Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯
jannatul firdaus mithila

“ মাহি!”
রমণীর ধ্যান জ্ঞান নেই। নরম তুলতুলে হাতদুটোর দৃঢ় বন্ধনে যুবককে আঁটকে ফেলার সে-কি আপ্রাণ চেষ্টা তার। হরিণী চোখদুটো কেমন দিশাহীনের ন্যায় ঝরাচ্ছে অশ্রু। যে-ই নির্দয় মানব কোনো একদিন কড়া কন্ঠে বলেছিল — সে কারো নাম মনে রাখে না, সে-ই নির্দয় মানব আজ প্রথমবার সপ্তদশীর নাম ধরে ডাকলো! অথচ বোকা মানবীর সেদিকে থোড়াই হুঁশ রয়েছে। তার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে তখনো চলছে — রূঢ় মানবের ভয়াবহ অতীতের একাংশ। কর্ণকুহরে বোধহয় গুনগুন করছে ছোট বাচ্চা ছেলেটার ক্রন্দনধ্বনি।

মুহুর্তেই অস্থিরতা বেড়ে গেল মাহি’র। কন্ঠায় নামলো খরা। দু’হাতের ধারালো নখর দিয়ে তৎক্ষনাৎ খামচে ধরল মুগ্ধের পিঠ। রমণীর এরূপ দিশাহীন কান্ডে পরপরই হতবাকতার সমুদ্রে গলা অব্ধি ডুবলো মুগ্ধ। বিস্ময় লেপ্টে গেল তার সুদর্শন মুখাবয়বে। বলিষ্ঠ দেহখানা তার, নিজ অজান্তেই ঝংকার তুলছে যেন। বুকের খাঁচায় হচ্ছে তোলপাড়। কি যেন অস্থিরতায় লাফাচ্ছে! ভীষণ বেগতিক হালতে লাফাচ্ছে অঙ্গটা। বাইরে থেকে হুট করেই প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে গেল মুগ্ধ। তার বুকের কাছে লেপ্টে আছে মানবীর ক্ষুদ্র বদন। এক অদ্ভুত শীতলতায় ছেয়ে গিয়েছে তার অন্তর। মস্তিষ্ক হলো ফাঁকা! রুশদী কিং নাহলে এমুহূর্তে নির্ঘাত হতবাকতার জেরে জ্ঞান হারাতেন বলিষ্ঠ পুরুষ।
এদিকে ক্ষুদ্র রমণী ভীত-সন্ত্রস্ত। অন্তঃকোণের বিরাট দহনে মুখ হা করে ফেলছে নিঃশ্বাস। ঝাপ্সা চোখদুটোর দৃশ্যপটে রূঢ় মানবের অতীত কল্পনা করে বড্ড আবেগি মাহি। ট্রমাটিক অতীত থেকে রাক্ষস হবার পূর্ণ দীক্ষায় দীক্ষিত হওয়া ব্যক্তিকে আগেভাগে বিচার করাটা ছিলো নেহাৎ বোকামি! তাছাড়া যে লোকের হৃদয় আঁটকে আছে কনক্রিটের দেয়ালে, তার কাছে দয়ামায়া প্রত্যাশা করাটাও ছিলো বিশাল পাগলামো। অন্তর্মুখী রমণী নাক টানলো খানিক। নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,

“ আ’ম সরি-হ!”
মুহুর্তেই কপাল গোছালো মুগ্ধ। মুখাবয়ব থেকে এতক্ষণের সকল হতবাকতার অবসান ঘটলো রমণীর শেষ বাক্যটুকুতে। সে গম্ভীর হলো এপর্যায়ে। শক্ত হাতের বন্ধনটা আরও কিছুটা দৃঢ় করল সে। পরক্ষণে দৃঢ় চোয়ালখানা পূর্বের তুলনায় খানিকটা তীক্ষ্ণ করে, বলিষ্ঠ ঘাড়টা ঝোঁকালো খানিক। মুখ রাখলো মানবীর নরম তুলতুলে কানের লতি বরাবর। কপালের চামড়া গুটিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ আর ইউ্য ওকে সিগনোরা?”
রমণী নিরুত্তর! বরং জোর বাড়ালো হাতের। সিক্ত চোখদুটো বুঁজে রেখে কম্পিত কণ্ঠে আওড়াল,
“ আমি জানিনা বিস্ট! আমি সত্যিই জানিনা আমার কি হচ্ছে! হুট করেই নিজেকে এতোটা দূর্বল কেনো মনে হচ্ছে বিস্ট? কেনো সামলাতে পারছি না নিজেকে?”

যুবক উদ্বিগ্ন! তবুও বাইরে থেকে কঠোর মুখভঙ্গি স্পষ্ট তার। তৎক্ষনাৎ বাহাতের অসামান্য জোরে আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম ঘাড়ের ত্বক। অতঃপর কোনরূপ বাক্যব্যয়ে রমণীর ছোট্ট মুখটা নিজ মুখোমুখি নিয়ে এসে, দৃষ্টি করল সরু। কাদঁতে কাদঁতে মানবীর সুশ্রী মুখমণ্ডলের সে-কি বেহাল দশা। জ্বলে চিকচিক করছে নত অক্ষিপুটের কার্নিশ। নাকের ডগায় জমেছে লাল টুকটুকে আভা। ত্বরিত ব্যাকুল চিত্তে রমণীর নরম তুলতুলে কপোল বরাবর আলতো করে হাত রাখলো মুগ্ধ। বলিষ্ঠ ঘাড়টা বেশ ঝুঁকিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে শুধালো,
“ তোকে কে বলেছে নিজেকে সামলাতে? কে বলেছে এসবের চেষ্টা করতে? আমি কি ম’রে গিয়েছি? তোর দূর্বল হতে ইচ্ছে দূর্বল হ, আমি নির্দ্বিধায় আমার বুক পেতে দিবো তোর পদতলে। তোর ভেঙে পড়তে ইচ্ছে হলে ভেঙে পড়, আমি ঠিক সামলে নিবো তোকে। শুধু শুধু নিজেকে সামলানোর ক্ষুদ্রতম কষ্টগুলো করতে হবে কেনো আমার রাণীর? তার জন্য খোদ আমি নামক রাজা তো আছি-ই!”

সহসা মানবীর ছলছলে দৃষ্টিযুগল নিষ্পলক ভাব-ভঙ্গিমা ধরলো যেন। আঁটকে গেল লোকটাতে! মাহি টের পেলো তার হৃদয় ছুটছে লাগামহীন গতিতে। রূঢ় মানবের অকপট, ভনিতাহীন স্বীকারোক্তিতে দুলে উঠেছে সর্বাঙ্গ। অবচেতন মন বাধ্য হচ্ছে লোকটার প্রতি ফের মায়ায় জড়াতে। তবে এবার যে তা কেবল — মায়া! লোকটার ভয়াবহ অতীতের সম্মুখীন হয়ে নরম হয়েছে তার পাথরসম অন্তর। তা থেকেই বোধহয় মায়ার উৎপত্তি। কিন্তু সে-ই মায়া যে স্রেফ মায়ার রুক্ষ সীমানা অব্ধি সীমাবদ্ধ। অবচেতন মনটা তার যতোই রূঢ় মানবের মায়ায় লেপ্টে যাক, আত্মসম্মানী, বিচক্ষণ মস্তিষ্ক সে-ই মায়াকে ভালোবাসার গন্ডি অব্দি পেরুতে সাফ ধিক্কার জানাচ্ছে। এহেন ধিক্কারে জর্জরিত মাহি, তক্ষুনি ঠোঁটের কোণে ফোঁটালো এক চিলতে ব্যথাতুর হাসির রেশ। শীতল হাতখানা আলগোছে উঁচিয়ে এনে রাখলো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষের ঠিক বাঁপাশে। মুগ্ধ নিস্পৃহ! গুটিয়েছে কপাল। রমণী তখন ভগ্ন কন্ঠে আওড়াল,

“ আপনি নাকি হৃদয়হীন নিষ্ঠুর! মানুষরূপী রাক্ষস!তাহলে আপনার হৃদয়টা ওমন ধুকপুক করছে কেনো বিস্ট? আমার সামান্য স্পর্শে কাঁপছে কেনো আপনার সর্বাঙ্গ?”
মুগ্ধ নিরুত্তেজ! ঘাড়টা খানিক বাঁকিয়ে, দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। গমগমে গলায় শুধালো,
“ কৈফিয়ত চাচ্ছিস?”
রমণী আলতো হাসলো। ভেজা চোখদুটোও খানিক দুলে উঠল হাসির তোড়ে। মুগ্ধ বিমুগ্ধ নয়নে দেখল সপ্তদশীর হাসিটুকু। মাহি’র দৃষ্টি এড়ায়নি তা। কন্ঠে ভারী গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে প্রতুত্তর করে সে,

“ একদম না! ফ্যাক্ট বলছি।”
সহসা ঠোঁট বাঁকায় মুগ্ধ। রমণীকে নিজের সঙ্গে ঝাপটে রেখে, বলিষ্ঠ ঘাড়টা সামান্য ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফোঁটালো ঘাড়ের সবক’টা রগ। পরক্ষণেই স্থির হলো রূঢ় মানবের ঘাড়। দৃষ্টে ফুটলো কুটিলতার ছাপ। ভারী অদ্ভুত কূটকৌশলী কন্ঠে শুধালো,
“ তুই এখনো আমার ব্যাপারে ১% ও জেনে উঠতে পারিসনি সিগনোরা! সেখানে আমায় নিয়ে ফ্যাক্ট আওড়ানো তো দূর কি বাত।”
ভড়কায় মাহি! ইতস্ততায় জড়ায় পেলব মুখখানা। মুগ্ধের কুটিল দৃষ্টিজোড়ার পানে দীর্ঘক্ষণ নেত্র ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা হলো না মানবীর। তৎক্ষনাৎ ঝুঁকে এলো তারা। জড়ানো কন্ঠে আওড়াল,
“ আপনি.. আপনি পুরো দুনিয়ার সম্মুখে যে রূপে নিজেকে জাহির করেন, আপনি এমনটা নন বিস্ট! আর কেউ না জানুক, আমি..আমি জানি আপনি এমন নন।”
মুহুর্তেই দৃষ্টিযুগল কুঞ্চিত করল মুগ্ধ। মাহি’র নরম তুলতুলে গালে ঠেকিয়ে রাখা শক্ত হাতটা সঙ্গে সঙ্গে নামিয়ে আনলো মেয়েটার চোয়াল বরাবর। সেথায় আলতো চাপ প্রয়োগ করে হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“ তাহলে, তোর মতে — আমি কেমন?”
বাক হারালো মাহি। রুক্ষ দাঁতের রুষ্ট চাপায় নিম্নাংশের অধর পিষ্ট করতেই যুবক জোর বাড়ালো হাতের। তক্ষুনি রমণীর পেলব মুখখানা উঁচু হলো কিছুটা। হতচকিত দৃষ্টি সুদর্শনের মুখপানে পড়তেই দেখল — যুবক কেমন শক্ত মুখে তাকিয়ে আছে তার পানে। মাহি হতবাক। অধর নাড়িয়ে দু’টো বাক্য আওড়াতে উদ্যোত হবে, তন্মধ্যে শোনা গেল মুগ্ধের বাজখাঁই কন্ঠ!
“ কামড় খেতে ইচ্ছে হলে আমায় বলবি! ইউ নো না? আমি এসবে কতোটা এক্সপার্ট?”
বলেই চোখ টিপলো মুগ্ধ। মানবীকে কোনরূপ উত্তর দেবার সুযোগ না দিয়ে ধীরলয়ে আগালো মুখ। তার রুক্ষ অধরযুগল প্রায় ছুঁই ছুঁই মাহি’র নরম ওষ্ঠপুট। আগ্রাসী কায়দায় মিলন ঘটবে ঘটবে ভাব, ঠিক তখনি পরিত্যক্ত কুয়ার ভেতর থেকে ভেসে এলো ভগ্ন নারী কন্ঠের দূর্বল গোঙানির শব্দ! মুহুর্তেই আঁতকে উঠে মাহি। তৎক্ষনাৎ সর্বাঙ্গ নাড়িয়ে যে-ই না মুগ্ধকে কিছু বলতে যাবে, তার পূর্বেই রমণীর তুলতুলে ওষ্ঠপুটের ওপর ক্ষুধার্ত বাঘের ন্যায় হামলে পড়ল মুগ্ধ।
এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে গেল মাহি। বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই দুরুদুরু করে উঠল তার। বেপরোয়া যুবকের ওমন আকস্মিক স্পর্শে তার সমস্ত সত্তা কেঁপে উঠলেও, এমুহূর্তে রমণীর প্রতিবাদের ভাষা নেই। উপায়ন্তর কায়দায় কেবল বিস্ফারিত নয়নে তাকিয়ে রইলো সম্মুখের সুদর্শন পুরুষটির দিকে। যিনি আপাতত উন্মত্তের ন্যায় অধরসুধাপানে মত্ত! তাঁর রুক্ষ আঙুলের ডগাগুলো ধীরলয়ে এগোচ্ছে মানবীর চুলের গোড়ায়। সেথায় আলতো চাপ প্রয়োগ করে মুহুর্তেই ক-গাছি চুল আঁকড়ে ধরে মুগ্ধ। ডুব দেয় প্রমত্ততায়!

সময়ের ব্যবধানে কপোতীর অধীরতা ক্রমশ বেড়ে যেতেই হাসফাস করতে লাগলো সে। মোচড়াতে লাগল রূঢ় মানবের দৃঢ় বাহুবন্ধনে। তা টের পাওয়া মাত্রই অনিচ্ছাসত্ত্বেও অধরযুগলে দূরত্ব সৃষ্টি করল মুগ্ধ। বুকের ওঠানামার গতি অসামান্য তাঁর, ধীরলয়ে কপাল ঠেকালো মাহির কপালে। এদিকে বেপরোয়া যুবকের লাগামহীন প্রমত্ততার হাত থেকে ছাড়া পেতেই, প্রাণপনে ফিরে পাওয়া একফোঁটা বাতাসের ন্যায় বুকভরে নিঃশ্বাস টানতে লাগলো রমণী। অস্থিরতায় কাঁপছে তার সর্বাঙ্গ! মুহুর্তখানেক নীরবতায় বুদ থেকে আচানক শুকনো ঢোক গিলে মাহি। পর ক্ষীণস্বরে আওড়াতে গেল—

“ কুয়া থেকে কার যে….!”
বাকিটা বলার ফুরসত পায়নি বেচারি। তার আগেই শুরু হলো বেহায়া লোকের পূর্বের ন্যায় বেলাজা কার্যকলাপ। ফের আশ্লেষে টেনে ধরল রমণীর সিক্ত অধরযুগল। মাহি এবার বড্ড বিরক্ত! কপাল কুঁচকে দু’হাতে অনবরত ঠেলতে লাগলো রূঢ় মানবের রুক্ষ বক্ষ। কিন্তু বালাইষাট! কাজ আর হলো না তাতে। লোকটা সরলোও না, থামলোও না। অসহায় রমণী হাল ছাড়ল এপর্যায়ে। প্রস্তরখন্ডের ন্যায় জমে রইলো লোকটার বক্ষে। সময়ের কাঁটা বেশ খানিকটা পেরুতেই থামলো মুগ্ধ। বিচ্ছিন্ন করলো রমণীর রক্তিম ওষ্ঠপুট! কুটিল দৃষ্টিজোড়ায় রমণীর পেলব মুখখানা আবদ্ধ করে নিয়ে হিসহিসিয়ে শুধালো,
“ সবকিছু কানে নিতে নেয়া ঠিক না মা’ই গার্ল! তোর আগ্রহের সবটুকু আকর্ষণে কেবল আমার নাম রাখ। আমি বাদে অন্য কিছুতে আগ্রহ দেখাতে গেলে ক্ষতিটা তোর-ই হবে।”
মাহি নির্বাক। লজ্জা, অভিমান এবং অপ্রকাশিত সন্দিগ্ধতার অদ্ভুত এক মিশ্রণে দ্বিধায় জড়ালো মানবী। অন্তঃকোণে প্রশ্ন জাগলো —

“ কি আছে ঐ কুয়োতে? কে আছে ঐ কুয়োর ভেতর? কুয়োর প্রসঙ্গ উঠতেই লোকটা এমন ভাব পাল্টালো কেনো? আমাকে কোনরূপ প্রশ্ন করার সুযোগ দিচ্ছে না কেনো?”
এরূপ ভাবনায় বিভোর রমণী, ছোট্ট মস্তিষ্ক জুড়ে কৌতুহলের কেঁচো গিজগিজ করতে লাগলো বোধহয়। মুখগহ্বরে অধর নাড়িয়ে ফের অধর নাড়াতে যাবে ঠিক তখনি ওষ্ঠপুট বাড়ায় মুগ্ধ। ত্বরিত নাক-মুখ কুঁচকে নেয় মাহি। কপট ঝাঁঝ দেখিয়ে শুধায়,
“ থামুন অসভ্য লোক!”
থামলো মুগ্ধ। জিভ ঠেললো গালের ভাঁজে। চোখেমুখে একপ্রকার দুষ্টুমির ছাপ ফুটিয়ে আওড়াল,
“ ইউ নো হোয়াট হটি? আ’ম থিংকিং সামথিং।”
ভ্রু গুটিয়ে তাকায় মাহি। জিজ্ঞেস করে,
“ কি?”
সহসা চৌকা দৃষ্টিতে তাকালো মুগ্ধ। ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রতুত্তর করল,

“ তুই যেহেতু স্বেচ্ছায় আমায় জড়িয়ে ধরেছিস, তারমানে ইউ ওয়ান্ট মি! দেন হোয়াই ওয়েস্ট এনি মোর টাইম? লেটস গেট ইন্টিমেট।”
মুহুর্তেই চোখদুটো খিঁচে নেয় মাহি। মনে মনে কয়েকবার গালমন্দ করে নিজেকে, কেন যে মায়া দেখিয়ে লোকটাকে জড়িয়ে ধরতে গেলো! এবার খেসারত ভুগুক। বোকা মানবী নিজ মনে ভাবনায় মত্ত বলে তক্ষুনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টে রমণীর ঠিক পেছনে থাকা কুয়ার পানে তাকায় মুগ্ধ। চোয়াল করে শক্ত! অভ্যন্তরে কোনো কিছু নিয়ে বিশাল ছক কষছে সে। ভাবছে দক্ষ কৌশল! মানবীকে অন্য ভাবনায় ঢুকিয়ে দিয়ে, পরপরই তাকে কোলে নিয়ে পা ঘোরালো উল্টোপথে। হাঁটতে হাঁটতে মুখভঙ্গি পাল্টাচ্ছে মুগ্ধ! দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় কন্ঠে চাপাআক্রোশে শুধায়,
“ “ভি, সুকিনি দেতি, দাঝে নি আদনই ভেশ্চি নরমালনা স্দেলাত্ নে মোঝেতে!”
( কু***বাচ্চারা সামান্য একটা কাজও ঠিকমতো করতে পারে না। অকর্মক কতগুলো!)

ধুপধাপ কদমে অন্দরমহলে প্রবেশ করল মুগ্ধ। কোলে তার আদুরে সপ্তদশী! মুখ ভার করে রেখেছে মায়াবিনী। হাঁটতে হাঁটতে আড়চোখে তা বারকয়েক দেখল মুগ্ধ। এতক্ষণ যাবত নির্বিকার থাকলেও এবার কেমন গমগমে গলায় বলে ওঠল,
“ তোর জামাই ম’রছে?”
ত্বরিত ভড়কায় মাহি! সহসা মুগ্ধের পানে সন্দিগ্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে শুধালো,
“ হোয়াট ননসেন্স! বিয়ে-ই তো করলাম না এখনো।”
তৎক্ষনাৎ থমকে দাঁড়ালো মুগ্ধের ব্যস্ত পদযুগল। চোয়ালের পেশি হলো টানটান। দৃষ্টিতে তীক্ষ্ণতা লেপ্টে, ঝাঁঝালো কণ্ঠে শুধালো —
“ হোয়াট দ্য ফা’ক! ওসব বা*ল-ছা*ল করতে হবে কেনো? বিয়ে ছাড়াই তো আমি আছি।”
মাহি আর কথা বাড়ালো না। নির্মল মুখখানা শক্ত করে নিয়ে কুলুপ আঁটলো মুখে। মুগ্ধ একমুহূর্ত স্থির তাকিয়ে রইলো। পরমুহূর্তেই মানবীকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে হাত গুঁজল পকেটে। চঞ্চলা চড়ুই ছাড়া পেয়েই কদম বাড়ালো সম্মুখে। মধ্যকার দুরত্ব খানিকটা বাড়াতেই পেছন থেকে ভেসে এলো মুগ্ধের গমগমে কন্ঠস্বর!

“ সোজা ঘরে যা ঘাড়ত্যাড়া দেড়ব্যাটারী। চড়ুই ডাকছি বলে আমার অনুমুতি ছাড়া এদিক-ওদিক উড়োউড়ি করতে যাস না যেন, নয়তো সোজা ডানা কেটে দিবো কিন্তু!”
থমকায় মাহি! ঘাবড়ে গেলো পরক্ষণে। শরীর ঘুরিয়ে তাকালো না আর। মাথাটা কেবল কাত করে সম্মতি দিলো নিরবে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রূঢ় মানব ততক্ষণে ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপেছে। ধরিয়েছে লাইটার! মানবীর ওমন নিরব সম্মতিতে হাসলো সে। মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া টেনে বিড়বিড়ালো,
“ এতো বাধ্য?”
বিড়বিড়িয়ে বলা বাক্যটুকু কেবল নিজ অব্দি সীমাবদ্ধ রাখলো মুগ্ধ। অদূরে নিষ্পলক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো যতক্ষণ রমণীকে দেখা যায়, ঠিক ততক্ষণ! মানবীর ক্ষুদ্র দেহখানা যে-ই না দৃষ্টির বাইরে গেল, ওমনি রঙ পাল্টালো রূঢ় মানবের মুখাবয়ব। ফিরলো চিরচেনা নির্দয় খোলসে। তক্ষুনি পাদুকা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দাম্ভিক কদম বাড়ায় মুগ্ধ। কিছুটা পথ এগোতেই হুট করে তার পেছনে সাগরেদ হিসেবে যোগ দেয় এডউইন। তার উপস্থিতি টের পেয়েই দাঁত খিঁচল মুগ্ধ!
“ তুই থাকতে ও জঙ্গলে গেলো কি করে বাস্টা’র্ড? কোথায় ম*রতে গিয়েছিলি তুই? আর কুয়ার মুখ খোলা কেনো? ঐ মহিলার মুখে স্কচটেপ লাগাসনি? চিৎকার করছিলো কেনো কু***বাচ্চাটায়?”
এডউইন গম্ভীর মুখে ঢোক গিললো খানিক। মুহুর্ত ব্যয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে সম্মুখে অগ্রসর নির্দয়ের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,

“ মনস্তার! আপনি যখন কুয়োতে ছিলেন তখন…”
সহসা ব্যস্ত পাদু’টো থামলো মুগ্ধের। উত্তরের অপেক্ষা করবার পূর্বেই এডউইন বলে ওঠে,
“ তখন আপনার সিগনোরা নাচঘরে ঢুকেছিল। তার কিছুক্ষণ পরেই হিমাংশু রায় আর তার স্ত্রী ঢুকলেন! তাদের মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। আর….তারপর ”
“ ডিড দ্যাট মা’দার ফা–কা-র টাচড মা’ই গার্ল?”
কথার মাঝে ওমন রুখ পড়ায় থমকায় এডউইন। পরক্ষণেই রূঢ় মানবের ওমন ভয়ানক কন্ঠে আঁতকে উঠে সে। থতমত খেয়ে কি বলবে না বলবে তা নিয়ে চিন্তায় মগ্ন হতেই, সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া বিস্ট আচমকা শরীর ঘুরিয়ে আক্রমণ বসালো ভোলা ভালা এডউইনের কন্ঠনালী বরাবর। মুহুর্তেই ভড়কায় এডউইন! রূঢ় মানব তাঁর শক্ত হাতের জোরালো জোরে বেচারার পাদু’টো শূন্যে তুলতে তুলতে হুংকার ছুঁড়ে বলল,
“ আ’ম ফা*কিং আস্কিং ইউ সামথিং বাস্টা’র্ড! ডিড দ্যাট মাদা’র ফা**কার টাচড মাই গার্ল? ডিড হি?”
সহসা ওপর নিচ মাথা নাড়ায় এডউইন। তক্ষুনি বেচারার কন্ঠ ছেড়ে দিলো মুগ্ধ। সঙ্গে সঙ্গে বেচারা ছিটকে পড়ল জমিনে। বুকের ওপর হাত চেপে কাশতে কাশতে একপলক তাকালো রূঢ় মানবের পানে। ওমনি চমকে উঠে সে! ট্যাটু শৈলীতে অঙ্কিত বলিষ্ঠ হাতদুটোর ওপরে শার্টের গোটাচ্ছে মাফিয়া মনস্টার। মুখাবয়ব জুড়ে তাঁর তীব্র রাগ! দাঁত খিঁচে কেবল আওড়াল,
“ তেল গরম কর! আর ডোডো কে রেডি কর!”

মাথাভর্তি ক্ষীণ যন্ত্রণা! চুলের গোছায় জমেছে খানিক ব্যথা। চঞ্চলা চড়ুই আর ছুটছে না। হাঁটছে ছোট ছোট কদমে। ধীরলয়ে সামান্য এগোতেই মানবীর মনের কোণে হুট করে উত্থাপিত হলো এক অদ্ভুত ইচ্ছে। রূঢ় মানবের কক্ষে গতকাল দেখেছিল — একখানা টেলিফোন। তাতে লাইন আছে কি-না কে জানে! লাইন থাকলে অবশ্য বাড়িতে একটা কল দিতে পারবে সে। বাবার জন্য বুকটা বড্ড পোড়াচ্ছে তাঁর। খানিকটা কথা বলতে পারলে যদি স্বস্তি মিলে! তাছাড়া নির্দয় লোকটা তো এদিকে নেই আপাতত। তাহলে তার কক্ষে গিয়ে ফোন ইউজ করলে সে থোড়াই টের পাবে! বোকা সপ্তদশীর সে-কি চিন্তার জোর। এহেন চিন্তার জোরে ত্বরিত পা ছোটালো বিপরীত বারান্দার দিকে।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ! দু’হাতে কক্ষের দুয়ার ঠেলে দিতেই, সম্পূর্ণ কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে থাকা রূঢ় মানবের পুরুষালী পারফিউমমের ঘ্রাণটা কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল মাহি’কে। মাহি মুগ্ধ হতে গিয়েও সময় নষ্ট করলো না। সহসা কক্ষে প্রবেশ করে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলে বন্ধ করে দিলো কক্ষের দুয়ার। অতঃপর সন্ধানী চোখে এদিক-ওদিক তাকাতেই একপর্যায়ে তার দৃষ্টি গিয়ে আঁটকে গেল — অদূরের বেডসাইড টেবিলের ওপর সজ্জিত এন্টিক টেলিফোনখানা! রমণী স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সামান্য। ত্বরিত পায়ের জোর বাড়িয়ে ছুটলো বিছানার ধারে।
মাহি’র ক্ষুদ্র বদনখানি কাঁপছে ভীষণ! কম্পিত হাতদুটো বাড়িয়েছে ফোনের দিকে। মনে বড়ো সংশয় তার। ফোনে যদি লাইন থাকে তখন? পারবে সে বাড়িতে কল দিতে? পারবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে? এরূপ চিন্তায় হাসফাস করছে রমণী। রূঢ় মানবের ভয়ে একবার হাত গুটিয়ে নিচ্ছে, তো পরক্ষণে পরিবারের সঙ্গে একটুখানি যোগাযোগের লোভে বাড়িয়ে দিচ্ছে হাত।

অন্তঃকোণের দোলাচালে একপ্রকার অতিষ্ঠ মাহি। চোখদুটো সহসা কুঁচকে নিয়ে কম্পিত হাতে আচমকা আঁকড়ে ধরল ফোনটা। অতঃপর তা একটানে তুলে এনে কানে ঠেকাতেই ফোনের ওপাশ থেকে ঝিরঝিরে টুংটাং শব্দ শুনতে পেলো সে। মুহুর্তেই রমণীর পেলব মুখখানায় একটুকরো আশার আলো দেখা গেল যেন। সে তৎক্ষনাৎ কাঁপা কাঁপা হাতে টেলিফোন স্ট্যান্ডে আঙুল চাপলো। বাড়ির ল্যান্ডলাইনের নম্বরখানা বেশ মনে আছে তার। চটজলদি টুকলো সব-কয়টা নম্বর। তড়িঘড়ি করে কলে চাপতেই রিং হতে লাগলো ফোনটায়। মানবী অধীর আগ্রহে ফোন কানে ঠেকিয়ে বসে রইলো রিসিভ হবার অপেক্ষায়। বুকটা বড্ড ধুকপুক করছে তার। ফোনে রিং হচ্ছে একদিকে, আর অন্যদিকে তার হৃৎস্পন্দনের গতি তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড অতিবাহিত হলো! কল কেটে যাবে যাবে যোগাড়। আশাহত মানবী মুখ ভার করার প্রস্তুতি নিতেই ওপাশ থেকে আচমকা কেউ একজন রিসিভ করলেন কল। চিরচেনা দৃঢ় কন্ঠে আওড়ালেন,

“ হ্যালো? এহসান’স হিয়ার। কে বলছেন?”
সপ্তদশী ভঙ্গুর হলো মুহুর্তেই। বহুল পরিচিত এবং কাঙ্ক্ষিত দু’টো সুধাবাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই কন্ঠরুদ্ধ হলো বোকা মানবীর। কান্নারা চোখদুটোর কোটর ছাড়িয়ে এক্ষুণি বোধহয় বেরিয়ে আসবে তাঁর। গলার কাছটায় অনুভুত হচ্ছে অসহ্য চিনচিনে ব্যথা। রমণী ঢোক গিললো পরপর। জিভের ডগা ভারী হওয়ায় বাক্য না বেরুলেও, এলোমেলো নিঃশ্বাসের ছন্দ ঠিক ভেদ করলো টেলিফোনের রিসিভার। টেলিফোনের ওপাশে থাকা ব্যস্ত মধ্যবয়সী রমণীর কর্ণকুহরে স্পষ্ট প্রবেশ করল, এরূপ এলোমেলো নিঃশ্বাসের শব্দ! মুহুর্তেই রমণী থমকালেন যেন। দূর্বল দেহে কম্পন হলো আচমকা। পায়ের তলায় জমিনটা বোধহয় খানিক নড়ে উঠল। যার তাল সইতে না পেরে দূর্বল রমণী ধপ করে বসে পড়লেন পাশে থাকা সোফার নরম গদিতে। তিনি জানেন না তাঁর মমতায় আচ্ছাদিত হৃদয়টা ওমন কাঁপছে কেনো। তিনি জানেন না ফোনের ওপাশে কে আছে! তবুও মমতাময়ী সে-কি টান অনুভব করছে দেখো। বিভ্রমে কাঁপা কাঁপা অধরের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে আওড়াল —

“ ক-ক-কে?”
সপ্তদশী ত্বরিত চোখদুটো বুঁজে নিলো। ওতোগুলো দিন পর মায়ের কন্ঠখানা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই বুক ভারী হয়ে এলো মানবীর। কন্ঠ ফুঁড়ে উপচে বেরিয়ে আসতে চাইলো কান্নাগুলো। মানবী সর্তকতার লক্ষ্যে তক্ষুনি অধর কামড়ে ধরল। নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়ে, মুহুর্ত ব্যয়ে ভারী কন্ঠে কেবল প্রতুত্তর ছুঁড়ল —
“ আম্মু-হ!”
সহসা হৃৎস্পন্দন থমকে গেল মাইমুনা বেগমের। থমকে গেল তার অভিব্যক্তি। দীর্ঘদিনের নির্ঘুম চোখদুটো সঙ্গে সঙ্গে ভরে উঠল যেন। কাঁপতে লাগলো দূর্বল দেহখানা। হতবাক কন্ঠে শুধালেন,
“ মা-মাহি? মা-মাহি?”

এবার আর নিজেকে ধরে রাখার সাহস হলো না মাহি’র। কেঁদে উঠল ডুকরে। তাঁর কান্নার প্রতিটি শব্দ যেন তীরের ফলার ন্যায় বিঁধতে লাগলো মমতাময়ীর দূর্বল হৃদয়ে। মমতাময়ী নিজেও মেয়ের বিচ্ছেদে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে আওড়ালেন,
“ আমার মা! মা…কেমন আছিস তুই মা? তুই.. ঠিক আছিস মা? তুই কোথায় মা?”
কান্নার তোড়ে হেঁচকি তোলবার যোগাড় মাহি’র! অস্ফুটে শুধায়,
“ আম্মু! তোমরা সবাই কেমন আছো আম্মু? আব্বু কেমন আছে? বড় আব্বু, মেজো আব্বু, কাকাই ওরা কেমন আছে? আহি কেমন আছে আম্মু? ও কি এখনো কলেজে যাওয়ার সময় ব্যাগ নিতে ভুলে যায়? ও এখন একা একা জটিল ম্যাথম্যাটিক্সগুলো করতে পারে আম্মু? আর.. আর পুতুল? পুতুল সোনা কেমন আছে আম্মু? ও ঠিকমতো স্কুলে যায় তো? অরিপু কেমন আছে? ইকরা আপু, অনি ভাইয়া, রোদ ভাইয়া ওরা সবাই কেমন আছে? আর..আর ফুপ্পি? ওরা…
“ আরে থাম না-রে বাচাঁল মেয়ে! আর কতবার ভালো আছে, ভালো আছে করবি? এগুলা তোর ফ্যামিলি মেম্বার’স না-কি গোটা একটা গ্রামের জনগণ? তোর দাদা বান্দীর ছেলে সময় কালে সঠিক জিনিস ইউজ করেনি কেন? না-কি তার ওদিকে ফার্মেসি ছিলো না? এতো এতো পাগল-ছাগল পয়দা করলো কি করে বান্দীর ছেলেটায়?”

কথার পথিমধ্যে ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা রূঢ় মানবের এহেন খিটখিটে বাক্যে যারপরনাই হতবাক মাহি। নিজ ভুল হচ্ছে ভেবে তক্ষুনি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে এনে সম্মুখে তাক করলো। ওমনি ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো মাইমুনা বেগমের হতচকিত কন্ঠস্বর!
“ মাহি? মাহি? তোর সঙ্গে ঐ জা*নোয়ার ছেলেটা বসে আছে নাকি?”
কথাটা শেষ হবার ফুরসত হলো না মাইমুনা বেগমের। তার পূর্বেই মাহি’র লাইনে মিউটেশন অন করে এক্সটেনশন থেকে ধেয়ে এলো রূঢ় মানবের ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠস্বর!
“ ও শাশুড়ী আম্মাআআআআআআআআ! কেমন আছেন গো? নিজের মেয়ের জামাইকে কেউ এভাবে বলে না-কি শাশুড়ী আম্মাআআআআআআআআ? যে জায়গায় আপনার উচিৎ জামাই ষষ্ঠীর আয়োজন করা, সে জায়গায় আপনি আমায় এমনভাবে গালমন্দ করছেন? ধূর! দুষ্ট মেয়ে!”
মুহুর্তেই সর্বাঙ্গে আগুন জ্বলে উঠল মাইমুনা বেগমের। দাঁত করল কিড়মিড়!

“ মুখ সামলে কথা বলো বেয়াদব ছেলে।”
“ ওটাই তো আমি পারি না শাশুড়ী আম্মাআআআআআআআআ! আপনি দেখেননি আমি কেমন? তারপরও এমন দিবাস্বপ্নের কথা বলেন কেমনে?”
দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল মাইমুনা বেগমের। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল মুগ্ধের শ্লেষাত্মক কন্ঠ!
“ এমনিতে আপনার হাতের খাবার খাওয়ার দূর্ভাগ্য হয়নি শাশুড়ী আম্মাআআআআআআআআ! তবে আপনার বানানো জিনিসটা রোজ খাচ্ছি! উফফ…. হেব্বি টেস্ট বুঝলেন?”
কপাল গোছালেন মাইমুনা বেগম। ফোনের ওপাশ থেকে পরপরই কর্কশ কন্ঠে শুধালেন,
“ কি বলতে চাইছো তুমি? আমার বানানো জিনিস মানে? আমিতো এখন পর্যন্ত তোমায় কিছু দেইনি। দিলে অবশ্যই বি ষ মিশিয়ে দিতাম। তুমি কোনটার কথা বলছো বেয়াদব?”

“ হায় হায়! জানেন না? আপনার মেয়ের কথা বলছি যে! আপনার দ্বারা বানানো আমার পার্সোনাল আচার সে। একবার মিষ্টি, একবার টক, আরেকবার ঝাল! উফফ…. হোয়াট আ কম্বিনেশন শাশুড়ী আম্মাআআআআআআআআ! হোয়াট আ কম্বিনেশন! জাস্ট চুমু টাইপ!”
সহসা ঘৃণায় মুখ কুঁচকে নিলেন মাইমুনা বেগম। দাঁত খিঁচে অধর নাড়াতে উদ্যোত হবেন, তার পূর্বেই রমণীর হাতের মুঠো হতে ল্যান্ডলাইন ফোনটা ছো মে’রে টেনে নিলো অনিক! এহসান পরিবারের দ্বিতীয় রত্ন। সুদর্শন পুরুষ ফোনটা কানে তুলেই বলে ওঠে,
“ হেই ইউ রাস্কেল!”
তৎক্ষনাৎ চোয়ালের পেশি টানটান হলো রূঢ় মানবের। ডেস্কের ওপর তুলে আনলো পাদু’টো। পিঠ এলিয়ে দিলো দিলো চেয়ারের গায়ে। কটমটিয়ে শুধালো,
“ ওরে শালা! কি রে? তোকে না গু লি করেছিলাম? তুই এখনো বেঁচে আছিস? ভেবেছিলাম ম’রে -ট’রে গেলে মাটি দিয়ে আসবো। তোর তো দেখছি কৈ মাছের প্রাণ!”
চোয়াল শক্ত করল অনিক! কন্ঠে নামালো ঝাঁঝ!

“ আমার বোনকে তোর মতো জা*নোয়ারের কব্জা থেকে ফিরিয়ে না আনা অব্ধি, আমি ম’রছি না।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই গা দুলিয়ে হেসে ওঠে মুগ্ধ! মুহুর্ত খানেক যেতে না যেতেই সে-ই হাসি মিলিয়ে গেল বাতাসের ঝাপটায়। মুখাবয়ব হয়ে উঠল কঠোর! দাঁত খিঁচে বলে ওঠল,
“ আসিস তবে কু****বাচ্চা! এমনিতেও তোদের মতো উচ্ছিষ্ট গুলো পৃথিবীতে থেকে শুধু শুধু অক্সিজেন নষ্ট করছে! এ সুযোগে তোদের মে’রে দিয়ে পৃথিবীর অক্সিজেন বাঁচানোর কাজটা নাহয় করে ফেলব!”
বলেই কলটা খট করে কেটে দিলো মুগ্ধ! বাহাতের আঙুল দিয়ে এক্সটেনশনে চাপ বসাতেই সপ্তদশীর ফোনের মিউটেশন কেটে গেল মুহুর্তেই। ভয়ার্ত রমণী সামান্য ঢোক গিলতেই ওপাশ থেকে ধেয়ে এলো রূঢ় মানবের ক্ষিপ্ত কন্ঠস্বর!

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৮

“ কলিজায় খুব বেশি সাহস হয়ে গিয়েছে তোর তা-ই না? ঠিক আছে! ড্রয়ারে একটা স্লিভলেস রেড কালার নাইটি পড়ে আছে। গো এন্ড অর দ্যাট! আ’ম কামিং। নাচতে তো পারিস-ই, সো আজ সারারাত তোর নাচানাচি চলবে জাস্ট! তবে নাচটা নাচাবো আমি, তাও আবার আমার পছন্দের, আমার ওয়েতে। বান্দীর মেয়ে!”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫৯ (২)