মাটির পিঞ্জর পর্ব ৫
নূরায়েশা মাহনূর
উজানকে প্রায় টানতে টানতেই এক নির্জন বাঁকে নিয়ে এলো বাকিরা। চারপাশে সুনসান নিস্তব্ধতা, কেবল ঘন জমাট আকাশের নিচে দূরের কোনো অরণ্যপ্রান্তর নিরবে নিশ্বাস ফেলছে। উজানের বুক উঠছে-নামছে ভারি ভারি শ্বাসে। রাগের অনল এখনও ভেতরে ক্ষীণভাবে জ্বলছে, নেভেনি পুরোপুরি।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ে দৃষ্টির রক্তমাখা বাহু। কালো বোরখার ভাঁজে জমে থাকা গাঢ় রক্তের রেখা, ক্ষত থেকে চুঁইয়ে পড়ে ভিজিয়ে ফেলছে কাপড়।উজানের চেতনায় হঠাৎ ঝড় উঠলো । সমস্ত রাগ, সমস্ত জেদ এক নিমিষে পিছিয়ে পড়লো । দ্রুত এগিয়ে আসলো সে । কণ্ঠে অজান্তের তাড়না নিয়ে বলে উঠলো,
– দেখি… কতটুকু কেটেছে?
বলেই দৃষ্টির দিকে হাত বাড়ালো উজান। আলতো করে ছুঁয়ে দেখতে চাইলো তার ক্ষতটা। কিন্তু ঠিক তখনই…এক অনভিপ্রেত ঝাঁকুনিতে দৃষ্টি নিজের হাত সরিয়ে নিলো। এমনভাবে সে সরে দাড়ালো মনে হচ্ছে উজানের স্পর্শ এক বিষাক্ত আগুন। কোনো কথা বললো না। চোখ তুলেও একবারও তাকালো না উজানের দিকে।
উজান থমকালো। আধবাড়ানো হাতটা বাতাসেই স্থবির হয়ে গেলো। ঠোঁটে জমে ওঠা কাঁচা ব্যথার স্বরে আফরার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
– আপু আপনারা আপনাদের মতো আসুন… আমি যাচ্ছি।
স্বরের নিচে অসহ্য ক্লান্তি তার। ভেতরের সমস্ত দুর্বলতা একটি বাক্যে নিঃশেষ হয়ে গেলো। কোনো অপেক্ষা করলো না সে। চোখ নামিয়ে সোজা এগিয়ে গেলো সামনের রাস্তার দিকে। তারপর হঠাৎ করেই একটি রিকশায় উঠে পড়লো । অথচ এতটুকু পথ হেঁটে যাওয়াই যথেষ্ট হতো। কিন্তু… এই মুহূর্তে তার শরীর বেদনাহত । তাই আগেভাগে সে চলে গেলো সেখান থেকে। এদিকে সবাই তাকিয়ে আছে উজানের দিকে। উজান এক হাত কোমরে রেখে আরেক হাতে মাথা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
– তোদের সম্পর্কটা আসলে ঠিক কেমন একটু বলতো উজান?
নয়নের কণ্ঠে চাপা কৌতূহল। তার কথায় উজান একবার চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। সে কিছু বলবে তার আগেই পাশ থেকে জিদান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠলো,
– তুই ওকে তোর হবু বউ বললি কেনো? তোদের কি বিয়ে ঠিক হয়ে আছে নাকি? কই আমাদের তো কিচ্ছু বলিসনি!
একেকটা প্রশ্ন তীরের মতো এসে বিঁধছে উজানের চারপাশে। আর এই আঘাতের মধ্যেই হঠাৎ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে ফেটে পড়লো তুবা। তুবার চোখের তারা টলমল করছে। দগদগে ঈর্ষায় পুড়ে যাচ্ছে সে ।
– সত্যি কি তোদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে উজান?
তুবার গলার একরাশ ছটফটানি। বিরক্ত হলো উজান। এই মুহুর্তে তার এত কৈফিয়ত দিতে ভালো লাগছে না।
– থামবি তোরা? সমস্যা কি তোদের? বাড়ি চল, তাড়াতাড়ি।
যে রাগ উজান দৃষ্টির ওপর ছুঁড়ে দিতে পারেনি, তাই এবার বাকিদের উদ্দেশ্যেই ছুড়ে দিলো । এরপর উজান পাশে দাঁড়ানো সবাইকে ঠেলে গটগট করে হাঁটা ধরলো সামনের দিকে। পেছনে তাকালো না একবারও।
জিদান, নয়ন সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার চুপচাপ। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে উজানের পেছনে হাঁটা ধরলো ।
এদিকে তুবার মুখে কথা নেই। কিন্তু ফোসফাস নিশ্বাসে নিজেকেই পুড়িয়ে ফেলছে একটানা। আফরা পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে আড়চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে।
আফরা জানে তুবার এই রাগের কারণ। তুবা অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে উজানের মাঝে। উজানের কাছে একফোঁটা গুরুত্ব খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত সে । উজান মানেই তার জীবনের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নটাই আজ সবচেয়ে নির্মমভাবে ছুঁড়ে দেওয়া হলো তার চোখের সামনে ।
বাড়ি ফিরে কারও সঙ্গে একটা কথাও না বলে সোজা নিজের ঘরে চলে গেলো দৃষ্টি। বোরকাটা শরীর থেকে খুলে নিলো ক্লান্ত ভঙ্গিতে। কাপড়টা ভারী হয়ে আছে এক অজানা গ্লানিতে। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো সে।
আয়নায় দেখা যাচ্ছে রক্তের দাগ মাখানো ছেঁড়া ব্লাউজ। ছুরির কোপটা খুব একটা ধারালো ছিল না হয়তো। বোরকার কাপড়ে ঠেক লেগে ক্ষতটা অতটা গভীর হয়নি। তবুও ব্যথাটা দগদগে হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বুকের ভেতর।
চোখদুটো আয়নায় স্থির। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠলো। নিজেকে খুব অপমানিত লাগছে নিজের কাছেই। উজান হাত বাড়িয়েছিল, ছুঁতে চেয়েছিল তাকে। শুধু ছোঁয়া নয় তার উপর অধিকার ফলিয়েছিল প্রকাশ্যে। হবু বউ বলে অন্য পুরুষদের চোখ রাঙিয়ে শাসন করেছিল…আর তাতেই বেশি অপমান বোধ করেছে সে। এই তো সেদিন…হ্যাঁ, এই তো কালকেই তো…সব মানুষের সামনে তাকে কাজের লোক বলে পরিচয় করে দিয়েছিলো উজান।
আর আজকের মাঝেই এত পরিবর্তন!দৃষ্টি কি তবে একটা খেলনা? যাকে ইচ্ছেমতো অপমান করবে, আর প্রয়োজন পড়লে একটু ছুঁয়ে দেবার অভিনয়ে সবকিছু মুছে যাবে? না, সে খেলনা নয়। সে কোনো পুতুলও নয়, যাকে যখন খুশি সাজিয়ে তোলা যায় আর যখন খুশি সরিয়ে রাখা যায় পুরনো খেলনার বাক্সে।
উজানের প্রতি আরো একরাশ ঘৃণা দানা বাঁধলো দৃষ্টির মনুষ্য অন্তরে। যে পুরুষ নিজের মুখের কথার দাম রাখতে জানে না, যে নিজের আত্মসম্মানের ওজন বোঝে না তার কাঁধে দাঁড়িয়ে কোনো নারীর স্বপ্ন রচনা হয় না। দৃষ্টির চোখে সেই পুরুষরা কেবল কাপুরুষ। কাপুরুষ, যারা ভালোবাসার নামে এক ধোঁয়াটে শব্দে নারীদের আত্মসম্মান গিলে ফেলে দিনের পর দিন।এরা দৃষ্টির কাছে কেবলই কাপুরুষ, মুখোশধারী কাপুরুষ!
দৃষ্টি আসার কিছুক্ষণ পরপরই উজানরাও চলে এলো। উজান কারো সাথে কোনো কথা না বলে সোজা চলে গেলো নিজের ঘরে। সবাই যার যার ঘরে গেলো। জিদান নয়নদের সাথে গেলো। ঘরে এসে টেবিলের উপর রাখা সব জিনিসপত্র গুলো ফ্লোরে ছুড়ে ফেললো উজান। তখন কি হয়েছিলো তার সে ভাবতে পারছে না। না না সে কোনো ভাবেই দৃষ্টিকে সহ্য করতে পারে না। কিন্তু তখন ওই ছেলের মুখে ভাবি ডাক শুনে তার এত রাগ হয়েছিলো কেনো? কেনো সহ্য হলো না তার কথাটা? দৃষ্টিসহ পুরো পরিবার তাদের শত্রু! সে কিছুতেই দৃষ্টিকে নিজের বউ হিসেবে দেখতে পারবে না। তাহলে তখন যে বলে ফেললো?
আহহহ! কী হচ্ছে এসব!? মাথার ভেতর বিস্ফোরণ হচ্ছে একটার পর একটা। চোখে আগুন, কানে কেবল নিজেরই হৃদস্পন্দনের শব্দ। উজান দু’হাতে নিজের চুলগুলো আঁকড়ে ধরলো মুঠো ভরে। মনে হচ্ছে চুলগুলো সব ছিড়ে এখনই হাতে চলে আসবে। রাগে, যন্ত্রণায়, একরাশ অপরাধবোধে ফুসছে সে। নিজেকে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। পা আপনাতেই চলে গেল বারান্দার দিকে।
হাওয়ায় ওড়ানো পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখটা পড়ে গেলো সোজা ওপাশের বারান্দায়। দৃষ্টির ঘরের দিকে।আলোটুকু ঠিকঠাক পড়ছে আয়নার উপর। আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টি।
এক হাতে কাপড়টা উঁচিয়ে রেখেছে, অন্য হাতে তুলোতে ওষুধ লাগাচ্ছে ক্ষতস্থানে। উজানের বুকটা ধক করে উঠলো। সে তো দৃষ্টিকে আঘাত করেনি,তবুও তার জন্যই দৃষ্টির গায়ে ছুরির দাগ।
যদি দৃষ্টি সেই সময় না আসতো? তাহলে আজ এই ক্ষত তো উজানের গায়ে উঠতো! দৃষ্টি… তাকে বাঁচিয়েছে।এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালো উজান। তারপর কোনো কিছু না ভেবে, দ্রুত পায়ে ছুটে চললো দৃষ্টির ঘরের দিকে।
উজানদের বাড়িটা মোটামুটি বিশাল। তার দাদার হাতে গড়া এই প্রাসাদোপম ভিটেয় শতাব্দীর ছাপ। দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে বেয়ে উঠেছে পুরনো লতা আর উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে আছে কতশত অজানা গল্পের ছায়া।
বাড়ির একেবারে মাঝ বরাবর একটা প্রশস্ত উঠোন যার চারদিকে প্রহরীর মতো ঘিরে আছে ঘরগুলো। সেই উঠোনের এক পাশে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। ইট আর কাঠের যুগল বুনটে তৈরি সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে জমে আছে পুরনো দিনের কাঠখোট্টা শব্দ।
দোতলায় উঠতেই চোখে পড়ে এক গলির মত লম্বা বারান্দা। চারপাশ ঘুরে চক্কর দিয়ে চলে যাওয়া সেই বারান্দা দোতলার প্রতিটা কক্ষে পৌঁছে দেয় নীরবে, নিখুঁতে। মাঝখানে ছাদখোলা উঠোনটা বাড়ির ফুসফুস। উপরে আকাশ খোলা আর নিচে নরম আলো-ছায়ার খেলা।
এই বারান্দার পথে ধরেই দ্রুত পায়ে হেঁটে এলো উজান। তাদের ঘরদুটো মুখোমুখি, একদম উল্টো পাশে। উজান গলি-বারান্দা ধরে ঘুরে এসে দৃষ্টির ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালো।
একটা জড়ো শ্বাস বুক ভরে টেনে নিলো উজান। কী এক অজানা সংকোচ, দ্বিধা আর রাগে মিশ্রিত সেই নিশ্বাস। দরজায় কাঁপা হাতে টোকা দিতেই দৃষ্টি ভেতরে কেঁপে উঠলো।
সে তখনো আয়নার সামনে এক হাতে সাদা কাপড় পেঁচিয়ে ধরে আছে ক্ষতটা। অন্য হাতে চেষ্টায় আছে ব্যথার উপশম করার। উজানকে দেখামাত্র কাঁধে ঝুলে থাকা শাড়ির আচলটা টেনে গায়ে চেপে ধরলো ভালোভাবে। আর কৌশলে আড়াল করলো রক্তজল করা কাটা হাতটা।
তবে সে সময় পেলো না উজানকে থামাবার। উজান কোনো ভূমিকা ছাড়াই ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়লো। তার চোখজোড়া সরাসরি ক্ষতের খোঁজ চালাচ্ছে। এগিয়ে আসতে আসতেই উজান বলে উঠলো,
– দেখি, কতটুকু কেটেছে?
দৃষ্টি কিছুটা পিছিয়ে গেলো। উজানের দিকে না তাকিয়ে বলে উঠলো,
– আপনি এখানে কী করছেন?
উজান থমকে দাঁড়ালো। চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসা তাগিদে ভরা। তার ভিতরে পুঞ্জিভূত হয়ে আছে এক রাশি অপরাধবোধ। যা রাগ হয়ে ঝরে পড়ছে ঠোঁটের কোণে।
– দেখতে এলাম কতটুকু কেটেছে। দেখা আমাকে, দেখি। তোকে কে বলেছে এত সাহস দেখাতে?
শেষ কথাটা এসে পড়লো কড়াভাবে। কিন্তু সেই কঠোরতা পুরোপুরি সত্য ছিলো না। মিছে মিছে রাগ দেখাচ্ছে সে। আদোতে নিজেই পুড়ছে অপরাধবোধে।
দৃষ্টি এখনো ফ্লোরের দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখ তুলছে না, ঠোঁটও নড়ছে না। তবু একধরনের চাপা অস্বস্তি তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। উজানের উপস্থিতি তার জন্য এখন যন্ত্রণা, আর সেই যন্ত্রণার গভীরে জ্বলছে না বলা কত প্রশ্ন।
– আমি ঠিক আছি। আপনি যেতে পারেন এখন।
উজান থেমে গেলো। ভ্রু কুঁচকে তাকালো তার দিকে।
কণ্ঠটা যতটাই ঠাণ্ডা, দৃষ্টির চোখ ততটাই উত্তপ্ত।
– দেখা আমাকে, দেখি। কাপড় বেধেছিস কেনো ইনফেকশন হবে। আমার কাছে ব্যান্ডেজ আছে চল বেধে দেই।
– আপনাকে এত উপকার করতে হবে না সাহেব। আপনি মালিক হয়ে কাজের লোকের হাতে ব্যান্ডেজ করবেন বিষয়টা অনেক দৃষ্টিকটু। আপনার বন্ধুরা শুনলে আপনার মানসম্মান ও যেতে পারে।
– দৃষ্টি, বেশি পাকামি করছিস কিন্তু!
উজান এবার ধমকে উঠলো। দৃষ্টি এবার চোখ তুলে সোজা তাকালো উজানের চোখে।
– আমি সেই ছোট বেলার দৃষ্টি না উজান ভাই, যাকে আপনি ইচ্ছে মত অপমান করবেন তবুও আমি ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে আপনার কাছে চলে যাবো।
– কি বলতে চাচ্ছিস তুই?
– ঠিকই বলছি। আমি এখন বড় হয়েছি।ভালো-মন্দ বুঝার যথেষ্ট জ্ঞান হয়েছে আমার। তাই আপনার করুণা, আপনার আদেশ, আপনার পরামর্শ কোনোটারই প্রয়োজন নেই আমার। বেরিয়ে যান। একটা মেয়ের ঘরে অবিবাহিত পুরুষের উপস্থিতি এটা খুবই বেমানান।
উজান অবাক চোখে তাকিয়ে রইল দৃষ্টির দিকে।ফ্যালফ্যাল করে একদম স্তব্ধ হয়ে। এই মেয়েটাকে সে এমন উচ্চ গলায় কথা বলতে কখনও দেখেনি। কখনও কল্পনাও করেনি। দৃষ্টি খুবই মিষ্টিভাষী মেয়ে। তার মুখের কথায় ফুল ঝরে ঝরে পড়ে। আজ তার কণ্ঠে কী তীক্ষ্ণ হাওয়া!
আগে উজান হাজারবার ধমকেছে দৃষ্টিকে। কখনো ঠান্ডা গলায়, কখনো ঝাঁঝালো সুরে কথা বলেছে কিন্তু দৃষ্টি কখনোই প্রতিবাদ করেনি। অপমান গিলেছে চুপিচুপি। অপমানে তার চোখ ভিজেছে, কিন্তু মুখে উচ্চারিত হয়নি একটাও প্রতিবাদের শব্দ।
উজান জানে দৃষ্টির আত্মসম্মান প্রবল, দগ্ধ রোদে জমে থাকা পাথরের মতো কঠিন। কিন্তু তার আশেপাশে এলেই মেয়েটা কেমন বেহায়ার মতো আচরণ করত! সব ভুলে গিয়ে তার আশেপাশে ঘুরে বেড়াত। একটার পর একটা কথা বলে যেত। মনে হতো সে একটা তোতাপাখি, চুপ থাকাটাও তার জন্য অপরাধ।
আজ সেই মেয়েটা ঠাণ্ডা গলায়, স্পষ্ট ভাষায় যা বলল তা উজানকে কাঁপিয়ে দিল। ভিতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে তার। কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। কী বলবে কোথা থেকে শুরু করবে মাথা কাজ করল না।
পাঁচটা বছর। এত বছর পরে কতটা পাল্টে গেছে দৃষ্টি! না, এখন আর সে আগের দৃষ্টি নেই। আজকের দৃষ্টিকে উজান চিনতেই পারল না। সময় তার ভিতরকার সমস্ত কোমলতা গলিয়ে নতুন করে গড়েছে একটা অসীম, অবিচল দৃঢ়তায়।
উজান শেষবারের মতো নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত মৃদু গলায় হেরে যাওয়া এক ভাঙা কণ্ঠে বলল,
– অনেকখানি কেটে গেছে তোর দৃষ্টি… একটুখানি, শুধু একটুখানি দেখতে দে আমাকে।
দৃষ্টি চোখ নামিয়ে নরম স্বরে শুধু বলল,
– বেরিয়ে যান উজান ভাই… প্লিজ।
মাটির পিঞ্জর পর্ব ৪
আর কিছু বলতে পারল না উজান। ঠোঁট নড়ল, কিন্তু শব্দ বেরোল না। কাপা কাপা পায়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল দৃষ্টির ঘর থেকে। উজান বেরুতেই দৃষ্টি এগিয়ে গিয়ে দরজার খিলটা লাগিয়ে দিল। সবকিছুর এখন নিরব অন্ত্য।
এই হাতের যন্ত্রণাটা তার কাছে কিছুই না। আসল ব্যথা তো বুকের গভীরে। যেখান থেকে প্রতিদিন রক্ত ঝরে পড়ে নীরবে। উজান যদি জানত, কত অভিমানে এমন ব্যবহার করেছে সে! যদি জানত, দিনের পর দিন নিজেকে কেমন করে পুড়িয়েছে দৃষ্টি! একবার, একটাবার যদি মনের এই ক্ষতটা দেখাতে পারত সবাইকে! তাহলে কি সবার সাথে এমন দূরত্ব হতো?
