Home মাটির পিঞ্জর মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩৩

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩৩

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩৩
নূরায়েশা মাহনূর

কেটে গেল আরও কয়েকটা দিন । সময় তার নিজস্ব নিষ্ঠুর গতিপথে অগ্রসর হতে থাকে। কারো জন্য বিরতি নেই, কারো জন্য স্থিরতার দান নেই তার । কোন খাত দিয়ে দিন শেষ হয়ে যায়, আবার কোন অদেখা ফাঁক দিয়ে নবদিন প্রবেশ করে তার কোনো হিসেব ধরে না জীবনের খাতায়।
দৃষ্টির শরীরটা কয়েক দিন ধরে ভেঙেচুরে আছে।ভেতরে এক অজানা অবসাদ বাসা বেঁধেছে। হালকা কোনো কাজেই দমফুরানো ক্লান্তি গ্রাস করে ফেলে সারাটা শরীরকে। মাথার ভেতর উঠছে অসংলগ্ন ঘূর্ণিঝড়, হঠাৎ হঠাৎ দপ করে চোখের সামনে আলো নেভার মতো অনুভূতি হয় । তবে এই ব্যাপারে সাইফকে কিছু জানায়নি সে; জানালেই তো সে অকারণে চিন্তার পাহাড় বসিয়ে ফেলবে।
বাড়ির উত্তরপ্রান্তের থাকা লাইব্রেরিতে মুখোমুখি বসে আছে সাইফ আর ইমন। দুজনেই জরুরি ব্যাপারে কথা বলছে। দিনের বেলায় এইদিকটায় কারো তেমন আসা যাওয়া হয় না। তাই গোপন আলাপের জন্য এটাই তাদের বিশেষ জায়গা।

– আসবো?
দরজার দিক থেকে ভেসে আসা দৃষ্টির ক্ষীণ ডাকেই সাইফ আর ইমন চোখ ফিরিয়ে তাকালো । ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখে সাইফ হালকা মাথা নেড়ে অনুমতি দিল। দৃষ্টি ম্লান হাসি ছড়িয়ে ভেতরে ঢুকল।
– অনেকক্ষণ ধরে এখানে আছেন… তাই নাস্তা নিয়ে এলাম। লাগলে বলবেন, কাথা-বালিশও এনে দেব।
– কাথা-বালিশ দিয়ে কি করব, ভাবি?
চায়ের কাপ তুলতে তুলতেই ইমনের ঠাট্টা শোনা গেলো। দৃষ্টি সাইফের দিকে কাপ এগিয়ে দিতে দিতে নির্লিপ্ত স্বরে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

– আজকাল দিনের অর্ধেকটা সময় তো আপনারা এখানেই কাটিয়ে দেন। তাই ভাবলাম, কাথা-বালিশ দিলে এখানেই রাত গুজরে নেবেন।
– না না, আমি আমার বউ ছাড়া ঘুমাতে পারব না। একেবারেই অসম্ভব!
একহাত অনিয়ন্ত্রিত ভঙ্গিতে নাড়িয়ে ঘোষণা করল সাইফ। দৃষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়াল; সাম্প্রতিক কালে লোকটার নির্লজ্জতা মাত্রা হারিয়েছে।যেখানে-সেখানে প্রেমের আবেগ ছড়িয়ে পড়ে তার।
ঘুরে দাঁড়াতেই দৃষ্টির মাথার ভেতর আকস্মিক এক ঘূর্ণিপাক উঠল। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলে সে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ধার চেপে ধরল। আঙুলগুলো অবচেতন শক্তিতে কাঠের কোনা খামচে ধরল। ক্ষীণ আওয়াজে ইমন আর সাইফ একসাথে তাকিয়ে উঠল তার দিকে।

– কী হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ নাকি?
চেয়ারের ঘর্ষণধ্বনি কাটিয়ে সাইফ একলাফে দৃষ্টির সামনে এসে দাঁড়াল। দৃষ্টি কষ্টে নিজেকে গুছিয়ে ফিসফিস করল,
– না না… কিছু না। আপনারা কাজ করুন, আমি যাই।
কথা শেষ হতেই পা বাড়ানো দৃষ্টির শরীর হঠাৎই ভারহীন হয়ে গেল। মাথার ভেতর প্রচণ্ড দোল খেয়ে দেহটা নিচে নামতে লাগল। কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই সাইফ তাকে দুহাতে থামিয়ে ফেলল। মুহূর্তেই তার মুখে আতঙ্কের ছাপ গাঢ় হয়ে উঠল।
– এই বউ… কী হলো আপনার?
দৃষ্টির নিথর দেহ তার বাহুর ভাঁজে নিস্পন্দ পড়ে আছে। নাড়ির সাড়া নেই, চোখের পাতা স্থির।

– ইমন, ডাক্তারকে ফোন দে এখনই!
কঠোর, কাঁপা নির্দেশ ছুড়ে দিয়ে দৃষ্টিকে কোলে তুলে লাইব্রেরি থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল সাইফ। পায়ের শব্দে গমগম করতে লাগল করিডর। নিজের রুমে পৌঁছে তড়িঘড়ি করে বিছানায় শুইয়ে দিল দৃষ্টিকে। তার মুখের ওপর নেমে থাকা অস্বস্তিকর ফ্যাকাশে ছায়া দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত শীতল ভয় জমাট বাধতে লাগল সাইফের।
বেশ কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে পৌঁছাতেই সাইফ ছটফট করা আতঙ্কের উপর দাঁড়িয়ে হঠাৎই সোজা হয়ে উঠল।
– চাচা, দেখেন তো কী হয়েছে ওনার… আচমকা মাথা ঘুরে অচেতন হয়ে পড়ল কেন? তাড়াতাড়ি দেখেন! এখনো জ্ঞান ফিরছে না কেন ওনার?

– আরে, শান্ত হও। আমাকে দেখতে দাও। তুমি বাইরে যাও।
– না। আমি এখানেই থাকব।
ডাক্তার মুহূর্তের জন্য চোখ তুললেন, সাইফের মুখে যে একগুঁয়ে উৎকণ্ঠা ছায়া হয়ে আছে তা বুঝেই আর কিছু বললেন না। গভীর মনোযোগে দৃষ্টির চেকআপ শুরু করলেন। কয়েক মিনিটের নীরবতা, দৃষ্টির নিথর শরীর আর যন্ত্রের ক্ষীণ শব্দ ছাড়া ঘরে আর কিছুই নড়ছিল না।
হঠাৎ ডাক্তার মুখ তুললেন। তার মুখের রেখাগুলোতে গাঢ় গাম্ভীর্যের ছাপ। দৃষ্টির দিকে নয় সরাসরি সাইফের চোখে চোখ রেখে তাকালেন । সেই দৃষ্টি দেখেই সাইফের বুকের ভেতর মুচড়ে উঠলো।
– কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি? কিছু বলছেন না কেন? কী হয়েছে ওনার?
ডাক্তার ধীরস্বরে বললেন,
– বাইরে এসো আমার সাথে।
নিজের ব্যাগ তুলে ডাক্তার রুম ছাড়তেই সাইফ দৃষ্টির দিকে শেষবার তাকাল। তার মুখের নিস্তেজ সাদা ভাব দেখে বুকটা অদ্ভুত টান মেরে উঠল। তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলো সে, দরজা বাইরে থেকে টেনে লাগিয়ে দিলো।
ডাক্তার করিডরে দাঁড়িয়ে সাইফকে খানিকক্ষণ অদ্ভুত গভীরতায় পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর ধীরে, ভরাট স্বরে বললেন,

– এই কাজটা ঠিক করোনি তুমি, সাইফ। মেয়েটার সাথে এমনটা না করলেও পারতে।
সাইফের চোখে ছায়া নেমে এলো। ঠোঁট শুকিয়ে গেল। ভেতরটা কেঁপে উঠল।
– চাচা… কী হয়েছে ওনার? কোনো ভয়ানক কিছু?
ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন,
– হ্যাঁ, বেশ ভয়ানকই হয়েছে।
– ক…কি?
সাইফের কণ্ঠ মনে হচ্ছে কেউ শক্ত হাতে চেপে ধরে রেখেছে। মুহূর্তের নীরবতার পর ডাক্তার নিজের গাম্ভীর্য ভাঙলেন। ঠোঁটের কোণে ধীরে উঠল এক অমায়িক উষ্ণ হাসি। সাইফের কাঁধে আলতো চাপড়ে বললেন,

– খুশির খবর আছে। বাবা হতে যাচ্ছো তুমি।
এক নিমিষে সাইফের চারপাশের জগৎ স্থির হয়ে গেল।সময়ের কাঁটা কেমন থেমে থাকা নদীর মতো নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে । নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। বুকের ভেতর ধক্ করে কেমন আলোড়ন উঠল, শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠল অচেনা আবেগে। স্থির, বিস্ফারিত চোখে কিছুক্ষণ ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইল।
– আপনি… সত্যি বলছেন?
– হ্যাঁ, একদম সত্যি। তোমার স্ত্রীকে বিশেষ যত্নে রাখবে। ওর শরীর বেশ দুর্বল, আর মনে হয় কোনো দুশ্চিন্তায়ও আছে। মা সুস্থ থাকলে সন্তানও সুস্থ হবে এটা মাথায় রাখবে।

এই বলে ডাক্তার এগিয়ে গেলেন। দরজার কাছে পৌঁছাতেই ইমন তাকে বিদায় জানাল। তাদের কথোপকথন যে ইমন শুনেছে তা তার মুখের আলোয়ই বোঝা যাচ্ছিল। বুকটা উল্লাসে ভরে উঠেছে তারও।
ইমন ফিরে আসতেই দেখল, সাইফ এখনো অবশ দাঁড়িয়ে আছে। এক জায়গায় স্থির, বুকের ভেতরে ঝড়ের মতো কিছু বয়ে যাচ্ছে তার । ইমন কাছে আসতেই হঠাৎই সাইফ তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।নিজের আনন্দের এই ভার সে একা বহন করতে পারছে না। সাইফের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রু।শব্দহীন, গভীর, উচ্ছ্বসিত অশ্রু।
– ইমন… তুই শুনেছিস? ডাক্তার কি বলল?
– শুনেছি ভাই!
– আমি নাকি বাবা হবো রে…! ডাক্তার আমার সাথে মজা করলো না তো? আমি সত্যিই… বাবা হবো? সত্যি? আমার মাথায় ঢুকছে না!

– সত্যি বলেছে ভাই আমি তো চাচ্চু হবো !
ইমন কথাটা বলতেই সাইফ হঠাৎ তাকে ছেড়ে খানিক দূরে সরে দাঁড়াল, আর তারপর একেবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। একজন শক্ত, কঠিন মানুষ হঠাৎ শিশুর মতো ভেঙে পড়ার মতো সে কি কান্না। কাঁদতে কাঁদতে হেচকি তুলে বললো,
– আমার বউটা এত ভালো কেন রে, ইমন? এত খুশি দিতে দিতে আমাকে পাগল না করে দেয়!
ইমন নিজের হাসি চেপে রাখতে না পেরে ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করল।
– আরে থামেন ভাই… কেউ দেখলে কি ভাববে?
– তুই বুঝবি না… আমি, আমি আজ… অ-অনেক খুশি… অ-অ… আজ…

শেষের শব্দগুলো আর বেরোতেই পারল না। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে উঠল, চোখের সামনে আলো দুলে উঠল। পরক্ষণেই সাইফের শরীর দুলে মাটির দিকে ঢলে পড়ল। ইমন পাঞ্জাবীর কলার ধরে দ্রুত তাকে থামিয়ে ফ্লোরে শুইয়ে দিল। স্তব্ধ, হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল সাইফের নিথর মুখের দিকে।
প্রেগন্যান্ট কি ভাবি হইছে নাকি ভাই হইছে? এই নমুনা নিয়ে আমি কই যে যাবো মাবুদ।
তখনই সেখানে এলো নীলিমা। সাইফকে পড়ে থাকতে দেখে দৌড়ে এলো।
– ভাইয়ার কি হয়েছে। এখানে এইভাবে পড়ে আছে কেন?
ইমন একটা হতাশার শ্বাস ছাড়লো। মাথা ঘুরিয়ে তাকালো নীলিমার দিকে।

– বাপ হওয়ার খুশিতে ভাই আমার অজ্ঞান। যেই বান্দা এখনো আসেই নাই সে এখনই মা বাপরে জ্ঞান হারা কইরা দিতাছে। দুনিয়ায় আসলে জানি আরো কত কি দেখাবে!!
– কিহহহহ!!
চিৎকার দিয়ে কথাটা বলে উঠলো নীলিমা। নীলিমার চিৎকারে এক দফা লাফিয়ে উঠলো ইমন। মুখটাকে বাকিয়ে তাকালো নীলিমার দিকে। বিড়বিড় করে বলে উঠলো,
– সবগুলা একেকটা নমুনা। এই বাড়িতে মনে হয় আমিই একটা স্বাভাবিক মানুষ।
– কি বললেন আপনি?
– কই কি বললাম।
– ভাইয়া বাবা হবে মানে?
– ভাইয়া বাবা হবে মানে আপনি বুঝেন না? ভাই প্রেগন্যান্ট।
– কিহহহহহ!!!!
এবার আরেক দফা লাফিয়ে উঠলো ইমন। সব আবোলতাবোল হয়ে যাচ্ছে।

– না মানে ভাবি প্রেগন্যান্ট।
কথাটা বলেই মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে উঠলো,
– এই আধাপাগল গুলার সাথে থাকতে থাকতে আমিও পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমারে বাঁচাও আল্লাহ।
তাদের দুজনের কথার মাথে পিটপিট করে চোখ খুললো সাইফ। চোখের ঝাপসা পরিষ্কার হতেই দেখলো দুইজোড়া চোখ উবু হয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে তাকেই দেখছে। তা দেখেই লাফিয়ে চিৎকার করে উঠে বসলো সাইফ। সাইফের চিৎকারের সাথে সাথে ইমন আর নীলিমাও চিৎকার করে দূরে সরে গেলো। ইমন একটা পিলারে হেলান দিয়ে বসে নিজের বুক চেপে ধরলো। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বলে উঠলো,

– আর একটুর জন্য হার্ট এট্যাকের থেকে বেঁচে গেলাম।
সাইফ উঠে দাড়ালো ধিরে ধিরে। আর তখনই নীলিমা ঝাপিয়ে পড়লো সাইফের উপর।
– ভাইয়ায়ায়ায়ায়া তুই নাকি প্রেগন্যান্ট? !
সাইফকে জড়িয়ে নাচতে নাচতে কথাটা বলে উঠলো নীলিমা। সাইফ তব্দা খেয়ে তাকালো ইমনের দিকে।
– ভাই বিশ্বাস করেন আমি কিছু বলি নাই ।
ইমন ইশারায় দুইহাত নাড়িয়ে না বোধক বুজাচ্ছে। মানে এমন একটা কথার ব্যাপারে সে কিছুই জানে না। সাইফ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,

– তুইই বলছোস সালারপুত!!
এরপর নীলিমার উদ্দেশ্য বহুকষ্টে বলে উঠলো,
– তোর আপু প্রেগন্যান্ট আমি না!!
– ওই একই! আমি ফুফি হবো!! কি মজা!! ইয়েএএএএএ!!
ইমন আস্তে করে পাশ কাটিয়ে সরে গেলো। যাওয়ার আগে কিছু একটা ভেবে আবার ফিরে এলো। নীলিমার হাত টেনে আবার হাঁটা ধরলো। নীলিমা রাগী দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। ইমন তা পাত্তা না দিয়ে সাইফের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

– ভাবির কাছে যান আপনি।
সাইফ নেচে নেচে চলে গেলো ঘরের ভিতরে। নীলিমার হাত ধরে টেনে এনে বাড়ির এক কোনায় দাঁড়ালো ইমন।
– ভাই প্রেগন্যান্ট এটা বললেন কেনো?
– আপনিই তো বলেছেন।
– আমি তো মুখ ফঁসকে বলে ফেলেছিলাম।
– আমিও!
ইমন পারে না নিজের চুল নিজেই টেনে ছিড়ে ফেলে। এই কোন আপদের পাল্লায় পড়লো। ইমনকে পাত্তা না দিয়ে হাঁটা ধরলো নীলিমা। বেনুনি ঘুরাতে ঘুরাতে বলে উঠলো,
– আমি যাই আমার এখন অনেক কাজ। ফুফি হবো বলে কথা।
পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠলো ইমন।
– হ আমার কোনো কাজ নাই আমি তো আকাইম্মা! আমিও তো চাচ্চু হবো আমার কাজ আরো বেশি বুঝেছেন।
বলেই মুখ ঘুরিয়ে উল্টো পথা হাটা ধরলো ইমন। দুজন দুইদিকে এমন ভাবে যাচ্ছে মনে হচ্ছে দুই পৃথিবী উদ্ধার করার দায়িত্ব তাদের দুজনের কাঁধে পড়েছে।

বেশ কিছুক্ষণ পর দৃষ্টি চোখ মেলে তাকালো। আঙুল নড়াতেই টের পেলো কোনো অচেনা ভার তার হাতকে আচ্ছাদিত করে আছে। কষ্টভরা মাথা সামান্য ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো তার বাঁ হাতের উপর শিশুবিড়ালের মতো গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে সাইফ। দৃষ্টির চেতনা ফেরার অপেক্ষায় অপেক্ষায় কখন যে সে ঘুমে ঢলে পড়েছে হয়তো নিজেও জানে না।
দৃষ্টি ধীরে সোজা হয়ে বসল। অন্য হাত বাড়িয়ে সাইফের অগোছালো চুলগুলো সরিয়ে দিলো মুখের উপর থেকে। স্পর্শের সেই ক্ষুদ্র আলোড়নেই সাইফের ঘুম ভেঙে গেল। মাথা তুলে তাকাতেই দেখলো দৃষ্টির দৃষ্টি ইতিমধ্যেই তার দিকে নিবদ্ধ।

– জ্ঞান ফিরেছে আপনার?
এক প্রশস্ত, বিস্ময়মাখা হাসি নিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলো সাইফ। দৃষ্টি নীরব সম্মতিতে মাথা দোলালো।
দৃষ্টির ধরা হাতটি সাইফ আলতো করে উপরে তুললো। তার উল্টো পিঠে দু’টি দীর্ঘ চুমু এঁকে, কনুই ভর দিয়ে হাতটি ঠাঁই দিলো নিজের থুতনির নিচে। তারপর নিরবচ্ছিন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দৃষ্টির চোখের গভীরে। অতঃপর অপ্রস্তুতভাবে তার গাল বেয়ে নেমে এলো দু’ফোঁটা লবণাক্ত অশ্রু।
দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। সামান্য অজ্ঞান হওয়াতেই মানুষটা এমনভাবে ভেঙে পড়ল কেন? তার এই অকারণ কান্না দৃষ্টির বুকের ভেতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে গেল যার অর্থ সে এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি।
– কি হয়েছে? কাঁদছেন কেন? আমি তো ঠিক আছি দেখুন…
দৃষ্টির কাঁপা কণ্ঠে উচ্চারিত বাক্যটুকু বাতাসে মিলিয়ে যেতেই সাইফ ধীরে হাসলো।

– অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, বউ… আমাকে এত ভালোবাসা, এত শান্তি আর এত এত অনির্বচনীয় আনন্দ দেওয়ার জন্য।
দৃষ্টি এখনো স্থির। সাইফের কথার উৎস কিছুতেই ধরতে পারছে না। তার এমন বিমূঢ় মুখ দেখে সাইফ নীচু স্বরে মৃদু হাসলো। তারপর আলতো করে দৃষ্টির একটি হাত তুলে রাখলো দৃষ্টিরই পেটের উপর।
– আমাদের মাঝে আরেকজন আসতে চলেছে… আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন!
দৃষ্টির শ্বাস থমকে গেল। মুহূর্তের ভেতর দ্রুত চোখ নামিয়ে তাকালো নিজের পেটের দিকে। আশ্চর্যের, অবিশ্বাসের, আনন্দের, ভয়ের অদ্ভুত মিশেল চোখে নেচে উঠলো। আবার তাকাল সাইফের দিকে। সাইফ নিশ্চুপে মাথা নাড়লো। এবং পরক্ষণেই দৃষ্টির চোখের কোণে জমে থাকা জল হঠাৎ করেই মুক্ত আকাশ পেলো। বর্ষার প্রথম দুধারে বৃষ্টির মতো অবাধে গড়িয়ে পড়তে লাগলো তার অশ্রু।

সাইফ ধীর হাসিতে খাটের উপর উঠে বসল এবং পরের মুহূর্তেই দৃষ্টিকে নিজের বাহুঢোরে টেনে নিলো।সেই আশ্রয়ে মুখ চাপা দিয়ে হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠলো দৃষ্টি। এমন সংবাদ তার জীবনে আসবে এটা সে কখনো কল্পনার আঙিনাতেও রাখেনি।
সাইফ নরম স্বরে তাকে শান্ত করলো, তারপর দৃষ্টির কপালে এক দীর্ঘ চুমু দিলো। খানিকটা সরে এসে আবার তাকালো দৃষ্টির দিকে। দৃষ্টি নিজের পেটের উপর কাঁপা আঙুল বুলাতে বুলাতে আরও জোরে কেঁদে ফেললো।
– কলঙ্ক বয়ে বেড়ানো এই শরীর… এখানে কোনোদিন একটা ছোট প্রাণ বাসা বাঁধবে, আর আমি সেই প্রাণ বয়ে বেড়াবো কখনো কল্পনাও করিনি শেখ সাহেব।
সাইফ দৃষ্টির দুই গাল আলতো করে তুলে ধরলো।

– আপনাকে কতবার নিষেধ করেছি এসব কথা মুখে না আনতে। আপনি আমার কাছে চিরদিনই নির্মল,কোমল আর পবিত্র। আর আমাদের সন্তানের চোখেও আপনি ঠিক সেই একই রকম পবিত্র থাকবেন।
– আল্লাহ আমার জীবনে এত সুখ বরাদ্দ রাখবেন কখনো ভাবিনি। সেই রাতের পর তো মনে হয়েছিল জীবনটাই শেষ । কিন্তু ভাঙাচোরা সেই অস্তিত্বকে এভাবে ফের সাজিয়ে দেবেন তিনি এটুকুও কল্পনায় আনিনি… সত্যিই আনিনি।
সাইফ নিরবে দৃষ্টির হাত ধরলো, তারপর সেই হাতের উপর নিজের অধর ছুইয়ে বলে উঠলো,
– আপনিও ভালোবাসা পাওয়ারই যোগ্য, বউ। নিজেকে কখনো এতটা তুচ্ছ মনে করবেন না। দুনিয়ার সবার কাছে আপনি সাধারণ হলে আমার কাছে আপনিই আমার দুনিয়া। আপনাকে ঘিরেই আমার সকল সুখ, সকল আনন্দ।
দৃষ্টির চোখ বেয়ে আরো কয়েক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়লো। ফিসফিস করে বলে উঠলো,

– কলঙ্কের বোঝা দূরে সরিয়ে এত সুখ আমার কপালে সইবে তো??
– সকল কলঙ্ক ধুয়ে মুছে এই দুনিয়ার সবটুকু ভালোবাসা,সবটুকু মমতা, আমি আপনার পদতলে এনে হাজির করবো বউ। কখনো এক মুহূর্তের জন্যও ভালোবাসার অভাব বোধ করতে দেবো না আপনাকে, কথা দিলাম। এই দুনিয়ার সবটুকু সুখ কেবলমাত্র আপনার হোক!!

মাটির পিঞ্জর পর্ব ৩২

দৃষ্টি আবার সাইফের বুকে ঢলে পড়লো। হঠাৎই ক্লান্ত হৃদয়ের ভেতর দিয়ে শীতল কোনো তুষারস্রোত বয়ে গেল। মনে হলো বসন্তের সব রঙিন বাতাস তাকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরেছে।
মা হওয়ার অনুভূতি কি তবে এমনই? শরীরের গভীরে ক্ষুদ্র এক সৃষ্টিস্ফুলিঙ্গ বহন করতে করতে কি প্রতিটি নারী নিজেকে এতটাই পূর্ণ, সুনিপুণ ও অপরূপ মনে করে? এক অদৃশ্য প্রাণ নিজের মধ্যে শ্বাস নিচ্ছে এই ভাবনাটুকুই কি সমস্ত অসম্পূর্ণতাকে ছাপিয়ে এক তীব্র পরিতৃপ্তি বয়ে আনে? ‘মা’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই কি এতো কোমল, এতো দুর্বোধ্য, এতো অভিভূত করা আবেশে ভরে ওঠে দেহমন?
দৃষ্টি বিস্ময়ে শিউরে উঠল। অদ্ভুত… সত্যিই অদ্ভুত!!অবিশ্বাস্য… অবর্ণনীয়… আর অদ্ভুতভাবে পবিত্রও।
…..অমীমাংসিত…..

১ম পরিচ্ছেদের সমাপ্তি