Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩২

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩২

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩২
ফারহানা নিঝুম

“আই ডোন্ট নো শয্য, তুমি প্লিজ এসো! আমি ফেইরি ল্যান্ডের গেইটে দাঁড়িয়ে আছি!”
কথাখানা কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই বিরক্তির সূক্ষ্ম রেখা ভেসে উঠল শয্যের কপালে। আগামীকাল সুরাইয়ার জন্মদিন অথচ কন্যাটি যেন আজ থেকেই উন্মত্ত উত্তেজনায় আচ্ছন্ন। ইতোমধ্যেই টিম আলফা এবং আরও কয়েকজন খ্যাতিমান সেলিব্রিটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অনুষ্ঠানে। ফেইরি ল্যান্ডের ড্রইংরুমে থমাসকে পাশে নিয়ে বসেছিল শয্য। বিশালদেহী কুকুরটি স্নেহমাখা ভঙ্গিতে গা এলিয়ে দিয়েছে তার পায়ের কাছে।
“বাট সুরাইয়া, এখনও তো সময় আছে। তুমি এত অধৈর্য হয়ে পড়ছো কেন?”
ওপাশ থেকে অনুনয় ভেসে এলো,
“প্লিজ শয্য, আই অ্যাম ওয়েটিং!”

তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করল শয্য। শেষমেশ আর আপত্তি না করে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে পড়তে গিয়েই তার দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সিঁড়ির বাঁকে লুকিয়ে থাকা এক পরিচিত অবয়বে। কৌতূহলী চোখে আড়ি পাতছিল ঝুমঝুম।
শয্যের ওষ্ঠকোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
সহসা ফোন বের করে একটি নম্বরে কল করল সে।
“হ্যাঁ, চলে আয়।”
“আচ্ছা!”
সংক্ষিপ্ত উত্তর পেয়ে কল কেটে দিল সে। ফেইরি ল্যান্ডের সুবিশাল গেইটের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে ঝুমঝুম ও প্রিয়া। দু’জনের চোখেমুখে গুপ্ত অভিযানের উত্তেজনা।
“আর ইউ শিওর আমাদের ভেতরে যাওয়া উচিত হবে?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল ঝুমঝুম।
প্রিয়া ভ্রু নাচিয়ে উত্তর দিল,
“যদি ভেতরের রহস্য জানতে চাস, তাহলে অবশ্যই ঢুকতে হবে। চল!”
বলার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে গেল সে।
আজ ভাগ্য সহায়। মিসেস ইয়েরিন অনুপস্থিত। ফলে বাধা দেওয়ার মতো কেউ নেই।পাসওয়ার্ড প্রবেশ করিয়ে দরজা খুলতেই তারা নিঃশব্দে ভেতরে প্রবেশ করল। সিঁড়ির ধাপ বেয়ে সতর্ক পদক্ষেপে উপরের তলায় উঠে গেল দু’জনে।
শয্যের মাস্টার বেডরুমে প্রবেশ করতেই বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল ঝুমঝুম।

“এত বিশাল বেডরুম!”
বিস্ময়ভরা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই সে গিয়ে ধপাস করে লুটিয়ে পড়ল নরম বিছানায়।
“আহ্! প্রিয়া, এই বিছানা এত নরম কেন? আমার তো এখনই ঘুম পেয়ে যাচ্ছে!”
প্রিয়া বিরক্ত হয়ে হাত ধরে টেনে তুলল।
“মাশা! আমরা এখানে তদন্ত করতে এসেছি, ঘুমাতে না!”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল ঝুমঝুম।ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও বিশেষ কিছু পেল না তারা। তবে একটি ছোট চাবি খুঁজে পেল। সেটি কীসের চাবি, বুঝতে না পেরে আগের জায়গাতেই রেখে দিল।
“উফ্! এখানে তো কিছুই নেই!”
হতাশ হয়ে বলল ঝুমঝুম।প্রিয়া চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল,
“তাহলে অন্য রুমগুলো দেখি।”
একের পর এক কক্ষ অনুসন্ধান করেও কোনো ফল মিলল না। কিন্তু করিডোরের এক প্রান্তে পৌঁছাতেই থমকে দাঁড়াতে হলো। একটি দরজা কিছুতেই খুলছে না।

“মাশা, দেখ! এটা লক করা!”
ঝুমঝুমও চেষ্টা করে নিশ্চিত হলো।
“হ্যাঁ, মনে হচ্ছে তালাবদ্ধ।”
প্রিয়া বিরক্তিতে ফুঁসতে লাগল।
“এখন চাবি পাব কোথায়?”
ঠিক তখনই ঝুমঝুমের মনে পড়ল শয্যের রুমে পাওয়া চাবিটির কথা।
“ওয়েট! ওই চাবিটা হয়তো এটার!”
দু’জনের চোখেই উত্তেজনার ঝিলিক জ্বলে উঠল।
দ্রুত দৌড়ে গিয়ে চাবিটি নিয়ে এলো ঝুমঝুম।চাবি ঘুরতেই মৃদু শব্দে খুলে গেল দরজা।অভ্যন্তর ছিল অন্ধকারে নিমজ্জিত।প্রিয়া সুইচ অন করতেই সময় যেন থমকে গেল।

নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো দু’জনেরই। দেয়ালের প্রতিটি ইঞ্চি জুড়ে অসংখ্য ছবি। সবগুলোতেই এক মানুষ।
ঝুমঝুম। একটি কোণও খালি নেই। কোথাও হাসছে সে, কোথাও অভিমানী, কোথাও বিস্মিত, কোথাও নির্লিপ্ত।
যেন কোনো শিল্পী তার সমগ্র অস্তিত্বকে এক নারীর প্রতিচ্ছবিতে উৎসর্গ করেছে। কাঁপতে কাঁপতে সামনে এগিয়ে গেল ঝুমঝুম। একটি ছবিতে হাত রাখল। সেটি সেই দিনের ছবি জুঁই ও আব্রাহামের রিসেপশনের রাত।
ঘাগরা, গাজরা, আর মুখভরা সরল হাসি। প্রিয়া হা হয়ে তাকিয়ে আছে।
“ও মাই গড! এটা তো আমার ধারণার থেকেও অনেক বেশি!”
ঝুমঝুমের বুকের ভেতর তীব্র কম্পন শুরু হলো।‌তার দৃষ্টি পড়ল একপাশে রাখা ডিজিটাল ডিসপ্লের দিকে।
স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে তারই একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি।
ওয়ালপেপার। কাঁপা হাতে ডিসপ্লে স্পর্শ করল সে।
পরবর্তী মুহূর্তেই তার দুনিয়া যেন উল্টে গেল। গ্যালারির প্রতিটি ফোল্ডার। প্রতিটি অ্যালবাম। প্রতিটি স্মৃতি। সবখানে শুধু সে। এবং কি ঝুমঝুমের কষ্ট করে আঁকা পোট্রেট টা এখানে আছে! শুধু ঝুমঝুম।তার হাসি।তার কান্না।তার অভিমান।তার অজান্তে ধারণ করা অসংখ্য মুহূর্ত।স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে।এতদিন ধরে?এভাবে?কেন?কীসের জন্য?তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।

“এসব… শয্য ভাইয়া… আমাকে…”
বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারল না।
ঠিক তখনই প্রিয়া আঁতকে উঠল।
“এটা দেখ মাশা!”
একটা ছোট্ট বাক্স,তার ভেতরে থাকা কোমর বন্ধনী, নূপুর, ভাঙা চুড়ি,কানের দুল থেকে শুরু করে হেয়ার ক্লিপ! অনেক কিছু সযত্নে রাখা।
চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো কন্যার! হৃদয় কেঁপে উঠলো হুহু শব্দে।
প্রিয়ার অস্থির দৃষ্টি গিয়ে পড়েছে ছাদের কোণায় লাগানো একটি সিসিটিভি ক্যামেরায়।
“ও শিট!”
প্রায় চিৎকার করে উঠল সে।
“মাশা! শয্য ভাইয়া আমাদের দেখে ফেলেছে! ওই দেখ ক্যামেরা! নিশ্চয়ই এতক্ষণে উনি জেনে গেছেন আমরা পুরো ফেইরি ল্যান্ড তল্লাশি করছি!”
ঝুমঝুমের দেহ শীতল হয়ে এলো। মস্তিষ্কে বজ্রাঘাতের মতো আঘাত হানল অসংখ্য প্রশ্ন।মেহরিমা ও রাকিবের নিষিদ্ধ সম্পর্কের স্মৃতি ভেসে উঠল চোখের সামনে।ত্যাজ্য হওয়া।
প্রতিবাদ।বিচ্ছেদ।অস্বীকৃতি।তবে কি ইতিহাস আবারও পুনরাবৃত্ত হতে চলেছে?তবে কি বাদশাহ পরিবারের বুকে আবারও জন্ম নিতে চলেছে আরেকটি নিষিদ্ধ অধ্যায়?
আর যদি সত্যিই তাই হয় তাহলে শয্য এতদিন ধরে তার কাছ থেকে কী লুকিয়ে রেখেছিল?

“আই অ্যাম ইন লাভ।”
রাত্রির নিস্তব্ধ প্রহরে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টি রেখে সংক্ষিপ্ত বার্তাটি পাঠিয়ে দিল শয্য। বাংলাদেশে অবস্থানরত আব্রাহাম তখন ব্যবসায়িক কিছু ফাইলপত্র পর্যালোচনায় ব্যস্ত ছিল। বার্তাটি চোখে পড়ামাত্রই যেন তার সমগ্র সত্তা বিস্ময়ে আলোড়িত হয়ে উঠল। প্রায় লাফিয়ে উঠে সে দ্রুত টাইপ করল,
“সত্যি? কাকে? কিভাবে?”
প্রতিক্রিয়ার এই মাত্রা দেখে বিস্মিত হলো শয্য। মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল তার ওষ্ঠপ্রান্তে। সাচ আ বিগ জোক! লোকটা সত্যিই বড় ভাই হওয়ার দায়িত্বটা খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছে! অতঃপর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,
“ইয়াহ, আই অ্যাম।”
বার্তাটি পাঠানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আব্রাহাম কলিং। শয্য বিরক্ত-ইতস্তত এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপরও কলটি গ্রহণ করল। ফোন রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে প্রায় চিৎকার ভেসে এলো,

“শয্য! ইটস ট্রুথ? সত্যি বলছিস নাকি আমাকে প্র্যাঙ্ক করছিস?”
শয্য উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে। তার দৃষ্টি তখন ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির।সেখানে চলমান একটি ভিডিও ফুটেজ।
আজ সকালের।ঝুমঝুম আর প্রিয়া ফেইরি ল্যান্ডে প্রবেশ করেছিল। নিষিদ্ধ সেই কক্ষের দরজা খুলেছিল। তার যত্নে লুকিয়ে রাখা প্রতিটি অনুভূতির সাক্ষী হয়ে গিয়েছিল।
কন্যা জেনে গেছে। অবশেষে জেনে গেছে।
চোয়াল শক্ত করে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“আপনার সঙ্গে মিথ্যা বলে আমার কী লাভ?”
আব্রাহামের ঠোঁটের কোণে প্রশস্ত হাসি ফুটে উঠল।
“তাহলে কি মামুনিকে বলে দিই? বলি, তার ছোট ছেলে অবশেষে কারও প্রেমে পড়েছে?”
শয্য কপাল কুঁচকে ফেলল।
“নো ওয়ে। আমি শুধু আপনাকে বলেছি। আমি বলিনি বড় ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে। যখন সময় হবে, আমিই বলব মাম্মাকে।”

আব্রাহাম শব্দ করে হেসে উঠল।এই ছেলেটা মুখে যতই অস্বীকার করুক, কোথাও না কোথাও তাকে বড় ভাই হিসেবেই মেনে নিয়েছে।
“ওকে ফাইন। বলব না। কিন্তু অন্তত এটুকু তো বল মেয়েটা কে?”
শয্যের ওষ্ঠে রহস্যময় হাসি ফুটল।
“সিক্রেট।”
বাক্যটি উচ্চারণ করেই কল কেটে দিল সে।
ফোনের স্ক্রিন নিভে যেতেই আব্রাহামের মুখে এক প্রশান্ত হাসি ছড়িয়ে পড়ল।ঠিক সেই মুহূর্তে পিছনে কারও উপস্থিতি অনুভব করে ঘুরে দাঁড়াল সে।জুঁই।নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।অনেকক্ষণ ধরেই।তাদের সম্পূর্ণ কথোপকথন শুনেছে সে।
জুঁই মৃদু স্বরে বলল,
“আপনি শয্য ভাইয়াকে খুব ভালোবাসেন, তাই না?”
প্রশ্নটি শুনে আব্রাহামের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত কোমলতা নেমে এলো।চোখদুটি যেন ক্ষণিকের জন্য কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠল।
তবুও সে হাসল। স্নিগ্ধ, নিঃশব্দ এক হাসি।
“খুব বেশি।”
সামান্য বিরতি নিয়ে আবার বলল,

“ছেলেটা আমার ভাই। সৎ ভাই হোক কিংবা না হোক রক্তের হিসাবের আগে সম্পর্কের মূল্য অনেক বড়।”
জুঁই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।এমন মানুষ সে আগে কখনো দেখেনি। আব্রাহাম ধীর কণ্ঠে বলতে লাগল,
“জানো, মাঝে মাঝে খুব অপরাধবোধ হয়। মনে হয়, আমিই যেন ওর প্রাপ্য সবকিছু কেড়ে নিয়েছি। অথচ বাস্তবতা দেখো ওর সব আছে। অর্থ, খ্যাতি, পরিচিতি, ভালোবাসা পাওয়ার হাজারটা সুযোগ আছে।”
সে থামল।দীর্ঘশ্বাস ফেলল।আব্রাহামের কণ্ঠ আরও গভীর হয়ে উঠল।
“তবুও ছেলেটা ভীষণ একা। নিজেকে এমন এক নিঃসঙ্গতার গোলকধাঁধায় বন্দি করেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ ও নিজেও জানে না।”
জুঁই নিঃশব্দে শুনছে। জানালার ওপারে সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মলিন হয়ে আসছিল। আব্রাহাম দূরে কোথাও তাকিয়ে বলল,
“আর আমি? আমার তো কিছুই ছিল না। না পরিবার, না নিশ্চয়তা, না নিরাপত্তা। অথচ আজ দেখো সবাইকে পেয়েছি।”

জুঁইয়ের বুকের ভেতর কেমন এক মোচড় অনুভূত হলো।
হঠাৎ করেই শয্যের কথা মনে পড়ল।তার শৈশব।
তার নিঃসঙ্গতা।তার অপ্রকাশিত ক্ষতগুলো।
অদ্ভুতভাবে নিজের জীবনটার সঙ্গে মিল খুঁজে পেল সে।
সবকিছু থেকেও শূন্য থাকার যন্ত্রণা।মানুষে ঘেরা থেকেও একা থাকার বেদনা।হয়তো এই কারণেই আব্রাহাম তাকে এত সহজে বুঝতে পারে।কারণ আব্রাহাম নিজেও জানে
কিছু মানুষ আছে, যাদের জীবনে অভাব থাকে না কোনো কিছুর।তবুও তারা ভেতর থেকে নিঃস্ব থাকে।
আর কিছু মানুষ থাকে, যাদের কাছে কিছুই থাকে না।
তবুও তারা অন্যের জন্য একটি সম্পূর্ণ আশ্রয় হয়ে ওঠে।

খরগোশের খাঁচাটা হাতে নিয়ে যখন শয্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বাদশাহ বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করল, তখন ড্রয়িংরুমের আবহ যেন এক নিমিষে থমকে গেল। সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে থাকা রিমঝিম বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে রইল। বিস্ময়ের অভিঘাতে তার মুখখানা প্রায় হা হয়ে গেছে।
পরমুহূর্তেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন তারা বাদশাহ। দৃষ্টি পড়তেই তাঁর মুখমণ্ডলের বর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেল। যেই প্রাণীটিকে কয়েক ঘণ্টা পূর্বেই তিনি ঘৃণাভরে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধ্য করেছিলেন, সেই খরগোশটিই আবার দিব্যি সম্মানের সহিত ঘরে প্রবেশ করেছে!
ক্রোধে তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
“এটা কী? তুমি আবার এটাকে নিয়ে ভেতরে এলে কেন? প্লিজ, এটাকে বাইরে রেখে এসো। আই ডোন্ট লাইক দিস!”
শয্য কোনো উত্তর দিল না।সে যেন শব্দহীন এক যুদ্ধের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।হাতে ধরা খাঁচাটা নামিয়ে রেখে স্থির দৃষ্টিতে সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে।আর সত্যিই, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নূপুরের ক্ষীণ ঝংকার তুলে দোতলা থেকে নেমে এলো ঝুমঝুম।দৃষ্টিদ্বয়ের সংঘর্ষ ঘটতেই মেয়েটা থমকে দাঁড়াল।কান্নার চিহ্ন এখনো স্পষ্ট তার ফুলে ওঠা চোখজোড়ায়। গোলাপি গালদুটোও লালচে হয়ে আছে।অজানা এক স্নায়ুচাপে বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ তুলল ঝুমঝুমের হৃদয়।শয্য এখানে কেন?
প্রশ্নটা মস্তিষ্কে উদিত হলেও ঠোঁট পর্যন্ত পৌঁছালো না।
শয্য আচমকা গম্ভীর স্বরে ডেকে উঠল,
“থমাস, কাম!”
মুহূর্তের মধ্যেই বিশালদেহী কুকুরটি লেজ নাড়তে নাড়তে ভেতরে প্রবেশ করল।খরগোশের পর কুকুর!
দুটি প্রাণীকে একসঙ্গে দেখে তারা বাদশাহর মুখমণ্ডলে বিতৃষ্ণার ছাপ আরও ঘনীভূত হলো।
“শয্য! আমি কি বললাম তুমি শুনতে পাওনি? এগুলোকে বাইরে পাঠাও!”
এবার শয্য ধীরে ধীরে মুখ তুলল।ডান ভ্রুর পিয়ার্সিংটা আলোয় ঝলসে উঠল।এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে অত্যন্ত স্থির স্বরে বলল,
“আমার পছন্দ। আপনার পছন্দ না হলে আমার কিছু করার নেই। পৃথিবীতে সবার পছন্দ তো আর এক হতে পারে না।”

কথাগুলো ছিল শান্ত।কিন্তু সেই শান্তির অন্তরালে লুকিয়ে ছিল প্রচ্ছন্ন বিদ্রোহ।রিমঝিম স্তম্ভিত।ঝুমঝুমও নিঃশব্দে শুকনো ঢোক গিলল।এত দীর্ঘ বাক্য তারা বাদশাহর উদ্দেশে শয্যকে বলতে বহু বছর কেউ শোনেনি।হঠাৎই সে চেয়ার টেনে বসে পড়ল।অতঃপর গমগমে কণ্ঠে বলল,
“আই অ্যাম হাংরি। ঝুম, আমাকে খাবার সার্ভ কর।”
বাক্যটা শুনে রীতিমতো চমকে উঠল দুই বোন।এই সেই শয্য, যাকে খাওয়ানোর জন্য জেসমিন বাদশাহ পর্যন্ত যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে যান!আর আজ সে নিজে থেকে খেতে এসেছে?
রিমঝিম তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে বলল,
“আমি দিচ্ছি!”
শয্য নির্বিকার।সে ইতোমধ্যে ডাইনিং টেবিলে বসে পড়েছে।
তার ডান পাশে থমাস।বাম পাশে খরগোশ স্নোয়ি।
দৃশ্যটা দেখে তারা বাদশাহর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।
“এখন আবার পশুগুলোকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসেছো?”
শয্য থমাসের মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে মৃদু হাসল।
“সো হোয়াট? মাই পাপি’স ইজ অলসো হাংরি।”

তারা বাদশাহর চোখমুখ ক্রোধে জ্বলতে লাগল।অন্যদিকে ঝুমঝুম ধীর পায়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে এল।
মেয়েটার বুঝতে বাকি রইল না এটা খাওয়া নয়।এটা প্রতিবাদ।এটা প্রতিশোধ। এটা সেই নীরব শাস্তি, যা শয্য তারা বাদশাহকে দিতে এসেছে।খাবার পরিবেশন চলতে লাগল। শয্য অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাবার খেল।
মাঝে মাঝে থমাসকে খাওয়াল।আবার স্নোয়ির খাঁচার সামনে খাবার এগিয়ে দিল।যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক দৃশ্য এটাই।অবশেষে সহ্যের সীমা অতিক্রম করলেন তারা বাদশাহ।ক্রুদ্ধ পদক্ষেপে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন।
অগ্নিদীপ্ত নয়নে একবার ছেলের দিকে তাকিয়ে হনহন করে চলে গেলেন ভেতরের দিকে।তাঁর প্রস্থানেও শয্যের মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না।বরং সে আরও ধীরেসুস্থে পানির গ্লাসে চুমুক দিল।ঠিক তখনই চোখাচোখি হয়ে গেল ঝুমঝুমের সঙ্গে। মুহূর্তমাত্র।কিন্তু সেই এক পলকের দৃষ্টিবিনিময়েই কন্যার হৃদস্পন্দন যেন তাল হারিয়ে ফেলল।
শয্যের হ্যাজেল চোখদুটি অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে ছিল তার উপর।আর সেই দৃষ্টি সহ্য করার সাহস হলো না ঝুমঝুমের।
মুখখানা লাল হয়ে উঠল।পরক্ষণেই হন্তদন্ত হয়ে ঘুরে দাঁড়াল সে।নরম পায়ের শব্দ তুলে প্রায় পালিয়ে গেল কিচেনের দিকে।আর তার পলায়নপর অবয়বের দিকে তাকিয়ে শয্যের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, দুর্বোধ্য হাসি।

ঝুমঝুম চড়ুই পাখির মতো উড়ে উড়ে রান্না ঘরে যাওয়ার মতো ছুটলো। রান্না ঘরে এসেই ফটাফট দু কাপ চা বানিয়ে নিয়েছে।
তবে চায়ের কাপ এখনো রাখা আছে, আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে ট্রে টা খুঁজে চলেছে।‌ আকস্মিক দৃষ্টি জোড়া দরজার কাছে নিবদ্ধ হতেই বুকের ভেতর ধক করে উঠল মেয়েটার।
সৌষ্ঠবপূন্য দেহের মানুষটিকে ওমন ভাবে টান টান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বক্ষঃস্থল কম্পিত হলো রমণীর। স্থির নেত্রে তার দিকেই তাকিয়ে আছে শয্য। তার ওমন র’ক্তচক্ষু দৃষ্টিতে তাকানো দেখে ভয়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।
ঝুমঝুমের মস্তিষ্ক সেই একটা বাক্য বারংবার মনে পড়ছে। কর্ণ গোচরে ঝংকার তুলছে প্রিয়ার বলা “ভালোবাসা” কথাটা। এবং শয্যের বাড়িতে দেখা সেই ছবিগুলো। মানসপটে ভেসে এলো সকালের দৃশ্য খানা। ওষ্ঠো জোড়া শুকিয়ে হলো কাঠ। পল্লব ঝাপটায় বারংবার। অতঃপর এক পা দু পা করে। ঝুমঝুম ভয়ার্ত চোখে তাকায় তার দিকে। মেয়েলি ষষ্ট ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে অদ্ভুত কিছু ঘটতে চলেছে যা উচিত নয়। ভেতরের ভয়টুকু তীব্র মাত্রায় বেড়ে চলেছে। শয্য কে ওমন ভাবে নিকটে আসতে দেখে বিস্মিত কন্ঠে বলল।
“দ..দেখুন শয্য ভাই আপনি যেটা করছেন সেটা কিন্তু.. অনুচিত! আমি কিন্তু ম..মেজো আব্বু কে বলে দেব…
দু’জনের মধ্যে দুরত্ব কেবল এক ইঞ্চি হবে,শয্যের নিঃশ্বাস চোখে মুখে উপছে পড়তেই আঁখি পল্লব খিঁচিয়ে বুঁজে নিল ঝুমঝুম।

তার এমনতর অবস্থায় ঠোঁট কামড়ে হাসলো শয্য। তাকে পাশ কাটিয়ে হাত বাড়িয়ে বানানো চায়ের একটি কাপ তুলে নিল আলগোছে। দুধ চা খাওয়া হয়না খুব একটা, শয্য বাদশাহ যে ব্ল্যাক কফি খেতে পছন্দ করে। তবুও আজকে দুধ চা নিল। শয্য সরে আসতেই ঝুমঝুম যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচলো। দু পা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো শয্য, ঝুমঝুম আড়চোখে তাকায় লোকটার দিকে। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে মেয়েটার।
ছিহ্ ছিহ্ নিজের বোন কে নাকি দুষ্টু দৃষ্টিতে দেখছে এই নির্লজ্জ ভাই তার!
চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে একের পর এক শয্য, ঝুমঝুম শক্ত হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে নড়াচড়া করার জো নেই।

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩১

সম্পূর্ণ চা টা খেয়ে আবারো কাছাকাছি এলো শয্য। ঝুমঝুম শিউরে উঠে,চোখ দুটো ভয়ের সাগরে ডুবে আছে।
শয্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শীতল কন্ঠে বলে।
“এত বড় হওয়ার দরকার ছিলো না,খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেছিস এবার বেপরোয়া আমিটা সামলাবো কিভাবে?”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ৩৩