Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৬
Tahmina Akhter

….আসব?
কাব্যের কন্ঠস্বর শুনে আলো শোয়া থেকে উঠে বসল। মাহরীন অসহায়ের মত তাকালো কাব্যের দিকে। কাব্য ইশারায় ওর মা’কে রিলাক্স মুডে থাকতে বলল। কাব্য আলোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো দুই হাত দূরত্ব রেখে। তারপর, শান্তসুরে বলল,

— আজ আমার রিসিপশন। অথচ, সাত সকালে তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি, আলো। কারণটা কি জানো? তুমি আমাদের কাছে ভীষণ দামী একজন মানুষ। তোমার কারণে সেদিন আমাদের মা সেইফলি বাসায় যেতে পেরেছিল।
— উপকার করা একজন দায়িত্বশীল মানুষের কর্তব্য। এই কথা আপনিই আমাদের বলেছেন, স্যার। উপকার করে প্রতিদান নেয়া কি উচিত?আলোর শেষ কথাটি শুনে মাহরীন এবং কাব্য দুজনে একে অপরের মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল।
পরক্ষনেই আলোর কথা ভাবার্থ টের পেয়ে কাব্য এবং মাহরীন বিস্মিত হয়ে যায়। মাহরীন আলোর হাত ধরে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— তুমি ভুল বুঝছো, আলো! তোমার সঙ্গে আমাদের কোনো দেনা-পাওনার সম্পর্ক হতেই পারে না।
পৃথিবীতে সব সম্পর্ক কি আর রক্তের সম্পর্কের কারণে হয়? কিছু কিছু সম্পর্ক আত্মার সম্পর্ক হয়। যাকে বলে “আত্মার আত্মীয়”। তোমাকে দেখার পর থেকে আমার কেমন যেন আপন আপন লাগে! তুমি আমার সঙ্গে আজ যেতে না চাইলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু, আমি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাই। অন্তত এই রাইট’স তুমি আমাকে দেবে আলো। একটা বুড়ি মা শেষ বয়সে এসে একটা মেয়ের অভাবে ভুগছে। তুমি কি চাও সেই মানুষটা একটা মেয়ের অভাব পেয়ে মরুক?

আলো স্তম্ভিত। ব্যথিত নয়নে তাকিয়ে রইল মাহরীনের দিকে। কাব্যের চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। ইদানিং তার মা কেন জানি ইমোশনাল কথাবার্তা বলে? কেন বলে? তার মায়ের ভেতরে কি এমন চলছে? ছোটবেলা থেকে যে মায়ের কাঠখোট্টা টাইপকথা শুনতে শুনতে বড় হয়েছে। সেই মা এখন এত নরম, এত আদুরে সুরে কথা বলে!
হুট করে কাব্যর মোবাইলে কল আসে। সে বের হয়ে যায়। এদিকে মাহরীন আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শেষমেষ হাল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মাহরীন। পরমুহূর্তে মাহরীন অনুভব করল তার হাতের মাঝে আলোর ছোট হাতের স্পর্শ! মাহরীন আলোর দিকে ফিরে তাকালো। আলো মুচকি হেসে বলল,

—আপনার আত্মার আত্মীয় হতে চাই, আন্টি। আমাকে মেয়ে বানানোর লোভ দেখিয়ে আবার মাঝপথে ছেড়ে চলে যাবেন না যেন? আমি সহ্য করতে পারব না। কারণ, এই আমিটা ভীষণ শূন্য!
মাহরীনের চোখ ভিজে ওঠার আগে নিজেকে সামলে ফেলল। আলোর মাথায় হাত রেখে বলল,
— তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এসো। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য।

মাহরীন চলে গেল। আলোর কেন জানি মাহরীনকে ফিরিয়ে দিতে ইচ্ছে করল না। মানুষটা হয়ত সত্যি অনেক ভালো মনের মানুষ। এই যে তাদের ছোট কুটিরে এসে বেতের মোড়ায় বসে রঙ চা খেলো হাসিমুখে, এটা কি কোনো নিরহংকার মানুষ ছাড়া আর কেউ করতে পারবে? আলোর আট ফিটের ঘরটায় একটা ছোট খাট, একটা পড়ার টেবিল ছাড়া কিছুই নেই। আলোর খাটে এসে যখন মাহরীন বসল তখন এই ঘরের সৌন্দর্য যেন মাহরীনের সৌন্দর্যের সামনে ফিকে হয়ে গেল। কিছু সময়ের মধ্যে আলো নিজের মনের মাঝে চলা কিছু কথার প্যাঁচ কাটল। গতকাল, হয়ত আলোর অবস্থান সম্পর্কে জানত না তাই আলোকে নিতে আজ সকালে মাহরীন এবং কাব্য এসেছে। কিন্তু, এখানে আসার পর তো তারা আলোর অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ ধারনা পেয়েছে। চাইলেই কিন্তু তারা চলে যেতে পারত। কিন্তু তারা যায়নি। ঠিক গতকালের মত আলোকে কাছে টানার কি প্রয়াস মাহরীনের মাঝে, তা ব্যাখাতীত।

— তা মহারাণী, শেষমেশ কাউরে পটাইতে পারলি?
আলো সবেমাত্র চুলগুলোতে হাত দিয়েছিল। এমন সময় সিতারা বেগম ঘরে ঢুকে কথাটি বলল। আলো খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বলল,
— এসব কি কথা বলো, তুমি? উনারা কেমন তুমি জানো?
– জানি, জানি সবই। কিন্তু, কারো পটাইতে যাইয়া আবার পেট বাঁধাইস না। আমার চিন্তা না করলে নাই। কিন্তু তোর বাপের মুখে চুনকালি লাগাস না।
সিতারা বেগম কথাগুলো বলে চলে গেল। আলোর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরল। কি হচ্ছে আর কি ভাবছে তার সৎ মা?
মানুষের মন এত কলুষিত! এতটা নীচ তাদের মন-মানসিকতা!
নীচ থেকে এবার গাড়ির হর্ণের শব্দ ভেসে এলো। আলো মাথায় ওড়না জড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। বাড়ির সামনে অনেক মানুষ জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। আলোকে দেখে দুজন বৃদ্ধ এসে জিজ্ঞেস করল,

— আলো এরা কারা? তোদের বাসায় কি করে?
আমার স্যার এবং স্যারের মা এসেছে।
কথাটি বলে আলো আর অপেক্ষা করল না। সোজা মাহরীনের কাছে চলে গেল। নয়ত বুদ্ধাগুলো প্রশ্ন করতে করতে পাগল করে ফেলত। মাহরীন গাড়ির দরজা খুলে আলোকে গাড়িতে উঠে বসার জন্য ইশারা করল। আলো গাড়িতে উঠে বসল। মাহরীন দরজা লাগিয়ে ওপর পাশে গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে কাব্য। গাড়ি এবার ধীর ধীরে চলতে শুরু করল। দশ মিনিট অতিক্রম হবার পর গাড়িটা ধীরে ধীরে দক্ষিণ খুলশী আবাসিক এলাকার দিকে চলতে শুরু করল। তার কিছুক্ষন পরেই দশতলা একটা বিল্ডিংয়ের সামনে গিয়ে গাড়িটা থেমে গেল। আলো জানালা দিয়ে দেখল চমৎকার বাড়িটাকে। ছাদ থেকে একদম নীচতলা পর্যন্ত বাড়িটাকে ঝাড়বাতি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে।

নেমে এসো আলো।
মাহরীনের ডাক শুনে আলো গাড়ি থেকে নেম পরল। তারপর, মাহরীনের পেছনে পেছনে বাড়িতে প্রবেশ করল আলো। বাড়িটা বাইরে থেকে যতটা সুন্দর তারচেয়ে বেশি সুন্দর অন্দরমহলে। মাহরীন যেতে যেতে কিছু খুটিনাটি তথ্য শেয়ার করল আলোর সঙ্গে।
ছাঁদে ডেকোরেশন করা হয়েছে রিসিপশনের। দশতলা বাড়িটা মূলত তাদেরই। নীচ থেকে তিনতলা পর্যন্ত উনারা ব্যবহার করেন। বাকি পাঁচতলার ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়েছেন।
অবশেষে লিফট থেকে বের হয়ে তিনতলায় পৌঁছে গেছে আলো এবং মাহরীন। তিনতলা পুরোটা ফুল দিয়ে সাজানো গোছানো। কিছু কিছু ফুল দেখে তো আলো চিনতেও পারল না।
আলোকে একটা রুমের ভেতরে নিয়ে গেল মাহরীন। আলোকে খাটের ওপর বসিয়ে মাহরীন চলে গেল কাঠের আলমারীর কাছে। এদিকে আলো চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরটার চারপাশে তাকিয়ে দেখছিল। টানটান করে বিছানা বিছিয়ে রেখেছে। ড্রেসিংটেবিলের পাশে বুকশেলফ। আলমারী।
মাহরীন আলমারি থেকে একটা প্যাকেট বের করে এনে আলোর দিকে বাড়িয়ে দিলো। আলো প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে বলল,

— কি এটা?
—শাড়ি। এটা আমার শাড়ি। মাশফির বাবা যে বছর মারা গিয়েছিল। সে বছর শেষবারের মত আমার জন্য শাড়িটা কিনেছিল। শাড়িটা আমার হাতে দিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু শাড়িটা পরে তাকে আর দেখাতে পারিনি।
কথাগুলো বলার সময় মাহরীনের কন্ঠস্বর কাঁপছিল।
আলো দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে বলল,
— কিন্তু, আন্টি এটা তো শুধুই আপনার। আমাকে কেন দিচ্ছেন?
আমার বলেই আমি তোমাকে দেয়ার অধিকার রাখি। শাড়িটা পরে নাও। ব্লাউজ এবং পেটিকোট হয়ত তোমার শরীরে ফিট হবে। কারণ, তখন আমিও তোমার মত গোলুমুলু ছিলাম। আমি গেলাম। তুমি ঘরেই থেকো। কিছুক্ষণ পর আমি আসছি। দরজা বাইরে থেকে লক করে যাব। কোনো অসুবিধা হবে না তো?

আলো মাথা নাড়িয়ে বোঝালো কোনো সমস্যা হবে না। মাহরীন বাইরে থেকে দরজা লক করে চলে গেল।
** তোমার নতুন বউ ফেলে তুমি সাত সকালে কই গিয়েছিলে? বাপ রে তোমার বউয়ের ছটফটানো দেখে, আমি তো ভেবেছি তোমাকে কেউ বুঝি বাসরঘর থেকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে।
মেঘালয়ের কথা শুনে কাব্য হাসতে শুরু করল। ইতি মাথা নীচু করে বলল,
— উনি আমাকে বলে গেলেই পারতেন।
— বলিনি কারণ তুমি ঘুমিয়েছিলে। নতুন ব্রাইডের ঘুম নষ্ট করতে নেই। কারণ, তাদের চেহারার লাবন্য হারিয়ে যেতে পারে। ছবিতে ভালো নাও লাগতে পারে।

হইছে ফটোগ্রাফার সাহেব। বিশদভাবে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। তুমি যদি অনুমতি দাও তো একটা প্রশ্ন করি?
মেঘালয়ের কথা শুনে কাব্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তারপর ইতির হাত ধরে তার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,
–একটা প্রশ্ন থেকে কয়েকশ প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই আমি রিক্স নিচ্ছি না। আপাতত আমি এবং আমার বউ একাকি টাইম স্পেন্ড করতে চাই। ডোন্ট ডিস্টার্ব আস।
কাব্যের কথায় পুরো ডাইনিং টেবিলে হাসির রোল পরে গেল। মেঘালয় হাসতে হাসতে ডাইনিং টেবিলে থাকা কাজিন গ্রুপের দিকে তাকিয়ে বলল,

— ভাই ও আদরের বোনেরা আমাদের কাব্য ভাই আর আমাদের ভাই নেই রে। সে এখন ইতি ভাবির নেওটা হয়ে গেছে। ব্যাথায় বুকটা কেমন করছে? তনু তোর কাছে গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবেলট আছে?
মেঘালয়ের নাটকীয় ভঙ্গিতে বলা কথাগুলো শুনে আরও একদফা হাসির রোল পরল।
মেঘ?
মেঘ পেছনে ফিরে দেখল তার ফুপা রহমান সাহেব ডাকছে তাকে। মেঘালয় এক্সকিউজ মি বলে সেখান থেকে সরে এসে তার ফুপার কাছে গিয়ে বলল,
কিছু বলবেন?

— তোমার মায়ের ঘরে আমার মোবাইলটা চার্জে রেখেছিলাম। মোবাইলটা এনে দেবে?
—মা কি ঘরে নেই?
মেঘালয় চিন্তিত সুরে প্রশ্ন করল। রহমান সাহেব জবাবে বললেন।
— ভাবি তো ছাঁদে গেছে।
— আচ্ছা আপনি ওয়েট করুন। আমি মোবাইল নিয়ে আসছি।
মেঘালয় এবার হাঁটতে শুরু করল তার মায়ের রুমের উদ্দেশ্য।
এদিকে আলো শাড়িটা খুলে দেখল। বেশ চমৎকার একটা শাড়ি। আকাশী রঙা জামদানী শাড়ি। সাদা ব্লাউজ এবং পেটিকোট। আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, ওয়াশরুমে গিয়ে পরনের কাপড় ছেড়ে শাড়ি পড়তে শুরু করল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে শাড়ির কুচি করার সময়। বারবার হাত থেকে কুঁচির ভাজ খসে পরছে। আলো বিরক্ত হয়ে শেষবারের মত শাড়িতে কুচি তুলছিল।

ঠিক সেই সময় দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল মেঘালয়। আলো ওয়াশরুমে থাকায় টের পেলো না ঘরে কেউ প্রবেশ করেছে। মেঘালয় চার্জার খুলে মোবাইল হাতে নিলো। তারপর ঘর থেকে বের হবার সময় খেয়াল করল ওয়াশরুমের দরজার ফাঁক দিয়ে লাইটের আলো বের হচ্ছে। মেঘালয় ফোঁস একটা নিশ্বাস ফেলে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। হাত বাড়িয়ে ওয়াশরুমের লাইটের সুইচ অফ করতেই ভেতরে থেকে কে জানি একপ্রকার ছুটে বেরিয়ে এলো। মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে গেছে। কি হলো এটা? কি ছিল? পরক্ষণেই ঘুরে পেছনে তাকাইতে দেখতে পেলো অনাকাঙ্ক্ষিত এক দৃশ্য। আলো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকা আলোর হাতের আঙুলের ফাঁক থেকে ধীরে ধীরে খসে পরে যাচ্ছে শাড়ির কুঁচি। মেঘালয় চট করে পেছনে ঘুরে গেল। আলো যখন টের পেলো কি ঘটলো তার সঙ্গে ততক্ষণে কিছুই করার ছিল না। এই একটা মানুষের সামনেই কেন সে বারবার ভুল করে? এই যে তাকে এখন কি ভাবছে মানুষটা?

আলো চট করে শাড়ির কুঁচির অংশগুলো তুলে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরল। তারপর, মেঘালয়কে উদ্দেশ্য করে বলল,
** আসলে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। লাইট অফ গেল হুট করে! আপনি একটু সরে দাঁড়াবেন? আমি ওয়াশরুমে যাব।
ব্যস, এই একটা কথার অপেক্ষায় যেন ছিল মেঘালয়। মেঘালয় ঠিক একইভাবে পেছনে ফিরে থাকা অবস্থায় সরে দাঁড়ালো। আলো ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। আর মেঘালয় প্রচন্ড অস্বস্তি নিয়ে তার মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে এলো।
ছাঁদের উদ্দেশ্য যেতে যেতে, মেঘালয়ের চোখের সামনে বারবার সেই দৃশ্য ভেসে উঠছে। কিন্তু, মেঘালয়ের মনে একটাই প্রশ্ন উদিত হচ্ছে বারবার। আলো এই বাড়িতে? কিন্তু, কিভাবে সম্ভব? আলোর অস্তিত্ব হয়ত নিছক মস্তিষ্কের ভ্রম বৈ আর কিছুই নয়। কিন্তু, সেই মুহূর্ত, আলোর ভয় পাওয়া কন্ঠে বলা কথা, সেগুলোও কি ভ্রম? কার কাছে আছে মেঘালয়ের মনে জাগা প্রশ্নের উত্তর?

হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে ছাঁদে পৌঁছে যায় মেঘালয়। তার ফুপাকে মোবাইলটা দিয়ে তার মায়ের কাছে যায়। মাহরীন তখন বাবুর্চীর সঙ্গে কিছু নিয়ে কথা বলছিল। মেঘালয়কে দেখে মাহরীন মুচকি হেসে ফেলল। তারপর বলল,
কি রে বাবা মুখ কালো করে রেখেছিস কেন? — তুমি একটু সাইডে আসবে, মা? কথা ছিল।
মাহরীন বাবুচাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে মেঘালয়ের সঙ্গে চলে এলো ছাঁদের উত্তর দিকে। মেঘালয়কে যেন পুরো অস্বস্তি ঘিরে ধরেছে। মাহরীন ছেলের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কি হয়েছে? তোকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?
আলোকে তোমার ঘরে দেখলাম কেন?
মেঘালয়ের মুখ থেকে আলোর নাম শুনে মাহরীন “হায় আল্লাহ” বলে কপালে হাত দিয়ে বলল,

— দেখেছিস আমি কতটা ভুলো মনা? মেয়েটাকে সেই কখন ঘর রেখে এসেছি? দরজা তো বাহির থেকে বন্ধ ছিল! কে খুলে দিলো দরজা? আলো ঠিক আছে তো?
মাহরীনের অস্থিরচিত্তে বলা কথাগুলো শুনে মেঘালয় ভ্রু কুঁচকে বলল,
তারমানে আলো সত্যি সত্যি আমাদের বাড়িতে এসেছে? … হ্যা। সকালে আমি আর কাব্য গিয়েই তো ওকে নিয়ে এলাম। এখন কোথায় আছে, আলো?
মাহরীন প্রশ্ন করল ঠিকই কিন্তু মেঘালয়ের কাছ থেকে উত্তর শোনার অপেক্ষাটুকু করলেন না। ছাঁদে থেকে নেমে পরলেন।

— কিন্তু, কাব্য ভাই আমাকে জানাল না কেন? আর সবচেয়ে বড় কথা মা আলোকে নিয়ে এত কনসার্ন কেন?
আলোর নামটা মুখে আসতে না আসতেই আবারও সেই দৃশ্য হানা দিলো মেঘালয়ের মানসপটে। মেঘালয়ের মনে হচ্ছে স্মৃতির এই ভয়াল অংশটুকু ট্রিম করে দিতে।
কিন্তু, এটা তো কোনো যন্ত্র নয়। এটা হচ্ছে মানুষের স্মৃতি। চাইলেই কি মুছে ফেলা যায়? স্মৃতি মুছে ফেলতে চাইলে বরং আরও শক্ত করে মস্তিষ্কের মধ্যে স্মৃতিগুলো নিজেকে সেঁধিয়ে রাখে। যেন কেউ মুছে ফেলতে না পারে।
মেঘালয় এবার নিজের প্রতি বিরক্ত অনুভব করল। তার অনুভূতি, তার সহ্য ক্ষমতা কি এতটাই দূর্বল? এতটাই ঠুনকো? সামান্য একটা বিবৃতকর অবস্থা থেকে সে নিজেকে টেনে তুলতে পারছে না। স্বাভাবিক হতে পারছে না?
রিসিপশনের অনুষ্ঠানের পর নতুন বর-কনে চলে গেল কনের বাপের বাড়ি। আলোকে এসে কিছুক্ষণ আগেই নিয়ে গেছে ওর বাবা। মাহরীন আলোকে বিদায় দিতে চায়নি। কিন্তু, বিদায় যে দিতেই হবে। পরের মেয়েকে কি আর জোর করে রেখে দেয়া যায়?

রাত আটটা।
মেঘালয় তখন ড্রইংরুমে বসে মাশফি এবং মাশফির বউ তানিয়ার সঙ্গে কথা বলছিল। কথায় কথায় আলোর প্রসঙ্গ উঠে আসে। কারণ, রিসিপশনের পুরো অনুষ্ঠানের একমাত্র আর্কষনের বিষয়বস্তু ছিল আলো। আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার মুখে একটাই প্রশ্ন,
“কে এই মেয়ে?” মাহরীন প্রতিউত্তরে কেবল হেসেছে।
মাশফি এবং তানিয়া মেঘালয়ের কাছে আলোর ব্যাপারে জানতে চাইলে সে সংক্ষিপ্ত আকারে সেদিনকার ঘটনা খুলে বলে। সবটা শোনার পর তানিয়া মুখ ভেঙিয়ে বলল,

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৫

— যত্তসব সিনেমা! হেল্প করেছে, তাকে টাকা দিয়ে দিক না। সেও খুশি। আমার শ্বাশুড়িও খুশি, ব্যস। কিন্তু এত আদিক্ষেতা দেখানোর কি আছে?
– আদিক্ষেত্তা তো অবশ্যই দেখানোর আছে। কারণ, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মেঘালয়ের জন্য আলোকে আনব। আলো হবে আমার মেঘালয়ের অর্ধাঙ্গিনী।
মাহরীন সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে কথাগুলো বলল। এদিকে মেঘালয়, মাশফি এবং তানিয়া হতভম্ব হয়ে গেছে।

মেঘের ওপারে আলো পর্ব ৭