প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬১
সাইয়্যারা খান
বেশ সময় লাগিয়ে ধরণীর বুকে আগমন হলো হেমন্তের রাজপুত্রের৷ চোখ মুখ একদম মা-বাবার মিশেল৷ নাকটা শুধু তার ফুপির পেয়েছে৷ হেমন্ত না থাকায় সবার আগে পৌষ কোলে নিলো। বড় চাচি বা সেজ চাচি কেউ কিছু বলে নি৷ বলার অবশ্য সাহসই পান নি তারা৷ তৌসিফ পৌষের থেকে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখলো। বেশ সুন্দর একখানা ফুটফুটে বাচ্চা। করিডোর দিয়ে দৌড়ে এদিকে আসছে হেমন্ত। জৈষ্ঠ্য গিয়ে খবর দিয়েছে তাকে। তৌসিফ হাসিমুখে অবিন্যস্ত হেমন্তের কোলে তুলে দিলো তার রাজপুত্রকে। হেমন্ত ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো। নাক টেনে পৌষকে জিজ্ঞেস করলো,
“শ্রেয়া?”
“ঠিক আছে একদম। অ্যঁই হেমু ভাই, নাকটা আমার মতো না?”
হেমন্ত হাসলো। কানে কানে আজান দিলো। পৌষের কাছে এগিয়ে এসে বললো,
“নিয়েছিস? নে আগে।”
“সবার আগে নিয়েছি। বাকি কেউ নেয় নি।”
হেমন্ত তেমন কিছু বলে না৷ নিজের মায়ের কাছে আগ বাড়িয়ে পর্যন্ত যায় না৷ তার মা তো হেমন্তের প্রথম সন্তানটাকে আগলে রাখে নি বরং নিষ্ঠুরতম আচরণ করেছে। কেন দিবে নিজের দ্বিতীয় সন্তানকে হেমন্ত? একদমই দিবে না সে। শশুর শাশুড়ীর কাছে সুন্দর মতো বুঝিয়ে দিলো হেমন্ত। কিছুটা তারা জানে বটে তাই তো পৌষকে নিয়ে টু শব্দ করে নি।
বড় চাচা দাঁড়িয়ে থাকলেন না৷ এগিয়ে এসে কোলে নিতে চাইলেন৷ হেমন্ত না করে না৷ তুলে দেয় তার ছোট্ট জানকে৷ পা বাড়িয়ে এগিয়ে যায় স্ত্রীর কাছে। চোখের দেখাটা না দেখলে যে এই পুরুষমনটা শান্তি পাচ্ছে না। একদমই পাচ্ছে না।
ক্লান্ত শ্রেয়ার মুখ জুড়ে মায়া মায়া ভাব। হেমন্ত এগিয়ে এসে পাশে বসে৷ কপালে হাত রাখে। চুলের ভাজে আঙুল বুলিয়ে দিতে দিতে ডাকে,
“শ্রেয়ু?”
উত্তর আসে না৷ গভীর ঘুমে শ্রেয়া। স্ত্রীর কপালে নরম, আদুরে চুম্বন করে হেমন্ত। গাল দুটোয় আদর করে পুণরায় ডাকে। শ্রেয়া চোখ পিটপিট করে। খুলে সামান্য। হেমন্ত আলতো হাসে। কপালে কপাল রেখে বলে,
“এত সুন্দর উপহার দিলে শ্রেয়ু? কই রাখব একে? বুকের ভেতর নাকি কলিজার ভেতর?”
“কোথায় সে?”
“সবার সাথে পরিচিত হচ্ছে। আমাকে চিনেছে।”
“চিনেছে?”
“হ্যাঁ। কোলে তুললাম। টুকুর টুকুর করে চেয়ে দেখলো আমাকে। চোখ দুটোয় কি যে মায়া শ্রেয়ু। নাকটা পৌষের মতো।”
“আমি দেখেছি।”
“নাম রাখবে না? ভেবেছো তুমি?”
“নামটা পৌষ রাখুক।”
“আমি বলে দেখব৷ রাজি হবে না আমি জানি৷ তুমি মা না? তুমি রেখো।”
“আচ্ছা।”
কিয়ংকাল চুপ থেকে হেমন্ত গলায় দরদ মিশিয়ে ডেকে উঠলো,
“শ্রেয়ু?”
“হ্যাঁ।”
হেমন্ত কথা বলে না৷ ঝুঁকে জড়িয়ে ধরে। গলায় মুখ গুঁজে কেঁদে ওঠে। শ্রেয়া ওর চুলগুলো আঁকড়ে ধরে। সান্ত্বনা দেয়। মানে না হেমন্ত। তার কষ্ট হচ্ছিলো। ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো। হেমন্তটা নরম শ্রেয়া জানে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করতে করতে বলে,
“এমন করে কাঁদে না হেমন্ত। লোকে কি বলবে?”
“আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিলো শ্রেয়ু। তুমি ওভাবে কাঁদছিলে। আমার মাথা কাজ করছিলো না৷ এখানে এসেও কিছু করতে পারি নি। সব তৌসিফ ভাই করেছে।”
শ্রেয়া শুনে অথচ সে জানে পাগলপ্রায় ছিলো হেমন্ত। নার্স সহ ডাক্তার তাকে জানালো তো।
তৌসিফ আর পৌষ হাসপাতাল থেকে বিদায় নিয়েছে একটু আগে। পৌষ ফিরতে চায় নি কিন্তু তৌসিফকে না করতে পারে নি। তৌসিফ অবশ্য জোর করে নি। পৌষ নিজ থেকেই তৌসিফের অসুস্থতা নিয়ে বিচলিত ছিলো৷ কয়েকবার বলেছিলো বাসায় ফিরে যেতে। অবশ্য ওকে একা বাসায় ফিরতে বললেও মনে মনে শান্তি পেতো না পৌষ। এতটা মাসের সংসার, কেন জানি মনে হয় তৌসিফ একা কিছু পারবে না। তার শার্টটা খোলা থেকে পানি এগিয়ে মুখের সামনে ধরা এতোদিনের সংসারে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ কাউকে কিছু না বলেই কাজগুলো হয়ে থাকে। তৌসিফ অবশ্য পৌষকে অনুভূতি গুলো অনুভব করতে বাধ্য করেছে। তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে পৌষ ছাড়া সে অচল। মুখে কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করলেও পৌষ কৃতজ্ঞ। এই এক জীবনে খুব বড় পাওয়া এই তৌসিফ।
বেসিনের নিচে মাথা দিয়ে একাধারে পানি দিচ্ছে পৌষ। মাথাটা গোল গোল ঘুরে তার দুই দিন ধরে। অবস্থা বেগতিক। এসেছে পরই বোরকা খুলে বাথরুমে ঢুকেছে। মুখ চোখ গর্তে ঢুকেছে যেন। আধ ঘন্টা যাবত বাথরুমে ঢুকে আছে ও। মাথাটা তুলতেই এলোমেলো ভেজা চুল মুখে ছড়িয়ে গেলো। আয়নায় নিজেকে দেখে পৌষের মুখ ছোট হয়ে গেলো৷ তৌসিফ মানুষটাই তেমন সুন্দর পাগল। তারমধ্যে পৌষটা কেমন অগোছালো। নিজের যত্ন নিতে না শেখা একটা মানুষ। আজকে মুখ চোখ আরো ভেতরে ঢুকে আছে। মুখে পানি দিতে গিয়ে পৌষ দেখলো জানার সামনের দিকে অনেকখানি ভিজে গিয়েছে। দরজা না খুলেই একবার ডাকলো,
“শুনছেন? আপনি কি রুমে?”
ডেকেই দরজা খুলে পৌষ। সম্মুখে দাঁড়িয়ে তৌসিফ। হাতে পৌষের কাপড়। পৌষ খানিকটা অবাক হয়। এই লোক ওকে এতটা চিনে কিভাবে? শুধু মাত্র বউ বলে নাকি গভীর ভালোবাসা বলে? তৌসিফ কাপড় দিতে দিতে প্রশ্ন করে,
“কি হয়েছে?”
পৌষ কাপড় হাতে তুলে উত্তর দিলো,
“কিছুই না। ভিজে গিয়েছি।”
“আমি সাথে আসি?”
“ঢংগের তো শেষ নেই যে এখন উনি আসবেন। সরুন।”
দরজাটা খট করে লাগিয়ে পৌষ পোশাক বদলে মুখে পানির ঝাপ্টা দিলো। নরম তয়লাটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসতেই তৌসিফ ধরলো। তয়লা দিয়ে মুখটা চেপে চেপে মুছতে মুছতে খুব গভীর দৃষ্টিতে দেখলো পৌষকে৷ পৌষও তাকিয়ে রইলো তবে বেশিক্ষণ না। তৌসিফের সাথে হাজার তিড়িংবিড়িং করলেও চোখে চোখ রাখতে অক্ষম পৌষ। মাথাটা ভেজা দেখে খোপা খুললো তৌসিফ। এত বড় চুল অথচ বিশাল অযত্নে রাখে মেয়েটা। চুল গুলো তৌসিফের পছন্দের। তার মায়ের চুল এমন ছিলো। তালুটা সুন্দর করে মুছতে মুছতে তৌসিফ বললো,
“শরীর খারাপ লাগে?”
“আরে নাহ্..”
দরজায় শব্দ হতেই পৌষ তৌসিফের পেছন থেকে নিজের ওরনা নিয়ে গায়ে জড়ালো। মিনু এসেছে। হাতে দুটো গ্লাস। পৌষ গদগদকণ্ঠে মিনুর থেকে গ্লাস নিয়ে বললো,
“মিনুসোনা, অনেক দোয়া দিলাম তোকে। লেবু খেতে মন চাইছিলো।”
মিনু আরেক গ্লাস তৌসিফের হাতে দিয়ে বললো,
“মামা বললো আনতে।”
পৌষ ঢকঢক করে শেষ করে নিজেরটুকু। তৌসিফ দুই চুমুক খেয়ে পৌষকে সাধতেই পৌষ নিলো। দুই ঢোক গিলে তৌসিফকে ফেরত দিয়ে ভেজা তয়লা বাথরুমে রেখে এসে চুল ঝাড়লো। মিনু যেতেই তৌসিফ দরজা আটকে আসে। পৌষের হাত ধরে একদম নিজের মুখ বরাবর বসায়। কপালে, গালে, গলায় হাত দিয়ে পরখ করে দেখে। সন্দিহান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“কিছু হয়েছে?”
“না তো।”
“শরীর খারাপ?”
“কয়েকদিন ধরে ভালো লাগছে না।”
“কেমন লাগছে?”
“ভালো না ততটা। মাথা লাড্ডুর মতো ঘুরে।”
“বলেছো আমাকে? একটাবার বলেছো পৌষরাত? তোমার মুখ দেখে কেন বুঝতে হয় আমার? চোখ দু’টোর এমন অবস্থা কেন? শান্তি নেই তোমার? সারাদিন এদিক ওদিক টইটই।”
একগাদা বকবক করে তৌসিফ ফোন হাতে তুললো। পৌষ ওর শার্ট টেনে ধরে পাশ থেকে। তৌসিফ দাম দিলো না৷ এবারে পৌষ আস্তে করে হাতটা বুকের দিকে নিলো। নিজেও মাথা দিয়ে গুতাগুতি করে ঢুকলো সেখানে। দুই হাতে গলা জড়িয়ে ধরতেই কপাল কুঁচকে তাকায় তৌসিফ। এক হাত মাথায় রেখে ভেজা চুল নেড়ে দেয়। ফোনটা রেখে আরেকটু জড়িয়ে ধরে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে,
“কি হয়েছে তোতাপাখি? খারাপ লাগছে?”
“ডাক্তার লাগবে না।”
“মার খাবে আমার হাতে তুমি। কি অবস্থা করেছো নিজের।”
“খুব খারাপ দেখায় আমাকে?”
কপালের ভাজ দ্বিগুন হলো তৌসিফের। পৌষ বুকে থেকেই বললো,
“আপনি কত সুন্দর অথচ আমি?”
“তুমি কি?”
“অসুন্দর, অগোছালো, বাঁচাল আর ঘাড়ত্যাড়া একটা মেয়ে।”
“মানো তবে?”
“হুঁ।”
“পৌষরাত? পৌষরাত?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৬০
তৌসিফ ডাকলো কয়েকবার কিন্তু তোতাপাখি উত্তরে কিছু বললো না। বুকের থেকে ওর মুখ তুলেও কয়েকবার ডাকলো। যখন দেখলো পৌষ নড়ে না তখনই তৌসিফের বুক কামড়ে উঠলো। মাথাটা খারাপ হলো। হঠাৎ কি হলো? তার তোতাপাখি কেন কথা বলে না?
