ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৯
ছায়া
রাত তখন প্রায় ১ টা ছুঁইছুঁই বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে পর্দা দুলছে ইলা একা বসে আছে নিজের রুমে হালিমা ঘুমিয়ে পড়েছে ইলার মাথা ভরা চিন্তা আজকে সারাদিনের সব শব্দ হাসি সাজসজ্জা শেষে যেন বুকটা ভারী হয়ে আছে।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু ইলার চোখে ঘুম নেই। মনটা কোথাও হারিয়ে গেছে শাওনেরনের কথা, পুরোনো দিন, ছোটবেলার সেই হাসি তবুও আজ সে নিজেকে প্রতিজ্ঞা করেছে আর চোখের জল ফেলবে না। মন অন্যদিকে নিতে আবার ফোনটা হাতে তুলে গেম এ ডুকলো Free Fire স্ক্রিনে লগইন হতেই পুরোনো নামটা জ্বলে উঠলো
“Sizuka” গেমটা অনেকদিন বাদে খেলছে। সার্ভারে ঢুকতেই আশ্চর্য হয়ে গেল একটা পুরোনো আইডি অনলাইনে “Nobita” এই নামটা আগে থেকেই ওর ফ্রেন্ডলিস্টে আছে।ঠিক তখনই একটা ইনভাইটেশন পপ আপ করল স্ক্রিনে “Nobita to play a match with you.”
ইলার চোখ কেঁপে উঠল ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল সে Accept বাটনে চাপ দিল। লবিতে ঢুকতেই একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“তুমি চিনতে পারোনি তাই না?”
ইলা কেঁপে উঠল সেই কণ্ঠটা কেমন যেন পরিচিত লাগছে সে একটু থেমে বলল,
ইলাঃ- এইটা নবিতা ভাইয়ার তুমি সেই নবিতা ভাইয়া।
ওপাশ থেকে মৃদু হাসির আওয়াজ,
নবিতাঃ- হ্যাঁ সিজুকা আমি নবিতা তুমি কাল আমাকে চিনতে পারোনি তাই আমি নাম বদলে আগের নাম দিয়ে দিছি।
ইলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল গলার ভেতর দিয়ে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো,
ইলাঃ- তুমি এখনো এই গেম খেলো।
নবিতাঃ- তুমি এই গেমটা ছেরে গেছো তাই আমি থাকলেও তেমন খেলিনা কিন্তু প্রতিদিন একবার করে গেমে ডুকি
আর তখনই ইলার মনে পড়ল পাঁচ বছর আগের সেই দিনগুলো…
ফ্ল্যাশব্যাক পাঁচ বছর আগে:
তখন ইলা ক্লাস ৮ এ পড়ে নতুন নতুন ফোন হাতে পেয়েছে তার মায়ের আর সেই ফোনে আবিষ্কার করেছে এক নতুন জগৎ গেমের দুনিয়া। প্রথম প্রথম একা একাই Classic Match খেলত। হাত কাঁপত গুলি ঠিকঠাক চলত না, মাঝেমাঝেই মারা যেত।
একদিন হঠাৎই র্যান্ডম স্কোয়াডে ঢুকে যায় তিনজন অচেনা প্লেয়ার একজনের নাম ছিল Nabita অন্য দুইজনের Zoro আর Tanish গেম শুরু হতেই নবিতা বাকি দুইজনের সাথে কথা বলা শুরু করলো। ইলা মাইক্রোফোন অফ রেখে দিয়েছিলো কোনো কথা বলে নি। কিছুক্ষণ পড়ে নবিতাকে এনিমি মেরে দেয় নবিতা রিভাইব দিতে বলে কিন্তু বাকি দুইজনের কাছে টকেন ছিলো না।
নবিতাঃ- এইযে সিজুকা তোমার কাছে টকেন থাকলে রিভাইব দাও।
ইলা চুপ করে থাকে কিছু বলে না এটা দেখে নবিতা ইলাকে ধমক দেয় ইলা ভয়ে মাইক্রফোন অন করে বলে।
ইলাঃ- আমার কাছে টোকেন নাই তো।
এই টুকু কথা শুনে নবিতা স্তব্ধ হয়ে যায় নবিতা বলে
নবিতাঃ- তুমি নতুন না মনে হয় একদম beginner।
ইলা একটু ভয় পেয়েছিল,
ইলাঃ- হ্যাঁ আমি একটু নতুন গেমের কিছুই তেমন জানি না।
নবিতাঃ- চিন্তা করো না আমি তোমার পাশে আছি।
সে গেমটা হেরে গেলেও ইলার মন ভরে গেছিল। প্রথমবার কারও সাথে খেলতে খেলতে এমন মজা লেগেছিল। এরপর থেকে প্রতিদিনই নবিতা ইনভাইট পাঠাত ইলাও রেগুলার অনলাইন আসত।
দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠল নবিতা কখনো গেমে cover দিত, কখনো revive করত, আবার কখনো বলত,
নবিতাঃ- ইলা আজকের mission তুমি লিড করবা।
সেই দিনগুলোতে ইলা হাসত অনেক জীবনের ছোট কষ্টগুলো গেমের মধ্যেই হারিয়ে যেত। মাঝে মাঝে ওরা দুজন custom match খেলত আর নবিতা বলত,
নবিতাঃ- তুমি ভালো প্লেয়ার হবা শুধু practice করো।
ইলার রাগ উঠিলে নবিতা coustom খেলতো সব সময় মরে যেতো আর ইলার রাগ ভেঙে যেতো।কিন্তু কখনো কেউ কারো নাম জিগ্যেস করেনি।
কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন ইলার মা ফোন ভেঙে ফেলেন। গেম খেলার জন্য মা রাগ করেছিলেন খুব। সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল ইলা। মার ও খেতে হয়েছিলো ইলাকে অনেক তার পর থেকে আর গেম খোলেনি আর নবিতার সাথে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমান:
ইলার চোখে জল চলে এল সে হেসে বলল,
ইলাঃ- তুমি এত বছর পরেও এই গেমে আছো আমি ভাবতেও পারিনি।
নবিতাঃ- তুমি ফিরবে জানতাম তাই নাম বদলে রেখেছিলাম I’m Waiting।
ইলা হাসল চোখের কোণ ভিজে উঠল,
ইলাঃ- তুমি তাহলে সত্যি অপেক্ষা করেছিলে?
নবিতাঃ- ছাড়া গেমটা একদম ফাঁকা লাগতআজ মনে হচ্ছে পুরোনো দিনগুলো আবার ফিরে এসেছে।
ইলা চুপচাপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল গেমে ঢুকেছে ঠিকই, কিন্তু মনে হচ্ছে ফিরে এসেছে সেই কিশোর বয়সের দিনগুলোয় যখন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল একটা ভার্চুয়াল স্কোয়াডে। রাতটা গভীর হতে থাকল গেমের আওয়াজ তাদের হাসি আর স্মৃতির ঢেউ সব মিলিয়ে আবার নতুন এক গল্পের শুরু হলো।
রাত ভোর ইলা আর নবিতা গেম খেলল কথা বলল ভোর ৫ টা বাজে ইলার ঘুম পাচ্ছে তাই ইলা ঘুমনোর জন্য বিদায় নিচ্ছিলো নবিতা বলল
নবিতাঃ- সিজুকা আবার হারিয়ে যাবে না তো।
ইলাঃ- না এখন আর আমাকে আটকানোর কেউ নেই তাই আর হারাবো না।
ইলা গেম থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলো আমি এই ছেলের সাথে এত দিন ধরে খেলি এখনো নাম জানলাম না কে এই নবিতা থাক কালকে জেনে নিবো তারপর ইলা ঘুমিয়ে গেলো।
সকাল ৮ টা জানালার ফাঁক দিয়ে নরম আলো ঢুকছে বাইরে পাখির কলরব। ইলা তখনো গভীর ঘুমে বিছানার পাশে ফোনটা পড়ে আছে। রাতভর ফ্রি ফায়ার খেলতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হঠাৎই “থাপ্প” একটা ভারী শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।
ইলার মুখে হাত চেপে ধরলো ব্যথায় চোখ খুলে দেখল সামনে দাঁড়িয়ে সাবিহা বেগম চোখ লাল, মুখে তীব্র রাগ আর কষ্টের ছাপ।
ইলাঃ- আম্মু মারছো কেনো আমি কী করেছি?
সাবিহা বেগম গর্জে উঠলেন,
সাবিহাঃ- কি করেছিস জিজ্ঞেস করছিস নষ্টা মেয়ে তুই জানিস না তুই কি করেছিস?
ইলা হতভম্ব হয়ে গেলো সাবিহা বেগমের কথা শুনে
ইলাঃ- আম্মু আমি তো কিছুই করিনি।
সাবিহা বেগম নিজের ফোনটা তুলে ধরলেন।
সাবিহাঃ তুই এইটা দেখ।
ইলার কাঁপা হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিলেন তিনি স্ক্রিনে চলছে একটা ভিডিও ছাদের আলো এক মেয়ে আর এক ছেলেকে দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা মেয়ের মুখ নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে দুজনের মাঝে ভয়ানক কাছাকাছি এক দূরত্ব তারপর ছেলেটা মেয়েটাকে কিস করা শুরু করে। দুইজনই রোমান্টিকভাবে দাড়িয়ে আছে আর সেই মেয়েটা ঠিক ইলা। ইলার মুখ শুকিয়ে গেল চোখ বড় বড় হয়ে গেল ঠোঁট কাঁপছে। তার কণ্ঠে হতাশা ভয় অবিশ্বাস সব মিশে গেল একসাথে।
ইলাঃ- না… এটা আমি না… আমি না।
কিন্তু সাবিহা বেগম এক চিলতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন,
সাবিহাঃ- তুই না? তুই না হলে এই মুখ এই পোশাক, এই ছাদ সব এক রকম কেন? তুই আমার মেয়ে হয়ে এমন কাজ করলি ইলা?
ইলার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল ছেলেটার মুখ ভিডিওতে ব্লার করা তবুও বুঝা যাচ্ছে না কে। তবে সেটিংটা স্পষ্ট তাদের বাড়ির ছাদ আর ড্রেস সেম আরিয়ান আর ইলার মত। ইলার মনে আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল।
ইলাঃ- আম্মু আমি সত্যি করে বলছি এটা আমি না কেউ ভিডিও বানিয়েছে এডিট করেছে।
সাবিহা রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন,
সাবিহাঃ- এডিট সবাই এখন তো এটাই বলে পুরো বাড়ি এখন এই ভিডিও দেখছে। তুই যা করেছিস এখন আর লুকানো যাবে না।
ইলার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে দৌড়ে দরজার বাইরে গেল বাড়ির করিডোরে দাঁড়িয়ে আত্মীয়স্বজন, কাজিন, করিম উদ্দিন তালুকদার এমনকি রফিকুল তালুকদার পর্যন্ত সবাইয়ের চোখে ঘৃণা, তাচ্ছিল্য, আর ফিসফিসানি
“এই তো সেই মেয়ে…”
“ছাদে এমন কাজ করেছে…”
“ছেলেটার মুখ ব্লার কিন্তু মেয়েটা তো স্পষ্ট এই মেয়ে ছিলো”
ইলার কানে বাজছে সেই “ছি ছি” শব্দগুলো প্রত্যেকটা যেন তার বুকের ভেতর ছুরি হয়ে ঢুকছে সে কাঁপা গলায় বলল,
ইলাঃ- এটা কেউ যন্ত্র করে বানিয়েছে
কেউ বিশ্বাস করল না সাবিহা বেগম চেঁচিয়ে বললেন,
সাবিহাঃ- তুই এখন মুখ বন্ধ রাখ যতক্ষণ না আমি জানতে পারি তোর সাথে এই ছেলে কে আর এই ভিডিও কে করেছে, ততক্ষণ তুই কারো সামনে মুখ দেখাবি না।
ইলা হাঁটতে হাঁটতে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।চোখে পানি এসে গেল হাত কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে। সে নিজের ফোন খুলল কিন্তু তার ফোনে ভিডিওটা নেই।
ইলাঃ- কেউ… কেউ এটা বানিয়েছে… কিন্তু কে?
তার মনে ভেসে উঠল আরিয়ানের মুখ হঠাৎ সন্দেহ জেগে উঠল কিন্তু পরক্ষণেই মাথা নাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- না… আরিয়ান এমন করতে পারে না… সে তো আমার সাথেই ছিলো।
তবুও প্রশ্নের উত্তর মেলে না কীভাবে,কে এমন ফুটেজ তৈরি করল? কেন ছাদে এমন দৃশ্য যেটা তাদের মধ্যে কখনো ঘটেইনি?
সকাল ৮ টা ৩০ মিনিট বাড়ি জুড়ে হইচই, চিৎকার, কান্নার আওয়াজ পুরো পরিবেশ যেন ভেঙে পড়েছে। কেউ নিচের ড্রইংরুমে ছুটে যাচ্ছে কেউ আবার ভিডিও দেখে অবাক হয়ে নিজের মধ্যে ফিসফিস করছে “বিশ্বাস হয় না ইলা এমন কিছু করবে ঢাকায় কি লেখা পড়া করতে যায় নাকি এই সব শিখতে যায়”
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই উপরের ঘরে আরিয়ান তখনো আধো ঘুমে রাতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে ঘুমিয়েছিলো তাই এখনো ক্লান্ত শরীরটা ঠিক মতো সাড়া দিচ্ছে না।কিন্তু নিচের কোলাহল এত জোরে উঠছে যে ঘুম আর ধরে না।
চোখ খুলে চুল এলোমেলো ভাবে বিছানা থেকে উঠে বসে আরিয়ান চোখে ঘুম মুখে ক্লান্তির ছাপ গলা ভেজা কন্ঠে বলল
আরিয়ানঃ- রায়েদ কী হয়েছে নিচে এত চিল্লাচিল্লি কেনো?
রায়েদ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মুখটা কেমন গম্ভীর হাতে ফোন।
সে ধীরে ধীরে ফোনটা বাড়িয়ে দেয় আরিয়ানকে।
আরিয়ানঃ- নিজেই দেখে নাও কি হয়েছে।
আরিয়ান ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনে চোখ রাখতেই তার বুকটা ধপ করে নেমে গেলো। ভিডিও চলছে ছাদের ওপর ইলা পাশে দাঁড়িয়ে একটা ছেলে আর সেটা নিজেই আরিয়ান। তারপর হঠাৎ করেই দেখা গেলো আরিয়ান ইলাকে কিস করছে।
পেছনে স্লো মিউজিক এঙ্গেল এমনভাবে কাটা যে মনে হচ্ছে দুজনেই রোমান্টিক মূহূর্তে হারিয়ে গেছে আরিয়ান হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো চোখ বড় বড়।
আরিয়ানঃ- এটা কিভাবে সম্ভব? রায়েদ আমি তো এমন কিছু করিনি ভাই। এই ভিডিওটা ফেক এটা…এটা কেউ ইচ্ছে করে বানিয়েছে।
রায়েদঃ- আমি জানি তুমি এমন কিছু করো নি আমি তোমার থেকেও ভালো চিনি ইলাকে ও কখনো এমনি কিছু করতে পারে না। কিন্তু সবাই তা বুঝবে না বাড়ির বড়রা এখন নিচে বসে আছে ইলাকে মারছে জিজ্ঞেস করছে সাথে ছেলেটা কে ছিলো।
আরিয়ান যেন এক মুহূর্তও বসে থাকতে পারছে না তার বুক ধকধক করছে মুখের রঙ পাল্টে গেছে। এই কথা শুনেই সে তড়িঘড়ি নিচে ছুটে গেলো।
নিচে নামতেই যে দৃশ্যটা দেখল আরিয়ান সেটা তার চোখে সহ্য করার মতো না। ইলা কোণায় মেঝেতে বসে আছে চুল এলো মেলো গালে হাতের আঙুলের ছাপ,চোখে পানি সাবিহা বেগম চিৎকার করে বলছে,
সাবিহাঃ- তুই কার সাথে এই তামাশা করেছিস এই ছেলেটা কে বল।
ইলা কাঁদছে কণ্ঠটা কাঁপছে বার বার বলছে
ইলাঃ- আম্মু আমি সত্যি করে বলছি আমি এমন কিছু করিন।
সাবিহাঃ- চুপ এত বড় প্রমাণ দেখার পরেও মুখে মিথ্যা বলছিস?
তারপর আবার একটা চড় মেরে দেয় ড্রইংরুমে তখন উপস্থিত সবাই রফিকুল তালুকদার, করিম উদ্দিন তালুকদার, আদিবের বাবা-মা,আর আরিয়ানের বাবা-মা সবাই আছে পরিবেশটা ভারী যেন বাতাস জমে গেছে। ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়ানো আরিয়ান গর্জে উঠল
আরিয়ানঃ- আন্টি যথেষ্ট হয়েছে ইলা যা বলছে ও সত্যি বলছে আমরা এমন কোনো কাজ করিনি।
সবাই থমকে গেলো সাবিহা বেগম চমকে আরিয়ানের দিকে তাকালো আরিয়ান ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।তার চোখে একফোঁটা ভয় নেই শুধু রাগ আর অপমানের মিশ্র ছায়া।
আরিয়ানঃ- আমরা ছাদে ছিলাম ঠিকই কিন্তু এমন কিছু হয়নি।এই ভিডিওটা এডিট করা কেউ ইচ্ছা করে আমাদের ফাঁসিয়েছে।
কিন্তু কেউ যেন শুনতে চাইছে না আরিয়ানের কথা শেষ হতেই তার বাবা মেহেরাব খান উঠে দাঁড়ালেন চোখে রাগ কণ্ঠ ভারী ঠাসসস একটা জোরে চড় পড়লো আরিয়ানের গালে। পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
মেহেরাবঃ- তোর মুখে এইসব কথা শুনতে হবে আজ আমি কখনো ভাবিনি তোকে আমি এত ভালোবাসা, এত শিক্ষা, এত বিশ্বাস করেছিলাম এইসব করার জন্য?
মেহেরাব খানের গলা কেঁপে উঠছে রাগে ও কষ্টে আরিয়ান চোখ নামিয়ে গাল চেপে বলল,
আরিয়ানঃ- আব্বু আমি সত্যি করে বলছি আমি এমন কিছু করিনি।এটা ফেক ভিডিও কেউ আমাদের ফাসিয়েছে।
নাফিসা খান কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
নাফিসাঃ- আরিয়ান সবাই তো ভিডিওটা দেখেছে সবাইকে এখন কে বিশ্বাস করাবে?এই লজ্জা আমরা কোথায় রাখবো?
রফিকুল তালুকদার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
রফিকুলঃ- ছেলেটার মুখ ব্লার করা হলেও এখন সবাই বুঝে ফেলেছে কে সে এই ঘটনার পরে আমাদের পরিবারের মান-সম্মান শেষ
ইলা কাঁদতে কাঁদতে আবার সাবিহা বেগমকে বলল
ইলাঃ- আম্মু আমি মিথ্যা বলছি না আরিয়ান ভাই আর আমি কিছু করেনি।
এই কথা শুনে সাবিহা বেগম আবার চিৎকার করে উঠলেন,
সাবিহাঃ- আরিয়ান ভাই? তুই এখনো ওর পক্ষ নিচ্ছিস।
ইলা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল,
ইলাঃ- কারণ ও কিছু করেনি কেউ আমাদের ফাঁসিয়েছে।
আরিয়ান এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আরিয়ানঃ- আমরা যদি অপরাধী হতাম তাহলে আমি এখানে দাঁড়িয়ে মুখ দেখাতাম না আন্টি। আপনার মেয়েকে অপমান করা মানে আমার নিজের সম্মান নষ্ট করা। আমি যেভাবেই হোক এই মিথ্যেটা প্রমাণ করব।
ড্রইংরুমে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এসেছে ইলার কান্নার শব্দ মিলিয়ে গেছে এখন শুধু বাতাসের চাপা গুঞ্জন আরিয়ানের ভারী নিঃশ্বাস আর চারপাশের দৃষ্টি। সবাই এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন কেউ কারও মুখ দেখতে চাইছে না। ঠিক তখন রফিকুল তালুকদার উঠে দাঁড়ালেন তার চোখে রাগ আর অপমানের ছাপ স্পষ্ট
রফিকুলঃ- এই নিয়ে আর কোনো কথা না এটা সত্যি হোক বা মিথ্যা আমাদের বাড়ির মান-সম্মান শেষ হয়ে গেছে। এখন একটাই সমাধান এই ছেলেটা মানে আরিয়ান আমাদের মেয়েকে বিয়ে করবে।
ঘরটা যেন মুহূর্তেই কেঁপে উঠল সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক আরিয়ান হতভম্ব হয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- কি বললেন বিয়ে সেটা কখনো সম্ভব না।
রফিকুল তালুকদার কণ্ঠ উঁচু করে বললেন,
রফিকুলঃ- কেন সম্ভব না এই ভিডিওতে তোমাকে দেখা গেছে, সেটা যদি মিথ্যা হয় তবুও এখন মানুষ তো কথা বলছে।তোমাদের ছবি তোমাদের নাম ছড়িয়ে গেছে সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ মুখ দেখাতে পারছি না আমরা।
আরিয়ান রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো চোখ লাল হাত মুস্টিবন্ধ
আরিয়ানঃ- আমি বুঝতে পারছি না কেন কেউ আমার কথা শুনছে না। আমি বলেছি এটা এডিট করা ভিডিও আমরা কিছু করিনি এটা কারও ষড়যন্ত্র।
রফিকুল তালুকদার ঠাণ্ডা কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
রফিকুলঃ- ষড়যন্ত্র হোক বা বাস্তব তাতে কিছু যায় আসে না মানুষ এখন বিশ্বাস করে নিয়েছে। আর আমাদের মেয়ের মাথায় যে কলঙ্ক লেগেছে সেটা মুছতে হলে একটাই পথ বিয়ে।
আরিয়ান কণ্ঠ চড়িয়ে বলল,
আরিয়ানঃ- আমি কাউকে ভালো না বেসে বিয়ে করবো না। এটা কোনো সমাধান না এটা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া শাস্তি।
ইলার চোখে জল সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
ইলাঃ- আমি কিছু করিনি আম্মু…বড় বাবা…মেঝো বাবা বিশ্বাস করো এগুলো মিথ্যা আমি বিয়ে করতে চাই না।
সাবিহা বেগম তীব্র গলায় বললেন,
সাবিহাঃ- তুই কি চাস সেটা কেউ জিজ্ঞেস করছে না তুই যা করেছিস তার শাস্তি তোকে পেতেই হবে। তোর জন্য তোর বাবা লোক লজ্জায় কারো সামনে আসছে না।
আরিয়ান চিৎকার করে বলল,
আরিয়ানঃ- শাস্তি কোন অপরাধের শাস্তি দেবেন আমাদের আন্টি যেটা আমরা করিনি তার শাস্তি।
হঠাৎ মেহেরাব খান আরিয়ানের বাবা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন তার গলায় গর্জন চোখে এক ধরনের কঠোরতা
মেহেরাবঃ- আর কোনো কথা না এই বিয়ে হবে আজই হবে।আমার কোনো আপত্তি নেই ইলাকে আমার ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে।
এই কথা শুনে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেলো সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মেহেরাব খানের দিকে।নাফিসা খান চোখ মুছতে মুছতে মাথা নিচু করলেন রফিকুল তালুকদার মুখে সামান্য স্বস্তির ছায়া। কিন্তু আরিয়ান যেন ভেতর থেকে ভেঙে পড়লো সে হঠাৎ করে চিৎকার করে উঠলো,
আরিয়ানঃ- না আব্বু তুমি এমনটা করতে পারো না আমাকে একটা সুযোগ দাও প্রমাণ করার জন্য যে আমি নির্দোষ আমার আর ইলার মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই।
মেহেরাব খান গর্জে উঠলেন,
মেহেরাবঃ- চুপ কর আরিয়ান তুই এখন একটা কথাও বলবি না। তুই যদি সত্যিই আমার ছেলে হোস তাহলে এখনই চুপচাপ এই বিয়েতে রাজি হবি।
আরিয়ান হতাশ হয়ে তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
আরিয়ানঃ- আব্বু মাত্র একদিন সময় দিন একদিন আমি প্রমাণ করে দিবো এই ভিডিওটা ফেক এই ভিডিওর আসল উৎস বের করে আনবো।
মেহেরাব খান জোরে টেবিলে হাত মেরে উঠলেন
মেহেরাবঃ- কোনো সময় নয় তুই এখন এমন অবস্থায় কিছু বলার যোগ্যতাও হারিয়ে ফেলেছিস। আমার মাথা নিচু হয়ে গেছে মানুষ মুখে আঙুল দিচ্ছে আমার ছেলের নামে তুই যদি আমার ছেলে হলে তাহলে চুপচাপ বিয়ে করবি আজই।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল তার চোখে রাগ, কষ্ট, অপমান সব একসাথে মিশে গেছে তারপর গলা ভারী করে বলল,
আরিয়ানঃ- আপনারা সবাই আমাকে অপরাধী বানিয়ে ফেলেছেন প্রমাণ ছাড়াই।ঠিক আছে যদি বিয়ে আপনাদের কাছে মান-সম্মানের প্রশ্ন হয় তাহলে সেই মান সম্মান বাঁচানোর জন্য আমি জাহান্নামেও যেতে পারি। কিন্তু মনে রাখবেন একদিন আমি প্রমাণ করব আমি দোষী না আমি নির্দোষ।
এই বলে আরিয়ান ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো চারপাশে সবাই স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে।ইলার চোখে তখন শুধু কান্না বুকের ভেতর একটা ভয় যে বিয়েটা হতে যাচ্ছে সেটা ভালোবাসার নয় বরং এক অদ্ভুত অন্ধ অস্থিরতার ফলাফল। রফিকুল তালুকদার বললেন
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ২৮
রফিকুলঃ- সব প্রস্তুতি করো আজ সন্ধ্যায় বিয়ে হবে।
সাবিহা বেগম ভেতরে চলে গেলো গলায় কাঁপন
সাবিহাঃ- এই মেয়েটা আমাদের মুখ কালো করে দিয়েছে…।
ইলা একা বসে আছে কোণের সোফায় চোখে অশ্রু আর মনে মনে বলছে
ইলাঃ- আমি জানি আমরা নির্দোষ আরিয়ান কিন্তু এখন কে আমাদের বিশ্বাস করবে?
