Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৯

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৯

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৯
নূরায়েশা মাহনূর

মাথার উপর বরফের ব্যাগ চেপে ধরে একের পর এক কোল্ডড্রিংস গিলে যাচ্ছে ইমন, দাউদাউ করে জ্বলন্ত আগুনে পানি ঢালছে। কপাল ভিজে আছে ঘামে, তাপটা আরও ছড়িয়ে পড়ছে শরীর জুড়ে। চোখেমুখে একরাশ ঝাপসা কুয়াশা। সাইফ ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে, তবে কথার মাঝে মাঝেই আড়চোখে তাকাচ্ছে ইমনের দিকে।
ইমনের কোনো হুঁশ নেই। সে নিজেকে ঠাণ্ডায় ডুবিয়ে দিতে ব্যস্ত। এক গ্লাস শেষ করে আরেকটা তুলতে যাবে, এর মধ্যেই সাইফ বিদ্যুৎগতিতে গ্লাসটা কেড়ে নিলো। নিজের কথার ফাঁকে স্ট্রো ঠোঁটে ছুঁইয়ে চুমুক দিলো একবার। ইমন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। সাইফ এবার কল কেটে কপাল কুঁচকে সরু চোখে তাকালো তার দিকে। ইমন নির্বাক। কাঁধে এক সজোর চপাটাঘাত বসিয়ে সাইফ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো,

– কী সমস্যা? এমন ঠাণ্ডা গিলছিস কেন? গলা বসে যাবে না তোর?
ইমন কোনো জবাব দিলো না। চেয়ারে হেলান দিয়ে মাথা নামিয়ে রাখলো। চোখেমুখে জমাট বাঁধা রাগ, চোখ দুটোও লালচে, অস্থির। সাইফের বোঝার সাধ্য নেই কিছু।
– কী হয়েছে তোর?
গম্ভীর কণ্ঠে আবারও প্রশ্ন করলো সাইফ। ইমন ধীর চোখে পিটপিট করে তাকিয়ে বলে উঠলো,
– আচ্ছা ভাই, আপনার সামনে যদি কেউ ভাবির হাত ধরে আপনি তারে কী করতেন?
– মেয়ে হলে কিছু করতাম না, ছেলে হলে হাতটা হাতের জায়গায় রাখতাম না।
ইমন থম মেরে গেলো। ফোঁস করে উঠলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– ইশশ! এখানেই ভুল হইছে আমার। হাতটা কা*ইটা ফেলা উচিত ছিলো।
– কার হাত কা*টার কথা বলতেছিস তুই?
সাইফ এবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। ইমনের মুখে কাদোকাদো ভাব, চোখগুলোও কাচের মতো চিকচিক করছে। সাইফ আবার ধীরে ধীরে বলে উঠলো,
– আমি তো আমার বউরে ধরবো দেখে কাটবো। তোর তো আর বউ নাই।
এক মুহূর্ত থেমে থেকে আবার চোখ কুচকে বললো,
– এই ব্যাটা… প্রেমে পড়ছিস নাকি তুই? কে সেই কপালপুড়ী যার কপালে তোর মতো আশিক জুটেছে?
ইমনের ঠোঁট কেঁপে উঠলো। গলাটা হঠাৎ ভারী হয়ে এলো।

– ভাই, আপনে আমারে অপমান করতেছেন।
– তোর আবার মানও আছে নাকি?
– ধুর! সবাই খালি মজা নেয়!
ইমন চেয়ার সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সাইফ পিছন থেকে সুরে সুরে ডেকে উঠলো,
– আরেহ দাঁড়া, কার কপালে এত অকাল বিপদ জুটলো বলে যা!
ইমন একবারও পেছন ফিরে তাকালো না। সাইফ স্থির হয়ে বসে রইলো খানিকক্ষণ, তারপর একচিলতে হাসি ফুটে উঠলো ঠোঁটে।

কেটে গেছে আরও এক মাস। সময় নদীর স্রোতের মতো বয়ে চলে গেছে নিরবে। কোনো হিসেব রাখারও ফুরসত হয়নি কারও। দিনগুলো গুনে দেখার সুযোগ নেই, অথচ তারা নিঃশেষ হয়ে ঝরে পড়ছে পাতা-হারা ঋতুর মতো। জীবন তার নিজস্ব গতিতেই বহমান। কারো থেমে থাকা কারো জীবনের নিয়ম নয়; কারও জন্য পৃথিবীর ঘড়ি থেমে থাকে না।

এই এক মাসে আকাশছোঁয়া কোনো পরিবর্তন আসেনি। যা হওয়ার, সবাই কেবল আপন খাতে বয়ে চলেছে। অরুনা বেগমের হৃদয়ে আবারও জেগেছে ছেলের প্রতি পুরোনো মমতা। একসময়কার বিরক্তি মুছে গিয়ে মাতৃত্বের অনিঃশেষ টান আবার দৃঢ় হয়েছে। ঠিক করেছেন কিছু মাসের ভেতরেই ছেলের বিয়ের আয়োজন করবেন।
ইশিতা নিমগ্ন পড়াশোনার জগতে। তবু অদৃশ্য এক বাঁধনে উজানের সঙ্গে তার সম্পর্ক আগের চেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠছে। নীলিমা বইয়ের ভারে ডুবে গেছে, পরীক্ষার চাপ তাকে অন্যকিছুর সময় দিচ্ছে না।
সাইফ আর ইমন মন দিয়েছে ক্লাবের কর্মকাণ্ডে। তবে সাইফ আসলে ইদানীং কী করছে, তা কারও জানা নেই। রহস্যের আবরণে ঢেকে আছে তার দিনরাত। কেবল ইমনই বোঝে, কার জীবনে কী স্রোত বইছে, কার অন্তরে কী ঝড় গোপনে ধাক্কা দিচ্ছে।

বোরকা গায়ে জড়িয়ে নিকাব পরছে দৃষ্টি। কালো কাপড়ের আবরণে ঢেকে যাচ্ছে তার প্রতিটি অভিব্যক্তি। একপাশে সাইফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাঞ্জা মেরে তৈরি হচ্ছে। পাঞ্জাবির কলার সযত্নে সোজা করে, হাতার ভাঁজ গুটিয়ে তুলে রেখেছে। পারফিউমের কাঁচের বোতলটা হাতে তুলে গলায়, কব্জিতে, পাঞ্জাবীর ভাঁজে নিপুণ ভঙ্গিতে ছিটিয়ে দিচ্ছে সুগন্ধ। নিকাবের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি চোখ কুচকে তাকিয়ে আছে সাইফের দিকে। এমন অহেতুক সাজসজ্জার কি কারণ দৃষ্টি বুঝতে পারছে না ।

সাইফ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো সযত্নে ঠিক করে, খোচা খোচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে পিছনে ঘুরতেই থম মেরে গেলো। দৃষ্টির চাহনিটা বিদ্ধ করলো বুকের ভেতর। চোখের চাপা অগ্নিতে মুহূর্তেই গলা শুকিয়ে গেলো সাইফের। শুকনো লালা গিলে আমতা আমতা করে ফিসফিস করে উঠলো,
– ইয়ে… মানে… আপনার সাথেই কলেজে যাচ্ছি যে…
দৃষ্টির ভ্রু টেনে কপালে চলে গেলো। কণ্ঠে শীতল ব্যঙ্গ ঝরে পড়লো,

– আমার কলেজ কি বিয়েবাড়ি নাকি? মেয়ে দেখতে যাচ্ছেন সেটা বললেই হয়।
সাইফ তড়িঘড়ি করে দু’হাত তুলে প্রতিবাদ করলো, চোখে অস্বস্তির কুণ্ঠা ভাসছে,
– আস্তাগফিরুল্লাহ, বউ… আমি আপনাকে ছাড়া আর কাউকে দেখি না।
দৃষ্টি ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যাগ গোছাতে গোছাতে ধীর কণ্ঠে জবাব ছুঁড়ে দিলো,
– দেখার ইচ্ছে আছে নাকি?
সাইফ গলায় চাদর জড়াতে জড়াতে, মাথা নিচু করে তড়িঘড়ি স্বরে বললো,
– না না… কী যে বলেন…
কিন্তু দৃষ্টি থেমে নেই। চোখ কুচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে, এক্ষুণি ভেদ করে ফেলবে বুকের ভেতরের সব গোপন কথা।

– মেয়েদের নাম শুনলেই আপনার কান লাল হয়ে যায় কেন? সত্যিই কি মেয়ে দেখার ইচ্ছে আছে? … চলুন, তাহলে আমি-ই চয়েজ করে দিই।
সাইফ কানে হাত দিয়ে চমকে দেখলো, সত্যিই তার কান আগুনের মতো গরম হয়ে আছে। কিন্তু সেটা মেয়েদের নাম শুনে নয় দৃষ্টির তীক্ষ্ণ অগ্নিদৃষ্টি এক মুহূর্তে রক্তে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। বুকের ভেতরটা কেমন দমবন্ধ হয়ে আসছে। দৃষ্টি এবার নিপুণ ভঙ্গিতে হাসার ভান করে বলল,
– আরেহ, লজ্জা পাবেন না। আমি নিজেই দেখেশুনে পছন্দ করে দেবো।যাকেই দেবো, সেটাই আপনার জন্য সেরা হবে। আপনি তো আর দেখতে পাবেন না।
সাইফ চোখ কুঁচকে অবাক গলায় বলল,

– দে… দেখতে পাবো না মানে?
দৃষ্টি মাথা খানিকটা কাত করল।
– মানে দেখার জন্য তো চোখ থাকতে হয়… সেটাই যদি তুলে ফেলি তাহলে কীভাবে দেখবেন?
কথাটা শেষ হতেই আচমকা দৃষ্টি টেবিলে রাখা একটা কলম তুলে নিলো হাতে। মুহূর্তের মধ্যে কলমের নিবটা সাইফের চোখের মণির সামনে চেপে ধরলো সে। সাইফের বুকের ভেতরটা হিমশীতল শূন্যতায় ডুবে গেল। দৃষ্টি এবার সাইফের কলার শক্ত করে চেপে ধরলো। চোখে সেই একই অগ্নিদৃষ্টি, কলমটা চোখের মণির গা ঘেঁষে ধারালো ভঙ্গিতে ধরে রেখে দাঁত পিষে বলে উঠলো,

– অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকানোর আগে মনে রাখবেন, এই চোখ আমি দৃষ্টি নিজ হাতে উপড়ে আপনাকে ধরিয়ে দেবো…
নীরবতার ভেতর সাইফের গলায় শুকনো শব্দ ফুটে উঠলো,
– আ.. আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কোনো উত্তর না দিয়ে ব্যাগটা কাঁধে তুলে সোজা দরজার দিকে হাঁটা ধরলো দৃষ্টি। তখনই সাইফ তার হাতটা টেনে নিলো। শক্ত টানে গতি হারিয়ে সাইফের বুকের সঙ্গে এসে ঠেকলো দৃষ্টি। দু’জনের মাঝের ফাঁকা জায়গাটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

সাইফ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দৃষ্টির চোখে। সেই চোখে তীব্রতা, অভিমান, অচেনা এক আকর্ষণের ঝড়। ধীরে ধীরে দু’হাত তুলে দৃষ্টির মুখের দু’পাশ আড়াল করে রাখা গালের উপর রাখলো। নরম স্পর্শে দৃষ্টির বুকের ভেতর কেমন কেঁপে উঠলো। সাইফ মুখটা খানিক ঝুঁকিয়ে নিকাবের উপর দিয়ে নিজের অধর রাখলো দৃষ্টির মাথায়। মুহূর্তখানেক থেমে থেকে আবার চোখে চোখ রাখলো সে।
আলতো হাতে নিকাবটা সামান্য তুলতেই উন্মুক্ত হয়ে এলো দৃষ্টির রক্তাভ গোলাপি অধর। শ্বাস কেঁপে উঠলো তার। সেই আধো আঁধার নিকাবের ফাঁক দিয়ে সাইফ হঠাৎ ঝুঁকে পড়লো। দীর্ঘ, শক্ত এক চুমু এঁকে দিলো কাপা-কাপা সেই নরম ঠোঁটে। একচিলতে দূরত্বে সরে এসে আবার নিকাব নামিয়ে দিলো সাইফ। নরম, গভীর কণ্ঠে তার স্বর শুনালো,

– এই যে, কথা দিলাম… অন্য কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলেও তাকাবো না।
দৃষ্টি কিছু বললো না,নিকাবের আড়ালেই ফুটে উঠলো একচিলতে হাসি। হাসিটা লুকোনো থাকলেও সাইফ বুঝে ফেললো। দৃষ্টির চোখের কোণ খানিক সংকুচিত হলো যে তাই। সাইফ এরপর শক্ত করে দৃষ্টির হাতটা ধরে নিলো, আঙুলে নিজের আঙুল গলিয়ে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলো।

– উজান ভাই আমি এই ফুলটা নিতে চাই… প্লিজ!
উজান হাতে ধরা লালচে গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললো,
– এতগুলো ফুল দিয়ে কি করবি তুই, বুঝা আমারে? একসাথে এত নিলে সব ফুল একসাথেই নষ্ট হয়ে যাবে। তারচেয়ে আলাদা আলাদা সময়ে নিবি।

একঝাঁক বাহারি ফুল বুকের কাছে জড়িয়ে, ঠোঁট ফুলিয়ে উজানের দিকে তাকিয়ে রইলো ইশিতা। হাতের মাঝে জায়গা ফুরিয়ে গেছে, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন পাপড়ি ভরে আছে তবুও তার মন পড়ে আছে সাদা গোলাপের দিকে। চোখে তীব্র আকাঙ্ক্ষার ঝিলিক, কণ্ঠে অভিমান মেশা সুরে বলে উঠলো,
– দিবে না সেটা সরাসরি বললেই হয়। তুমি অনেক কিপটে হয়ে গেছো।
একপাশে দাঁড়ানো মুরুব্বি-ধাঁচের দোকানদার মুচকি হেসে যোগ করলো,

– ভাই, নিয়ে দেন না বাচ্চা মানুষটা।
উজান চমকে তার দিকে ঘুরে তাকালো। কপালের ভাঁজে বিরক্তি খেলা করলো।
– কোন দিক দিয়ে একে আপনার বাচ্চা মনে হয়? আগায় গোড়ায় পুরো এক বুইড়া বেডি মানুষ!
– উজান ভাইইই! লাগবে না তোমার ফুল।

রাগে ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুরে হাঁটা ধরলো ইশিতা। উজান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছু না বলে দোকানি থেকে দুটো সাদা গোলাপ কিনে নিলো। ধীর ভঙ্গিতে ইশিতার হাতে ফুলগুলো গুঁজে দিয়ে বাকি দাম মিটিয়ে পিছনে ঘুরলো।
কিন্তু মাত্র দু’কদম যেতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলো। চোখ থেমে গেল সামনে। দুই হাত বুকে পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি। সরু চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে । উজানের বুকের ভেতর কেমন কেঁপে উঠলো। এভাবে, এতদিন পর, হঠাৎ করে দৃষ্টিকে দেখবে এটা কোনোভাবেই তার কল্পনায় ছিল না। উজানের থমকে যাওয়া দেখে পিছন থেকে ইশিতা কৌতূহলী স্বরে বলে উঠলো,

– আরে থেমে গেলে কেন উজান ভাই? চলো না…
কথা শেষ হওয়ার আগেই তার নজরও গিয়ে পড়লো দৃষ্টির দিকে। চোখ বড় বড় করে উঠে ফুলগুলো উজানের হাতে ধরিয়ে দৃষ্টির দিকে দৌড়ে গেলো ইশিতা।
– আপু! তুমি এতদিন পর! আমাদের তো ভুলেই গেলে!
দৃষ্টির ঠোঁটে নীরব হাসি ফুটে উঠলো। ইশিতাকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিলো সে। কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে রেখেই ধীরে সরে এলো। চোখ বুলালো ইশিতার চেহারায়। মেয়েটা দিনদিন অত্যাধিক সুন্দর হচ্ছে। গালের উজ্জ্বলতা বেড়েছে, চোখের দীপ্তি তীক্ষ্ণ হয়েছে। আলতো করে ইশিতার গালদুটো চেপে ধরে বললো দৃষ্টি,

– একদম ভুলিনি। তবে এখানে কি করছিস তোরা?
শেষ কথাটার সঙ্গে সঙ্গে আড়চোখে তাকালো উজানের দিকে। তীক্ষ্ণ সেই চাহনিতে বুকের ভেতর হালকা শিরশিরে অনুভূতি বয়ে গেলো। উজান চোরা চোখে অন্যদিকে তাকিয়ে ব্যস্ত ভাব ধরলো। ইশিতা খুশিমনে ঝটপট বলে উঠলো,
– ফুল কিনতে এলাম, আপু! এই দেখো, উজান ভাই আমাকে কতগুলো ফুল কিনে দিয়েছে।
উজানের মুখের রঙ পাল্টে গেল। ইশিতা এই মেয়েটা বড্ড ছেলেমানুষ। কখন, কোথায়, কী বলতে হয়, কোনো হিসেবই ওর নেই। গলায় কাঁটা আটকে গেলেও কোনোভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে উজান দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললো,

– এ… একটা বার্থডে… বার্থডে পার্টিতে যাবো আমরা… তাই… নিয়েছি।
শব্দগুলো কেমন ভেঙে ভেঙে এলো তার ঠোঁট থেকে। আশ্চর্য, উজান এতটা তোতলাচ্ছে কেনো? নিজেরই বোঝা দায়। ইশিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে একটানে বলে ফেললো,
– মিথ্যে কথা বলছো কেন? ফুল তো আমি আমার জন্য নিয়েছি।
উজান কোনো জবাব না দিয়ে আস্তে ঘুরে অন্যদিকে তাকালো। ইশিতা ঝটপট সব ফুল নিজের হাতে গুটিয়ে নিলো।
কলেজ ছুটি হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। প্রতিদিনের মতো আজও দৃষ্টি এখানে এসে দাঁড়িয়েছিল সাইফের জন্য। বাজারঘেঁষা এই জায়গায় ফুলের দোকানের সারি, ছোটখাটো দোকানপাট আর মানুষের ভিড়। কিন্তু আজকে এইভাবে মুখোমুখি হয়ে যাওয়া দৃষ্টির কাছে অপ্রত্যাশিত।
দূর থেকে ইশিতাকে ফুল কিনতে দেখে এগিয়ে এসেছিল সে। কিন্তু উজানকে ইশিতার পাশে দেখে থেমে গেলো। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকেই বুঝলো দু’জনের সম্পর্কটা বোধহয় সেই স্বাভাবিক সীমা পেরিয়ে অন্য কোনো পথে পা বাড়াচ্ছে।

এমন সময় একটু দূরে থেকে সাইফের কণ্ঠ ভেসে এলো। সাইফকে দেখতে পেতেই ইশিতা ছুটে গেল তার দিকে। দৃষ্টি চলে যাওয়ার পর থেকে সাইফের সঙ্গে আর তেমন কোনো যোগাযোগের প্রয়োজন পড়ে নি। জীবন যাপনের অবিরাম ব্যস্ততায় কে-ই বা কাকে মনে রাখে! সাইফও ইশিতাকে দেখে কেবল সৌজন্যমূলক একটুকরো হাসি ছুঁড়ে দিল। দৃষ্টি সেদিকে চট করে তাকিয়ে মৃদু হাসল। উজান স্থিরদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সাইফকে পর্যবেক্ষণ করল, তারপর বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দৃষ্টির দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,

– বেশ সুখেই আছিস, তাই না?
– আলহামদুলিল্লাহ! আমার এই কলঙ্কিত জীবনে এত সুখ আমার ভাগ্যে জুটবে কখনো ভাবিনি…
সাইফের দিকে নিবদ্ধ চাহনি রেখেই কথাগুলো উচ্চারণ করল দৃষ্টি। উজান মাথা নেড়ে সায় দিল, অথচ চোখে-মুখে অপরাধবোধের ছায়া। দৃষ্টির চোখে চোখ রাখার মতো সাহস ওর আর অবশিষ্ট রইল না।
– ইশিতা খুব কোমল, উজান ভাই। স্বভাবটা যেমন শিশুদের মতো, মনটাও ঠিক তেমনি ফুলের পাপড়ির মতো নরম। দয়া করে ওকে কষ্ট দেবেন না ।
উজান চমকে তাকাল দৃষ্টির দিকে। দৃষ্টি এবার তার চোখের ভেতরে চোখ গেঁথে স্থির গলায় আবার বলল,

– অন্তত ওকে আমার মতো ত্যাগ করবেন না। জীবনে উত্থান-পতন আসবেই, কিন্তু সেসবের মাঝেই কারও হাত ছেড়ে দেওয়াটা কাপুরুষতার পরিচয়। ইশিতার চোখে আপনি যেনো আজীবন সুপুরুষ হিসেবেই থাকেন।
উজান নির্বাক। কী বলবে? আদৌ কিছু বলার আছে কিনা সে নিয়েই দ্বিধাগ্রস্ত। দৃষ্টি তার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপমাখা একচিলতে হাসি হাসল, কিন্তু নিকাবের আড়ালে হাসিটা উজানের দৃষ্টিগোচর হলো না। উজান ঠোঁট নেড়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সাইফ এগিয়ে এলো।

– চলুন, বউ…
সাইফের কথাটা শেষ হতেই উজান নিজের বাক্য গিলে ফেলল। ইশিতা হঠাৎই হেসে বলে উঠল,
– আমাদের বাড়িতে কবে আসবা, আপু?
– আসব, সময় করে… বড়মাকে অনেকদিন দেখা হয়নি। তোমরাও তো আমাদের বাসায় আসতে পারো।
ইশিতা ও দৃষ্টির কথার মাঝেই উজান আর সাইফের চোখ বারবার একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে যাচ্ছিল। দৃষ্টি সেটা লক্ষ্য করতেই ধীরে বলে উঠল,

– ওনি, উজান ভাই।
– জানি…
শান্ত, সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল সাইফ। এরপর হাত বাড়িয়ে বলল,
– আমি সাইফ… শেখ ইজতিহাদ সাইফ।
উজান সৌজন্য রক্ষা করে হাত মেলাল।
– আহমির উজান চৌধুরী।
দুই পুরুষের মাঝে কুশল বিনিময়ের ফাঁকে কিছুক্ষণের জন্য চোখে-চোখ আটকে রইল। বাতাসে টান অনুভূত হলো। পরিস্থিতি অস্বস্তিকর দিকে গড়াতে শুরু করেছে বুঝে দৃষ্টি হালকা হাসি দিয়ে সেদিনের মতো বিদায় নিল।

ধীর পদক্ষেপে এগোচ্ছে দৃষ্টি। পায়ের নিচে শুকনো পাতাগুলোর ভাঙচুর শব্দ অশ্রুত কোলাহল তুলছে। চারপাশে এমন গাঢ় নীরবতা যে, ক্ষুদ্রতম শব্দও অস্বাভাবিকভাবে তীক্ষ্ণ হয়ে কানে বাজছে। দম আটকে চলতে চলতে একসময় এসে থামল বাড়ির পেছনের বাগানে পোড়া চিলেকোঠার ভগ্নদেহী ঘরটার সামনে। চারদিক নিস্তরঙ্গ, অরণ্যের মতো বেড়ে ওঠা বৃক্ষরাজি, জায়গাটাকে এক অজানা ভয়ের আবরণে ঢেকে রেখেছে।
চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে দৃষ্টি। সাইফ নেই ঘরে, ইমনও অনুপস্থিত। নীলিমা দুপুরের ভোজন শেষে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাহারাদাররাও খাবারের বিরতিতে। সুযোগকে পুঁজি করেই আজ নিজের মনের কৌতূহল আর সংশয়ের অবসান ঘটাতে এখানে এসেছে সে। গাছের ঝোপ সরিয়ে প্রতিটি কোণায় দৃষ্টি রাখছে গভীর মনোযোগে। এমন সময় গাছপালার ভিড়ে মাটির বুকে চোখে পড়ল জংধরা কোনো লোহার বস্তু। মুহূর্তেই সে ঝুঁকে পড়ল, স্পষ্টভাবে দেখতে চাইল সেটাকে।

– এখানে কী করছো?
বজ্রকণ্ঠের মতো ভেসে আসা আওয়াজে দৃষ্টি জমে গেল। মাথা ঘুরিয়ে দেখল তাজউদ্দীন দাঁড়িয়ে আছে । বিস্ময়ে থমকে গেল সে। তাজউদ্দীন যে বাড়িতে আছে, তা তো জানতই না। কবে ফিরল, সেসবের খবরও নেই। তার স্থির চাহনির ভেতর অদ্ভুত এক সুর, আরেকবার বলল,
– এখানে কী চাই তোমার? জায়গাটা গাছপালায় ভর্তি, বুঝতে পারছো না? যেখানে-সেখানে পা ফেলার আগে সতর্ক হওয়া উচিত। সাপ-বিচ্ছু লুকিয়ে থাকতে পারে।
দৃষ্টি হতবাক। আজ তাজউদ্দীনের কণ্ঠে অন্য রকম রঙ। লোকটা কি সত্যিই তার নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছে, নাকি আড়ালে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে? গলা খাঁকারি দিয়ে কিছু বলতে উদ্যত হতেই তাজউদ্দীন হাত তুলে থামিয়ে দিল।

– থাক, আর কিছু বলতে হবে না। আমি চাই না আমার ছেলের বউ কোনো বিপদে পড়ুক। চলো, ফিরে যাই।
বলেই হেঁটে চলল সে। তৃতীয়বারের মতো বিস্ময়ে অভিভূত হলো দৃষ্টি। ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবার তাকাল সেই জং ধরা লোহার টুকরোটার দিকে। হঠাৎ তাজউদ্দীনের কঠিন স্বর আবার কানে এলো,
– কী হলো, কথা কানে যাচ্ছে না?

মাটির পিঞ্জর পর্ব ২৮

গভীর শ্বাস ফেলে দৃষ্টি তার পিছু নিলেও হঠাৎই তাজউদ্দীনকে পাশ কাটিয়ে দ্রুতপায়ে নিজেই এগিয়ে গেল সামনের দিকে। মাঝপথে দাঁড়িয়ে গেল তাজউদ্দীন। মেয়েটার সাহসী আগুনঝরা মেজাজ প্রতিবারই তাকে অভিভূত করে। বুকের ভেতর চাপা বিস্ময়ে ফিসফিস করে উঠল ,
– পুরোটাই মায়ের রক্ত বইছে এ মেয়ের শিরায়।

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩০