মহামায়া পর্ব ২৫
তুশকন্যা
“তুই হচ্ছিস আমার ব্লাড!”
মূহুর্তেই আনায়ার চোখমুখ কুঁচকে গেল। অবাক স্বরে বলল,
“বালাদ? মানে হাম্বা? কিন্তু আমি তো হাম্বা নই।”
ভিভিয়ানের মেজাজ মূহুর্তেই চটে গেল। ভ্রু-জোড়া কুঁচকে বিরক্তির সাথে আওড়াল,
“তুই আসলেই একটা বলদ!”
আনায়ার চোখ-মুখ চুপসে গেল। মাথা নুইয়ে শুধালো,
“আমি জানি, আমাকে দেকতে হাম্বার মতো না।”
ভিভিয়ান নিজের বিরক্তি দমিয়ে, ভারী শ্বাস ফেলল। শান্ত স্বরে বলল,
“আমি তোকে বলদ বলিনি, ইডিয়ট! ওটা ব্লা’ড। ব্লা’ড মানে র’ক্ত।”
আনায়া উৎসুক ভঙ্গিতে মুখ তুলে আওড়ায়,
“র..রকতহ্? উযে তুমার হাত কেতে যেটা পরসে? ওতা?”
ভিভিয়ানের হাতের দিকে ইশারা করল আনায়া। ভিভিয়ান নির্বিকারে মাথা নেড়ে বলে,
“হু,এটাই।”
আনায়া দুদণ্ড স্থির দাঁড়িয়ে, আবারও জিজ্ঞেস করল,
“কিনতু এতা কেনো আমি হবো? তোমার সুইতহাতও কি এতার মতো দেকতে?”
এই সামান্য জিনিস নিয়েও আনায়া দুটো সম্মোধনকে এক করার চেষ্টা করছে। যা ভেবে ভিভিয়ান পুনরায় বিরক্তির স্বরে বলল,
“এতো কিছু জানিনা, এটা ভালো লাগে আর তোকেও ভালো লাগে। নাম পছন্দ না হলে, ও তোর ব্যাপার।”
—“তুমার রকত বালো লাগে?”
—“হু, খারাপ কি? সুন্দরই তো—অ্যাট্রাক্টিভ,সাম হাউ ইন্টারেস্টিং।”
আনায়া বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। তবুও মুখ ফস্কে সহজ স্বীকারোক্তি দিল,
“তুমি একতা পাগল।”
ভিভিয়ান হাতে ব্যন্ডেজ বাঁধছিল। হুট করে আনায়ার মুখ থেকে এহেন কথা শোনায় সে বলে উঠল,
“আর তুই একটা ছাগল।”
ভিভিয়ান থেমে আবারও আওড়াল,
“এখানে থাকার হলে চুপচাপ থাক নয়তো নিচে গিয়ে খেল।”
ছুটির আরো দুটো দিন এভাবেই নানান ছলাকলে কেটে গিয়েছে। বিকেলের রৌদ্রছায়া এহসান মঞ্জিলে ছেয়ে আছে। ড্রয়িংরুমে ভাহিদ এহসানের গম্ভীর উপস্থিতির কারণে ইদানীং নিজের রুমটাই ভিভিয়ানের একমাত্র আস্তানা। সে ঘরের সোফায় গা এলিয়ে, কপালে হাত দিয়ে বসে ছিল। মস্তিস্কে কেবল একটি চিন্তাই অবিরাম ঘুরপাক খাচ্ছে—আগামীকাল মাওরার জন্মদিন।
রাত বারোটা বাজলেই তাকে উইশ করতে হবে, কিন্তু ভিভিয়ান এই বিশেষ দিনগুলো পালনের ব্যাপারে বড্ড কাঁচা। সম্পর্কের টানাপোড়েনের পর মাওরাকে একটু খুশি করা বা সারপ্রাইজ দেওয়ার মতো কোনো সৃজনশীল বুদ্ধি তার মাথায় আসছে না।
ঠিক এমন সময় দরজায় নূপুরের মতো মিষ্টি পায়ের শব্দ শোনা গেল। ভিভিয়ান চোখ না মেলেই বুঝতে পারল কার আগমন। পরক্ষণেই ঘরে প্রবেশ করল ছোট্ট আনায়া। পরনে তার গাঢ় সাদা রঙের একটি গাউন, কাঁধ অবধি নেমে আসা রেশমি চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে উড়ছে।
তার দুহাতে কিসের যেন অস্তিত্ব। ভিভিয়ান চোখ মেলে তাকাল। দেখল, আনায়া তৃপ্তিতে টকটকে লাল চেরি ফল চিবোচ্ছে। খাওয়ার চোটে চেরির রসে তার ঠোঁট, গাল আর হাত মাখামাখি হয়ে একদম রক্তবর্ণ হয়ে আছে।
ভিভিয়ান ভ্রু কুঁচকে তার দিকে চেয়ে গম্ভীর স্বরে বলল,
“ওই বিচ্ছু! তুই আমাকে রেখে একা একা কী খাচ্ছিস?”
আনায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভিভিয়ান ছোঁ মেরে তার হাত থেকে অর্ধেক খাওয়া চেরিটা কেড়ে নিয়ে মুখে পুরে দিল। আনায়া শুরুতে এমন আকস্মিক ঘটনায় একটু হকচকিয়ে গেলেও, পরক্ষণেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। অন্য হাতটা উঁচিয়ে একটা হৃষ্টপুষ্ট চেরি দেখিয়ে বলল,
“হি হি, আমার কাসে আরো একতা আসে।”
ভিভিয়ান পুনরায় সেটা ধরতে গেলে আনায়া ঝট করে হাত সরিয়ে নিয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল।
—“উঁহু, এতা তো দেবো না।”
তার সেই বিজয়ের হাসি দেখে ভিভিয়ানের ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটল। চেরির বীজটা দাঁতের অগ্রভাগে চেপে ধরে সে পুনরায় চিন্তার সাগরে ডুব দিল। আনায়ার লাল হয়ে থাকা মুখটার দিকে চেয়ে সে ভাবুক ভঙ্গিতে ডাকল,
“ব্লাড!”
আনায়া চিবানো থামিয়ে বড় বড় চোখে তাকাল। দুদিন আগের সেই র’ক্তার’ক্তি ঘটনার রেশ ধরেই হয়তো ভিভিয়ান তাকে এই নামে ডাকছে। সে চঞ্চল স্বরে সাড়া দিল,
“আমি?”
”হুঁ, তুই নয়তো আর কে।”
ভিভিয়ান সোফায় সোজা হয়ে বসে বলল,
“একটা হেল্প করতে পারবি?”
আনায়া গাল ফুলিয়ে মাথা ঝাঁকাল। ভিভিয়ান এবার কিছুটা ইতস্তত করে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আমার জান’কে তুই দেখেছিস না?”
আনায়া পুনরায় মাথা নাড়িয়ে বিজ্ঞের মতো বলল,
“হু, হু, তোমার বউ দেকেচি তো!”
”আজ ওর বার্থডে।”
ভিভিয়ান একটু থামল, তারপর কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুই বার্থডে কী তা বুঝিস তো?”
আনায়া আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল,
“হু হু, ঐ যে নেড (রেড) আচে না! ও-ই-ও তো বাতদে কলে।”
ভিভিয়ানের মেজাজ নিজের প্রতিই বিগড়ে গেল। দুনিয়ায় এত মানুষ থাকতে সে শেষমেশ কার কাছে পরামর্শ চাইতে এল! তবুও ধৈর্য ধরে জিজ্ঞেস করল,
“এই নেডটা আবার কে?”
—“ঐযে একতা নাল-লাল পাকি। তুমার মতো দেকতে, অন্নেক রাগ। আমি দেকি তো ওকে, টিবিতে আসে, আমার বালো লাগে ওকে।”
ভিভিয়ান দুই সেকেন্ড ভেবেই বুঝতে পারল সে কার্টুন চরিত্র ‘রেড’-এর কথা বলছে। সে কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্য করে বলল,
“ওহ, এ্যাংরি বার্ডস? রেড-এর কথা বলছিস?”
—“হু, হু, ওতাই।”
ভিভিয়ান আরো কিছু বলবে তার আগেই, আনায়া তার দিকে নিজের হাতের চেরিটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“বাইয়া এতা কেতে ছুতো ছুতো করে দাও। খেতে পাছসি না।”
ভিভিয়ান গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। তার কথামতো দাঁত দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট চেরির টুকরো করে তার হাতে ধরিয়ে দিতে লাগল। কখনো বা সেই এক টুকরো চেরিতে সে নিজেও আনমনে ভাগ বসাল। অতঃপর পুনরায় নিজের গুরুগম্ভীর ভাবগাম্ভীর্যে ফিরে গিয়ে বলল,
”আচ্ছা এবার শোন, এখন আমায় এটা বলতো—কারো বার্থডেতে দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেস্ট গিফট কী হতে পারে?”
আনায়া চেরি খেতে খেতেই চটজলদি জবাব দিল,
“তোমার বউকে দিবা?”
ভিভিয়ান মনে মনে বিরক্ত হলো—‘বিচ্ছুটা এত বেশি বোঝে কেন!’
মুখে বলল, “হুম, ওর জন্যই।”
”তাহনে একটা ভুম গাড়ি দাও।”
—“হুঁশ! ও তো মেয়ে।”
—“আ… তাহনে একতা পুতুন দাও।”
—“দেওয়া যায়, কিন্তু ও তো তোর মতো বাচ্চা নয়।”
আনায়া কিছুক্ষণ কপাল কুঁচকে ভাবল।তারপর উৎসাহী হয়ে বলল,
“তাহনে… বাইয়া বাইয়া, তোমার বউ বাতদেতে কেক খাবে না?”
—“খেলে খাবে না খেলে নাই, তাতে আমার কী? তুই কাজের কিছু বল নয়তো বাইরে গিয়ে খেল।”, ভিভিয়ান কিছুটা হাল ছেড়ে দেওয়া ঢঙে বলল।
আনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল।
“তাহনে চনো, আমরাও কেক বানাই, তোমার বউ খুচি হয়ে যাবে।”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কেক? সে তো কিনতেও পাওয়া যায়। কষ্ট করে বানাতে যাব কেন?”
—“কিনে দিলে খুচি হবে না, আমরা বানালে খুচি হবে।”, আনায়ার অকাট্য যুক্তি।
ভিভিয়ান বিরক্তির সাথে আওড়াল,
“হ্যাঁ, তোকে বলেছে!”
আনায়া এবার ঠোঁট উল্টে অভিমানী সুরে বলল,
“তুমি আমার কুনো কতা ছুনো না। আমি বলেতি তো, কেক বানালে অনেক বড় হবে আর তোমার বউও খুচি হবে। …আমিও খেতে পাবব।”, শেষের কথাটা বলতেই আনায়া ফিক করে হেসে দিল।
ভিভিয়ান তার দিকে কিছুক্ষণ এক নাগাড়ে চেয়ে থেকে, বিড়বিড় করে আওড়াল,
“বয়স অনুযায়ী তোর কথাবার্তা একদমই মানায় না তারা, আশ্চর্য!”
আনায়া তার গাম্ভীর্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও হাসল। কথা বলতে বলতে দ্বিতীয় চেরিটাও শেষ হয়ে গেল। খাওয়া শেষে আনায়া বীজ হাতের তালুতে নিয়ে ভিভিয়ানকে দেখিয়ে বলল,
“বাইয়া, এটা দিয়ে গাস হবে না?”
ভিভিয়ান আলসেমি কাটিয়ে উঠে দাঁড়াল।
“গাছ?… বলছিস যখন তবে দে লাগিয়ে দেখি।”
সে আনায়াকে নিয়ে বারান্দায় গেল। সেখানে একটি ছোট মাটির টবে সামান্য কাদাটে মাটি ছিল। ভিভিয়ান আঙুল দিয়ে গর্ত করে বীজ দুটি পুতে দিয়ে বলল,
“শোন তারা, যদি এখান থেকে কুঁড়ি বের হয়, তবেই বুঝবি গাছ হবে। তখন এটাকে নিয়ে নিচে বাগানে লাগিয়ে দেব। আর যদি না হয়, তবে বুঝবি তুই পঁচা বীজ খেয়েছিস।”
আনায়া টবের ওপর ঝুঁকে পড়ে।গভীর ভাবনায় বিজ্ঞের ন্যায় মাথা নাড়িয়ে বলে উঠল,
“না না, গাস হবে। আমি পানি দেব তো।”
ভিভিয়ান তার ছোট্ট মাথায় হাত রেখে মৃদু হাসল। এই বিচ্ছুর পাগলামি মাঝেমধ্যে তাকে প্রচন্ড বিরক্তবোধ করায়, আবার কখনো অদ্ভুত এক শান্তি দেয়। সে নিজেও আশ্চর্য এমন অদ্ভুত টানাপোড়েনে।
ভিভিয়ান বেশ কিছুক্ষণ হতে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আনায়ার উজ্জ্বল মুখটার দিকে চেয়ে আছে। তার যুক্তিবাদী মস্তিষ্ক বলছিল কাজটা চরম বোকামি হবে, কিন্তু মনের কোনো এক কোণ থেকে মাওরাকে চমকে দেওয়ার এই ইচ্ছাটা সে দমন করতে পারল না।
দুজনে আস্তে-ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগোতে লাগল। ভাগ্যিস, দুপুরের সব কাজ শেষে অনিমা আর কাশফিয়া নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে।বাড়িতে এই সময় আর তেমন কেউ নেই। পাভেল—সে নিজের মতো নিজের ঘরে সময় কাটাচ্ছে।
অন্তত রান্নাঘরটা আপাতত ফাঁকা। ভিভিয়ান ভেতরে ঢুকে কাউন্টারের ওপর দুহাত রেখে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। রান্নাবান্না তার জগতের বাইরের বিষয়, তবে ইন্টারনেটের কল্যাণে তাত্ত্বিক জ্ঞানটুকু অন্তত আছে। সে ফ্রিজ থেকে ডিম, বাটার আর দুধ বের করে আনল। আনায়া তখন একটা টুল টেনে তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছিল, যাতে সে কাউন্টার অব্দি পৌঁছাতে পারে।
ভিভিয়ান তাকে সাহায্য করে টুলের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,
“শোন বিচ্ছু, একদম নড়বি না। শুধু আমি যা বলব তাই করবি।”
সে একটা বড় কাঁচের বাটি নিয়ে তাতে ময়দা আর চিনি মেপে নিচ্ছিল। আনায়া কৌতূহলী হয়ে হাত বাড়িয়ে বলল,
“বাইয়া, আমি গুডু গুডু (নেড়েচেড়ে) করে দেই?”
ভিভিয়ান গম্ভীর মুখে একটা চামচ তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“নে ধর। তবে বেশি জোরে নাড়বি না, তাহলে ময়দা তোর নাকে-মুখে মেখে ভূত হয়ে যাবি।”
আনায়া খুব মন দিয়ে বাটির মিশ্রণটা নাড়তে শুরু করল। আদতে আনায়া তখন কি করছিল তা বোঝা মুশকিল, কিন্তু ভিভিয়ান ততক্ষণে ডিমের কুসুম আলাদা করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তার বলিষ্ঠ হাত দুটো সাধারণত বাইকের হ্যান্ডেল কিংবা জিমের ডাম্বেল ধরে অভ্যস্ত, সেখানে এই সূক্ষ্ম কাজ করতে গিয়ে কপালে তার বারবার ভাঁজ পড়ছে।
মিশ্রণ তৈরি হওয়ার এক পর্যায়ে আনায়া হঠাৎ বলে উঠল,
মহামায়া পর্ব ২৪
“বাইয়া, এতে চকনেট দিবে না? তোমার বউ চকনেট খায় না?”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“দেবো?”
আনায়া বিজ্ঞের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে বলল,
“হু,হু, দাও দাও।… আমকেও দিও, আমিও এক্টু খাই।”
ভিভিয়ান ক্ষীণ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে এক টুকরো ডার্ক চকোলেট আনায়ার মুখে পুরে দিল।
সবকিছু রেডি হওয়ার পর, শেষবারের মতো ভিভিয়ান আনায়ার কাছে জানতে চাইল,
“ব্লা’ড! এর মধ্যে আর কি দেওয়া যায় বলতো?”
আনায়া মাথা উঁচিয়ে, কেক ব্যাটারের দিকে চেয়ে কিছু একটা ভাবল। পরক্ষণেই উৎসুক ভঙ্গিতে বলে উঠল,
“বাইয়া, এক্টু ইন্দু (ইঁদুর) ম’রা বিছ দাও। মুজা মুজা লাগবে।”
