Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৭

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৭

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৭
ইসরাত জাহান দ্যুতি

দুদিন পরের এক পড়ন্ত বিকেল আজ। সোনাঝরা রোদ তখন কাঠমান্ডু উপত্যকার ওপর মখমলের মতো বিছিয়ে আছে। কেবিনের বড়ো কাঁচের জানালার ওপারে হিমালয়ের তুষারশুভ্র শিখরগুলো গোধূলির আলোয় আবির মেখে ধীরে ধীরে তামাটে হয়ে উঠছে। উত্তরের হিমেল হাওয়া পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে যখন উপত্যকায় নেমে আসে, তখন তার সঙ্গে মিশে থাকে পাইন আর দেবদারুর এক সতেজ ঘ্রাণ। দূরে কোথাও কোনো বৌদ্ধ মঠের ঘণ্টা বাজছে, যার গম্ভীর প্রতিধ্বনি পাহাড়ের স্তব্ধতাকে এক অপার্থিব পবিত্রতায় ভরিয়ে দিচ্ছে। আকাশের নীল রংটা দ্রুত বদলে গিয়ে বেগুনি আর কমলা আভা ধারণ করছে, আর সেই উজ্জ্বল পটভূমিতে এক ঝাঁক বুনো পাখি দল বেঁধে নীড়ে ফিরছে।

ট্রাওজারের পকেটে এক হাত পুরে জানালার ফ্রেমটাতে কাঁধ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আশফি। বাইরের আকাশে রঙের মহোৎসব চললেও তার দুই চোখ নিবদ্ধ ঠিক উলটো দিকে — বিছানায় আধশোয়া হয়ে থাকা মারিশার ওপর। কাঁচের ওপার থেকে আসা শেষ বিকেলের তির্যক আলো ওর গালে এসে পড়ায় ওকে এক অলৌকিক ছবির মতো দেখাচ্ছে তার কাছে। ফ্যাকাশে ঠোঁটে খুব হালকা গোলাপি আভা ফিরে এসেছে, যদিও শরীরের দুর্বলতা এখনো কাটেনি। একটু নড়াচড়া করলেই বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে।
কোলের ওপর রাখা নিজের নোটপ্যাডে মারিশা তখন এ কদিনে ঘটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে লিখে রাখতে ব্যস্ত। কিন্তু পাশের ওই দীর্ঘদেহী পুরুষের অলপক তীক্ষ্ণ দৃষ্টির প্রখরতা সে প্রতিটা লোমকূপে অনুভব করছে। একবার ভাবল কড়া গলায় কিছু বলবে৷ কিন্তু পরক্ষণেই আবার ডোপামিন হরমোনের কারসাজিতে একটা মিষ্টি প্রশান্তি ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তবে ভুলেও তা হাসিতে প্রকাশের চেষ্টা করল না।
মুখ না তুলেই সাদা পৃষ্ঠাতে লিখতে লিখতে আড়চোখে একবার আশফিকে দেখল সে। কিন্তু অনেকটা সময় বাদেও যখন আশফির ওই গাঢ় আর স্থির দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সরল না, তখন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না মারিশা। সে হুট করেই নোটপ্যাড থেকে মুখ তুলে সরাসরি আশফির চোখের দিকে তাকাল। ওর ভ্রুতে সূক্ষ্ম এক কুঞ্চন, গলায় ধরে রাখল পুরোনো জেদী সুর। খুব ক্ষীণ, গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কী সমস্যা? কী দেখছ অমন করে?”

​ধরা পড়ে গিয়েও দৃষ্টি সরাল না আশফি। বরং মারিশার বিরক্তিটা যেন ও বেশ উপভোগ করছে। জানালার ফ্রেম থেকে পিঠ সরিয়ে আয়েশ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। কিন্তু জবাব দেওয়ার জন্য মুখ খোলার আগেই মারিশা তর্জনী উঁচিয়ে সাবধান করে দিল, “একদম বলবে না যে দেয়াল দেখছি!”
​“তো যা দেখব তা-ই বলব না?” হাসিটা অতি কষ্টে সামলে নিয়ে কণ্ঠে এক রাশ রসিকতা ঢেলে দিল আশফি। ওর চোখের কোণে তখন চিকচিক করছে দুষ্টুমির আভাস।
এদিকে ​আশানুরূপ জবাবটা না মেলায় মারিশা ভ্রুজোড়া আরও কুঁচকে ফেলল, যেন ও আগেই জানত আশফি এমন কোনো অজুহাত দেবে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল ও, “দেয়াল দেখছিলে, তাই তো? ঠিক আছে…”

​কথাটা বলেই সে আঙুলের ইশারায় কেবিনের দরজাটা দেখিয়ে দিল। ওর গলায় ফুটে উঠল চূড়ান্ত তাচ্ছিল্য, “ওই যে, ডোর ওদিকে। বাইরেও অনেক দেয়াল আছে। আমাকে বিরক্ত না করে বাইরে গিয়ে সেই দেয়াল দেখো।”
​মুচকি হাসতে হাসতে তখন শান্ত পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে এল আশফি। ওর দৃষ্টিতে এবার এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর মুগ্ধতার মিশ্রণ। মারিশার খুব কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে উত্তর দিল, “দেখছিলাম সাত দিন আগে আমার যে ছিটিয়ালটাকে প্রায় হারিয়ে ফেলছিলাম, আলহামদুলিল্লাহ সে আজ আমার সামনে বসে আমার ওপর রাগ, অভিমান করার মতো শক্তি ফিরে পেয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার এই বিরক্ত মুখটা দেখার জন্যই আমি গত এক সপ্তাহ নিজের জীবনের সঙ্গে বাজি ধরতে রাজি ছিলাম।”
​বাঁকা চাউনিটা নিমেষেই ফিরিয়ে নিল মারিশা। মুখ ভার করে জানালার ওপারে তাকিয়ে অভিমানী সুরে বলল, “বেশি কথা বলা তোমার পুরনো অভ্যাস। দেখার কাজ শেষ হলে এখন যাও তো। আমার বিরক্তিকর মুখটা আর দেখতে হবে না।”

​আশফি এবার ওর দিকে হালকা ঝুঁকে এল। ওর চিবুকটা আলতো করে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল, “তুমি দেখতে দিলেও দেখব, না দিলেও দেখব। সেই অধিকারটুকু তো আমি কামিয়ে নিয়েছি বহু আগেই।”
​“দিলিশাকে হোটেলে রেখে আমার কাছে দিনের পর দিন পড়ে থাকার মানে কী? যতসব ঢং! হুহ্,” মারিশা রাগে ঝামটা মেরে আশফির হাতটা নিজের মুখ থেকে সরিয়ে দিল।
​“আচ্ছা ঢং, তাই না?” বলতে বলতে আশফি একটুও ভ্রুক্ষেপ না করে ওর পাশের ঠিক ফাঁকা জায়গাটুকুতে বসে পড়ল। একদম গা ঘেঁষে বসা যাকে বলে।
​অদ্ভুতদর্শনের মতো পাশে বসা মানুষটার দিকে তাকিয়ে তখন মারিশা সজোরে বিরক্তি ঝাড়ল, “কী সমস্যা? গায়ের মধ্যে এসে বসছ কেন?”

​“গায়ের মধ্যে এসে না বসলে দেখবে কীভাবে? এই যে দেখো আমার ক্ষতবিক্ষত শোল্ডারটা…” বলতে বলতেই নিজের ওভারসাইজড টি-শার্টের গলাটা এক টানে কিছুটা নিচে নামিয়ে ধরল আশফি।
ওর কণ্ঠে এবার একটা অনুযোগের সুর, “এটা কিসের চিহ্ন, হুঁ? জানপ্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করে ভালুকের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনলাম বউকে। সেটা কি বোনের কাছে গিয়ে থাকার জন্য?”
​“আচ্ছা?” কপট বিস্ময়ে চোখ বড়ো বড়ো করে ভর্ৎসনা করল মারিশা, “এখন হবু বউ থেকে সোজা বোন হয়ে গেল, না? তো জানিম, সেদিন রাতে টেন্টে তার সঙ্গে ঘুমিয়েছিলে কি বোন ভেবে?”
​‘ঘুমানো’ কথাটা দ্বারা সে কী ইঙ্গিত দিয়েছে তা স্পষ্ট বুঝেও আশফি যেন কিছুই বোঝেনি এমন এক নির্বিকার ভঙ্গি করল। গলায় এক চিলতে নির্লিপ্ততা মেখে বলল, “তো বোন ভেবেই তো টেক কেয়ার করেছিলাম। আর ঘুমিয়েছি কোথায়? ও ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তো আমি নিজের টেন্টে ফিরে এসেছিলাম। ফেরার আগে অবশ্য…”
​কথার শেষে রহস্যময় একটা টান দিয়ে থামল আশফি। মারিশার চিবুকটা ধরে নিজের দিকে ফেরাল সে। চোখের চাউনিতে গভীরতা এনে বলল, “আমার জংলী বউটাকে দেখার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু জানতাম সেই ইচ্ছে পূরণ করবে না সে। তাই আর ডাকিনি।”

​মারিশা আবারও এক ঝটকায় মুখটা সরিয়ে নিল। জানালার কাঁচের ওপারে গোধূলির আলোয় ওর ফ্যাকাশে গাল দুটো এবার যেন একটু বেশিই লাল হয়ে উঠল। হৃদয়ের স্পন্দন দ্রুত হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মুখে এক বিন্দুও নমনীয়তা প্রকাশ হতে দিল না সে। শুধু অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “অসহ্য!”
​“সত্যি বললে তো অসহ্য লাগবেই। মিথ্যে বললে ঠিকই বিশ্বাস করে সহ্য লাগত”, ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে একটু খেপিয়ে দেওয়ার সুরে বলল আশফি, “তা আমার কাঁধটাকে দেখে কেমন লাগছে, সেটাও বলো। বমি করে দেওয়ার মতো না? তাহলে বউ হয়ে তোমার কী উচিত ছিল? আমার ক্ষতের যত্ন নেওয়া। অথচ তা না করে ওয়াশরুমটা পর্যন্ত ইউজ করছ আমার কোলে চড়ে।”
​মারিশা এবার রাগে রীতিমতো ফুঁসে উঠল, চোখমুখ শক্ত করে, কপালে ভাঁজ ফেলে দাঁতে দাঁত চেপে সে উত্তর দিল, “একটা ধাক্কা মেরে কেবিন থেকে বের করে দেব এবার। থাকতে বলেছে কে? আমি বলেছি? কোলে চড়ে ওয়াশরুম পর্যন্ত যাচ্ছি তাতে তোমার সমস্যা কী? ভেতরের কাজ তো আর তোমার সামনে বসে করছি না, যে গন্ধ সহ্য করতে হচ্ছে।”

ভ্রুজোড়া কুঁচকে একটা দুষ্টু হাসি দিল আশফি। ওর চোখ জোড়াও তখন হাসিতে ছোটো হয়ে এসেছে, “ছিহ্! তো সেটাও চাও না-কি করতে?”
​মারিশা এবার বালিশটা টেনে নিয়ে ওকে মারার উপক্রম করে চেঁচিয়ে উঠল, “শাট আপ… হোলি অ্যাসহোল!”
কিন্তু ওর চেঁচানো বা গালিগালাজ আশফির কানে পৌঁছাল বলে মনে হলো না। বরং ওর ওই অ্যাসহোল সম্বোধনটা শুনে আজ রেগে যাওয়ার বদলে তার চোখের কোণে দুষ্টু হাসিটা আরও গাঢ় হলো। বালিশটা কেড়ে নিয়ে একপাশে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সজোরে চেপে ধরল মারিশার দুটো কবজি। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের পলকে ওকে বিছানার সাথে প্রায় পিষে ফেলে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হরমোন ব্যালেন্স এমনিতেই বেচারির ওলটপালট। তার ওপর আশফির এই হুট করে করা হামলায় মারিশার বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল। সে দুই হাত ছাড়ানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল, “ছাড়ো বেয়াদব! একদম অসভ্যতা করবে না। আমি একজন সিরিয়াস পেশেন্ট, দেখতে পাচ্ছ না? আর আমি তোমার কেউ না, ঠিক আছে?”

কোনো বাধায় মানল না আশফি। ওর খুব কাছে মুখটা নিয়ে এল সে। এতটাই কাছে যে তার তপ্ত নিঃশ্বাস এখন মারিশার ঠোঁটে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর ওর শেষ কথাটুকু শুনে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল তার। খুব নিচু, ভারী গলায় জবাব দিল, “আমার কেউ না? আচ্ছা! এই যে তোমার বুকের ধুকপুকানিটা আমার গায়ের চামড়া ফুঁড়ে আমার হৃদপিণ্ড পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে, ওটা কি পাশের বেডের কোনো পেশেন্টের? তুমি আমার কেউ না সেটা তুমি সব সময় ভেবে এসেছ, মাহি৷ কিন্তু তুমি আমার ঠিক কতটা ভেতরে ছিলে, সেটা আমার এই শরীর আর আত্মা খুব ভালো করেই জানে। আর পেশেন্টকে তো দেখতেই পাচ্ছি। সেই অজুহাতে তো আরও বেশি করে সেবা করা দরকার আমার। সাত দিন! সাত সাতটা দিন আমি এই মুখটার দিকে তাকিয়ে শুধু আফসোস করেছি। জানো আমার কী ইচ্ছে করছিল?”

​থমকে গেল মারিশা। আশফির চোখের ওই তীব্র নেশা ধরানো চাউনি দেখে ওর ভেতরের সব রাগ নিমেষেই জল হয়ে যেতে চাইল। কিন্তু সে যে জন্ম থেকেই কঠিন জেদি! হার মানা ওর স্বভাবেও নেই তাই। অবজ্ঞাভরে নাক কুঁচকে বলল, “তোমার ওই নোংরা ইচ্ছের কথা শুনতে আমি বসে নেই। ছাড়ো বলছি!”
​আশফি এবার ওর একটা হাত ছেড়ে দিয়ে ওর গলার নিচের দিকটায়, যেখানে রক্তস্পন্দন ধুকপুক করছে, সেখানে নিজের ঠান্ডা আঙুলগুলো রাখল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনল ওর কানের লতির খুব কাছে।
মুহূর্তেই সারা শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল মারিশার। আশফি তখন ফিসফিস করে বলল, “ইচ্ছে করছিল তোমাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে। ইচ্ছে করছিল চার বছর পেছনে যেতে। যেদিন লুকিয়ে আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে, সেই দিনটাতে ফিরে তোমাকে জোর করে আমার কাছে আটকে রাখতে। আর এখন যখন তুমি আমার নাগালের মধ্যে, তখন তুমি বলছ আমি দেয়াল দেখি, না? আমার রক্তে এখন যে উত্তাপ ছুটছে, সেটা কি অন্য কারও জন্য? সব বুঝেও আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিচ্ছ।”

​বলেই আশফি হুট করে ওর ঘাড়ের খাঁজে মুখ ডুবিয়ে কটা চুমু খেয়ে নিল। অকস্মাৎ এমন আক্রমণে থতমত খেল মারিশা৷ চোখদুটো বুজে ফেলল একদম। ওর হাত দুটো তখন আশফির টি-শার্টের কাপড়টা খামচে ধরেছে। এলোমেলোভাবে বলার চেষ্টা করল, “আশফি, সরো এক্ষুনি। আমি একদম পারমিশন দিচ্ছি না তোমাকে৷”
দুষ্টুমির মাত্রা তাতে আরও বেড়ে গেল আশফির৷ তা দেখে মারিশা এবার ধমক মারল, “আরে কেউ চলে আসবে তো? সরো বলছি!”

​“আসুক”, ওর ঘাড়ে একটা গভীর আদুরে দংশন দিয়ে বলল আশফি, “বউয়ের গালি খেতে খেতে যদি আজ ধরাও পড়ি, মন্দ হবে না। আর তুমি কী চিজ দিয়ে তৈরি, হ্যাঁ? হসপিটালের বেডে শুয়েও তোমার ঝগড়া করার এনার্জি কমে না? না-কি আমাকে এত কাছে পেয়ে তোমার হার্টবিট সামলাতে পারছ না বলে পুরনো কাসুন্দি ঘাটছ?”
​মারিশা এবার রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে ওর চুলে একটা হ্যাঁচকা টান দিল, “বেশি আদিখ্যেতা কোরো না তো! তোমার এই দরদ আর নাটক অন্য কারো জন্য তুলে রাখো। আমি ভালো করেই জানি, ওই রাতে দিলিশার তাঁবুতে গিয়ে তোমার ওর জন্য কত প্রেম উথলে পড়ছিল। এখন এখানে এসে এত ঢং করছ কেন? যাও না ওর কাছেই!”
​মুখটা তুলে ওর চোখের দিকে তাকাল আশফি। তার চোখে এখনো নিখাদ এক চিলতে দুষ্টুমি। এবার ও হুট করে মারিশার ঠোঁটের একদম কাছে নিজের ঠোঁটটা নিয়ে গিয়েও শেষ মুহূর্তে হঠাৎ থেমে গেল। কিন্তু ততক্ষণে কী হতে চলেছে তা ভেবেই মারিশা চোখদুটো ঠেসে বন্ধ করে ফেলল আবার। ঠিক সেই মুহূর্তে আশফি ওর ঠোঁট না ছুঁয়েই গালে একটা শব্দ করে দীর্ঘ চুমু খেল।
​তারপর সরে এসে হাসতে হাসতে বলল, “দিলিশার সাথে কী করেছি সেটা তো দিলিশাই জানে। কিন্তু তোমার সাথে কী করব, সেটার ফর্দটা বেশ লম্বা। আপাতত এই যে তুমি আমাকে বেয়াদব বললে, অ্যাসহোল বললে৷ এটার দণ্ড হিসেবে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে।”

“কিসের কাজ? কোনো কাজ করতে পারব না।”
“পারতে তো হবেই”, কথাটা বলেই আশফি নিজের টি-শার্টের কলারটা সরিয়ে ওই ব্যান্ডেজ মোড়ানো কাঁধটা মারিশার মুখের সামনে ধরল। ব্যান্ডেজের ফাঁক দিয়ে নীলচে হয়ে থাকা সেই বিশাল ক্ষতের কিছু অংশ উঁকি দিচ্ছিল।
​সে এবার গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে এনে, একদম মারিশার চোখের দিকে তাকিয়ে অনেকটা অধিকার খাটানোর সুরে বলল, “এই যে দাগটা দেখছ, এটা সারাজীবন থাকবে। আর যখনই আমি আয়নায় এটা দেখব, আমার মনে পড়বে আমার সেই জংলী বউটার কথা। যে কিনা আমাকে ফেলে রেখে মরে যাওয়ার শখ করেছিল। তো এখন তোমার প্রায়শ্চিত্ত কী জানো?”
হাতের তর্জনী দিয়ে ব্যান্ডেজের ঠিক ওপরের এক টুকরো সাদা সুস্থ চামড়া দেখিয়ে বলল সে, “এই ব্যান্ডেজটার ঠিক পাশের এই সুস্থ জায়গাটায় তোমাকে একটা চুমু খেতে হবে। তাহলেই হয়তো আমার ভেতরের এতদিনের হাহাকার আর জ্বালাটা একটু হলেও শান্ত হবে।”

মারিশা বিস্ফোরিত চোখে ওই ক্ষতটার দিকে তাকিয়ে রইল। আশফির এমন সরাসরি দাবি ওর ভেতরের সব রাগ মুহূর্তেই একরাশ মায়ায় রূপ দিল ঠিকই। কিন্তু সেটা একদম প্রকাশ্যে আসতে দিতে চাইল না। নাক কুঁচকে পালটা যুক্তি দিল, “চুমু খেলে বুঝি জখমের জ্বালা কমে? এটা কোন আজব মেডিকেলের পড়া? অসহ্য! সরো তো এখান থেকে, পারব না আমি।”

​আশফি তখন আরও জেদী হয়ে উঠল, “খাবে না চুমু? আচ্ছা ঠিক আছে… তাহলে আমিই আবার শুরু করি?”
​বলেই ও আবার মারিশার ঠোঁটের দিকে ঝুঁকতে শুরু করল। ঠিক তখনই করিডোরে হৃদয় আর দিব্যর হাসির শব্দ শোনা গেল। মারিশা তখন আতঙ্কিত হয়ে দুই হাতে আশফিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল৷ আশফি সরল বটে। তার আগে চটজলদি ওর ঠোঁটের ওপর ছোট্ট করে একটা চুমু সে দিয়েই বসল।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৬ (২)

​বন্ধুরা ঢোকার ঠিক দুই সেকেন্ড আগে সে জানালার দিকে চেয়ে ভীষণ নির্লিপ্ত গলায় বলল, যেন খুব স্বাভাবিক এক আলোচনা চলছিল ওদের মাঝে, “হুম, নেপালের এই আবহাওয়াটা আসলেই খুব বিচিত্র, তাই না মাহি?”
​মারিশা তখন চাদরটা গলার ওপর পর্যন্ত টেনে নিয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, “হারামি… এক নাম্বারের হারামি এটা!”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৮