Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬০

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬০

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬০
ছায়া

হাসপাতালের করিডোরে সাবিহা বেগম পাগলের মতো এদিক-ওদিক ছুটছেন।নার্স আর ডাক্তারদের জেরা করছেন, কিন্তু কারো কাছেই কোনো উত্তর নেই।সাবিহার কপালে ঘাম জমেছে হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ডাক্তার অস্থির হয়ে বললেন,
ডাক্তারঃ- দেখুন এটা অসম্ভব পেশেন্ট অ্যানাস্থেশিয়ার প্রভাবে গভীর ঘুমে থাকার কথা সে নিজে হেঁটে বের হতে পারে না।
রাশেদ তালুকদার হাসপাতালে পৌঁছালেন তার মুখ ফ্যাকাশে।
রাশেদঃ- সাবিহা ইলা কোথায়?অপারেশন কি হয়েছে?
সাবিহা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
সাবিহাঃ- জানি না ডাক্তাররা বলছে ও কেবিনে নেই। কেউ ওকে নিয়ে গেছে।
রাশেদ তালুকদার ধপ করে করিডোরের চেয়ারে বসে পড়লেন।
রাশেদঃ- ইলা কোথায় চলে গেলো খান বাড়ির লোকদের কি জবাব দিবো

খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে মেহেরাব খান আর নাফিজা বেগম অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন। ইলা আর তার মা চেকআপের নাম করে বের হওয়ার পর অনেক সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের ফোন বন্ধ।নোহা মেহেরাব খান এর কাছে এসে বলল
নোহাঃ- আব্বু ভাবিরা তো অনেক ক্ষন হয় গেছে এখনো আসছে না কেনো?
হঠাৎ আদিব এসে মেহেরাব খান কে জানালো ইলা হসপিটাল থেকে উধাও কোথাও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।নাফিজা বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
নাফিযাঃ- উধাও মানে? ইলার কিছু হলে আমি কাউকে ছাড়ব না।
মেহেরাব খান কঠোর গলায় আদিবকে বললেন,
মেহেরাবঃ- ইলার বাবাকে ফোন দাও আদিব এখনি।
ফোনের ওপাশ থেকে রাশেদ তালুকদার কাঁপাকাঁপা গলায় সবটা স্বীকার করলেন।ইলাকে তারা না জানিয়ে গর্ভপাত করানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন। এই কথা শুনে মেহেরাব খানের রক্ত মাথায় চড়ে গেল।
মেহেরাবঃ- আপনারা এই কাজটা করতে পারলেন? একটা অনাগত প্রাণকে শেষ করতে চাইলেন?
রাশেদ তালুকদার কিছু বলতে পারলো না উপার থেকে ফোন কেটে গেলো। হঠাৎ সাবিহা বেগমের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল ‘ইলা’ নাম সেভ করা সাবিহা দ্রুত ফোন ধরলেন,

সাবিহাঃ- মা তুই কোথায়?
ওপাশ থেকে একটা কন্ঠ শুনা গেলো কিন্তু ইলার কণ্ঠ নয় বরং এক ভারী পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এল
“আপনারা মা-বাবা হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। ইলা আমার কাছে নিরাপদ। ওর সন্তানের ক্ষতি করার চিন্তা আর ভুলেও করবেন না। আর অকে খুজার চেষ্টা ও করবেন না।
লাইনটা কেটে গেল সাবিহা বেগম পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কে এই ব্যক্তি আর ইলাকেই বা কেনো নিয়ে গেলো তার সাথে।
সাবিহা বেগমের হাত থেকে ফোনটা ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল। তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। ফোনের সেই ভারী কণ্ঠস্বরটা এখনো তার কানে বাজছে। রাশেদ তালুকদার সাবিহাকে ধরলেন।
রাশেদঃ- কী হয়েছে? ইলা কোথায়? কে ফোন করেছিল?
সাবিহা শুধু বিড়বিড় করে বললেন,

সাবিহাঃ- কেউ ওকে নিয়ে গেছে ও আর আসবে না। আমরা আমাদের মেয়েকে শেষ করে দিলাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে হাসপাতালের করিডোর কাঁপিয়ে মেহেরাব খান, নাফিজা বেগম, আদিব,পরি,হালিমা,নোহা,নেহা আর রায়েদ ভেতরে ঢুকলেন।মেহেরাব খানের মুখটা পাথরের মতো শক্ত, আর নাফিজা বেগমের চোখ কান্নায় লাল।মেহেরাব খান সরাসরি রাশেদ তালুকদারের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার গলার স্বর নিচু কিন্তু অসম্ভব তীক্ষ্ণ।
মেহেরাবঃ- বেহাই সাহেব ভাবিনি আপনি এত নিচে নামবেন। আমার ছেলের শেষ স্মৃতিটুকু মুছে দিতে চাইলেন? আর এখন আমার মেয়েটা কোথায়? কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?
রাশেদ তালুকদার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার কোনো উত্তর নেই।আদিব চিৎকার করতে লাগলো নার্স আর ডাক্তার এর সাথে,

আদিবঃ- অপারেশন থিয়েটার থেকে কেউ কিভাবে উধাও হলো ? এই হাসপাতালের সিকিউরিটি কোথায়?
ডাক্তারঃ- আমরা সত্যিই জানি না আমি যখন ফিরে আসি, দেখি বেড খালি।সিসিটিভি ফুটেজেও কিছু বোঝা যাচ্ছে না, কারণ ওই সময় করিডোরের সব ক্যামেরা রহস্যজনকভাবে বন্ধ ছিল।
আদিব রায়েদ আর দেরি না করে হাসপাতালের সিসিটিভি রুমে ছুটে গেল।তারা ফুটেজ চেক করতে শুরু করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ঠিক যে ১০ মিনিটে ইলা উধাও হয়েছে, সেই ১০ মিনিটের কোনো রেকর্ডিং নেই। রায়েদ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
রায়েদঃ- আদিব ভাই দেখো ঐ যে ব্যাকডোর দিয়ে একটা কালো হুডি পড়া লোক কিছু নিয়ে যাচ্ছে আমার মনে হয় এটাই ইলা।

সবাই যখন দিশেহারা ইলার নিখোজ নিয়ে তখন মেহেরাব খানের ফোনে একটা মেসেজ এল
“ইলা ভালো আছে সুস্থ আছে অকে নিয়ে টেনশন করবেন না সঠিক সময় আপনাদের বৌমা আপনার কাঁছে চলে যাবে। থানায় জিডি করার ভুল করবেন না তাহলে বিপদ বাড়বে।
মেহেরাব খান মেসেজটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝলেন, কেউ একজন ইলাকে ছায়ার মতো পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু সে কে?
হাসপাতালের সিসিটিভি রুমের ভেতরে থমথমে নীরবতা। স্ক্রিনের আলোতে সবার মুখ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। আদিব বারবার ফুটেজ রিওয়াইন্ড করছে, কিন্তু একই জায়গায় এসে ভিডিও হঠাৎ ব্ল্যাক হয়ে যাচ্ছে।রায়েদ কাঁপা গলায় বলল,

রায়েদঃ- এই দেখো ঠিক এই সময়টাতেই ক্যামেরা অফ এটা কাকতালীয় হতে পারে না।
আদিব দাঁত চেপে বলল,
আদিবঃ- না এটা প্ল্যান করা। কেউ ইচ্ছা করেই ক্যামেরা বন্ধ করেছে।
পিছন থেকে মেহেরাব খানের ভারী কণ্ঠ ভেসে এলো,
মেহেরাবঃ- ফুটেজটা আবার চালাও।
আদিব স্লো মোশনে ফুটেজ চালাল। দেখা গেল হাসপাতালের ব্যাকডোরের কাছে একটা লম্বা, কালো হুডি পরা লোক স্ট্রেচারের মতো কিছু ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু চলার ভঙ্গিতে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।নাফিযা বেগম মুখে হাত চাপা দিলেন,
নাফিযাঃ- ওটাই আমাদের ইলা
পরি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
পরিঃ- কেউ ইলাকে অপহরণ করেছে।
ডাক্তার অসহায় গলায় বললেন,
ডাক্তারঃ- কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো ওই ব্যাকডোর দিয়ে বের হওয়ার কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই সিকিউরিটি লগেও কিছু নেই।
আদিব রাগে টেবিলে মুঠি আঘাত করল,

আদিবঃ- মানে ভেতরের কেউ সাহায্য করেছে!
হাসপাতালের করিডোরে সাবিহা বেগম মেঝেতে বসে কাঁদছেন। তার কাঁধ কাঁপছে থরথর করে।রাশেদ তালুকদার নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চোখ দুটো লাল।ঠিক তখনই মেহেরাব খান ধীরে ধীরে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে আগুন, কিন্তু কণ্ঠ অস্বাভাবিক ঠাণ্ডা।
মেহেরাবঃ- একটা প্রশ্নের উত্তর দিন,বেহাই সাহেব
আপনারা কি ডাক্তার ছাড়া আর কাউকে জানিয়েছিলেন আজকের ব্যাপারটা?
রাশেদ তালুকদার মাথা নেড়ে বললেন,
রাশেদঃ- না কাউকে না শুধু ডাক্তার আর আমরা দুজন জানতাম।
নাফিযা বেগম কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে উঠলেন,
নাফিযাঃ- তাহলে কে জানল যে আজ ইলার সাথে এমন কিছু হচ্ছে যেখানে আমরাই জানতাম না।
ঠিক সেই মুহূর্তে আদিব দৌড়ে এসে বলল,
আদিবঃ- ফুফুআব্বা হাসপাতালের ব্যাকডোরের বাইরে একটা গাড়ির অস্পষ্ট ফুটেজ পাওয়া গেছে।
মেহেরাব খান জিজ্ঞেস করলেন।

মেহেরাবঃ- নাম্বার প্লেট এর নাম্বার নোট করেছো?
আদিবঃ- নাম্বার প্লেট ব্লার করা।
রায়েদ নিচু গলায় বলল,
রায়েদঃ- প্রফেশনাল কাজ মনে হচ্ছে।
নাফিযা বেগমের বুক ধড়ফড় করতে লাগল,
নাফিযাঃ- আমার ইলা সে কি জ্ঞানহীন অবস্থায় ছিল কে ওকে নিয়ে গেল?
হঠাৎ মেহেরাব খানের ফোন আবার ভাইব্রেট করল। সবাই তাকিয়ে রইল।তিনি ধীরে ধীরে মেসেজটা খুললেন।
“ ইলাকে অজ্ঞান অবস্থায় আমি বিয়ে এসেছি ওর আর বাচ্চার ক্ষতি করার চেষ্টা কেউ করলে তার ফল ভালো হবে না। আর অযথা ইলাকে খুজা খুজি করবেন না।
মেসেজটা পড়ে মেহেরাব খানের চোখে এক ঝলক বিস্ময় ফুটে উঠল আদিব উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
আদিবঃ- ফুফুআব্বা কী লিখেছে?
মেহেরাব খান ধীরে ধীরে বললেন,

মেহেরাবঃ- সে দাবি করছে ইলা আর বাচ্চা দুজনই নিরাপদ তারকাছে।
হাসপাতালের এক কোণে দাঁড়িয়ে পরি ফিসফিস করে বলল,
পরিঃ- কিন্তু একটা কথা যে লোকটা মেসেজ করেছিল সে ইলাকে চিনে
নোহা থমকে গেল,
নোহাঃ- মানে?
পরি ধীরে বলল,
পরিঃ- মানে সে ইলাকে খুব কাছ থেকে চেনে কিন্তু নিজের পরিচয় লুকাচ্ছে।
রায়েদের চোখ বড় হয়ে গেল,
রায়েদঃ- তাহলে সে কি আমাদের পরিচিত কেউ?আমাদের যত তারাতাড়ি সম্ভব থানায় জানাতে হবে
মেহেরাব খান হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তার কণ্ঠ দৃঢ়।
মেহেরাবঃ- কেউ থানায় যাবে না।
সবাই অবাক হয়ে তাকাল আদিব বলল,
আদিবঃ- ফুফু আব্বা এটা কি বলছেন এটা তো কিডন্যাপিং!
মেহেরাব খান ধীরে বললেন,

মেহেরাবঃ- না এটা কিডন্যাপিং না এটা “প্রোটেকশন” ইলাকে কেউ প্রোটেকড করছে।
নাফিযা বেগম অবাক হয়ে তাকালেন,
নাফিযাঃ- কীভাবে এত নিশ্চিত হচ্ছো তুমি?
মেহেরাব খান চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিলেন,
মেহেরাবঃ- কারণ যে-ই হোক সে জানে ইলার প্রেগন্যান্সির কথা, অপারেশনের কথা, এমনকি আমাদের পরিবার নিয়েও জানে।
এর মানে সে অনেক দিন ধরে ইলাকে নজরে রাখছিল।
রাশেদ তালুকদার কাঁপা গলায় বললেন,
রাশেদঃ- তাহলে… সে কি শত্রু?
মেহেরাব খান ধীরে চোখ খুললেন তার চোখে রহস্যময় কঠোরতা।
মেহেরাবঃ- না…শত্রু হলে সে ইলাকে বাঁচাত না আর আমাদের ফোন করে এত খবর জানাতো না।
ঠিক তখনই আদিবের ফোনে একটি অজানা নম্বর থেকে একটি ভিডিও ক্লিপ এলো সবাই ঘিরে দাঁড়াল।ভিডিও ওপেন হতেই দেখা গেল একটা অন্ধকার রুম মৃদু আলো।বিছানায় শুয়ে আছে ইলা গভীর ঘুমে।তার হাতে স্যালাইনের লাইন খুলে রাখা।আর তার হাত শক্ত করে রাখা নিজের পেটের ওপর। ক্যামেরার পেছন থেকে সেই একই ভারী কণ্ঠ শোনা গেল—

“ওকে আর কাঁদতে হবে না এবার কেউ ওর সন্তান কেড়ে নিতে পারবে না।
ভিডিও হঠাৎ শেষ হয়ে গেল নাফিযা বেগম ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন,
নাফিযাঃ- মেয়েটা ঘুমের মধ্যেও নিজের বাচ্চাকে আগলে রেখেছে।
সাবিহা বেগম মেঝেতে বসে পড়লেন বুক চাপড়াতে চাপড়াতে,
সাবিহাঃ- আমি পাপ করেছি আমি নিজের নাতনি/নাতিকে মেরে ফেলতে যাচ্ছিলাম।
রাশেদ তালুকদারের চোখ দিয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়ল।হাসপাতালে গ্যাঞ্জাম করে লাভ নেই তাই সবাই হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসলো।
হাসপাল থেকে বের হওয়ার সময় আকাশ কালো হয়ে এসেছে।
মেহেরাব খান গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।সে ফিসফিস করে বললেন,
মেহেরাবঃ- তুমি যে-ই হও আমাদের ইলাকে বাঁচিয়ে রেখেছ এটাই অনেক ।
মেহেরাব খান এর ফোন আবার একবার ভাইব্রেট করল। নতুন মেসেজ।

“সময় হলে সত্যিটা নিজেই জানতে পারবেন মেহেরাব খান।
আর মনে রাখবেন ইলা একা না সে কখনোই একা ছিল না।”
মেসেজটা পড়ে মেহেরাব খানের চোখ হঠাৎ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল তিনি খুব আস্তে বললেন,
মেহেরাবঃ- এত আত্মবিশ্বাস কিভাবে এটা অসম্ভব…!
আদিব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
আদিবঃ- ফুফু আব্বা আপনি কি কাউকে সন্দেহ করছেন?
মেহেরাব খান ধীরে গাড়িতে উঠে বসতে বসতে বললেন
মেহেরাবঃ- যদি আমার সন্দেহ সত্যি হয় তাহলে যে ইলাকে নিয়ে গেছে সে আমাদের প্রতি সেকেন্ড এর খবর রাখছে।
আর অন্যদিকে অন্ধকারের আড়ালে কোথাও এক জোড়া চোখ নিঃশব্দে ইলার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে

“ আরিয়ানের ইলাফুল এবার কেউ আপনাকে ছুঁতেও পারবে না…”
খান বাড়ি…
খান বাড়িতে ফিরে আসার পর যেন পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল।বাড়িটা একই আছে মানুষগুলোও একই কিন্তু ভেতরের বাতাসে এক অদৃশ্য আতঙ্ক জমে আছে। কারো মুখে জোরে কথা নেই, হাসির শব্দ নেই, শুধু ভারী নিঃশ্বাস আর অস্থির পায়চারি।
মেহেরাব খান নিজের ঘরে দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ বসে রইলেন। সামনে টেবিলে ফোন রাখা। সেই অজানা নম্বর থেকে আসা মেসেজগুলো বারবার পড়ছেন। শব্দগুলো ছোট কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস।এই লাইনটা মাথার ভেতর ঘুরছে।
তিনি জানেন যেই হোক সে শুধু ইলাকে নিয়ে যায়নি, সে খান পরিবারের প্রতিটি নড়াচড়া সম্পর্কে জানে। এর মানে নজরদারি অনেক দিনের।মেহেরাব খান ধীরে ফোন তুলে একটি নম্বরে কল করলেন খুব সংক্ষিপ্ত কথা। কোনো আবেগ নেই, শুধু নির্দেশ।
“ইলার খোঁজ গোপনে শুরু হলো থানায় নয় প্রকাশ্যে নয়। ছায়ার আড়ালে।
অন্যদিকে রাশেদ তালুকদার বাড়িতে ফিরেও বসে থাকলেন না।অপরাধবোধ তাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে। মেয়েকে হারানোর ভয় এখন তার সব অহংকার ভেঙে দিয়েছে। তিনিও তার পরিচিত কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষকে খবর দিলেন। হাসপাতালের আশপাশ ব্যাকডোরের রাস্তা, আশেপাশের সিসিটিভি সব চেক করার নির্দেশ গেল।
অন্য দিকে,

আদিব সবাইকে রেখে রায়েদ সহ আবার হাসপাতালে গেল সে গাড়ির অস্পষ্ট ফুটেজটা সংগ্রহ করেছে। ছবিটা পরিষ্কার নয়, কিন্তু কালো গাড়ির বডির এক কোণে হালকা একটা স্ক্র্যাচ দেখা যাচ্ছে খুব ছোট কিন্তু আলাদা।
সে শহরের কয়েকটা পরিচিত গ্যারেজে ছবি পাঠাল। যদি কোনো গাড়ি ওই রকম ক্ষত নিয়ে আসে মেরামত করতে খবর যেন সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয় তার চোখে ঘুম নেই। মাথার ভেতর শুধু একটা প্রশ্ন ইলা কি জ্ঞান ফেরার পর ভয় পেয়ে যাবে মানুষিক ভাবে ও এমনি অসুস্থ
রায়েদ অন্য পথ নিলো সে বুঝেছে, হাসপাতালের ভেতরের কেউ সাহায্য না করলে এটা সম্ভব নয়।রায়েদ নার্সদের টার্গেট করলো খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, হাসি, হালকা ফ্লার্ট সবকিছু মিলিয়ে এক নার্সের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জানা গেল অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে একটা অচেনা পুরুষকে কেউ দেখেছিল করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকতে।সে নাকি মেলেটারিদের মতোই আত্মবিশ্বাস নিয়ে হাঁটছিল।কিন্তু কেউ ভালো করে দেখেনি।রায়েদের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

খান বাড়ি…
নাফিযা বেগম জায়নামাজে বসে আছেন। চোখ ভেজা, ঠোঁট কাঁপছে। তার দোয়া একটাই
নাফিযাঃ- আমার বৌমাকে আর আমার ছেলের শেষ সৃতিকে দিয়ে দাও।
সাবিহা বেগম প্রথমবারের মতো নিঃশব্দে কান্না করছেন। কোনো আত্মপক্ষ সমর্থন নেই,কোনো যুক্তি নেই। শুধু অপরাধবোধ তিনি অনুভব করছেন নিজের সিদ্ধান্তই হয়তো মেয়েকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
পরি, নোহা, নেহা আর হালিমা একসাথে বসে তিলাওয়াত করছে তাদের কণ্ঠ কাঁপছে। প্রত্যেকের চোখে ভয় যদি ইলা ফিরে না আসে?বাড়ির দেয়ালগুলো যেন এই কান্না শুষে নিচ্ছে।
রাত গভীর হলে মেহেরাব খান একা বারান্দায় দাঁড়ালেন। আকাশ কালো হালকা বাতাস বইছে।তিনি খুব ধীরে নিজের মনে বললেন
“ যেই হোক সে খুব কাছের কেউ।কারণ শত্রু এভাবে আগাম সতর্ক করে না শত্রু সরাসরি আঘাত করে।
হঠাৎ তার ফোনে একটি অচেনা লোকেশন পিং এল। খুব অল্প সময়ের জন্য তারপর আবার অফলাইন।মেহেরাব খান সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনশট নিলেন।লোকেশন শহরের ভেতরেই খুব দূরে নয়।তার চোখে এক ঝলক দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
খেলা শুরু হয়েছে এবার তিনি চুপ করে বসে থাকবেন না।
দূরে কোথাও একই সময়ে অন্ধকার ঘরে একটা মৃদু আলো জ্বলছে।বিছানায় ঘুমন্ত ইলার শ্বাস ওঠানামা করছে শান্তভাবে।

আর কেউ একজন ছায়ার মতো জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
সে জানে তাদের খুজা হচ্ছে আর সে প্রস্তুত তাদের চরকি পাক ঘুরানোর জন্য।
নতুন রহশ্যঃ
শহরের এক নিভৃত স্থানে একটি পুরনো বাড়ি সেখানে একটি বড় বিছানায় ইলা শুয়ে আছে।তার হাতে এখনো সেই স্যালাইনের ক্যানুলাটা লাগানো,কিন্তু কোনো স্যালাইন নেই সেটা খুলে ফেলা হয়েছে। ইলার জ্ঞান ফিরছে ধীরে ধীরে।
সে চোখ মেলে দেখল চারপাশটা একদম অচেনা। ঘরের দেয়ালে পুরনো আমলের ঘড়ি টিকটিক করছে। সে পেটে হাত দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল।
ইলাঃ- আরিয়ান ওরা আমাদের বাবুকে মেরে ফেলেছে আমি বাঁচাতে পারলাম না
ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল একজন সুদর্শন পুরুষ। তার পরনে কালো শার্ট, হাতে এক গ্লাস পানি। ছায়ায় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৯

“শান্ত হন আপনার বাবুর কিছু হয়নি।আমি সঠিক সময়ে আপনাকে সেখান থেকে সরিয়ে এনেছি।
ইলা চমকে উঠে লোকটির দিকে তাকাল। দেখার চেষ্টা করলো কিন্তু ইলা তার মুখ দেখতে পেলো না চোখের ঝাপসা ভাব কাটছে না।
ইলাঃ- আপনি কে? আমাকে এখানে কেন এনেছেন?

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৬১