মাটির পিঞ্জর পর্ব ২১
নূরায়েশা মাহনূর
আকাশের বিস্তীর্ণ গম্বুজে স্থির চোখে দাঁড়িয়ে আছে ইশিতা। গোধূলির আভা অনেক আগেই গলে নেমেছে; দিনভর বৃষ্টির অশ্রুস্নানের পর ধৌত আকাশ আজ স্বচ্ছ কাচের মতো। সাদা রুপালি থালার মতো পূর্ণচন্দ্র তার রাজ্য বিস্তার করেছে, চারদিক জুড়ে অসংখ্য নক্ষত্রের ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু নিভু নিভু দীপ্তিতে দুলছে। নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইশিতা , বুকের ভেতর ভারী বিষণ্ণতার স্তূপ।
দুপুরে দৃষ্টির জিনিসপত্র গুছাতে গিয়ে হঠাৎ পেয়ে যায় এক পুরোনো ডায়েরি । প্রথমে স্বাভাবিক ভদ্রতায় সেটি সরিয়ে রেখেছিলো, কিন্তু কৌতূহলের অগ্নিশিখা শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রাস করে ফেলে। অবশেষে আঙুলে কাঁপুনি নিয়ে মলাট উন্মোচন করেছিলো সে।
পাতার পর পাতা জুড়ে সেখানে নিঃসীম বিষাদের ঢেউ, শব্দের পর শব্দে জমাট বেদনার নিবিড় অরণ্য। পড়তে পড়তে বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে যায় ইশিতা। এত দুঃখ, এত আঘাত, অথচ দৃষ্টি সবটা আড়াল করে রেখেছে। কেউ চোখের পলকেই টের পাবে না, এই হাসিমাখা মেয়েটির অন্তরে এতো অন্ধকার বহমান।
– একা একা দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? করছিস কি?
পরিচিত স্বরের ঝাঁঝে বিন্দুমাত্র নড়ে উঠলো না ইশিতা। যে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলো, সেই ভঙ্গিতেই স্থির।উজানের কপালে গাঢ় ভাঁজ নেমে এলো। ধীরপায়ে এগিয়ে এসে সে কাঁধসমান সমান্তরাল হলো। কৌতূহলী চোখে প্রথমে আকাশ, তারপর তাকে দেখে নিলো।
– কি এমন মন গেঁথে তাকিয়ে আছিস? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
– সেদিন… দৃষ্টি আপুকে বিয়ে করলে না কেনো, উজান ভাই?
উজানের দিকে চোখ না তুলেই কথাটা ছুড়ে দিলো ইশিতা। পদক্ষেপ থেমে গেলো উজানের। আসার পর থেকে এ প্রশ্নের মুখোমুখি এখনো তাকে হতে হয়নি। আচমকাই ইশিতার থেকে কেনো এমন প্রশ্ন ? সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো উজান । এবার ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো ইশিতা, চোখের গভীরে জমাট অভিযোগের ছায়া।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– উচিত হয়নি তোমার, আপুকে এভাবে ফেলে রেখে চলে যাওয়া। একেবারেই ঠিক করোনি।
উজানের কণ্ঠে বিস্ময়ের স্রোত,
– তুই হঠাৎ এই কথা বলছিস কেনো?
কঠিন স্বরে উত্তর এলো,
– কারণ আমি আপুর ডায়েরি পড়েছি। সব জেনে ফেলেছি আমি। আপুর নিজের বাড়ি থেকে দূরে একা থাকা, সেদিন তুমি তাকে ফেলে চলে যাওয়া, বিয়ের পরও সাইফ ভাইয়ের সঙ্গে তার সেই এক ছাদের নিচে না থাকা সবটাই জানি এখন আমি।
উজানের পা হঠাৎ জমাট হয়ে গেলো। দৃষ্টির ডায়েরি? গলার স্বর খানিক গড়িয়ে তড়িঘড়ি করে উচ্চারিত হলো,
– ডায়েরিটা… আছে এখন তোর কাছে? আমাকে দে, একবার।
ইশিতা নির্বিকার,
– নেই। পাঠিয়ে দিয়েছি। ইমন ভাই এসে নিয়ে গেছে।
– শিট!
ঠোঁটের কোণে ফিসফিসিয়ে গালি ঝরে পড়লো। ইশিতা তার মুখের দিকে সোজা তাকিয়ে নিঃকণ্ঠ প্রশ্ন ছুড়ে দিলো,
– কেনো, এত দরকার তোমার?
– না… এমনি, একবার দেখতে চেয়েছিলাম।
– আচ্ছা উজান ভাই, তুমি কখনো সত্যিকারের প্রেমে পড়েছো? জানো, প্রেমে পড়ার অনুভূতি কেমন হয়?
প্রেম! প্রেমে পড়ার অনুভূতি! শব্দগুলো কানে ঢুকেই শূন্যে ঝুলে রইলো। কোনো সংজ্ঞা মিললো না মাথায়। কেবল একটানা চেয়ে রইলো উজান। ইশিতা চোখ না তুলে নিঃস্পৃহ স্বরে বলে উঠলো,
– জানো না, তাই তো? জানার কথাও না। কারণ তুমি কোনোদিন প্রেম নামের জিনিসটায় পৌঁছাতে পারোনি। বারবার কেবল মোহে আটকে গেছো তুমি। প্রেমের আসল স্পর্শ এখনো তোমার কাছে আসেনি।
উজানের ভেতরটা কেমন ধাক্কা খেলো। গলার স্বর খানিক ভারী,
– তুই কি একটু বেশিই বড়দের মতো কথা বলছিস না, ইশিতা?
এবার চোখ তুলে গভীরভাবে উজানের দিকে তাকালো ইশিতা। চাহনি ধারালো কাঁচের মতো, উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবারে মেপে নিলো উজানকে । কালো ট্রাউজারের সঙ্গে সাদা টি-শার্ট, এলোমেলো চুলের গোছা কপালের উপর আছড়ে পড়েছে, আর গলার ফাঁকে শক্ত মাংসপেশীর রেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে আছে। চোখদুটোতে অদ্ভুত এক দীপ্তি, চকচকে, অগোছালো।
এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তির ছায়া নেমে এলো উজানের মুখে। এই মেয়েটার দৃষ্টি বোঝাই যাচ্ছে না, ভেতরে কি খুঁজছে সে কে জানে । হঠাৎ নীরবতা চিরে স্পষ্ট কণ্ঠে বললো ইশিতা,
– প্রেম তোমার জীবনেও আসবে, উজান ভাই।এমনভাবে নামবে মনে হবে আকাশ ছুঁয়ে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘের ভেতর থেকে উঁকি দেবে যত্নে গড়া হাজারো স্বপ্ন। তখন তুমি আর তাকে আপুর মতো ফেলে যেতে পারবে না। একা করে দেওয়ার সাহস পাবে না। সারাজীবন বুকের ভেতর আগলে রাখার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যাবে। তখনই বুঝবে প্রেম কাকে বলে, ভালোবাসা মানে কি।
কথাগুলো বলেই কাঁধের ওড়নাটা ঠিক করে ধীরপায়ে চলে গেলো ইশিতা। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো উজান। এই ছোট্ট মেয়েটাই এখন প্রেমের ব্যাখ্যা শোনাচ্ছে তাকে! হেসে উড়িয়ে দিতে চাইলেও কোথায় যেন আটকে গেলো হাসিটা। অদ্ভুতভাবে মনের এক কোণে গাঢ় হয়ে বসে রইলো সেই কথা। আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষমেশ উজানও ধীরে ধীরে চলে গেলো।
ইমন আর নীলিমা ইতিমধ্যেই বাড়ির কোণায় কোণায় খুঁজে ফেলেছে, দৃষ্টির কোনো হদিস নেই। সাইফ একপাশে দাঁড়িয়ে গাঢ় মনোযোগে ভাবছে, রাতের বেলা কোথায় যেতে পারে দৃষ্টি? আসার পর থেকে তো স্বাভাবিক ভাবেই ছিলো সে, কোনো অস্থিরতার আভাস ছিলো না।
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো সাইফ। পরমুহূর্তেই হঠাৎ স্মৃতির আলতো দরজা খুলে গেলো মস্তিষ্কে, চোখে এক ঝলক জ্বলে উঠলো। ঠোঁটের কোণে অনিয়ন্ত্রিত এক হাসি ছড়িয়ে পড়লো। হালকা শ্বাস ছেড়ে শরীরের অজানা ভার নামিয়ে নিলো সে। ইমন আর নীলিমার ব্যাকুলতা থামিয়ে শান্ত স্বরে সান্ত্বনা দিলো তাদের।
আপনমনে তাকের পর তাক স্পর্শ করে চোখ বুলিয়ে চলেছে দৃষ্টি। কতদিন পর এই ঘরে ফিরলো সে! সবকিছু ঠিক আগের মতোই টিপটপ করে সাজানো, কোথাও একচিলতে ধুলোর দাগও নেই। মনে হয়, কেউ যত্নে পরিস্কার করে রেখেছে এই ছোট্ট লাইব্রেরীটাকে।
ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে এল ছোট টেবিলটার কাছে।টেবিলের উপর ছোট ছোট কাগজ আর কলমের ভিড়। তাদের মাঝেই মাঝারি আকারের একখানা ফ্রেম, তিনটি হাস্যোজ্জ্বল মুখ বন্দি হয়ে আছে সেখানে।
সঙ্কোচভরা আঙুল বাড়িয়ে নিলো দৃষ্টি ফ্রেমটা। কাঁপতে থাকা আঙুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দিলো ছবিটাকে। তারপর হঠাৎ বুকের ভেতরের সব বাঁধ একসাথে ভেঙে গেলো। ছবিটাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে হু-হু করে কান্নায় ভেঙে পড়লো সে, ঘর ভরে উঠলো বুকভাঙা ডুকরে ওঠার শব্দে।
– বাবা… মা… কেনো আমাকে একা করে চলে গেলে বলো তো? আমার যে একেবারেই কেউ নেই। আমি যে ফাঁকা। কিভাবে পারলে আমায় একা ফেলে যেতে? কেনো সেদিন তোমাদের সাথে আমাকেও নিয়ে গেলে না? কেনো… কেনো?
কথাগুলো গড়িয়ে আসতেই বুক ভেঙে এলোমেলো হয়ে কান্নায় ডুবে গেলো দৃষ্টি। ডুকরে ওঠার শব্দে কেঁপে উঠলো ঘরের শ্বাস। শরীর কাঁপিয়ে টেবিলটার সঙ্গে হেলান দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো সে।
পাশের দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলো দৃষ্টি। পুরোনো ইজিচেয়ারের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতর ধক করে উঠলো কিছু। মনে হলো এইমাত্র তার বাবা সেখানে হেলান দিয়ে বসে বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে আছে।
কাঁপা পায়ে এগিয়ে গেলো ছোট্ট আলমারিটার কাছে। হাত বাড়িয়ে খুলে নিলো। ভেতর থেকে তুলে আনলো একখানা পুরোনো রুমাল। রুমালটা বুকের কাছে তুলে নাক টেনে নিলো গন্ধ। বাবার গায়ের গন্ধ এখনো সেখানে লেগে আছে ।
হঠাৎ সারা শরীর কাঁপিয়ে ফেটে পড়লো সে। বুক ফেটে চিৎকার করে কান্না এল তার মুখ থেকে। গড়িয়ে পড়লো অঝোর জল। মনে হলো বুকের ভিতর কোনো পাহাড় ভেঙে সমুদ্র উথলে পড়েছে। যে জানোয়ারেরা তার বাবা-মাকে অমানবিকভাবে ছিঁড়ে ফেলেছিলো, সেই নিষ্ঠুরতার কথা মনে পড়তেই দৃষ্টি আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সাইফ। চোখের সামনে ভেঙে পড়া দৃষ্টির দৃশ্য দেখে বুকভরা দীর্ঘ নিশ্বাস গিলে নিলো সে। কিভাবে সামলাবে এই মেয়েটার বেদনা, কোনো ভাষাই খুঁজে পেলো না মন।ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আলতো করে হাত রাখলো দৃষ্টির ঘাড়ে। কিন্তু পরমুহূর্তেই বিদ্যুতের ঝটকায় হাত সরিয়ে দিলো দৃষ্টি। চোখে তীব্র ক্ষোভের আগুন।
– খবরদার! আমাকে একটুও ছুঁবেন না! আপনাদের কারণেই আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে এমনটা হয়েছে। সেদিন… সেদিন যদি এই বাড়ি থেকে আমাদের তাড়িয়ে না দিতেন, তাহলে কিছুই হতো না। বুঝেছেন আপনি? বুঝতে পেরেছেন? আমি আপনাদের ঘৃণা করি সবাইকে ঘৃণা করি, সবাইকে!
– আমার কথাটা…
সাইফ হাত বাড়িয়ে আবারও তাকে ধরতে চাইলো। কিন্তু দৃষ্টি পিছিয়ে গেলো, এড়িয়ে গেল তার স্পর্শ। কয়েক কদম দূরে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।কান্নার ভাঙা গলায় আকাশ ফাটিয়ে উঠে এলো আর্তনাদ,
– আমার মা-বাবাকে ফিরিয়ে দেন, শেখ সাহেব!ফিরিয়ে দেন না তাদের! দয়া করে একবার… একবার নিয়ে আসুন তাদের। আমার কাছে ফিরিয়ে দিন…
বলে যেতে যেতে হঠাৎ ঢলে পড়লো দৃষ্টি। সাইফের হাত ঝাঁপিয়ে উঠলো, দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে নিলো তাকে। বেহুঁশ দেহটাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই আবারও অচেতনতার ঘোরে তলিয়ে গেলো দৃষ্টি।
তীব্র দাবদাহে জ্বলছে দৃষ্টির শরীর। দিনভর ভিজে থাকা ভেজা কাপড়ের শীতলতা হারিয়ে গিয়ে এখন পুরো দেহ আগুনের আঁচে পুড়ছে। জ্বরের ঘোরে সেই কখন থেকে অসংলগ্ন আবোল-তাবোল কথা বকে যাচ্ছে সে। নীলিমার হাত থেমে নেই একটার পর একটা ভেজা কাপড় কপালে চেপে যাচ্ছে, জলপট্টি বদলে দিচ্ছে, কিন্তু জ্বর কমার কোনো লক্ষণ নেই।
সাইফ বেরিয়ে গিয়েছিলো কাজে, ফিরতে দেরি হবে বলেই জানিয়েছিলো। কিন্তু এত রাত অবধি ফিরবে না, তা ভাবেনি নীলিমা। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ঘরভর্তি নীরবতা ভেঙে জানান দিচ্ছে রাত ২:২১।
– আমার মা… বাবাকে…
ফিসফিসে স্বর ভেসে এলো দৃষ্টির ঠোঁট থেকে। নীলিমা কান পাতলো, মাথা ঝুঁকিয়ে ধরলো তার মুখের কাছে, কিন্তু স্পষ্ট কিছুই বোঝা গেলো না।
– জ্বর কমেনি এখনো?
সাইফের গলার ভারে চমকে উঠলো নীলিমা। ধড়ফড় করে ঘুরে তাকালো ভাইয়ের দিকে। কিছুক্ষণ আগেই ফোনে জানিয়েছিলো দৃষ্টির এই করুণ অবস্থার কথা।উঠে দাঁড়িয়ে তাড়াহুড়ো স্বরে বললো সে,
– না, কমেনি। ঔষধ এনেছিস? আপুর জ্বর কিন্তু অনেক, ভাইয়া। ঔষধ ছাড়া কমবে বলে মনে হচ্ছে না।
– এনেছি আমি। তুই যা, একটু ঘুমা। অনেক রাত হয়ে গেছে।
নীলিমা এক পা এগিয়ে আবার থেমে গেলো। চোখে স্পষ্ট দ্বিধার ছায়া। দৃষ্টি এই মুহূর্তে নিজের ঘরে শুয়ে আছে। কিন্তু সাইফ কি এখন এখানেই রাত কাটাবে, না নিজের ঘরে যাবে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খেতে লাগলো মাথায়। যদি কোনোভাবে দৃষ্টি জানতে পারে যে সাইফ এই ঘরে ছিলো, সকালবেলা নিশ্চিত ঝড় বয়ে যাবে এই বাড়িতে।
– ভাইয়া, তুই কি…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সাইফের চোখের আগুনে পুড়ে গেলো নীলিমা । রক্তচক্ষুর মতো তাকালো সে। আজকে এটা পুরো অন্য এক সাইফ, তার চোখের সেই চাপা রাগে কেঁপে উঠলো নীলিমা। ঠোঁট ভিজিয়ে আস্তে স্বরে বললো,
– কিছু দরকার হলে আমাকে ডাকিস।
বলেই কাপড়ের আঁচল গুছিয়ে চলে গেলো সে।নীলিমার পদধ্বনি মিলিয়ে যেতেই সাইফ ধীরে ধীরে দৃষ্টির পাশে গিয়ে বসলো। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ওষুধের প্যাকেট বের করে নিলো।
হালকা জোর করে মুখে তুলতেই তীব্র বিরক্তিতে জ্বরের ঘোরেও দৃষ্টি ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলো তাকে, কিন্তু অসুস্থ শরীরের শক্তি তার নিজেরই সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলো। শেষমেশ বাধ্য হয়ে সাইফের দেওয়া ওষুধই গিলে নিলো সে।
ওষুধটা মুখে গুঁজে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দৃষ্টির সারা শরীর কেঁপে উঠে গড়গড় করে সবটা বমি হয়ে বেরিয়ে এলো। সাইফ একেবারে কাছে বসে থাকায় সেই বমির স্রোতে ভিজে গেলো তার পাঞ্জাবী থেকে পা পর্যন্ত। স্তব্ধ চোখে সেই দৃশ্যের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলো সে। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বললো,
– হায়রে বউ! এভাবে যদি ভালোবাসাটা ঢেলে দিতেন…
তবু বিরক্তি একটুও এল না মুখে। উঠে দাঁড়িয়ে ধৈর্য নিয়ে দৃষ্টিকে পরিষ্কার করলো। বিছানা নতুন করে গুছিয়ে দিয়ে সাবধানে শুইয়ে দিলো তাকে। তারপর নিজেই চলে গেলো গোসলে।
কিছুক্ষণ পর ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো সাইফ । পরনে শুধু একটা ট্রাউজার, অর্ধনগ্ন দেহে ত্বকজোড়া জলকণার আভা। দৃষ্টি এখনও জ্বরে পুড়ছে। তোয়ালেটা একপাশে ফেলে দিয়ে থার্মোমিটার হাতে তার পাশে বসলো সাইফ। কয়েক মুহূর্ত পর কাঁচের ভেতর ভেসে উঠলো তাপমাত্রা, ১০৪°।
এতটা জ্বরের কারণ শুধু দিনের বৃষ্টিভেজা শরীর নয় একসাথে এত ধাক্কা, এতটা ভেতর ভেঙে যাওয়া, সব মিলে শরীরটাকে অসহায় করে দিয়েছে। অথচ পৃথিবীর সামনে নিজেকে কতটা শক্ত, নির্লিপ্ত মানুষ হিসেবে তুলে ধরে সে! নিজেকে সাহসী প্রমাণ করার জন্য কত কি যে করে। এ কথা মনে হতেই ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলো সাইফের। আলতো করে হাত বুলিয়ে দিলো দৃষ্টির জ্বলন্ত মাথায়। একবার ওষুধ খাওয়ানো হয়ে গেছে এখন আর কিছু দেওয়ার উপায় নেই। তাই শুধু হাতের স্পর্শেই শান্তি ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো সে।
এর মাঝেই সাইফ হাত বাড়িয়ে খাটের কোণায় পড়ে থাকা একটা টিশার্ট তুলে নিলো। ভেজা শরীরে সেটাই গলিয়ে নিলো দ্রুত। তারপর আবার দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইলো স্থির দৃষ্টিতে। ঠোঁটদুটো নিস্তেজ, কালচে হয়ে আছে। ফর্সা মুখ জ্বরে লালচে হয়ে আছে , নাকের পাশ ফুলে উঠেছে। চোখের চারপাশে লালচে দাগ আর ফুলে আছে পাতা। দীর্ঘ কান্নার ছাপ এখনো শুকায়নি। শ্বাস নেবার ভঙ্গিতেও অস্থিরতা, ছোট ছোট ঢেউয়ের মত ঘন ঘন উঠছে বুক।
হঠাৎ সাইফের শ্বাস গলায় আটকে গেলো। শুকনো ঢোক গিলে চোখ ফেরাতে চাইলো, অথচ চোখদুটো অবাধ্য। আবারও গিয়ে থিতু হলো সেই ক্লান্ত অদ্ভুত সুন্দর মুখের উপর। তারপর একেবারেই ফিসফিস করে বলে উঠলো,
– জানেন সোনাবউ… আপনাকে দেখতে এতটাই ভালো লাগে যে মনে হয় , জনমভর তাকিয়ে থাকলেও এই চোখদুটোর তৃষ্ণা কোনোদিন ফুরাবে না।
বলতে বলতে সাইফ নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনী দিয়ে দৃষ্টির ঠোঁটে আলতো স্পর্শ রাখলো। ঠান্ডা সেই ছোঁয়ায় অচেতন দেহের ভেতর থেকে হালকা এক শিরশিরে সাড়া উঠলো, দৃষ্টি অজান্তেই কেঁপে উঠলো সামান্য।
আর তখনই সাইফের ভেতরে বাঁধভাঙা আকুলতা দানা বাঁধলো। নিজেকে আর সামলাতে পারলো না সে। ধীরে মুখ বাড়িয়ে খুব আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো দৃষ্টির ঠোঁটে। এতটাই মৃদু ছোঁয়াটুকু হাওয়ার মত লাগলো, যাতে দৃষ্টি ঘোরের মাঝেই কিছু বুঝে না ফেলে। মুখ তুলে নিয়ে আবারও তার উপর ঝুঁকে রইলো। গরম শ্বাস এসে পড়লো দৃষ্টির চোখে-মুখে। একাগ্র মনোযোগে চেয়ে রইলো সাইফ।
হঠাৎ পিটপিট করে খুলে গেলো দৃষ্টির চোখ। ঝাপসা হয়ে দেখা গেলো তার সামনে সাইফকে, এতটা কাছে যে শ্বাসের উষ্ণতাই মুখে লেগে আছে। জ্বরের ঘোরেই হাত বাড়িয়ে সাইফের গাল স্পর্শ করলো দৃষ্টি। তার উত্তপ্ত হাতের তাপ সাইফের শরীর কাঁপিয়ে দিলো। তৎক্ষণাৎ নিজের হাত রেখে দিলো দৃষ্টির হাতের উপর, আলতো করে ধরে রাখলো। ঝুঁকে থেকে ফিসফিস স্বরে উচ্চারণ করলো,
– কিছু লাগবে, বউ?
মুখ শুকনো, কণ্ঠে শুধু ভাঙা শ্বাস,
– আ..আমাকে… একটু ভালোবাসুন।
একেবারেই আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে কথাটা বলেছিল দৃষ্টি। কিন্তু সাইফের কানে তা নিখুঁতভাবে গেঁথে গেলো। মুহূর্তে শরীর জমে এলো তার। কি করবে বুঝে উঠতে পারলো না। শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে নিলো সে, ঠিক সেই সময়ে আচমকা দৃষ্টি নিজের সমস্ত দুর্বলতা সত্ত্বেও তৎক্ষণাৎ সাইফের ঠোঁটকে নিজের করে নিলো। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই স্পর্শে স্তব্ধ হয়ে গেলো সাইফ। নিজের সমস্ত সংযম ভেঙে ঝুঁকে গিয়ে পুরো শরীর দৃষ্টির গায়ের উপর ভর করে পড়লো।
কিছুক্ষণ সেই অচেতন উত্তাপে গলে থাকার পর দৃষ্টি ধীরে ধীরে তাকে ছেড়ে দিলো। চোখ বন্ধ করে হাঁপাতে লাগলো, বুক ওঠানামা করছে অস্থির ছন্দে। সাইফও এখনো নিজের ঘোর কাটাতে পারছে না। ফিসফিসিয়ে দৃষ্টি বলে উঠলো,
– ঠান্ডা লাগছে…
দৃষ্টির গায়ে মোটা ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে রেখেও তার শরীরের স্পষ্ট কাঁপুনি সাইফের হাতে এসে লাগলো। এই অদ্ভুত শীত মাংস ভেদ করে ঢুকে যাচ্ছে হাড়ের ভেতর। এক মুহূর্তও দেরি করলো না সাইফ। কোনো কিছু না ভেবে খাটে উঠে শুয়ে পড়লো দৃষ্টির পাশে। দু’হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে নিলো তাকে, নিজের উষ্ণতা ঢেলে দিতে চাইলো সমগ্র দেহে।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ২০
কিন্তু তাতেও দৃষ্টির কাঁপুনি থামলো না। অস্থির হয়ে উঠলো সাইফ। শেষমেশ কোনো দ্বিধা না রেখে নিজের টিশার্টের ভেতর গুঁজে নিলো দৃষ্টিকে। দৃষ্টি হালকা গুঙিয়ে উঠলো, তারপর গুটিশুটি মেরে বিড়ালছানার মতো শরীর ছোট করে লুকিয়ে নিলো নিজের সমস্ত অস্তিত্ব, সেই বুকে।
