Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬২

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬২

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬২
সাইয়্যারা খান

অবিন্যস্ত, অপরিপাটি হয়ে উন্মুখ হয়ে বসে আছে তৌসিফ। ডাক্তার এসেছে, পৌষকে দেখছে। তৌসিফ নিজে দেখছে ডাক্তার যথাসম্ভব ভালো ভাবেই দেখছে অথচ তৌসিফের তর সইছে না৷ মনে হচ্ছে হাসপাতালে নিতে হবে। এভাবে বাড়ীতে হচ্ছে না। এখনও চোখ খুলছে না পৌষ। এতক্ষণে খোলার কথা ছিলো না? ছিলো তো। ঘড়ির কাটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে টানা মিনিট পনেরো অতিক্রম হয়েছে। তৌসিফের তোতাপাখি চোখ খুলে নি। অস্থির, দমবন্ধ লাগছে তৌসিফের। এমন জ্বালায় জ্বলিত সে যা কাউকে চোখে দেখানো যাবে না। শুধু ধুঁকে যাবে তৌসিফ। এই পৌষরাতের প্রেম তাকে গলা টিপে মেরে ফেলবে। বিষাক্ত অনুভূতির চাপে পিষ্ট তৌসিফ। চোখ দুটো ক্রমশ লাল হচ্ছে। হাতের মুঠোয় থাকা পৌষের মলিন হাতটা আরেকটু চেপে ধরতেই কানে ঠেকলো ডাক্তারের কথা,

“আমি ব্লাড স্যাম্পল নিয়ে যাচ্ছি। ল্যাবে পাঠিয়ে দিব। রিপোর্ট সকাল নাগাদ পেয়ে যাবে।”
“চোখ খুলছে না কেন?”
“খুলবে। দূর্বল মনে হচ্ছে।”
“সেটা জানা আছে আমার। চোখ খুলানোর ব্যাবস্থা করুন নাকি হাসপাতালে নিব।”
“আপাতত প্রয়োজন দেখছি না। বাসায় থাকুক, রিপোর্ট ছাড়া হাসপাতালে নিয়ে লাভ নেই। উঠে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যে। জোর করে হলেও খায়িয়ে দিও কিছু।”
ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন৷ অতি নিকটজন সে। সম্পর্কে তৌসিফের মামা হন। দূর সম্পর্কের মামা। চেম্বার বাজারেই। ডাক দিতেই চলে এসেছেন। তৌসিফ ভাবলো উনি যেতেই পৌষকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে। এভাবে জ্ঞানহীন পৌষের সাথে এক ঘরে থাকা তৌসিফের পক্ষে সম্ভব না৷ কেমন বিদঘুটে অনুভূতি হচ্ছে তার। তৌসিফের অবশ্য হাসপাতালে নিতে হলো না। তার আগেই চোখ খুললো পৌষ। কপাল কুঁচকে তাকালো এদিক ওদিক। ডাক্তার ওর চোখ দুটো ভালো মতো পরীক্ষা করে একটু চিন্তিত হলেন। প্রেসক্রিপশনে নতুন আরেকটা ঔষধ লিখে তৌসিফের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,

“ঔষধ আনিয়ে খায়িয়ে দাও এখনই।”
ডাক্তার বিদায় নিতে না নিতেই পৌষ মুখ খুললো৷ ভীষণ বিরক্ত হয়ে বললো,
“দুটো মিনিট হয় নি ওমনি ডাক্তার ডাকতে হলো কেন? না করি নি আমি?”
কথাটা বলেই তাকালো তৌসিফের দিকে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তৌসিফ। পৌষ তারাতাড়ি উঠার চেষ্টা করলো। শরীর ব্যথা করছে তার। নিজের সবটুকু শক্তি ব্যায় করে উঠেই তৌসিফকে জড়িয়ে ধরলো। পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে চঞ্চল কণ্ঠে বললো,
“অ্যঁই মামাতো ভাই অ্যঁই, কিছু হয় নি তো।”
তৌসিফ না কথা বললো আর নাই জড়িয়ে ধরলো। পৌষ নিজের বুকের মাঝে আরেকটু আঁকড়ে ধরতে চাইলো। বোঝানোর চেষ্টা করলো ও সুস্থ আছে৷ তৌসিফের নিরুত্তাপ ভাব ওকে পোড়ালো। খুব করে জ্বালালো। মুখ চোখ সরু করে চটপট করে বললো,

“এদকম মুখ বানিয়ে রাখবেন না বলে দিলাম৷ এমনিতেই ভালো লাগছে না৷ বউয়ের সেবা না করে ভঙ দেখাচ্ছেন আমাকে? আপনার ভেলকিবাজি বুঝি না আমি?”
তৌসিফ মুখটা ঠেকালো পৌষের কাঁধের কাছে ঘাড়ে। গরম ক্ষুদ্র নিঃশ্বাসের আভাস পেলো পৌষ। মুখ বাড়িয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো শক্ত মানুষটার নরম গালে। তৌসিফ জড়িয়ে ধরলো পৌষের চিকন কায়া। পৌষের দেহটা কাঁপলো সামান্য। ছোট্ট করে শোনা গেলো,
“আমি ভয় পেয়েছিলাম।”
“বুঝতে পেরেছি আমি। কই দেখি মুখটা। এমন সুলতানি মুখটা চুসে রাখা আমের মতো করে রাখলে কেমন দেখায় হ্যাঁ?”
তৌসিফ মুখটা ঘষলো ঘাড়ে। পৌষ গুটিয়ে গেলো খুব সামান্য। তৌসিফ ওভাবে থেকেই শুধালো,

“আমাকে এভাবে ভয় পায়িয়ো না পৌষরাত। আ’ম নট রেডি ফর অল দিস।”
পৌষ তৌসিফের চুলে হাত দিলো। তাকে শান্ত করার চেষ্টা চালালো। তৌসিফ শান্ত হলো বটে৷ পৌষকে খানিকটা সময় বুকে জড়িয়ে রেখে বললো,
“খাবে এখন৷ ডাক্তার ঔষধ দিয়েছে।”
“শরীর ব্যথা হচ্ছে।”
“আমি টিপে দিব৷ এখন খাবে।”
ওকে রেখে তৌসিফ উঠে গেলো। পৌষ শুয়ে রইলো বিছানায়। মাথাটা ঘুরাচ্ছে এখনও। তৌসিফ শুনলেই চিন্তা করবে। লোকটার মুখ চোখ শুকিয়ে একটুখানি হয়ে আছে। তাকানো যাচ্ছে না।
তৌসিফ ফিরলো মিনিটের ব্যাবধানে। এসেই পৌষকে তুললো। মুখে পানি দিতে বাথরুমে নিয়ে যেতেই দেখলো পৌষ একা হাঁটতে পারছে না। পড়ে যাবে যাবে ভাব। দুই হাতে তৌসিফকে ধরে হাঁটছে। তৌসিফ চিন্তিত মুখে জিজ্ঞাসা করলো,

“মাথা ঘুরছে এখনও?”
“একটু।”
বুয়া খাবার দিয়ে যেতেই তৌসিফ আজ মুখে তুলে খাওয়ালো। পৌষ মাছ খাবে না। মুরগির ঝাল হওয়া ঝোল দিয়ে সামান্য খেলো। তৌসিফের খেতে মন চাইলো না। চিন্তায় যেন ওর আয়ু ফুরাচ্ছে। পৌষের চাপে সামান্য খেয়েই বুয়া ডেকে পরিষ্কার করালো সব। ঔষধের প্যাকেট নিয়ে রনি দিয়ে গেলো মাত্রই। তৌসিফ দেখে দেখে খাওয়ালো। পৌষ একদম নীরবে খেয়েছে। ঝামেলা করে নি। চিরুনী হাতে সুন্দর করে তৌসিফ আঁচড়ে দিলো ওর মাথা৷ বেণীটা গেঁথে আলতো হাতে পৌষের গাল ছুঁয়ে দিলো তৌসিফ। বিনিময়ে হাসলো পৌষ। তৌসিফ নিজের মাথাটা এলিয়ে দিলো পৌষের কোলে৷ হেডবোর্ডে হেলান দেওয়া পৌষ ওর মাথায় হাত বুলালো। চোখ বুজে আছে তৌসিফ। হঠাৎই, একদম হঠাৎই তৌসিফ তড়াক করে চোখ খুললো। পৌষকে অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন করে বসলো,
“তুমি কি প্রেগন্যান্ট পৌষরাত?”
হঠাৎ প্রশ্নে পৌষ কিছুটা থমকে গেলো৷ বোকামুখে তাকিয়ে রইলো৷ কিছুপল অতিক্রম হতেই নিজেকে ধাতস্থ করে ঋণাত্মক উত্তরে বললো,

“না তো।”
তৌসিফ লাফিয়ে উঠলো। পৌষ দেখলো চকচক করা মুখটা। ভীষণ আগ্রহ নিয়ে তৌসিফ বললো,
“হতেও পারো।”
“হবে না।”
“বেশি জানো তুমি? আমি জানি না?”
ঠোঁট উল্টায় পৌষ। তৌসিফ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে তাকালো পৌষের পেটের দিকে৷ পৌষের অবাকতা দুইধাপ বাড়িয়ে তৌসিফ হঠাৎ ওর জামা টেনে ধরলো। পৌষ বিরক্ত হলো। মুখে উচ্চারণ করলো,
“কি?”
“পেটটা দেখি। দেখাও তো।”
কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তৌসিফ ওর পরণে থাকা কুর্তি তুললো। নিটোল পেটটায় ডান হাত রেখে চোখ বুজে কিছু বুঝতে চাইলো। তৌসিফের ভণ্ডামি দেখে এবারে পৌষ বিরক্ত হলো। এমনিতেই শরীর ভালো লাগছে না তার। হাতটা ঠেলে সরিয়ে পেট ঢেকে শুতে শুতে পৌষ বললো,

“আপনার পেট চেক করুন।”
“আশ্চর্য! আমার পেটে আছে নাকি?”
“আমার পেটেও নাই। ফালতু লোক।”
“স্বামীকে এসব বলো তুমি।”
“অ-স্বামী আপনি।”
তৌসিফ গটগট পায়ে কোথায় জানি বেড়িয়ে গেলো। মন খারাপ করে শুয়ে রইলো পৌষ। একবার পেটে টোকা দিলো। বিরবির করে বললো,
“আমার খালি পেট। ব্যাটা হুদাই লাফাচ্ছে।”
চোখটা মাত্রই লেগেছিলো ওমনিই তৌসিফ এসে তুললো ওকে। গোলাপি রঙের প্যাকেট দেখে পৌষের বুঝতে বাকি রইলো না কিছু। তৌসিফ বেশ আগ্রহ নিয়ে শুধালো,

“প্লিজ না হানি, জাস্ট ডু ইট ফর মি।”
তৌসিফের আগ্রহ দেখে পৌষ আর না করলো না৷ উঠে গেলো। এদিকে তৌসিফ এসির ঘরে ঘামছে সামান্য। ভীষণ উত্তেজিত সে। মাথাটা এখন বরং তৌসিফের ঘুরছে। দরজায় দুটো টোকা দিতেই পৌষ দরজা খুলে স্ট্রিপ এগিয়ে দিলো। জ্বলজ্বল করা মুখটা নিমিষেই নিভলো। দায়সারা ভাবে পৌষ বললো,
“আগেই বলেছিলাম। বেশি বুঝে ব্যাটা।”
পৌষ যেতে নিলেই আটকালো তৌসিফ। মুঠোয় থাকা দুটো স্ট্রিপ দেখিয়ে বললো,
“এটা তো ফলস রেজাল্ট হতে পারে হানি। ট্রাই এগেইন না তোতাপাখি।”
“একদমই না।”
“প্লিজ।”
“না।”
“লাস্ট টাইম।”

বাধ্য হয়ে গেলো পৌষ। রাগে গজগজ করতে করতে স্ট্রিপ ছুঁড়ে দিলো তৌসিফের দিকে। কিছু ধরার বা বলার আগেই পৌষ বমি শুরু করলো। তৌসিফ হকচকালো। তারাতাড়ি বউকে ধরলো। পৌষ রাগে ফুঁসছে। ছাড়াতে ছাড়াতে বলছে,
“অসভ্য লোক, ছাড়ুন আমাকে। যত্তসব আজাইরা কাজকারবার।”
“আমি স্যরি হানি।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬১

মুখে পানি দিতে দিতে বললো তৌসিফ। পৌষ ভিজে গিয়েছে ততক্ষণে। রাগে হিসহিসিয়ে বললো,
” আপনার এই কুত্তামার্কা ডাক গিয়ে অন্য কাউকে ডাকুন। আমার শরীর ভালো না, উনি বাচ্চা পয়দা করে।”
বলতে বলতে পৌষ কেঁদে ফেললো অথচ তৌসিফ জানে পৌষ কাঁদে না৷ কখনো কাঁদে না। সেই যে একবার কাঁদলো তৌসিফ গু লি খাওয়াতে আর তো কাঁদে নি৷ আজ কি হলো হঠাৎ?

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬৩