মনের আড়ালে পর্ব ২ || লেখনীতে Alisha Rahman Fiza

1334

মনের আড়ালে পর্ব ২
লেখনীতে Alisha Rahman Fiza

আমি এখন বসে আছি রুপসার মাথার কাছে মেয়েটার অসম্ভব জ্বর একটু পর পর তার মাথায় জল পট্টি দিচ্ছি সবচেয়ে আজব ব্যাপার হলো রুপসা এই জ্বরের ঘোরেও আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করে একটু পর পর তাকাচ্ছে।হয়তো ও আমার উপর নজর রাখছে ওর অগোচরে যদি আমি পালিয়ে যাই বাচ্চা মেয়ে এতসব ও বুঝেনা রুপসার মতো আমারও যদি একটা মেয়ে থাকতো ভাবলেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের হয়।জল পট্টি দিতে দিতে খেয়াল হলো ওর খাবারের কথা তাই আমি বিছানা থেকে উঠে যেই না রুম থেকে বের হতে যাবো তখনই মিস্টার রক্তিম হাতে খাবারের প্লেট নিয়ে হাজির হয়।আমাকে একবার ভালোমতো দেখে সে প্লেট গুলো টি টেবিলে রেখে বুকে হাত গুজে বললেন,

~দেখেন অধরা,আমার মেয়ের জ্বর যে পর্যন্ত ঠিক না হচ্ছে সে পর্যন্ত আপনি কোথাও যেতে পারবেন না।
তার এরূপ কথা শুনে রাগে আমার শরীর কাঁপতে শুরু করলো এই ব্যক্তির উপর রাগটা ২ঘন্টা আগের ঘটনার জন্য। এতটা ম্যান্যারলেস আর অসভ্য মানুষ আমার জীবনে আমি দেখিনি
২ঘন্টা আগে সে আমাকে দেখে রাস্তা পার হয়ে আমার কাছে এসে আমার হাত খপ করে দিলেন তার এহেন ব্যবহারের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।মিস্টার রক্তিম আমাকে টেনে নিয়ে আসলেন তার গাড়ির কাছে আমি তার থেকে হাত ছাড়িয়ে বললাম,

~কীসব আচরণ করছেন মাঝরাস্তায় মাথা কী খারাপ আপনার?
মিস্টার রক্তিমের এতে কোনো ভাবান্তর হলো না সে আবার আমার হাত ধরে জোর করে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে গেইট লক করে দিলো।আমি ভিতর থেকে অনেক চিৎকার চেঁচামেচি করলাম কোনো লাভ হলো না সে গাড়িতে বসে ড্রাইভ করতে শুরু করলো। আমি তার দিকে ভালোমতো তাকালাম মিস্টার রক্তিমের অবস্থা খুব খারাপ চুলগুলো একদম অগোছালো শার্টের অবস্থাও বেশি ভালো না।আমি বললাম,
~কিছু কী হয়েছে?রুপসা ঠিক আছে?

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

রুপসার কথা বলতেই সে আরো জোরে গাড়ি ড্রাইভ করতে লাগলেন আমি ভয় পেয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে ফেললাম।হঠাৎ মনে হলো গাড়িটা থেমে গেছে আমি চোখ পিটপিট করে খুলে দেখলাম।মিস্টার রক্তিম গাড়ির সীটে হেলান দিয়ে আছেন তার চোখ বন্ধ। আমি তার অবস্থা দেখে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না কিছুক্ষন পর মিস্টার রক্তিম বললেন,
~রুপসার শরীর ভালো না প্রচন্ড জ্বর কিন্তু ও দরজা বন্ধ করে বসে আছে কাউকে ওর কাছে আসতে দিতে চায় না।রুপসা আপনাকে এখনই তার কাছে চায় আমার কাছে আর কোনো অপশন নেই।
বলেই আবার গাড়ি ড্রাইভ করতে শুরু করলেন আমি বোকার মতো বসে রইলাম আর সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

বর্তমান
আমি তার কথার প্রেক্ষিতে কোনো কথা বললাম না টি টেবিল থেকে খাবারটা নিয়ে আস্তে করে রুপসার পাশে বসলাম।তারপর ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে ডাকলাম ~রুপসা সোনা বাচ্চা।উঠো খেতে হবে যে নাহলে কীভাবে ম্যামের সাথে খেলবে?
রুপসা চোখ খুলে বললো,
~খেতে মন চায় না তো বমি আসে।
আমি ওর কপালে চুমো দিয়ে বললাম,
~সোনা বাচ্চা না খেলে সুস্থ হবে কী করে?আর আমার সাথে খেলবে কী করে?
রুপসা চট করে বললো,
~একটু খাবো তাহলে।
আমি হেসে বললাম,
~ঠিক আছে।

রক্তিম দাড়িয়ে দাড়িয়ে অধরা আর রুপসাকে দেখছে একদম মা-মেয়ে লাগছে দুজনকে।আজ যদি রাহি বেঁচে থাকতো তাহলে হয়তো রুপসাকে এভাবেই খাইয়ে দিতো।রাহি তো রুপসা বলতে পাগল ছিল একমূর্হুত রুপসাকে ছাড়া তার চলতো না তাহলে এভাবে রুপসাকে ছেড়ে কেন চলে গেলো?এসব ভাবলে রক্তিমের বুকের বাম পাশটা চিনচিন করে উঠে। সেই ছোট বেলায় সে তার মা-বাবাকে হারালো আর তার এই রাজকুমারিও তার মতো মা হারা হলো।এসব ভাবছিল রক্তিম তখনই রুপসা তাকে উদ্দেশ্য করে বললো,

~পাপা,তুমি খেয়েছো?
মেয়ের কথায় রক্তিম অপরাধীর মতো চোখ করে বললো,
~সরি পরী খাইনি এখন পর্যন্ত।
রুপসা চোখ গরম করে বললো,
~যাও এখনি তুমি খাবার খেয়ে আসো নাহলে তোমার সাথে আড়ি।
এতটুকু বলে রুপসা মুখ ফুলিয়ে বসে রইলো রক্তিম হালকা মেয়ের পাশে গিয়ে বসে বললো,
~পাপা তার পরীর কথা অমান্য করতে পারে এখনই আমি খাবার খেয়ে নিচ্ছি।
রক্তিমের কথা শুনে রুপসা তাকে জড়িয়ে ধরলো তারপর রক্তিমের গালে চুমো খেয়ে বললো,

~এইতো আমার good papa.
বাবা-মেয়ের এতো সুন্দর মুর্হুত দেখতে দেখতে হঠাৎ বাসার কথা মনে পরে গেলো আমি সাথে সাথে মোবাইল বের করে দেখি ৭.৩০ তা দেখে আমার মাথায় হাত মা অনেক টেনশন করছে নিশ্চিত আমাকে এখনই বাসার জন্য রওনা দিতে হবে কিন্তু তার আগে রুপসাকে বোঝাতে হবে।আমি রুপসার দিকে তাকিয়ে বললাম,
~রুপসা।

রুপসা আমার ডাকে মিস্টার রক্তিমকে ছেড়ে দিয়ে আমার দিকে ঘুরলো আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম,
~রুপসা তোমার পাপা যেমন তোমার জন্য না খেয়ে বসে আছে তেমনি আমার পাপাও আমার জন্য না খেয়ে বসে থাকবে।তোমার কী কষ্ট লাগবেনা আমার পাপার জন্য
রুপসা আমার কথা শুনে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললো,

~ম্যাম আমি চাই না আমার জন্য তোমার পাপা কষ্ট করুক।তুমি কাল আসবে তো
আমি কী জবাব দিবো তা আমি বুঝতে পারলাম না কিন্তু আমার আগেই মিস্টার রক্তিম বলে উঠলেন,
~অবশ্যই অধরা আপনি কালকে আমাদের বাসায় আসবেন আর কালকে তো ছুটির দিন।
I hope you shall have no work for tomorrow.
মিস্টার রক্তিমের কথা শুনে মন চাইছে তার মাথা ফাটিয়ে দেই কিন্তু এখন বাসায় যেতে হবে তাই আমি রুপসাকে বললাম,
~হ্যাঁ সোনা বাচ্চা কাল আমি আসবো।
আমি রুপসার থেকে বিদায় নিয়ে তাদের বাসা থেকে বের হয়ে আসলাম। মা অনেক টেনশন করছে নিশ্চয় কিন্তু মা একবারও ফোন দিলো না কেন?

আমি বাসায় পৌছে কলিংবেল টিপ দিতেই মা দরজা খুলে দিলো।মা আমাকে দেখে বললো,
~তুই কোথায় ছিলি?
আমি জুতা খুলতে খুলতে বললাম,
~একটা জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলাম মা।
আমার কথা শেষ হতেই একজন নারী কন্ঠ গম্ভীরভাবে বলে উঠলো,
~কাজ ছিল নাকি কোন নাগর জুটিয়েছ যে বাসায় আসতে এতো দেরি হলো?
এই কন্ঠটা শুনে আমি হতবাক হয়ে সামনে দিকে তাকিয়ে দেখি আহনাফের মা সোফায় বসে আছে তার পাশে আহনাফের খালাতো বোন রামিয়া বসে আছে।

তাদের দেখে আমি অবাক হলাম আহনাফের মৃত্যর পর তারা এ বাসায় আসাতো দূর আমাকে একটা ফোন পর্যন্ত করেনি।আমি নিজেকে সামলে তাদের কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
~কেমন আছেন?মা
আহনাফের মা মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
~রামিয়া,এই মেয়ে যেনো আমাকে মা না ডাকে।
রামিয়া মুখ কাচুমাচু করে আমাকে বললো,
~ভাবি তুমি খালামণিকে
রামিয়াকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আহনাফের মা বলে উঠলো,
~রামিয়া সে তোর ভাবি না আর এই কাগজে ওকে সাইন করতে বলে দে।
হাতের কাগজটা রামিয়ার হাতে দিয়ে একথাটি বললেন।রামিয়া আমার হাতে কাগজ দিয়ে বললো,
~এই কাগজটায় সাইন করে দেও।

আমি বললাম,
~কীসের কাগজ এটি?
রামিয়া আমতা আমতা করে বললো,
~আহনাফ ভাই তার অর্ধেক জমানো টাকা তোমার নামে ব্যাংকে রেখেছে খালাম্মা সেটি এখন বের করতে চায় তাই এই কাগজে তোমার সাইন নিতে এসেছি আমরা।
রামিয়ার কথা শুনে অবাক হলাম না সে যে নিজের স্বার্থের জন্য এসেছে তা আমার প্রথমে বোঝা উচিত ছিল।আমি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললাম,
~আহনাফের সম্পত্তির জন্য এখানে এসেছো?
আমার কথা শুনে আহনাফের মা চেঁচিয়ে বললেন,

~এই মেয়ে মুখ সামলিয়ে কথা বলবে।আমার ছেলের টাকা আমি নিবো তোমার কী?
আমি কিছু না বলে ব্যাগ থেকে কলম বের করে কাগজটায় সাইন করে দিলাম আর সেটা আহনাফের মায়ের হাতে দিয়ে বললাম,
~আপনাকে যাতে আমি কোনোদিন এ বাসায় না দেখি।
বলেই নিজের ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দিলাম।ব্যাগটা ছুরে ফেলে দিয়ে ফ্লোরে বসে পরলাম হাঁটু গেড়ে কাদঁতে থাকলাম আমার সাথেই কেন এমন হলো?আহনাফ আপনি আমাকে ছেড়ে কেন চলে গেলেন?আমি কী এতো খারাপ যে আমাকে একা করে কেন চলে গেলেন?তখনই মা আর অরুনার গলা শোনা গেলো তারা দরজা ধাক্কাচ্ছে আর বলছে

~আপু দরজা খোলো ওই মহিলার কথা শুনে নিজেকে হার্ট করো না।
মা বললো,
~কী করছিস ভিতরে অধরা?দরজা খোল।
আমি চোখ মুছে তাদের বললাম,
~মা অরুনা তোমরা যাও আমি ঠিক আছি।একটু একা থাকতে দেও আর হ্যাঁ বাবাকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই।
অধরার মা আর অরুনা আর অধরাকে ডাকলো না। থাক না মানুষটি একা কিছু কষ্ট একাই সামলাতে হয় অন্যকে জড়িয়ে নিলে কষ্টটা আরো দ্বিগুন হয়ে যায়।

সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গে মোবাইলের আওয়াজে আমি চোখ খুলে চারপাশ খুব ভালো করে দেখে বুঝতে পারি কাল রাতে কান্না করতে করতে আমি ঘুমিয়ে পরেছিলার ফ্লোরে।আমি আস্তে আস্তে ফ্লোর থেকে উঠে ব্যাগ হাতড়ে মোবাইল বের করে দেখি রুপসার ফোন।আমি রিসিভ করতেই রুপসা অভিমান কন্ঠে বলে উঠলো,
~ম্যাম তুমি আসো না কেন?সকাল ১০টা বাজে
রুপসার কথায় মনে হলো আজ তো ওর বাসায় যাওয়ার কথা ছিল কালকের ঘটনার জন্য একথা তো ভুলেই গিয়েছিলাম।আমি রুপসাকে বললাম,

~রুপসা আমি একটু পরই আসছি তোমার কাছে।
রুপসা বললো,
~ঠিক আছে।পাপাকে তোমার জন্য গাড়ি পাঠতে বলবো?
আমি বললাম,
~না আমি চলে আসবো।

আমি ফোন রেখে কার্বাড থেকে কাপড় নিয়ে সোজা চলে গেলাম ওয়াশরুমে শাওয়ার নিয়ে একবারে বের হলাম।নিজেকে পরিপাটি করে ব্যাগটা নিয়ে দরজা খুলে বের হলাম রুম থেকে। বাহিরে বের হয়ে দেখি বাবা সোফায় বসে আছে পেপার পরছে মা রান্নাঘরে তাই সেখানে চলে গেলাম মা আমাকে দেখে বললো,
~অধরা,তুই কী কোথাও বের হচ্ছিস?
আমি বললাম,
~একটু কাজ আছে হয়তো বাসায় আসতে সন্ধ্যা হবে।
অরুনা কোথায়?
মা বললো,
~ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসেছে।তুই নাস্তা কর টেবিলে রাখা আছে
আমি বললাম,
~বক্সে ভরে দেও যেতে খেয়ে নিবো।

মনের আড়ালে পর্ব ১

বলেই অরুনার কাছে চলে গেলাম গিয়ে দেখি মেয়েটা আসলেই মনোযোগ দিয়ে পড়ছে।তাই আমি আর ওকে ডিস্টার্ব করলাম না বের হয়ে আসলাম টেবিল থেকে বক্স নিয়ে হলরুমে এসে পরলাম বাবা আমাকে দেখে বললো,
~তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসিস।
আমি মুচকি হেসে বের হয়ে পরলাম বাড়ির দরজার সামনে এসে দেখলাম মিস্টার রক্তিম গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে আমাকে দেখে সে বিরক্তি নিয়ে বললেন,
~রুপসা ওয়েট করছে প্লিজ তাড়াতাড়ি আসেন।

তার কথা শুনে রাগে আমার মাথা নষ্ট ইশশ কী সিরি কথা বলার যেমন আমি তাকে আসতে বলেছি এই ব্যাটা তুই কেন এসেছিস?আমি বলেছি আসতে এভাবেই আমার মুডের ৪২০ বেজে আছে উপর দিয়ে তোর ত্যাড়া কথা। এসব বলতে গিয়েও বললাম না আমি শুধু বললাম,
~আসার কোনো প্রয়োজন ছিলনা আমি একা পৌছাতে পারতাম।
মিস্টার রক্তিম আমার কথা শুনে বললেন,
~অধরা,এতকথার টাইম নেই আপনার জন্য এভাবেই আমার মিটিং লেট করে শুরু করতে হবে তাই মেজাজ এভাবেই খারাপ। তাই গাড়িতে উঠে বসেন মেয়ের জেদের কাছে হার মেনে এসব করতে হচ্ছে।
আমি আর কিছু না বলে ধুপধাপ পা ফেলে গাড়িতে উঠে বসলাম সেও গাড়িতে উঠে বসলো।

মনের আড়ালে পর্ব ৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here