Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৪৫

যাত্রাপথ পর্ব ৪৫

যাত্রাপথ পর্ব ৪৫
মাশফিত্রা মিমুই

আকবর মিয়ার প্রাণহীন দেহখানা মেঝেতে শোয়ানো। আপাদমস্তক একটি রংহীন চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আশেপাশে মানুষেরা কাঁদছে, বিলাপ করছে, কেউ বা রবের নিকট মরহুমের রূহের মাগফেরাতের জন্য দোয়া করছে। মসজিদের মাইকের মাধ্যমে মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে গিয়েছে দূর দূরান্তে। মুহূর্তেই গ্ৰামের নবীন প্রবীণরা ছুটে এসে জমায়েত হয়েছে মাস্টার বাড়ির দোরগোড়ায়। এমনকি তিন কন্যা তমিজা, আবেদা, সরলাও সন্ধ্যার পূর্বেই চলে এসেছে বাবাকে শেষ দেখা দেখতে।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আঘাত বোধহয় সরলা-ই পেয়েছে। পিতার লাশের পাশে এলোমেলো বসে চোখ আর নাকের পানি এক করে আর্তনাদ করছে,“আব্বা, আব্বা গো! আমারে মাফ চাওয়ার সুযোগটাও দিলেন না, আব্বা! আমার আব্বায় আমার উপরে অভিমান লইয়াই দুনিয়া ত্যাগ করছে। ও আব্বা! এই অপরাধ লইয়া আমি বাঁচমু কেমনে? মাইয়া নামে কলঙ্ক আমি। আব্বা গো!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কাঁদতে কাঁদতে একসময় জ্ঞান হারালেন তিনি। ভাগ্নে, ভাতিজারা তাকে ধরে নিয়ে রেখে এলো পাশের ঘরে। শুধু সৈয়দুন নেছাই কাঁদছেন না। মৃত স্বামীর বরফের মতো শক্ত হাতটা মুঠোয় ধরে বসে আছেন। কৈশোরে সংসার, পরিবার, সমাজের অমানবিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে যখন মৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছিলেন তখন তাঁর সামনে আলোর দিশারী হিসেবে যুবক আকবর মিয়াকেই মহান আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছিলেন। লোকটার আগমনে যুবতী সৈয়দুন নেছার জীবন বদলেছে, পেয়েছিলেন এত সুন্দর ঘর, সংসার আর মাতৃত্ব। কত যুগ হাতে হাত রেখে পাড়ি দিয়েছিলেন! অথচ সেই লোক দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। রেখে গেলেন তাকে একা। ওইতো দূরের ওই আরামদায়ক কেদারা খালি পড়ে আছে, ওখানেই তো রোজ বসতেন। অথচ আজকের পর থেকে কেউ বসবে না। এই ঘরটায় কিছুদিনের অতিথি হয়ে একা থাকতে হবে বৃদ্ধাকে।
খাটের সাথে হেলান দিয়ে শূন্যে তাকালেন তিনি। ছেলেদের উদ্দেশ্যে বললেন,“গোসলের ব্যবস্থা কর। তগো আব্বায় কষ্ট পাইতাছে। সবাইরে কানতে নিষেধ কর। কানতে হইবো ক্যান এত? দোয়া কর, দোয়া। তেনারে শেষ গোসল আমি দিমু।”

ছেলেদের চোখেও পানি টলমল করছে। অদূরে শালিক পাখির দল করছে হাহাকার, বিড়াল ছানা উদাস হয়ে ঘরের সামনে করছে ম্যাও ম্যাও। রোজ নিয়ম করে দুইবেলা বুড়ো তাদের খাবার দিতেন। সেই বুড়ো আজ আর নেই। পড়ে আছে তাঁর নিথর দেহ। একটু পর হয়তো এই চিহ্নটুকুরও ঠাঁই হবে সাড়ে তিন হাত মাটির নিচে। তারপর থেকে কে খাবার দেবে তাদের?
প্রবীণদের মুখমন্ডলে বেদনার ছাপ। ভিড় থেকে ভেসে আসছে আলোচনা,“অনেক ভালা মানুষ আছিলেন। দেখা হইলেই হাইসা হাইসা কথা কইতেন, ন্যায়ের পক্ষে থাকতেন। ধীরে ধীরে গেরাম থাইক্যা সব ভালা মানুষ গেলে গা আমগো কী হইবো?”

চারিদিকে হায় হুতাশ আর আফসোস। বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের মাতম। মায়ের পাশে বসে মিছরিও কাঁদছে। তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নাজির একপলক সেই মৃত, কঠিন মুখখানা দেখলো। মুহূর্তেই বুকে যেন হাহাকার করে উঠলো। এক অদ্ভুত শূন্যতা আর ভার একসাথে এসে চেপে বসলো তার উপর। বুকটা চেপে ধরলো সে। মাইকে সংবাদটা শুনেই স্ত্রীকে নিয়ে ছুটে এসেছিল নাজির। আজ সকালেও তো বুড়োর সঙ্গে কত কথা বলে গিয়েছিল। অথচ তখন কি সুন্দর তার সঙ্গে হেসে কথা বলেছে! নাজিরের আফসোস হয়। কেন যে তাড়াহুড়ো করল? আরেকটু কাছে বসলে কী হতো?

ভেতর থেকে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। পৃথিবীতে তার ভালো চাওয়ার মতো, দুঃখ বোঝার মতো কেউ আর রইল না। এই জীবনে যাদেরকেই নাজির ঠুনকো মনে করেছে বা ঘৃণা করেছে আসলে তারাই ছিল নাজির শাহর একমাত্র আপন। আর যাদের ভেবেছিল আপন তারাই তার অনিষ্টকারী। নাজির পিছু হটে। লাশকে গোসলের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর ঘণ্টা দেড়েক পর জানাজা। নাজিরের কানে বেজে ওঠে বুড়োর করুণ কণ্ঠস্বর,‘আমি মরলে আমার লাইগা দোয়া করবি তো, নাজির? আফসোস করবি একটু?’
নাজিরের আজ সত্যি আফসোস হয়, মন থেকে দোয়া আসে। নিজেকে বড্ড একা একা লাগে। কি বিষণ্ণতা চারিদিকে!

মাগরিবের আজানের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। আজ আর সাদা লুঙ্গি, পাঞ্জাবী পরে কেউ মসজিদে নামাজ পড়তে যায় না। অথচ বুড়ো এক ওয়াক্ত নামাজও সহজে কাযা দিতো না। মাগরিবের নামাজ শেষে সৈয়দুন নেছা নিজে স্বামীকে গোসল করালেন। বুড়ো প্রায় বলতো, তোমার আগে আমি মরলে আমার গোসল তুমি দিও, দুনা।
স্বামীর সেই আবদার পূরণ না করলে হয়? বিয়ের পর স্বামী বলেছেন এমন কোনো কাজ নেই যেটা সৈয়দুন নেছা করেননি। গোসল শেষে আতর, সুরমা মাখানো হলো। কি সুন্দর, স্নিগ্ধ যে লাগলো দেখতে! ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি খেলা করছে। সৈয়দুন নেছা চোখ ফেরাতে পারেন না। মন ভরে চেয়ে চেয়ে দেখলেন। এই সৌন্দর্য কী আর কখনো দেখার সৌভাগ্য হবে?কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,“আমার লাইগা আমনে অপেক্ষা কইরেন। খুব শিগগিরই আমি আমনের কাছে আইয়া পড়মু। ওই আন্ধার কবরে ডরাইয়েন না। আমি আমনের লাইগা আল্লাহর কাছে রোজ দোয়া করমু। আল্লাহ তো জানে আমনে মানুষ কত খাঁটি!”

নজরুল আলম তাড়া দিয়ে বললেন,“আম্মা, সময় যে হইয়া গেছে। আব্বারে লইয়া যাইতে হইবো।”
পুত্রের কথায় বৃদ্ধার দুর্বল দেহে কম্পন ধরে। মাথা তুলে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,“এহনি লইয়া যাইবি? জানাজা শেষে সোজা কবর দিবি?
নজরুল আলমের ভীষণ কষ্ট হয়। পুরুষ বলেই হয়তো শুধু হাউমাউ করে কাঁদতে পারেন না। আকবর মিয়া আসলেই আদর্শ একজন পিতা ছিলেন। যার ছায়া তলে তাঁর নানা, দাদা হওয়া ছেলেরাও নিরাপদ বোধ করতো, ভরসা পেতো। ভারী কণ্ঠে বললেন,“হ, আম্মা। আমনেই তো কইছিলেন মরা মাইনষেরে দ্রুত কবর দিতে হয়।”
বুড়ো শেষ নিঃশ্বাস স্ত্রীর কোলে মাথা রেখেই ত্যাগ করেছিলেন। অথচ সৈয়দুন নেছার মনে হয় এখনো অনেক কথা বাকি, অনেক পথ চলা বাকি। বুকে কষ্ট লুকিয়ে রেখে স্বামীকে অন্তিম বিদায় জানিয়ে বলেন, “লইয়া যা।”

নজরুল আলম এগিয়ে আসেন। কাফনের কাপড় দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলেন। খাটিয়ার সামনের পায়া ধরেন তিনি আর কাশেম আলী। পেছনের দুটো ধরে সুজন আর তালেব। রুহুল, মাসুম, ফুফাতো ভাইয়েরা ঠিক তাদের পেছনে। তজবি হাতে আফাজ উদ্দিনও পথ চলছেন তাদের সাথে। বিড়বিড় করে দোয়া দরুদ পাঠ করছেন। ফাঁকে ফাঁকে হাতের উল্টো পিঠে অশ্রু মুছে আড়াল করছেন। আকবর মিয়ার সঙ্গে তাঁর সখ্যতা সেই বাল্যকালের। একসঙ্গে মক্তবে গিয়েছেন, নদীতে ভেলা ভাসিয়েছেন, লাটিম ঘুরিয়েছেন। অথচ আজ সেসব শুধুই স্মৃতি।
গুনগুন কান্নার আওয়াজ এখনো ভেতর থেকে ভেসে আসছে। যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লেন সৈয়দুন নেছা। বিছানার চাদরে এখনো স্বামীর গন্ধ লেগে আছে।

এশার নামাজের পর বিদ্যালয়ের মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। সচরাচর শুক্রবার ছাড়া মসজিদে খুব একটা মানুষ দেখা যায় না। কিন্তু অবাক করা কান্ড, আজ যেন মানুষের ঢল নেমেছে মাঠে। মাসুমের মনে হলো, গোটা ইউনিয়নের মানুষ যেন চলে এসেছে এখানে। ইমাম অনেক দোয়া দরুদ পাঠ করলেন, জানাজা শেষ হলো। শেষ বারের জন্য বহু মানুষ ছুটে এলো বৃদ্ধকে একপলক দেখতে। অনেকে কেঁদেও দিলো। মাসুম তাদের চেনে না। তবুও কানখাড়া করে শুনতে পেলো তাদের কণ্ঠ,“অনেক ভালা মানুষ আছিলো। আল্লাহ জান্নাতবাসী করুক।”

জানাজা শেষে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হলো পারিবারিক গোরস্থানে। এখানেই শুয়ে আছেন আকবর মিয়ার পিতা, মাতা আর প্রথম স্ত্রী জুলেখা। তাঁর কবর খুদা হয়েছে ঠিক পিতার পাশে। ওই অন্ধকার, নির্জন রাত্রিতে একছটা হারিকেনের আলোর মধ্যেই আকবর মিয়াকে শোয়ানো হলো কবরে। খুলে দেওয়া হলো মুখের সাদা কাফনের বাঁধন।তারপর শেষবারের মতো বিদায় দিয়ে মাটি চাপা দেওয়া হলো। কবরের উপর খেজুর কাঁটা দিয়ে একসময় সবাই ত্যাগ করল স্থানটি। শুধু সবার আড়ালে, অন্ধকারের মধ্যে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল নাজির। বৃদ্ধ তাকে বলেছিল, অন্ধকার কবরে থাকতে তাঁর কষ্ট হবে। অন্ধকারে সে ভয় পায়।

দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কী করার আছে নাজিরের? সে তো অকৃতজ্ঞ। নিজের বাবা-মায়ের পরিণতি সম্বন্ধে জেনেও প্রতিশোধ নিতে পারেনি। বরং করছে শত্রুদের সঙ্গেই বসবাস, খেয়েছে শত্রুর হাতের রান্না করা খাবার।
কতক্ষণ যে এভাবে নাজির দাঁড়িয়ে থাকে সে খেয়াল তার নেই। সময়ও হিসাব করে না। আচমকা ভেসে আসে এক ভারী কণ্ঠস্বর,“কেডায় ওইখানে?”
নাজির পিছু ফিরে তাকায়। অদূরে টর্চ লাইটের আলো তার দিকেই তাক করা। নাজির এগিয়ে আসে। মুখটা এবার পরিষ্কার হয়। বৃদ্ধ আফাজ উদ্দিন দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে দেখেই বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“তুই এত রাইতে এনে কী করোস?”

“আমনে কী করেন?”
“মনে শান্তি পাইতাছি না। একদিন তো আমিও এমন কইরাই বিদায় নিমু!”
“সবাইরেই একদিন বিদায় নিতে হইবো। এহন বাড়িত যান। রাইতের আন্ধারে ঘুইরেন না, এমনিতেই হাঁপানির রোগী।”
দুজনে তারা একসঙ্গে হাঁটতে লাগলো। বৃদ্ধর হাঁটার গতি ধীর। তাই নাজিরও সেই গতিই অনুসরণ করল। আফাজ উদ্দিন বললেন,“সেই ছুডো বেলাত্তে আমরা একলগে বড়ো হইছি। কৈশোর পার হইতেই আমগো লগে আইয়া যোগ দিলো তোর দাদা। কিন্তু সবার আগে তো সে-ই গেলো গা। সবচেয়ে কষ্টের আছিলো তার বিদায়। আল্লাহ হেফাজত করো।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন আফাজ উদ্দিন। নাজির চুপচাপ পাশাপাশি হাঁটছে। তিনি ফের বললেন,“তগো মধ্যে তো এহন অনেক শত্রুতা! এইসব আর মনে পুইষা রাখিস না। নজরুলের বাপ কহনো তগো খারাপ চায় নাই। এহন তো হের নাতনি বিয়া করছোস। সংসার কেমন চলে?”
“আল্লাহর রহমতে ভালাই।”
“ভালা থাকলেই ভালা।”

মেইন সড়ক পর্যন্ত আফাজ উদ্দিনকে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরে এলো নাজির। মিছরিকে আর আনতে গেলো না। সদ্য বাড়ির কর্তা মারা গিয়েছেন। এখনো সবার মধ্যে শোক, অস্থিরতা চলছে। থাকুক না হয় কয়েকদিন ওই বাড়িতে।
ফটক পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেলো উঠোনে চেয়ার পেতে বসে থাকা আমিরুল, মুমিনুল শাহ আর সিরাজ উল্লাহকে। হেসে হেসে গল্প করছে। লোকটাকে দেখেই নাজিরের মাথায় রক্ত উঠে গেলো। ইচ্ছে করল ছুটে গিয়ে বেধরাম পেটাতে। তার পিছুপিছু প্রবেশ করল নওশাদ। সেও রেগে গেলো। তবে ভাইয়ের মতো রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে সশব্দে বলে উঠলো,“কু**ত্তার বাচ্চা!”

হাত মুষ্টিবদ্ধ করে এগিয়ে যেতে লাগলো সেদিকে। উপস্থিত মানুষদের কথা থেমে গেলো। দৃষ্টি স্থির হলো তেড়ে আসতে থাকা হিংস্র নওশাদের দিকে। নাজির আঁতকে ওঠে, দ্রুত ছোটো ভাইয়ের হাত চেপে ধরে থামিয়ে দিলো। চাপা স্বরে শাসিয়ে বললো,“মরতে চাস, বদমাইশ? পারবি হেগো লগে? রাগ সংবরণ কর, এই খেলা বুদ্ধির খেলা।” তারপর সবার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বললো,“ওই পাড়ার কুত্তায় বাচ্চা দিছে। রাস্তায় বাহির হইলেই জ্বালায়।”
সকলের হতভম্বতা কমলো। ঠেলেঠুলে নওশাদকে ঘরে পাঠিয়ে দিতে চাইলো নাজির। কিন্তু আমিরুল শাহ বাঁধা দিলেন। ভাতিজাদের ডাকলেন,“এইদিকে আয়।”

নাজির বাধ্য ছেলের মতো এগিয়ে গেলো। পেছন পেছন নওশাদও এলো। আরেকটা চেয়ার টেনে দুই ভাই পাশাপাশি বসলো। ভালো করে তাকাতেই দেখতে পেলো মানুষ রূপী অমানুষগুলোর মুখমন্ডল জুড়ে খেলা করা তৃপ্তির হাসি। সিরাজ উল্লাহ চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,“আল্লাহর মাল আল্লাহ লইয়া গেছে। বয়স তো কম হইলো না! যত তাড়াতাড়ি মানুষ মরে ততই ভালা।”
আমিরুল শাহ তাল মেলালেন,“হ, আমগো শান্তি নষ্ট করতে করতেই অর্ধেক জীবন পার করছে। নাজিররে তো মাঝে মাঝেই কানপড়া দিতে চাইতো। খারাপ লোক।”
মুমিনুল শাহ গলা ঝাড়লেন,“মরা মানুষ লইয়া এত কথা কইতে নাই। হেগো বাড়ির কী অবস্থা, নাজির? তোর তো শ্বশুরবাড়ি।”

“শোক বাড়ি যেমন হয়। আমগো বাড়ির থাইক্যা পুরা আলাদা। আপন মাইনষের লাইগা হেগো মায়া আছে, চোখে পানি আছে।”
“আমগো নাই কইতাছোস?” আমিরুল শাহ জিজ্ঞেস করলেন।
“নাই তো, আমার আব্বার মৃত্যুতে কেউ কানছে?”
“কেডায় কানবো? যেই অবস্থা আছিলো! আমার তো হের লাইগা কষ্ট লাগতো। আল্লাহর কাছে কত দোয়া যে করছি! তোর চাচী জানে।”
“নামাজ না পইড়াই? ঠিকমতো অযু করেন তো?”
থতমত খেয়ে গেলেন লোকটা। সিরাজ উল্লাহ বলে উঠলেন,“অনেক জমিজমা হেগো। বুইড়ার লাইগাই এতকাল পরিবার ঠিক আছিলো। এহন দেখবি এইগুলা লইয়া অশান্তি শুরু হইবো। তোর ভাগ কিন্তু ছাড়বি না, নাজির।”
“আমার ভাগ?”
“হ, তোর বউয়ের ওয়ারিশ। বাপের ঘরের একমাত্র মাইয়া সে।”
“তা দিয়া আমনের কী? নজর লাগছে?”
“নজর লাগবো ক্যান?”

“তাইলে একজন মানুষ মরতে না মরতেই সম্পদ লইয়া কথা তুলেন ক্যান? জন্মগত বড়লোক গো কহনো লোভ থাকে না, লোভ থাকে চোরের বংশে পয়দা হওয়া ছোটলোক গো। নিজের কামে মন দেন। দুইদিন পরপর বোইনের বাড়িত আইয়া পইড়া থাকলে লাভ হইবো না। আয়, নওশাদ।”
অধরের হাসি অপমানে মিলিয়ে গেলো সিরাজ উল্লাহর। কঠিন স্বরে বললেন,“কারে কইলি কথাডা? কেডায় ছোটলোক?”
নাজির পিছু ফিরে তাকালো না। উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করল না। নওশাদের উদ্দেশ্যে গলার স্বর নামিয়ে বললো,“তুই হেগো লগে মুখ লাগাবি না। নিজের রাগে কাবু রাখ। বলদ সাইজা থাকবি, যাতে তোরে অকাজের মনে কইরা গুরুত্ব না দেয়।”

সিরাজ উল্লাহ রাগে কাঁপতে লাগলেন। তাঁর বাবা মারা গেছেন বহু বছর আগে গণধোলাই খেয়ে। তারপর শাহ বংশে ফরিদার বিয়ে হলো, সামিউল আর আয়েশার জন্ম হলো। সিরাজ উল্লাহর ভাগ্যও খুলে গেলো। গ্ৰামে এখন সবাই সমিহ করে চলে। অথচ আজ অনেকদিন পর ছোট্ট এক ছেলে নাজির, যাকে তিনি সাড়ে একুশ বছর আগেই টুটি ধরে মেরে ফেলতে পারতেন, নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারতেন এই পৃথিবী থেকে, সে কিনা আকার ইঙ্গিতে তাকে ছোটলোক বলে গেলো! মুমিনুল শাহ সাফাই গেয়ে বললেন,“ওর কথা ধইরেন না তো। ছুডো মানুষ তাই কি কইতে কি কইয়া দেয়! অত প্যাঁচগোছ বোঝে না। আমনের এই কথাডা কওয়া উচিত হয় নাই।”
“ছুডো মানুষ?”
আমিরুল শাহ ছোটো ভাইকে শাসিয়ে বললেন,“এত মায়া কই থাইক্যা আইয়ে? সবসময় দেহি নাজিরের হইয়া সাফাই গাস। খুব ভালা মানুষ বুঝি তুই? যদি জানে, হের বাপ-মায়ের লগে তুই কী করছোস তাইলে ছাইড়া দিবো?”
মুমিনুল শাহ মনে মনে হাসলেন। এত সহজ নাকি তাকে ধরা? ভাই, স্ত্রী সন্তানরাই তো এখনো ধরতে পারলো না। সবার অলক্ষ্যে বিড়বিড় করে বললেন, “এইডাই তো আমার অস্ত্র, ভাইজান।”

মাস্টার বাড়ির আনাচে কানাচে নিস্তব্ধতা বিরাজমান। আগরবাতির ঘ্রাণ এখনো মিলিয়ে যায়নি। পাশের বাড়ি থেকে প্রতিবেশীরা রাতের খাবার দিয়ে গিয়েছে। সেই খাবার কারো মুখে রোচেনি। সুজাতা, সিফাতসহ বাচ্চাদেরকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে পলি আর জেসমিন।
মিছরি, ফাহমিদা বসে আছে দাদীর ঘরে। স্বামী হারিয়ে আজ তাদের ধৈর্যশীল দাদী ফোপাচ্ছে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু। তবুও কান্না আটকে রাখার চেষ্টায় অবিচল। ফাহমিদা চুপচাপ বসে আছে। তার অবস্থাও আহামরি ভালো নয়। সন্তান সম্ভাবা সে। মাস তিনেক চলছে। এর মধ্যেই ধরে গিয়েছে খাওয়ায় অরুচি। তার মধ্যে হঠাৎ দাদাজানের মৃত্যু! দাদাজানই তো এতকাল এই পরিবারের মূল শিকড় ছিলেন। তিনি ছাড়া কী যে হবে! এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ ওই লোকের উপর কৃতজ্ঞ। যখনি তারা বিপথে পরিচালিত হয়েছে তখনি স্রষ্টা ওই লোকটাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অথচ আজ তিনি নেই।
কারো চোখে ঘুম নেই। পুরুষেরা বসে আছে উঠোনে। বড়ো কন্যা তমিজার স্বামী ইকরাম হোসেন মাথা নেড়ে বললেন,“আব্বার লাইগা এতকাল এই সংসারে প্রাণ আছিলো। এহন কী হইবো? সম্পদ তো ভাগ হইবো, সব আলাদা হইয়া যাইবো।”

প্রত্যেকটা পরিবারেই হয়তো এমন কেউ থাকে যাদের কাছে মৃত মানুষের শোকের থেকেও সম্পদের শোক গুরুত্ব পায় বেশি। নজরুল আলম, কাশেম আলী ভারাক্রান্ত মন নিয়ে উত্তর দিতে পারলেন না। সদ্য দুই ভাই এতিম হয়েছেন। মাসুমের এসব কথা ভালো লাগলো না। তাই সে ত্যাছড়া স্বরে বললো,“সম্পদের ভাগ অনেক আগেই হইয়া গেছে। আমনেগোডা তো বিয়ার সময়েই হুনছিলাম দাদাজানে দিয়া দিছিলো। আমগোডাও দিয়া দিছে। আমরা এতকাল যেমনে আছিলাম ভবিষ্যতেও তেমনেই থাকমু। সেই শিক্ষাই দাদাজান দিয়া গেছে। মন ভালা নাই, একটু আগে কবর দিয়া আইলাম। এহনি সংসারে অশান্তি সৃষ্টি কইরেন না।”

যাত্রাপথ পর্ব ৪৪

অসন্তুষ্ট হলেন ইকরাম হোসেন। কিছু বলার পূর্বেই আবেদার স্বামী অলিউল খান বললেন,“ঠিকই তো কইছে। একজন মারা গেছে, আমনেরা তাঁর লাইগা দোয়া করবেন, তা না! সম্পদ লইয়া শুরু হইয়া গেছে। তাগো সম্পদ লইয়া তারা কী করবো, না করবো হেইডা তাগো ব্যাপার। আল্লাহর রহমতে আমগো কী কম আছে? আমগো দায়িত্ব হইলো বিপদ-আপদে আপন মাইনষের পাশে দাঁড়ানো। কী ঠিক কইছি না?”
বাকিরা ভদ্রলোকের কথায় সায় জানালো। কথাবার্তা আর বেশিদূর এগোলো না। বাচ্চা ছাড়া কারো চোখে ঘুমও নামলো না।

যাত্রাপথ পর্ব ৪৬