বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২
ইসরাত জাহান দ্যুতি
রাত ১: ২০
দূরের পাহাড় আর গাছপালার ওপরে সাদা কুয়াশার আস্তরণ। টিলার ওপরের কুয়াশাগুলো ধীরে ধীরে নেমে এসে আবছা করে দিচ্ছে পাহাড়ের ঢালকে৷ তবে শীতের কুয়াশার মতো ঘন নয় এ কুয়াশা। হালকা আর নরম। বৃষ্টিটাও আর নেই। আকাশে ধূসর ছায়ার মাঝ থেকে তাই চাঁদটা হঠাৎ হঠাৎ উঁকি মারার সুযোগটুকু পাচ্ছে।
গায়ে নাইটগাউনটা জড়িয়ে গুটিসুটি মেরে মারিশা বসে আছে জানালার সামনে। পাহাড়ি হিমেল হাওয়ায় ঠান্ডা লাগছে বেশ। ফরসা ত্বকটা তার বরফের মতো সাদা হয়ে আছে যেন। কেবল মুখটাতেই রক্তিম আভা। মাঝে মাঝে নাকটাও টানছে৷ ইতোমধ্যে ঠান্ডা‚ জ্বরের কাছে ধরাশায়ী সে।
ছোটো টেবিলটার ওপর আধ খাওয়া চিকেন গ্রিল‚ সস মাখানো বিফ স্টেক আর স্যালাডটা পড়ে আছে। পাশে আধ বোতল হাইনিকেন।
শেহনান শুয়ে পড়ার পরই হঠাৎ দরজায় কড়া পড়ে। খাবার নিয়ে হাজির হয় হোটেলের স্টাফ। রাগের মাথায় তীব্র ক্ষুধার জ্বালাটা ভুলতেই বসেছিল মারিশা। না বলতেই রিসেপশনিস্ট যে দায়িত্ব সহকারে খাবার পৌঁছে দেবে‚ সেটাতে খুব অবাক হয় সে। কিন্তু মেজাজ এত বেশি উত্তপ্ত ছিল তখন‚ খাবারগুলোর সঙ্গে এক বোতল নেশার দাওয়া চেয়ে বসে সে স্টাফের কাছে৷ নয়তো শেহনানের প্রতি খুনচাপা রাগটা তার সহজে নামবে না।
খাওয়া-দাওয়ার পর থেকেই সে ঠায় বসে আছে জানালার কাছে৷ শোয়নি আর বিছানাতে। অন্তত অমন অপমানের পর ওই বিছানাতে যাওয়া মানেই হীনমনা‚ আত্মমগ্ন লোকটার বিশ্বাসকে সত্য করে দেওয়া।
নেশা ধরেনি মারিশার৷ সে অভ্যস্ত বিয়ারে। কিন্তু শরীরটা যে তার জেদের সঙ্গে সংগ্রাম করার অবস্থাতে নেই আর। বসে থাকতেও কষ্ট হচ্ছে ভারি। তবুও টালমাটাল অবস্থাতে চেয়ারটা টেনে টেবিলের কাছে এসে বসল। মাথাটা পেতে দিল টেবিলের ওপর৷ কিন্তু উষ্ণ বিছানা আর গায়ে কম্বলটার ভীষণ দরকার ছিল তার এ মুহূর্তে।
কত সময় কাটল এভাবে‚ তা আর টের পেল না মারিশা। কেমন ঘোরের মাঝে চলে গেল সে। শুনতে পেল বহু দূর ভেসে আসছে কারও ডাকাডাকি। তার ঘরোয়া নামটা ধরেই ডাকছে বারবার। ওই ঘোরের মাঝেই বিড়বিড়িয়ে উঠল সে‚ “কে? কে ডাকছ আমায়?”
যখন চোখজোড়া খুলল‚ তখন ভোর নাকি দুপুর তা বুঝে উঠতে পারল না। শরীরটা যেমন ভারী লাগল‚ সেই সাথে মাথার মধ্যেও ভার ভার‚ একটু ব্যথা আর পেটের নিচের অংশেও চিমটি লাগার মতো হালকা ব্যথা অনুভব করল সে। কিছু একটা আন্দাজ করেই লাফিয়ে উঠে বসল। বুঝতে পারল‚ প্রতি মাসের স্বাভাবিক দিনগুলো ফিরে এসেছে৷ ঠিক তখনই খেয়াল হলো তার‚ সে বিছানাতে দুইটা কম্বলের ভেতর জড়িয়েছিল এতক্ষণ। ঝট করে পাশ ফিরে তাকাল। না‚ অহংকারী লোকটা আর নেই। ঘরের কোথাও নেই সে… এমনকি তার ব্যাগপ্যাকও। চলে গেছে বোধ হয়। আরেকটা বিষয়ও অনুভব হলো‚ তার জ্বরটাও চলে গেছে প্রায়।
হঠাৎ টেবিলের দিকে নজর পড়ল তার৷ ফেলে রাখা খাবারগুলোও আর নেই৷ উচ্ছিষ্ট পাত্রগুলো পড়ে আছে শুধু৷ আর পাশেই লেবু পানির গ্লাস আর একটা ভেজা টুকরো কাপড়। কাপড়ের টুকরোসহ সবটা দেখে সে ভ্রু কুঁচকে বিছানা ছাড়ল৷ টুকরোটা তার নিজের একটা পোশাকেরই অংশ। ছিঁড়ল কে? ওই দাম্ভিক বাঙালিটা? না-কি সে নিজেই? গ্লাসের তলাতে লেবু পানি পড়ে আছে কিছুটা৷ এটাইবা কার খাওয়া? গতরাতে সে কি মদের সঙ্গে লেবু পানিও আনিয়েছিল? বুঝতে পারল না ব্যাপারগুলো। কিছু একটা অদ্ভুত লাগল তার৷ কী যেন মনে পড়তে চাচ্ছে‚ কিন্তু পাহাড়ি কুয়াশার মতোই স্মৃতিতে সবটা ধোঁয়াটে হয়ে আছে। বিছানাতে কি সে-ই এসেছিল? কিন্তু কখন? মনে করতে না পারায় মেজাজটা খিটখিটে হয়ে গেল। এই অসুখটা থেকে কবে মুক্তি পাবে সে?
মনের মধ্যে একটা সন্দেহ নিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকল তারপরই। পরনের পোশাক ছেড়ে নিজেকে ভালোভাবে দেখল আয়নাতে। না‚ কোনো কিছুর চিহ্ন নেই শরীরে৷ কেবল ঠোঁটটা হালকা ফোলা দেখাল৷ মাঝেমধ্যে ঘুম বেশি হলে চোখ‚ ঠোঁট এভাবে ফোলা দেখা যায় কিছুক্ষণ। তাই আর অস্বাভাবিকভাবে নিল না সেটা। গোসল করতে করতে হঠাৎ শেহনানের ছোটোলোকামি আচরণগুলো মনে পড়ল তার। গালাগাল করে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই। বিড়বিড়াল‚ “কী আত্মগর্ব আর দম্ভ নিয়ে কাল অপমান করল আমাকে! অথচ যাওয়ার আগে সেই আমারই এঁটো খাবার খেয়ে গেছে! ছোঁচা লোক একটা!”
থামেল | মেলরোজ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার | দুপুর ১:৪০
সকালের নাশতা খেয়েই শেহনান বেরিয়ে পড়তে চেয়েছিল পোখরার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বন্ধু পরাগের আবদারে ঢুকেছিল ইন্দ্র চক বাজারে। নেপালে এবারই প্রথম সফর পরাগের। কিন্তু সেখানে ঢোকার পর থেকেই মাথা খারাপ অবস্থা সবার৷ এত ভিড় যে মোবাইলে নেটওয়ার্ক অবধি পাচ্ছিল না ওরা ঠিকঠাক। আর ঢাকার নিউমার্কেট থেকে কোনো অংশে কমও ছিল না ইন্দ্র চক। বস্তির মতো ঘিঞ্জি একেকটা গলি‚ আর লোকজনের ঠাসাঠাসি করে চলাফেরা। শেহনানের চোখে সেখানে আসলে দর্শনের মতো বিশেষ কিছু ছিল না বলে বেশিক্ষণ আর ঘোরাঘুরি করেনি ওরা। যতটুকু হেঁটেছে তাতেই সবার খিদে পেয়ে গেছে। তাই সরাসরি রেস্তোরাঁ চলে এল দুপুরের খাবার খেতে৷
ওরা বসল রেস্তোরাঁর খোলা আঙিনাতে। আঙিনার মাঝখানে ছায়া দেওয়া নাম না জানা বড়ো একটা গাছ‚ যার গোড়াটা দুই ধাপ উঁচু করে ইঁটের বেদি দিয়ে বাঁধানো গোলাকারভাবে। গাছের ডালে ডালে ঝুলিয়ে রাখা কিছু লাইট৷ সন্ধ্যার সময় লাইটগুলো জ্বালিয়ে মায়াবী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয় বোধ হয়। ইটের সলিঙের আঙিনা জুড়ে বসার জন্য চার-পাঁচটা কাঠের টেবিল আর বেঞ্চ পাতা। দু-একটাতে আবার বড়ো ছাতাও রাখা ওপরে। আঙিনার চারপাশে ফুল গাছের টব‚ পাতাবাহার গাছের মতো দেখতেও কতগুলো গাছ। আঙিনার সাথেই আবার ইংরেজি অক্ষর এল আকৃতির বারান্দা। সেখানেও বসার ব্যবস্থা রয়েছে৷ পরিবেশটা খু্ব শান্ত আর স্নিগ্ধও। কেননা‚ লোকজন তেমন নেই বললেই চলে।
“তোরা মেনু দ্যাখ”‚ শেহনান বলে উঠল হঠাৎ‚ “আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসি।”
মেনু কার্ডটা তখন সবার আগে দিব্য এগিয়ে নিল৷ হৃদয়‚ সৌভিক আর পরাগকে জিজ্ঞেস করতে লাগল কী খাবে তারা। যেতে পথে শেহনান ওদের বলে গেল‚ “আর যা-ই খা‚ ভাতটা অবশ্যই নিস।”
মাছে-ভাতে বাঙালিদের জন্য আসলে ভাত ছাড়া দু-বেলা খাওয়াটাই কষ্টের।
ওয়াশরুমের কাজ শেষ করে বেসিনের সামনে এসে চোখে-মুখে কবার পানির ঝাপটা দিল শেহনান৷ ভেজা মুখটা তুলে আয়নার দিকে তাকাতেই নিজের প্রতিবিম্বের পাশে আচমকা মারিশার প্রতিবিম্ব দেখে সে একটুখানি চমকাল। একই সময়ে মারিশাও ঘাড় ফেরাল। তবে শেহনানের মতো আর চমকাল না।কারণ রেস্তোরাঁতে ঢোকার পরই সে বসতে দেখেছিল ওদের।
দুজনের চোখে চোখ পড়তেই মারিশা লক্ষ করল‚ ওকে দেখা মাত্রই শেহনানের চোখ-মুখের প্রতিক্রিয়া একেবারে বদলে গেছে—ভীষণ গম্ভীর দৃষ্টিতে দেখছে লোকটা। সেই দৃষ্টি দেখে মারিশার মনে হলো‚ ওকে না এখনই বলে বসে‚ “আমার পিছু ছাড়তে মন চাচ্ছে না বুঝি? চলে এলেন আমাকে ফলো করতে করতে?”
কিন্তু আদতে এমন কিছু ঘটল না৷ মারিশার দিকে তির্যক চাউনি মেলেই টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে তার আগাপাছতলা দেখতে লাগল শেহনান। কালোর ওপর সাদা ফ্লোরাল প্রিন্টের স্মকড ম্যাক্সি ড্রেস পরনে—হাঁটুর অনেকটা নিচ অবধি পৌঁছেছে সেটা। গাঢ় বাদামী চুলগুলো ছেড়ে কানের পাশের কয়েকগাছি চুল টেনে পেছনে ছোট্ট ক্ল ক্লিপে আটকে রাখা‚ কানের লতিতে হীরার ছোট্ট টপস‚ গলায় সাদা স্বর্ণের খুব চিকন পেন্ডেট চেইন‚ হাতে নানারকম পাথরের তৈরি বিডেড ব্রেসলেট আর পায়ে সাদা এসপাড্রিলস। তবে চোখে-মুখে বোধ হয় সানস্ক্রিন ছাড়া আর কোনো প্রসাধনী ব্যবহার হয়নি৷ তার দরকারও নেই অবশ্য। এতেই রূপ-লাবণ্য যেভাবে ঠিকরে পড়তে চাইছে‚ তা আর দেখতে চাইল না শেহনান। কিন্তু না দেখেও তো পারে না। মেয়েটাকে খুব অসহ্য লাগলেও কেন যেন চোখটা সহজে ফেরাতেও পারে না সে।
তার এমন পর্যবেক্ষণ দেখে মারিশা ঠিক বুঝল না‚ আসলে কী দেখছে ওকে লোকটা? সে কি মুগ্ধ‚ না-কি আবারও অপমানের বাহানা খুঁজছে ওর সাজপোশাক দেখে? ব্যাপারটা বুঝতে না পারার ফলে ওর অস্বস্তি ঠেকল ভীষণ৷ বাঁকা চাউনি ছুড়ে বলল‚ “মোটেও ফলো করিনি আপনাকে৷ উলটে আপনি আমাকে কেমন করে নোটিস করছেন এখন। কী দেখছেন, হ্যাঁ?”
এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর জবাবে বক্রোক্তি করল শেহনান‚ “আপনাকে কই দেখছি? ওয়াশরুমের চকচকে দেয়াল দেখছি।”
“কোথায় দেয়াল দেখছেন?” মুহূর্তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দিল মারিশা‚ “আপনি তো আমাকে দেখছিলেন।”
“তাহলে তো জানেনই‚ আপনি ছাড়া আর কোনো প্রাণী‚ বস্তু নেই এখানে।”
‘প্রাণী‚ বস্তু’ শব্দদুটোই প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ আর অবহেলা টের পেয়ে গতরাতের রাগটা আবার মাথাচারা দিয়ে উঠল মারিশার। শেহনানের দিকে শক্ত চাউনি রেখেই হাতে ধরা ছোটো স্লিং ব্যাগটার চেইন আটকে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল। তারপর তার দিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল‚ “আপনার আসলে সমস্যা কী? আপনার মতো এত বাজে বিহেভিয়ার আমি কোনো বাঙালির মাঝে পাইনি কখনো। আপনি তো ভদ্রবেশের অসভ্য একটা বাঙালি।”
“সাচ স্প্লেনডিড অ্যারোগেন্স স্টিল!” চোখে তিরস্কৃত চাউনি নিয়ে শেহনান বলল‚ “আপনার নামে পুলিশের কাছে যে সেক্সুয়াল অ্যাসল্টের অভিযোগ দিইনি‚ তার জন্য আমার পায়ে পড়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত ছিল। কিন্তু তার বদলে এখনো চড়া গলায় কথা বলার সাহস দেখাচ্ছেন!”
“হোয়াট!” বিস্ময়ে চিৎকারটা আপনা-আপনিই বেরিয়ে ওর এল গলা থেকে। চেয়ে রইল শেহনানের দিকে বিস্ফারিত চোখে। গতরাত থেকে এখন অবধি সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়াটা মারিশার এটাই ছিল।
টিস্যুটা বিনে ছুড়ে ফেলে শেহনান এগিয়ে এল ওর কাছে। বক্রকটাক্ষের সঙ্গেই বলল‚ “বাহঃ! একদম রিয়েল এক্সপ্রেশন লাগছে তো অবাক হওয়ার নাটকটা!”
রাগে‚ অপমানে হিতাহিত জ্ঞানটুকু হারাল বোধ হয় মারিশা। চেঁচিয়ে উঠল সহসাই‚ “কী জঘন্য একটা মানুষ আপনি! এতখানি সাহস পেলেন কী করে আমাকে এমন মিথ্যা ব্লেইম করার? ইউ আর আ ভাইল‚ ডিসপিকেবল ম্যান! একটা রাত আশ্রয়ের জন্য সাহায্য কামনা করেছিলাম আপনার মতো পুরুষের থেকে‚ ভাবতেই এখন রাগ হচ্ছে নিজের প্রতি।”
শেহনান রইল তখনো পুরোপুরিই শান্ত আর স্বাভাবিক। চেহারাতে এক ফোঁটাও রাগের আভাস মিলল না৷ এবং জবাব দিল ধীরস্বরে‚ “আমার মনে হয় ভুলই হয়েছে আপনাকে পুলিশের হাতে না দিয়ে৷ গায়ের চিহ্নগুলো আমার কিন্তু ধুয়ে যায়নি এখনো৷ তাছাড়া কেবল সেক্সুয়াল অ্যাসল্টের অভিযোগই করব না। শুরুতে আমাকে বারবার হিট করতে চাইছিলেন। অ্যাটেম্প টু মার্ডার কেসও দেব। গায়ে জ্বরটা না থাকলে বোধ হয় শক্তিটা কাজে লাগিয়ে মার্ডারই করে ফেলতেন।”
“কী বলছেন আপনি!” লোকটার উলটো-পালটা কথাবার্তায় মারিশার মাথা ঘুরে ওঠার অবস্থা। প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়ল সে৷ আর উত্তেজিত হলেই কথা জড়িয়ে আসে ওর।
“আমি মার্ডার… আপনাকে মার্ডার করতে চেয়েছি… সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্ট! আপনি… আপনি এসব মিথ্যে বলছেন আমার প্রতি রাগ থেকে… ঘেন্না থেকে।”
“কিসের রাগ আর কিসের ঘেন্না? কে আপনি? কত দিনের আলাপ আমার আপনার সঙ্গে?”
স্তম্ভিত বেশে মারিশা চেয়ে রইল শেহনানের দিকে৷ লোকটার চোখ-মুখ দেখে ওর মনে হলো না‚ একটা কথাও মিথ্যা বলছে। কিন্তু নিজের প্রতিও এমন অভিযোগ বিশ্বাস করার মতো নয়৷ হ্যাঁ‚ এটা সত্য‚ গতরাতের অপমানে আর ঘুমাতে না পারার কষ্টে মাথায় খুনে রাগ চেপেছিল তার। তাই বলে সত্যিই খুন করতে চাইবে না-কি? আর তার চেয়েও ভয়ঙ্কর অভিযোগ‚ সে মেয়ে হয়ে একটা পুরুষকে যৌন হয়রানি করবে! একটুখানি শান্ত হয়ে শেহনানকে দৃঢ়ভাবে বলল‚ “আপনার গায়ের চিহ্ন দেখতে চাই।”
“নাটকটা কম করুন তো!”
“আমি নাটক করছি না”‚ ধমকে উঠল মারিশা‚ “আপনার গায়ে চিহ্ন থাকলে দেখাতে নিশ্চয়ই অসুবিধা হওয়ার কথা না?”
“ইম্পসিবল! জামা খুলে আপনাকে চিহ্ন দেখাতে যাব আমি? তার আর দরকার নেই…” বলে গাঢ় সবুজ টি-শার্টের গলাটা একটুখানি নিচে টেনে নামাল শেহনান। স্পষ্ট কামড়ের দাগ গলার নিচে! আর সেটা সদ্য তৈরি হওয়া ক্ষতই। এবং গলার এক পাশেও রক্ত জমে হালকা নীল চিহ্ন তৈরি হয়েছে।
বিস্ময়ে মারিশাকে জড়ীভূত দেখাল। বিশ্বাসই করতে পারল না‚ এ কাজ সে করেছে! আর ওর বিস্মিত‚ স্থির চাউনি দেখে শেহনান বলল‚ “গায়ের বাকি আঘাতের চিহ্ন দেখলে নাটকটা কেমন হত আপনার?”
আচমকা ছলছল করে উঠল মারিশার চোখদুটো। ভেজা দৃষ্টিতে চাইল শেহনানের দিকে। জিজ্ঞেস করল থমকানো কণ্ঠে‚ “মেরেছি‚ সত্যি?”
এভাবে হঠাৎ কান্না করে ফেলতে দেখে কতক্ষণ সরু দৃষ্টিতে ওকে দেখল শেহনান। তারপর বলল‚ “প্রচুর আক্রোশ দেখিয়েছেন ড্রাঙ্ক অবস্থায়। ডেঞ্জারাস চিজ আপনি! দেখে তো মনেই হয় না।”
“আমি ড্রাঙ্ক হই না৷ কিন্তু এমন কিছু করেছি আমি‚ তা বিশ্বাসই করতে পারছি না। আসলে মনেই পড়ছে না কিছু। আর আপনার অন্য অভিযোগটা…”‚ লজ্জায় কথাটা আর শেষ করল না মারিশা। চিহ্নগুলো দেখে এবার নিজেই নিজের প্রতি সন্দিগ্ধ সে৷ তাছাড়া ওর দুর্বল স্মৃতিশক্তিও নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসটা ওর কমিয়ে দিচ্ছে।
“আমিই তবে আপনার বেডে এসেছিলাম?” প্রশ্নটা করল খুব লজ্জিত মুখে।
“না”‚ ওকে অবাক করে শেহনান নির্বিকার গলায় বলল‚ “জ্বরে পুড়ছিলেন দেখে মায়া হয়েছিল একটু৷ আমিই ডেকেছিলাম তাই। কিন্তু ওই মায়া দেখাতে গিয়ে যে নিজেই খুন হব‚ তা যদি জানতাম…” কথাটা শেষে কয়েক সেকেন্ডের বিরতি৷ মৃদুস্বরে বলল তারপর‚ “তাকিয়েও দেখতাম না আর।”
কথাটা কেমন যেন দ্ব্যর্থপূর্ণ লাগল মারিশার কাছে। ভ্রু কুঁচকে বলল‚ “মেনে নিলাম হিট করেছি আপনাকে। কিন্তু হিট করার পর আপনার সঙ্গে জোর করে ঘনিষ্ঠ কেন হতে চাইব? যেহেতু আমার আক্রোশ ছিল আপনার প্রতি৷ আর জোরজবরদস্তি যদি করিও‚ আমাকে তখন ঘর থেকে বের করে কেন দিলেন না? সেটাই তো করার কথা আপনার।”
“প্রশ্নটা তো আমি করব‚ ম্যাডাম”‚ সন্দিহান হয়ে বলল শেহনান‚ “এক সঙ্গে দু ধরনের রিয়্যাকশনের মানেটা কী?”
বিষণ্ণ চোখে চাইল মারিশা। মলিন সুরে বলল‚ “আমি আসলে কখন‚ কেন আর কী করেছিলাম‚ আমার কিছুই মনে নেই।”
এক বিন্দুও বিশ্বাস হলো না শেহনানের৷ বরং মিথ্যা বলছে ভেবে বিদ্রূপের ছায়া সরে মুখটা হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল তার‚ “বাংলাতে কথা বলতে জানেন বলে বাংলা সিনেমাটা বেশি দেখেন না-কি? নেশার ঘোরে সব ভুলে গেছি টাইপ রিয়্যাকশন দেখিয়ে আপনার ইনোসেন্ট সাজার চেষ্টাটা রিডিকুলাস থিং। আমি কোনো সিনেমার ক্যারেক্টার নই‚ যে ড্রামা করেই বিশ্বাস করে নেব।”
কথা শেষেই ক্ষুব্ধ চাউনি ছুড়ে বেরিয়ে পড়ল ওয়াশরুম থেকে। কিন্তু তার অবিশ্বাসটুকু মারিশা নিতে পারল না একদম। তাকে পিছু ডাকতে ডাকতে চলে এল সেও৷
শেহনান নিজের টেবিলের দিকে আসতেই তার পিছু পিছু মারিশার অমন ব্যাকুলিত হয়ে ছুটে আসার দৃশ্য দিব্যরা সবাই দেখতে লাগল হতবাক দৃষ্টিতে। থেমে পড়ল মারিশাও ঠিক তখনই‚ যখন খেয়াল হলো টেবিলের সবাই ওকে অদ্ভুতদর্শনের মতো চেয়ে দেখছে৷ কারোরই নজর পড়ছে না দেখে খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সে। তাই কপট মুচকি হেসে সবাইকে ‘হ্যালো’ করল৷ শেহনান বেঞ্চিতে বসে বেশ বিরক্ত হয়ে তাকাল ওর দিকে।
কিন্তু ভদ্রতা বজায় রাখল পরাগ। সে ‘হাই’ করে জিজ্ঞেস করল‚ “কিছু বলতে চান আপনি?”
“না… আমি আসলে…”‚ শেহনানের দিকে অপরাধী চোখে চেয়ে মারিশা উত্তর দিল‚ “ওনাকে সরি বলতে চাইছিলাম। গতরাতে ভীষণ রুড হয়ে গিয়েছিলাম ওনার সাথে।”
কথপোকথন ইংরেজিতে চলছিল ওদের৷ মারিশার শেষ কথাটা শুনেই সবাই বুঝে গেল‚ সে-ই তবে ওদের বন্ধুর ঘরের ভাগিদার! মুহূর্তেই দিব্য ফিচেল হাসল। নিজের পরিচয় দিয়ে বলল‚ “হ্যালো‚ মিস৷ আমি দিব্য ফারহান। আপনি যে এত চমৎকার তা তো আমাদের বন্ধু বলেনি!”
বলেই সে মারিশাকে আবারও দেখতে লাগল সূক্ষ্ম নজরে। মেদশূন্য‚ আকর্ষণীয়‚ ছিপছিপে গড়ন মেয়েটার। প্রথম দেখাতেই একদম মনে গেঁথে গেল তার। কিন্তু বন্ধুদের মাঝে স্বভাবে সব থেকে বেশিই দুষ্টু আর ঢেমনা চরিত্রটাই তার৷ বরাবরই মেয়েদের ক্ষেত্রে কথাবার্তা আর বাহ্যিক আচরণে খুব একটা রাখঢাক করে না সে। তবে তার জীবনে নারী অধ্যায়তে একমাত্র প্রাধান্য পায় দৈহিক সম্পর্কটাই। মারিশার প্রতিও দৃষ্টিভঙ্গি তার সেটাই।
দিব্যকে দেখে হৃদয়ও আর চুপ থাকল না৷ নিজের পরিচয়টা দিয়েই সে প্রস্তাব রাখল‚ “আরে বসুন না! লাঞ্চটা আমাদের সঙ্গেই করুন।” বলতে বলতে নিজের পাশে জায়গাও বানিয়ে দিল।
দিব্যও একই অনুরোধ করল ওকে। কিন্তু শেহনানের অসন্তোষ চেহারা আর সেই ক্ষুব্ধ চাউনি দেখে মারিশা বসতে চাইল না একবারও। এতক্ষণ চুপ থাকা সৌভিক দুজনের মাঝে এই অদ্ভুত প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ করছিল৷ মেয়েটাকে মোটেও সহ্য করতে পারছে না যেন শেহনান। অবশ্য পশ্চিমা ধাঁচের মেয়েদের প্রতি বন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গি সব সময়ই তিক্ত। তাই বন্ধুকে একটু জ্বালাতেই এবার সেও মারিশাকে নিজের পরিচয়টা দিয়ে বেশ আন্তরিক ঢঙে অনুরোধ করল ওদের সঙ্গে খাবার খেতে৷ হৃদয় আর দিব্যও আবারও একই অনুরোধ করতে থাকল দেখে মারিশা আর যেতে পারল না৷ তবে বসল সে পরাগের পাশে এসে। হৃদয় আর পরাগ পাশাপাশিই বসা। হৃদয় তাতে একটু অসন্তুষ্টই হলো দেখে দিব্য বাঁকা হাসল তার দিকে তাকিয়ে।
এই দলে দিব্যর পর যদি কেউ মেয়েবাজ হয়ে থাকে‚ তবে সেটা হৃদয়৷ আর সব থেকে ভালোর তালিকাতে প্রথম নামটা আসে পরাগের‚ তারপর সৌভিকের। এরা দুজন যথেষ্ট বাস্তবানুগ। কারণ‚ ইতোমধ্যে দুজনেই বৈবাহিক জীবনে পা বাড়িয়েছে৷ পরাগ বিয়ে করেছে আরও বছর দুই আগে৷ আর সৌভিকের বিয়েটা ঠিক হয়ে আছে মাসখানিক হলো। এই সফর শেষেই সে বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসবে৷
বাকি রইল শেহনান। একমাত্র সে-ই এদের সবার থেকে একটু ব্যতিক্রম। জীবনকে নির্দিষ্ট ছকের বাইরে সাজিয়ে নিয়েছে সে৷ তাকে অগোছালো‚ বা বাউণ্ডুলেও বলা চলে না। আবার ভবিষ্যত নিয়ে তাকে খুব বেশি ভাবতেও দেখা যায় না৷ তবে বছর চারেক আগে তাকে পাকাপাকিভাবেই একজন ছন্নছাড়া‚ ঘরছাড়া‚ বাউণ্ডুলে বলা হত। পৃথিবী সফরের নেশায় সে সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ত দূর দেশগুলোর মানচিত্র বুকে নিয়ে। কখনো সমুদ্রের বুকে‚ কখনো চেনা-অচেনা কোনো দ্বীপে‚ কখনো জঙ্গলে আর পাহাড়ে ক্যাম্পিং করে‚ ঘুরেফিরে দিন কাটাত। কখনোবা ভিনদেশের আদিবাসী সমাজে‚ কোনো পাহাড়ি গ্রামে নিজেকে একেবারে নেটওয়ার্ক বাইরে নিয়ে যেত।
সেই দিনগুলোতে দুশ্চিন্তায়‚ দুর্ভাবনায় বাড়ির সদস্যদের পাগল হওয়ার দশা হত বলে একটা সময় তারা পরিকল্পনা করেছিল‚ ছেলেকে ঘরমুখো করবে ঘরে লাল টুকটুকে একটা বউ এনে দিয়ে৷ কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য যে‚ সেই পরিকল্পনা আজও তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি‚ পারেনি তারা ছেলেকে ঘরে বাঁধতে। হঠাৎ পরিবার থেকে আরও যেন দূরে সরে যেতে থাকল ছেলেটা।
তবে একটু পরিবর্তন এসেছে শেহনানের মাঝে৷ বছর তিন হলো পাঁচ বন্ধু মিলে বিশাল পুঁজি নিয়ে শুরু করেছে তাদের পর্যটন রিসোর্টের ব্যবসা৷ যেহেতু ঘুরে বেড়ানোর নেশা শেহনানের‚ তাই এ ব্যবসার বুদ্ধিটাও ছিল ওরই।
মারিশার সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝে খাবার এসে পড়ল৷ মোমো‚ থুকপা‚ ভেজিটেবল স্টু‚ সেকুয়া আর ডাল ভাতের সঙ্গে মাংস। হৃদয় একটু পেটুক বলে সে আলাদা করে আবার তন্দুরি আর বাটার চিকেন অর্ডার দিয়েছিল৷ সেটাও আসার পর দিব্য হঠাৎ মারিশাকে বলল‚ “আপনি তো এসব খেতে পারবেন না বোধ হয়। আপনার জন্য কন্টিনেন্টাল খাবারের ব্যবস্থা করছি।”
“কে বলল খেতে পারব না? আমি বাঙালি খাবারে অভ্যস্ত। এমনকি বাংলা কথাতেও একদম পারফেক্ট আমি”‚ শেষ কথাটা বাংলাতেই বলল মারিশা।
শেহনান বাদে প্রত্যেকে তখন দারুণ এক ঝটকা খেল শুনে। সৌভিক তাজ্জব বনে জিজ্ঞেস করল‚ “এত ফ্লুয়েন্টলি কী করে? ফরেনারদের বাংলা বলাটা অসম্ভব কিছু না৷ কিন্তু এত পারফেক্টলি বলা কি সম্ভব?”
একটা মোমো মুখে পুরে মারিশা মুচকি হাসল৷ চিবানো শেষ হলে সে সবাইকে আরও একবার ঝটকা খাওয়াল এ কথা জানিয়ে‚ “আমার মা বাঙালি। বাংলাদেশেই আমার মায়ের বাড়ি। বাংলাটা তাই আপনাদের মতোই পারফেক্ট আমার।”
“কিন্তু আপনি বৃটিশ অ্যাক্সেন্টে কথা বলেছেন৷ হোমল্যান্ড তবে ইংল্যান্ড?” জিজ্ঞেস করল দিব্য।
মারিশা হেসে বলল‚ “সবাই-ই তাই ভাবে। আমি মূলতঃ সেখানে পড়াশোনা করেছি। কিন্তু আমার আসল ঠিকানা ইস্তাম্বুল। আমার বাবা ওসমান বারিশ সুলতান।”
“উফ… তাহলে তুর্কিশ বিউটি আমার সামনে? খুব পছন্দ আমার তুর্কিশ অ্যাক্ট্রেস। আপনিও তাদের চেয়ে কম না”‚ বাঁকা হেসে বেশ খোলামেলা ঢঙেই বলল দিব্য।
আর বন্ধুর এই ছ্যাবলামি‚ হ্যাংলামি দেখে পরাগ ও সৌভিক ভেতরে ভেতরে হলো খুবই বিরক্ত৷ কেবল শেহনানকেই দেখাল নির্বিকার। ফোন ঘাঁটার মাঝে সে আপনমনে খেয়ে চলেছে৷
কিছু মানুষ থাকে‚ যাদের চোখদুটোর চাউনিই প্রকাশ করে দেয় তাদের ব্যক্তিত্বকে৷ দিব্যর ক্ষেত্রেও তাই। তার ধূর্ত আর কামার্ত চাউনি শুরুতেই মারিশার বুঝতে অসু্বিধা হয়নি। কিন্তু সে জানে‚ এই ছেলে খুব বেশি দূর এগোনোর সুযোগটাই পাবে না৷ তবে চেষ্টা করবে খুব৷ তা ভেবেই সে হাসল মনে মনে৷
কিন্তু এই দলটাতে চোখে পড়ার মতো সব থেকে সুদর্শন দুটি পুরুষ শেহনান আর দিব্য। দুজনের সুগঠিত শরীর আর দীর্ঘ উচ্চতা প্রায় একইরকম৷ এমনকি গায়ের রংটাও দুজনের কাছাকাছিই৷ হয়তো একটু বেশি ফরসা হবে দিব্যই৷ কেননা বনে-বাদাড়ে‚ পাহাড়ে ঘুরে রোদে পুড়ে বেড়ানো পুরুষটা শেহনানই৷ কিন্তু দিব্যর মতো ধূর্ত‚ কামার্ত নয় শেহনানের বাদামী চোখদুটো। তার চোখজোড়া খুবই সাধারণ। কিন্তু সে চোখের চাউনি এত শান্ত আর হাসি হাসি‚ যে সে রেগে গেলেও তা চোখদুটোই প্রকাশ পায় না৷ দুনিয়া সফরের স্বপ্নটাও যেন ওই শান্ত চোখে স্পষ্ট। ভালো লাগে তাই।
খাওয়া শেষ হলেও ওদের গল্প চলতে লাগল৷ মোটামুটি সবার ব্যক্তিরূপই মারিশা কিছুটা বুঝে গেল। সব থেকে বেশি ভালো লাগল ওর পরাগকেই৷ খুব সরল আর অমায়িক তার ব্যবহার৷ গল্পের মাঝে মাঝে শেহনানকেও লক্ষ করতে ভুলল না সে৷ এই লোকটার আচরণ ওর সঙ্গে খু্ব নিষ্ঠুর হলেও ওর মনে হলো‚ তার হৃদয়টা খু্ব কোমল আর মানবিক৷ নয়তো রাতে সে যা করেছে তার সঙ্গে‚ তারপরও একটা আঁচড়ও পড়েনি ওর গায়ে… ফিরতি কোনো আঘাত করেনি লোকটা ওকে! কিছু মনে না পড়লেও সে বুঝতে পেরেছে‚ ওর দেওয়া আঘাতগুলো লোকটা চুপচাপ সয়েই নিয়েছে শুধু৷ আর ক্ষমাও করে দিয়েছে ওর অসুস্থতা আর মাতাল অবস্থার কথা বিবেচনা করে। কেবল তার প্রথম অভিযোগটা নিয়েই মারিশা দ্বিধাদ্বন্দে। লোকটার সঙ্গে আরেকবার কথা বলতেই হবে ওকে।
এসবের মাঝেই কিছু একটা ভেবে হঠাৎ মারিশার চিন্তাগুলো থমকাল। লেবু পানির ব্যবস্থাটা কি শেহনানই করেছিল? কারণ‚ এটুকু তো তার মনে আছে‚ প্রচণ্ড খারাপ লাগায় সে টেবিলে মাথা পেতে ঘুমিয়ে গিয়েছিল৷ আর ওই ভেজা কাপড়ের টুকরোটার রহস্যও তো খুঁজে পেল না সে। কেন যেন মনে হচ্ছে‚ জলপটির কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল ওটা। এবার খাবার অর্ডারের বিষয়টাতেও খটকা লাগল মারিশার৷ হোটেল ছেড়ে আসার সময় রিসেপশনিস্টকে সে খাবারগুলো পাঠানোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিল যখন‚ তখন লোকটার কপালে কেমন ভাঁজ পড়তে দেখেছিল। সে সময় কোনো সন্দেহ না হলেও এখন ওর সন্দেহ জাগল‚ আদৌ কি রিসেপশনিস্টই খাবার পাঠিয়েছিল?
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ১
পরাগ নিজেদের পূর্ব ভ্রমণের টুকটাক অভিজ্ঞতার গল্প শোনাচ্ছিল ওকে৷ মাঝে মাঝে হৃদয় আর দিব্যও যোগ দিচ্ছিল৷ এর মাঝেই হঠাৎ হৃদয় খেয়াল করে শেহনানের দিকে ওর গভীর দৃষ্টি৷ যদিও মারিশা ছিল অন্যমনস্ক। কিন্তু হৃদয় সেই চাউনির ভাষা নিজের মতো ব্যাখ্যা করে নিল৷ তারপরই সে ডেকে উঠল মারিশাকে। সে ডাকেই সম্বিৎ ফিরল যেন মারিশার৷ সেই সাথে ভাবল‚ শেহনানকে নিয়ে ভাবা কথাগুলো ওর একদমই অযৌক্তিক৷ মায়া দয়া থেকে লোকটা বিছানাতে ডেকে আনতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু সে কখনোই করতে পারে না৷ নতুন স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা নেই বলে সে যদি অমন দাম্ভিক‚ নিষ্ঠুর লোকটার এত যত্নশীল রূপ মননে চিত্রায়ণ করতে চায়‚ তবে ওর চেয়ে বোকাসোকা মেয়ে আর দ্বিতীয়টি হবে না কোথাও।
