এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৬
সেঁজুতি আক্তার
অবশেষে সেই দিনটা চলেই আসলো। সকাল থেকেই সায়রা মাইরা দুজনেই রেডি হচ্ছে। ওদের ফ্লাইট দুপুর একটায়। এখন বাজে সকাল নয়টা। লাগেজ আগেই গোছানো হয়ে গেছে।
মাইরা একটা সুন্দর ড্রেস পরে রেডি হয়ে নিল। খুব বেশি সাজগোজ করল না। চুলগুলো ঠিক করে রুম থেকে বের হতেই সায়রাও ওর রুম থেকে বেরিয়ে আসলো।
দুজনেই নিচে চলে আসলো। গাড়িতে লাগেজ ওঠানো হয়ে গেছে। রায়হান মির্জা আর শাহানা বেগম ওদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
–সায়রা এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল, আব্বু আমরা তাহলে যাই?
–রায়হান মির্জা মাথা নেড়ে বললেন, হুম। সাবধানে যেও। পৌঁছে ফোন করবে।
— আচ্ছা আব্বু।
মাইরা শাহানা বেগমের কাছে গিয়ে বলল, আম্মু আমরা আসি।
শাহানা বেগম বললেন, যাও। সাবধানে থেকো। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া করবে আর সায়রার সাথে থাকবে।
–জি আম্মু। আপনি চিন্তা করবেন না।
সায়রা মাইরার হাত ধরে বলল, ভাবি চলো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
দুজনেই বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গাড়ি ধীরে ধীরে বাড়ির গেট পেরিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। সায়রা জানালার পাশে বসে মাইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, ভাবি, আমার কিন্তু অনেক এক্সাইটমেন্ট হচ্ছে। মাইরা হাসলো, আমারও আপু। দেখি শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাও আমাকে। সায়রা হেসে বলল, দেখো ভাবি, অনেক ঘোরাবো তোমাকে। মাইরাও মুচকি হেসে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
মাইরাদের গাড়িটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমেই সায়রা আর মাইরা নিজেদের লাগেজগুলো নিয়ে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।
দুজনেই চেক-ইন কাউন্টারে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাল। লাগেজ চেক-ইন করে বোর্ডিং পাস নিয়ে নিল। এরপর সিকিউরিটি চেক আর ইমিগ্রেশনের ফরমালিটিগুলোও শেষ করল। সবকিছু শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। তারপর দুজনেই বোর্ডিং এরিয়ায় এসে বসলো।
–সায়রা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ভাবি আর একটু পরেই কিন্তু আমাদের ফ্লাইট।
–মাইরা মুচকি হেসে বলল, সত্যি বলতে এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না আমরা সত্যিই দেশের বাইরে যাচ্ছি।
–সায়রা হেসে ফেলল, আর একটু পরেই বিশ্বাস হয়ে যাবে।
হঠাৎ মাইরা আশেপাশে সামনে তাকাতেই থমকে গেল। একটু দূরে একজন পরিচিত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখতেই চিনতে পারল। ওর কলেজের লেকচারার নীলাদ্রি নীল।
পরনে পাউডার ব্লু কালারের শার্টের সাথে ক্রিম কালারের প্যান্ট। চোখে সানগ্লাস। হাতে একটা লাগেজ নিয়ে হাস্য উজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে।
–মাইরা অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। স্যার এখানে কী করছেন?
–সায়রা নীলাদ্রিকে দেখেই এগিয়ে গেল। অবশেষে আসলেন?
–নীলাদ্রি মুচকি হেসে বলল, হুম। এতক্ষণ কোথায় ছিলেন আপনারা?
–এই তো আসলাম। আপনিই তো আগে চলে এসেছেন।
— আপনাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মনে হচ্ছিল আজকে বুঝি আর আসবেনই না।
–আপনি জানেন তো, আমরা দেরি করে আসি না।
–নীলাদ্রি মজা করে বলল, হ্যাঁ, সেটা তো আজকে ভালোভাবেই বুঝলাম।
–সায়রা এবার একটু অস্বস্তি নিয়ে চারপাশে তাকাল। তারপর মাইরার দিকে তাকিয়ে বলল, ভাবি এদিকে আসো।
মাইরা ধীরে ধীরে ওদের কাছে এগিয়ে গেল। নীলাদ্রি মাইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। কেমন আছেন?
মাইরা মাথা নেড়ে বলল, জি স্যার ভালো।
–ভালো। তাহলে চিন্তা নেই।
–মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলল, কীসের চিন্তা স্যার?
নীলাদ্রি হেসে বলল, না, কিছু না। আপনাকে দেখে মনে হলো আবার কলেজের মতো চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
–মাইরা সামান্য হাসলো।
সায়রা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন নাকি ভেতরে যাবেন?
নীলাদ্রি হেসে বলল, চলুন তাহলে। আপনারাই পথ দেখান।
সায়রা সামনে এগিয়ে গেল। মাইরা ওর পাশে হাঁটতে লাগল।
মাইরা খেয়াল করল, সায়রা আজকে একটু চুপচাপ। সাধারণত ও এতক্ষণে অনেক কথা বলত। কিন্তু এখন কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে আছে। মাইরা আস্তে করে বলল, আপু, তুমি ঠিক আছো?
-সায়রা সঙ্গে মুচকি হেসে বলল, হুম ভাবি। আমি ঠিক আছি।
মাইরা আর কিছু বলল না। শুধু ওর দিকে একবার তাকিয়ে আবার সামনে হাঁটতে লাগল।
দীর্ঘ জার্নি শেষে অবশেষে সিঙ্গাপুরে এসে পৌঁছাল। প্লেন থেকে নামার পর মাইরা চারপাশে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। সবকিছুই ওর কাছে নতুন লাগছে। এতদিন শুধু ছবি আর ভিডিওতে দেখেছে, আজকে নিজের চোখে দেখছে। সায়রা আর নীলাদ্রিও মাইরার সাথে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসলো। বাইরে আসতেই দেখলো একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার ওদের দেখে এগিয়ে এসে লাগেজগুলো নিয়ে নিল।
মাইরা গাড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু, আমাদের জন্য গাড়ি এসেছে?
–সায়রা শুধু মাথা নেড়ে বলল, হুম। চলো।
মাইরা বেশ খুশি মনেই গাড়িতে উঠে বসলো। জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল।
–সায়রা চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
–মাইরা এবার সায়রার দিকে তাকাল। এতক্ষণ ধরে সায়রাকে অস্বাভাবিক রকম চুপচাপ লাগছে। সাধারণত কোথাও ঘুরতে গেলে সায়রাই সবচেয়ে বেশি কথা বলে। অথচ আজকে ও একদম চুপ।
–মাইরা আস্তে করে বলল, আপু তুমি ঠিক আছো?
–সায়রা এবার মাইরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসার চেষ্টা করে বলল, হুম ভাবি। আমি ঠিক আছি।
মাইরা আর কিছু বলল না। তবে ওর মনে কেমন একটা সন্দেহ থেকে গেল। নীলাদ্রি এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। সায়রার দিকেও একবার তাকাল। কিন্তু কোনো কথা বলল না। ওর মুখেও এখন আর আগের মতো হাসি নেই। গাড়ির ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসলো। মাইরা আবার জানালার বাইরে তাকালো। কিছুক্ষণ পর গাড়িটা শহরের একটা শান্ত এলাকায় ঢুকে পড়ল। মাইরা চারপাশে তাকিয়ে দেখল, এখানে আগের জায়গার তুলনায় অনেক বেশি নিরিবিলি।
মাইরা কিছু বলার আগেই গাড়িটা একটা বড় বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামল। মাইরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থমকে গেল।
সামনে একটা বড় হাসপিটাল। মাইরা কিছু বুঝতে না পেরে সায়রার দিকে তাকাল। আপু আমরা এখানে কেন এসেছি?
সায়রা কোনো উত্তর দিল না। নীলাদ্রিও চুপ করে বসে রইল।
মাইরা এবার আরও অবাক হয়ে বলল, আপু কিছু তো বলো। আমরা কি এখানে কারো সাথে দেখা করতে এসেছি? সায়রা গাড়ির দরজা খুলে নিচে নেমে বলল, চলো ভাবি। ভেতরে চলো।
মাইরা কিছুই বুঝতে পারল না। তবুও সায়রার পেছন পেছন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ড্রাইভার ইতিমধ্যেই ওদের লাগেজগুলো নিয়ে চলে গেছে।
মাইরা দাঁড়িয়ে সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল, আপু আমাদের লাগেজ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
–সায়রা বলল, ভেতরে চলো। সব বুঝতে পারবে।
মাইরা আর কিছু বলল না। শুধু সায়রার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।
নীলাদ্রি ওদের পেছনে আসছিল। এতক্ষণ ধরে ও একদম চুপ। মাইরা কয়েকবার ওর দিকে তাকালেও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।
হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেই মাইরা আরও অবাক হয়ে গেল।
সায়রা সোজা সামনে এগিয়ে গেল। মাইরা ওর হাতটা ধরে ফেলল। আপু সত্যি করে বলো তো আমরা এখানে কেন এসেছি?
সায়রা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, ভেতরে চলো ভাবি।
–মাইরা এবার আর কিছু বলল না। নীলাদ্রি পাশে দাঁড়িয়ে সায়রার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। সায়রা আর কোনো কিছু না ভেবে মাইরার হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরেই ওরা একটা কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ালো। মাইরা অবাক চোখে চারপাশে তাকালো। তারপর সায়রার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই সায়রা শান্ত গলায় বলল, ভাবি নিজেকে শক্ত রেখো।
–মাইরা ভ্রু কুঁচকে বলল, কেন আপু? কী হয়েছে?
সায়রা আর কিছু বলল না। শুধু মাইরার হাত ধরে কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে ঢুকেই মাইরার পা জোড়া থেমে গেল। বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো মাইরার সমস্ত পৃথিবী যেন ওলট-পালট হয়ে গেছে।
বেডের ওপরে শুয়ে আছে শেহরান। পায়ে আর কপালে সাদা ব্যান্ডেজ মোড়ানো। পাশে মনিটরে বিপ বিপ আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মাইরা অবাক চোখে সায়রার দিকে তাকিয়ে বলল, এসব কী?
সায়রা কোনো উত্তর দিল না। শুধু ওর চোখ বেয়ে দু ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। মাইরা আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো শেহরানের বুকে। শেহরানের চোখটা কেবলই লেগে এসেছিল। হঠাৎ বুকে কারোর উপস্থিতি টের পেয়েই ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকালো সামনে। নিজের এতকাছে মাইরাকে দেখে শেহরানের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠলো। মাইরা কাঁপা কন্ঠে বলল, এসব কী? কী হয়েছে আপনার?
শেহরান কাঁপা হাতে মাইরার মাথায় হাত রাখল। মাইরা মুখ তুলে শেহরানের দিকে তাকালো। শেহরান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি রেখে বলল, কেমন আছো মাইরা? মাইরা সঙ্গে সঙ্গে শেহরানের বুক থেকে উঠে পড়লো। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে বলল, আপনার না জানলেও চলবে কেমন আছি আমি। কিন্তু আপনি বলুন, আপনার এই অবস্থা কীভাবে? কথাটা বলেই ছলছল চোখে শেহরানের দিকে তাকিয়ে রইলো মাইরা।
এমপি শেহরান মির্জা পর্ব ২৫
শেহরান বুঝলো তাঁর পিচ্চি বউয়ের অভিমান আকাশ ছুঁয়েছে কিছুক্ষণ চুপ করে মাইরার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর হালকা হেসে বলল, এক্সিডেন্ট করেছি।
তখনই কেবিনের দরজা খুলে নীলাদ্রি ঢুকে পড়ল। এক্সিডেন্ট করেছিস? কী করে এক্সিডেন্ট করেছিস সেটা বল।
–সঙ্গে সঙ্গে মাইরা অবাক চোখে পিছনে ফিরলো।
