Home ভয়েজের মায়াজাল ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৮

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৮

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৮
ছায়া

খান বাড়িটি যেন আজ এক জীবন্ত কবরস্থানে পরিণত হয়েছে।ইলার চিৎকারে সারা বাড়ির মানুষ কান্না করছে।ইলা পাগলের মতো পাগলের মত করছে আর বলছে, “আর আরিয়ানের কিছু হয়েছে, আমি জানি কেউ আমাকে কিছু বলছ না কেন?
মেহেরাব খান পাথরের মতো সোফায় বসে আছেন তার ফোনে ফোন এসেছিলো কিছুক্ষণ আগে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে। ওপাশ থেকে আসা কণ্ঠস্বরটি এখনো তার কানে বাজছে
“আমরা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, সিলেট সীমান্তে মর্টার শেলের আঘাতে মেজর আরিয়ান খান শাওন বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহিদ হয়েছেন…”
মেহেরাব খানের হাত থেকে ফোনটা ফ্লোরে পড়ে গেল।স্ক্রিনটা চুরমার হয়ে গেছে ঠিক যেমন চুরমার হয়ে গেছে এই পরিবারের স্বপ্নগুলো।নাফিযা বেগম মেহেরাব খানের পায়ের কাছে বসে পড়লেন। তার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসছে। তিনি শুধু অস্ফুট স্বরে বললেন,

নাফিযাঃ- তুমি চুপ করে আছো কেন? আমার আরিয়ান ভালো আছে তো?
মেহেরাব খান কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া এক ফোঁটা জল সব উত্তর দিয়ে দিল।পুরো ঘরে এক নিস্তব্ধতা নেমে এল, যা কিছুক্ষণ পরেই রূপ নিল এক বুকফাটা আর্তনাদে।
শোকের মাতম
ইলা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার মনে হচ্ছে চারপাশের দেয়ালগুলো তাকে গিলে খাচ্ছে।রায়েদ আর আদিব একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে আরিয়ানের মৃত্যু মেনে নেয়ার মত না।
রায়েদঃ- না এটা হতে পারে না আরিয়ান ভাই এভাবে আমাদের ছেড়ে যেতে পারে না।
ইলা ধীর পায়ে মেহেরাব খানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।তার চোখে জল নেই দৃষ্টি একদম স্থির।
ইলাঃ- বাবা আপনি মিথ্যা বলছেন তাই না?আরিয়ান তো বলেছিল ও আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না ও তো কথা দিয়ে কখনো কথা খেলাপ করে না।
মেহেরাব খান ইলার হাত দুটো ধরলেন। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে,
মেহেরাবঃ- মা রে দেশ আজ এক বীর সন্তানকে হারাল আর আমরা আমাদের কলিজার টুকরোকে।
মেহেরাব খান এর কাছে এই শব্দ দুটো শোনার সাথে সাথেই ইলা কোনো শব্দ না করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।নোহা,নেহা, পরি আর হালিমা ছুটে গিয়ে তাকে ধরার আগেই সে জ্ঞান হারিয়েছে।

অপরদিকে……
সিলেটের সেই পাহাড়ি ক্যাম্প এখন শান্ত। কিন্তু এই শান্তি বড়ই ভয়ংকর। সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে কয়েকটা কফিন,তাদের কাউকে চেনার উপায় নেই সবার শরীর ঝলসে গেছে। শুধু পোশাক বাচ নেম প্লেট দেখে সনাক্ত করা হয়েছে লাশ গুলো কফিন গুলোর ওপর সগৌরবে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।মাঝখানের কফিনটার সামনে আরিয়ানের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড দাঁড়িয়ে স্যালুট দিচ্ছেন।তার চোখেও জল। আরিয়ান এর নিথর দেহটার কিছুটা দূরে আরিয়ানের ওয়ালেট আর ইলার ছবিটা দেখা যাচ্ছিলো।যেন মৃত্যুর ওপারেও সে তার প্রিয়তমাকে সাথে করে নিয়ে যেতে চায়।আরিয়ানের সহকারী বিড়বিড় করে বলল,
“স্যার আপনি বলেছিলেন রক্তপাত ছাড়াই নিয়ন্ত্রণ করবেন।কিন্তু আপনি নিজের রক্ত দিয়ে আমাদের মাটি রক্ষা করে গেলেন। আপনার ঋণ এই দেশ কোনোদিন শোধ করতে পারবে না।”

খান বাড়ি…..
সকাল দশটা ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে আরিয়ানের মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছে।পুরো আত্রাই গ্রাম আজ মেহেরাব খানের বাড়ির সামনে ভিড় করেছে। সেনাবাহিনীর গাড়ি যখন বাড়ির সামনে এসে থামল তখন ইলার জ্ঞান ফিরেছে। সে কোনো কথা বলছে না শুধু শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
কফিনটা যখন উঠোনে নামানো হলো নাফিযা চিৎকার করে আছড়ে পড়লেন ছেলের কফিনের ওপর।
নাফিযাঃ- ওরে আমার বাবা রে তুই হাসি মুখে বেরিয়ে গেলি,আর আজ পতাকায় মুড়িয়ে ফিরলি?তোর মা বেঁচে থাকতে তুই কেন চলে গেলি। আমাকে কেনো রেখে গেলি বাবা।
ইলা টলতে টলতে কফিনের কাছে এগিয়ে গেল।কফিনের ওপর রাখা আরিয়ানের নেমপ্লেট ‘Major Ariyan’ এর ওপর হাত রাখল সে।
ইলাঃ- আপনি খুব স্বার্থপর আপনি বলেছিলেন সারাজীবন আমার সাথে থাকবেন। কিন্তু আপনি তো চিরতরে মায়ার বাঁধন ছিঁড়ে চলে গেলেন।
ইলা দুহাতে কফিনের ওপর ঢাকা দেওয়া জাতীয় পতাকাটা খামচে ধরল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছে গাল বেয়ে নামছে তপ্ত লোনা পানি।সে আর্তনাদ করে উঠল যা শুনে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের কলিজা কেঁপে উঠল।
ইলাঃ- আরিয়ান ওঠেন এই যে আপনার ইলাফুল কান্না করছে আপনি না আপনার ইলাফুল এর কান্না সহ্য করতে পারেন না।

তাহলে এখন কেন এই কাঠের বাক্সে শুয়ে আছেন ওঠেন বলছি
ইলা কফিনের গায়ে পাগলের মতো কিল-ঘুসি মারতে লাগল, যেন তার এই আঘাতে পাথর হয়ে যাওয়া আরিয়ান জেগে উঠবে। হালিমা আর পরি ইলাকে টেনে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু ইলার গায়ে যেন আজ আসুরিক শক্তি ভর করেছে। সে সবাইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
ইলাঃ- আমাকে কেউ ধরবে ন ও ঘুমাচ্ছে, ও আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে আরিয়ান আপনি কি উঠবেন নাকি আমি চলে যাবো।আপনি একবার উঠেন আমি আর জিদ করব না, আর কোনোদিন আপনার সাথে ঝগড়া করব না! শুধু একবার চোখ মেলুন আমাকে একবার ‘ইলাফুল’ বলে ডাকুন।
আরিয়ানের মা বোন পাশে বসে বুক চাপড়াচ্ছেন, কিন্তু ইলার এই উন্মাদনা দেখে সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ইলা এখন কফিনের ওপর মাথা কুটে কুটে রক্তারক্তি করে ফেলছে। তার নখ দিয়ে কফিনের কাঠ আঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলতে চাইছে সে।

ইলাঃ- আপনি কেন আমাকে এভাবে একা ফেলে গেলেন? আমি এখন কার জন্য বেচে থাকবো কার জন্য অপেক্ষা করবো?
খোদার দোহাই লাগে একবার উঠেন।
মেহেরাব খান এগিয়ে এসে ইলার মাথায় হাত রাখলেন কিন্তু ইলা তাকেও চিনতে পারছে না।সে শুধু কফিনের ঢাকনাটা খোলার চেষ্টা করছে।
ইলাঃ- বাবা ও ভেতরে শ্বাস নিতে পারছে না ওকে বের করুন ও উত্তর দিচ্ছেন না কেন?
রায়েদ এক কোণে দাঁড়িয়ে দেয়াল ধরে কাঁদছে।ইলার বাড়ির সবাই এসেছে ইলার এই অবস্থা দেখে সবাই কান্না করছে। ইলা প্রায় পাগল হয়ে গেছে।রায়েস ইলার এই অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারছে না। রায়েদ এসে ইলার হাত দুটো শক্ত করে ধরল।
রায়েদঃ- ইলা শান্ত হ বোন আরিয়ান ভাই শহিদ হয়েছে ও আল্লাহর কাছে চলে গেছে তুই দোয়া কর এভাবে ভেঙে পড়িস না।
ইলা রায়েদের মুখে দিকে তাকিয়ে আছে তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে।

ইলাঃ- মিথ্যা কথা একদম মিথ্যা কথা আরিয়ান মরেনি আরিয়ান আপনি উঠুন তো এই রায়েদ ভাইয়াকে বকুনি দিন, ও আপনাকে মৃত বলছে ও মজা করছে।
ইলা আবার আরিয়ানের কফিনের ওপর শুয়ে পড়ল।নিস্তব্ধ দুপুরে তার সেই বুকফাটা হাহাকার যেন সীমান্তের সেই বারুদের গন্ধকেও হার মানিয়ে দিল। সে বিড়বিড় করতে লাগল,
“আরিয়ান আমার মায়াজাল ছিঁড়ে আপনি কোথায় পালালেন? আমি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না আমি আসছি আপনার কাছে।
বলতে বলতে ইলা নিথর হয়ে কফিনের পাশে পড়ে গেলো।কান্নার বেগ সইতে না পেরে সে আবারও জ্ঞান হারিয়েছে।কিন্তু তার হাত দুটো তখনো কফিনের কাঠটা এমনভাবে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন আজরাইল এসেও সেই বাঁধন আলগা করতে পারবে না।
জানাজার জন্য আরিয়ানের দেহ যখন কফিনে করে বের করলো তখন সবাই এক পলক দেখার জন্য এগিয়ে এলো। কিন্তু দেখার মত অবস্থায় ছিলো না।
আরিয়ানকে যখন জানাজার মাঠে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল,তখন ইলা আবার জ্ঞান ফিরে পেয়েছে।কিন্তু সে এখন আর চিৎকার করছে না।তার চোখের জল শুকিয়ে গাল দুটো সাদা হয়ে গেছে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আরিয়ানের যাবার দিকে।

ইলাঃ- আপনি তো বলেছিলেন আমাকে ছাড়া কোথাও যাবেন না। আজ কেন এত মানুষ আপনাকে নিয়ে যাচ্ছে?
জানাজা শুরু হলো ইমাম সাহেবের ভারী কণ্ঠস্বর যখন বাতাসে ভেসে এল, “সালাতুল জানাজা…” তখন পুরো মাঠ এক অপার্থিব নীরবতায় ডুবে গেল। হাজার হাজার মানুষ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে এক বীর যোদ্ধার সামনে। মেহেরাব খান জানাজার কাতারে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে দিলেন। যে বাবা কোনোদিন মাথা নত করেননি আজ তিনি তার একমাত্র সন্তানের লাশের সামনে ভেঙে পড়েছেন।
আকাশে ও যেনো আজ কান্না করছে যেন মেঘেরাও আরিয়ানের বিদায় সইতে পারছে না।এই মাঠে যেখানে ছোটবেলায় আরিয়ান দৌড়ে বেড়াত, আজ সেখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। সবার চোখে জল।
আরিয়ানের দেহটা যখন বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো, অন্য দিকে ইলার শেষ আশাটুকুও যেন নিভে গেল। আরিয়ানের বাবা চিৎকার করে কান্না করছে
সেই চিৎকারে জানাজার মাঠে থাকা প্রতিটি মানুষের চোখ ভিজে উঠল। শক্ত হৃদয়ের সৈনিকদের চোখ থেকেও জল গড়িয়ে পড়ল। রাফায়েল সামির কেউ ঠিক নেই আজ। সবাই গভীর শক এ আছে আরিয়ানকে কবর দেওয়া হলো। একে একে সবাই চলে যাচ্ছে। কিন্তু আরিয়ানের বাবা সেই কবরের ওপর শুয়ে আছে। তার হাত দুটো মাটির ভেতরে ডেবে যাচ্ছে। সে যেন মাটির নিচে থাকা আরিয়ানকে ছুঁতে চাইছে।
মেহেরাবঃ- বাবা এ তুই কেমন শাস্তি দিলি আমাকে। আমি যে আর নিতে পারছিনা
আমি কিভাবে সবাইকে সমলাবো।

রায়েদ আদিব মিলে মেহেরাব খান কে তুলে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে।মাঠ খালি হয়ে গেছে এখন শুধু কয়েকটা কাক উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে, যেন তারাও এই শোকের ভার বইতে পারছে না।
খান বাড়ির এখন নিস্তব্ধ যে বাড়িতে সবসময় হাসি-আনন্দে মুখরিত থাকত, সেখানে আজ শুধু কান্নার ছায়া।
ইলা আরিয়ান কে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে একদম চুপ।কথা বলছে না কারো দিকে তাকাচ্ছে না।সবাই ভয় পাচ্ছে তার এই নীরবতা দেখে।পাগলামির চেয়ে এই নিস্তব্ধতা যেন আরও ভয়ংকর।
সন্ধ্যা নামার পর নাফিযা ইলাকে ডেকে নিয়ে গেলেন নামাজে ঘরের এক কোণে জায়নামাজ পেতে দিয়েছেন। ইলার হাত ধরে বসালেন।
নাফিযাঃ- মা একটু নামাজ পড় তোর আরিয়ান তো আল্লাহর কাছে।ওর জন্য দোয়া কর ও যেন জান্নাতে বাসি হয়।
ইলা কোনো উত্তর দিল না। শুধু জায়নামাজের ওপর বসে পড়ল।তার চোখ দুটো ফোলা, লাল। গালে শুকনো চোখের পানির দাগ। ইলা ধীরে ধীরে হাত তুলল তাকবিরের জন্য কিন্তু হাতটা কাঁপছে।
ইলা মনে মনে বলল,

ইলাঃ- আল্লাহ তুমি যদি সত্যিই দয়ালু হও, তাহলে আমার আরিয়ানকে ফিরিয়ে দাও। আমি তো কিছু চাইনি জীবনে।শুধু ওকে চেয়েছিলাম। তুমি কেন নিয়ে নিলে?
নামাজ শুরু হল ইলা সিজদায় গেল। মাথা মাটিতে রাখতেই তার বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এল জোরে জোরে।
ইলাঃ- ইয়া আল্লাহ আমার আরিয়ানকে ফিরিয়ে দাও ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না খোদা,তুমি তো সব পারো ওকে একবার ফিরিয়ে দাও আমি কখনো অকে কষ্ট দিবো না।
কান্নার সাথে সাথে ইলার শরীর কাঁপতে লাগল।সিজদা থেকে উঠতে গিয়ে সে টলে গেল নাফিযা বেগম ছুটে এলেন।
নাফিযাঃ- ইলা মা কী হলো?
কিন্তু ইলা আর শুনছে না তার চোখ বন্ধ হয়ে এসেছে।কান্নার ঝড়ে তার শরীর আর মন দুটোই ভেঙে পড়েছে। জায়নামাজের ওপর মাথা রেখে সে অজ্ঞান হয়ে গেল। যেন আল্লাহর কাছে শেষ অনুরোধটা করতে করতে থেমে গেছে। নাফিযা চিৎকার করে উঠলেন।
নাফিযাঃ- কেউ আয় ইলা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
হালিমা, পরি, নোহা, নেহা ছুটে এল। রায়েদ আর আদিবও দৌড়ে এল ঘরে। ইলাকে তুলে বিছানায় শোয়ানো হল।মুখে পানি ছিটানো হল।কিন্তু ইলার চোখ খুলছে না।তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে যেন এখনো বিড়বিড় করছে
“আরিয়ান… ইলাফুল… বলে একবার ডাকো…”

ডাক্তার ডাকা হল ডাক্তার এসে বললেন, শক আর অতিরিক্ত কান্নার কারণে তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশ্রাম দরকার, মনের ওষুধ দরকার।কিন্তু সবাই জানে এই শোকের ওষুধ কোথাও নেই। রাত গভীর হল ইলা এখনো অজ্ঞান।তার পাশে নাফিযা,সাবিহা,তাসলিমা,হালিমা,পরি,নোহা, নেহা সবাজ বসে আছেন। হাত ধরে বসে কাঁদছেন।
নাফিযাঃ- বৌমা তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড় তাহলে আমরা কীভাবে বাঁচব? আরিয়ান তোমাকে আমার কাছে রেখে গেছে। তুমি তো আমার ছেলের অর্ধেক। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমি কী করব?
বাইরে বৃষ্টি নেমেছে আকাশও যেন কাঁদছে।বৃষ্টির ফোঁটা জানালায় পড়ছে, আর প্রতিটা ফোঁটার সাথে ইলার অজ্ঞান মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে এই মায়াজাল আর কখনো ছিঁড়বে না।
কিন্তু ইলার মনে অজ্ঞানতার মাঝেও একটা স্বপ্ন দেখা যাচ্ছে। আরিয়ান দাঁড়িয়ে আছে, হাসছে। হাত বাড়িয়ে বলছে
“ইলাফুল কাঁদিও না আমি তো আছিই। শুধু চোখ বন্ধ করে দেখ…”
ইলা অজ্ঞান অবস্থায়ও এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।

TIME Skip…..
৭ দিন চলে গেলো সবার অবস্থা খারাপ মেহেরাব খান মনে হচ্ছে আধমরা হয়ে গেছে। নাফিযা নিজেও কান্না করে করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।আর ইলার দিন যত যাচ্ছে, ইলা ততই নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। রাতে ঘুম আসে না, আর এলেও স্বপ্নে শুধু আরিয়ানের মুখ ভেসে ওঠে হাসছে, ডাকছে “ইলাফুল”, তারপর হঠাৎ অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
সকাল হলে সে বিছানা থেকে উঠতে পারে না।শরীর দুর্বল, মাথা ঘোরে, বমি বমি ভাব।নাফিযা বেগম আর সাবিহা দুজনেই লক্ষ্য করেছেন ইলার চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে, গাল দুটো ভেতরে ঢুকে গেছে, হাত-পা ঠান্ডা।কথা বললে উত্তর দেয় না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকায়।
হঠাৎ ইলা বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল।মাথা ঘুরে চোখ অন্ধকার হয়ে এল।নোহা চিৎকার করে উঠল।

হালিমাঃ- আম্মু ভাবি পড়ে গেছে।
নাফিযা ছুটে এলেন নোহা আর নেহা মিলে ইলাকে কোলে তুলে বিছানায় শোয়ালেন। ঠান্ডা পানি মুখে ছিটালেন কিছুক্ষণ পর ইলার চোখ খুলল কিন্তু দৃষ্টি ঝাপসা।
নাফিযাঃ- আর এভাবে দেখা যাবে না আজই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। এভাবে চলতে পারে না।
আবিদ কে ফোন করে ডাকা হল। গাড়ি বের করা হল।ইলাকে তুলে গাড়িতে বসানো হল।ইলা কিছু বলল না,শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। চোখ দুটো শূন্য।
হাসপাতালে পৌঁছে গাইনোকলজিস্টের চেম্বারে নেয়া হল।ডাক্তার তমা, বয়স্ক, চশমা পরা। ইলাকে দেখে ভ্রু কুঁচকালেন।
ডাক্তারঃ- কী হয়েছে মেয়েটির?
নাফিযাঃ- অনেক দিন ধরে খাচ্ছে না ঘুমাচ্ছে না দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। মাথা ঘোরে বমি বমি করে।শকের পর থেকে এমন।
ডাক্তার ইলার পালস দেখলেন, চোখ-কান পরীক্ষা করলেন তারপর বললেন
ডাক্তারঃ- একটা টেস্ট করতে হবে।
প্রেগন্যান্সি টেস্ট নাফিযা চমকে উঠলেন।
নাফিযাঃ- মানে?
ডাক্তারঃ- লক্ষণগুলো দেখে মনে হচ্ছে। আর এই মানসিক শকের সাথে হরমোনের পরিবর্তন মিলে অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।
ইলা এতক্ষণ চুপ ছিল হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠল যেন অনেক দিন পর প্রথম কিছু শুনল।

ইলাঃ- প্রেগন্যান্ট…?
ডাক্তার নার্সকে ডেকে টেস্টের ব্যবস্থা করলেন কিছুক্ষণ পর রিপোর্ট এল।ডাক্তার রিপোর্ট দেখে মৃদু হাসলেন।
ডাক্তারঃ- পজিটিভ আপনি প্রেগন্যান্ট।
প্রায় সাত-আট সপ্তাহ হবে চেম্বারে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল।নাফিযা চোখে জল চলে এল হাত কাঁপছে। আদিব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।ইলা অবাক চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাতটা পেটের ওপর রাখল।
ইলাঃ- আরিয়ান… তোমার… আমাদের…!!!
ইলার কণ্ঠ ভেঙে গেল চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।কিন্তু এবারের জল অন্যরকম। শোকের সাথে মিশে আছে একটা অদ্ভুত আলো।যেন মৃত্যুর অন্ধকারের মাঝে হঠাৎ একটা ছোট্ট আলো জ্বলে উঠেছে।

নাফিযাঃ- বাবা রে আমার আরিয়ানের বাচ্চা
ইলা হঠাৎ উঠে দাঁড়াল পা কাঁপছে, কিন্তু সে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল
ইলাঃ ডাক্তার এটা…এটা সত্যি? আমার পেটে আরিয়ানের একটা অংশ জীবিত?
ডাক্তার মাথা নাড়লেন
ডাক্তারঃ- হ্যাঁ তবে আপনাকে এখন থেকে খুব যত্ন নিতে হবে। আপনার স্বামীকে আপনার কেয়ার নিতে বলবেন বেশী করে।
ডাক্তার এর কথা শুনে ইলার চোখে পানি চলে আসলো। নাফিযা ডাক্তার কে সব কিছু খুলে বলল সব শুনে ডাক্তার বলল

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৭

ডাক্তারঃ- এখন নিজেকে আর ভাঙতে দেয়া যাবে না।এই বাচ্চার জন্য আপনাকে বাঁচতে হবে।
ইলা আবার বসে পড়ল হাতটা পেটে রেখে আলতো করে হাত বুলাতে লাগল। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল
ইলাঃ- আরিয়ান আপনি চলে গেছন কিন্তু আমাকে একা ফেলে যাননি।আপনি আমার ভেতরে ফিরে এসেছ আমি আপনাকে হারাইনি।

ভয়েজের মায়াজাল পর্ব ৫৯