Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ২৪

মহামায়া পর্ব ২৪

মহামায়া পর্ব ২৪
তুশকন্যা

রাত তখন বেশ গভীর। এহসান মঞ্জিলের সদর দরজায় বাইকের গম্ভীর শব্দ থেমে যেতেই ড্রয়িংরুমে অপেক্ষারত সবার দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ হলো। ভিভিয়ান ফিরেছে। তার চেহারায় স্পষ্টত রুক্ষতা আর চোখে ক্লান্তি মেশানো অস্থিরতা। পার্কে মাওরার সাথে কাটানো সময়টা যে মোটেও সুখকর ছিল না, তার স্পষ্ট ছাপ তার বিধ্বস্ত মুখাবয়বে ফুটে উঠেছে।
​ড্রয়িংরুমে তখন এক গুমোট পরিবেশ। ভাহিদ এহসান সোফায় বসে সংবাদপত্রে চোখ রাখলেও তার সমস্ত মনোযোগ ছিল দরজার দিকে। কাশফিয়া দুশ্চিন্তায় পায়চারি করছে,ফোন করার পরও ছেলে ফোন ধরেনি।
অনিমা সোফার এক কোণে বসে আনায়াকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তারেক এহসান এখনো ফেরেননি, তার ফিরতে আজ মধ্যরাত হবে।
​ভিভিয়ান ঘরে পা রাখতেই ভাহিদ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বলল,

“এই অসময়ে বাড়ি ফেরার মানে কী? তোমাকে কতবার বারণ করেছি এভাবে না বলে রাতবিরাত বাইরে না থাকতে।একটা কথাও শোনো না, এতোটা অবোধ হয়েছো কবে?”
​ভিভিয়ান কোনো উত্তর দিল না, কেবল একবার শীতল দৃষ্টি বাবার দিকে নিক্ষেপ করে নিজের ঘরের দিকে এগোতে চাইল। ঠিক তখনই কাশফিয়া এগিয়ে এসে বলল,
“আব্বা, কোথায় ছিলে তুমি? সেই বিকেল থেকে তোর কোনো খবর নেই। কাউকে কিছু বলেও যাওনি! আমরা সবাই কতটা দুশ্চিন্তা করেছি জানো? তোমার বাবা এতো করে বলে, এখানকার অবস্থা ভালো না, অজানা শত্রুদের শেষ নেই। আর তুমি…আচ্ছা এসব না হয় বাদই দাও, আনায়াকে তো দেখো। ও তোমার জন্য কখন থেকে পাগলামি করে যাচ্ছে।”

​বড়-মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই অনিমার কোল থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল ছোট্ট আনায়া। সারা সন্ধ্যা সে না খেয়ে কান্নাকাটি করেছে, কারো কথা শোনেনি। কাশফিয়ার আঁচলের তলায় গিয়ে, ধরে আধো-আধো গলায় সে জেদ ধরে আওড়াল,
“বিভান বাইয়া, আমি তোমার হাতে খাব। চলো, আমি আর দুষ্টুমি করব না…আমি তোমার সাথে ঘুমাব।”
​এমনিতেই মাওরার সাথে ঘটে যাওয়া তিক্ত সময় আর বাবার কড়া শাসন—সব মিলিয়ে ভিভিয়ানের মেজাজ হুট করেই চটে গেল। আনায়ার এই অবুঝ আবদার তার অসহ্য বোধ হলো। সে একবার আনায়াকে লক্ষ করে, পরক্ষণেই বাড়ির বাকি সবার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত রুক্ষ আর কর্কশ স্বরে বলে উঠল,
​”আশ্চর্য! এসব কেমন কথাবার্তা? আমি কি কোনো বাচ্চা নাকি যে সবসময় বাচ্চাদের সাথে পড়ে থাকতে হবে?”
​ভিভিয়ানের এমন আকস্মিক আর কঠোর ব্যবহারে ড্রয়িংরুমের সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। সাধারণত সে আনায়ার প্রতি কিছুটা কোমল থাকলেও আজকের এই উগ্র রূপ কারোরই চেনা নয়। ভাহিদ এহসান ক্ষিপ্ত হয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আঙুল উঁচিয়ে ধমকের সুরে বললেন,

“ভিভান! কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেই শিক্ষা কি ভুলে গেছো? ও তোর ছোট বোন,বাচ্চা একটা মেয়ে। সারাদিন তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে আর এতেও…
​বাবার কথা শেষ করতে দিল না ভিভিয়ান। তার সহ্যশক্তি তখন তলানিতে। সে নিজের গাম্ভীর্য আর জেদ বজায় রেখে তেজদীপ্ত কণ্ঠে বলল,
“আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি বাবা। কোথায় যাব আর কখন ফিরব সেটা আমার ব্যাপার। আর আমাকে সবসময় এভাবে জেরা করাটা বন্ধ করো। আমি এখন নিজের রুমে যাচ্ছি, কেউ যেন ডিস্টার্ব না করে।”
​এই বলেই সে কারোর উত্তরের অপেক্ষা না করে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের ঘরে চলে গেল। পেছনে ফেলে গেল একরাশ নিস্তব্ধতা। ভাহিদ বিস্ময় আর রাগে ফুঁসতে লাগল, কাশফিয়া হতভম্ব হয়ে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

​সবচেয়ে বেশি আঘাত পেল ছোট্ট আনায়া। সে তো এমন কিছু আশা করেনি। সে বড় ভাইয়ের দিক থেকে এমন নিষ্ঠুর ব্যবহার আশা করেনি! আনায়া কাশফিয়ার আঁচল ধরে বড় বড় চোখে ভিভিয়ানের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি বুঝল কে জানে, অথচ তার টলটলে চোখ দুটো মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল। কিন্তু সে মোটেও কাঁদল না।
​অনিমা ভিভিয়ানের কাজে খুব বেশি একটা অবাক হলো না। ছেলেটাকে সে বেশিই ভালোবাসে। যথারীতি ভিভিয়ানের সব কথাই যেন তার কাছে ঠিকই মনে হলো। অনিমা ভারী শ্বাস ফেলে আনায়াকে কোলে নিতে চাইলে সে এক ঝটকায় মায়ের হাত সরিয়ে দিল।

কারো কোনো কথা না শুনে সে তার ছোট্ট পা ফেলে ফেলে দ্রুত নিজের খেলার ঘরের দিকে ছুটে গেল। অনিমা বিরক্ত হলো মেয়ের কান্ডে। এমনিতেই এবার অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে তার শরীর যেন চলছেই না। এতো ক্লান্তিতে সময় পেরোয় যে, আনায়ার দিকেও নজর রাখার শক্তিটুকুও যোগায় না।
আনায়া নিজের খেলার ঘরে এলো। পুরো ঘর জুড়ে নানান পুতুল ও খেলনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বেশিরভাগই তার বড়মা আর বড়বাবা এনে দিয়েছে। একই সাথে ঘরের একপাশে বড় ম্যাট্রেস ও কম্ফর্টার বিছানো। মাঝেমধ্যে সেখানেই শুয়ে-বসে খেলতে খেলতে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
তবে আজ নিজেকে আড়াল করতেই, সে নিজের ছোট্ট বিছানাটায় গিয়ে কুঁকড়ে শুয়ে পড়ল। তার ছোট্ট হৃদয়ের গহীনে আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা ও অভিমান বাসা বাঁধল।

ভিভিয়ান নিজের ঘরে প্রবেশ করেই সজোরে দরজাটা ঠেলে দিল। মাথার ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। গায়ের টিশার্টটা এক কোণায় ছুঁড়ে ফেলে সে বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে পানির ঝাপটা দিল। আয়নায় নিজের রক্তাভ চোখের দিকে তাকিয়ে একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। এরপর বিছানায় এসে ধপ করে গা এলিয়ে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে চোখ বুজল।
হঠাৎ দরজার কাছে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ হতেই, ভিভিয়ান চোখ না মেলেই কান সজাগ করল। তার মনে হলো, অতি পরিচিত সেই ছোট্ট পায়ের শব্দ—নিশ্চয়ই আনায়া এসেছে। নিজের সহজাত গাম্ভীর্য বজায় রেখে সে বেশ গুরুগম্ভীর স্বরে বলে উঠল,

​”তারা, প্লিজ এখন বিরক্ত করিস না। মুড অফ আছে।”
​কথাটা বলে সে বালিশে আরও গভীরভাবে মুখ গুঁজে দেয়। কিন্তু মিনিট খানেক পার হয়ে গেলেও কোনো সাড়াশব্দ মিলল না; কোনো আধো-আধো বুলি কিংবা জামার কোণা টেনে ধরার টানও অনুভূত হলো না।
ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে মুখ তুলে দরজার দিকে তাকাল। দেখল দরজার চৌকাঠ একদম শূন্য। কেউ আসেনি। ভিভিয়ান খানিকক্ষণ ওভাবেই চেয়ে থেকে একটা তপ্ত শ্বাস ছাড়ল। হুট করেই তার মনে পড়ে গেল—নিচে সে মেয়েটার সামনে খুব বাজেভাবে সবার সাথে কথা বলে এসেছে। এবং তা আনায়াকেই ইঙ্গিত করে।
​কোনো কালবিলম্ব না করে ভিভিয়ান বিছানা থেকে উঠে পড়ল। আসার সময় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় খেয়াল করেছিল, বিচ্ছুটা তার খেলার ঘরের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে।ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সে আনায়ার খেলার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।

রুমের ভেতরে আবছা আলো। আনায়া সেখানে ফ্লোরের ওপর বিছানো বড় তোশকের ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। একটা ছোট কম্বল দিয়ে সে নিজেকে এমনভাবে মুড়িয়ে রেখেছে যে কেবল তার মাথাটা দৃশ্যমান। তার ছোট্ট হাতের মুঠোয় ভিভিয়ানের দেওয়া সেই খরগোশটা। সে আপনমনে ফিসফিস করে খরগোশটার সাথে কথা বলছে, যেন নিজের সবটুকু অভিমান সে ওই জড় পদার্থটার কাছে উজাড় করে দিচ্ছে।
​ভিভিয়ান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে ডাকল,

“তারা!”
​ভিভিয়ানের গলার আওয়াজ শোনামাত্রই আনায়া সচকিত হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে আরও শক্ত করে কম্বলের নিচে গুটিয়ে নিল এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়ার ভাণ করল। ভিভিয়ান তার এই কাণ্ড দেখে এক মুহূর্তের জন্য তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে এগিয়ে এসে, ধপ করে আনায়ার পাশে তোশকের ওপর শুয়ে পড়ল। এক হেঁচকায় কম্বলটা সরিয়ে দিয়ে আনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
​”হেই প্রিটি লিটিল র‍্যাবিত! এতো দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছিস?”
​আনায়া কোনো উত্তর দিল না। সে ভিভিয়ানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে জেদের সাথে পুনরায় কম্বলে মুখ গুঁজে দিল। ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে বিড়বিড় করল, “ওরেহ!”

সে পুনরায় আনায়ার কানের কাছে ফিসফিস করে আওড়াল,
“ঐ জানবাচ্চা,রাগ করেছিস? কথা বলবি না আমার সাথে?”
​সে আর সময় নষ্ট করল না। হুট করেই আনায়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে তার ছোট্ট পেটে মুখ গুঁজে দিল ভিভিয়ান। তার একঝাঁক এলোমেলো চুল আর চাপদাঁড়ির খোঁচায় আনায়া মুহূর্তেই অস্থির হয়ে উঠল।
ভিভিয়ান অনবরত পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে ওকে ঝাঁকাতে লাগল। বেচারী আনায়া কয়েক সেকেন্ড নিজের গাম্ভীর্য ধরে রাখার চেষ্টা করলেও, শেষমেশ আর পারল না। সব অভিমান হাওয়ায় মিশিয়ে সে দমফাটা হাসিতে খিলখিলিয়ে উঠল। দুহাতে ভিভিয়ানের চুল ধরে তাকে সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে সে হাঁপাতে লাগল।
—“বা…বাইয়া, ছুসছুরি লাগে।”

​বেশ কিছুক্ষণ পর ভিভিয়ান মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। খেয়াল করল, মেয়েটার হাসিমাখা চোখের কোণে এখনো কান্নার জল লেগে আছে। ভিভিয়ানের কণ্ঠস্বর অনেকটা নরম হয়ে এল। সে নিচু স্বরে বলল,
“আরেহ আরেহ, কান্না করেছিস? সত্যি? এতো কষ্ট পেয়েছিস?”
​আনায়া নিজের হাসি থামিয়ে আবারও চুপসে গেল। টলটলে চোখজোড়া আবারও জলে ভিজে উঠল। ভিভিয়ান দ্রুত উঠে বসল। নিজের সহজাত কায়দায় এক থাবায় আনায়াকে নিজের কবজির জোড়ে হাতের মুঠোয় তুলে নিল। নিজের মুখের সামনে মুখোমুখি ঝুলিয়ে উঁচিয়ে ধরল।
​আনায়া ধরা গলায় ক্ষীণ স্বরে বলল,
“আমি আর তোমাক এ বিকত (বিরক্ত) করব না। আমি ভালো বেবি হয়ে থাকব।”

​ভিভিয়ান সামান্য হাসল, তবে তাতে স্পষ্টত মায়া ছিল। সে আনায়াকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল,
“ওতো ভালো হওয়ার দরকার নেই, যেমন আছিস তেমনই থাক। এবার বল, সারা সন্ধ্যা না খেয়ে নাটক করেছিস কেন?”
​আনায়া মাথা নুইয়ে বলল,
“তুমি বকা দিয়েছ কেন? আমি তো তোমার সাথে খাব বলেচিনাম।”
​ভিভিয়ান একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
“ওকে সরি, ভুল হয়েছে আমার। এখন কোনো কথা না, চল আমার রুমে গিয়ে খাবি।”
​ভিভিয়ান আনায়াকে কাঁধে করে কোলে তুলে নিজের ঘরে নিয়ে এল। নিচে মা’কে খবর দিয়ে নিজের রাতের খাবারের সাথে আনায়ার জন্যও খাবার আনিয়ে নিল সে। বিছানায় আনায়াকে বসিয়ে নিজ হাতে খাওয়াতে শুরু করল। অসময়ে এসব করতে কিছুটা বিরক্ত লাগলেও,এসব করতেও সে তেমন দ্বিধা করল না। নিজের ভালোলাগা কিংবা খারাপ লাগা—নিজের সকল অনুভূতির সাথেই ভিভিয়ানের সম্পর্ক বড্ড কাঁচা।

​খাওয়া শেষে এবার ঘুমানোর পালা। আনায়াকে বুকে জড়িয়ে,ঘরে পায়চারি করতে লাগল। বিশাল এক শক্ত-পোক্ত পাহাড়ের মতো ভিভিয়ানের প্রশস্ত বুকের একপাশে ছোট্ট আনায়া যেন তার হৃদপিণ্ডেরই একটা অংশ হয়ে গুটিয়ে রইল। আনায়ার কথামতো তাকে এবার গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসতে হলো।
​”শোন, এক জঙ্গলে একটা ছোট্ট হরিণ ছিল। সে খুব দুষ্টুমি করত…”
​আনায়া মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে বলল,
“হংরিণের শিং নেই?”
ভিভিয়ান ধৈর্য ধরে বলল,
“হ্যাঁ আছে।”
—“ঐ জঙগনে হংরিন ছারা আর কুনু বাগ-ভান্নুক থাকত না?”
—“থাকবে না কেনো, সবাই থাকত। আগে আমায় পুরো গল্পটা বলতে দে।…হরিণটা একদিন একটা পাহাড়ে গেল…”
ভিভিয়ান বিরক্তি নিয়ে কিছুটা রুক্ষ স্বরেই আওড়াতে লাগল। কিন্তু নাছোড়বান্দা আনায়া আবারও বলে উঠল,
“পাখাড় কত বড় বাইয়া?”

—“পাখাড় নয় পাহাড়!”
—“হু হু,ওতা কত বড়?” আনায়ার কৌতুহলী প্রশ্ন।
​ভিভিয়ান কিছুটা বিরক্ত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“তোর মাথার চেয়ে অনেক বড়। এখন চুপ করে শোন…”
​গল্পের মাঝেই আনায়া আরও দু-তিনবার অবান্তর প্রশ্ন করল, ভিভিয়ান বিরক্তি নিয়ে হলেও তার উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। তবে ধীরে ধীরে আনায়ার কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হয়ে এল। একসময় ভিভিয়ান অনুভব করল, তার ঘাড় আর গলার খাঁজে আনায়ার উষ্ণ নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে। মেয়েটা তার গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে গভীর ঘুমে ঢলে পড়েছে।
ভিভিয়ান একটা স্বস্তির ভারী শ্বাস ফেলল। অন্ধকার ঘরে সে কিছুক্ষণ আনায়ার শান্ত মুখটার দিকে চেয়ে রইল। জগতের সব উগ্রতা আর আক্রোশ যেন এই ছোট্ট শিশুটির সাহচর্যে এসে থমকে যায়। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে আনায়াকে নিজের বুক থেকে নামিয়ে বিছানার একপাশে শুইয়ে দিল। এরপর চাদরটা ওর বুক পর্যন্ত টেনে দিয়ে সব লাইট অফ করে নিজেও ঘুমের দেশে পাড়ি জমাল।

পরদিন সকালে এহসান মঞ্জিলের আবহ এক চিলতে রোদেলা ব্যস্ততায় মুখিয়ে উঠল। নিত্যদিনের কোলাহল ছাপিয়ে আজ বাড়িতে এক বাড়তি আমেজ; আনায়ার মামাতো ভাই রেহান তার বাবা-মায়ের সাথে চট্টগ্রামে এসেছে। সম্পর্কের টানে অন্তঃসত্ত্বা অনিমা তথা আনায়ার মা-কে দেখতেই মূলত তাদের এহসান মঞ্জিলে আসা। সাধারণ আত্মীয়তার নিয়ম মেনে ডাইনিং রুমে চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ আর বড়দের খোশগল্পে বাড়িটা মুখরিত হয়ে উঠল।
​রেহান আনায়ার চেয়ে বছর ছয়েকের বড়। শান্ত এই ছেলেটিকে খেলার সাথী হিসেবে পেয়ে আনায়া যেন মেঘ না চাইতেই জল পেল। বড়দের আড্ডার মাঝেই দুই ভাই-বোন ছুটে গেল বাগানের দিকে। নতুন সঙ্গীর সাথে খেলায় মেতে আনায়া যেন ক্ষণিকের জন্য তার বিভান বাইয়া’র অস্তিত্বই দুনিয়া থেকে মুছে ফেলল।

ভিভিয়ান নিজের ঘরের জানালার পর্দা সরিয়ে দূর থেকে দেখল, আনায়া আর তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। এই দৃশ্য দেখে ভিভিয়ান এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করল। অন্তত আজ কিছুক্ষণ সে আনায়ার নজরদারি আর অবুঝ আবদার থেকে মুক্ত। এই সুযোগেই তাকে মাওরার সাথে দেখা করে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিতে হবে। বিগত কয়েকদিনের এই অস্থিরতা আর তিক্ততা তার স্নায়ুচাপকে চরম সীমায় নিয়ে গিয়েছে।
​ভিভিয়ান সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় দেখল বাড়ির সবাই মেহমান নিয়ে ব্যস্ত। সে পাভেলকে একপাশে ডেকে নিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“পাভেল, আমি একটু বেরোচ্ছি। সবদিকে একটু খেয়াল রাখিস। বাড়িতে কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে কল দিবি।”

পাভেল বড় ভাইয়ের চোখের ভাষা বোঝে, সে মাথা নেড়ে আশ্বস্ত করল। এরপর ভিভিয়ান দ্রুত পায়ে গ্যারেজের দিকে এগিয়ে গেল।
​পার্কের সেই নির্জন কোণায় মাওরা আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি বিচলিত। ভিভিয়ান বাইক থামিয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসতেই মাওরা একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। ভিভিয়ানের পরনে আজ কালচে ধূসর রঙের একটি শার্ট, হাতার বোতামগুলো কবজি পর্যন্ত খোলা।
সে মাওরার কাছাকাছি আসতেই তার সেই চিরাচরিত গুরুগম্ভীর ভাব বজায় রেখে নরম স্বরে বলল,
“কালকের আচরণের জন্য আমি সরি নই মাওরা, কারণ আমার জায়গা থেকে আমি ঠিক ছিলাম। তবে তোমাকে এভাবে মনমরা দেখাটা আমার জন্য কষ্টের।”
​মাওরা মাথা নিচু করে রইল। ভিভিয়ান তার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। দুজনের মাঝের দীর্ঘদিনের মান-অভিমানের বরফ কিছুটা গলতে শুরু করলেও মাওরাজর চোখে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। ভিভিয়ান লক্ষ্য করল মাওরা যেন কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু বারবার থেমে যাচ্ছে। ভিভিয়ান ওর থুতনি আলতো করে ধরে নিজের দিকে মুখ তুলে বলল,
“কিছু বলবে? অস্থির লাগছে কেন? বাসায় সব ঠিক আছে?”
​মাওরা কেবল মাথা নেড়ে বলল,

“না, কিছু না। সব ঠিক আছে।”
​ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকে একবার পরখ করে নিলেও, পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে এক চিলতে ম্লান হাসল। সে মাওরাকে ওখানেই দাঁড় করিয়ে রেখে পার্কের গেটের কাছে গেল আইসক্রিম নিতে। মাওরা একাই দাঁড়িয়ে ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে তিন-চারজন বখাটে যুবককে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখল।
তাদের বয়স খুব একটা বেশি নয়, কিন্তু চলন-বলন আর চোখের চাউনি কুৎসিত। মাওরা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু ছেলেগুলো আগ বাড়িয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।
​তাদের একজন দাঁত বের করে হাসল,
“কী গো সুন্দরী, একা দাঁড়িয়ে কেন? এই জায়গায় নতুন নাকি?” মাওরা কোনো উত্তর দিল না, কেবল অস্থির হয়ে ভিভিয়ানকে খুঁজতে লাগল। অন্য একজন টিপ্পনী কাটল,
“চুপ করে থেকো না। এ শহরটা খুব বড়, পথ হারিয়ে ফেললে কিন্তু মুশকিল।”
​ঠিক তখনি হাতে আইসক্রিম নিয়ে ভিভিয়ান ফিরে এল। দৃশ্যপট বদলে যেতে ওর এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে শান্ত পায়ে হেঁটে মাওরার পাশে এসে দাঁড়াল সে। অত্যন্ত নিরেট কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“মাওরা, এদের চেনো?”
​মাওরা দ্রুত মাথা নেড়ে বোঝাল— “না।”
​ছেলেগুলো ভিভিয়ানের দীর্ঘ সুঠাম দেহ আর শান্ত চাউনি দেখে শুরুতে কিছুটা থতমত খেলেও পরক্ষণেই নিজেদের সামলে নিল। একজন হাহা করে হেসে ভিভিয়ানকে একটা ব্যঙ্গাত্মক সালাম দিয়ে বলল,
“স্লামালাইকুম বড়ভাই! কিছু মনে করবেন না,হ্যাঁ? আপনার বোনটাকে একা দেখে আমরা একটু দেখভাল করছিলাম আরকি। আপনার বোন মানেই তো আমাদের…হে হে। অনেক সুন্দর আপনার বোনটি!”
​ভিভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে মাওরার চোখের দিকে তাকাল; মাওরা ভয়ার্ত চোখে ইশারে করছিল, এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভিভিয়ান তো নাছোড়বান্দা।
সে ছেলেগুলোর কথায় তাদের দিকে না চেয়েই ক্ষীণ হাসল। সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে আইসক্রিমের মোড়কটা ছাড়িয়ে মাওরার হাতে দিল। এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে প্রথম ছেলেটার কাঁধে হাত রাখল। ছেলেটা তখনো নির্বিকার ভঙ্গিতে হাসছে,

“কী বড় ভাই, কোনো সমস্যা?”
​ভিভিয়ান এক অদ্ভুত তির্যক হাসি হাসল। তার সেই হাসি দেখে ছেলেগুলোর হাসি নিমেষেই মিলিয়ে গেল। ভিভিয়ান ফিসফিস করে বলল,
“হুম,সমস্যা তো কেবল শুরু হলো।”
​ব্যাস, কথা শেষ হতে না হতেই শুরু হলো তাণ্ডব। ভিভিয়ানের এক শক্তিশালী ঘুষিতে প্রথম ছেলেটা ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। মাওরা আতঙ্কে দুপা পিছিয়ে গেল। চোখের পলকে ভিভিয়ান যেন এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করল। সে চার-পাঁচজন ছেলেকে একসাথে ইচ্ছেমতো পিটিয়ে চলেছে।
কারো কলার চেপে ধরছে তো কাউকে লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ছেলেগুলো মার খেয়ে পালাতে চাইলেও ভিভিয়ান তাদের নিস্তার দিচ্ছে না। এবং বারবার চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়াতে লাগল,
“মেয়ে দেখলে হুঁশ থাকে না? আমার বোনের দেখভাল করতে এসেছিস? ইডি*ট, বা*স্টা* আম্মা বলবি ওকে!”
ছেলেগুলো বেআক্কল হয়ে মার খেতে রইল। বারবার আওড়াল,
“ভাই মাফ করেন,আর কখনো…”

—“আগে বল ও তোদের কি হয়? বল কি হয়?”
—“আ…আম্মা হয়,আম্মা।”
—“তাহলে আমি কি হই?”
—“আ…বড় ভাই…”
—“হা*****! বল আমি কি হই তোদের।”
—“বড়ভাই… না, না, আব্বা… আব্বা… ”
মাওরা কি বলবে নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। ভিভিয়ান উম্মাদ হয়ে উঠেছে,কাউকে ছাড়তেও সে রাজি না। এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে ভিভিয়ানের হাতটা ছেলেগুলোর আত্নরক্ষায় জন্য,ব্যবহার করতে চাওয়া কোনো ধারালো বস্তুুর সাথে লেগে অনেকটা কেটে গেল।
ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে, কিন্তু ভিভিয়ানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মাওরা আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে ভিভিয়ানকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। তাকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে,সে বারবার আওড়াতে লাগল,

“ভিভিয়ান, প্লিজ থামো! মরে যাবে ওরা, ছেড়ে দাও!”, মাওরার তীব্র আকুতিতে ভিভিয়ান শেষ পর্যন্ত থামল। সুযোগ বুঝে ছেলেগুলো ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল।
​ভিভিয়ানের দীর্ঘশ্বাসগুলো তখন তপ্ত ঝড়ের ন্যায় বইছে। শার্টের হাতা ভিজে রক্ত চুইয়ে পড়ছে। মাওরা ভয়ে কাঁপছে, ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নিজের প্রিয় মানুষকে এমন বিধ্বংসী রূপে দেখে সে স্তম্ভিত। ভিভিয়ান ওর কান্নার শব্দ শুনে যেন হুশ ফিরে পেল। সে ধমকের স্বরে বলে উঠল,
“কাঁদছো কেন মেয়ে? কান্না বন্ধ করো!”
​মাওরা কোনো কথা না শুনে নিজের ওড়নার একপাশ দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলল। এরপর ভিভিয়ানের রক্তাক্ত হাতটা টেনে নিয়ে খুব যত্ন করে ব্যান্ডেজের মতো করে বেঁধে দিতে লাগল। ভিভিয়ান শুরুতে হাত সরিয়ে নিতে চাইলে মাওরা ধমক দিল,

“একদম নড়বে না! দেখো কী অবস্থা করেছ হাতের।”
​ভিভিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মেজাজ তখনো খিটখিটে, কিন্তু মাওরার হাতের ছোঁয়ায় হৃদপিণ্ডের গতি কিছুটা স্বাভাবিক হলো। সে মাওরার দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“অকারণে বাইরে বের হবে না। আমি না বললে একা কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যতদিন এখানে আছো সাবধানে থাকবে।”
​মাওরা তার চোখের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বলল,
“তুমিও নিজের খেয়াল রেখো। এই রাগ তোমার একদিন বড় কোনো ক্ষতি করে ফেলবে।”
​ভিভিয়ান ভারী শ্বাস ফেলল। বাইকে ওঠার আগে মাওরার কাছাকাছি এল। আলতো করে ওর মাথার পেছনে হাত রেখে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলো। ক্ষণিকের সেই গভীর আলিঙ্গন যেন সব অভিযোগ আর যন্ত্রণার প্রলেপ। মাওরাকে শান্ত করে ভিভিয়ান আর দেরি করল না; সময় থাকতেই বাড়ি ফিরতে হবে। নয়তো তার এই অবস্থা দেখে বাড়িতে আবারও গন্ডগোল শুরু হবে।

ভিভিয়ান বাড়িতে যখন প্রবেশ করল, তখনও ড্রয়িংরুমে মেহমানদের হাসাহাসি আর খোশগল্পে বাড়ি মুখরিত। সে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সবাইকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়িতে পা বাড়াল। ভাগ্যিস, এই মুহূর্তে সবাই রেহানের বাবা-মায়ের আপ্যায়নে এতোটাই নিমগ্ন যে, ভিভিয়ানের এই বিধ্বস্ত অবস্থার দিকে নজর দেওয়ার ফুরসত কারো হলো না।
সে নিজের জন্য এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল; অযাচিত জেরা আর শোরগোল থেকে মুক্তি পাওয়ার এর চেয়ে ভালো সময় আর হয় না।
​নিজের ঘরে ঢুকেই সে সজোরে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসল। মাওরার ওড়নার সেই শুভ্র সাদা টুকরোটি এখন রক্তে ভিজে টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। হাতের ক্ষতটা বেশ গভীর, স্পন্দনশীল যন্ত্রণার সাথে অবিরাম রক্ত চুইয়ে পড়ছে। ভিভিয়ান জানে, এই হাত নিয়ে বেশিক্ষণ বসে থাকা বোকামি হবে। বাড়ির কেউ যদি একবার দেখে ফেলে, তবে পরিস্থিতির সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। যতদিন বাড়িতে আছে,ততদিন সাবাধানে থাকতেই হবে।

​দ্রুত আলমারি থেকে ফার্স্ট এইড বক্সটা বের করে নিজের পাশে রাখল সে। কিন্তু হাতের সেই ভেজা বাঁধনটা খোলার আগেই হুট করে ঘরের দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ছোট্ট আনায়া। ভিভিয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হলো; নিজের অজান্তেই সে দরজাটা ঠিকমতো লক করতে ভুলে গিয়েছিল। তবে আগন্তুককে দেখে তার বুকের ভেতরের অস্থিরতা কিছুটা কমল—যাক, অন্তত বড় কেউ আসেনি।
​আনায়া তার প্রিয় পুতুলটা বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দরজার চৌকাঠে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাড়ির বড়রা ভিভিয়ানের প্রত্যাবর্তন টের না পেলেও, এই ছোট্ট সত্তাটির চোখ এড়ায়নি। সে খেলার মাঝেই ভিভিয়ানকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখে তার পিছু পিছু ছুটে এসেছে। তার চোখজোড়া এখন ভিভিয়ানের সেই র*ক্তাক্ত হাতের ওপর স্থির।

​—“বাইয়া! হাত কেতে গেছে, রকত পরছে।”
​আনায়ার কণ্ঠস্বরে স্পষ্টত অবুঝ আতঙ্ক। ভিভিয়ান নিজের ক্ষতের দিকে মনোযোগ সরিয়ে নিয়ে অত্যন্ত নিরাসক্ত গলায় বলল,
“তুই এখানে কী করছিস? যা, দরজাটা ভালো করে চাপিয়ে দিয়ে আয়।”
​আনায়া বাধ্য মেয়ের মতো দ্রুত পা ফেলে দরজাটা আটকে দিয়ে পুনরায় ভিভিয়ানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। বিশালকায়, পেশীবহুল ভিভিয়ানের সামনে এই ছোট্ট শিশুটিকে অত্যন্ত নিরীহ আর ভঙ্গুর দেখাচ্ছে।
ভিভিয়ান নির্বিকার ওড়নার বাঁধনটা খুলতে শুরু করল। তার চেহারায় কোনো ব্যথার চিহ্ন নেই, যেন এই ক্ষত তার কাছে তুচ্ছ কোনো ব্যাপার। কিন্তু আনায়া যেন ব্যথায় নিজেই কুঁচকে যাচ্ছে। ভিভিয়ান যখন ক্ষত পরিষ্কার করতে তুলো হাতে নিল, তখন সে লক্ষ্য করল আনায়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে আপনমনেই ক্ষতের দিকে লক্ষ্য করে বারংবার ফুঁ দিচ্ছে।
​ভিভিয়ান মুখ তুলে তাকাতেই দেখল, আনায়ার ডাগর চোখ দুটো জলে ছলছল করছে। একটু আগেও সে বাগানে রেহানের সাথে হাসিখুশিতে মেতে ছিল, অথচ এখন তার ঠোঁট দুটো কান্নায় থরথর করে কাঁপছে।
​ভিভিয়ান বেশ নিরেট প্রশ্রয়ের স্বরে জানতে চাইল,

“হেই, তুই কাঁদছিস কেন?”
​আনায়া কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে অস্ফুট স্বরে আওড়াল,
“বাইয়া ব্যাথা…”
​ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আমার ব্যথা করছে, এটা তোকে কে বলল?”
​আনায়া কোনো জবাব দিল না। সে শব্দ করে কেঁদে ফেলার ঠিক আগের মুহূর্তে পৌঁছে গেছে। ভিভিয়ান আর দেরি করল না; দ্রুত নিজের অন্য হাতটি বাড়িয়ে আনায়াকে নিজের কাছে টেনে নিল। তাকে আগলে জড়িয়ে ধরে নরম স্বরে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

“হেই পাগলী! কাঁদছিস কেন? আমার কিচ্ছু হয়নি।”
​আনায়া পুনরায় ফুঁপিয়ে উঠে একই কথা আওড়াল,
“বাইয়া ব্যাথা…”
​ভিভিয়ান একটা ভারী শ্বাস ফেলল। তার মতো একজন উগ্র-গম্ভীর মানুষের পক্ষে এই অবুঝ আবেগের মোকাবিলা করা কঠিন। সে আনায়ার চোখের জল মুছে দিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর সতর্ক গলায় বলল,
​”কিসের ব্যথা? আমার একটুও ব্যথা করছে না।… তুই আগে আমার কাছে প্রমিজ কর, এইসব কথা তুই বাড়ির আর কাউকে বলবি না। মা কিংবা বড়-মা কাউকে না। পারবি তো?”
​আনায়া তার চোখের দিকে তাকিয়ে অসীম বিশ্বাসে মাথা নাড়ল। ভিভিয়ান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পুনরায় নিজের ড্রেসিংয়ে মন দিল, আর আনায়া মূর্তির মতো তার পাশে বসে অজানা যন্ত্রণার ভাগিদার হতে লাগল।

খানিকক্ষণ বাদেই আনায়া কিছুটা শান্ত হয়ে বলল,
“বাইয়া! এতা কিবাবে কেতেছে? তুমি চুপ করে কোতায় গিয়েছিনে?”
ভিভিয়ান আনমনে অকপটে আওড়ায়,
“আ…আমি? আমার সুইটহার্টের দেখা করতে গিয়েছিলাম?”
—“সুইতহাত? ওতা কে?”
—“ঐ যে সেদিন ছবি দেখলাম, সেই!”
—“ওওওও, তোমার বউ?”
ভিভিয়ান আনায়ার কথায় ক্ষীণ হাসল। মাথাটা হালকা ঝাঁকিয়ে আওড়াল,
“হুম!”

—“তোমার বউ তোমার সুইতহাত?”
—“হুম,সে আমার জান, সুইটহার্ট সবকিছুই।”
—“এই সুইতহাত কিমন দেকা যায়? এতার মানে কি? কোতায় পাওয়া যায়?”
একসাথে আনায়ার এতো প্রশ্নে ভিভিয়ান কিছুটা অপ্রস্তুত হলো।মাথা চুলকে বলল,
“আ…এটার মানে হলো মিষ্টি হৃদয়। আই থিংক এমন কিছুই।…আমাদের সবারই একটা করে হৃদয় বা হৃদপিণ্ড রয়েছে।কিন্তু যখন কেউ আমাদের অত্যন্ত প্রিয় বা ভালোবাসার মানুষ হয়ে ওঠে, তখন তাকেই সম্বোধন করে সুইটহার্ট বলা হয়।”
আনায়া কি বুঝল কে জানে। সে ভাবুক স্বরে বলল,
“তাহলে আমি তুমার কি?”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে আনায়ার উৎসুক মুখের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল,

মহামায়া পর্ব ২৩

“তুই?”
আনায়া মাথায় ঝাকায়,
“হুম,হুম।”
ভিভিয়ান এবার নিজেই কিছুক্ষণ গভীর ভাবনা ভাবতে লাগল। সদ্য ব্যান্ডেজ বাঁধা নিজের হাতটার দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই মুখ তুলে আনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুই হচ্ছিস আমার ব্লাড!”
মূহুর্তেই আনায়ার চোখমুখ কুঁচকে গেল। অবাক স্বরে বলল,
“বালাদ? মানে হাম্বা? কিন্তু আমি তো হাম্বা নই।”

মহামায়া পর্ব ২৫