কেমন জানি হচ্ছে।”
“কেমন?”
“অদ্ভুত অদ্ভুত লাগছে।প্রথমবার তো কেমন অদ্ভুত ঠেকছে সবকিছু।”
দর্শন মুখে আর কিছু না বলে শোভার হাত ধরে খাবার তুলে নিলো।শোভার হাতটা নিয়ে খাবার নিজের গালে নিলো।শোভা নিচের দিকে চেয়ে আছে।শোভার হাত থেকে খাবার নেবার সময় ইচ্ছা করেই শোভার হাতের আঙুলগুলো দর্শন নিজের ঠোঁটের মাঝে নিয়ে শোভার মুখের দিকে চেয়ে থাকে।শোভা দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিয়ে বলে,“এমন করলে কিন্তু খাওয়া হবে না।”

“কেমন করলে?”
“এই যে এগুলো।”
“কোনগুলো?”
“আপনি জানেন আমি কিসের কথা বলছি।”
“হুমমম জানি তো।তাও তোমার থেকে শুনতে চাইছি।”
“আমি আপনার মত অসভ্য না।”
“আমি অসভ্য?”
“একটু একটু।”
দর্শন হেসে দিলো। শোভা মুখ শুকনো করে তাকাতেই দর্শন হাসি থামিয়ে শোভার দিকে খাবার এগিয়ে দেয়।শোভা খাবার মুখে নিতেই দর্শন বলে,“এবার তো খাইয়ে দিতে আপত্তি নেই?”
শোভা এক পলক তাকালো।খাবার নিয়ে দর্শনের সামনে কাপা কাপা হাতে ধরে।দর্শন সাথে সাথে গালে তুলে নেয় সাথে শোভার আঙুলের ডগায় চুমু দিয়ে সরে আসে।শোভা বুঝতে পেরেও চুপ করে থাকে। শোভার প্রতিবার খাওয়ানোর সময় দর্শন একেকটা চুমু দিতেই থাকে।
খাওয়া শেষে খাবারের প্লেট নিয়ে দর্শন রান্নাঘরে গেলো।রান্নাঘরে প্লেট রেখে বাইরের দরজা চেক করলো।ভালোভাবে লক করা আছে কি না দেখে রূপরের দিকে তাকাতেই সিনথিয়াকে দেখে বিরক্তির চাহনি দিয়ে নিজ রুমের দিকে যেতে নেয়।কিন্তু পা থেমে গেলো দর্শনের।সিনথিয়া বের হবার সাথে সাথে দিজাও বের হয়েছে।দুজনে ছাদের দিকে যাচ্ছে।দর্শন এবার দিজাকে ডাক দিয়ে বলে,“কোথায় যাচ্ছিস?”
দিজা বলে, “ছাদে।”

“এত রাতে?”
“সিনথিয়া আপু ছাদে ঘুরতে চাচ্ছিলো।”
“সোজা ঘরে যা।”
সিনথিয়া আগ বাড়িয়ে বলে,“আমরা একটু ঘুরেই চলে আসব।”
দর্শন রাগী দৃষ্টিতে বলে,“আমার কথার অবাধ্য হওয়া আমি পছন্দ করি না।আমার বাড়িতে থাকতে হলে আমার কথামত চলেই থাকতে হবে।”
সিনথিয়া রেগে গেলো।প্রকাশ করল না।এখন রাগ প্রকাশ করলে দর্শনকে শায়েস্তা করতে পারবে না।তাই চুপ করে সহ্য করে নিলো দর্শনের অপমান। দিজা যেই দেখলো দর্শন রেগে আছে তখনই ধীর পায়ে চলে যেতে নেয় ঘরের দিকে।দর্শন আবারও ডাক দিলো, “দিজা।”

দিজা পিছন ফিরলো।দর্শন উপদেশ দিলো,“সাবধানে চোখ কান খোলা রেখে চলিস।তোর দুনিয়া আর অন্যদের দুনিয়া এক না।তোর জীবন আর অন্যদের জীবনের চালচলন ভিন্ন।যে কাজে অন্যরা নিজেদের সম্মান ধরে রাখে হুবহু সেই কাজ কিন্তু তোর অসম্মান বয়ে আনতে পারে।কথাগুলো বুঝলে তোর মঙ্গল।”
দিজা বুঝতে না পারলেও এমন ভাব করলো যেনো ও বুঝেছে।দর্শনের সামনে ভয়ে ভয়ে বলে,“বুঝেছি ভাইজান।”
দর্শন আর কিছু না বলে চলে গেলো।সিনথিয়া মনে মনে বলে,“তোমার এই অহংকার আমি শেষ করে দিবো।”
ঘরে এসে দর্শন দেখলো শোভা বিছানা গুছিয়ে ঝাড়ু পাশে রাখলো।আয়নার সামনে এসে খোলা চুলগুলো একসাথে করে একহাতে নিলো।বিনুনি করতে নিলেই দর্শন এসে শোভার চুলগুলো হাতে নিলো।শোভা আয়নায় দর্শনকে দেখে।দর্শন শোভার চুলগুলো বেঁধে দিতেই শোভা গাছগুলোর কথা মনে করে বলে, “রিঠা,আমলকী,শিকাকাই গাছগুলো কেন লাগিয়েছেন?”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৩

“তোমার জন্য।তুমি বলেছিলে ছোটবেলায় পাশের বাসায় গিয়ে ওদের গাছ থেকে রিঠা,আমলকী, শিকাকাই নিয়ে চুলের জন্য ব্যবহার করতে।তাই আমি নিজের বাসায় এগুলো লাগিয়েছি।প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে তোমার যা যা লাগে আমাকে বলবে।আমি তোমার জন্য সবকিছু নিয়ে আসব।”
শোভা পিছন ফিরে জিজ্ঞাসা করে,“সবকিছু?”
দর্শন শোভার কোমরে হাত রেখে ধীরে বলে,“আমার সাধ্যের মধ্যে যা কিছু আছে সব তুমি পাবে।”

বাবুই পাখির সুখী নীড় পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here