যাত্রাপথ পর্ব ২৯
মাশফিত্রা মিমুই
আকাশ আজ মেঘলা। ভোর রাত থেকে বৃষ্টি আসার আগমনী বার্তা দিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। উঠোনের একপাশে বসে একা হাতেই পাঁচটা দেশী মোরগ কেটে চলেছেন কলিমের মা।চারপাশে মাছি ভনভন করছে। অদূরে বিথী কুটছে মাছ। গাছের ডালে কাকের দল কা কা করছে। সুযোগ পেলেই যেন থাবা মারবে মৃত মাছের গায়ে।
সকালের খাবার খেয়ে গৃহিণীরা শুরু করে দিয়েছে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন। মিছরিকে দেখতে পেয়ে মর্জিনা ডাকলেন,“ওই মেজো বউ! ধরো, গরুর গোশটা ভালা মতন ধুইয়া আনো।”
বাধ্য মেয়ের মতো ডেচকি ভরা গোশত নিয়ে কলপাড় চলে গেলো মিছরি। গোশতের গায়ে ময়লা দিয়ে ভর্তি। কসাই সম্ভবত পরিষ্কার স্থানে কাটেনি। মর্জিনা এবার লিলির উদ্দেশ্যে বললেন,“এই পাউয়াগুলা কাইট্টা দেও তো, বউ। পাউয়া ভাজি করমু। তোমার চাচা শ্বশুরের অনেক পছন্দ।”
লিলির চোখেমুখে আঁধার নেমে এলো। বিরক্তি নিয়ে বললো,“বাড়িতে এত মানুষ থাকতে আমি কাটবো?”
“ক্যান? তুমি কোন নবাবজাদী যে কাটতে পারবা না? বাড়ির সবাই কাম করতাছে, দেহো না? শ্বশুরবাড়িতে পায়ের উপর পা তুইল্যা বইয়া বইয়া খাওয়া চলবো না। আইয়ো তাড়াতাড়ি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
অগত্যা বাধ্য হয়েই লিলিকে যেতে হলো। বঁটি আর প্রায় দশটা বড়ো বড়ো কাঁচা পেঁপে নিয়ে বারান্দার পিঁড়িতে গিয়ে বসলো। বাড়িতে যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশ চলছে। পেঁপে কাটতে গিয়ে হাতের আঙুলের বেশ কয়েক জায়গায় কেটে গেলো তার। রাগে দুঃখে সবকয়টার গোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলো। এসব কী তার কর্ম? তার মাও বোধহয় এমন কাজ বহুদিন করেননি। বাড়িতে কাজের লোকই সমস্ত কাজ করে। কলিমের মা মুরগি কাটা শেষ করে জিড়োতে বসলো। লিলির কাজের ঢং দেখে মুখ বাঁকিয়ে বললো, “এইগুলা এত মোডা কইরা কাটতাছো ক্যান? এমনে কাটলে তো ছিঁকলার লগেই সব যাইবো গা। তরকারি আর কতটুক হইবো? সুবহান ভাইয়ের দুই দুইডা পোলাই আকাইম্মা মাইয়া মানু ধইরা আনছে। এইসব দিয়া সংসার হয় কহনো?”
মর্জিনা বললেন,“নাজিরের বউডা তো তাও একটু কথা হুনে, কাম না পারলেও কিছু কইলেই চেষ্টা করে। কিন্তু নওশাদেরটা একেবারে বেয়াদব। মুখে মুখে তর্ক করে। কপালের অবস্থাডা দেখ! সারাক্ষণ কুচকাইয়া রাখে।”
লিলি এদের সাথে মুখ লাগালো না। মহিলাগুলোর মুখের ভাষা খারাপ। তার একার পক্ষে এদের সঙ্গে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তবে মা থাকলে অবশ্যই এদের মুখের উপর উচিত জবাব দিতে পারতো।
নওশাদ নাজমুলের সাথে নামার জমিতে কলাগাছের চারা লাগাচ্ছিলো। কথাগুলো কর্ণগোচর হওয়ায় বললো,“শহরে বড়ো হইছে, চাচী। তাই এসব পারে না। ওগো বাড়িত কাম করার লাইগাই আলাদা মানুষ রাখা আছে।”
“ওইসব শহরে চলে, গেরামে না। নিজের সংসারের কাম মাইনষে করবো ক্যান?” বিথী বললো।
“পারে না, এখন আর কী করবেন? আপনারা একটু শিখাইয়া পড়াইয়া নেন।”
“তাই চাই, বাপ। কিন্তু তোর বউ হুনলে তো। কোনো কথা হুনে না। আমরা কী তার শত্রু? দেওরার পোলার উপর কী আমগো কোনো অধিকার নাই?” ফরিদা বললেন।
নওশাদ দুদিকে ঘন ঘন মাথা নাড়ালো। চাচীদের সঙ্গে বিরোধ করে বউয়ের চামচা উপাধি পেতে সে অনিচ্ছুক। বললো,“আমি ওরে বুঝামু, বড়ো চাচী। আমনে মনে দুঃখ নিয়েন না।”
“আর কবে বুঝাবি? বিয়ার তো আর কমদিন পার হয় নাই।”
বিপরীতে আর কিছু বলার মতো খুঁজে পেলো না নওশাদ। মিছরি গোশত ধুয়ে কলপাড় থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছিল। তাকে দেখেই নওশাদ ডাকলো, “ভাবি!”
হাঁটতে হাঁটতে লোকটার দিকে একপলক তাকালো সে। চাহনির ভঙিতে অপ্রস্তুত হলো কিছুটা। জিজ্ঞেস করল,
“আমায় ডাকলেন?”
“আপনাকে ছাড়া আর কাকে ডাকবো? বয়সে ছোটো হলেও আপনি আমার বড়ো ভাইয়ের বউ হন। সম্পর্কে বড়ো, সম্মানীয়।”
লজ্জা আর বিভ্রান্তিতে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল মিছরি। এত বড়ো একটা লোক তাকে ভাবি ডাকছে, আবার আপনি বলে সম্বোধনও করছে! ভাবতেই বিস্ময়ে ভরে ওঠে মন। নওশাদ জিজ্ঞেস করল,“ভাই কই? সকাল থেকে একবারও দেখা পেলাম না।”
“বাড়িতে নেই, ক্ষেতে গেছে।”
কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকে নওশাদ। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,“আমরা আজ বিকেলের ট্রেনেই শহরে ফিরে যাচ্ছি।”
কথা শেষ হতে না হতেই ফরিদা আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলেন,“কী কস! আইজ?”
“হ্যাঁ, গতকালই যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু যাইনি।”
“আগে কইলি না ক্যান? বাড়িত কুটুম আইবো। আর তোরা যাবি গা?”
“এখন যাচ্ছি না, বিকেলে যাচ্ছি। ভাইকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম।”
ফরিদা যে অসন্তুষ্ট হলেন বুঝাই গেলো। জোগাড় যন্ত্র শেষে রান্নার আয়োজন শুরু হলো। মিছরিকে পাশে বসিয়ে ফরিদা তাকে সঁপে দিলেন মশলা বাটার কাজ। কিছুক্ষণ অনভিজ্ঞ হাতে শিলের উপর পাথর পিষতেই তালুতে জমাট বেঁধে গেলো রক্ত। ফরিদা তা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন,“বাদ দেও এইডা। যাও, চুলা ধরাও। এইডা তো পারো নাকি?”
এটাও মিছরি পারে না। মুখ ছোটো হয়ে গেলো তার। ফরিদা নিজেই মশলা বাটতে শুরু করে দিলেন। বাটা মশলা দিয়ে গরুর গোশত ভালো করে মাখিয়ে চুলায় চাপাবেন। বাড়ির সবাই তাঁর হাতের মাখানো গোশত খেতে ভীষণ পছন্দ করে। মেয়েটার মুখ দেখে আশ্বস্ত করে বললেন,“সমস্যা নাই। তোমার অন্য চাচী শাশুড়ি আর জায়ের মতন বকমু না। বস্তা থাইক্যা শুকনা পাতা বাহির কইরা চুলার মুখে ঢুকাও। হেরপর কুপি জ্বালাইয়া পাটখড়ির মাথায় আগুন ধরাইয়া চুলার ভিতরে রাইখা ওই পাইপ দিয়া ফুঁ দেও। যতক্ষণ না আগুন ধরবো, ততক্ষণ পর্যন্ত ফুঁ দিতেই থাকবা।”
কথামতো তাই করতে লাগলো মিছরি। আগুন ধরাতে গিয়ে তার পরনের পোশাক আর হাতে-মুখে লেগে গেলো কালি। বহু কসরতের পর শেষমেশ চুলায় জ্বলে উঠলো আগুন। ততক্ষণে মশলা বেটে গোশত মাখানো শেষ ফরিদার। পাতিলটা চুলায় বসিয়ে বললেন,“এইবার গা গোসল দিয়া আইয়ো, যাও। বহুত কাম করছো। একটু পর মেমান দিয়া বাড়ি ভইরা যাইবো। তহন আর গিয়া গোসল করতে পারবা না। নতুন বউ সাইজা সুন্দর কইরা তৈয়ার হইয়ো। গহনাগাটি বেশি বেশি কইরা পরবা কিন্তু।”
মিছরি মাথা নাড়িয়ে উঠে চলে আসে। এই বাড়িতে ভালো মানুষ হিসেবে এই মহিলাকেই আপাতত তার মনে ধরেছে। ঘরে প্রবেশ করতেই জগ থেকে সরাসরি মুখে পানি ঢেলে খাওয়া নাজিরকে দেখতে পেলো সে। মিছরি কথা না বলে আলনা থেকে কাপড় নিতে লাগলো। নাজির প্রশ্ন করল,“কয়লাতে গিয়া গড়াগড়ি করছিলা নাকি? মুখের এই অবস্থা ক্যান?”
প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি নিয়ে পেছনে ফিরে তাকালো মিছরি। টেবিল থেকে ছোটো আয়নাটা নিয়ে মুখের সামনে ধরতেই চমকে গেলো। কপালে, গালে কালি লেগে আছে। দ্রুত ওড়না দিয়ে মুছতে মুছতে বললো,“চুলা জ্বালাতে গিয়ে হয়তো লেগে গেছে।”
বিপরীত থেকে আর কোনো সাড়া না পেয়ে জিজ্ঞেস করল,“কোথায় গিয়েছিলেন?”
“ক্যান? খুব মনে পড়তাছিল?”
“মোটেও না।”
“আইচ্ছা?”
“কাপড় রাখার জন্য একটা আলমারি লাগবে। সব কাপড় কী আলনায় রাখা যায়?”
“আর কী লাগবো?”
“বড়ো একটা আয়না। এই ছোটো আয়নায় শুধু মুখ দেখা যায়।”
“বড়ো আয়না?”
“হুম, ড্রেসিং টেবিল। আমাদের বাড়িতে আছে।”
“তগো বাড়ি?”
“হুম।”
“কোনডা?”
“আমার বাপের বাড়ি।”
“তাইলে আমগো মারাস ক্যান? বিয়ার পর তোর বাড়ি এইডা। আমগো বাড়ি মানে জামাইর বাড়ি বুঝাবি।”
“এটা শ্বশুরবাড়ি।”
“একটা দিমু। এইডা আমি নিজের পরিশ্রমের ট্যাহায় বানাইছি। তোমার শ্বশুরের ভিটা ওইপাশেরটা।”
“ওইপাশের মাটির বাড়ি?”
“হ।”
“এবার বলেন, কবে কিনে আনবেন?”
“ট্যাহা নাই, পরে।”
“আপনি একটা গরিব লোক।”
“যা বাপেরে গিয়া জিগাইয়া আয়, গরিব লোকের কাছে বিয়া ক্যান দিছে।”
“নেহাৎ শালিসে সাহায্য করেছিলেন বলে।”
“তার লাইগা বিয়া দিয়া দিবো?”
“দিয়েছে তো।”
“অন্য কারণ আছে। কলকাঠি তোমার শয়তান দাদায় লাড়ছে। বুইড়ার শরীরে অনেক বিষ।”
“একদম এসব বলবেন না। খারাপ হবে।”
“কী খারাপ করবা?”
“বলবো না।”
“বিয়ার আগের রাইতে দুই ভাই-বোইনে মিল্যা যে পলানের চেষ্টা করছিলা, তা পারছিলা কী? সেই তো নাজির শাহর বউ হইয়াই আইতে হইছে। কয়দিন পর ডজন ডজন পোলাপাইনের মা ও হইয়া যাইবা।”
আঁতকে উঠলো মিছরি। হাত থেকে গামছাটা পরে গেলো নিচে। চোরা দৃষ্টিতে পিছু তাকাতেই নাজির শব্দহীন হেসে উঠলো।
“তুমি কী ভাবছিলা, ময়না পাখি? নাজির জানবো না? গেরামের এমন কিছু নাই যা নাজির জানে না। তোমার আমার মিল উপর থাইক্যাই সেট করা। না হইলে তুমিই কও পটাইলাম না, বদনাম করলাম না, কহনো কোনো ইঙ্গিত পর্যন্ত দিলাম না তাও আমার ভাগ্যে আইয়াই ক্যান পড়লা? তোমার বংশ আমগো জাত শত্রু। সেই ছুডোবেলা থাইক্যাই এই শত্রুতা দেইখা বড়ো হইছি। তোমার ভাইগো লগে আমার ভাইগো মারামারির মতো শত্রুতা। তাইলে বিয়া হইলো কেমনে?”
দৃষ্টিতে বিস্ময় জমে মিছরির। নাজির মাথায় টোকা মারে,“থাক, ছুডো মাথায় এত চাপ দিয়েন না, বউ। শুধু মনে রাখেন জন্ম, মৃত্যু, বিয়া সব আমগো জন্মের আগে থাইক্যাই আল্লাহ লেইখা রাখছে। ভাগ্যে না থাকলে কহনো কিছু হইতো না। রিজিকের মালিকও আল্লাহ। ধনী, গরিব বিষয় না। বিষয় হইতাছে হালাল, হারামের। কামাই কম, তবে সব হালাল। বড়ো মুখ কইরা কইতে পারবা, জামাইয়ের হালাল কামাই খাও।”
নাজির গামছাটা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বেরিয়ে যেতে লাগলো ঘর থেকে,“আইজ সারাদিন আর কাম নাই। কাপড় গোছাও, আগে আমি গোসলডা সাইরা আসি। একলগে করতে চাইলে পিছে পিছে আইতে পারো।”
সেকথা শ্রবণালী পর্যন্ত পৌঁছালো না মিছরির। এই বাড়িতে এসে থেকেই রহস্য রহস্য গন্ধ পাচ্ছে সে। কিন্তু কিছুতেই যেন উদঘাটন করতে পারছে না। বোঝ হওয়ার পর বাড়ি ফিরে এই প্রথমই নাজির লোকটার সাথে দেখা হয়েছিল তার। পূর্বে কখনো নাম শুনেছিল কিনা তাও ঠাওর করতে পারে না। সত্যিই কী সব ভাগ্য? অবিশ্বাসের অবকাশও অবশ্য থাকে না। মিছরি বরাবরই তাকদিরে বিশ্বাসী।
গোসলের জন্য বের হলেও কলপাড় বা পুকুর পাড়ে নাজির গেলো না। গলায় গামছা, লুঙ্গি ঝুলিয়ে বাঁদরের মতো উঠে বসলো পেয়ারা গাছের উঁচু ডালে। নিচে দাঁড়িয়ে আছে আব্দুল্লাহ আর সুমা। শোরগোল শুনে মিছরি বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। স্বামী নামক লোকটাকে গাছের আগায় বসে থাকতে দেখে রাগত স্বরে চেঁচিয়ে বললো,“আপনি না গোসল করতে গেলেন?”
পেয়ারায় কামড় দিতে গিয়েও থেমে গেলো নাজির। হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙিতে বললো,“ওহ, হ, ভুইল্যা গেছি। দেহো কত হরবি হইছে, খাইবা?”
“বাজে লোক। এতক্ষণে আমার গোসল হয়ে যেতো। আপনার জন্য দেরি হয়েছে।”
“নেও, খাও।”
বলেই একটি পেয়ারা ছিঁড়ে তার দিকে ছুঁড়ে মারলো নাজির। মিছরি দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে বিড়বিড় করে বকতে বকতে পোশাক নিয়ে কলপাড়ে ঢুকলো। কলপাড়ের ছাদ খোলা। ভেতরে দাঁড়িয়ে গাছপালা আর আকাশ দেখা যায়। চারিদিকে ইটের দেয়াল হলেও দরজা টিনের। পেয়ারা গাছটা তার পাশেই। এই তো ওখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট নাজিরকে দেখা যাচ্ছে। এমনকি পেছনে ঘুরলে নাজিরও ভালো করেই ভেতরটা দেখতে পাবে। মিছরি আবার বেরিয়ে এলো। পূর্বের মতোই চেঁচিয়ে বললো,“নিচে নেমে আসুন।”
সুমা হাতের পেয়ারাটা অর্ধ খেয়ে ডাকলো,“চাচা, আরেকটা দেও।”
নাজির এবার একসাথে প্রায় দশ বারোটা পেয়ারা তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বললো, “ক্যান?”
“গোসল করবো।”
“ধইরা রাখছে কেডায়?”
“আপনাকে নামতে বলেছি।”
“একলগে করবা?”
“মুখে কিছু আটকায় না? এই গাছের আগা থেকে কলপাড়ের ভেতরের সবকিছু দেখা যায়। কীভাবে গোসল করবো? নামেন তাড়াতাড়ি।”
“তাতে কী হইছে? জামাই লাগি। পিছনে ফিরা দেখার অত শখ নাই আমার।”
নিজের রাগকে আর কিছুতেই সংবরণ করতে পারলো না মিছরি। আশেপাশে খুঁজে মাটির কিছু কুন্ডুলি নিয়ে ছুঁড়ে মারতে লাগলো উপরে। নাজির নড়েচড়ে উঠলো। হুমকি দিয়ে বললো,“আক্কাসের নাতিন! জামাইয়ের গায়ে ঢিল ছুঁড়োস? নিচে আইলে কিন্তু পুকুরে লইয়া গিয়া ঘেডি ধইরা চুবামু।”
সুমার হাত থেকে ছোঁ মেরে একটা পেয়ারা কেড়ে নিলো মিছরি। নিশানা বরাবর ধরে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,“ফিতার নাতিরে আমি ভয় পাই না। না নামলে এই পেয়ারা দিয়ে আজ মাথা ফাটাবো।”
কয়েক সেকেন্ডের জন্য বোকা বনে গেলো নাজির। ফিতা! ফিতা কে? ভাবতে গিয়ে আঁতকে উঠলো সে। চেঁচিয়ে বললো,“তুই আমার দাদারে ফিতা কইলি? এত্ত বড়ো সাহস?”
“বেশ করেছি। একশবার বলবো। আমার দাদা আক্কাস হলে আপনার দাদা ফিতা। এবার নামবেন নাকি মাথা ফাটাবো?”
“আইচ্ছা, দাঁড়াও। বুইড়া ভদ্র কইয়া বোমা ধরাইয়া দিছে। পুরা ঠইকা গেলাম। পোলাপাইন বইল্যা তোমারে কিছু কইলাম না শুধু।”
সুমা এগিয়ে গিয়ে মিছরির হাত থেকে নিজের পেয়ারা উদ্ধার করে জামায় মুছতে মুছতে বললো,“আমার হরবি!”
নাজির নিচে নেমে এলো। উঠোনে বসে সকলেই এদের কান্ডকারখানা চেয়ে চেয়ে দেখছে। কলিমের মা মুখ বাঁকিয়ে চাপা স্বরে বললেন,“খারাপ মাইয়া মানু। কী ব্যবহার জামাইয়ের লগে!”
মর্জিনা সন্তুষ্ট চিত্তে বললেন,“কইছিলাম না, বউ আইয়াই গোলামের পুতেরে ঠিক করতে পারবো। এক্কেবারে ঠিক হইছে, খুশি হইছি। জীবনে অনেক ঘাউড়ামি করছে।”
নওশাদ, নাজমুল পাশাপাশি বসে হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। নাজির ওদের ধমকালো,“কী রে খুব আনন্দ লাগতাছে, ঝাউড়ার গুষ্টি? হাসি থামা! না থামাইলে দুইডারে ধইরা কিলামু।”
মুখ চেপে ধরলো দুজনে। এই হাসি আজ আর থামার নয়। নাজির সরতেই ফের শব্দ করে হেসে দিলো।
রান্নাবান্না শেষ হওয়ার পূর্বেই অতিথিরা চলে এসেছে বাড়িতে। ফরিদার বাপের বাড়ির দিকের নিকটাত্মীয় বলতে আছে মাত্র ওই একটা ভাই। তাই তাকেও আজ পরিবারসমেত দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। বোন তো নিজের সংসার নিয়েই ব্যস্ত থাকে সারা বছর।
মিছরি শাড়ি হাতে লিলির ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে ডাকলো,“লিলি আপা!”
ভেতর থেকে জবাব এলো,“এসো।”
মিছরি ভেতরে প্রবেশ করে আশেপাশে তাকালো। না, নওশাদ ঘরে নেই। তাই স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
“কী প্রয়োজন?”
“শাড়ি পরিয়ে দেবে? আমি ঠিকমতো পরতে পারি না।”
“দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসো।”
বিছানায় শাড়ি রেখে দরজায় খিল দিয়ে এলো মিছরি। লিলি সাজছিলো। চোখে কাজল পরে সেই সাজের সমাপ্তি টেনে শাড়ির ভাঁজ খুলে দেখতে দেখতে বললো,“ভীষণ সুন্দর তো! কে দিয়েছে? আমার ভাসুর নিশ্চয়ই?”
“বউ ভাতে উপহার পেয়েছিলাম। তবে কে দিয়েছে জানি না।”
মিছরি পেটিকোট, ব্লাউজ পরে নিলো। লিলি নিজের দক্ষ হাতে শাড়িটা গুছিয়ে পরাতে লাগলো। কুচি ঠিক করতেই মিছরি বলে উঠলো,“এভাবে পরাচ্ছো কেন?”
“তবে?”
“ওই যে কেমন প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে পরে না? ভাবি, চাচীদের মতো করে।”
“আমি ওভাবে পরাতে পারি না। এভাবে পরলেই সুন্দর লাগে। কীভাবে পরতে হয় তা তুমি দেখে শিখে রাখো। পরে নিজ থেকে চেষ্টা করলে পরতে পারবে।”
মিছরি আর কিছু বললো না। চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো। লিলি হাতে ধরে পুরো শাড়ি পরাটা খুব সুন্দর করে তাকে শিখিয়ে দিলো। তারপর কাজল হাতে নিয়ে বললো,“এখানে এসে বসো। কাজল পরিয়ে দেই, আরো সুন্দর লাগবে।”
দ্বিমত করল না মেয়েটা। কাজল পরলে তাকে সুন্দর লাগে। লিলিও তেমন গাঢ় করে কাজল পরালো না। বরং হালকা করেই পরালো। মিছরি আয়নায় দেখলো নিজেকে। অধরে ফুটে উঠলো চমৎকার হাসি, “ধন্যবাদ, আপা।”
লিলি প্রত্যুত্তরে শুধু হাসলো। কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টানতে দেখে বললো,“যেভাবে আছে সেভাবেই সুন্দর লাগছে। আবার ঘোমটা দিতে হবে কেন?”
“এমনি, এতগুলো মানুষের সামনে যাবো। যেমন তেমন করে তো আর যাওয়া যায় না। আমি যাচ্ছি, তুমিও চলে এসো।”
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিছরি। পুরোনো মাটির ভিটায় ঘর সংখ্যা তিনটি। যার একটাতে থাকে নওশাদ। আর বাকি দুটো নাজির গোলা হিসেবেই ব্যবহার করে। বারান্দা থেকে নেমে নিজেদের ভিটার বারান্দায় উঠতেই নাজিরের সাথে দেখা হয়ে গেলো।গোসল সেরে বাবাকে খাওয়াতে গিয়েছিল সে। স্ত্রীকে দেখে ভ্রু দুটো কুঁচকে আপাদমস্তক ভালো করে চেয়ে দেখলো। মিছরি দুই হাত পেছনে রেখে দুলতে দুলতে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“আমায় কেমন লাগছে দেখতে? বউ বউ না?”
“না, শেওড়া গাছের পেত্নী।”
অধরের হাসি নিভে গেলো মিছরির। ললাটে সরু ভাঁজ পড়ল। মুখ ভেঙিয়ে বললো,“আপনি আসলেই একটা মিথ্যাবাদী।”
“তুমি বুঝি সত্যবাদী?”
“সত্যবাদী না হলেও এভাবে মিথ্যা বলি না।”
নাজির শব্দহীন হেসে এঁটো প্লেটটা রান্নাঘরে রেখে এলো। থুতনি সমান লম্বা মেয়েটির নরম কব্জি ধরে আচমকা টেনে নিয়ে এলো নিজের অতি নিকটে। এক হাত পিঠে ঠেকিয়ে কপালে শক্ত করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। মুহূর্তেই সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো মিছরির। আশেপাশে তাকিয়ে দ্রুত সরে গেলো দূরে। লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখখানার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নাজির। যেতে যেতে বললো,“বিয়ার পর একটু বেশিই সুন্দর হইয়া গেছে তালমিছরি।”
অবাক হয় মিছরি। পরক্ষণেই অধরে ফুটে ওঠে মুচকি হাসি। যার ফলে থুতনিতে টোল পড়ে।
মহিলারা বাড়ির অন্যান্য নারীদের সাথে গল্পে মেতে উঠেছে। পুরুষেরা শাহ বাড়ির বাকি পুরুষদের সঙ্গে ঘরে বসে গল্প করছে। অতিথি বলতে ওই তো আয়েশার স্বামী, তিন সন্তান, শাশুড়ি, দুই দেবর, দেবরদের স্ত্রী আর পাঁচ ছানাপোনা। সাথে আছে ফরিদার ছোটো ভাই, ভাইয়ের বউ শায়লা আর তাদের তিন ছেলে-মেয়ে। বড়োটার অবশ্য বিয়ে হয়ে গেছে। বউটা আট মাসের গর্ভবতী।
গল্পগুজব শেষে নারী-পুরুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে খেতে বসেছে। পুরুষেরা খাবার ঘরে আর মহিলারা বসেছে পারভেজের ঘরে।
সিরাজ উল্লাহর গলার আওয়াজ অন্যদের চেয়ে একটু উঁচু। কথা বলার ভঙ্গিটাও এমন, যেন মাইকের বদলে তাকে দিয়েই বিশেষ ঘোষণা পৌঁছে দেওয়া যাবে গ্ৰামবাসীদের দোরগোড়ায়। খেতে খেতে প্রথম প্রশ্নটা তিনি নওশাদের দিকেই ছুঁড়লেন,“বহুদিন পর তোর লগে দেখা সাক্ষাৎ হইলো। হুনছি শহর থাইক্যা মাইয়া ভাগাইয়া আইনা নাকি বিয়া করছোস? নেকাপড়া কী শেষ? কামকাজ কিছু করোস? নাকি এহনো ভাইয়ের ঘাড়েই?”
ঘর ভর্তি বাইরের মানুষের সামনে অহেতুক প্রশ্নে খাবার গলায় আটকে গেলো নওশাদের। নাজির পাশেই বসা। পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো। চতুরতার সহিত প্রসঙ্গ বদলাতে বললো,“হুনছি মুদির দোকান দিছেন, নিচে নাকি আবার মুরগির ফার্মও খুলছেন? এত ট্যাহা পয়সা পাইলেন কই থাইক্যা? আমারেও একটু কন।”
খাওয়ার সাথে সাথে গল্প জমে উঠছিল যেন। কিন্তু হঠাৎ নাজিরের কথায় বিরক্তির ভাঁজ ফুটে উঠলো সিরাজ উল্লাহর ললাটে। কথার মাঝখানে মনে হয় বাম হাত না ঢুকালে এই ছেলেটার ভালো লাগে না। কৃত্রিম হেসে বললেন,“আমার আর অত ট্যাহা কই? সাদ্দাম, সোহেল যা কামায় তাই দিয়াই চলে। দোকান খুলছি মহাজনের থাইক্যা ঋণ তুইল্যা।”
“সুদও তো অনেক!”
“না, কমই।”
“ওহ, আমার আবার এইসব হারাম জিনিস পছন্দ না। তাই মনে হয় সবার থাইক্যা পিছাইয়া আছি।”
ভাইয়ের হয়ে যে খোঁচাটা নাজির ফিরিয়ে দিলো বুঝতে আর বাকি থাকে না। সিরাজ উল্লাহ বললেন, “বিয়াত আইতে পারি নাই। কামে আটকাইয়া গেছিলাম। তোর বউ কই? ডাক দেহি। মামা শ্বশুর, ননাস জামাই, অতিথি গো খাওন বাইড়া দিবো না?”
ফরিদা এতক্ষণ এখানেই বসা ছিলেন। লেবু, শসা ফুরিয়ে যাওয়ায় ভেতরে গিয়েছিলেন আনতে। কথাটা শুনেই বললেন,“ওয় ভিতরে বেয়াইন গো খাওন বাইড়া দিতাছে। আমি ডাইকা আনি।”
নাজির বাঁধা দিলো,“নিজের লাইগা বউ আনছি, মামু। পরপুরুষরে খাওন বাইড়া দেওনের লাইগা আনি নাই। এইগুলা বউয়ের কাম না।”
“ধুর, ব্যাটা! তুই যে মাঝে মাঝে কী কস না? শত্রু বাড়ির মাইয়া আনছোস, আবার বউ কইয়া চিল্লাস?”
“কী আর করার কন? সবই কপাল।”
আমিরুল শাহ ইশারায় বাড়তি কথা বলতে নিষেধ করলেন শ্যালককে। ঘরে মেয়ে জামাই আর তার ভাইরাও রয়েছে।পারিবারিক বিষয় নিয়ে আলোচনার স্থান কী এটা নাকি?
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে উঠোনে এসে চেয়ার পেতে বসেছে সকলে। আয়েশার দেবরদের নিয়ে পারভেজ, নাজমুল গিয়েছে বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে। বাচ্চারা সব একসাথে হয়ে দূরের বাগানে ছুটছে। ফরিদা, মর্জিনা সমবয়সী নারীদের পেয়ে পান বানিয়ে দিতে দিতে পৃথিবীর নানাবিধ গল্পে মেতে উঠেছে।মিছরি আমিরুল শাহর দালান থেকে বেরিয়ে লিলির পিছুপিছু ঘরের দিকে যাচ্ছিলো। শায়লা কলপাড় থেকে বেরিয়ে তাদের দেখতেই উচ্চস্বরে বলে উঠলেন,“ওইতো নাজির আর নওশাদের বউ! এইদিকে আইয়ো দেহি।”
লিলি ফিসফিস করে বললো,“ডাকে কেন? খেতে বসেও ইচ্ছেমতো প্রশ্ন করেছে। না শোনার ভান করে ঘরে চলো।”
মিছরিও তেমন করেই বললো,“কিছু মনে করলে?”
“যা ইচ্ছে মনে করুক। আমাদের কী? আমার ঘুমানো প্রয়োজন। একটু পর আবার রওনা দিতে হবে।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই মহিলাটি এগিয়ে এসে খপ করে দু’জনের হাত ধরে বগলদাবা করে এগিয়ে গেলেন বাকি পুরুষদের দিকে। নওশাদ থাকলেও নাজির ওখানে নেই। সিরাজ উল্লাহ কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছেন। স্ত্রীর কণ্ঠে মাথা তুলে তাকালেন।
“এই যে, সুবহান ভাইয়ের দুই পোলার বউ।”
সকলের উৎসুক দৃষ্টি গিয়ে ঠেকলো তাদের দিকে। আমিরুল শাহ মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। লোকটা জিজ্ঞেস করল,“মাস্টর বাড়ির মাইয়া কোনডা?”
আমিরুল শাহ ধমকালেন,“ওই নাম মুখে আনতে নিষেধ করছি না? হের এহন একটাই পরিচয়, শাহ বাড়ির পোলার বউ। আগে পিছে আর কিছু নাই।”
“চ্যাতেন ক্যা, দুলাভাই? তো নাজিরের বউ কোনডা?”
লিলির হাত ছেড়ে দিলেন শায়লা। মিছরিকে টেনে সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন,“এই যে, এই মাইয়া। বউ কিন্তু সুন্দর আছে। বয়স কম, কথাবার্তাও কয় একেবারে বইয়ের মতন কইরা। নাজির কিন্তু জিতছে, দুলাভাই।”
মুমিনুল শাহ বললেন,“জিতছে তো হেরা। আমগো নাজিরের মতন উচ্চ বংশীয়, পরিশ্রমী পোলা পাইতো কহনো?”
“উঁহু, ভাবি কিন্তু আসলেই অনেক সুন্দর। একেবারে পরীর লাহান! বহুদিন পর এমন পরী দেখলাম।”
যাত্রাপথ পর্ব ২৮
বড়োদের মাঝখানে আচমকাই কথাটা বলে উঠলো সোহেল। বাবার ডান হাত সে। সবসময় বাবার সাথে সাথেই থাকে। আমিরুল শাহ কথাটা শুনে ছেলেটার দিকে তাকালেন। কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিছরির দিকে। গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “তোমরা এইবার ঘরে যাও। আমগো কথা আছে। পুরুষ মাইনষের আলোচনায় মহিলা মানুষ থাকা আমার পছন্দ না।”
অবশেষে হাঁফ ছেড়ে যেন বাঁচলো দুই জা। কিন্তু সোহেলের দৃষ্টি সরলো না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাদের যাওয়ার পথে।
