Home ভাব তরঙ্গ ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৪

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৪

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৪
বেলা শেখ

রাতের প্রথম ভাগে ভ্যাঁপসা গরম অনুভুত হলেও শেষ ভাগে শীতে রোমকূপ সজাগ। একটু পরপরই গা শিউরে উঠছে ঠান্ডায়। হাঁটু ভাঁজ করে বুকে জড়িয়ে পত্রলেখা পলকহীন তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত মানবের দিকে। স্পোর্টস ব্যাগে মাথা রেখে মেঝেতেই গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। পরিবার পরিজন ছেড়ে অচেনা জায়গায়, অচেনা ঘরের মেঝেতে, বালিশ বিহীনও কতটা নির্বিঘ্নে ঘুমুচ্ছে নবাব পুত্তুর। যেন চিন্তার কিছু নেই। অথচ সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারে নি সে। অনিশ্চিত জীবনটা বড্ডো এলেবেলে হয়ে গেছে। প্রতিটি প্রশ্বাসে যেন বিষ প্রবেশ করছে অন্তরে। কবে স্বস্তি ফিরবে? আদৌ ফিরবে তো? বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। অরুণাভের ঘুমন্ত মুখপানে তাকিয়ে ম্লান হাসে। মনে পড়ে যায় প্রথম মুখাদর্শন।
সেদিন বর্ষা খালমুনিকে চা দিতে গিয়েছিল। খালমুনি, বাদল আর ছোট্ট বৃষ্টি ল্যাপটপে খেলা দেখছিলো। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ওয়ার্ম আপ ম্যাচ ছিলো। বাংলাদেশ আর আফগানিস্তানের। নিজ জন্মভূমির নাম শুনেই বুকটা আনচান করে পত্রলেখার। নিজ দেশের কথা শুনতে, দেশের মানুষ দেখতেও ভালোলাগা কাজ করে। সেও বসেছিল খেলা দেখতে। হঠাৎ সুন্দর দেখতে হ্যাংলা পাতলা বাংলাদেশী যুবককে স্ক্রিনে দেখা যায়। বাদল জানায় ওটা তাঁর বরুন ভাই। বর্ষা খালামুনির প্রথম পক্ষের ছেলে—বরুণ ওরফে অরুণাভ সরকার।

সেদিনের ম্যাচ বৃষ্টির কারণে মাঝপথেই ব্যাহত হয়েছিল। তবে ব্যাট হাতে ৩৫ রান আর ৪ উইকেট নেওয়া যুবকটা সবার নজর কেড়েছিল। যুবকের মুখ থেকে হাসি সরছিলোই না। সেবারের অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের বাংলাদেশের একটা ম্যাচও সে মিস করে নি। স্ক্রিনে যখন সুন্দর মুখটা দেখাতো কিশোরী মনে শিউলি ফুল ফুটতো। কেমন যেন লজ্জা লাগতো! চিকনা ছেলেটাকে চোখে রাখতে রাখতে কখন যেন ভালো লেগে গেলো। এরপর ইন্সটাগ্রামে, ফেসবুকে খুঁজে পায়। কোন কালে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছিল এখনও ঝুলে আছে। তবে পাবলিক ফিগার থাকায় সব পোস্ট নজর কাড়তো। সে আপলোড কৃত সব পিকচার সেভ করে রাখতো। প্রিন্ট করে একটা অ্যালবামও বানিয়েছে। অ্যালবামের নাম—জানান।
সে কখনো ভাবেও নি তাঁর ক্রাশের সাথে তাঁর দেখা হবে। আর প্রথম দেখায় তাঁর নাক ফাটাবে! ভাবতেই নাকে হাত চলে যায় পত্রলেখার। ইশ্ কি ব্যথাটাই না পেয়েছিল সেদিন! তারপর ধীরে ধীরে ভাগ্য তাঁকে এই পর্যায়ে এনে দাঁড় করাবে।

মোটাতাজা গাল ফুলো সেই বাচ্চাছেলের সাথে বড়বেলার যুবকের মিল খুঁজে পায় না। শুধু ঘন পাপড়ির আবডালে ভাসা ভাসা চোখ দুটো আর বাম চোখের নিচে কালো তিলটা চেনা যায়। পত্রলেখা তিলটা দেখার চেষ্টা করে। ওই তো ফর্সা গালে কালচে তিল চেয়ে আছে। হঠাৎ খেয়াল হয় ছেলেটা কাঁপছে, ক্রমশই কুকড়ে যাচ্ছে। শীত লাগছে? নাকি জ্বরটর এলো নবাবপুত্তুরের! অস্বাভাবিক না, গত সারারাত বৃষ্টি মাথায় বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
নিঃশব্দে এগিয়ে শিয়রের কাছে বসে। জড়তায় নুইয়ে আর ভয়ে ভীত হয়ে কপালে হাত রাখে। এই বুঝি গর্জে ওঠে। যে রাগী ছেলেটা! পত্রলেখা হাত সরিয়ে নেয়। জ্বরের মাত্রা ভালোই। এখন কি করবে সে? উপান্তর না পেয়ে অরুণাভের বাহু ঠেলে দেয়।
অরুণাভের ঘুমন্ত মুখে বিরক্ত ভাব ফুটে ওঠে, পাশ ফিরে শোয়। পত্রলেখা আবারও বাহু ঠেলে। একসময় অরুণাভের ঘুম ছুটে যায়। চোখ মেলতেই পত্রলেখার মুখাদর্শন। আশেপাশে তাকাতে একটু চমকায় বৈ কি। কোথায় সে? লম্বা দম নিয়ে নিজেকে সামলে নিলো। মস্তিষ্ক কার্যকারিতা শুরু করে দেয়। উঠে বসে আলগোছে। অসহ্যনীয় মাথা যন্ত্রণায় কপাল চেপে ধরল।

পত্রলেখা চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে। তাঁর উপর নজর পরতেই কর্কশ গলায় বলল, “সমস্যা কি তোমার?”
পত্রলেখা ভ্রু কুঁচকে নেয়। দূরত্ব রেখে অরুণাভের কপালে হাত রাখার ভঙ্গিমা করে উল্টে পাল্টে বোঝায়, তোমার জ্বর! অরুণাভ আবারও গা এলিয়ে দেয়। বিরক্ত প্রকাশ করে বলে, “প্রতিবন্ধী না আমি। বোঝার ক্ষমতা আছে যে জ্বর এসেছে আর মাথা যন্ত্রণাও। আর আমার কাছে ওষুধ নেই।”
পত্রলেখার কপালে চিন্তার রেখা। কিছু সময় ভেবে অরুণাভের মুখের সামনে তুড়ি বাজায়। স্বীয় ওড়না রগড়ে ভাঁজ করে কপালে রাখার ভঙ্গিমা করে। অরুণাভ বুঝলো জলপট্টি দেওয়ার কথা বলছে। সে পূর্বের চেয়েও দ্বিগুণ বিরক্তভাব ফুটিয়ে পিঠ ফিরে শুয়ে বলল, “দরদ দেখাতে হবে না। দূরে যাও!”
পত্রলেখা চলে যায়। তবে মনের ভেতর অস্থিরতা বিরাজ করে। ছেলেটা জ্বরে ঠকঠক করে কাঁপছে। আবার নাকি মাথা ব্যথাও! সে ঘরে একলা মানুষ। মানবতার খাতিরেও তো কিছু করা উচিত। সে আবার ফিরে আসে। উঁকি দিয়ে দেখে, চোখ বুজে শুয়ে আছে। অতি সাবধানতার সাথে স্পোর্টস ব্যাগের চেন খুলে। ক্ষীণ শব্দ হতেই অরুণাভ তড়িৎ গতিতে ঘাড় ফেরায়। ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলে,

“কি করছো তুমি?”
পত্রলেখার চোখে মুখে অস্থিরতা! কপালে খেলে বেড়ানো চুল কানের পিঠে গুঁজে ইশারায় চারকোনা কিছু বোঝায়। তারপর ব্যাগ হাতরায়। অরুণাভ রীতিমতো অবাক। এই মেয়ের সাহস কি করে হয় তাঁর ব্যাগে হাত দেওয়ার? ইচ্ছে তো করে হাতটাই ভেঙে ফেলার। তবে সে রাগ দমিয়ে রেখে চুপচাপ মেয়েটার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে। খুঁজছে টাকি!
সাদা রুমাল পেয়ে পত্রলেখার ঠোঁটের কোণা বেঁকে গেছে। সে তড়িঘড়ি চলে যায়। ছিটকিনি খুলে বাইরে রান্নাঘরের সিংকের পানিতে রুমাল ভিজিয়ে নেয়। অরুণাভ বুঝলো তাঁর মনোভাব। ভালোলাগা তো দূর উল্টো বিরক্তি এসে জমা হয়।
“একদিনেই দরদ উথলে পড়ছে! সুন্দর ছেলে দেখলে এদের ঢং করতেই হবে, ন্যাকাষষ্ঠী। ”
দরজায় দাঁড়ানো পত্রলেখা স্পষ্ট শুনতে পায়। মুখটা গম্ভীর হয়ে আসে তৎক্ষণাৎ। হাতের ভেজা রূমাল মুখ বরাবর ছুঁড়ে মারে। বলাবাহুল্য তাঁর দিকজ্ঞান ভালো। এক্কেরে নিশানায় লেগেছে। অরুণাভ মুখ থেকে রূমাল সরায়। চোখ দুটো আগুনের লেলিহান শিখার কোনো অংশে কম না।

“হাউ ডেয়ার ইয়্যু” অতিরিক্ত রাগে কথা আঁটকে আসে অরুণাভের।
পত্রলেখা একটুও দমল না। তর্জনী আঙ্গুল গোল গোল ঘুরিয়ে অরুণাভের মুখ ইশারা করল। তারপর দুই হাত দিয়ে গোল করে পেয়ারা ফলের আকৃতি বানিয়ে মুখ বাঁকাল। ইশারার অর্থ বুঝতে অরুণাভের দেরি হল না। সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ঝগরুটে সুরে বলল, “নিজেকে বিশ্ব সুন্দরী ভাবো নাকি হ্যাঁ?”
পত্রলেখা বুকে হাত ভাজ করে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অরুণাভের গা জ্বলে পুড়ে ছারখার। সে তিরিক্ষি মেজাজে বলে, “তুমি একটা অসহ্য!”
পত্রলেখা ঠোঁট বাঁকিয়ে দুই হাতের মুঠি আলতো করে একবার ঠুকিয়ে দিল। তারপর পূর্বের স্থানে বসে পড়লো। ভঙ্গিটাই যেন বলে দিল— ‘আমার তাতে বয়েই গেছে।’
অরুণাভের মাথার চুল টেনে ছেঁড়ার ইচ্ছে করে। সে তাৎক্ষণিক ঘর ছাড়ে। ওয়াশ রুমে গিয়ে ট্যাপ ছেড়ে দেয়। জলধারায় মাথা পেতে দেয়। জ্বরের প্রকোপে চোখ দিয়ে ভাপ বেরুচ্ছে।
এক রুমের ছোট্ট বাসা। অল্প জায়গায় কিচেন আর ওয়াশ রুম পাশাপাশি। এছাড়াও একটা ছোট্ট বেলকনি আছে, গ্রীল বিহীন। অরুণাভ সেথায় রেলিংয়ের ওপর চড়ে উদাস বসে আছে। জ্বরে চোখ দুটো রক্তিম। শিশির বিন্দুর আভাস। নাকটাও ঢিলে হয়ে এসেছে। ভালোই পোড়াবে মনে হচ্ছে! ওষুধ খাওয়া অতীব জরুরী। কিন্তু সবে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দোকানপাট খুলতে ঢের সময়। হঠাৎ কারো পদচারণায় অরুণাভ বেলকনির দরজায় তাকায়।‌

“আই থিংক আমাদের ঠান্ডা মাথায় এই ব্যাপারে কথা বলা উচিত!”
পত্রলেখা আর এগুলো না। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। অরুণাভ সামনে খোলা আকাশপানে চেয়ে বলল, “এই সম্পর্কটাকে বয়ে বেড়ানো আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি হয়তো আমাকে পছন্দ করো। কিন্তু আমি তো করি না। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি।”
পত্রলেখা আশ্চর্য না হয়ে পারে না। সে ছেলেটাকে পছন্দ করে একথা কিভাবে বুঝলো ছেলেটা? তাঁর মন গোপনের কথা তো কেউ জানে না। হ্যাঁ মা একটু আকটু সন্দেহ করেছিল। মা বলে দিয়েছে কি? লজ্জায় লাল হয়ে আসে ধবল মুখখানি।
“যা হয়েছে খুবই ছেলেমানুষী! আমাদের এরকম জঘন্য ডেয়ার পূরণ করা উচিত হয় নি। আবার তোমাকে লক করাও উচিত হয় নি। ধরা পরে ব্যাপারটা আরো জঘন্যভাবে প্রেজেন্ট হয়েছে। এখানে আমাদের কারোরই দোষ নেই। আমরা পরিস্থিতির শিকার বুঝলে?”
মুখে বললেও অরুণাভ মনে মনে ভাবে— ‘সব দোষ এই ডাঈনীর। ও যদি পার্টিতেই না আসতো। তাহলে এতো কিছু হতোই ন। কুফা মেয়ে!’
পত্রলেখা সমানতালে হাত কচলায়। ছেলেটার মতলব খানা কি? নবাব পুত্তুরের এতো ভালো ব্যবহার তো হজম হচ্ছে না।
অরুণাভ আড়চোখে পত্রলেখার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “পার্টিতে কেন আসলে? না মানে দুদিনের পরিচিত একটা ছেলের সাথে নির্দ্বিধায় পার্টিতে এলে, তা-ও রাতের বেলায়। তোমার মা তোমাকে শাসনে রাখে না, না?”

পত্রলেখার চোখ দুটো দপ করে জ্বলে ওঠে। অরুণাভ ঘি ঢেলে বলল, “টুটুলের সাথে রিলেশনে আছো তুমি?”
পত্রলেখা ক্রোধ ভরা টলমলে চাহনি নিক্ষেপ করে মুখ ফিরিয়ে ঘরে চলে যায়। অরুণাভ ক্রুর হাসলো। গলা চড়িয়ে বলল, “আরে চিঠিপত্র রেগে গেলে নাকি! রাগার কি আছে বুঝলাম না কিন্তু! আমি তো সরল মনে প্রশ্ন করলাম। রিলেশনশিপে না থাকলে তো তাঁর সাথে রাত দুপুরে পার্টিতে আসতে না।”
ঘনঘন চোখ মুছে পত্রলেখা। ভুল তো বলে নি ছেলেটা। যে কারো মনেই এমন প্রশ্ন আসতে পারে। তারই ভুল। হোস্টেলে আড়াইশো মেয়েদের ভিড়েও নিজেকে বড্ড একা মনে হলেও নিরাপদ ছিলো। কেউ আঙুল তোলার সাহস করতো না! কেন টুটুলের জোরাজুরিতে রাজি হলো! হাতের কাছে পাক কষিয়ে লাগাবে একটা! বলে কি-না ফ্রেন্ডের বার্থডে পার্টি। রাত আটটার মধ্যেই চলে আসবে। আটটা বাজলে সে টুটুলের কাছে হোস্টেল ফেরার তাড়া দেখাচ্ছিল। ছেলেটা আমলেই নিচ্ছিলো না। চিল করতে বলছিলো। ওদিকে ভয়ে তাঁর প্রেসার লো হয়ে আসে। তবে স্বস্তি ছিলো পার্টিতে মেয়েদের উপস্থিতি। সে তাদের সাথেই বসে ছিলো চুপচাপ।‌ তারপর শুরু হয় সেই ভয়ানক ‘ডেয়ার এন্ড ডেয়ার’ খেলা। সে খেলবে না খেলবে না ইশারা করলেও টুটুল তাঁর নাম লেখায়। তারপর যখন তাঁর সাথে অরুণাভের নাম ওঠে সে চমকায়। ডেয়ার শুনে জ্ঞানশূন্য পড়ে। অরুণাভের মতো সেও আপত্তি প্রকাশ করে। নিরেট হয়ে বসে রয় সোফায়। কিন্তু সবাই নাছোড়বান্দা। হাসি ঠাট্টা করছিলো। আধ ঘণ্টাই তো— বলে কয়ে মেয়েগুলো একপ্রকার ঠেলে গুতে স্টাডি রুমে রেখে আসে। সে জড়সড় হয়ে বসে ছিলো টুলে। অরুণাভ একবারও তাঁর দিকে ফিরে চায় নি। ফোন গুঁতাচ্ছিলো ফুরফুরে মেজাজে। পনেরো মিনিটের মাথায় বাইরে থেকে গন্ডগোলের আভাস পাওয়া গেলো। সেই মুহূর্তে চোখাচোখি হয় দুজনের।
ফোন বাজছে। অচেনা নাম্বার দেখে অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়ে। রিসিভ করে কানে ঠেকাতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে,
“হ্যালো বরুণ?”

অরুণাভের মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে। ভাবে ফোনের ওপাশে তাঁর অপ্রিয় জন্মদাত্রী। কল কাটতেই নিবে তখন ওপাশের ব্যক্তি নিজ পরিচয় জানায়,
“আমি পত্রলেখার মা পপী চৌধুরী বলছি।”
অরুণাভের মেজাজ ঠান্ডা হলেও বিরক্তি কমলো না। ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও বলল, “জি বলুন!”
পপী চৌধুরী দম দেয়। শব্দ গুছিয়ে বলে, “পত্রলেখার ফোনে কল করেছিলাম। অরুণ ভাইয়া রিসিভ করলো। জানালো তুমি নাকি রাগ করে বাড়ি ছেড়েছো। পত্র তোমার সাথে তাই না?”
“হ্যাঁ।”
পপী চৌধুরী দম ছাড়েন। তবে ভয় কমে না। বদরাগী ছেলেটার যে ভরসা নেই। তিনি বলেন, “একটু কথা বলিয়ে দাও?”
“আপনার মেয়ে তো কথা বলতে পারে না।”
পপী চৌধুরী হাসলেন, “তুমি ফোন দাও ওঁর কাছে। দেখো কিভাবে কথা বলি!”
অরুণাভ বিরক্ত মুখে ঘরে ফিরে আসে। পত্রলেখাকে অদ্ভুত শব্দ করে কাঁদতে দেখে ভ্রু কুচকালো। ফোন বাড়িয়ে বলল, “তোমার মা, কথা বলো?”

পত্রলেখা ফোন কেড়ে নিয়ে কানে ঠেকালো। একবার মুখ তুলেও চাইলো না। তাতে কার কি! অরুণাভ তাঁর ব্যাগে মাথা ঠেকিয়ে আবারও গা এলিয়ে দিলো। জ্বর ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলছে নাজুক দেহখানি।
“পত্র, মা আমার কাঁদছো কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে।”
পত্রলেখা মাথা নেড়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে। কিচ্ছু ঠিক হবে না। পপী চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “দোষ তোমারই। কেন গেলে পার্টিতে? আমার অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে না একবারও। তোমার সাহস দেখে আমি অবাক পত্র!”
পত্রলেখা শান্ত হয়ে গেলো। পপী চৌধুরী বললেন, “কষ্ট পেলেও এটাই সত্যি বাকিদের মতো সাধারণ নও তুমি। যেখানে সাধারণ মেয়েরাই দিনদুপুরে হেনস্থার শিকার। সেখানে রাত দুপুরে এক বাক প্রতিবন্ধী মেয়ে হয়ে তুমি দুদিনের বন্ধুর সাথেও পার্টিতে চলে গেছো। তাও রাত্রি বেলায়। আমি তো যাস্ট স্পিচলেস! এতোটা অধঃপতন মানতে কষ্ট হচ্ছে পত্র।
পত্রলেখার নীরাবতা আরেকটু ঘন কালো হয়। পপী চৌধুরী থেমে নেই, “এমনিতেই বোবা বলে বিয়ে দিতে পারছি না। তার উপর এই কেলেংকারি! লোক জানাজানি হলে সমাজে মুখ দেখাতাম কি করে তুমিই বলো? তাই অরুণ ভাইয়ের প্রস্তাব আমি ফেলতে পারি নি।”

মেয়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি কঠোরতা ঠেলে নরম হয়ে বললেন, “আমার জানামতে বরুণ তোমার পছন্দের। আর খোঁজখবর নিয়ে জানলাম ছেলেটা ভালোই। শুধু বয়সটাই কাঁচা। ওঁর অমতে বিয়ে তাই প্রথম প্রথম হয়তো রাগ দেখাবে, চিল্লাচিল্লি করবে। মানতে চাইবে না তোমাকে, ডিভোর্সের কথা বলবে। তুমি একটু নরম থেকো, কষ্ট হলেও মানিয়ে নিও। দেখবে একদিন সব ঠিকঠাক।”
পত্রলেখার আর শুনতে ইচ্ছে করে না। কল কেটে দেয়। অরুণাভ বিদ্রুপের হাসি উপহার দিয়ে বলল, “তোমার মা খালাদের মা হওয়ার যোগ্যতাই নেই চিঠিপত্র! একই নারিতে শ্বাস নেওয়ার পরও সন্তানের প্রতি তাদের টানই নেই। অথচ আমার আম্মুকে দেখো? নিজ গর্ভজাত সন্তানের থেকে কোনো অংশে কম মনে করে না বরঞ্চ বাকিদের থেকে বেশিই চোখে হারায়!”

পত্রলেখা কিছু বললো না। সে জানে, মা তাঁকে ভালোবেসে। তবে মা তাঁর থেকেও নিজের ভালোথাকাকে বেশি ভালোবাসে। আর এতে ভুলও নেই। সবারই ভালো থাকার অধিকার আছে। বাক প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য নিজের পুরোটা জীবন নষ্ট করার মানেই হয় না। তাছাড়াও মা তাঁর সব প্রয়োজন মিটিয়েছে। সুযোগ আর সময় পেলেই ছুটে এসে মেয়ের সাথে সময় কাটিয়েছে। আদর করেছে। তাই সে মায়ের ভুল খুঁজে পায় না।
কলিং বেল বাজাচ্ছে কেউ। পত্রলেখা অরুণাভের দিকে তাকায়। ঘুমিয়ে পড়েছে আবারও, নাকি জ্বরে হুঁশ হারিয়েছে? সে গিয়ে বাহু ঝাঁকায়। জ্বরে কাতর অরুণাভ দূর্বল ভঙ্গিতে চোখ মেললো। পত্রলেখাকে দেখে ঝাঁঝালো স্বরে বলে, “তোমার সমস্যা টাকি? শান্তি তো কেড়েই নিয়েছো এখন ঘুমোতেও দিবে না?”
পত্রলেখা নাকের পাটা ফুলিয়ে দরজায় ইশারা করে বোঝায় কলিং বেল বাজাচ্ছে কেউ। অরুণাভের কপালে ভাঁজ পড়ে। সাত সকালে কে এলো? আব্বু নিশ্চয়ই ! চোখের তারা চমকায় তাঁর। অনেক কষ্টে উঠে বসে। হেলে দুলে গিয়ে দরজা খোলে। বাড়ির মালিক সরোয়ার সাহেব দাঁড়িয়ে।
“গুড মর্নিং আঙ্কেল!”

সরোয়ার সাহেবের মুখশ্রী গম্ভীর। চাহনি অরুণাভের পেছনে। অরুণাভ পেছন ফিরে, চোখ রাঙায়। পত্রলেখা ঘরের দরজা থেকে সরে গেল। অরুণাভ সামনে ফিরে সৌজন্যবোধক হাসলো। ভদ্রলোক গম্ভীর মুখে বললেন, “মনির বলেছিলো একা থাকবে। ব্যাচেলর ভাড়া দিবোই না। মনির এতো করে বললো বলে রাজি হলাম। বাড়িতে উঠলে একাই। সকালে দারোয়ান বললো মাঝরাতে রাতে কোন মেয়েকে নিয়ে এসেছো!”
“ও মেয়ে না আঙ্কেল, ও একটা ডা…” অরুণাভ স্বীয় মুখ চেপে ধরে।
সরোয়ার সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন, “মেয়ে না মানে?এখন তুমি কি আমাকে ছেলে মেয়ের ফারাক শেখাবে?”
অরুণাভ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল, “কাজিন হয়।”
ভদ্রলোক বুঝি রেগে গেলেন। বললেন, “রাত দুপুরে কাজিনকে ঘরে আনবে? তাও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে কাজিন! মাথা খারাপ তোমার?”
জ্বরে অরুণাভের মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু সময় থম মেরে থেকে সেই অপ্রিয় সত্যটাই বলে দিলো, “সি’জ মায় ওয়াইফ, ওলসো কাজিন।”

“প্রমাণ?”
অরুণাভ এলোমেলো চুল পেছনে ঠেলে দেয়। শার্টের হাতায় নাক ডলে বলে, “আঙ্কেলকে ফোন করে এনশিউর হয়ে নিন।”
সরোয়ার সাহেব আর ঘাঁটলেন না। ভালোই হয়েছে, বউ এনেছে। তিনি ভ্রু কুঁচকেই বললেন, “তুমি অরুণ সরকারের ছেলে না?”
অরুণাভ কড়ছা দৃষ্টি ক্ষেপন করে বলে, “না, উনি আমার বাবা।”
ভদ্রলোক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললেন, “একই তো হলো!”
“না…এক হলো না। আমার কোচ বলে, আন্ডার এইটিন ছেলেরা বাবার পরিচয়ে বড় হয়। আর আফটার এইটিন বাবারা ছেলেদের পরিচয় পায়। তাই ছেলেদের উচিত বুঝে শুনে প্রতিটি কদম ফেলা। একটি ভুল কদম বাবার সম্মান নষ্ট করে।”
জ্বরে অরুণাভ আবোলতাবোল বকে। লোকটা আঠার মতো লেগে আছে। যাচ্ছে না কেন? তাঁর মাথা চক্কর দিচ্ছে। এই বুঝি গা ছেড়ে দেয়। সরোয়ার সাহেবের কপালের ভাঁজ শিথিল হয় আসে। পছন্দ হয় কথাটা। দরজা থেকে উঁকি দেওয়া প্রাণীটিকে দেখে মুচকি হেসে বলল,
“প্রেমের বিয়ে তোমাদের? বাড়ি থেকে মেনে নেয় নি বলে এখানে এসেছো নিশ্চয়ই? এখন বুঝেছি সব।”
অরুণাভ চট করে তাকালো। ভদ্রলোক মুচকি হেসে অরুণাভের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “চিন্তা করিও না। খুব শিগগিরই মেনে নিবে। ততদিন আমার এখানেই থেকো। কোনো সমস্যা হলে নির্দ্বিধায় বলতে পারো!”
অরুণাভ জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করে। ভদ্রলোক দরজার দিকে ইশারা করে বললেন, “ডাকো বউমাকে! ভালোমন্দ জিজ্ঞাসা করি!”

“ও কথা বলতে পারে না।”
ভদ্রলোক সন্দিহান চোখে চাইলেন।
“মানে, কথা বলবে না। একটু বেশি-ই লাজুক।”
দাঁতে দাঁত চেপে বলেই অরুণাভ উঁচু গলায় ডাকলো, “পত্রলেখা, আঙ্কেল কথা বলবে। বাইরে কি আসবে?”
সরোয়ার সাহেব মুগ্ধ হলেন। কি সুন্দর করেই না ডাকলো! আহা মনটাই জুড়িয়ে গেলো তাঁর।‌ তিনিও বউকে এভাবেই নাম ধরে ডাকেন। পত্রলেখা মাথায় কাপড় টেনে বেরিয়ে আসে। অরুণাভের পিঠ পেছনে দাঁড়িয়ে লাজুক হাসলো। অরুণাভের গা জ্বলে উঠলো। মেয়েদের এক্টিং লেভেল কতটা হাই তা আজ বুঝে গেলো সে। এই মেয়ে অতিমাত্রায় ধুরন্ধর। সাবধান অরুণাভ!
ওদিকে সরোয়ার সাহেব মুগ্ধ হলেন মেয়েটার নমনীয়তায়। কি স্নিগ্ধ শোভন মুখটা! তাঁর নিজ মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল, “মা, তোমার নাম কি?”
পত্রলেখা চোখ তুলে তাকালো। সরোয়ার সাহেব নাম শোনার জন্য মুখিয়ে। অরুণাভ ধৈর্য হারিয়ে নিজেই জবাব দিলো, “পত্রলেখা পাঠান।”
“পাঠান?” ভদ্রলোক কতক্ষণ পত্রলেখার মুখের দিকে তাকালেন। একটু ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় মেয়েটা বাঙালি না।

“তুমি বাংলাদেশী না?”
পত্রলেখা মাথা নাড়লো। ভদ্রলোক শুধালেন, “পাকিস্তানী? নাকি ইন্ডিয়ান?”
পত্রলেখা না বোধক মাথা নেড়ে অরুণাভের দিকে তাকায়। অরুণাভ বিরক্ত মুখে বলল, “আফগান!”
“আফগান?” ভদ্রলোকের চোখে মুখে বিস্ময়। পত্রলেখা মুচকি হেসে মাথা দোলালো। ভদ্রলোক আরও কিছু বলতে চাইলেন অরুণাভ আলোচনায় ফুলস্টপ বসিয়ে বলল, “আঙ্কেল অন্য কোনো সময় কথা বলবো। এখন একটু তাড়া আছে। বেরুতে হবে আমাকে।”
ভদ্রলোক আলোচনা দীর্ঘ না করে চলে গেলেন। অরুণাভ ধরাম করে দরজা লাগিয়েই পত্রলেখার উপর খেকিয়ে উঠলো, “ছোট বাচ্চা তুমি? উঁকি ঝুঁকি কেন দিচ্ছিলে, হ্যাঁ? আর ডাকলাম বলেই বেরিয়ে আসতে হবে? কমনসেন্স নেই তোমার, বেয়াদব!”
পত্রলেখা নাক মুখ কুঁচকে ছোট ছোট চোখে চাইলো। অরুণাভ কটমট করে বলল, “খবরদার ওভাবে তাকাবা না! চোখ তুলে নেবো একদম! আমাকে তো চিনো না তুমি!”
পত্রলেখা ঠোঁট বাঁকায়। বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে যায় ঘরে। অরুণাভ কতক্ষণ হাবলার মতো তাকিয়ে রইলো। তারপর ধেয়ে গেলো ঘরের দিকে। খুনাখুনি না হয়ে যায়!

অনেক দিন পর বাবার গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে অরুণিতা! গম্ভীর মুখে লুকোচুরি ভাব। অরুণ সরকার ফোনে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসে। কানে ফোন ঠেকিয়েই গাড়িতে উঠে বসে। চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্চিন চালু করে। হর্ণ বাজিয়ে ছেলেকে ওয়ার্ণ করে। প্রহর ব্যাগ কাঁধে ছুটে আসে। বোনকে ফ্রন্ট সিটে দেখে মুখ কালো করে পেছনে বসে। অরুণ লুকিং গ্লাসের দিকে তাকিয়ে ছেলেকে ইশারায় বোঝায়— কি হলো?
প্রহর মুচকি হেসে মাথা দোলায়। অরুণ ফোন রেখে দিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল, “ব্যাগ রেখে দাও, আজ আমার অবেলার প্রহর ড্রাইভ করে স্কুলে যাবে!”
প্রহরের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে আসে, “পাপা সত্যিই?”
“হুম হুঁ!”

প্রহর অত্যধিক খুশিমনে ব্যাগ ফেলে গাড়ি থেকে বেরোয়। অরুণ দরজা খুলে ছেলেকে তুলে কোলে বসায়। গালে গাল ঘষে চুমু দেয়। প্রহর স্টিয়ারিংয়ে হাত রাখলে অরুণ ছেলের হাতে হাত রেখে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
অরুণিতা আড়চোখে পাপার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে। ছেলের মন খারাপ বুঝতে তো কষ্ট হলো না। যত সমস্যা অরুণিতার বেলায়।
“তোমার ক্লাসটিচার ফোন করে বলল তুমি নাকি ক্লাসে পিঙ্কির সাথে পটর পটর করো। এটা কিন্তু গুড বয়ের কাজ না। গুড বয় ক্লাসে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়। গার্লফ্রেন্ডের দিকে না।”
শেষের টুকু বিড়বিড় করে বলল অরুণ সরকার। প্রহর চোখ পিটপিট করে বলল, “পটর পটর কি পাপা?”
“অকারণে কথা বলা।”
“আমি তো অকারণে কথা বলি না! ইম্পোর্টেন্ট কথা বলি!”
অরুণ হাসলো, “তা কি ইম্পোর্টেন্ট কথা বলো শুনি?”
প্রহর আনন্দ প্রকাশ করে বলে, “পিঙ্কির আম্মুর টাম্মিতে বাবু আছে। কিন্তু পিঙ্কি জানেই না।”
“জানে না? তোমাকে কে বললো ওর আম্মুর টাম্মিতে বাবু আছে?”
“মাম্মামের মতো ওনার পেটও ফুলে গেছে। সেই প্রথম দিন থেকেই।”
অরুণ ভ্রু কুঁচকালো। পাশ থেকে অরুণিতা জবাব দিলো, “তোর হবু শ্বাশুড়ি মোটা তাই টাম্মি ফুলে থাকে। বাবু টাবু কিচ্ছুটি নেই। টাম্মি ফুলে গেলেই বাবু হয় না রে বোকা!”
প্রহর ঘার ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকায়, “হয় না?”
অরুণ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “উঁহু”

“তাহলে কখন হয়?”
অরুণ জবাব খুঁজতে বেশ সময় নিলো। প্রহর অধৈর্য হয়ে বলল, “পাপা বলো না?”
“ভালো কাজ করলে আল্লাহ খুশি হয়ে বাবু দেয়।”
“মাম্মাম কি ভালো কাজ করেছিল?”
“জানি না।”
“কেন জানো না?”
“বাবা, নো মোর কোশ্শেন!”
“আর একটা, প্লিজ পাপা?”
“একটাই কিন্তু?”
প্রহর মাথা নাড়লো। মন খারাপীর সুরে বলল, “ভাইটুস কখন আসবে? ওলাফ মিসড ভাইটুস সোওওও মাচ।”
অরুণ ছেলের কপালের একপাশে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, “তোমার ভাইকে একটুখানি বড় হতে দাও। বাস্তবতা শিখতে দাও। তারপর তুমি আমি গিয়ে নিয়ে আসবো। হুঁ?”
প্রহর বুঝলো না কথার মানে। প্রশ্ন করবে অরুণ গাড়ি থামিয়ে দেয়। প্রহর উঁকি দিয়ে দেখে তার স্কুল এসে গেছে। অরুণ ছেলেকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামে। কোলে ছেলে আর কাঁধে ব্যাগ ফেলে স্কুলের ভেতর চলে যায়। ছেলেকে ক্লাসে প্রথম বেঞ্চে বসায়। প্রহর বসেই ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে বেঞ্চের অপর পাশের রাখে। অরুণ ভ্রু কুঁচকে বলে, “কার জন্য?”

“পিঙ্কি!”
“এতো পছন্দ পিঙ্কিকে?”
“আমি লেট হলে পিঙ্কিও আমার জন্য জায়গা রাখে পাপা।”
অরুণ ছেলের মুখটা আঁজলায় ভরে গালে মুখে চুমু দিয়ে বলল, “নিজের খেয়াল রেখো। আর কেউ কিছু বললে টিচারকে জানাবে। খারাপ লাগলে টিচারকে বলবে পাপাকে কল দিতে। পাপার নাম্বার মুখস্থ আছে না জাদুটার?”
“আছে তো!”
অরুণ ব্লেজারের ভেতর পকেট থেকে চকলেট বের করে চলে যায়। মনে পড়ে যায় যুগ খানেক আগের কথা। বড়জনকেও এভাবেই স্কুলে রেখে যেতো সে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে উঠে বসে। চাবি ঘোরাতেই অরুণিতা বলে ওঠে,

“স্যরি পাপা!”
অরুণ অবুঝ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, “ফর হোয়াট?”
অরুণিতা কিছুটা সময় নিলো। থেমে থেমে বলল, “আই নো আই ওয়াজ রং… আই ওয়াজ সো রূড…. ইট ওয়াজ মায় ফল্ট। স্যরি—আই ডোন্ট নো হাউ ট্যু এক্সপ্রেস ইট বাট আই রিয়েলি মিন ইট।”
“ইট টুক ইউ ফাইভ মান্থস টু রিয়ালাইজ ইউ ওয়ার রং অ্যান্ড শুড অ্যাপোলোজাইজ?
অরুণিমা পরনের ফ্রক খামচে ধরে। অনেকটা যুদ্ধ করে সে ‘স্যরি’ বলেছে। পাপা এক্সেপ্ট না করলে সে জানে না কি করবে!
অরুণ দক্ষ হাতে গাড়ি চালায়। সামনে দৃষ্টি স্থির রেখে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে,, “এতো ইগো তোমার? পাপাকে ছোট্ট একটা স্যরি বলতে পাঁচ মাস লেগে গেল!”
অরুণিতার গম্ভীর চোখ চিকচিক করে। সে জানালার বাইরে তাকায়। অরুণ ম্লান হেসে বলল, “স্যরি বলারও প্রয়োজন ছিলো না। পরদিন একবার ‘পাপা’ বলে ডাকতে শুধু। সব সেখানেই শেষ হয়ে যেতো। কিন্তু তুমি তো তুমিই!”

অরুণিতার গলা দিয়ে শব্দ বেরুতে চায় না। অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলো, “আ’ম স্যরি পাপা।‌ আর হবে না।”
অরুণ আর কিছু বলল না। গাড়ি এসে থামলো অরুণিতার হাই-স্কুলের সামনে। অরুণিতা বেরিয়ে আসে ব্যাগ কাঁধে। জানালায় টোকা দেয়। অরুণ গ্লাস নামায়। তবে অরুণিতার দিকে তাকালো না। অরুণিতার ঠোঁট ভেঙে আসতে চাইছে। ফর্সা গাল দুটো রক্তলাল। ছুঁয়ে দিলেই রক্ত বেরুবে।
“পাপা?”
“আমার লেট হচ্ছে!”
অরুণিতার মুখটা কালো হয়ে আসে। যেরকম প্রহরের হয়েছিল ফ্রন্ট সিটে বসতে না পেরে। অরুণ ওয়ালেট বের করে। হাজার টাকার দুটো নোট বের করে মেয়ের হাতে দেয়।
“তোমাকে মায়ের চোখে দেখতাম। কিন্তু আফসোস সেই মর্যাদা তুমি ধরে রাখতে পারো নি।”
গ্লাস উঠে যায়। গাড়ি চলে যায় শা শা গতি তুলে। অরুণিতা কচকচে নোট দুটো মুঠোয় ভরে। গেইটের কাছে বসে থাকা পা-হীন দুঃস্থ লোকের বাটিতে টাকা রেখে চলে যায় ভেতরে। অশ্রুসিক্ত আখিযুগ্ম হতে বড় বড় ফোটা গড়িয়ে পড়ে। মায়ের চোখে দেখতাম—পাস্ট টেন্স! তারমানে আর মায়ের চোখে দেখে না। এতো বড় অপরাধ করে ফেলেছে সে? ভালো তো! খুব ভালো! দেখতেও হবে না। নতুন মা আসবে। তাকেই দেখবে, দেখুক। মা ডাকবে, ডাকুক। আহ্লাদ করবে, করুক। অরুণিতা কিচ্ছু বলবে না। কোনো রিয়্যাক্ট করবে না।

ছাদের রেলিংয়ের উপর বসে দুই ব্যক্তি। অনেক্ষণ ধরে চলে নীরাবতা। এক সময় নীরাবতাকে পিছু ফেলে মানবী মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, “তারপর?”
“আনি….”
আনিকা থামায়। অরুণাভের না বলা কথাও বুঝে নেয়। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে, “বাপ দাদা যে পথে হেঁটেছে সে পথে হেঁটে তুই ফিরে আসবি আর আমি তোকে এক্সেপ্ট করে নিবো—এমনটা ভাবিসও না। আনিকা সরকার ঝুটা জিনিসে মুখ দেওয়া তো দূর ফিরেও তাকায় না।”
অরুণাভ শান্ত গলায় বলে, “আমাকে যা খুশি বল, বাপ দাদা টানবি না।”

“টানলাম না।”
“আনি একবার আমার দিক থেকে ভাব!”
“ভাবলাম…পরিস্থিতি যেমনই হোক তুই কিভাবে আরেকজনের নামে কবুল বললি ভোর? তোর কি আমার কথা একবারও মনে পড়ে নি?”
অরুণাভের জল টলমল চোখ আনিকার প্রশ্নের জবাব দেয়। আনিকা মলিন মুখে বলল, “সময় গেলে সাধন হবে না—ঠিকই বলে সবাই। সেই সময় যদি আঁকড়ে নিতাম তাহলে এমন পরিস্থিতি আসতোই না। যাইহোক নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা।”
অরুণাভ রেলিং থেকে নামে। আনিকার হাত দুটো মুঠোয় ভরে বলে, “আ’ল ফিক্সড এভরিথিং আনি। যাস্ট গিভ মি সাম টাইম! পত্রলেখার সাথে আজকেই কথা বলবো আমি। ডিভোর্সের বিষয়ে।”

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৩

“সেটা তোমাদের পার্সোনাল ইস্যু। আমাকে টানবে না এসবে। ওকে ডিভোর্স দিলেই আমি নাচতে নাচতে তোমার বউ সাজবো এই আশা করাও পাপ। সব সেই মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে ভোর।”
অরুণাভের হাতের মুঠো থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয় আনিকা। অরুণাভ গম্ভীর মুখে বলে, “রেগে আছিস তাই এমন বলছিস। আমিও রেগে এমনই ভাবতাম।”
আনিকা ব্যঙ্গাত্নক সুরে বলে, “আমি ‘তুই’ না। আমি আনিকা। যাইহোক আমার বোঝাপড়া হবে চাচ্চুর সাথে। আমার থেকে ওই বোবা মেয়েটাই বেশি যোগ্য হয়ে গেলো তাঁর কাছে!”

ভাব তরঙ্গ পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here