ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৯
ছায়া
হাসপাতাল থেকে ফেরার পথটা যেন অনেক লম্বা লাগছিল।গাড়িতে ইলা জানালার পাশে বসে আছে, হাত দুটো পেটের ওপর রেখে। চোখ বন্ধ কিন্তু ঘুম নয় যেন আরিয়ানের সাথে কথা বলছে মনে মনে।নাফিযা পাশে বসে তার হাত ধরে আছেন, কিন্তু কোনো কথা বলছেন না। গাড়ির ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা, শুধু ইঞ্জিনের আওয়াজ আর মাঝে মাঝে ইলার গভীর নিঃশ্বাস।বাড়ির কাছাকাছি এসে ইলা হঠাৎ মুখ তুলল।
ইলাঃ- আম্মু আমাকে একটু কবরস্থানে নামিয়ে দিন।
নাফিযাঃ- এখন না মা এত দুর্বল শরীর নিয়ে কবরস্থানে যাওয়া ঠিক না?
ইলাঃ- প্লিজ আম্মু আমার ওর সাথে কথা বলতে হবে ওকে জানাতে হবে।
নাফিযা আর আপত্তি করলেন না।গাড়ি থামানো হল কবরস্থানের কাছে।আদিব আর পরিও নেমে এল।ইলা ধীরে ধীরে নামল। পা কাঁপছে কিন্তু সে থামল না।হাতে একটা ছোট্ট ফুলের তোড়া যেটা আসার পথে রাস্তায় নিয়ে নিলো।
কবরের সামনে পৌঁছে ইলা হাঁটু গেড়ে বসল। আরিয়ানের কবরের ওপর এখনো মাটি নরম, ফুলের পাপড়ি ছড়ানো। ইলা হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করল, যেন আরিয়ানের হাত ধরছে।
ইলাঃ- ভয়েজ কিং আমি এসেছি।
কণ্ঠটা ভাঙা চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল মাটিতে।
ইলাঃ- আপনি জানেন না আপনি চলে যাওয়ার পর আমি ভেবেছিলাম আর বাঁচব না। আপনাকে ছাড়া বাচা আমার পক্ষে সম্ভব না ভেবেছিলাম এই জীবনটা শেষ। কিন্তু আপনি আমাকে আপনার অস্তিত্ব দিয়ে গেছেন।
ইলা পেটে হাত রাখল আলতো করে বুলিয়ে দিল।
ইলাঃ- আমি প্রেগন্যান্ট ভয়েজ কিং আমাদের একটা বাচ্চা হবে।ডাক্তার বলল সাত-আট সপ্তাহ হয়ে গেছে।আপনার রক্ত একটু একটু করে আমার পেটে বেড়ে উঠছে।
কান্না আরও জোরালো হয়ে উঠল। ইলা মাথা নিচু করে কবরের মাটিতে কপাল ঠেকাল।
ইলাঃ- আপনি বলেছিলেন আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। দেখুন আপনি সত্যি রেখেছেন কথা। আপনি আমার সাথেই আছেন। কিন্তু ভয়েজ কিং আমি ভয় পাই। আমি একা এই বাচ্চাকে কীভাবে মানুষ করব? আপনি তো থাকবেন না আমার পাশে। আপনাকে তো ও কখনো দেখতে পাবে না। বাবা বলে কাউকে ডাকতে পারবে না।
ইলার কান্না এখন আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। হাত দুটো মাটি খুঁড়ছে যেন আরিয়ানকে ছুঁতে চায়।
ইলাঃ- আপনি জানেন আমি প্রতিদিন স্বপ্নে আপনাকে দেখি। আপনি হাসেন,আমাকে ‘ইলাফুল’ বলে ডাকেন। কিন্তু ঘুম ভাঙলেই আপনি নেই।তবে আজ থেকে এই ছোট্ট প্রাণটার মধ্যে আপনি আছেন। আমি ওকে আপনার মতো করে বড় করব। আপনার সাহস, আপনার ভালোবাসা, আপনার দেশপ্রেম সবকিছু ওকে দিয়ে দেব। কিন্তু আপনি একবার বলুন না আমি কী করব যখন ও জিজ্ঞেস করবে বাবা কোথায়? আমি কী উত্তর দেব?
ইলা কবরের ওপর শুয়ে পড়ল গাল মাটিতে ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগল।
ইলাঃ- ভয়েজ কিং আমি চেষ্টা করব।আমি বাঁচার চেষ্টা করব। শুধু আপনি আমাকে শক্তি দিন। আমাকে আর ভাঙতে দেবেন না। এই বাচ্চাটার জন্য! আমাদের বাচ্চাটার জন্য আমাকে বাঁচতে হবে।
দূর থেকে নাফিযা দেখছেন। চোখ মুছে মুছে কাঁদছেন। পরি আর আদিব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।কেউ এগিয়ে যাচ্ছে না। এটা ইলা আর আরিয়ানের মুহূর্ত।
চোখ লাল কিন্তু দৃষ্টিতে একটা নতুন দৃঢ়তা। সে ফুলের তোড়াটা কবরের ওপর রাখল।
ইলাঃ- আমি আসব প্রতিদিন আমাদের বাচ্চাকে নিয়ে আসব। আপনাকে দেখাব কত বড় হচ্ছে আমাদের বাচ্চা। আপনি দেখবেন।
আকাশ থেকে শুনবেন।
ইলা উঠে দাড়ালো
ইলাঃ চলি ভয়েজ কিং আজ আমি বাড়ি যাচ্ছি এখন থেকে আপনার জন্য অপেক্ষা করব না আর। কারণ আপনি তো আমার সাথেই আছেন।
সূর্য ডুবছে আকাশে লাল-কমলা রঙ। ইলা পিছনে না তাকিয়ে হাঁটতে লাগল। কিন্তু তার পায়ে এখন আর টলমল নেই। যেন একটা নতুন শক্তি পেয়েছে।দূরের কবরে বাতাসে ফুলের পাপড়ি উড়ছে। যেন আরিয়ান বলছে
“ইলাফুল… আমি গর্বিত তোমার ওপর।”
ইলা চলে গেলো বাড়িতে গাড়ি খান বাড়ির সামনে থামতেই নাফিযা গাড়ি থেকে নেমে ছুটে ভেতরে গেলেন।মুখে একটা অদ্ভুত হাসি, চোখে জল।
নাফিযাঃ- সবাই শোনো!শোনো সবাই! আমার দাদি হবো! আরিয়ানের বাচ্চা আসছে পৃথিবীতে! ইলা প্রেগন্যান্ট!
বাড়ির সবাই যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।তারপর নোহা, নেহা, পরি, হালিমা সবাই চিৎকার করে উঠল।
নোহাঃ- সত্যি আম্মু? ভাবি প্রেগন্যান্ট?
হালিমাঃ- আল্লাহু আকবর! আরিয়ান ভাইয়ার বাচ্চা!
রায়েদ আর আদিব দুজনেই হেসে উঠল, কিন্তু চোখে জল। মেহেরাব খান সোফায় বসে ছিলেন। শুনেই মাথা তুললেন। প্রথমে অবাক হলেন, তারপর ধীরে ধীরে মুখে একটা হাসি ফুটল অনেক দিন পর।
মেহেরাবঃ- সত্যি আমি দাদু হবো?
নাফিযা বেগম মেহেরাব খানের কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন। হাত ধরে বললেন,
নাফিযাঃ- হ্যাঁ সাত-আট সপ্তাহ ডাক্তার বলল হচ্ছে। ওর একটা অংশ ইলার পেটে রয়ে গেছে।
মেহেরাব খানের চোখ ভিজে উঠল। তিনি নাফিযার হাত চেপে ধরলেন।
মেহেরাবঃ- আল্লাহর শুকরিয়া আমার ছেলের শেষ সৃতি আমাদের সাথে আছে।
ইলা ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল রায়েদ আর আদিব তাকে ধরে ভেতরে নিয়ে এল। সবাই ইলাকে ঘিরে ধরল।কেউ কেউ জড়িয়ে ধরল, কেউ কপালে চুমু খেল। ইলা শুধু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু হাসি পুরোপুরি ফুটল না। তার হাত এখনো পেটের ওপর।
কিন্তু এই খুশির মাঝে দুজন মানুষ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন ইলার বাবা-মা।ইলার বাবা রাশেদ তালুকদার আর মা সাবিহা বেগম এক কোণে দাঁড়িয়ে। তাদের মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে শুধু উদ্বেগ আর একটা অদ্ভুত দুঃখ।
নাফিযা বেগম তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
নাফিযাঃ- বেহাই বেহান আপনারা কি খুশি হননি??
সাবিহা বেগম মাথা নিচু করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
সাবিহাঃ- আমরা খুশি হতে চাই…সত্যিই চাই। কিন্তু…
রাশেদ তালুকদার কথাটা শেষ করলেন।
রাশেদঃ- কিন্তু আমাদের মেয়েটা এখনো ছোট ও একা এত বড় দায়িত্ব কীভাবে নেবে? আরিয়ান নেই, আমাদের মেয়ে কীভাবে একা সব সামলাবে?
নাফিযা বেগমের চোখে জল এসে গেল।
নাফিযাঃ- আমরা আছি না আমরা সবাই আছি। আমরা আগলে রাখবো ওকে
রাশেদঃ- আপনারা আছেন ঠিকই কিন্তু মা-বাবার মন তো বোঝেন। আমরা দেখছি আমাদের মেয়ে দিন দিন অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে একাকিত্ব তে ভুগছে।
সাবিহা বেগম ইলার কাছে গিয়ে তার হাত ধরলেন।
সাবিহাঃ- মা তুই সত্যি খুশি? নাকি শুধু আরিয়ানের কথা ভেবে নিজেকে বোঝাচ্ছিস?
ইলা মায়ের চোখে তাকাল তার চোখে পানি
ইলাঃ- আম্মু… আমি খুশি সত্যিই খুশি। কারণ এটা আরিয়ানের অংশ। কিন্তু… আমি ভয়ও পাই। আমি জানি না কীভাবে ওকে বড় করব। কিন্তু আমি চেষ্টা করব আমি ওকে হারাতে দেব না।
সাবিহা বেগম ইলাকে জড়িয়ে ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
সাবিহাঃ- তুই আমাদের একমাত্র মেয়ে তোকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখলে আমাদের বুক ফেটে যায়। আমরা খুশি হতে পারছি না কারণ আমরা ভয় পাচ্ছি তোর জন্য ভয় পাচ্ছি। তোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পাচ্ছি।
ইলা মায়ের কপালে চুমু খেল।
ইলাঃ- আম্মু আমি ঠিক আছি এখন থেকে আমি আর ভাঙব না। এই বাচ্চাটার জন্য আমাকে শক্ত হতে হবে। আরিয়ানও চাইবে না আমি ভেঙে পড়ি।
মেহেরাব খান উঠে এসে ইলার কাঁধে হাত রাখলেন।
মেহেরাবঃ- ইলা মা তুই আমাদের মেয়ে। এই বাড়ির বড় মেয়ে। আমরা সবাই তোর সাথে আছি।
ইলা মেহেরাব খানের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
ইলাঃ- বাবা ধন্যবাদ
বাড়িতে আবার একটা হালকা হাসির ঢেউ উঠল। কিন্তু ইলার বাবা-মায়ের মুখে এখনো সেই উদ্বেগের ছায়া। তারা খুশি হতে চান কিন্তু পারছেন না। কারণ তাদের মেয়ের চোখে এখনো সেই অন্ধকার লেগে আছে।
রাতে ইলা বিছানায় শুয়ে পেটে হাত রাখল। ফিসফিস করে বলল,
ইলাঃ- আরিয়ান আমাদের বাচ্চা এসেছে। সবাই খুশি কিন্তু আমার বাবা-মা খুশি হতে পারছেন না। তারা আমার জন্য ভয় পাচ্ছেন। আমি তাদের বোঝাব আমি শক্ত হব। আপনি আমাকে শক্তি দিন।
রাত গভীর খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু ঘুম আসেনি ইলার বাবা-মা আর মেহেরাব খান নাফিযা বেগমের।
রাশেদ তালুকদার আর সাবিহা বেগম মেহেরাব খানের সামনে বসে আছেন। নাফিযা বেগম পাশে চোখ লাল। ঘরে একটা ভারী নীরবতা।
রাশেদ তালুকদার গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করলেন।
রাশেদঃ- ভাই… আমরা অনেক ভেবেছি সারাদিন ভেবেছি আমাদের মেয়ের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার দেখা যাচ্ছে।
মেহেরাব খান চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
রাশেদঃ- বাচ্চাটা আসছে ঠিকই কিন্তু এই বাচ্চা এলে আমাদের ইলা আরও ভেঙে পড়বে ও একা সব সামলাতে পারবে না। ও এখনো ছোট আমরা তো অকে বিধবা হয়ে থেকে যেতে দিতে পারি না। তাই আমরা চাই না এই বাচ্চা পৃথিবীতে আসুক।
সাবিহা বেগম চোখ মুছে বললেন,
সাবিহাঃ- আমরা খারাপ মা-বাবা হয়ে যাচ্ছি জানি।কিন্তু আমাদের মেয়ের জীবনটা দেখুন। ওর বয়স এখনো কম সামনে অনেক দিন। আরিয়ান নেই ও একা একটা বাচ্চাকে কীভাবে মানুষ করবে? সমাজ কী বলবে ওর মানসিক অবস্থা এখন এত খারাপ যে বাচ্চা হলে ও পুরোপুরি ভেঙে যাবে। আমরা চাই… ও যেন আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে।
নাফিযা বেগম চমকে উঠলেন।
নাফিযাঃ- মানে? আপনারা কী বলতে চান?
রাশেদ তালুকদার মাথা নিচু করে বললেন,
রাশেদঃ- আমরা বলছি এই প্রেগন্যান্সি টার্মিনেট করা যায়। ডাক্তাররা বলেছে এখনো সময় আছে।
মেহেরাব খানের মুখ কালো হয়ে গেল। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
মেহেরাবঃ- আপনারা কি যা তা বলছেন? এটা আরিয়ানের বাচ্চা আমার ছেলের শেষ চিহ্ন। আমরা এতদিন কাঁদছি, ভেঙে পড়ছি আর এখন আপনারা বলছেন এটাকে শেষ করে দিতে?
সাবিহা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
সাবিহাঃ- আমরা ইলার জন্য বলছি আমাদের মেয়ের জন্য। ও যদি এই বাচ্চা নিয়ে বেঁচে থাকতে না পারে? পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে ও যদি আত্মহত্যা করে ফেলে?
নাফিযা বেগমের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
নাফিযাঃ- আপনারা জানেন না ইলা আজ কবরের সামনে কী বলেছে? ও বলেছে ও এই বাচ্চাকে হারাতে দেবে না। এটা ওর জীবনের একমাত্র আশা। ও এখন এটাকে ধরে বাঁচতে চাইছে।
রাশেদঃ- কিন্তু যদি ও আবার ভেঙে পড়ে? আমরা ওকে হারাতে চাই না।
মেহেরাব খান গভীর নিঃশ্বাস নিলেন।
মেহেরাবঃ- আমি আপনাদের দুঃখ বুঝি কিন্তু এই সিদ্ধান্ত ইলার। শুধু ইলার আমরা কেউ ওকে জোর করতে পারি না। ও যদি চায় বাচ্চাটা রাখতে… তাহলে আমরা সবাই ওর পাশে থাকব। আর যদি ও নিজে না চায় তাহলে আমরা ওর সিদ্ধান্ত মেনে নেব। কিন্তু এখন আমরা ওকে চাপ দেব না।
সাবিহা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
সাবিহাঃ- আমরা ওকে বলব না কিন্তু আমাদের মন বলছে এটা ওর জন্য বিষ হয়ে যাবে।
মেহেরাব খান চুপ করে বসে পড়লেন।
মেহেরাবঃ- আল্লাহ যা ভালো মনে করবেন তাই হবে। কিন্তু আমি জানি যত টুকু ইলা মাকে চিনেছি ও আমার ছেলেকে আমাদের থেকেও বেশি ভালো বাসতো তাই ইলা এই বাচ্চাকে হারাতে চাইবে না। কারণ এটা আরিয়ানের শেষ উপহার।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। যেন আকাশ ও এই দ্বিধার মধ্যে কাঁদছে।ইলা তার ঘরে শুয়ে আছে। হাত পেটে ফিসফিস করে বলছে,
ইলাঃ- আরিয়ান আমি জানি না কী হবে। কিন্তু আমি তোমাকে হারাতে চাই না। এই ছোট্ট বেবিটা আমাদের দুজনের। আমি ওকে রাখব যাই হোক না কেন।
Time Skip….
রাতের অন্ধকারে খান বাড়ির এক কোণের ঘরে আলো জ্বলছে। দরজা বন্ধ ভেতরে শুধু ইলার বাবা রাশেদ তালুকদার আর মা সাবিহা বেগম। দুজনেই চুপ কিন্তু চোখে একটা ভয়ানক দৃঢ়তা। সাবিহা বেগম প্রথম কথা বললেন কণ্ঠ কাঁপছে।
সাবিহাঃ- আমি আর পারছি না সারাদিন দেখছি আমার মেয়ে পাগলের মতো কথা বলছে। পেটে হাত দিয়ে বিড়বিড় করছে।
রাশেদ তালুকদার মাথা নিচু করে বসে আছেন হাত কাঁপছে।
রাশেদঃ- আমি অনেক চেষ্টা করেছি ওদের বোঝানোর কিন্তু ওরা শুনছে না। ওরা চায় আরিয়ানের বাচ্চা সুস্থ ভাবে পৃথিবীতে আসুক
সাবিহাঃ- তাহলে আমরা কী করব? চুপ করে দেখব ও ধীরে ধীরে মরে যাক?
রাশেদ তালুকদার চোখ বন্ধ করলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন,
রাশেদঃ- আমরা কাউকে না জানিয়ে ইলাকে ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাই।
সাবিহা বেগমের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
সাবিহাঃ- আল্লাহ কি আমাদের মাফ করবেন?
রাশেদঃ- আমরা ওর জীবন বাঁচাতে চাই। ও যদি জানতে পারে তাহলে কখনো এটা হতে দিবে না পরে হয়তো বুঝবে। কিন্তু এখন ওকে বাঁচাতে হবে।
তারা দুজনে চুপ করে বসে রইলেন। তারপর সাবিহা বেগম উঠে দাঁড়ালেন।
সাবিহাঃ- কাল সকালে আমি ওকে বলব ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। চেকআপের নাম করে নিয়ে যাব। ডাক্তারকে আগে থেকে বলে রাখব ওকে কিছু না জানিয়ে।
রাশেদঃ- হ্যাঁ কিন্তু খান বাড়ির লোকজনকে জানতে দেওয়া যাবে না।ওরা যদি জানে তাহলে সব শেষ।
সাবিহা বেগম দরজার দিকে তাকালেন ইলার ঘরের দিকে।
সাবিহাঃ- আমার মেয়ে আমি ওকে এভাবে হারাতে পারব না।
পরদিন,
ইলা বিছানায় বসে পেটে হাত বুলাচ্ছে মৃদু হাসি মুখে।দরজায় টোকা পড়ল। সাবিহা বেগম ঢুকলেন মুখে জোর করে হাসি।
সাবিহাঃ- মা উঠ আজ ডাক্তারের কাছে যাব। চেকআপ করাতে হবে শরীরটা দেখে আসি।
ইলা অবাক হয়ে তাকাল।
ইলাঃ- আজ? কিন্তু আমি তো ভালো আছি। কালকেই আসলাম ডাক্তার এর কাছ থেকে।
সাবিহাঃ- ভালো থাকলেও চেক করতে হয়। আমার নাতি নাতিনি কেমন আছে আমি দেখবো। চল আমি তোর সাথে যাব।
ইলা একটু দ্বিধা করল কিন্তু মায়ের চোখে কিছু একটা দেখে মাথা নাড়ল।
ইলাঃ- ঠিক আছে আম্মু।
দুপুরের দিকে গাড়ি বের হল শুধু ইলা আর তার মা।রাশেদ তালুকদার বাড়িতে অপেক্ষা করছেন। হাতে ফোন ডাক্তারের সাথে কথা হয়ে গেছে।
হাসপাতালে পৌঁছে ইলাকে চেম্বারে নেয়া হল। ডাক্তার মহিলা সাবিহা বেগম ডাক্তারকে আগে থেকে সব বলে রেখেছেন।ডাক্তার ইলাকে দেখে বললেন,
ডাক্তারঃ- আপনার শরীর এখনো দুর্বল। আমি একটা স্যালাইন দিচ্ছি দুর্বলতা কমানোর জন্য।
ইলা কিছু বুঝল না
ইলাঃ- স্যালাইন? কেন?
সাবিহাঃ- শুধু বিশ্রামের জন্য মা তুই চুপ কর।
ইলা চুপ করে রইল। নার্স এসে স্যালাইন লাগিয়ে দিল। ইলার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল।
ইলা অজ্ঞান হয়ে গেল সাবিহা বেগম চোখ মুছে ডাক্তারের দিকে তাকালেন।
সাবিহাঃ- যা করার তারাতাড়ি করুন দয়া করে।
ডাক্তার মাথা নাড়লেন
ডাক্তারঃ- আমরা করছি কিন্তু এটা আপনার মেয়ের সিদ্ধান্ত নয়।
সাবিহাঃ- ওর জীবনের জন্য এটা করা জরুরি।
ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৮
অপারেশন থিয়েটারে ইলাকে নেয়া হল ডাক্তার যখন অপারেশন করবে ঠিক সেই সময় ডাক্তার এর একটা জরুরি অপারেশন এর জন্য ডাকা হলো ইলাকে অপারেশন থিয়েটারে রেখে ডাক্তার আর নার্স বেরিয়ে গেলো।
৩০ মিনিট পরে ডাক্তার আর নার্স এসে দেখে ইলা অপারেশন থিয়েটারে নেই। সবাই খুজাখুজি শুরু করলো কিন্তু ইলা কোথাও নেই। সাবিহা ডাক্তার কে বলল আমার মেয়ে একা কিভাবে চলে গেলো?
ডাক্তারঃ- আমি যে ইনজেকশন দিয়েছি সেটা ৬ ঘন্টা আগে জ্ঞান ফিরবে না।
সাবিহাঃ- তাহলে আমার মেয়ে কিভাবে হারিয়ে গেলো?
