Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ১৫

মৌটুসী পর্ব ১৫

মৌটুসী পর্ব ১৫
ঋতস্বিনী মাহবিশ

​“নানি মনি! নানি মনি! কোথায় তুমি? বাইরে এসো তাড়াতাড়ি!”
চঞ্চল পায়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে ঢুকতে ব্যস্ত কণ্ঠে নানিকে ডাকছে চড়ুই।
​চড়ুইয়ের এমন অস্থির আর উচ্চস্বরে ডাকাডাকি শুনে লালবানু বেগম কিছুটা ঘাবড়েই গেলেন। সেলাইয়ের কাজ ফেলে দ্রুত উঠে বাইরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে নানু? এমনে চিৎকার করে ডাকতাছ ক্যান?”
​চড়ুই কোনো কথা না বলে সোজা এগিয়ে এসে লালবানু বেগমের হাতটা চেপে ধরল। তাকে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে যেতে যেতে উত্তেজিত হয়ে বলল, “নানু, তুমি তাড়াতাড়ি চলো! বাইরে একটা আঙ্কেল লোক অনেকগুলো হলুদ হলুদ পাখি নিয়ে এসেছে।”
​বাড়ির সামনে এক লোক বড় ঝুড়িতে করে কতগুলো দেশি হাঁসের বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাড়ার কয়েকজন মহিলা ভিড় করে ছানাগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখছে, দামাদামি করছে। চড়ুই ভিড় ঠেলে লালবানু বেগমকে সামনে নিয়ে গিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “দেখো নানিমনি, কী সুন্দর হলুদ হলুদ পাখি! আমাকে কিনে দাও।”

​“এইগুলা তো পাখি নয় নানু, এইগুলা হলো হাঁসের ছানা।”
​“তাহলে আমি হাঁসের ছানাই কিনব! আমাকে কিনে দাও।”
​লালবানু বেগম একটু বিপদে পড়লেন। এগুলাকে পালা তো আর মুখের কথা নয়! তাছাড়া তাদের বাড়িতে তো কোনো বড় হাঁসও নেই যে তাকে দিয়ে বড় করে নিবে। ভদ্রমহিলা চড়ুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝাতে লাগলেন, “নানু পাখি, আমাগোর তো কোনো হাঁস নাই। এত ছুডু ছুডু ছানা মা ছাড়া থাকব কেমনে? অযথায় ঘরবাড়ি নোংরা করব খালি।”
​কিন্তু চড়ুই নাছোড়বান্দা! নানির হাত ছেড়ে সে এবার ঝুড়ির এক কোণ শক্ত করে ধরে রইল। চোখ-মুখ কুঁচকে, ঠোঁট উল্টে বেঁকে বসল সে, “হাঁসের ছানা কিনে দাও নানিমনি! দিতেই হবে, না হলে আমি এখান থেকে উঠবই না।”
​চড়ুইয়ের জেদ দেখে এক প্রতিবেশী নানি এবার চড়ুইকে একটু জ্বালাতে হাস্যরসাত্মক সুরে বললেন,
“আইচ্ছা, চড়ুই বুড়ি, তাইলে এই হাঁস ওয়ালার লগে তোমার বিয়া দিয়ে দেই, কি কও? তারপর হের লগে বাড়ি চইলা যাও। সারাদিন হাঁসের লগে খেলতে পারবা।”
​হাঁসওয়ালা বয়স্ক লোকটাও ফাজলামি বুঝে হাসিমুখে বললেন, “যাইবা মাইয়া আমার লগে, আমার গিন্নির হতিন হয়ে?”

​ছোট্ট চড়ুই তাকে নিয়ে সবার এমন মিটিমিটি হাসি দেখে উঠে দাঁড়িয়ে লালবানু বেগমের কোমর জড়িয়ে ধরল, কোলে মুখ লুকিয়ে ডুকরে উঠল সে। চড়ুইকে বিরক্ত করতে পেরে এবার উপস্থিত সকলেই মুখ চেপে হাসা বাদ দিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল।
​লালবানু বেগম নিজেও মুচকি হেসে নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “কাইন্দ না নানু। নানি-মনিরা তোমার লগে মজা নিছে। আমি হাঁসের ছানা কিনে দিতাছি তোমারে।”
​অগত্যা চড়ুইকে একশ টাকায় এক জোড়া ছানা কিনে দিলেন লালবানু বেগম। ছানা দুটো পাওয়ার পর চড়ুইয়ের আনন্দের আর সীমা রইল না যেন; দুই হাতের পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে বাচ্চাগুলোকে হাতে নিল সে। তারপর দুই হাতে বুকের সাথে ছানাগুলোকে জাপটে ধরে দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হেঁটে দিল। লালবানু বেগম টাকা পরিশোধ করে ফিরে এলেন। এরপর ঘরের কোণ থেকে পুরোনো একটি পাখির খাঁচা বের করে এনে ছানা দুটোকে তার ভেতর ঢুকিয়ে রাখলেন।
​চড়ুইয়ের খুশির যেন শেষ নেই! সারাক্ষণ সে ছানা দুটোর সাথেই সময় কাটাচ্ছে। ওদের জন্য ভাত মেখে নিয়ে আসছে, সারাক্ষণ খাঁচার সামনে বসে আপন মনে তাদের সাথে গল্প করছে, খিলখিলিয়ে হাসছে। এমনকি সন্ধ্যার পড়ার সময়ও খাঁচাটা নিজের পড়ার টেবিলের পাশে নিয়ে বসল সে।

​রাতে শোয়ার সময় চড়ুই একা একাই একটা উঁচু প্লাস্টিকের টুল এনে মাথার কাছে রাখল, তারপর তার ওপর হাঁসের ছানাগুলোর খাঁচাটা বসাল। এদিকে বিছানা গোছাতে গোছাতে মৌটুসী মেয়ের কাণ্ডকারখানা দেখছে। এই দৃশ্য দেখে তার মানসপটে ভেসে উঠল পুরোনো কিছু স্মৃতি—চড়ুই তখন মাত্রই ভালোভাবে বসতে শিখেছে, মৌটুসী তাকে গোলাপি রঙের একটি মুরগির বাচ্চা এনে দিয়েছিল। কী যে আনন্দিত হয়েছিল তখন ছোট্ট চড়ুই! জীবন্ত মুরগির বাচ্চাটাকে দেখে ভয় পাওয়ার বদলে সে তার সাথেই খেলত। তার ছোট্ট শরীরে বাচ্চাটি তার খরখরে নখে দৌড়াদৌড়ি করলে সে খিলখিলে হেঁসে উঠত। যদিও কিছুদিন পর মুরগির বাচ্চাটা বড় হওয়ার আগেই তা বিড়ালের পেটে গিয়েছিল। তখনকার সেই কথা চড়ুইয়ের মনে নেই। থাকবার কথাও নয়।
​হাতের কাজ চালাতে চালাতে আনমনেই হেসে উঠল মৌ।
​খাঁচার সামনে বসে চড়ুই ছানাগুলোর সাথে আপন মনে একা একা কথা বলছে। বিছানা গোছানো শেষ করে মৌটুসী মেয়ের পাশে এসে দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসল। চড়ুই ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে চঞ্চল কণ্ঠে বলল, “মাম্মা, এরা আমার আরও দুইটা নতুন বন্ধু!”

​মৌটুসী আলতো করে সামনে ঝুলে থাকা চড়ুইয়ের লম্বা চুলগুলো কানের পিঠে গুঁজে দিল। এরপর বলল, “কিন্তু তোমার নতুন বন্ধুদের তো এভাবে খাঁচায় বন্দি করে রাখা যাবে না চড়ুই পাখি! ওদের পুকুরে ছেড়ে দিতে হবে, সাঁতার কাটতে দিতে হবে। খাঁচায় আটকে রাখলে তো ওরা মরে যাবে।”
​“তাহলে আমিও ওদের পুকুরে ছেড়ে দেব!”
​মৌটুসী ভ্রু কুঁচকাল মেয়ের কথায়। “আচ্ছা? কিন্তু এখানে পুকুর কোথায় পাবে?”
​চড়ুই একটু সময় নিয়ে ভাবল, তারপর বলল, “কেন? তুমি বানিয়ে দেবে! নাহলে আমি নানি মনিকে বলব, একটা পুকুর বানিয়ে দিতে।”
​চড়ুইয়ের কথা শুনে মৌটুসী শব্দ করে হেসে মেয়েকে কাছে টেনে জড়িয়ে নিল। “আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। কালকে আমি আঙ্গিনায় একটা বিশাল বড় পুকুর খুঁড়ে দিব আমার চড়ুই পাখিকে। তারপর সে সেখানে হাঁসের খামার দিবে। আর সেই হাঁস বাজারে বিক্রি করে আমরা বড়লোক হয়ে যাব। নাকি আমার মায়ের হাঁস সোনার ডিম পাড়বে মাম্মা?”

পরের দিন স্কুলে এসে চড়ুই তার হাঁসের ছানাগুলোর গল্প শোনাল বীরকে। চড়ুইয়ের মুখে ওদের বর্ণনা শুনে বীর উতলা হয়ে পড়ল ওদের দেখতে। তারপর দুইজন মিলে বুদ্ধি আঁটল, ছুটি হলে বীর চড়ুইয়ের সাথে তাদের বাসায় যাবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ছুটির পর বোরাকের কাছে জেদ ধরে বসল বীর। সে এখন বাসায় যাবে না। চড়ুইয়ের সাথে তাদের বাসায় যাবে। এদিকে বিপদে পড়েছে বোরাক। ছেলের সরল আবদারখানি সরাসরি ফেলতে পারছে না। আবার স্বল্পপরিচিতা একজন নারীর সাথে ছেলেকে পাঠাতেও মন সায় দিচ্ছে না। বীর আর চড়ুই দুজনে মিলে বোরাকের দুই হাতের আঙুল ধরে মায়াভরা চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে অনুমতির অপেক্ষায়।
​মৌটুসীর মনের অবস্থাও বেশ দোটানায়। একদিকে বীরকে সাথে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও, বাস্তব পরিস্থিতি তার অন্যরকম। চড়ুইকে বাসায় রেখেই তাকে আবার কাজে বেরোতে হবে। তাছাড়া বীর ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান; সাধারণ মধ্যবিত্ত তাদের বাড়িতে গিয়ে যদি সে অস্বস্তি ফিল করে? পরে এর প্রভাব যদি চড়ুইয়ের উপর পড়ে? কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে সেই অস্বস্তি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বরং বাধ্য হয়েই এবার মৌটুসী সৌজন্যতা বজায় রেখে বোরাককে বলল, “সমস্যা নেই ভাইয়া, বীর যাক না আমাদের সাথে। কিছুক্ষণ থাকল, বিকেলে এসে নিয়ে গেলেন!”
​বোরাক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বীর আবার বাবার আঙুল আলতো করে নাড়িয়ে আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল,

“পাপা, যাই?”
​চড়ুইও ঠোঁট উল্টে বলল, “আঙ্কেল, বীর বন্ধু আমাদের সাথে যাক না প্লিজ? আমরা একসাথে হাঁসের ছানা নিয়ে খেলব।”
মৌটুসী মনে মনে খুব করে চাইছে, বোরাক যেন না করে দেয়। কিন্তু তার প্রত্যাশাতে এক বালতি পানি ঢেলে বোরাক বলে উঠল, “আচ্ছা ঠিক আছে। যাও।”
​কথাটা শোনা মাত্র বীর আর চড়ুই খুশিতে লাফিয়ে উঠল। চড়ুই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ আঙ্কেল!”
বীরও বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ পাপা!”
​বোরাক মিষ্টি হেসে দুজনের মাথায় হাত বুলিয়ে মৌটুসীর দিকে তাকাল। “মিস! পাঠালাম তাহলে। একটু খেয়াল রাখবেন প্লিজ। আমি বিকেলে গিয়ে নিয়ে আসব।”
​মৌটুসী এবার ফিক করে হেসে উঠল, যেন পেছনে ঘা মেরে হাসানো হচ্ছে তাকে। কিন্তু তা বুঝতে না দিয়ে হাসি মুখেই বলল, “অবশ্যই ভাইয়া। নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। এসো বাচ্চারা!”

​স্কুটি থেকে নেমেই বীরের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে ছুটল চড়ুই। আঙিনার এ মাথা থেকেই সে লালবানু বেগমকে ডাকতে শুরু করল, “নানি মনি, নানি মনি! দেখো কে এসেছে!”
​লালবানু বেগম গোসল সেরে সবেমাত্র বারান্দায় বেরিয়েছেন। নাতনিকে এভাবে দৌড়ে আসতে দেখে সতর্ক কণ্ঠে বললেন, “আস্তে দৌড়াও নানু, পইড়া যাইবা!”
​চড়ুই বীরকে নিয়ে লালবানু বেগমের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “দেখো কে এসেছে, আমার বীর বন্ধু।”
​বীর পিটপিট চোখে চেয়ে আছে লালবানু বেগমের দিকে।
​ভদ্রমহিলা বীরকে আগে কখনো না দেখলেও চড়ুইয়ের মুখে অনেকবার নাম শুনেছেন। তিনি আদরে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, “কেডা আইছে আমগো বাড়ি? আমগো পাখির বন্ধু? মাশাআল্লাহ! নাম কী বাবু তোমার?”
​বীর তার সহজাত মিষ্টি হাসিতে বলল, “আযান বীল শিকদাল।”

​‘শিকদার’ টাইটেলটা কানে যেতেই থমকে গেলেন ভদ্রমহিলা। প্রগাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন বীরের দিকে। উনাকে ভাবনায় রেখেই চড়ুই বীরকে হাত ধরে সামাদ আলীর ঘরের দিকে নিয়ে গেল।
​তখনই মৌটুসী এসে ঢুকল বাড়িতে। লালবানু বেগম এবার মেয়েকে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “বাচ্চাটা কেডা মৌ?”
​”চড়ুইয়ের বন্ধু মা, ওর ক্লাসে পড়ে।”
​”হেইডা জানি। কিন্তু হের বংশপরিচয় কী, জানস?”
​”হুম, শিকদার বংশ। আমাদের সাবেক মেয়র আযান উদ্দিন শিকদারের নাতি সে।”
​”মেয়র আজান উদ্দিন শিকদারের নাতি আমগো চড়ুইয়ের লগে পড়ে?” ভদ্রমহিলার কণ্ঠে একরাশ বিস্ময়।
​মায়ের অবস্থা দেখে মৌটুসী ভ্রু কুঁচকে বলল, “এত অবাক হওয়ার কী আছে আম্মা? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যে কেউ পড়তে পারে সেখানে। ছাড়ল এসব। খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।”
​”বড় লোকের ছাওয়াল। কী খাওয়াবি তারে?”

​”কী মানে? ভাত রান্না করছ না? বড়লোক-ছোটলোক সবাই দুপুরে ভাত খায়। ফ্রিজ থেকে গরুর মাংসের তরকারির বাটিটা বের করে ভিজিয়ে দাও। বরফ ছাড়লে এসে গরম করছি আমি।”
​মৌটুসী যেমন ভয় পেয়েছিল তেমনটা হয়নি। বরং তাদের বাড়িতে এসে বীর বেজায় খুশি। এমন খোলামেলা পরিবেশ, মাটি, আর হাঁসের ছানাগুলো—সব মিলিয়ে তার আনন্দের সীমা নেই। মৌটুসী সকালে উঠানের মাঝখানে একটা ছোট গর্ত করে তাতে পানি ভরে দিয়েছিল; ওটাই এখন চড়ুইয়ের পুকুর। বীর আর চড়ুই এখন সেই গর্তের পানিতে ছানা দুটোকে ছেড়ে দিয়ে খেলছে।
​এদিকে মৌটুসী আজ আর শোরুমে গেল না। ফোন করে ম্যানেজারকে জানিয়ে দিল, এতে ম্যানেজারের ঝাড়িও খেলো ফ্রি-তে। শনিবার একদিন ছুটি কাটিয়েছে, আজ বুধবার অর্ধেক ডিউটি করল, কালও যেতে পারবে না—মালিকের বকাবকি করা তো স্বাভাবিকই।
​মৌটুসী সব গুছিয়ে খাবার রেডি করে চড়ুই আর বীরের হাত-মুখ ধুইয়ে ফ্রেশ করিয়ে দিল। বীর এখনো স্কুল ড্রেসেই আছে। কিন্তু এবার তাকে খাওয়াতে গিয়ে বাঁধল মহা বিপত্তি। তরকারি দিয়ে এক লোকমা ভাত ওর মুখে দিতেই জিহ্বায় ঝাল লাগায় সব খাবার মুখ থেকে বের করে দিল সে।
​মৌটুসী প্লেট রেখে তাড়াতাড়ি করে পানি খাইয়ে দিল ওকে। চড়ুই অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, “বীর বন্ধু কী হয়েছে?”

বীর শুষাতে শুষাতে বলল, ​”ঝাল! ভাত অনেক ঝাল!”
​মৌটুসী বুঝল, বীর তরকারিতে এতটুকু ঝালও খেতে পারে না। যদিও বা ভুলটা তারই, তার আগেই বিষয়টা খেয়াল করা উচিত ছিল। নিজের বুদ্ধির ওপর হালকা বিরক্ত হয়ে বীরকে নিজের কাছে টেনে নিল। কপালে চুমু খেয়ে বলল, “বীর সোনার খুব জোরে ক্ষুধা পেয়েছে তাই না? আন্টি তোমাকে ম্যাজিকের মতো করে এক তুড়িতে খিচুড়ি বানিয়ে দিবে। আর একটু অপেক্ষা করো সোনা!”
​বীর বলল, “খিচুলি ঝাল?”
​”না বাবা। খিচুড়ি ঝাল না। খিচুড়ি অনেক ইয়াম ইয়াম!”
​মৌটুসী দ্রুত রান্নাঘরে গিয়ে সবজি কাটতে লাগল। সবজি আর মুরগির মাংস দিয়ে পাতলা খিচুড়ি বানাবে। তার হাতের এই খিচুড়ি চড়ুইয়ের খুব পছন্দ, বীরেরও হয়তো ভালো লাগবে।
​মৌটুসীর পিছু পিছু চড়ুই আর বীরও রান্নাঘরে এল। উদ্দেশ্য ওকে রান্নায় সাহায্য করা। মৌটুসী এদিক-ওদিক লবণের কৌটা দেখতে না পেয়ে চড়ুইকে বলল, “চড়ুই পাখি, টেবিলের ওপর থেকে লবণের কৌটাটা আনো তো মাম্মা!”

চড়ুই দৌড়ে গিয়ে একটা ছোট কৌটা এনে মায়ের হাতে দিল। মৌটুসী তা খুলে চামচে করে ওঠাতে গিয়ে দেখল এটা লবণ নয়, বরং চিনি। এবার সে নিজে গিয়ে লবণ খুঁজে নিয়ে এল। বীর আর চড়ুই দাঁড়িয়ে তার রান্না দেখছে। সেই সাথে চড়ুইয়ের স্বভাবসুলভ চঞ্চলতায় তার মুখ চলছে অবিরাম। ‘মাম্মা মাম্মা’ ডেকে এটা-ওটা বলছে ও।
​”মাম্মা, খিচুড়িতে এটা কী দিলে? মাম্মা ওটা কী দিলে? মাম্মা এখন একটু হলুদ দাও, তেল দাও।” ইত্যাদি ইত্যাদি। যেন রান্নায় তার বিরাট আগ্রহ।
​চড়ুইয়ের অনবরত ‘মাম্মা’ ডাক শুনতে শুনতে ছোট্ট বীরের কোমল মনে কী এক আকুতি জন্মাল কে জানে! এই পর্যায়ে সে আলতো করে চড়ুইয়ের হাত ধরে বলল, “চুলুই পাখি, তোমাল মাম্মাকে আমিও একটু মাম্মা ডাকি!”

​হঠাৎ বীরের এই প্রশ্নসূচক আবদারে মৌটুসীর হাত থমকে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বীরের আদুরে মুখটার দিকে চেয়ে রইল কতক্ষণ। একটা বাচ্চা ছেলের মুখে এমন আবদার শুনে প্রথমেই যেই বিষয়টা মাথায় আসার কথা, সেটাই ওর আন্দাজকে প্রভাবিত করল। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য মৌটুসী ছেলেটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। আলতো করে ওর নরম গাল দুটো দুহাতের আজলায় তুলে নিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল, “আমাকে মাম্মা ডাকলে তোমার মাম্মা তো রাগ করবে বীর সোনা!”
​বীর সহসা সরল গলায় উত্তর দিল, “লাগ কলবে না। আমাল তো মাম্মাই নেই!”
​ইশ! কী করুণ এক স্বীকারোক্তি। এমন আদুরে কণ্ঠে এই নিষ্ঠুর বাক্য শোভা পায়? মৌটুসীর মাতৃমনটা মুচড়ে উঠল। এই জন্যই হয়তো এতগুলো দিনেও ছেলেটির পাশে তার মাকে দেখা যায়নি! আর সে একটা মৃত মানুষকে নিয়ে কতকিছু ভেবে ফেলেছিল! মৌটুসীর ভীষণ মায়া হলো এই মা-হারা বাচ্চাটার প্রতি, সে নিজেও তো একজন মা! সে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসিমুখে বলল, “আচ্ছা বীর সোনা, তোমার যখন মন চাইবে তুমি আমাকে মাম্মা ডাকবে। কোনো সমস্যা নেই। চড়ুইয়ের মতো আমিও তোমার মাম্মা, বাবা।”
​মৌটুসীর কথা শেষ হওয়ার আগেই চড়ুই চট করে বলে উঠল, “না! বীর তোমাকে মাম্মা ডাকবে না। বীর, তুমি আমার মাম্মাকে মাম্মা ডাকতে পারবে না। আমি দেব না।”
​মৌটুসী মেয়ের ফোলা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন চড়ুই পাখি? তোমার বীর বন্ধু আমাকে মাম্মা ডাকলে কী সমস্যা?”

​”না মানে না।” চোখ-মুখ শক্ত করে বলল চড়ুই।
​বীর মলিন মুখে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট ছোট মায়াবী চোখ দুটো স্পষ্ট আকুতি জানাচ্ছে চড়ুইকে, যেন সে তার মাম্মার আদরের একটু ভাগ তাকেও দেয়। মৌটুসীর খারাপ লাগল। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বুঝিয়ে বলল, “এমন করে না চড়ুই পাখি। দেখো, বীরের তো মাম্মা নেই। আমাকে মাম্মা ডাকলে হয়তো তার ভালো লাগবে। বীর তো তোমার বন্ধু, তাই না?”
​চড়ুই বুকে হাত গুজে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এই পর্যায়ে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে অভিমানী গলায় বলল, “আমারও তো পাপা নেই, মাম্মা! বন্ধু তোমাকে মাম্মা ডাকলে আমিও তার পাপাকে পাপা ডাকব।”
​মেয়ের মুখে এমন আবদার শুনে মৌটুসী চমকাল, থামল, আরেক দফা হতবিহ্বল হয়ে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার চিন্তাশক্তি লোপ পেল যেন। স্থির দৃষ্টিতে কতক্ষণ মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “এসব কেমন ধরনের কথা চড়ুই পাখি? বীরের পাপাকে তুমি কেন পাপা ডাকবে?”

​”তাহলে বীর কেন আমার মাম্মাকে মাম্মা ডাকবে?”
​মেয়ের পাল্টা যুক্তিতে মৌটুসী কথা হারিয়ে ফেলল। হৃদপিণ্ডটা বুকে ক্রমান্বয়ে হাতুড়ি পিটা করতে লাগল। চোখ দুটো অজান্তেই ছলছল করে উঠল। তার ছোট্ট মেয়েটারও তো পাপা ডাক শুনবার জন্য কেউ নেই! কিন্তু সে কী করে তাকে বোঝাবে, তার এই আবদার যে বড়ই দুর্বোধ্য, অসম্ভব! অসহায়ভাবে ফাঁকা ঢোক গিলল মৌটুসী। পরক্ষণেই নিজের দুর্বল সত্তাকে শক্ত খোলশে আবৃত করে মেয়েকে বলল, “চড়ুই পাখি তুমি পঁচা কথা বলছ। মাম্মা কিন্তু রাগ করছি।”
​”পঁচা কথা না। বীরের পাপা আঙ্কেল অনেক ভালো, আমাকে অনেক আদর করে, আজকেও কতগুলো চকলেট দিয়েছে!”
​মৌটুসী এবার তিতিয়ে উঠল। পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে কড়া গলায় শাসাল, “চড়ুই পাখি! এমন কিছুই হবে না। আমি যেন দ্বিতীয়বার তোমার মুখে এমন কথা আর না শুনি, বোঝা গেল? আর বীরের পাপার সামনে তো কক্ষনো না!”

​চড়ুই মুখটা গোমড়া করে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
​মৌটুসী এবার বীরের দিকে ফিরে ওকে দুই হাতে বুকে টেনে নিল। কণ্ঠ নরম করে বুঝিয়ে বলল, “বীর সোনা! তোমার পাপা তোমার জন্য একটা মিষ্টি মাম্মা আনবে বাবা। তখন তুমি তাকে মাম্মা ডেকো, কেমন?”
​বীর মুখ তুলে বড় বড় মায়াবী চোখে মৌটুসীর দিকে তাকাল। নিষ্পাপ কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “পাপা আমাল জন্য মাম্মা আনবে?”
​মৌটুসী হাসিমুখে বলল, “অবশ্যই আনবে সোনা। খুব কিউট একটা মাম্মা আনবে, যে হবে তোমার নিজের মাম্মা। সে তোমাকে অনেক ভালোবাসবে, অনেক আদর করবে।”
​বীর কৌতূহলী হয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, “পাপা কোথা থেকে আমাল জন্য মাম্মা আনবে?”
​এতক্ষণ সামলে নিলেও, এবার মৌটুসী থতমত খেয়ে গেল। প্রশ্নটি এমন যে, সে উত্তর দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না। ঢোক গিলে আমতা-আমতা করে বলল, “উমমম… আনবে! কোথা থেকে আনবে… তু… তুমি বরং তোমার পাপাকেই জিজ্ঞেস করো, কেমন?”
​”আচ্ছা।”

​মৌটুসী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। খিচুড়িতে একটা নাড়া দিয়ে চড়ুইয়ের দিকে ফিরল। মেয়েটা মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মৌটুসী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বলল, “চড়ুই পাখি, সোনা মাম্মা আমার, বীর বন্ধুকে নিয়ে বাইরে খেলতে যাও। খিচুড়ি হয়ে গেলে আমি তোমাদের ডেকে নেব। তারপর একসাথে দুজনকে খাইয়ে দেব।”
​চড়ুই এক চুলও নড়ল না, বরং ওর চোখ-মুখ আরও শক্ত হয়ে উঠল। বীর এবার চড়ুইয়ের ছোট হাতটা ধরে বলল, “চড়ুই পাখি চলো, হাঁস ছানার সাথে খেলা করব।”
​চড়ুই এবার বীরের হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “বীর বন্ধু, তুমি তোমার পাপার ভাগ দিবে আমাকে?”
​”দিব তো! আমি পাপাকে বলব তেমালও পাপা হতে।” বীরের সহসা উত্তর। যেন সে তার পাপাকে চড়ুই পাখির সাথে ভাগ করতে তুমুল উৎসাহী।
​”সত্যি বলবে?”
​”সত্যি!”

​মৌটুসী এবার ভ্রু কুঁচকাল। বুঝল পরিস্থিতি বিব্রতকর হতে যাচ্ছে। আর মিস্টার জেন্টলম্যানের কানে পৌঁছালে সে অস্বস্তিতে দাঁড়াতেই পারবে না তার সামনে। জেন্টলম্যান ভাবতে পারেন, সে নিজেই মেয়েকে শিখিয়ে দিয়েছে। না, মেয়ের অবুঝ আবদার পূরণ করতে এভাবে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে পারবে না সে। তাই আগেই সতর্ক হয়ে বীরকে বুঝিয়ে বলল, “না বীর, পাপাকে এসব বলতে হয় না। তুমি কিন্তু একদম বলবে না, ঠিক আছে?”
​বীর কিছুই বলল না। শুধু মাথাটা হালকা কাত করল।
​চড়ুই এবার কাঁদো কাঁদো মুখে তাকাল মৌটুসীর দিকে। ফিসফিস করে বলল, “বীরের পাপা তার জন্য মাম্মা আনবে, তুমিও কি আমার জন্য পাপা আনবে?”
​হুট করেই মৌটুসী মাটিতে হাঁটু ভেঙে বসে মেয়েকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুটুকু লুকিয়ে বলল, “আনব মামনি। আনব। তোমার জন্য পাপা আনব। কেঁদো না, কেঁদো না মা আমার!”

​মায়ের আস্বাসে কিছুটা খুশি হলো চড়ুই। বুক থেকে মাথা তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “বীরের পাপার মতোই লাগবে।”
​মৌটুসী ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সায় দিল, “হুম। তুমি যেমন চাইবে।” এরপর কপালে চুমু খেয়ে বলল, “এখন যাও, বীর বন্ধুকে নিয়ে খেলা করো।”
​চড়ুই আর বীর বেরিয়ে যেতেই এতক্ষণ লুকিয়ে রাখা অশ্রুগুলো চোখ দিয়ে ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়তে লাগল। আর সম্ভব নয়, দুই হাতে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল সে। মৃদু শব্দে ফোপানোর শব্দ যেন বহুদিনের জমানো কষ্টের এক দীর্ঘশ্বাসের মতো রান্নাঘরে ছড়িয়ে পড়ল। এত কষ্ট হচ্ছে কেন? কী কারণ? আরও এক প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় কাঁধে নিয়ে নিল, তার ভারেই কি এই ব্যথা?

চড়ুই হাঁসের বাচ্চাগুলো ওর বীর বন্ধুর সাথে ভাগাভাগি করবে। তাই বীরের ফিরে যাওয়ার সময় একটা ছানা ওকে দিতে চাইল। হাঁসের ছানা পেয়ে বীরও খুব খুশি। চড়ুই একটা ছানা হাতে করে ধরে মৌটুসীর কাছে নিয়ে এসে বলল, “মাম্মা আমি এটা বীর বন্ধুকে উপহার দিয়েছি। একটা ব্যাগের ভিতর ঢুকিয়ে দাও।”
​মৌটুসী ভ্রু কুঁচকাল মেয়ের কাণ্ড দেখে। পরে বুঝিয়ে বলল, “চড়ুই পাখি, এই ছোট ছানাগুলো একা থাকতে পারে না। এদের দুজনকে আলাদা করলে ওরা মন খারাপ করে মারা যাবে। তোমরা বরং এখন ওদের একসাথে খেলতে দাও। যখন ওরা অনেক বড় হয়ে যাবে, তখন দুজন ভাগাভাগি করে নিও।”
​মৌটুসীর কথা দুজনেই বুঝল। তাই আর কোনো জেদাজেদি করল না। দুই বন্ধু সিদ্ধান্ত নিল, বড় হওয়া পর্যন্ত ছানা দুটো এখানে, এই পুকুরেই থাকবে। আর বড় হয়ে গেলে একটা বীর ওদের বাসায় নিয়ে যাবে।
​বিকেলের দিকে সাফওয়ান এসে গলির মাথা থেকে বীরকে নিয়ে গেল। মৌটুসীর অনেক বলাতেও বাড়িতে এল না। তবে আশ্বস্ত করে বলল, অন্য একদিন নিশ্চয়ই আসবে।

​বোরাকের উরুর ওপর বসে ফিডারের দুধ খাচ্ছে আর টিভিতে কার্টুন দেখছে বীর। বোরাক এক হাতে ছেলেকে ধরে অন্য হাতের আঙুল চালিয়ে ফোন স্ক্রোল করছে। এই পর্যায়ে বীর মুখ থেকে ফিডার সরিয়ে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বোরাকের দিকে তাকাল। বোরাকও ফোনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ছেলেকে ফুল অ্যাটেনশন দিল। মিষ্টি হেসে বলল, “বাবা আমার!”
​বীর কিছুক্ষণ বাবার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, “পাপা, তুমি আমাল জন্য একটা মাম্মা নিয়ে আসবে?”
​ছেলের এমন অদ্ভুত প্রশ্নে বোরাকের হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা কিঞ্চিৎ কুঁচকে উঠল। তার বিয়ের প্রসঙ্গে কোনো কথা তো বাড়ির কারোরই বীরকে জানানোর কথা নয়! তবে? বোরাক পাল্টা ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে এসব কে বলেছে পাপা?”

মৌটুসী পর্ব ১৪

​বীর খুব সহজ গলায় উত্তর দিল, “চুলুই পাখিল মাম্মা আন্টি বলেছে।”
​বোরাক দ্বিতীয় দফায় অবাক হলো। চড়ুইয়ের মাম্মা কেন এই ধরনের কথা বীরকে বলতে যাবে? বোরাকের খটকা খটকা হয়েই রইল। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বীর আবারও বলে উঠল, “পাপা, জানো? আমাল যেমন কোনো মাম্মা নেই, চুলুই পাখিলও পাপা নেই। ওল মাম্মা বলেছে, ওকেও একটা পাপা এনে দেবে।”

মৌটুসী পর্ব ১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here