ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৮
ছায়া
সকাল ৯ টা তালুকদার বাড়িতে আজ উৎসবের আমেজ। চারপাশে ফুলের গন্ধ ছেলেমেয়েরা দৌড়ঝাঁপ করছে। টেবিলে রঙের প্যাকেটের স্তূপ আজ আবির খেলার দিন। সবার ড্রেস কোড আজ “সাদা” রিমা, হালিমা, পরি, রাফি, রায়েদ, আদিব, সায়েম, নোহা,নেহা সবাই সাদা পোশাকে রঙের মেলা তৈরি করেছে।
আরিয়ানও আজ ব্যতিক্রম নয় পরেছে একটা খাঁটি সাদা পাঞ্জাবি সূক্ষ্ম সোনালি এমব্রয়ডারিতে কলার ঘিরে হালকা ঝিলিক বুকের কাছে তিনটা বোতাম খোলা নিচে ফিট সাদা পায়জামা হাতে সোনালি ঘড়ি। চুল সামান্য এলোমেলো চোখে সেই পরিচিত গম্ভীর গভীরতা। সে বসে আছে বাগানের এক কোণে কাঠের চেয়ারটায় হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ চোখ ফোনের স্ক্রিনে স্থির চারপাশের উল্লাসে যেন তার কোনো আগ্রহ নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো রঙের খেলা। রায়েদ আর আদিব একে অপরের মুখে আবির লাগিয়ে হাসছে হালিমা চিৎকার করে রাফির মুখে লাল রঙ ছুড়ে দিলো। সবাই লাল, নীল গোলাপি রঙে ভরে গেছে। শুধু একজন এখনো একদম ফর্সা পরিষ্কার আরিয়ান। রাফি দূর থেকে চিৎকার করে বলল,
রাফিঃ- ভাই এক চিমটি রঙ লাগিয়ে দিই?
আরিয়ান কফিতে চুমুক দিয়ে নির্বিকারভাবে বলল,
আরিয়ানঃ- কেউ আমার গায়ে রঙ লাগানোর চেষ্টা করলে আজ কফি নয় রঙই খাওয়াবো।
আরিয়ানের কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো কেউ আর সাহস করলো না আরিয়ান কে আবির দিতে এমন সময় হঠাৎ পেছনের দিকের পথ দিয়ে একটা হালকা বাতাস বয়ে গেলো আর সেই হাওয়ার সঙ্গে এল ইলা।
ইলার গায়ে সাদা চুড়িদার কাঁধে লাল ওড়না হালকা বাতাসে উড়ছে।কানে ছোট লাল জুমকা চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা গ্লসি রঙ মুখে একরকম শিশুর মতো চঞ্চলতা।চুলগুলো খোলা রোদে চকচক করছে।
ইলা এক মুহূর্তে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করলো সবাই মজা করছে আরিয়ান একা বসে আছে একদম রাজা-মেজাজে। ইলার ঠোঁটে হালকা এক চতুর হাসি ফুটে উঠলো। চুপিচুপি পেছন দিক দিয়ে এগিয়ে গেলো। আর ঠিক যখন আরিয়ান ফোনে চোখ রাখছিল ইলা হঠাৎ করে এক মুঠো লাল আবির আরিয়ানের গালে ছুঁয়ে দিয়ে বলল,
ইলাঃ- শুভ সকাল মিস্টার রাক্ষস
তারপর দৌড়ে পালিয়ে গেলো আরিয়ান এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেলো তারপর ধীরে হাত তুলে গালে ছোঁয়ালো সাদা ত্বকে এখন গাঢ় লাল রঙ যেন কারও স্পর্শে রক্তিম আগুন লেগেছে। আরিয়ান এর ঠোঁটে প্রথমে এক চিলতে হাসি তারপর নিচু স্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- বজ্জাত মেয়ে দেখাচ্ছি “মজা” কাকে বলে।
পরের মুহূর্তে চেয়ার থেকে উঠে সে তেড়ে গেলো ইলার পিছু।ইলা হাসতে হাসতে দৌড়াচ্ছে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠছে পেছনে দৌড়াচ্ছে আরিয়ান চোখে এক অদ্ভুত তেজ আর আনন্দের ঝিলিক।ছাদে পৌঁছে ইলা এক কোণে গিয়ে হাঁপাতে লাগলো।
চোখ বন্ধ করে ঠোঁট কামড়ে ভাবছে “আল্লাহ এখন ধরা পড়লে শেষ” চোখ খুলতেই দেখে সামনের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ান। চোখে সেই গভীর দৃষ্টি মুখে অর্ধেক হাসি অর্ধেক শাস্তি। ইলার বুক ধকধক করছে সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে দুহাত জোড় করলো,
ইলাঃ- দেখুন প্লিজ মারবেন না এটা ডেয়ার ছিলো।হালিমা ষ্টুপিডটা দিয়েছে আমি চাইনি আপনাকে রঙ দিতে প্লিজ রাগ করবেন না।
আরিয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।তার পদক্ষেপের শব্দ শুনে ইলার নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে গেলো।আরিয়ান একে বারে কাছে এসে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠস্বর নিচু গম্ভীর কিন্তু অদ্ভুত মায়ায় ভরা
আরিয়ানঃ- ডেয়ারটা তো শেষ হয়নি এখনো
ইলাঃ- কি মানে?
আরিয়ান হালকা হেসে বলল,
আরিয়ানঃ- আবির কে দিয়েছে আপনি!কিন্তু যে রঙটা আমার গালে আছে সেটা ফেরত নিবেন না…তাই এখন সেটা ফিরিয়ে দিচ্ছি।
এরপর ধীরে ধীরে আরিয়ান হাত তুললো ইলার গাল ছুঁয়ে আঙুলে জমে থাকা লাল আবিরটুকু তুলে ইলার গালে ছোঁয়ালো দুজনের গাল এখন একই রঙে রাঙা। চোখে চোখ পড়লো ইলার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠলো ঠোঁট কাঁপছে চোখে যেন রঙ নয় একরকম অজানা ঝড় আরিয়ান খুব নিচু স্বরে বলল,
আরিয়ানঃ- এখন তো রঙের হিসাব সমান হলো তাই না?
ইলা কিছু বলার আগেই আরিয়ান আরও একটু এগিয়ে এলো, ইলার গলায় ঝুলে থাকা লাল ওড়নার এক কোণ তুলে নিলো হাতে তার পরে নিজের গাল মুছে নিয়ে বলল
আরিয়ানঃ- সাবধানে থাকবেন এই লাল রঙ মানুষকে শুধু রাঙায় না ভালোবাসতেও শিখায়।
ইলা স্থির চোখের পলক ফেলতেও পারছে না হাওয়ায় ওড়না উড়ছে আকাশে মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে দুজনের মুখে। সেই আলোয় তাদের গালে লাল রঙ ঝিলমিল করছে যেন ভালোবাসার শুরুটা রঙের খেলায় লুকিয়ে ছিলো এতদিন। আরিয়ান হালকা হেসে পেছনে এক কদম সরলো বলল
আরিয়ানঃ- এবার নিচে যান না হলে সবাই ভেবে নেবে আমি আপনার ওপর রঙের বদলা নিচ্ছি।
ইলা ঠোঁটে একরাশ লজ্জা মেশানো হাসি নিয়ে নিচের দিকে দৌড়ে নামলো। আরিয়ান দাঁড়িয়ে রইলো ছাদে গালের রঙ ছুঁয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল
আরিয়ানঃ- ডেয়ার না মনে হয় “ডেঞ্জার” ছিলো।
ইলা নিচে নেমে গেলো দূরে থেকে পরি আর হালিমা দেখছে ইলা অন্য সাইডে চলে গেলো হালিমা ফিসফিস করে বলে,
হালিমাঃ- এই ডেয়ার টা আমি দিয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু রেজাল্ট এমন হবে ভাবিনি।
দুপুর গড়িয়ে এসেছে তালুকদার বাড়ি এখন একটু শান্ত পরিবেশ সকালের রঙের উল্লাসের পর সবাই ক্লান্ত। বাথরুম থেকে ভেসে আসছে পানির শব্দ আর হাসির টুকরো টুকরো আওয়াজ। ইলা আর হালিমা দুজনেই গোসল শেষ করে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছে। ইলার লম্বা ভেজা চুল গলা বেয়ে পিঠে পড়েছে মুখে হালকা পানি টলমল করছে। হালিমা পাশে আয়নায় নিজের মুখে ময়েশ্চার লাগাতে লাগাতে বলল
হালিমাঃ- তারাতাড়ি চুল শুখা দেরি হয়ে যাচ্ছে।
ইলাঃ- তুই তো এমন ভাবে বলছিস যেন আজ পরির বিয়ে না তোর বিয়ে
ঠিক তখনই দরজায় পরি এসে দাঁড়ালো পরি বিরক্ত হয়ে বলল
পরিঃ- তোদের এখনো হলো না যাবি কখন।
ইলাঃ- এইতো হয়ে গেছে চল চল
তিনজন একসাথে বেরিয়ে পড়লো শহরের বাতাসে এক অদ্ভুত উত্তেজনা আজ বিয়ের দিন আজ সবকিছু নতুন।পার্লারের দরজায় ঢুকতেই ভেতরের সুগন্ধে মন ভরে গেল। চুল শুকানোর হালকা শব্দ,নেইল পলিশের গন্ধ, আলো ঝলমলে আয়নার সারি
সবার আগে পরিকে রেডি করে দিলো। পরি ইলা আর হালিমার সামনে এসে দাড়ালো আজ পরির রূপ যেন অন্য গ্রহের আলো।পরি পরেছে লাল আর সোনালি কাজের বেনারসি মাথায় ভারি টিকলি,গাঢ় স্মোকি আই মেকআপ, ঠোঁটে ডিপ রেড লিপস্টিক হাতে চুড়ির তার গলায় সোনার নেকলেসের নিচে পড়ে আছে একটুখানি লজ্জা, মুখে এমন এক প্রশান্ত হাসি যেন সে জানে আজকের দিনটি শুধু তার।হালিমা তাকিয়ে চুপ হয়ে গেলো ইলা মৃদু গলায় বলল
ইলাঃ- তুই আজ সত্যি একদম রূপকথার বউ লাগছিস।
ইলা আর হালিমা দুজন পাশাপাশি বসল একজন মেকআপ আর্টিস্ট এসে জিজ্ঞেস করলো “আজকের ইভেন্ট বিয়ের তাই না? ইলা মাথা নেড়ে বললো,
ইলাঃ- হ্যাঁ আমরা বউয়ের বোন আর ফ্রেন্ড।
তারপর শুরু হলো সাজের খেলা ইলার গায়ে আজ কালো রঙের অর্গাঞ্জা শাড়ি,সোনালি সুতোর সূক্ষ্ম কাজ, গলায় ছোট মুক্তোর চোকার,কানে লম্বা দুল। চুলগুলো হালকা ওয়েভ করে খুলে রাখা চোখে হালকা কাজল ঠোঁটে সফট ন্যুড লিপস্টিক।তার মুখে একরাশ শান্ত কিন্তু তীব্র সৌন্দর্য যেন কালো রঙটা তার সত্তারই অংশ।
হালিমা পরেছে গোলাপি রঙের সিল্ক শাড়ি তাতে রুপালি পাড়।তার মেকআপটা একটু গ্লোয়ি চোখে হালকা গোলাপি শেড, ঠোঁটে হালকা পিচ লিপস্টিক চুলটা মাঝখানে সিঁথি করে নিচু বান। তার হাসিটাই তার মেকআপের সবচেয়ে সুন্দর অংশ নিখাদ মিষ্টি প্রাণবন্ত।
পরি নিজের সাজে ড্রেসারদের চোখ ধাঁধিয়ে দিলো বেনারসির ঝিলিক, চোখের কাজল, ঠোঁটে আত্মবিশ্বাসের লাল রঙ। সবাই তাকিয়ে রইল যেন একদিনের জন্য পুরো শহরের সৌন্দর্য সেদিন এই তিন মেয়ের মাঝেই বন্দি হয়েছে।
বিকেল হয়ে এসেছে কোমিউনিটি সেন্টারের বাইরে গাড়ির ভিড় ফ্লোরাল গেটের নিচে অতিথিদের ঢল। ইলা, হালিমা, আর পরি গাড়ি থেকে নামলো তিনজনের উপস্থিতিতেই যেন হাওয়ার গন্ধ বদলে গেলো।
ভিতরে ঢুকেই দেখা গেলো সবাই ব্যস্ত কেউ গিফট নিচ্ছে,কেউ সেলফি তুলছে কেউ গানের তালে নাচছে। মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে পরি মৃদু হেসে বলল
পরিঃ- তোমরা একটু চারদিকে ঘুরে এসো আমি মেকআপ ঠিক করে আসছি।
ইলা আর হালিমা তখন হলে ঢুকে চারপাশে তাকালো। মৃদু আলোয় এক কোণে দেখা গেল রায়েদ আজ সে ব্ল্যাক স্যুটে হ্যান্ডসাম মুখে সেই ফিল্মি হাসি। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাবাসুম হালকা ব্লু ড্রেসে চুলে ফুল গুঁজে রেখেছে। রায়েদ হাসতে হাসতে বলছে
রায়েদঃ- জানো তুমি হাসলে পুরো ঘরটা উজ্জ্বল হয়ে যায়।
তাবাসুম লজ্জায় চুল সরিয়ে বলল
তাবাসুমঃ- আপনি কিন্তু মিষ্টি কথা খুব ভালো বলতে জানেন।
এই দৃশ্য দেখে হালিমার ভ্রু কুঁচকে গেল সে মনের মধ্যে বলল
হালিমাঃ- এই ছেলে ভালো হবে না একটুও সিরিয়াস না ফ্লার্টিং করে বেড়ায় সারাক্ষণ।
ইলা ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
ইলাঃ- চল আমরা অন্যদিকে যাই।
দুজন ঘুরে চলে যাচ্ছিলো ঠিক তখনই রায়েদ হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে হালিমাকে দেখে ফেলল। আর সেই মুহূর্তেই তার মুখের হাসি থেমে গেল। গোলাপি রঙের শাড়িতে হালিমাকে দেখে সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল যেন সময় থেমে গেছে। তার চোখে অবাক দৃষ্টি কানে ছোট দুল, ঠোঁটে মৃদু হাসি সব মিলিয়ে এক অন্যরকম জাদু। তাবাসুম কিছু বলছিলো কিন্তু রায়েদের কানেই যাচ্ছিল না রায়েদ হঠাৎ বলল
রায়েদঃ- এক্সকিউজ মি আমি একটু আসছি।
তাবাসুম অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো রায়েদ হালিমার দিকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল শুধু মনে মনে ভাবল
রায়েদঃ- এই মেয়েটা গোলাপি শাড়িও ম্লান করে দেবে এমন আলো নিয়ে আসে।
ভিতরের সবাই তখন অপেক্ষায় আছে কখন বর আসবে কখন বর আসবে। একটু পরেই বাইরে গাড়ির হর্ণ শোনা গেল সঙ্গে সঙ্গে ছেলেরা চিৎকার শুরু করলো “বর চলে এসেছে বর চলে এসেছে” আর সেই মুহূর্তে মেয়েরা সবাই একসাথে গেটের সামনে ছুটে গেল
ইলা, হালিমা, রায়েদ, তাবাসুম, নোহা, নেহা, রিমা সবাই মিলে একেবারে “গেট বন্ধ” করে দাঁড়ালো। সবার হাতে রঙিন বোর্ড তাতে লেখা নানা ফানি ক্যাপশন
রিমাঃ- “তোমার হালু হওয়া ফ্রি না ভাই”
নোহাঃ- “গেট খুলবে না আগে কাশ দেখাও”
হালিমাঃ- “বউয়ের বান্ধবীরা ট্যাক্স ছাড়া গেট খুলবে না”
নেহাঃ- “ক্যাশ দাও তারপর প্রেমের ক্যাশব্যাক নাও”
ইলাঃ- “বরের ভেতরে ঢুকতে হলে ঘুষ দিতে হবে”
রায়েদঃ- “দুলাভাই এক লক্ষে ডিল না দিলে গেট সিল”
গেটের ওপাশে আদিব দাঁড়িয়ে আছে অফ-হোয়াইট শেরওয়ানি, ঠোঁটে আত্মবিশ্বাসী হাসি।
আদিবঃ- আচ্ছা কত টাকা লাগবে গেট খুলতে?
ইলাঃ- বেশি না ভাইয়া এক লক্ষ টাকাই দিবেন।
আদিবঃ- এক লক্ষ একটু কমানো যায় না নাকি?
ইলা, হালিমা, রিমা, নেহা,নোহা (একসাথে):
না না না এক টাকাও কমানো যাবে না।
আদিবঃ- তোরা তো ছেলে পক্ষের তাহলে ঐপাশে কেন?
রিমাঃ- আজ আমরা বউ পক্ষের স্পেশাল গেস্ট।
চারদিকে হাসির রোল পড়ে গেল ঠিক তখন করিম উদ্দিন তালুকদার গেটের কাছে এসে কড়া গলায় বললেন
করিম উদ্দিনঃ- এই সব কি হচ্ছে তারাতাড়ি গেট ছাড়ো বরকে দাঁড় করিয়ে রাখলে হবে না।
ইলা চোখ বড় করে বলল
ইলাঃ- না আমাদের দাবি না মানলে জামাই গেটেই থাকবে।
রফিকুল তালুকদার একটু রাগ করে ইলাকে বললেন
রফিকুলঃ- ইলা এখন এসব করার সময় না সবাই দেখছে।
ইলা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে দাঁড়ালো আদিব হাসতে হাসতে পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করল।
আদিবঃ- এই নাও তোদের ডিল ফাইনাল এবার গেট খোলো।
টাকা হাতে পেয়ে হালিমা মিষ্টি হেসে বলল
হালিমাঃ- ঠিক আছে দুলাভাই আপনি এখন ভিআইপি এন্ট্রি পাবেন।
সে এক গ্লাস শরবত এগিয়ে দিয়ে বলল,
হালিমাঃ- এই নিন গেট ওপেন সেরিমনি শরবত।
আদিব শরবত খেলো তারপর হাসতে হাসতে ফিতা কাটলো আর সবার তালি ও উল্লাসে গেট খুলে গেল। আদিব ভেতরে ঢুকলো পাশে বন্ধু-বান্ধব ভাইরা সবাই সবার মুখে হাসি ফুলের ঝড়ের মতো পরিবেশ।
সবাইকে ছাপিয়ে একদম শেষে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো আরিয়ান।আজ তার লুকে এমন এক পরিমিত সৌন্দর্য যে চোখ সরানো দায়। আরিয়ান পরেছে কালো রঙের শেরওয়ানি, গলায় হালকা রেশমি দোপাট্টা ঝুলছে,পায়ে চকচকে কালো জুতো। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে রাখা, ফেসে একরাশ পরিণত পুরুষের আকর্ষণ। চোখে সেই ঠান্ডা দৃষ্টি কিন্তু আজ একটু অন্যরকম যেন কোথাও একটুখানি আগুন আছে।
ভেতরে ঢোকার সময় তার চোখ পড়লো ইলার ওপর ইলা সাইডে দাঁড়িয়ে আছে কালো শাড়ি মুখে হালকা মেকআপ চোখে নীরবতা। তাদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য মিললো কেউ কিছু বললো না কিন্তু বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল। আরিয়ান চোখ সরিয়ে নিলো যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে সোজা ভেতরে চলে গেলো ইলা শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই বিয়ের মঞ্চে বসে পড়লো মোল্লা সাহেব এসে বসলেন মোল্লা সাহেব বিয়ে পড়ানো শুরু করলো
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” আজকের এই সুন্দর শুভক্ষণে উপস্থিত সবার সম্মুখে আমি বর মোহাম্মদ আদিব খান এবং কনে মিস পরি তালুকদার এর নিকাহ পড়াচ্ছি।
মোল্লা সাহেবঃ- আপনি কি সম্মতি দিলেন এই কনেকে নিকাহ করতে?
আদিবঃ- জি কাবুল (তিনবার উচ্চারণ করলো “কাবুল, কাবুল, কাবুল”)
তারপর মোল্লা সাহেব কনের ঘরে গেলেন মোল্লা সাহেব পরিকে বললেন
মোল্লা সাহেবঃ- তুমি কি সম্মতি দিচ্ছো আদিবকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে?
পরিঃ- জি কাবুল। (সে-ও তিনবার বলল “কাবুল, কাবুল, কাবুল”)
চারপাশে “আলহামদুলিল্লাহ” ধ্বনি উঠলো সবাই তালি দিলো।মোল্লা সাহেব দোয়া পড়ে বললেন “আল্লাহ তাদের দাম্পত্য জীবন বরকত দান করুন”
বিয়ে শেষ সবাই মিষ্টি মুখ করছে কেউ ছবি তোলায় ব্যাস্ত কেউ হাসি ঠাট্টায় ব্যস্ত সব মিলিয়ে একটা পরিপূর্ণ অনুষ্ঠান।রাত প্রায় ১২ টা ছুঁই ছুঁই সবাই গাড়িতে করে বাড়ির পথে।
ইলা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে আলো ঝলমলে শহরটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে আর তার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা নীরবতা।
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা বাইরে পূর্ণিমার আলো উঠেছে বাতাসে হালকা গোলাপ এর ঘ্রাণ মিশে আছে। তালুকদার বাড়ির হেস্ট হাউজে সাজানো হয়েছে বাসর ঘরটা সাদা গোলাপি পর্দা,ফুলের মালা,মোমবাতির মৃদু আলো, আর বিছানায় গোলাপ পাপড়ির ছড়ানো মিষ্টি সাজ।
পরিকে আগেই ঘরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে লাল বেনারসি, গলায় ভারি সোনার হার, ঠোঁটে হালকা লাল রঙ, চোখে লাজের আলো। হাতদুটো মেহেদিতে রাঙানো কাঁপছে অল্প অল্প করে। বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকপুক করছে আজ থেকে এক নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে।
বাইরে তখন সবাই মজা করছে রিমা,নোহা, নেহা,হালিমা, রায়েদ সবাই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে, “না না টাকা না দিলে ঢুকতে পারবে না”
আদিব হাসতে হাসতে বলল,
আদিবঃ- তোরা টাকা নে কিন্তু একটু ছাড় দে জামাইকে একটু ঘরে ঢুকতে দে।
হালিমাঃ- না জামাই সাহেব ছাড় বলে কিছু নাই আজ আপনি বন্দী।
শেষে সবাই অনেক হাসি-ঠাট্টার পর ১০ হাজার টাকা নিয়ে অবশেষে গেট খুলে দিল আদিব হাঁটতে হাঁটতে বলল,
আদিবঃ- আজ তো আমারই বিয়ে তবু মুক্তি কিনতে হলো।
ইলা আগেই চলে গেছে গাড়ি থেকে নেমে কারো সাথে কোনো কথা না বলে। আদিব রুমে ডুকেছে এদিকে সবাই যে যার ঘরে চলে গেলো হালিমা ইলার রুমের দিকে যাচ্ছিলো। ঠিক সেই সময় রায়েদ পিছোন থেকে হালিমার হাত ধরে ফেলে।
হালিমা পিছু ঘুড়ে দেখে রায়েদ হালিমা কিছুটা অবাক হয়ে রায়েদ হাটু গেড়ে বসে একটা গোলাপ দিয়ে হালিমাকে প্রোপোজ করে।
রায়েদঃ- ফাইলে ফাস্ট কাউকে দেখে আমার হার্টবিট বেরে গেছে আর সেটা হচ্ছো তুমি। তাই আমি দেরি করতে চাইনি
“I Love You”
হালিমাঃ- আপনার এই ট্রিক্স অন্য কোথায় ট্রাই করবেন মিস্টার ভন্ড। আমি কোনো দিন আপনাকে ভালোবাসবো না আর না আপনি আমার ভালোবাসার যোগ্য।
হালিমা আর কোনো কথা না বলে চলে গেলো রায়েদ বসা থেকে উঠে দারিয়ে থাকলো কোনো কথা বলল না।
আদিব ঘরে ঢুকেই দরজা হালকা বন্ধ করে দিল ঘরেনিস্তব্ধতা শুধু মোমবাতির ঝিকিমিকি আলো পরির ঘোমটা ঢাকা মুখ আর বাতাসে কাচাফুলের গন্ধ। আদিব কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল তারপর ধীরে ধীরে বলল,
আদিবঃ- এতক্ষণ সবাই কথা বলল হাসল মজা করল এখন কেবল তুমি আর আমি।
পরি মাথা নিচু করে বলল,
পরিঃ- সবাই তোমাকে নিয়ে কত মজা করছিল তোমার মুখের ভাব দেখেই হাসি পাচ্ছে আমার।
আদিব একটু এগিয়ে এল মুচকি হেসে বলল,
আদিবঃ- আর তুমি তোমার হাসিটা তো সব হাসির রাজা হতে পারত।
পরি তাকাল একবার চোখে ভয়, লজ্জা, আর ভালোবাসার মিশেল আদিব ধীরে ধীরে তার ঘোমটা সরিয়ে দিল মোমবাতির আলোয় পরির মুখটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট, নরম গাল, চোখে চিকচিক করা পানি আদিব একচোখে তাকিয়ে বলল,
আদিবঃ- তুমি জানো আমি যতই দুষ্টুমি করি আসলে তোমার মত কাউকে চেয়েছিলাম লাইফ পার্টনার হিসেবে।
পরি মাথা নিচু করল কানে কানে বলল,
পরিঃ- তুমি খুব বদ এখনো দুষ্টুমি করছো।
আদিব হাসল তার কণ্ঠটা গভীর উষ্ণ তবু কোমল
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৭
আদিবঃ- বদই তো তোমার মতো একটা মেয়েকে ভালোবাসার জন্য একটু বদ না হলে হয়?
তারপর ধীরে ধীরে পরির হাতটা ধরল আঙুলের মেহেদির নকশার দিকে তাকিয়ে বলল,
আদিবঃ- এই হাতটা এখন থেকে শুধু আমার হবে আমি রাখব, আগলে রাখব, তোমার হাসির কারণ হবো।
পরি চোখ তুলে তাকাল চোখে লাজের ঝিলিক দুজনের চোখে চোখ পড়ল সময় যেন থেমে গেল মুহূর্তের জন্য। বাইরে আতশবাজির আওয়াজ ভিতরে নিস্তব্ধতা। আদিব ধীরে ধীরে পরির গালে হাত রাখল কপালে একটা নরম চুমু দিল।
মোমবাতির আলো হালকা নেচে উঠল তারপর শুধু মিষ্টি নিঃশ্বাসের শব্দ রাতটা ভরে গেল ভালোবাসার গন্ধে।
