বিয়ে পাগলি পর্ব ৪
নিলুফা নাজমিন নীলা
রেস্টুরেন্টের টেবিলে বসে আছে সায়রা আর শাওন।
সায়রা বার বার অস্থির দৃষ্টিতে অন্য টেবিলের দিকে তাকাচ্ছে। যেখানে ঝিনুক বসে আছে। কিছুক্ষণ পরেই সায়রা ভ্রু কুঁচকে শাওনকে বলল,
“আপনি যে আপনার ভাইকে নিয়ে আসবেন সেটা আগে থেকে কেন বলেন নাই?”
শাওন বিস্মিত হয়ে বলল,
“কেন, আমার ভাইকে নিয়ে আসছি এতে আবার কি এমন সমস্যা হচ্ছে আপনার?”
সায়রা তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল,
“সমস্যা মানে কিন্তু খুব বড় সমস্যা! দেখুন ওই যে আপনার ভাই আর ঝিনুক একই টেবিলে বসে আছে। এখন যদি হঠাৎ কিছু একটা হয়ে যায় তখন তো মহা বিপদ হবে।”
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল,
“কিছু একটা হবে মানে কি? সায়রা, আপনি কি কথা বুঝে শুনে বলেন?”
সায়রা একটু ইতস্তত করে বলল,
“মানে আমি বলতে চাইছি… ঝিনুককে আমার মোটেও বিশ্বাস নাই। এখন যদি আমার দেবর মানে আপনার ভাইকে আমার নামে খারাপ কিছু বলে দেয়, তখন তো আমার বিয়েটা আর হবে না। সবকিছু ভেস্তে যাবে।”
শাওন হা করে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েকে আর কি বলবে সে!
তখনি সায়রা মুচকি হেসে বলল,
“হা করে থাকবেন না, মাছি ঢুকে যাবে মুখে।”
বলেই টেবিল থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো সায়রা।
শাওন অবাক হয়ে বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন?”
“আপনি বসে থাকেন, আমি একটু গোয়েন্দাগিরি করে আসি।”
সায়রা ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ঝুঁকে পড়ল ঝিনুকদের টেবিলের কাছে। পেছন থেকে মনোযোগ দিয়ে শুনতে চাইলো ঝিনুক কি বলছে। কিন্তু তখনই ঝিনুকের চোখে পড়ে গেল সায়রা।
“কি রে সায়রা, এখানে কি করিস?”
সায়রা জোর করে একচিলতে অবলা হাসি দিয়ে বলল,
“কিছুনা… তোরা কথা বল, আমি যাচ্ছি।”
বলেই সায়রা দ্রুত আবার ফিরে এলো নিজের টেবিলে। ঝিনুক বোকার মতো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার পিছু।
সায়রা এসে আবারো বসল। শাওন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি করছিল ঝিনুক? আপনার নামে বদনাম করছিল?”
সায়রা দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসল,
“আরে না! আমি কি খারাপ মেয়ে নাকি, যে আমার নামে বদনাম করবে?”
শাওন এবার গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করল,
“গতকাল আপনি আমার বাবার মোবাইলে কল দিয়ে যা তা বলেছেন কেন?”
সায়রা নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“যা তা তো বলিনি। আমি শুধু আমার মনের অনুভূতি জানাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি তো বুঝিনি, সেটা আমার শ্বশুর মশাইয়ের নম্বর!”
আবারও সায়রা জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?”
শাওন কিছু বলবে তার আগেই সায়রা মিষ্টি হেসে বলল,
“থাক, বলতে হবে না। আমি জানি, আপনি আমাকেই বিয়ে করবেন।”
কিছুক্ষণ শাওন বোকার মতো অবাক চোখে তাকিয়ে রইল সায়রার দিকে। মনে হলো যেন পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো এমন অদ্ভুত, আবার মিষ্টি মানুষকে দেখল। তারপর একটু থেমে কণ্ঠ নরম করে প্রশ্ন করল,
“আপনার জীবনে স্বপ্ন কী?”
সায়রা হেসে উঠল, সেই হাসিতে ছিল সরলতার ঝিলিক আর চঞ্চলতার খুনসুটি।
“আমার জীবনের বর্তমানে মূল লক্ষ্য হলো একটা বিয়ে করা। বিয়েতে ধুমতারাকা সাজুগুজু করা। তারপর পনেরো থেকে বিশটা বাচ্চা নিয়ে একেবারে কোলাহলময় সংসার বানাবো। আর শেষের লক্ষ্য হলো জামাইয়ের মাথা খাওয়া।”
শাওন কফি খাচ্ছিল। সায়রার শেষ কথা শুনে হঠাৎ কাশতে কাশতে প্রায় দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। একটু পরে নিজেকে সামলে নিয়ে সে আবার ধীর কণ্ঠে বলল,
“আপনি… কখনো প্রেম করেছিলেন?”
সায়রা ছোট করে বলল,
“হুম।”
শাওন আবার বলল,
“তাহলে মনে হয় ছেলেটা আপনার বেশি কথা বলার জন্যই চলে গেছে, তাই না?”
সায়রার মুখ থেকে হঠাৎ করেই হাসি উধাও হয়ে গেল। শাওন অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে তো কখনো সায়রাকে এভাবে মন খারাপ করতে দেখেনি। যখনই দেখেছে, তখনই দেখেছে সায়রা সবসময় হাসিখুশি মুডে থাকে।
শাওন ধীরে বলল,
“আপনি কি আমার কথায় কষ্ট পেয়েছেন, সায়রা?”
সায়রা মাথা নেড়ে বলল,
“না, না, আপনার কথায় কিছু মনে করিনি। আসলে জানেন, সকল মানুষের মনের ভেতরে লুকানো কিছু কষ্ট থাকে, যা তাদের ভেতর থেকে পাল্টে দেয়। মেরে ফেলে আগের সত্তাকে, জন্ম দেয় এক নতুন সত্তা।”
শাওন আগ্রহ নিয়ে সামনে ঝুঁকে বলল,
“তাহলে কি আপনার মনেও এমন কিছু লুকানো আছে? যেটা আপনাকে বদলে দিয়েছে, ভেতরে এক অন্য মানুষ বানিয়েছে?”
সায়রা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর চোখ নামিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
শাওন আবারও বলল,
“যদি বলতে অসুবিধা না হয় তাহলে বলেন… আর যদি সমস্যা থাকে তাহলে বলার দরকার নেই।”
সায়রা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল,
“তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়তাম। ওই বয়সে আবেগটাই বেশি ছিল। মজা করতাম, গল্প করতাম, তবে এখনকার মতো ছিলাম না। সবসময় লিমিটেড থাকতাম, ঝামেলার মাঝে আমাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। ওই সময়েই জীবনে প্রথম প্রেমের ছোঁয়া আসে। ছেলেটার নাম ফাহিম। পড়ত ক্লাস টেনে। ভীষণ ভদ্র আর ভালো ছেলে মনে হয়েছিল আমাকে। প্রথমে ও যখন প্রপোজ করে আমি এক্সেপ্ট করিনি, কিন্তু পরে রাজি হয়ে যাই। আমাদের সম্পর্কটা তখন খুব সুন্দর ছিল।”
কিছুক্ষণ থেমে মাথা নিচু করে রইল সায়রা।
শাওন নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তারপর… তারপর কী হয়েছিল?”
সায়রার ঠোঁট কেঁপে উঠল।
“কয়েক মাস পর আমি টেনে উঠি। তখন শুনলাম, ফাহিম আমার ক্লাসেরই আরেকটা মেয়েকে প্রপোজ করেছে। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি, ফাহিম প্রায় সব মেয়েকেই প্রপোজ করার চেষ্টা করেছে। আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, কেন ঠকাল আমাকে? আমার দোষ কী ছিল? তখন সে হেসে বলল,
‘তোর সাথে কোন ছেলে প্রেম করবে? তুই তো কথা বলতেই পারিস না, সবসময় বোবার মতো থাকিস, মনে হয় মুখে এখনো বুলি ফোটেনি।’
সেদিন ক্লাসের সবাই আমাকে দেখে হেসেছিল। আর তখন থেকেই অজান্তে আমি বদলাতে শুরু করি।”
শাওন তাকিয়ে রইল। এখনকার সায়রা যেন একেবারেই আলাদা। সবসময় দুষ্টুমির ছাপ থাকে যার মুখে, সে আজ নিস্তব্ধ। সায়রা মাথা নিচু করে হাতের সাথে হাত ঘষতে লাগল।
শাওন আস্তে জিজ্ঞেস করল,
“এখনও কষ্ট হয়?”
সায়রা এবার মাথা তুলল। ঠোঁটে পরিচিত দুষ্টুমি মাখা হাসি ফিরে এল।
“আরে কষ্ট? একদমই না। শুধু আফসোস লাগে… কেন এমন তুচ্ছ একটা ব্যাপারে এত কষ্ট পেয়েছিলাম তখন।”
শাওন মাথা নেড়ে মুচকি হেসে বলল,
“হুম… আপনি সত্যিই খুবই স্ট্রং গার্ল। আচ্ছা এখন যদি বলি, আপনাকে আমি বিয়ে করব না…?”
সায়রা ভ্রু কুঁচকে একটু মজা মেশানো কণ্ঠে বলল,
“তাহলে আপনি মহা কিছু হারাবেন।”
শাওন আরো কাছে ঝুঁকে মৃদু কৌতূহল নিয়ে বলল,
“কিরকম?”
সায়রা আত্মবিশ্বাসী গলায় হেসে বলল,
“আমাকে হারানো মানে নিজের সামনের দুইটা দাঁত হারানো। খেতে পারবেন বটে, কিন্তু কখনো প্রাণ খুলে হাসতে পারবেন না… জীবনটা ফাঁকা ফাঁকা মনে হবে।”
ওদিকে ঝিনুক আর শুভ্র বসে আছে টেবিলে। প্রথম যখন তারা একসাথে বসেছিল, ভেতরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল মনে হচ্ছিল এ জায়গা তাদের নয়। কিন্তু ধীরে ধীরে কথোপকথন জমে উঠেছে, মনটাও ভালো লাগছে। শুভ্র ছেলেটা বেশ ভদ্র, সরল আর আন্তরিক।
শুভ্র একটু থেমে কৌতূহলী হয়ে বলল,
“আপনার ফ্রেন্ড মেয়েটা কেমন?”
ঝিনুক স্নেহভরা চোখে সায়রার দিকে তাকালো। তারপর নরম আবেগ মেশানো গলায় বলল,
“সায়রার সাথে যখন আমার প্রথম আলাপ হয়, তখন তার অতিরিক্ত কথা বলা আর একরকম দুষ্টুমি আমার ভীষণ বিরক্ত লাগত। সত্যি বলতে প্রথম দিকে ওকে একেবারেই সহ্য করতে পারতাম না। কিন্তু পরে বুঝলাম, সায়রার মতো মেয়ে হয়তো পাওয়া বড়ই কষ্টকর। ওর ভেতরে এক অদ্ভুত মায়া আছে… মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা আছে। হ্যাঁ, প্রথম দিকে হয়তো আমার মতো আপনাদেরও ওকে বিরক্তিকর মনে হবে, কিন্তু বিশ্বাস করুন সময়ের সাথে বুঝবেন, সায়রার মতো একজন মানুষ আশেপাশে থাকা মানেই আশীর্বাদ।”
সায়রা বসে আছে নিজের রুমে। এক হাতে মোবাইল, অন্য হাতে কফির মগ। বসে বসে একটার পর একটা নিউজফিড স্কল করছে। হঠাৎই দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। ভেতরে ঢুকলেন সায়রার বাবা আর মা। সায়রা অবাক হয়ে বলল,
“আরে! তোমরা দুজন একসাথে?”
তারা দুজন মেয়ের পাশে এসে বসলেন। কিছুক্ষণ নীরবতার পর সায়রার বাবা ধীরে বললেন,
“আজ শাওনদের বাড়ি থেকে কল এসেছিল।”
সায়রা আবার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“ও বিয়েটা ভেঙে দিয়েছে, তাই না!”
তার কথা শুনে মা-বাবা একদম চুপ। সায়রার মনে হলো যেন ওদের চেহারায় কোনো অদ্ভুত রহস্য লুকানো আছে। হঠাৎ দুজনেই হেসে ফেললেন। সায়রার মাকে বলতে শোনা গেল,
“শাওনের বাবা বলেছে বিয়ের তারিখ এই শুক্রবারেই ঠিক করা হয়েছে।”
শুনে সায়রার চোখ-মুখ অবাক হয়ে গেল। যেন হা করে বসে রইল কিছুক্ষণ। সে একেবারেই ভাবতে পারেনি এত দ্রুত এই বিয়ে হবে। এতদিন যেটা নিয়ে মনের মধ্যে লুকিয়ে এক্সাইটমেন্ট ছিল, হঠাৎ সবকিছু বাস্তব হয়ে দাঁড়াল। মেয়েটা হঠাৎ যেন থম মেরে গেল। তার মনে হলো খুব তাড়াতাড়ি আপন মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে হবে এক অচেনা বাড়িতে।
সায়রা নিচু গলায় বাবাকে বলল,
“এত তাড়াতাড়ি কেন বাবা? আর মাত্র তিনদিন!”
বাবা মুচকি হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন,
“চিন্তা করিস না মা, সবকিছু তোর ইচ্ছে মতোই আয়োজন করব।”
এরপর তারা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। সায়রা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। তারপর হঠাৎ ফোনটা হাতে তুলে নিল। ঝিনুকের নাম্বারে কল দিল। কল ধরতেই সায়রা মৃদু কণ্ঠে বলল,
“ঝিনুক… বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে।”
ঝিনুক উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“ওয়াও, কংগ্রাচুলেশনস!”
সায়রা শুধু একটা “হুম” দিল।
ঝিনুক তার কণ্ঠ শুনেই টের পেল কিছু একটা গড়বড়। বলল,
“সায়রা, তোর কি মন খারাপ?”
বিয়ে পাগলি পর্ব ৩
সায়রা কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু চুপ থাকাই অনেক কিছু বলে দিল। তখন ঝিনুক হেসে বলল,
“এ্যরে বোকা, মন খারাপ কেন করছিস? বিয়ে মানেই তো শুধু পরিবার ছেড়ে যাওয়া না। বিয়ে মানে সাজগোজ, উৎসব, আর হাসি-খুশির মুহূর্তে ছবি তোলা।”
সাথে সাথেই সায়রার মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
“তাই তো! আমার বিয়ের আসল উদ্দেশ্যই হলো সাজগোজ করা। শোন, তুই কালকেই চলে আয় বুঝলি।”
বলেই কল কেটে দিল সে। মুখে ছোট্ট এক রঙিন স্বপ্নের হাসি খেলে গেল।
