বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩
ইসরাত জাহান দ্যুতি
“আপনারা তো দেখি দারুণ ট্রাভেলার”‚ চোখে-মুখে মারিশা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল‚ “আপনাদের ট্রাভেলিঙের গল্প শুনে আমার এখন আপনাদের সঙ্গেই যেতে ইচ্ছে করছে৷ এবার আর একা একা ঘুরে মজা পাবো না‚ যতটা মজা পেলাম আপনাদের ট্রাভেলিঙের গল্প শুনে।”
পরাগ হেসে বলল‚ “আমাদের বান্ধবীরা শুনলেও এমনই এক্সাইটেড হয়ে পড়ে। কিন্তু এরকম অ্যাডভেঞ্চারে মেয়ে মানুষ সঙ্গে নিলে ঝামেলা।”
“ষোলো বছর থেকে আমার ট্রাভেলিঙের অভ্যাস৷ আমাকে সঙ্গে নিলে আশা করি কারও ঝামেলা মনে হবে না৷”
কথাটা শুনে পরাগসহ সবাই-ই বেশ অবাক হলো মনে মনে৷ মাত্র অল্পক্ষণের পরিচয়ে মেয়েটা তাদের সঙ্গে ভ্রমণে বের হতে চাইছে! অবশ্য যার ষোলো বছর থেকে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা‚ সে তো এমন দুঃসাহসী হবেই। কিন্তু তাদেরকে বিশ্বাস করার মতো একটা বিষয়ে ‘কিন্তু’ তো থাকবে। একরকম অচেনা একটা দলই তারা মেয়েটার কাছে। কী করে এত সহজেই বিশ্বাস করে নিচ্ছে তাদের? মেয়েটা কি বোকা‚ না-কি বেশিই সরল? না-কি নিজের প্রতি মেয়েটার অতিআত্মবিশ্বাস?
হৃদয় আর অবাক হওয়াটা আড়াল করল না‚ “আপনি কি সিরিয়াস?”
“হ্যাঁ…” মারিশা উচ্ছ্বাসটুকু ধরে রেখেই বলল‚ “কেন‚ আমাকে নিতে চাইছেন না? আরে আমি কথা দিচ্ছি‚ আপনারা আমাকে নিয়ে কোনো পেরেশানিতেই পড়বেন না।”
“আমাদের মতো অচেনা একটা দলের সাথে আপনি সত্যিই যাবেন?” সৌভিক বলে উঠল‚ “আমরা কিন্তু কেবল ব্যাকপ্যাকার কিংবা অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলারই না। আমরা ওয়াইল্ডারনেস ট্রাভেলার বলেও পরিচিত। যার জন্য আজ পর্যন্ত লাভার তো দূরে পড়ে থাক‚ মেয়ে বন্ধুও সঙ্গে আনি না কেউ।”
“আমি সোলো ট্রাভেলার যদিও। কিন্তু আমার সত্যিই আপত্তি নেই আপনাদের সঙ্গে যেতে। কেবল আপত্তিটা আপনারা না করলে।”
“ভয় করবে না একটুও?” সরু দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল দিব্য।
ঠোঁটের ধারে নির্ভীক হাসি ফুটল মারিশার‚ “ভয়টা আবার কিসে? পুরুষে? সে ভয় তো বাড়িতে ফেলেই বের হয়েছি।”
“ওহো… ভুলেই গেছিলাম। তার নমুনা তো গতরাতের ব্যাপারটাতেই বুঝেছি আমরা”‚ বলার পরই হৃদয় ইঙ্গিতপূর্ণ হাসল শেহনানকে লক্ষ করে।
চিকন ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেটটা ধরে শেহনান ভ্রুকুটি করা চোখে তখন থেকে মারিশাকেই দেখছিল‚ যখন সে তাদের সঙ্গে যাওয়ার আবদারটা ধরল। নীরবতা ভেঙে অনেকক্ষণ পর সে আলোচনায় যোগ দিল‚ “নামটা যেন কী আপনার?”
“একি রে…”‚ আকাশ থেকে পড়ার মতো বিস্ময়টা নিয়ে দিব্য খোঁচা মেরে বলল‚ “সারা রাত এক ঘরে‚ এক বিছানায় থেকেও নামটা দেওয়া নেওয়া করিসনি তোরা!”
তার কটাক্ষপাতে গুরুত্ব না দিয়ে শেহনান মারিশার দিকে তীক্ষ্ণ চাউনিটা বজায় রাখল জবাবের অপেক্ষায়। মারিশাও তেমন গুরুত্ব দিল না দিব্যকে। কারণ‚ শেহনানের প্রশ্নটা শুনেই কেমন গম্ভীরতা ভর করল ওর চেহারায়। জবাব দিল‚ “পরিচয়টা রাতে জানিয়েছিলাম৷ ভুলে গেছেন বোধ হয়?”
“খেয়ালই করিনি”‚ স্পষ্ট অবহেলা শেহনানের মাঝে। শেষে আচমকা বক্রোক্তি করে বসল‚ “রিপিট করতে সমস্যা? না-কি নিজেও ভুলে গেছেন?”
হেসে ফেলল সৌভিক। মুখটা মারিশার থমথমে হয়ে উঠল তখন৷ রাতের অপমান‚ একটু আগের মিথ্যা অভিযোগ‚ সবটাই ভুলতে চেষ্টা করছিল সে। কারণ‚ নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে এই বাঙালি দলটাই ওর প্রয়োজন। কিন্তু শেহনানের বিদ্রূপাত্মক আর বাঁকা মন্তব্যে ওর মতো অধৈর্য ও দ্রুতই মাথা গরম হয়ে ওঠা মেয়ে কতক্ষণ চুপচাপ হজম করতে পারবে‚ কে জানে! লোকটার মাঝে স্পষ্ট নারীবিদ্বেষ মনোভাব টের পাওয়া যায়। না-কি বিদ্বেষটা কেবল ওকে কেন্দ্র করেই? শেষ কথাটা মনে হতেই মারিশা কী যেন ভেবে হঠাৎই দমে গেল। শেহনানের প্রতি রাগটাও দূর হয়ে গেল ওর। এ অপমানটাও তাই ভুলে গেল। উত্তর দিল দুষ্টুমি করে‚ “গুড়াস। তবে লালিগুড়াস নয়৷ শুধুই গুড়াস।”
নামটা শোনা মাত্রই দিব্য হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে সে বলল‚ “এমন নাম তো বাবা-মা‚ দাদা-দাদি‚ নয়তো হাজবেন্ড‚ বয়ফ্রেন্ডের মুখে মানায়৷ আমরা ডাকলে লোকে শেষে আমাদের সব্বার বউ ভেবে নেবে না তো আপনাকে?”
কথাটা শেষ হতে দেরি‚ সৌভিক আর হৃদয়ের অট্টহাসির চোটে সামনের টেবিলটা কাঁপতে দেরি হলো না৷ এমনকি শেহনানের ঠোঁটেও ফুটল বিদ্রুপাত্মক হাসিটা। কেবল পরাগই একটু অস্বস্তিবোধ করল‚ স্বল্প সময়ের পরিচয় হওয়া মেয়েটার সাথে এমন সস্তা রসিকতায়।
প্রচণ্ড কষ্টে মেজাজটা সামলাতে হলো মারিশাকে। বুঝতে পারল‚ শুধু শেহনানই না‚ পুরো দলটার সঙ্গেই টিকতে হলে ওকে খুব ধৈর্য ধরতে হবে আর শান্ত থাকতে হবে। রাগটা গিলে তাই অনিচ্ছাতে সবার হাসিতে শামিল হলো সেও। উত্তর দিল‚ “আমি এসেছি খুব বিশেষ একজনের খোঁজে‚ আমার বুনো গন্ধরাজে খোঁজে। আপনারা কেউ কি আমার বুনো গন্ধরাজ?”
“না গো‚ ম্যাডাম”‚ হৃদয় বলে উঠল‚ “আমরা কেউ বুনো টুনো না। দেখছেনই তো‚ আমরা সভ্য জগতের জামা-কাপড় পরা প্রাণী সমাজ৷ আমপাতা জামপাতায় লজ্জা ঢাকা কি আর সম্ভব‚ বলুন?”
হাসির ফোয়ারা ছুটল আরও একবার৷ হাসতে হাসতে দিব্য বলল‚ “প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমরা আবার খু্ব রসিক মানুষ।”
“ইট’স অলরাইট”‚ জোরপূর্বক হাসিটা হেসে মারিশা বলল‚ “বুনো গন্ধরাজকে খুঁজে পাবার পর আপনাদের পিছু আর নেব না‚ প্রমিজ।”
“যদি শেয়ার করতে প্রবলেম না মনে করেন‚ এই বুনো গন্ধরাজের ব্যাপারটা কী আসলে?” সবটা বুঝেও মজার ছলেই সৌভিক জিজ্ঞেস করল‚ “আপনার বয়ফ্রেন্ডের কথা বলছেন? না-কি সত্যিই পাহাড়ি গন্ধরাজের খোঁজে এসেছেন?”
সবার হাসি-ঠাট্টার মাঝে শেহনান যে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠেছে‚ তা কেউ খেয়াল করল না আপাতত। সৌভিকের প্রশ্নগুলো শেষ হতে না হতেই মারিশাকে আকস্মিক এক তিরস্কারপূর্ণ বাক্য ছাড়ল সে‚ “ইস্তাম্বুলে বুনো গন্ধরাজের বিলুপ্তি ঘটেছে না-কি? মরে টরে গেছে? না-কি ছেড়েছুড়ে চলে গেছে ম্যাডাম গুড়াসকে?”
পরাগ এবার বিরক্ত হলো যতখানি‚ তার চেয়ে বেশি অবাক হলো শেহনানের কথার ধরনে। সৌভিকও ভ্রুকুটি করে চাইলো ওর দিকে। তাদের হাসি-তামাশাতে তাও একটা সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু শেহনানের কথাগুলো যে একটু বেশিই ব্যক্তিগত আর অকপট হয়ে গেল! ও তো এরকম করে কথা বলে না! কোনো মেয়ের প্রতি ও যতই বিরক্ত হোক আর রাগ হোক‚ এমন সুরে আগে কখনো কারও সাথে কথা বলেনি ও! মাত্র এক রাতে কী এমন ঘটে গেল যে‚ মারিশার সঙ্গে এত বেশি বিরাগ নিয়ে কথা বলছে‚ এতটা বিরক্ত দেখাচ্ছে তার প্রতি? না-কি ঘটনা অন্য কোথাও? তখন মারিশাও কেমন মরিয়া হয়ে ওর পিছু পিছু ছুটে আসছিল! যা দেখে মনেই হচ্ছিল‚ বিশেষ কিছু ঘটনা ঘটেছে দুজনের মাঝে। কিন্তু ঘটলেও তো ওদের বন্ধু এরকম সুরে কথা বলা ছেলে নয়। কেবল একজন নারী ব্যতিত যে-কোনো শ্রেণীর নারীকেই যথেষ্ট সম্মান দিতে জানে ও।
কথাগুলো পরাগ আর সৌভিক‚ দুজনই ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে ওরা মারিশার দিকে চাইল—মেয়েটা নিশ্চয়ই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়েছে! কিন্তু শেহনানের কথাতে কেবল এক মুহূর্তের জন্য মারিশা থমকে পড়েছিল। বিব্রত দেখাল না মেয়েটাকে একটুও! বরং কী এক অর্থপূর্ণ চাউনিতে দুজন দুজনের দিকে চেয়ে আছে! দুজন দুজনের চোখে চোখ রাখার এই অভিব্যক্তিটা ওরা খেয়াল করতেই ওদের সন্দেহ আরও বেশি গাঢ় হলো৷
“এদের মধ্যে ঘটনাটা কী?” বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবতে লাগল সৌভিক।
আর এদিকে পরাগ ভাবুক হয়ে বিড়বিড়াল‚ “কোনোভাবে এরা পূর্ব পরিচিত না-কি? নয়তো তাকানোর ধরন এমন কেন দুটোর? আর আমার দোস্তের কথার সুরইবা অমন ইঙ্গিতপূর্ণ কেন?”
শেহনানের খোঁচাযুক্ত প্রশ্নগুলো সরাসরি এড়িয়েই গেল মারিশা। জবাব দিল কেবল সৌভিকের প্রশ্নে‚ “কোনো সমস্যা নেই বলতে। মজা করেই বললাম তখন৷ তবে ওই মানুষটাকে আমি বুনোই বলি আড়ালে আবডালে। কারণ‚ সারা বছর সে নাকি বনে‚ জঙ্গলেই পড়ে থাকে। বুনো গন্ধরাজ যেমন পাহাড়ের বুক ছাড়া বাঁচে না। সেও তেমনই পাহাড়‚ জঙ্গল ছাড়া সভ্য সমাজে বেশিদিন থাকে না।”
এ কথাগুলো সে বলছিল শেহনানের দিকে চেয়েই। খুব দৃঢ় কণ্ঠে বলল তারপর‚ “আর সে আমার বয়ফ্রেন্ড নয়৷ তারও ওপরে যে সম্পর্ক থাকে‚ আমার সঙ্গে তার সেই সম্পর্কটাই। আমার বুনো গন্ধরাজের জন্ম বাংলাদেশের মাটিতে। ইস্তাম্বুলে না৷ তবে এটা সত্য‚ আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি।”
“এই… আপনি ম্যারিড না-কি?” দিব্য উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
সেই একই সময়ে সৌভিক শেহনানের কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলল‚ “আপনার বুনো গন্ধরাজ আমার এই দোস্তের কোনো কপি ভার্সন না-কি? এটাও বছরে মনে হয় নয় মাসই বনে-জঙ্গলে পড়ে থাকে।”
“তাই? সেও তাহলে বুনোই?” বলেই মারিশা ঠোঁট চেপে হাসল৷ আর এই ফাঁকে দিব্যর প্রশ্নটা চাপা পড়ে গেল।
সৌভিক জবাব দিতেই যাবে‚ তখনই শেহনান বেঞ্চ ছেড়ে উঠে পড়ল। হাতে বাঁধা ওমেগার রিস্ট ওয়াচে সময়টা দেখে সে তাড়া দিয়ে বলল‚ “জিপ চলে আসার সময় হয়ে গেছে৷ ওনাকে গুড বাই করে সবাই উঠে পড় দ্রুত।”
“গুড বাই মানে? আরে উনি তো আমাদের সাথে যাবে”‚ হৃদয় বলল অনেকটা মনে করিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে।
উত্তরে শেহনান কিছু বলার আগে মারিশা পরাগকে জিজ্ঞেস করল‚ “আপনারা এখন কোথায় রওনা হবেন? পোখরাতে?”
“হ্যাঁ‚ আমার জন্যই একবার লেক দেখতে যাবে সবাই৷ প্রথম এলাম কিনা!”
“আমিও। তাহলে আপনার নাম্বারটা দিয়ে যান‚ ব্রো। আমিও পোখরাতেই যাব। গিয়ে কনট্যাক্ট করব।”
হৃদয় তখন বলল‚ “আপনি আমাদের সঙ্গে যেতে চাইলেন না? সমস্যা নেই‚ চলুন।”
“জিপে ছ’সাতজনের জায়গা হওয়া মুশকিল হবে। আমার জন্য আপনারা কষ্ট করবেন‚ সেটা ভালো লাগবে না আমার। আমি বাসে করে চলে যেতে পারব।”
“বাসে”‚ শেহনান কপট বিস্মিত হয়ে বলল‚ “ফ্লাইটে নয়? আপনাকে দেখে তো লাগছে না মানি প্রবলেমে ভোগা ফরেনার আপনি!”
“হোয়াট কাইন্ড অফ টক ইজ দিজ!” পরাগ ধমকে উঠল ওকে‚ “মাইন্ড ইয়োর ওয়ার্ডস!”
“কাম অন…”‚ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে হালকা গলায় বলল শেহনান‚ “হোয়াট ডিড আই ইভেন সে‚ দ্যাট আই নিড টু মাইন্ড মাই ওয়ার্ডজ? আমি কেবল ধারণা করেছিলাম উনি বাস টাসে চড়া পাবলিক না। লুক হার আউটফিট! তোদেরও কি মনে হচ্ছে না সেটাই?”
সৌভিক আর পরাগের পর এবার হৃদয় আর দিব্যও দারুণ অবাক হলো শেহনানের কথাবার্তার ধরনে৷ এরকম অপিরিচিত একটা মানুষ‚ তার ওপর সেই মানুষটা একজন নারী—তার সঙ্গে শেহনানের এমন আচরণ ওরা কল্পনাই করতে পারছে না৷ অথচ সব থেকে কথা কম বলা‚ মেয়েদের ব্যাপারে প্রায় আগ্রহশূন্য ছেলেটার আচরণ ওদের মতো ঠোঁটকাটাদের থেকেও এত অসামাজিক কী করে হলো?
মারিশার মুখ দেখে বোঝা গেল না‚ সে অপমানবোধ করল‚ না-কি রাগ হলো! কেবল চুপচাপ চেয়ে রইল শেহনানের দিকে। পরিবেশটা কেমন যেন একটা অস্বস্তিকর‚ গম্ভীর হয়ে উঠল দেখে দিব্য প্রসঙ্গ পালটাতে পূর্বের আলোচনাতে ফিরল‚ “কিন্তু পোখরার বাস তো সকাল সাতটায় ছাড়ে। আপনি আসতে আসতে দেখা গেল আমরা মানাসুল সার্কিটে ঢুকে পড়েছি।”
“পোখরার ফ্লাইটও আগামীকাল সকাল সাতটা থেকে বারোটার মধ্যে সম্ভবত। এর মধ্যে ওয়েদার খারাপ করলে ফ্লাইট ক্যানসেলও হতে পারে”‚ জানাল সৌভিক।
“আমি বাস‚ ফ্লাইট‚ কোনটাই চুজ করছি না তবে”‚ মুচকি হেসে বলল মারিশা‚ “প্রাইভেট কার বুক করে নেব।”
শেহনান যে মাত্রাতিরিক্ত নাখুশ‚ তা ওর অসন্তোষ চেহারাটাই বলে দিল৷ তবে কারণটা এবার মারিশাকে সহ্য করতে না পারার বিষয়ে নয়। আসল কারণটা হলো‚ পর্যটক হিসেবে একা রাতের বেলায় পোখরা বা থামেলের মতো জায়গায় প্রাইভেট কার ভাড়া করে যাতায়াত করার সময় নারীদের বিপদে পড়ার কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে শুনেছে ও। এর মধ্যে ছিনতাই‚ ডাকাতি‚ এমনকি চালকের অসৎ আচরণের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাও আছে। এরকম ঘটনা খুব বেশি ঘটে না ঠিকই‚ তবে সাবধানের তো মার নেই।
অনেক সময় কিছু অসাধু চালক পর্যটকদের দুর্গম বা কম জনবহুল এলাকায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে‚ যেখানে তাদের কোনো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে। কখনো কখনো তারা পর্যটকদের জিনিসপত্র চুরি করে বা তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করার চেষ্টাও করে। যদিও নেপালের পর্যটন পুলিশ এ ব্যাপারে বেশ সক্রিয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। তবুও কিছু ঝুঁকি তো থেকেই যায়। এই ঝামেলাটা এসে ঘাড়ে না পড়লে এত চিন্তা করতে হত?
এসব ভেবেই মারিশার প্রতি বিরক্তি বাড়ল শেহনানের। তার দিকে ওর চাউনিটা ঠান্ডায়। কিন্তু সেই চাউনিতে নিজের জন্য ওর রূঢ় মেজাজটা মারিশা ধরতে পারল ঠিকই। তবুও সে রইল একদম নির্বিকার। তাকে যে যেতেই হবে এদের পিছু পিছু! তাই আর দেরি করল না। শেহনান আর কোনো বাধা না দেয়‚ তার আগেই আইপ্যাডটা বের করে ঝটপট অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি ভাড়া করার কাজে লেগে পড়ল সে।
কিন্তু তখনই তাকে চমকে দিয়ে শেহনান গম্ভীর মুখ করে বলল‚ “কোনো প্রাইভেট কার ভাড়া করতে হবে না৷ আমাদের জিপেই যাওয়া যাবে।”
মারিশার বড়ো বড়ো চোখদুটোই প্রথম বিস্ময় দেখা গেল‚ তারপরই আনন্দে ঝিলিক দিয়ে উঠল। প্রাণোচ্ছল হাসি ফুটিয়ে শেহনানকে সে ধন্যবাদ জানাতে গেলে শেহনান তার আগেই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল রেস্তোরাঁ থেকে।
দুপুরের নিস্তেজ রোদ যখন থামেলের শহরে খেলা করছে‚ ঠিক তখন শেহনানদের দলটা মাহিন্দ্রা স্করপিও এসইউভিতে নিজেদের ব্যাকপ্যাক উঠাচ্ছে। গাড়িটাতে সদস্য সংখ্যা হচ্ছে আটজন। সামনের সিটে ড্রাইভার আর কো-ড্রাইভার‚ মাঝের সারিতে যে-কোনো তিনজন‚ আর পেছনের ভাঁজ করা সিটে বাকি তিনজন। তবে সেখানে একটু রোগা‚ পাতলা গড়নের মানুষকে বসতে হবে। সে নিয়েই ওরা আলোচনা শুরু করল। সবার মাঝে মারিশা যেহেতু একা একজন মেয়ে‚ সে যেন কোনোভাবে অস্বস্তি বা অসু্বিধাবোধ না করে‚ তাই পরাগ তাকে কোথায় বসতে দেবে‚ এ আলোচনাটাই আগে করতে লাগল।
শারীরিক গড়নে মাঝামাঝি আর স্বাস্থ্যটা বেশি ভারী হৃদয় আর পরাগের। এদিকে উচ্চতাতে বেশি লম্বা শেহনান আর দিব্য। আর সব দিক থেকে মাঝামাঝিতে রয়েছে সৌভিক। তার উচ্চতাও মাঝারি আর শরীরটাও হালকা। পরাগ আর হৃদয়ও মাঝারি উচ্চতার। ওরা ঠিক করল মারিশাকে মাঝের সারিতে জানালার পাশে রেখে তার পাশে বসবে পরাগ ও হৃদয়ের মাঝে যে-কোনো একজন‚ আর দিব্য ও শেহনানের মাঝে বসবে যে-কোনো একজন৷ তখনই দিব্য বলে উঠল‚ “আমি কিন্তু মাঝেই বসব।”
এ কথা শুনে হৃদয়ও মুহূর্তেই মুখ খুলল‚ “আমিও মাঝেই বসব।”
দিব্য আর হৃদয়ের মাঝে ইতোমধ্যে অঘোষিত এক সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে‚ মারিশাকে তারা কে আগে বাগে আনতে পারে। আর ব্যাপারটা একমাত্র মারিশাই টের পাচ্ছে শুরু থেকে। বিশেষ এক কারণে সে এটা খুব উপভোগও করছে। চোখে সানগ্লাস পরে‚ রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত সে আশপাশটা দেখায়। দু বন্ধুর কথা শুনতেই তার ঠোঁটের কোণে খেলে গেল কৌতুকপূর্ণ হাসি। কিন্তু লক্ষ করল না‚ এ মুহূর্তে আরও একজন দিব্য আর হৃদয়ের ভাবগতিককে সন্দেহ চোখে দেখছে।
দুজনের অমন দৃঢ় মতামত দেখে শেহনান সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখতে থাকল ওদের৷ হৃদয়ের থেকেও দিব্যকে একটু বেশি জানে সে। প্রায় এক সাথেই বড়ো হয়েছে কিনা! তাই একটু পর পরই মারিশার দিকে তার ঘুরে দেখার কারণটা ধরতে সময় লাগল না আর৷ তবে হৃদয়ও মেয়েটার পিছু পড়লেও তা চলবে কেবল ওদের এই সফর সময়গুলো অবধিই। কারণ‚ জারিন নামের ওদের একজন বন্ধু রয়েছে‚ যাকে সেই কলেজ জীবন থেকে হৃদয় নিজের হৃদয়ে ধারণ করে। কিন্তু সম্পর্কটা দুজনের সাপে নেউলের মতো বলে আজও পর্যন্ত মেয়েটাকে ভালোবাসার কথা জানায়নি সে। জারিন তবুও বোঝে। কিন্তু বুঝেও ধরা দেয় না বলেই হৃদয় রাগ আর জেদ থেকে এমন মেয়েবাজে পরিণত হয়েছে।
“তাহলে উঠে পড়ি সবাই। সব কিছু গাড়িতে তোলা তো শেষ‚ তাই না?” বলল পরাগ।
ডিকি দেখে নিয়ে হৃদয় বলল‚ “আর কিছু বাকি নেই। উঠি এবার।”
“আমার কয়েকটা কফি স্যাশে প্যাক দরকার”‚ কথাটা বলেই শেহনান হঠাৎ দিব্যকে বলল‚ “যা তো একটু। রোদের তেজে মাথা ব্যথা করছে আমার।”
“রোদের তেজে তোর আবার মাথা ব্যথা হয় কবে থেকে”‚ যেন অবাকই হলো দিব্য। কেননা‚ রোদ-বৃষ্টিতে ভিজেপুড়ে দুনিয়া চষে বেড়ায় যে‚ তার কি রোদের তেজে কাবু হওয়ার কথা?
“এখন কি মেডিকেল রিপোর্ট দেখাতে হবে?” শেহনান বিরক্তের সঙ্গে বলল‚ “যেতে না চাইলে বল।”
“তা কখন বললাম? আজ এত টেম্পার হারাচ্ছিস কেন বাববার?” ভ্রু কুঁচকে শেহনানকে দেখে দিব্য রাস্তার পাশের দোকানগুলোর দিকে এগোল।
ইতোমধ্যে মারিশা গাড়িতে উঠে পড়েছে৷ কিছুক্ষণ আগেই নতুন ফোন কিনেছে সে পরাগকে সঙ্গে নিয়ে৷ বারবার আইপ্যাড বের করাটা ঝামেলার লাগছিল। ব্যাগ থেকে ফোন বের করে বাংলাদেশের সেই গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে মেসেজে জানাল‚ শেহনানদের দলের সঙ্গে পোখরাতে রওনা হওয়ার কথা। এর ভেতরই গাড়ির অপরপাশের দরজা টেনে শেহনান উঠে এল। বসল আচমকা ওর কাছে। পাশ ফিরে তাকে দেখেই মেয়েটা চমকে গেল। সেই চমক কাটতে না কাটতেই শেহনান পরাগকে ডেকে উঠল বসার জন্য।
তা দেখে হৃদয় জলদি এগিয়ে এসে বলল‚ “আজব! তোরা এখানে বসছিস কেন? আমার আর দিব্যর বসার কথা তো।”
“কথা কম বল…”‚ গম্ভীরস্বরে বলল শেহনান‚ “দিব্য পেছনে বসবে। চুপচাপ বস তুইও।”
দিব্য ফিরে এল এর মাঝেই। এসে ব্যাপারটা দেখে সেও হৃদয়ের মতো প্রতিক্রিয়া জানাল। শেহনান তা শুনলই না যেন। দিব্যর কথার মধ্যে কফি স্যাশ প্যাকগুলো ব্যাগের কোন চেইনে ঢুকিয়ে রাখবে সৌভিক‚ সেটা জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷
পরাগ আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখছিল। ঘটনার ইতি টানল তারপর সে-ই। দিব্যকে ধাক্কা দিয়ে পেছনের সিটে ঢুকিয়ে দিয়ে সে চড়ে বসল শেহনানের পাশে।
শেহনানের ওপর দিব্য ভালোই খেপেছে। মারিশার সামনে বেশি কিছু বলতে পারল না দেখে থমথমে মুখে জানালার ধারে বসে রইল।
সিটে গা এলিয়ে দিল সকলে৷ জানালা দিয়ে শেষবারের মতো থামেলকে দেখে নিল তারা। রাস্তার দু’পাশে দোকানে দোকানে পর্যটকের ভিড়‚ কেউ দামাদামি করছে‚ কেউ ঘুরে ঘুরে দেখছেই কেবল৷ থামেলের চঞ্চলতা পেছনে ফেলে গাড়ি যখন প্রধান সড়কে উঠল‚ তখনই শুরু হলো পাহাড়ি সফরের আসল স্বাদ। শহরের কোলাহল মিলিয়ে যেতেই কানে এল বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। গাড়ি নাগধুঙ্গার পাহাড়ি পথে উঠতেই মারিশা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে এক গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বিড়বিড়াল‚ “অবশেষে!”
সিটে গা মাথা এলিয়ে দেওয়া শেহনান তখন আড়চোখে ওকে দেখল একবার।
রাস্তাটা যত উপরে উঠছে‚ তত নিচের কাঠমান্ডু শহর ছোটো হয়ে আসছে। একসময় পুরো শহরটা একটা ছোট্ট মডেলের মতো দেখা গেল‚ যেন কোনো শিল্পীর বানানো। নাগধুঙ্গা পার হয়েই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পালটে গেল। রাস্তার একপাশে উঁচু উঁচু সবুজ পাহাড়‚ আর অন্যপাশে তীব্র স্রোতের ত্রিশুলি নদী। নদীটা প্রায় পুরো পথজুড়েই সঙ্গ দেবে। কখনো শান্ত‚ কখনো প্রচণ্ড স্রোতে গর্জে উঠে।
রাস্তার দুই পাশে ছড়িয়ে পড়েছে ধানক্ষেতের সবুজ সমারোহ‚ দূরে সবুজে মোড়া পাহাড়‚ কখনো রাস্তার পাশ দিয়ে ঝরনার মতো ছোটো ছোটো ঝিরি গড়িয়ে পড়ছে নিচে‚ আবার কোথাও দেখা মিলছে ছোটো গ্রাম। মাটির বাড়ি‚ ছন বা টিনের চাল‚ সামনের উঠোনে শুকোতে দেওয়া ভুট্টা।
পরাগ ক্যামেরা বের করে ভিডিয়ো করতে শুরু করলে শেহনান তাকে বাধা দিয়ে বলল‚ “ক্যামেরা দিয়ে না‚ মন দিয়ে দ্যাখ। নয়তো নেচারের এই স্বাদ ফুলফিল পাবি না।”
“আরে বউকে দেখাব”‚ লাজুক হেসে বলল পরাগ।
শেহনান মৃদু হেসে চোখ ফেরাল জানালার দিকে। তবে তার আগেই আড়চোখে আরেকবার দেখে নিল মারিশাকে। বড়ো বড়ো চোখ দুটোতে যে মুগ্ধতা ভর করেছে ওর‚ তা যেন শিশুর বিস্মিত দৃষ্টির মতোই লাগল শেহনানের। ভীষণ সরল! এভাবে ওর দিকে তার বারবার তাকানোটা গাড়িতে ওঠার পর থেকে যেন একরকম অভ্যাসের মতো হয়ে গেছে।
এই হাইওয়েটা পাহাড় কেটে বানানো। ওদের জিপটা যখন পাহাড়ের গা ঘেঁষে উপরের দিকে উঠতে লাগল‚ এক অদ্ভুত অনুভূতি হলো সবার। গাড়ির জানালা দিয়ে মারিশা বাইরে তাকাতেই ওর মনে হলো যেন পৃথিবীর চূড়ায় উঠে যাচ্ছে সে। রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে উপরে উঠে গেছে। আর গাড়ি যখন একেকটা বাঁক পার হচ্ছে‚ তখন বুকের ভেতর একটা শিহরণ বয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভারের দক্ষ হাতে গাড়ি কখনো মসৃণভাবে‚ আবার কখনো সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে এগিয়ে চলছে।
এই ঝাঁকুনি‚ ঘনঘন বাঁক আর গাড়ি হঠাৎ হঠাৎ ওঠানামার সময় বিপত্তি ঘটে গেল মারিশার সঙ্গে। দীর্ঘ চার বছর পর এই সফর ওর৷ এই চার বছরে সেই পুরনো জোশটা আর নেই৷ মানসিক ও শারীরিক নানান অসুখে আর ধকলে এক দুর্বল শিশুর শরীরে পরিণত হয়ে গেছে ওর শরীরটা৷ ক্লান্তি আর কেমন অস্বস্তি ছেয়ে গেল ওর শরীরে৷ ঠান্ডা ঘাম আর মাথাব্যথা শুরু হলো‚ মাথা ঘুরতেও লাগল৷ কিন্তু বুঝতে দিতে চাইল না কাউকে৷ কারণ‚ ওদের দলে যুক্ত হওয়ার লোভে সে বলেছিল‚ ওকে নিয়ে কোনো সমস্যায় ভুগতে হবে না কাউকে।
অথচ ও টের পাচ্ছে না‚ পাশে বসা এক জোড়া তীক্ষ্ণ চাউনি অনেক আগে থেকেই ওর অসুস্থতা ধরে ফেলেছে। কেবল চুপচাপ দেখে যাচ্ছে শেহনান। সে অপেক্ষায় আছে‚ কখন ঝামেলাটা নিজে মুখ ফুটে প্রকাশ করবে।
শেষ পর্যায়ে মারিশা আর পারলই না অসুস্থতা আড়াল রাখতে৷ চেহারায় ঘাম বেড়ে গেল‚ বমি বমি ভাব শুরু হলো বেচারির৷ ব্যাগের ভেতর থেকে একটা চকলেট বের করে মুখে পুরল দ্রুত৷ কিন্তু তাতে আরও বেশি বিপদে পড়ল সে। পেট পাকিয়ে উঠল সঙ্গে সঙ্গেই।
আর এদিকে ওর চেহারার ভাবটা দেখেই শেহনান বুঝে ফেলল কী ঘটাতে চলেছে মেয়েটা। কোন এক ফাঁকে যেন পলিথিন হাতের মধ্যে নিয়ে সে প্রস্তুত হয়েই ছিল। মারিশা মুখ চেপে ধরে পলিথিন খুঁজতে শুরু করবে‚ তার আগেই সে এগিয়ে দিল৷ অবাক হওয়ার বা খুশি হওয়ার সময় নেই মারিশার। খপ করে পলিথিনটা ধরেই হড়বড়িয়ে বমি করে ফেলল৷ তা দেখে গাড়ির সবাই একটু চিন্তিত হলো৷
“ওনার তো দেখি মোশন সিকনেস আছে”‚ পেছন থেকে দিব্য বলে উঠল।
কেউ কোনো উত্তর দিল না৷ পরাগ দ্রুত পানি এগিয়ে দিল শেহনানকে। বমিটা বেচারির একবারেই থামল না৷ পেটের সবটা উগড়ে দিয়ে শরীরটা যখন একেবারে নিস্তেজ হলো ওর‚ শেহনান তখন পানির সঙ্গে হঠাৎ ঘুমের বড়ি ধরিয়ে দিল । বড়িটা দেখে কোনো প্রশ্নও করল না মারিশা। কাঁপা কাঁপা হাতে বড়িটা নিয়ে চুপচাপ খেয়ে মৃদু স্বরে শেহনানকে ধন্যবাদ জানাল৷
কোনো জবাবই দিল না শেহনান। নির্বিকার রূপে মাথাটা সিটে ফেলল আবার৷ মারিশাও একইভাবে চোখ বুজে পড়ে রইল। কিন্তু মনে মনে খুব চিন্তা হতে থাকল ওর‚ পোখরা পৌঁছে সুযোগ পেলেই শেহনান ওকে বাঁকা বাঁকা কথা শোনাবে খুব। তারপর হয়তো আর সঙ্গেও নেবে না এই বাহানা দেখিয়ে।
বাইরে তখন সবুজ পাহাড়ের সারি‚ তাদের ওপর দিয়ে বুনো মেঘের ছায়া খেলা করছে। পাহাড়ের গায়ে হালকা সবুজ ঘাসের আস্তরণ‚ তার ওপর ফুটে আছে নানা রঙের নাম না জানা বুনো ফুল। মনে হচ্ছে যেন কেউ তুলি দিয়ে যত্ন করে এঁকে দিয়েছে এই দৃশ্য। দুপুরের রোদে সেই সবুজ আরও যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে‚ আর ফুলের পাপড়িগুলো আরও ঝলমল করছে। মারিশার আর সেসব কিছুই দেখা হলো না।
কিছুক্ষণ পর জিপটা এক গভীর গিরিখাতের পাশ দিয়ে চলতে শুরু করল। নিচের দিকে তাকাতেই বুক কেঁপে উঠল পরাগদের। শত শত ফুট নিচে দেখা যাচ্ছে খরস্রোতা নদী‚ যা এই গিরিখাত তৈরি করেছে। এটা নিয়ে সবার মধ্যে আলোচনা শুরু হলে কৌতূহলে মারিশা চোখ খুলে জানালার বাইরে তাকাতে গেল৷ তখনই পাশ থেকে চাপাস্বরে ধমক এল‚ “হচ্ছেটা কী? আবারও বমি করার সাধ হয়েছে?”
থতমত খেয়ে থেমে গেল মারিশা। শেহনানের দিকে তাকাতেই শেহনান বিরক্ত নিয়ে একই গলাতে বলল‚ “গাড়ি অনেক ওপরে এখন৷ নিচে তাকালেই আবার মাথা ঘুরবে না? বারবার বমি করে সবাইকে জ্বালাতন করলে এখানেই ফেলে যাব আমি।”
মারিশা মনঃক্ষুণ্ন হলো বেশ৷ অবশ্য মনঃক্ষুণ্ন সেই তখন থেকেই‚ যখন থেকে শেহনান বাজে আচরণটা বেশি করছে।
“কারও অসুস্থতায় এভাবে কেউ বিরক্ত হয়?” মনমরা হয়ে বলল সে।
কিন্তু শেহনানের কাছে ওর ব্যথিত মুখ‚ ব্যথিত কণ্ঠ‚ কোনোটাই গুরুত্ব পেল না। জবাবে আরও রূঢ় হয়ে বলল‚ “আমি হই। আপনার মতো জঞ্জালের বেলাতে আরও বেশি হই।”
নিজেকে ‘জঞ্জাল’ বলতে শুনে কষ্ট তো পেলই মারিশা৷ অভিমানও হলো‚ রাগও হলো৷ রাগে-দুঃখে সোজা হয়ে বসে একদম জানালার বাইরে মুখ বাড়াল। আর ওর এই জেদে ভরা ত্যাড়ামি দেখে শেহনানের মেজাজও খারাপ হলো৷ কিন্তু বলল না কিছুই। শান্ত রাখল নিজেকে।
বাতাসের ঝাপটায় ঘুমটা চোখজুড়ে নেমে আসতে চাইলো মারিশার৷ কিন্তু চোখ বুজলেই তো দেহমন জুড়ানো এই প্রকৃতির দর্শনটা আর হবে না৷ নদীটা দেখতে দেখতে এতটাই বুঁদ হয়ে গেল সে‚ শেহনানের ব্যবহার আপাতত মাথাতেই থাকল না।
নদীর জল এত স্বচ্ছ যে এর তলদেশের প্রতিটি নুড়ি পাথর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। সূর্যের আলোয় সেই জল ঝলমল করছে৷ লাগছে যেন হাজার হাজার হীরার টুকরো ছড়িয়ে আছে। নদীর কুল কুল শব্দ গাড়ির কাঁচ ভেদ করে কানে আসছে সবার। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন এক বিশাল অজগর অলসভাবে শুয়ে আছে‚ আর তারই গা ঘেঁষে ওদের জিপটা এগিয়ে চলছে। গিরিখাতের দু’পাশেই বিশাল বিশাল সব পাথর৷ যেগুলো হাজার হাজার বছর ধরে ক্ষয় হয়ে এক মসৃণ রূপ নিয়েছে। এই দৃশ্য দেখলে কি আর চোখ বুজতে মন চায়?
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়েছে৷ দুই ঘণ্টা মতো পথ চলার পর ওদের গাড়ি থামল মলেখু নামের এক জায়গায়। ড্রাইভার নেপালি সুরে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে ওদের জানাল‚ “ইধার পপুলার স্টপেজ হ্যায়‚ স্যার। সাব লোগ ফ্রেশ ফিশ টেস্ট কারনে আতা।”
যদিও পরাগ আর মারিশা বাদে এ বিষয় জানা বাকিদের৷ গাড়িটা জনপ্রিয় একটা রেস্তোরাঁর সামনে থেমেছে৷ মারিশা বাদে নেমে পড়ল সবাই৷ চারপাশটা দেখতে দেখতে কী নিয়ে যেন কথাও চলতে থাকল ওদের মধ্যে।
আশপাশের পরিবেশটা শান্ত আর নিরিবিলি। এখানে কোনো শহুরে কোলাহল নেই। উঁচু উঁচু পাহাড়‚ তার মধ্যে থেকে ঝিরঝির করে বয়ে যাওয়া ঝরনা আর নদীর পাথর। বেশিরভাগ জায়গায় বাঁশ‚ গাছপালা আর লতা-পাতা। এর মধ্যে দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে এমন এক আলো-ছায়ার পরিবেশ তৈরি করছে‚ সারা পথের ক্লান্তি যেন ভুলে গেছে সবাই-ই। নদীর ধারে কিছু বাচ্চারা খেলছে‚ মাছ ধরছে। কেউ কেউ নদীতে ডুব দিয়ে সাঁতারও কাটছে।
মারিশা গাড়িতে বসেই দেখতে লাগল। কথাবার্তার ফাঁকে শেহনানের হঠাৎ চোখ গেল ওর দিকে৷ গাড়ি থেকে এখনো নামেনি দেখে এগিয়ে এল সে৷ তা দেখে জানালার কাছ থেকে মুখটা সরিয়ে বসল মারিশা। অভিমানটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল আবার। কিন্তু সেসবে পরোয়া করার সময় কই শেহনানের? সে তো কিসের আক্রোশে কেবল ওকে ধারাল কথার বাণে ক্ষত-বিক্ষত করতেই উৎসাহী৷
চাপা গলায় মারিশাকে বলে উঠল সেই কটাক্ষের সুরে‚ “আপনার জন্য কি ইনভাইটেশন লেটার আনতে হবে? নামছেন না কেন?”
বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২
“আমি কিছু খাবো না”‚ মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে কপট ভার মুখ করে বলল সে।
“এত গোশা ম্যানেজের সময় নেই আমার”‚ গলা নামিয়েই চিড়বিড়িয়ে বলল শেহনান‚ “আপনাকে আহ্লাদ দেওয়ার চাকরিও নিইনি আপনার বাপ-ভাইয়ের থেকে। এসব ত্যাঁদড়ামি করলে একদম ঘাড় ধরে নামিয়ে দেব গাড়ি থেকে।”
