মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৮
শ্যামলী রহমান
সকাল হতে বিয়ের সকালের নিয়ম শুরু হয়েছে।
প্রথমে আংটি খেলা।বাহিরে দুটো ছোট খাল খোড়া হয়েছে।পানি দিয়ে ভরলো খাল দুটো। মিলন খুঁড়েছে আসিফ আর পাভেল দেখছে।পাভেল গ্রামে বড় হয়েছে তাই এসব তার কাছে পরিচিত কিন্তু আসিফ বাস্তবে দেখেনি এই খেলা।শার্লিন আর মিথিকে সুতি শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে অনিমা আর পাশের বাড়ির এক ভাবি মিলিয়ে। সানিয়া মিথিকে এমনি পছন্দ করে না তাই কোনে কাজে হাত দিচ্ছে না।শমসের দেওয়ান প্রহর আর পিয়াস কে ডাকলো বাহিরে।ওরা দুজন আসতেই প্রহর পিয়াসের দিকে তাকালো।নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে হাঁসছে সবার সামনে।তখনই রিতি হাজির হলো।পিয়াসের কাছে গিয়ে বলল,
“ভাইয়া আমি আগেও তোমার দলে এখনো তোমার দলেই হবো।মিথির কেন যে প্র….
রিতি কথাটা শেষ করতে পারলো না। প্রহর তার সামনে তা বেমালুম ভুলে গেছিলো।প্রহর রিতির দিকে চেয়ে আছে ও বুঝতে পেরেছে কি বলতে চাচ্ছিলো।রিতি কে দেখে হাঁসলো।রিতি আড কিছু বললো না।পিয়াসের একপাশে দাঁড়ালো।
“কই নতুন বউদের নিয়ে আসো।
অনিমা আর সানিয়া শার্লিন মিথিকে নিয়ে আসছে।প্রহর মিথির দিকে তাকিয়ে আছে।গোলাপি রাঙা শাড়ি সাথে কাজল কালো আঁখি।অসম্ভব সুন্দর লাগছে যেন চোখ ফেরানো দায়।প্রহরের দৃষ্টি অনুসরণ করে পিয়াস সেদিকে তাকালো।মিথিকে নজরে আসতেই সে চোখ ফিরিয়ে নিলো।চোখের সামনে দেখলে কষ্ট বাড়ে বেশি। ওরা কাছাকাছি আসতেই প্রহর কে এক পলকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অনিমা হেঁসে বলল,
“দুলামিয়া শুধু দেখলে হবে?এতো সুন্দর সাজিয়েছি সালিদের কি তোহফা পাওয়া ভাগ্য নেই?.
প্রহর লজ্জা পেলো।আশে পাশে কত মানুষ। তবুও বলল,
“অবশ্যই আছে।
শার্লিন পিয়াসের ওপাশে মুখ ঘুরিয়ে থাকা দেখলো।তার এবার মনে হলো কাউকে সুখ দিতে গিয়ে কি অন্য একজন কে বেশি দুঃখ দিয়ে ফেললাম?
“এই খেলা শুরু করো।
দুপাশে পাশাপাশি দুজন করে চার জনকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।ছোট পানি ভর্তি খালে দুটায় দুটো আংটি আগে থেকে কাঁদার মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।এখন যে পাবে,পানির মধ্যেই কাড়াকাড়ি করে যার হাতে শেষ পর্যন্ত থাকবে সেই জয়ী।
খেলা শুরু হলো। নিয়ম রক্ষার্থে পিয়াস ও পানি হাত দিলো। চারজনে খুঁজতে আছে। প্রথমে মিথি আংটি পেয়েছে প্রহর পানির নিচে হাত চেপে আংটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পাশ থেকে কেউ মিথি,প্রহর,কেউবা শার্লিন পিয়াস বলে চিল্লাচ্ছে।
পিয়াস আংটি পেলেও সেটা শার্লিনের হাতে দেয় সবার অগোচরে। তার ইচ্ছে নেই এখানে থাকার এবং উচ্ছাস দেখার। ওদের দু-জনের মধ্যে শার্লিন জয়ী। পিয়াস ওঠে গেলো। প্রহর আর মিথি কাড়াকাড়ি করছে। এর মধ্যে অনিমা ওর কানে কানে কি যেন বললো। মিথি হুট করে হাত ছেড়ে দেওয়ার ভান করে মন খারাপ করলো। প্রহর উচ্ছাস মুখ বিষন্ন দেখে চিন্তিত হয়ে হাত আলগা করলো। মিথি এই সুযোগ নিয়ে আংটি তুলে নিলো।
“ইয়েেে।মিথি জিতে গেছে ভাইয়া হেরেছে।
অনিমার কথায় আর মিথির হাঁসিতে প্রহর পুরোই টাস্কি খেয়ে গেছে। মিথির দিকে তাকিয়ে মনে মনে
বলল,
“ভালো ট্রিংস শিখেছো দেখছি। ঠোঁটে হাঁসি লেপ্টে বলা কথাটা মিথি শুনেও না শোনার ভান করে উঠে গেলো।এর মধ্যে রুহেলের আগমন ঘটলো।সে অনিমার পাশে পাশে থাকছে।মিথি ওকে দেখে বলল,
“যাও চাচি কে বলবো তোমার বিয়ে দিতে।অনিমা রাজি হবে যদি তুমি আমারে কচ্ছপ বলা ছাড়ো।
রুহেল বলল,
“এক পায়ে খাড়া।মুই রাজি।
ওর কথা শুনে প্রহর সহ মিথি অনিমা হেঁসে উঠলো।
প্রহর এর মধ্যে শার্লিনের কাছে গেলো। প্রহর কে দেখে শার্লিন হাঁসলো।
“আমার জন্য এই বলিদান আমার আজন্ম মনে থাকবে,আমার সুখের ঠিকানার বাহক হলি তুই।তোর জন্য আমার এখন কষ্ট হচ্ছে আমাকে সুখে থাকতে দিয়ে নিজে অসুখী হবি না তো?
শার্লিন হাঁসলো। সব ঝেরে ফেলে বলল,
“মানুষের জীবনে কত মানুষ তো আসে।সবাই কি সবাই কে পায়?যারা পায় না তাদেরও জীবনে মুভ অন করতে হয়। সময় গেলে পিয়াস ভাই ও বদলাবে এতটুকু বিশ্বাস আমার আছে।
প্রহর সন্তুষ্ট হলো।শার্লিনের মাথায় হাত বুলিয়ে পুকুরের দিকে গেলো।বিয়ের দিন সকালে নিয়মের মধ্যে এটাও আরেকটা নিয়ম পুকুর থেকে মাছ ধরে বউয়ের শাড়ির আঁচলে দিবে এবং সেই নাছ বউ বেছে ধুয়ে রান্না করবে।
সমস্ত নিয়মকানুন শেষ হয়েছে।সকলে দুপুরে খেয়ে নিজ নিজ ঘরে গিয়েছে।বাহিরে প্রচন্ড রোদ গরম এজন্য বাহিরে কেউ যাচ্ছে না। মিথি ওই বাড়ি গেছে তাই প্রহর আসিফ আর পাভেলের ঘরের দিকে যেতে নিলো। তখনই অরুণা সামনে পড়লো। ওকে দেখে মুখ বাঁকা করে কিছু কথা শোনালো।প্রহর বরাবরের ন্যায় সহ্য করলো।একটা কথা না বলে পা বাড়ালো।পাভেল প্রহর কে দেখে বলল,
“আমাদের ফেরা উচিত।তুমি থাক আমরা বারং আজ রাতে নয়তো কাল চলে যাই।
“আমিও যাবো।
“তুই গেলে মিথি?
“ওকে নিয়ে যাবো।
“ওকে নিয়ে গেলে সংসার সাজাতে হবে, বাসা খুঁজতে হবে। এসবে অনেক খরচ আছে।
প্রহর আসিফের পায়ের উপর বসলো। ওর পা ছড়িয়ে রেখে শুয়ে ছিলো।
“আহহ।সালা পায়ের উপর বসে পা কি ভেঙে দিবি?তোর বিয়ে হলেও আমার এখনো হয়নি।
“তুই চিরকুমার থাক।পারলে লালনদের মতো ঘর বাড়ি ছেড়ে নির্বাসিত হয়ে যা।
পাভেল ওদের কাহিনি দেখছে।প্রহর ওর দৃষ্টি লক্ষ্য করে বলল,
“ব্যাংকের চাকরিটা হয়ে গেছে।কিছুক্ষণ আগে মেসেজ এসেছে এবং ফোন করে কনফার্ম করেছে।
পাভেল আসিফ খুশি হলো।
“আলহামদুলিল্লাহ।ভালো কিছু একটা হয়েছে। আগে বললি না কেন? এখন থেকে দেখিস সব ভালো হবে।বাড়িতে বলেছিস?
প্রহর মাথা নাড়ালো যার অর্থ জানায়নি।
“জানাবো পরে।
“মিথি কে আগে নিয়ে যাবি?বাসা খুঁজতে হবে।
“সেসব ব্যবস্থা করা হবে।প্রীতি আপু আছে না?সে খুঁজে দিবে বলেছে। আগে মিথির সাথে কথা বলতে হবে সে শহরে থাকতে চায় কিনা?আমার সাথে যাবে কিনা।তার মতামত ও আগে।
প্রহর ঘরে বসে আছে মিথির আসার নাম ও নেই।
বাড়িতে সকলে জবের কথা পাভেল বলেছে। আসিফ তো সাহার দেওয়ানের কানের কাছে গিয়ে বলেছে ইচ্ছে করে।অরুণা শুনে গম্ভীর হয়ে ছিলো।
প্রহর মিথির অপেক্ষায় অস্থির হয়ে আছে। ও বাড়ি যেতে চেয়েও যাচ্ছে না।কিন্তু না এবার যেতে হবে। সে ঘর থেকে বেরোলো। সুচরিতা বেগম সামনে পড়লো।প্রহর কে দেখে ফিসফিস করে বলল,
“শোন না বাবা আজকেও একটু প্রীতির সাথে কথা বলিয়ে দিস তো।পিয়াসের বিয়ের সময় প্রীতির বাম নিতেই তোর মামা আর নানা ক্ষেপে উঠলো। পিয়াস মন মন থাকলেও ওদের জন্য কিছু বলেনি।ওদের কি দোষ বলতো?দোষ একটাই নাপিতের বংশধর।তার দাদা আগে নাপিতের কাজ করতো।
এটাই তাদের অসম্মান করে।ছেলেটা নিজের পরিচয় গড়েছে চাকরি পেয়েছে এটা বলার সুযোগ দিলো না।
“ঠিক আছে রাতে কথা বলিয়ে দিবো।
সুচরিতা বেগম আশে পাশে তাকিয়ে চলে গেলো।
প্রহর ও নেমে আসলো। মিথিদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো।আত্নীয় স্বজন কিছু রয়ে গেছে। তাদের আনাগোনা বাহির থেকে বোঝা যাচ্ছে।
প্রহর ভেবেচিন্তে ভেতরে পেলো। প্রথমে দেখা মিললো মানিক সাহেবের সঙ্গে। প্রহর মাথা উঁচু করে তাকালো। উনার মুখের ভাবভঙ্গি বুঝা মুসকিল।ওকে দেখে ঘরে চলে গেলো।একটু পর মিথি বেরিয়ে আসলো।প্রহরের মুখোমুখি হতেই রাগি রাগি চোখ দুটো দেখতে পেলো। শীতল চোখে রাগ কখনো দেখেনি।
“কিছু বলছিলেন?
“আপনার ঘর আছে আপনার কি তা মনে আছে?
মিথি এবার বুঝলো রাগি চোখের কারণ।
“অনিমা যেতে দিচ্ছিলো না।বলছিলো আপনার দরকার হলে ডাকবেন।
অনিমা তখনই হাজির হলো।প্রহর ওকে বলল,
“সালিকা বড়ই দুষ্টু প্রকৃতির। ভাবি বানিয়ে প্রতিশোধ নিতে হবে।
“বউ কে ছাড়া থাকতে পারেন কিনা পরীক্ষা করছিলাম। কিন্তু আপনি তো পারছেন না। যান নিয়ে যান।
“অপেক্ষা তো কয়েক বছর থেকে করেছি।এবার যখন অপেক্ষা ফুরিয়েছে চোখের আড়াল হতে দিবো না।
অনিমা দাঁত বাহির করে হাঁসছে।মিথি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। পাশে আরো কয়েকজন কাজিন ও আছে। প্রহর মিথিকে নিয়ে বাহির হয়ে গেলো।
ধরনীতে রাত্রি নেমেছে। রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে। একটু আগে মোহনিয়া বেগম মিথির জন্য বানানো পায়েস দিয়ে গেছে সেগুলো খাচ্ছিলো।প্রহর বাহির থেকে আসলে মিথি পায়েসের বাটি তার সামনে দেয়। প্রহর নেয় না।
“খাইয়ে দাও।আদর মাখা হাতে মিষ্টি পায়েস, তোমার হাতে আয়েসে খাই।
মিথি পায়েস তুলে খাইয়ে দিলো। আর ভাবলো এই গম্ভীর মানুষটাও কত কথা জানে,বিষাদের আড়ালে কি স্নিগ্ধ হাঁসে।
হুট করে কারেন্ট চলে গেলো।মিথি ভয়ে প্রহরের নিকটে গেলো আঁকড়ে ধরলো তার শার্ট।প্রহর ভরসা দিলো একহাতে পাশের টেবিলের ড্রয়ার থেকে মোমবাতি বাহির করলো।
“মোমবাতিটা ধরো তো।
মিথি ধরলো প্রহর ম্যাচের কাঁটি জ্বালিয়ে মোমবাতি জ্বলালো।
মিথির মুখখানা সেই সোনালী আলোতে একটু বেশিই মোহনীয় লাগলো।মিথিও মোমবাতির আগুনের শিখা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরের দিকে তাকালো।
“কি দেখছেন?
প্রহর এগিয়ে আসলো।মিথির হাতে থাকা মোমবাতিটা সে নিজেও ছুঁলো।দৃষ্টি সরালো না বরং আরো গাঢ় কন্ঠে বলল,
“আমার নববধু কে।এই শুভ্র শাড়িতে মোমবাতির আলোতে তাকে যেন লাগছে নবরুপা।যার আঁখিতে হয়েছি আমি দিশেহারা।
মিথি লজ্জায় মাথা নিচু করে হাঁসলো।তখনই আবার হুট করে কারেন্ট আসলো।প্রহর ফু দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিলো।
“বাকি পায়েস টুকু খেয়ে নিন।
প্রহর শুনলো।পায়সে খাওয়া শেষে প্রহর মিথি কে নিয়ে ছাঁদে গেলো।অন্ধকার হলেও ছাঁদের আনাচেকানাচে কি আছে বুঝা যাচ্ছে।তীব্র বাতাস তাদের ছুঁয়ে দিচ্ছে।নড়ছে বাড়ির পাশে বড় ছাতিম গাছটার পাতা।মিথি আকাশের দিকে তাকালো।বলল,
“আকাশে তো চাঁদ তারা কিছু নেই।কি দেখতে এলাম?
প্রহর মিথিকে ইশারায় বেঞ্চে বসতে বললো।তার পর সে ও মিথির পাশে বসলো।খুব কাছাকাছি বসাতে হাওয়ায় ঝাপটায় চুলগুলো প্রহরের চোখে মুখে পড়লো।মিথি সরিয়ে দিলো।প্রহর বোমোহিত হয়ে হুট করে বলে উঠলো,
“আকাশে আজ চাঁদ উঠেনি,দেখা মিলেনি শুকতারার,
আমার আকাশ শুকতারার সঙ্গ পেয়েছে সে আর চায় না আকাশের চাঁদ শুকতারা দেখতে।
একটু থেমে আবারো বলল,
মন পিঞ্জিরা পর্ব ২৬+২৭
“চাঁদ যদিও উপমা মাত্র।তোমার তুলনা করবো না চাঁদের সঙ্গে।তুমি জোছনা।আমার অন্ধকার জীবনে আলোর রেখা।তাই-তো আমাবস্যার শেষে তোমার সাথে হলো দেখা।”
মিথি প্রহরের বুকে মাথা রাখলো।হৃদয়ের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছে।তীব্র অনুভূতির ন্যায় স্পন্দন বাড়ছে যেন।প্রহর হাত রাখলো মিথির কাঁধে। মাথার উপর হঠাৎ জোনাক পোকা উড়ে এলো।মিথি উঠে দাঁড়ালো।জোনাকি টাকে ধরতে হাত বাড়াতেই দূরে উড়ে গেলো।ধরতে না পারাতে ঠোঁট উল্টালো।প্রহর নিঃশব্দে হাৃসলো।বেঞ্চ থেকে উঠে ঠিক মিথির পিঠ বরাবর দাঁড়ালো।বলল,
“শোনো শুকতারা,জোনাকি তোমায় দিবে খনিকের জন্য কিঞ্চিৎ আলো,
জেনে রেখো,জীবন যতদিন থাকবে আমিই তোমায় বাসবো ভালো।”
