Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৮

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৮

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৮
নূরায়েশা মাহনূর

চারপাশে নিস্তব্ধতা, শুধু দূরে বজ্রের ক্ষীণ গর্জন, আর উপরের দিক থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে অসংখ্য জলকণা। ভেজা বাতাসে মাটির কাঁচা গন্ধ আর অচেনা এক উষ্ণতা মিশে আছে। ইশিতা এক অদৃশ্য টানে ছুটে চলেছে সামনে। হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে উজানের। অথচ উজানের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ এত তীব্র যে মনে হয় সিঁড়ির দেয়াল ছুঁয়ে সেটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

সিঁড়ির শেষ ধাপটা পেরিয়ে ছাদে পা রাখতেই হঠাৎ পৃথিবীটা অন্যরকম লাগল। অগণিত জলকণা বাতাসে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে ছাদের বুকে, আর আকাশের কালো অন্ধকারে বিদ্যুতের চিকচিকানি মাঝেমধ্যে ঝলসে দিচ্ছে তাদের মুখমণ্ডল।
উজান থমকে দাঁড়াল। তার চোখে এক অদ্ভুত ভাব, শীতল গাম্ভীর্যের মধ্যে লুকোনো অচেনা এক উষ্ণতা। ছাদে এসে দাড়াতেই ইশিতা ছাদের মাঝ বরাবর গিয়ে দাঁড়িয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে দিল। শিশুর মতো উল্লাস মাখা মুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– উফফ! কি যে সুন্দর লাগছে উজান ভাই জানো? মনে হচ্ছে বৃষ্টি আমাকে জড়িয়ে ধরছে।
তার কণ্ঠে কম্পন, অজান্তেই সেখানে লুকিয়ে আছে নির্মল আনন্দ। ভেজা চুল গাল বেয়ে লেপ্টে গেছে, ঠোঁটের কোণে অল্প কাঁপন। বিদ্যুৎ ঝলকানির ক্ষণিক আলোয় উজানের দৃষ্টি স্থির হলো ইশিতার ওপর। মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছে। কেমন সেটা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। আগে কখনো এমনভাবে তাকায়নি সে ইশিতার দিকে। দৃষ্টির প্রতিও তাকিয়েছে, কিন্তু সেই তাকানোতে ছিল না এই অচেনা অনুরণন। বিশেষ করে দৃষ্টিকে এমন অবস্থায় কখনো দেখে নি সে। দৃষ্টিকে উজান সবসময় একরকম সম্মান করত।

তবে সেই সম্মানটা কতটুকু আন্তরিক ছিল, সেটা সে জানে না। আদৌও সেটা সম্মান ছিলো নাকি করুণা তারও সঠিক কোনো উত্তর নেই তার কাছে । সবকিছু হঠাৎ গুলিয়ে যাচ্ছে। তবু ইশিতাকে দেখে আজ ভিন্নরকম এক অনুভূতি জন্ম নিল তার ভেতর। একেবারে নতুন রঙের। নিছক ভাইবোনের সম্পর্কের পরিধি ছাপিয়ে অন্য কিছু। কিন্তু কিছুটা আসলে কী উজান নিজেও খুঁজে পাচ্ছে না।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এল সে। ছাদের ভেজা পাথরের ওপর হাঁটার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির একটানা ছন্দে। জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো তার পদক্ষেপে ছিটকে বাতাসে ভেসে উঠছে। ইশিতার কাছে এসে থেমে গেল উজান। কিছুক্ষণ নিরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বিদ্যুতের আলোয় ঝরে পড়া বৃষ্টির কণার আড়ালে ইশিতার চোখে এক অজানা দীপ্তি ধরা পড়ল, যা উজানের বুকের ভেতর অদ্ভুত স্রোত বইয়ে দিল।

– অনেক হয়েছে… চল, ঠান্ডা লেগে যাবে তোর।
কণ্ঠটা নিচু শুনালো৷ উজানের কথা শুনে ইশিতা তার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সেই হাসি ভেজা হাওয়ার সঙ্গে মিশে সুরের মতো বাজল উজানের কানে। সেই সুর বুকের গভীরে গিয়ে অদ্ভুত কাঁপন তুলল, ভেতরের প্রতিটি ধমনীতে ছড়িয়ে পড়ল অনির্বচনীয় এক শিহরণ।
– লাগুক না ঠান্ডা! তবুও এমন রাত… এমন বৃষ্টি… এমন সুযোগ… মিস করতে পারব না, উজান ভাই।
বৃষ্টি থামছে না। ফোঁটাগুলো অবিরাম ঝরে পড়ছে, ভিজিয়ে দিচ্ছে দু’জনেরই শরীর। উজানের গাঢ় ধূসর টি-শার্ট ভিজে গাঢ় অন্ধকারে লেপ্টে আছে শরীরের সঙ্গে, পেশির বাঁকগুলো স্পষ্ট রেখার মতো ফুটে উঠেছে আরো আগেই। চুল বেয়ে নেমে আসা পানির বিন্দুগুলো এসে থেমে যাচ্ছে চোখের পাপড়ির কিনারে, ঠিক জমে থাকা অশ্রুবিন্দুর মত।

হুট করে ইশিতার দৃষ্টি সেখানে আটকে গেল। বুকের ভেতর কেমন এক অজানা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। মুখে ফুটে উঠল অস্পষ্ট এক হাসি। কেন হাসছে তা নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়। শুধু জানে, ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে। উজানের সঙ্গে ভিজে থাকার এই মুহূর্তটা ইশিতার ভেতরে থাকা আনন্দকে আরও গভীর করে তুলছে।
উজান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ইশিতার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব নিছক কয়েক ইঞ্চি। হঠাৎ বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানিতে তাদের চোখে চোখ পড়ল। ইশিতা ভিজে ঠোঁট নিরবে কামড়ে নিচ্ছে, বুকের ভেতর জ্বলছে অদ্ভুত এক উত্তাপ।উজানের চোখে কেমন ঝড়তোলা অস্থিরতা। নিম্ন স্বরে, প্রায় ফিসফিসে ভঙ্গিতে বলল সে,

– ইশু… ভিজবি তো ভিজ… কিন্তু সাবধানে। এই বৃষ্টি কিন্তু মানুষকে অদ্ভুত করে দেয়।
ইশিতা চোখ তুলে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে শিশুসুলভ সরলতা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার চোখের পাপড়িতে ঝুলে থেকে বিন্দু বিন্দু কাঁপছে।

– তাহলে তো… আমি ভিজবোই। অদ্ভুত হলে কেমন লাগে সেটা আমি দেখতে চাই।
উজানের আঙুল হঠাৎই অজান্তে ছুঁয়ে গেল ইশিতার কাঁধ। গলায় ঝুলে থাকা ওড়নাটা টেনে এনে তার শরীরের সঙ্গে লেপ্টে দিল। কোনো কথা বলল না উজান। শুধু নিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অনুভূতির উথালপাথাল ঢেউটা বুকের ভেতর জমিয়ে রাখল। ইশিতা থমকে দাঁড়ালো বুকের ভেতর কেমন এক অপরিচিত কম্পন জেগে উঠেছে।
এরপর উজান তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে দু’হাত তুলে রাখল ইশিতার গালে। বৃষ্টিভেজা আঙুলের স্পর্শে ইশিতার শরীর প্রকম্পিত হলো । শিশুর মতো করে মৃদু চাপ দিয়ে ইশিতার দুগাল টেনে দিলো উজান । নিপুণ আঙুলে উজান ইশিতার ভেজা গালে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো মুছে দিল । এরপর হঠাৎই ইশিতার হাত শক্ত করে চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল সে।

– অনেক হয়েছে, ইশুপাখি। জ্বর বাঁধিয়ে ফেললে ছোট মা আমাকে বকাবকি করবে। বৃষ্টি তো হতেই থাকবে… পরে কখনো আবার ভিজা যাবে।
উদ্ভট শুনালো উজনের কন্ঠস্বর। অদ্ভুত রকমের কোমল। মনে হচ্ছে কোনো অবাধ্য শিশুকে কোমল ভাবে বুঝাচ্ছে কোনো অকাজ না করতে। ইশিতা মাথা নেড়ে সায় জানালো, পিছন পিছন চলে গেলো উজানের।

– এই মুষলধারে বাইরে যাওয়া কতটা সুবিবেচনার কাজ হচ্ছে শেখ সাহেব?
ফিসফিসে স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল দৃষ্টি। সাইফ কপালের ভাঁজ গাঢ় করে, খানিক তীক্ষ্ণ স্বরে জবাব দিল,
– আপনিই তো বলেছিলেন, রাতে বের হবেন।
– বলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু এই অবিরাম জলধারার ভেতরেই নামতে হবে এমন তো কোথাও লিখে রাখিনি আমি।
– আপনি বলেছেন মানে সেটাই হবে। এখন চলুন কথা বলবেন না৷
বলেই ছাতার হাতল শক্ত করে ধরল সাইফ। অপরহাতে দৃষ্টির আঙুলগুলো থাবার মতো চেপে ধরে পা টিপে টিপে এগিয়ে গেল সামনে। ঘরের প্রান্ত ছাড়িয়ে এসে দাঁড়ালো স্যাঁতসেঁতে বাগানের গাঢ় সবুজ আঁধারে। দৃষ্টির হাতে ছোট্ট একটি টর্চলাইট, আর্দ্র বাতাসে যার আলো নেমে এলো ক্ষীণ রেখার মতো। গভীরের দিকে পা বাড়াতেই বাগানের ভেজা মাটির গন্ধে চারপাশ ভরে উঠল। টর্চের আলো কখনো বুনো ঘাসের ঝোপে, কখনো ভেজা পাতার গায়ে ধরছে দৃষ্টি । দু’জনের চোখ সতর্কভাবে গাছপালা স্ক্যান করছে, তবু অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ছে না।

– কিছুই তো দেখছি না, বউ।
– উঁহু… তাই তো… কিন্তু কেউ রাতে চুপিচুপি কেন এখানে আসবে?
সাইফ এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– তাহলে এক কাজ করি, আপাতত ফিরে যাই। পরে যদি কাউকে এখানে ঘুরাফেরা করতে দেখি, তখন তাকে অনুসরণ করব।
দৃষ্টি আবারও একবার চারপাশের প্রতিটি কোণা নজরে নিলো, অচেনা স্যাঁতস্যাঁতে বাতাসে নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। সাইফের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে ধীরে মাথা নেড়ে ফিসফিস করে বলল,
– হ্যাঁ… ঠিক আছে, চলুন।

তাজউদ্দীন বসে আছেন তার অফিসকক্ষে, টেবিলের উপর ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র আর ফাইলের স্তূপে ডুবে আছেন তিনি। জানালার বাইরে ভিজে হাওয়া ভেসে আসছে, কিন্তু তিনি অন্যমনস্ক। সূর্যের ম্লান আলোয় তার ক্লান্ত মুখটিতে কঠোরতা খোদাই হয়ে আছে। বাড়িতে থাকার সময় খুবই কম; সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি নয়, অথচ সেই সময়েও তাকে খুঁজে পাওয়া এক দুরূহ কাজ। জীবনের পরতে পরতে দায়িত্বের ভারে নত তিনি, নিজের সময় বলতে কিছুই নেই।

চেয়ারম্যানের এই পদে তার বসা অনেকটা সাইফের খ্যাতির কারণেই৷ সাইফের জনপ্রিয়তাই তাকে তুলে দিয়েছে এই আসনে। যদিও সাইফ কখনো প্রকাশ্যে তার পিতাকে সহযোগিতা করেনি; রাজনীতির প্রতি তার কোনো পক্ষপাত নেই। তবু জনগণের মনে এক অদৃশ্য সমীকরণ কাজ করেছে। যে বাবা এমন এক রত্নের জন্ম দিতে পারে, সে নিঃসন্দেহে সৎ, নিঃস্বার্থ এবং আদর্শবান। সেই বিশ্বাসেই গ্রামবাসী তাজউদ্দীনের হাতে তুলে দিয়েছে ক্ষমতার ভার। ফাইলের ভেতর ডুবে থাকা সেই মানুষটির মনোযোগের মধ্যেই হঠাৎ কক্ষের দরজা খুলে সাইফ প্রবেশ করল।

– আসবো?
– এসো।
চোখ না তুলে সোজা জবাব দিল তাজউদ্দীন। সাইফ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বসল পাশের একটি চেয়ারে। কক্ষের নীরবতায় কিছুক্ষণ চোখাচোখি চলল সাইফের। অবশেষে তাজউদ্দীনের কণ্ঠ ভেসে এলো,
– কিছু বলবে?
– সিয়াম কোথায়, বাবা?
চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে ঠাণ্ডা স্বরে উত্তর দিল তাজউদ্দীন,
– ইফতিহাদ কোথায়, সেটা আমি কীভাবে জানব?
– আপনি জানেন, বাবা। আমার থেকে সত্য লুকাতে যাবেন না। সিয়ামের সাথে আমার বোঝাপড়া আছে। ও কোথায়, আমাকে বলুন।
তাজউদ্দীন এবার হাতে ধরা কলম থামিয়ে সোজা হয়ে বসলেন।

– কিসের বোঝাপড়া, ইজতিহাদ? ভাই হয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কিসের বোঝাপড়া করবে তুমি? ভুলে গেছো, তোমার জন্যই ঘর ছাড়তে হয়েছে ইফতিহাদকে? ওই মেয়ের জন্য নিজের মানুষদের দূরে ঠেলে দিচ্ছো!
সাইফ হঠাৎ লাফিয়ে উঠল কথার ভেতর থেকে। তার কণ্ঠে রুদ্ধ ক্রোধ, চোখে তীব্র দহন।
– ভাই হয়ে ভাইয়ের সাথে কিভাবে বোঝাপড়া করতে হয়, সেটা তো আপনার কাছ থেকেই শিখেছি, বাবা! আর ওই মেয়ের কথা… ওই মেয়ে আমার বউ। সে-ই আমার সবচেয়ে আপন মানুষ। আমার কুলাঙ্গার ভাইয়ের থেকেও বেশি!
– ইজতিহাদ!
চেয়ারটা প্রচণ্ড শব্দ তুলে সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গেল তাজউদ্দীন। চোখ রক্তাভ আভা , চোয়াল শক্ত, বুকের ভেতর ক্রোধের ঢেউ তুমুল হয়ে উঠেছে। সে তেড়ে এসে দাঁড়াল সাইফের সামনে। সাইফও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দু’জনের চোখে চোখ আটকে গেল, নিরবে জমে উঠল এক অগ্নিদীপ্ত সংঘর্ষ।

– চিৎকার করবেন না, বাবা। আপনি সোজাসুজি বলে দিন সে কোথায় আছে। আমি যদি একবার সিয়ামের খোঁজ পেয়ে যাই, বিশ্বাস করুন, বোঝাপড়া এবার দ্বিগুণ হবে। যত দেরি হবে তাকে খুঁজে পেতে, সেই বোঝাপড়ার হিসাবও হবে ততটাই ভয়ঙ্কর হবে।
তাজউদ্দীনের নাসারন্ধ্রে তপ্ত নিশ্বাস জ্বলে উঠল।
– তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছো, ইজতিহাদ? ওই অসভ্য, অভিশপ্ত, কলঙ্কিত মেয়ের জন্য আমার সঙ্গে এভাবে দাঁতে দাঁত চেপে কথা বলার সাহস তোমার হলো কীভাবে?

– আরো আগেই বলা উচিত ছিল, বাবা। যদি আপনার হাতের পুতুল না হয়ে আমি আগেই নিজের গলা উঁচু করতাম, তাহলে আমার স্ত্রীকে এত অপমান সহ্য করতে হতো না। আর না… তাকে কলঙ্কিত হওয়ার তকমা বহন করতে হতো!
– কী যাদু করেছে সেই মেয়ে তোমার ওপর, যে তার জন্য তুমি এইরকম উন্মত্ত হয়ে উঠেছো?
সাইফের ঠোঁটে একরোখা তির্যক হাসি ফুটে উঠল, গলা ভারী করে করুণ ভাবে বলে উঠলো,
– ঠিক সেই যাদুই, বাবা… যেটা তার মা করেছিলেন আপনার ওপর। যে যাদুর জন্য আপনি আমার মাকে ভুলে গিয়েছিলেন। যে যাদুর জন্য তার মায়ের কাছে নিজেকে হার মেনেছিলেন… সেই একই যাদু।

– ইজতিহাদ!
তাজউদ্দীনের ধৈর্যের বাঁধ এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠল তার কণ্ঠ। হাত উঠল কক্ষ কাঁপিয়ে, কিন্তু সাইফের গালে আঘাত হানার আগেই তা থেমে গেল মাঝপথে।
তাজউদ্দীন বিস্মিত চোখে তাকিয়ে দেখল দৃষ্টির হাত শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে তার কব্জি। চোয়াল শক্ত, চোখে প্রজ্জ্বলিত শিখা, মুখের প্রতিটি রেখা ক্রোধে অগ্নিময়। তার দৃষ্টিতে বৃষ্টিহীন ঝড়ের তাণ্ডব।
তাজউদ্দীনের কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো, কিন্তু দৃষ্টির চাহনি অনড়। সেকেন্ডের মধ্যে দৃষ্টি ঝাঁকিয়ে ফেলে দিল তার হাত,স্পর্শের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ঘৃণা। ঠোঁট কেঁপে উঠল, কণ্ঠে ক্ষুরধার ঘৃণা ছলকে পড়ল,

– আপনার মতো কুলাঙ্গার বাবা আর কোনো সন্তানের না হোক! আপনার মতো বেইমান ভাই আর কোনো ভাইয়ের জীবনে না জুটুক! আপনার মতো পুরুষ কোনো পরিবারের অভিশাপ না হয়ে উঠুক!
দৃষ্টি সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে উঠল,
– লজ্জা হয় না আপনার? কোন সাহসে আপনি ওনার গায়ে হাত তুলতে যান?
তাজউদ্দীন তেড়ে এল দৃষ্টির দিকে। কিন্তু তার আগেই সাইফ হাত তুলে দিলো দু’জনের মাঝখানে।
– যথেষ্ট, বাবা!
তাজউদ্দীনের গলা হঠাৎ ফেটে বেরিয়ে এলো, কাঁপছে ক্রোধে। দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

– অতি বাড় বেড়ো না, এই তেজ বেশিদিন টিকবে না।
– আপনি আর আপনার আদরের সেই লম্পট ছেলে মিলে কী করতে পারেন, সেটা আমরা সময়ের অপেক্ষা না করেই দেখে নেব। আপনি খবর না দিলেও আমরা তাকে ঠিক খুঁজে বের করব।
– ইজতিহাদ, তোমার বউকে সাবধান করে দাও শেষবারের মতো বলছি।
সাইফ এবার গলা সমান স্থির রেখে উত্তর দিল,
– উনি ভুল কিছু বলেননি। আর আপনি খবর না দিলেও, আমরা ঠিক খুঁজে নেব সিয়ামকে ।
ঠিক তখনই দৃষ্টি সাইফের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। গলার স্বর নরম,দৃঢ়তায় পরিপূর্ণ,
– চলুন, আমি কলেজে যাব।
তাজউদ্দীনের চোখে বিস্ময়ের ছায়া ঘনীভূত হলো। তার দিকে তাকালে দৃষ্টির চোখে আগুনের ঝলক দেখা যায়, কিন্তু যখন দৃষ্টি সাইফের দিকে তাকায় সেই চোখে নেমে আসে সমুদ্রের গভীর প্রশান্তি। সাইফ এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে নিল। তারপর মাথা হালকা নেড়ে দৃষ্টিকে পাশে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।

– আপনি তখন ওইভাবে বাবার সামনে গেলেন কেন, বউ? যদি বাবা উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেলতেন জানেন, তখন আমি কতটা কষ্ট পেতাম?
সাইফের গলায় ঝিম ধরা ক্লান্তি। দৃষ্টি ঠোঁট বাঁকিয়ে, সোজা তাকাল সাইফের দিকে।
– আপনার গায়ে যে হাত তুলতে যাচ্ছিলো সেটা? আমি বুঝি কষ্ট পেতাম না?
খাটের কিনারায় বসে সাইফ মাথা চুলকে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখে শিশুর মতো সরল প্রশ্ন,
– আমার জন্য আপনার এত টান যে, জানতামই না তো!
– এসব টানটুন কিছু না। আসলে আমার তো আপনাকে সহ্যই হয় না। আপনাকে দেখলেই কেমন রাগ রাগ লাগে। কিন্তু… আপনি ভালো মানুষ। আপনার গায়ে কেউ হাত তুলবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখবো এটা ঠিক মানায় না। তাই ভাবলাম, বাচ্চা মানুষটাকে একটু সাহায্য করি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতেই কথাগুলো বলল দৃষ্টি । সাইফ হতবাক। দৃষ্টি এমনভাবে পাক্কা অভিনয় করছে বুঝার উপায় নেই এগুলা মজার স্বরে বলা।

– হাহ! বউ, আপনার তো সিনেমায় অভিনয় করা উচিত। কি দারুণ এক্সপ্রেশন আপনার! সত্যি বলছি, ১০০% পাস করে যাবেন।
দৃষ্টি মুখ ঘুরিয়ে তাকাল, ভ্রু উছিয়ে ঠোঁটে হালকা এক চিলতে হাসি টেনে বললো,
– তাই? তাহলে অডিশনটা দিয়েই দিই কি বলেন? আমাকে কিন্তু আপনি নিজে নিয়ে যাবেন।
সাইফ হেসে মাথা নাড়ল।
– অবশ্যই নিয়ে যাব।

বলতে বলতেই দৃষ্টির হাত নিজের হাতে টেনে নিয়ে আলগোছে বসালো হাঁটুর উপর। কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে নিল। দৃষ্টিও চুপচাপ সাইফের কাঁধে হাত পেঁচিয়ে ধরল। সাইফ হঠাৎ ঝুঁকে দৃষ্টির গালে একটা চুমু খেল, তারপর দৃষ্টির চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে নরম স্বরে বলল,
– কলেজে না গেলে হয় না বউ? যদি আবার কোনো বিপদ হয়?
দৃষ্টি কোনো জবাব দিল না। সে নিবিড়ভাবে দেখতে লাগল সাইফকে। প্রতিটি খুঁটিনাটি, প্রতিটি রেখা, প্রতিটি স্পন্দন দেখছে সে। সাইফের চোখ, মুখ, ঠোঁট, নাক… সবই তার চাহনির গভীরে বন্দি হচ্ছে।
দৃষ্টি ধীরে আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল সাইফের নাকের ঢগা। স্পর্শটা এতই নরম, এতই মলিন যে সাইফের চোখ অনায়াসে বুজে এলো । পরের মুহূর্তেই দৃষ্টি সাইফের দু’গাল আঁকড়ে ধরে মৃদু ভঙ্গিতে চুমু রাখল সাইফের চোখের পাতায়।

সাইফের ভেতরকার সবকিছু থমকে গেল। হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে চেপে ধরল দৃষ্টির কোমর। এই মুহুর্তে তাকে বুকের ভেতর চিরদিনের জন্য আটকে রাখতে চাইছে। দৃষ্টি সাইফের মুখের কাছে এগিয়ে এসে নাকের ঢগায় আরেকটা নরম চুমু রাখল। নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মিশে গেল বোধহয় দুজনের। তারপর সমস্ত আবেগ এক বিন্দুতে সঞ্চিত করে সাইফের কপালে রাখল দীর্ঘ, গভীর, অশেষ ভালোবাসায় ভরা এক চুমু। সরে এসে আবার তাকালো সাইফের দিকে। চোখে ঝলমল করছে এক অনুচ্চারিত আবেগ। সাইফের বুক ভরে উঠল অজানা বিস্ময়ে। এই প্রথম দৃষ্টি নিজে থেকে তাকে চুমু খেল।

সাইফ মনে মনে স্তব্ধ হয়ে রইল। দৃষ্টি ইদানীং তাকে এমনভাবে অবাক করে দেয়, যেন তার ভেতরে এক নতুন পৃথিবী জন্ম নিচ্ছে। কখনো হুটহাট এমন কিছু করে বসে যা সাইফের কল্পনারও বাইরে। এই দৃষ্টিকে চেনা যায় না। এটা তার সেই গাল ফুলিয়ে চোখ রাঙানো, একগুঁয়ে নাদুসনুদুস বউ নয়। এটা অন্য এক দৃষ্টি, ফুলের পাপড়ির মতো কোমল, আদর-মায়া-ভালোবাসায় জড়ানো এক সোনাবউ। যাকে হৃদয়ের খুব গভীরে তুলে রাখতে ইচ্ছে করে।
সাইফ ধীরে চোখ খুলে তাকাল। তার অবাক ভাব তার মুখমণ্ডল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। দৃষ্টি স্নেহে ভরা আঙুল দিয়ে সাইফের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিল। দু’গাল নিজের হাতে আঁকড়ে ধরে মৃদু স্বরে বলল,

– আপনি থাকতে আমার আবার কিসের বিপদ বলুন তো? আপনি তো আছেন সবসময় আমাকে রক্ষা করার জন্য…
সাইফ থেমে থেমে হাসল। দৃষ্টি পলকহীন ভাবে তাকিয়ে রইল সেই হাসির দিকে। এরপর সাইফ মাথা গুঁজল দৃষ্টির বুকের কাছটায় । হাতের বাঁধন আরও জোরালো হয়ে উঠল। শিশুসুলভ আবেশে ধীর কণ্ঠে বলে উঠল,
– আচ্ছা… তাহলে আজ কলেজে যাবেন না বউ। কাল থেকে যাবেন ঠিক আছে?
দৃষ্টি তার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
– আচ্ছা… যাব না।

– আপনি এই ফুলটা না নিলে… আমি আমার হাত কাইটা ফেলমু! প্লিজ… এটা নেন! আমি… আমি আপনাকে অনেক পছন্দ করি।
ছেলেটার কণ্ঠে আতঙ্ক, চোখে ব্যাকুলতা। হাতের মুঠোয় ধরে রাখা লাল গোলাপটা কাঁপছে তার কম্পমান আঙুলে। হাঁটু মুড়ে বসে আছে নীলিমার সামনে, মুখ ভেজা ঘামের বিন্দুতে।
নীলিমা নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে আছে, চোখে বিরক্তি। কালো নিকাবের আড়ালে কঠিন চাহনি লুকিয়ে রেখেছে। এ ছেলেটা গত কয়েকদিন ধরেই অবিরাম বিরক্ত করে চলেছে। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র, অথচ আচরণ একেবারে উচ্ছৃঙ্খল। নীলিমা ফার্স্ট ইয়ারে পড়লেও আজকাল ছেলেটার প্রিয় লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীলিমা ভ্রু কুঁচকে নিচু স্বরে বলল,

– আপনি… আমাকে না দেখেই পছন্দ করেন?
নিকাবের আড়াল থেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। ছেলেটা গলা ভিজিয়ে উত্তর দিল,
– হ্যাঁ… না দেখেই। আমি জানি… আপনি অনেক সুন্দর। আপনি কেমন দেখতে সেটা না দেখেও আমি জানি। না দেখে কি… ভালোবাসা যায় না?
নীলিমা ঠোঁট সামান্য নড়ালো । কিছু বলার ছিল, কিন্তু হঠাৎ চোখ গেল ছেলেটার পেছনে। ওখানে দাঁড়িয়ে আছে ইমন। বড়সড় একটা বাঁশের লাঠি কাঁধে ঠেকিয়ে রেখেছে। এক হাত পকেটে গুঁজে রাখা। চোখে কালো সানগ্লাস, দাঁড়িয়েছে দৃঢ় ভঙ্গিতে। মুখের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা যাচ্ছে সে একেবারে প্রস্তুত।

নীলিমার ভেতরটা কেমন জানি কেঁপে উঠল। ছেলেটার জন্য খানিকটা মায়া হলো। বেচারা বুঝতেই পারেনি কাকে বিরক্ত করছে। কিন্তু কিছু করার নেই যেখানে সেখানে ভালোবাসা উথলে পড়লে মাঝে মাঝে এমন যত্ন যে পেতেই হয়। নীলিমার ভাবনার মাঝেই ছেলেটা আচমকাই সাহস সঞ্চয় করে নীলিমার হাত ধরে ফেলল। এক নিমিষেই ইমনের বাঁশের লাঠি ঝড়ের মতো নেমে এলো তার হাতে। প্রচণ্ড ব্যথায় ছেলেটা গুঙিয়ে উঠল, হাত ছেড়ে পিছিয়ে পড়ল। কিন্তু ইমন থেমে নেই।
চটাং! চটাং! বাঁশের আঘাতের তীব্র শব্দে চারদিক কেঁপে উঠল। ছেলেটার চিৎকার রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল। মানুষজন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে, কেউ এগোতে সাহস পাচ্ছে না। ইমনের হাত থামছেই না একটার পর একটা সজোরে বাড়ি। ছেলেটা এখন মরিয়া হয়ে হাত-পা ছুঁড়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে, কিন্তু ইমনের ক্রোধ সীমাহীন। অবশেষে ছেলেটার অবস্থা বেগতিক দেখে নীলিমা এগিয়ে এসে ইমনের হাত চেপে ধরল।

– ইমন ভাই থামুন!
ইমন থামল ঠিকই, কিন্তু চোখের ভিতর দপদপ করছে অগ্নিশিখা। দম নিয়ে দাঁত চেপে ছেলেটার দিকে তাকাল, তারপর জোরে আরেকটা বাড়ি বসিয়ে দিল।
– চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যা!

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৭

কোনোমতে শরীর টেনে পালিয়ে গেল ছেলেটা। রাস্তাটা নির্জন। হাতে গোনা কয়েকজন পথচারী স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ইমন হঠাৎই লাঠিটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে এক তীব্র গালি ছুড়ে দিল। গলার স্বর নিচু, কিন্তু সেই শব্দগুলো নীলিমার কানে একেবারে স্পষ্ট পৌঁছে গেল। নীলিমা চোখ কুঁচকে, ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাল ইমনের দিকে।
– ছিঃহ্…! কিসব ভাষা এগুলো!

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৯