Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৬১

যাত্রাপথ পর্ব ৬১

যাত্রাপথ পর্ব ৬১
মাশফিত্রা মিমুই

আমিরুল শাহর মাথা কাজ করছে না। বহু বছর ধরে নিজের কুকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। লোক জানিয়ে অপরাধ করা সবার দ্বারা সম্ভব নয়। সমাজ এবং গারদের ভয় যাদের নেই তাদের পক্ষে হয়তো সম্ভব। কিন্তু আমিরুল শাহ? তিনি ভীতু প্রকৃতির মানুষ। লোভী, অহংকারী হলেও সম্মান খোয়ানোর ভয়, ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়ার ভয় এবং পরাজিত হয়ে বাকি জীবন কাটানোর ভয়ে ভীত। তিনি অন্যায় করেন গোপনে যাতে কেউ টের না পায়। অথচ উপরে যে একজন আছেন, যিনি সব দেখেন, জানেন তাই যেন ভুলে বসেছেন।
কুকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে নাজিরের কথামতো ভূমি অফিসে এসে হাজির হলেন আমিরুল শাহ। বড়ো ভাইয়ের নির্দেশ মোতাবেক এতদিন দৌড়ঝাঁপ করে সব কাগজপত্র তৈরি করে রেখেছিল নওশাদ।

চেনা অচেনা অনেক মানুষের সামনেই আমিরুল শাহ কম্পিত হাতে দলিলে টিপসই দিলেন। টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ ছাড়া লেখাপড়া তিনি জানেন না। তাই দলিলে আদৌ কী লেখা আছে তা পড়তে পারলেন না। মুক্তার কী বললো তাও অত খেয়াল করলেন না। শুধু মাথা নাড়ালেন। হস্তান্তরের সাক্ষী হলো আমিরুল শাহর বিশ্বস্ত ম্যানেজার। যে এতকাল ব্যবসায়ের লেনদেন ঘটিত সকল কার্যক্রম তদারকি করে মুমিনুল শাহর পিঠপিছে আসল দস্তাবেজ পাঠিয়ে দিতো।
ওখানকার সব কাজ মিটিয়ে ভেতর থেকে হেলেদুলে বেরিয়ে এলেন আমিরুল শাহ। সূর্যটা যেন একেবারে মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে। কি তেজ! মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো লোকটার। লুটিয়ে পড়ার আগেই নাজির এসে ধরে নিলো। শাসন করার ভঙিতে বললো, “নিজেরে সামলান, চাচা। পইড়া গেলে হাড্ডিগুড্ডি সব তো ভাঙবো। পরে আমার বাপের মতন সারা জীবন বিছানায় কাটাইতে হইবো।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“তোরে আর সহ্য হইতাছে না? ছাড় আমারে।”
“আইজকার ঘটনা আমগো মধ্যেই যাতে থাকে। ভুলেও অন্য কারো কানে গেলে, বিশেষ কইরা ছুডো চাচার কানে গেলে কিন্তু খবর আছে। আমি চুপ কইরা বইয়া থাকমু না।”
আমিরুল শাহ একপলক ভাতিজার দিকে তাকালেন। মায়ের জন্য কান্না করা সেদিনের সেই ছোট্ট ছেলেটা উচ্চতায় আজ তাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। চোখে কোনো ভয় নেই, শিরদাঁড়া সোজা, হাসিমুখে হুমকি দিচ্ছে। এমনকি চাইলেই এই মুহূর্তে তাকে শেষ করে দিতে পারে। কবে কবে যে এমন হলো? আর কিছু ভাবা বা বলার পূর্বেই ছাতা হাতে রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে এলো আব্বাস। হাঁপাতে হাঁপাতে উদ্বিগ্ন স্বরে বললো, “আমনে ঠিক আছেন, সাব? কোন ফাঁকে বাহির হইয়া আইলেন কন তো? গুদামের ভিতরে গিয়া দেহি আমনে নাই, পরে হাসমতের কাছ থাইক্যা সব হুইনা এনে আইলাম।” দম ছেড়ে নাজিরের উদ্দেশ্যে এবার প্রশ্ন ছুঁড়লো,“তুই এই সময়ে এনে ক্যান?”
“আমার চাচার কাছে আমি যহন ইচ্ছা আইমু। তুমি জিগানের কেডা? চাচার বয়স হইছে, তারে দেইখা হুইনা রাইখো। ধরো, এহন বাড়িত লইয়া যাও। আমার একটু কাম আছে। আয় নওশাদ।”
আব্বাস সন্দেহ নিয়ে তাদের যাওয়ার পথে তাকালো। হাতের ইশারায় বেবি অটো থামিয়ে আমিরুল শাহকে নিয়ে উঠে পড়ল তাতে।

নওশাদের বিস্ময় ভাব এখনো কমেনি। কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে বলেই ফেলল,“এতকিছু তুমি একা একা কীভাবে করলে, ভাই? আমিরুল শাহর মতো লোভী একটা লোক এত সহজে জমি হস্তান্তর করে দিলো? আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।”
নাজির সবকিছু বিস্তারিতভাবে জানালো। গতকাল রাতে আচমকাই বুদ্ধিটা তার মাথায় এসে হানা দিয়েছিল। সকাল থেকে অনেক পরিকল্পনা করে ছক সাজিয়ে করে ফেলল উদ্দেশ্য হাসিল। নওশাদের কৌতূহল এবার ভয়ে রূপ নিলো। বললো,“এখন তো আমার আরো ভয় হচ্ছে। আমিরুল শাহ তোমার ভয়ে চুপ থাকবে ভেবেছো? সবাই জেনে গেলে কী হবে? কিছুই করার থাকবে না। এতগুলো মানুষের সামনে আমরা টিকতে পারবো?”
নাজিরের চোখেমুখে ভয় নেই। স্টেশনে টেম্পু দাঁড়িয়ে আছে। মানুষ ভরলেই ছেড়ে দেবে। বাজারের দিকে হাঁটা ধরলো সে,“বউরে আজ পর্যন্ত কোনো উপহার দিছোস? এর লাইগাই তোর বউ টিকে না। আয় কিছু কিন্না লইয়া যাই।”

“তোমার চিন্তা হচ্ছে না?”
“না, আমি ভাবনা চিন্তা ছাড়া কাম করি না। আমার আবেগ কম। তাই আঁটঘাট বাইন্ধাই ময়দানে নামছি। যেই ঝটকা ব্যাডায় খাইছে! কয়দিন দাঁড়াইতে পারবো কিনা তাই সন্দেহ। ততদিনে দলিল রেজিস্ট্রি হোক।”
নওশাদের ভয় তবুও কাটে না। মনে হচ্ছে তার জীবন হেলায় কাটছে। একে তো দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেঁসেছে, নতুন বউকে বুঝতে পারছে না, সময় দিতে পারছে না। এদিকে আবার হুটহাট বড়ো ভাইয়ের ভয়ংকর সব কাজ করা তো আছেই।

দুপুরে আব্বাসের সঙ্গে বাড়ি ফিরলেন আমিরুল শাহ। মস্তিষ্ক এখনো ভয়ে থেমে আছে। কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলেই মগ নিয়ে তিনি চলে গেলেন পুকুর পাড়। তারপর নিচু সিঁড়িতে বসে একনাগাড়ে বেশ কিছুক্ষণ মাথায় ঠান্ডা পানি ঢাললেন। দেহের উত্তাপ, মনের ভয় তবু কমলো না, বরং আরো বাড়লো। ভয়, চিন্তা মানুষের শত্রু। ভুল সময়ে মস্তিষ্কে কড়া নাড়ে। স্বামীর কান্ড কারখানা দেখে ফরিদা চেঁচিয়ে উঠলেন,“বুইড়া বয়সে অসুখ বিসুখ বাঁধাইতে চান নাকি? এত পানি কেউ ঢালে?”

আমিরুল শাহ এবারেও কথা বললেন না। কারো কথা তাঁর শ্রবণালীতে পৌঁছালো না। আরো ঘণ্টা খানেক সেভাবেই ভেজা বসে থাকলেন। তারপর গামছা দিয়ে আপাদমস্তক মুছে ঘরে গিয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন।
এই সংসার ফরিদার আর ভালো লাগে না। কেউ তাঁর কথা শোনে না, গুরুত্ব দেয় না। পুরোনো সেই দাপটে ফিকে পড়ে গিয়েছে যেন। বুড়ো বয়সে স্বামীর ভীমরতি দেখে বিরক্তি, ক্ষোভ আরো বাড়ছে। যদিও ভালোবাসা, জৈবিক চাহিদা অনেক আগেই ধোঁয়ার মতো নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। এখন যা আছে শুধুই প্রয়োজন আর সামাজিকতা।
বেলা থাকতেই মিছরি গোসল সেরে বিছানায় বসে আছে। শালিক যহরের নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে মোনাজাত ধরেছে। নওশাদ শব্দহীন হেঁটে ঘরে প্রবেশ করল। হাতের ব্যাগটা বিছানার উপর রেখে পরনের ঘামে ভেজা শার্ট খুলে আলনায় ঝুলিয়ে চলে গেলো গোসলখানায়। তবুও তার উপস্থিতি শালিক টের পেলো। মোনাজাত শেষে জায়নামাজ গুটিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বন্ধ জানালা খুলে ঘরে পর্যাপ্ত আলো আসার ব্যবস্থা করে দিলো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নওশাদ ফিরে এলো। তাকে দেখে শালিক জিজ্ঞেস করল,“শরীর ঠিক কইরা মাজছেন? নাকি না মাইজ্জাই আইয়া পড়ছেন?”

“রোজ রোজ শরীর কে মাজে? ত্বকে অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার করা অনুচিত।”
“আমনে যে খাচ্চর এইডা কন।”
“শরীরখানা দেখেছো? কোথাও কোনো দাগ নেই। খাচ্চর হলে ধবধবে ফর্সা থাকতো?”
“সারাক্ষণ আজাইরা ঘুরলে দাগ থাকবো কেমনে? আমনে তো বেকার লোক। নিজের বড়ো ভাইডারে দেইখা শিখেন, কেমনে সংসারের লাইগা গাধার মতন খাটে। আবার বউরেও তুলা তুলা কইরা রাখে।”
বাঁকা দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালো নওশাদ। মেয়েটা সরাসরি তাকে অকর্মণ্য, বেকার উপাধি দিয়ে দিলো? গাল ফুলিয়ে বললো,“ভাই আমাকে কাজ করতে দেয় না। নাহলে ঠিকই এতদিনে একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলতাম। তবে বেকারও বেশিদিন আর থাকছি না। কয়েকদিন পরেই দেশের বাইরে চলে যাবো। তখন দেখবে তোমার স্বামী কত কাজের।”

“সময় হইলেই দেখা যাইবো। জ্ঞানী লোকে মুখে ফটর ফটর না কইরা কামে দেখায়।” বলেই শালিক মুখ বাঁকালো। পুনরায় খোঁচা মেরে বললো,“দাড়ি গোঁফ ছাড়া পুরুষ মাইনষেরে ভাল্লাগে না। সব কাইট্টা এমনে পরিষ্কার হইয়া থাকেন ক্যান?”
নওশাদের রাগ হলো। ভ্রু জোড়া খানিক কুঁচকে গেলো। তার মুখের মধ্যে দাড়ি গোঁফের অস্তিত্ব নেই। একটু বাড়লেই গোড়া থেকে কামিয়ে ফেলে। তবে শালিক মেয়েটা তার ভাবনার থেকেও যেন ভীষণ পটু। কথার সমাপ্তি টেনে বললো,“আইয়েন ভাত বাড়ি।”

“পরে খাবো। তার আগে এদিকে এসো, তোমার জন্য কী এনেছি দেখো।”
শালিক আর উঠলো না। ব্যাগটা আগেই দেখেছে, তবু নিজ থেকে ধরেনি। নওশাদ ভেতর থেকে বের করল দুটো শাড়ি। বললো,“বিয়ের পর তেমন কিছুই দিতে পারিনি তোমাকে। আপাতত এই শাড়ি দুটোই না হয় রাখো।”
স্বামীর থেকে পাওয়া প্রথম উপহার! শালিকের মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। দুই হাত দিয়ে ধরে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বললো,“অনেক সুন্দর হইছে। আমারে ভালা মানাইবো”
হাসলে শালিকের থুতনিতে টোল পড়ে। এর আগে নওশাদ খেয়াল করেনি। দোকানে গিয়ে স্ত্রীর জন্য কী কিনবে বুঝতে পারছিল না সে। পূর্বে প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে শখ করে একটি খয়েরী রঙের তাঁতের শাড়ি কিনেছিল সে লিলির জন্য। দোকানে গিয়ে বেশ চোখে পড়েছিল। দোকানিও প্রশংসা করে বলেছিল, “ভাই আমনের চয়েজ ভালা। ভাবি খুব খুশি হইবো।”

দোকানি ভুল বলেছিল। লিলি মোটেও শাড়িটা দেখে খুশি হয়নি। কম দামি শাড়ি নাকি তার দেহে মানাবে না, লোকে হাসবে। লোকে নাকি মা, ভাবিরা হাসবে তা খুব ভালো করেই তখন বুঝতে পেরেছিল নওশাদ। তারপর আর কখনো মেয়েটাকে শাড়ি কিনে দেয়নি। যদিও তাদের পথচলা খুব একটা দীর্ঘ ছিল না। সেই শাড়িটারও বা কী পরিণতি হয়েছিল তাও নওশাদ জানে না। তাই আজও দোকানে গিয়ে কী কিনবে তা বুঝতে পারছিল না। পূর্বে অনুভূতিতে যেই আঘাত পেয়েছিল তাতেই তার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। তবুও ভাই বললো,“মাইয়া মানুষ শাড়ি, চুড়িতে বেশি খুশি হয়। লইয়া যা।”

নওশাদ উদাস কণ্ঠে বললো,“সব মেয়ের পছন্দ এক নয়, ভাই।”
“তাইলে বউয়ের পছন্দ অপছন্দ আগেই জিগাস নাই ক্যান? বউ কেমনে পালতে হয় এইডাই তুই জানোস না, বলদ। চুপচাপ পছন্দ কর। মাইয়া খাঁটি হইলে যা পছন্দ কইরা দিবি তাতেই খুশি হইয়া যাইবো।”
নওশাদ ইতস্ততা নিয়ে চট করে কিনে ফেলল দুখানা শাড়ি। কিন্তু শালিক যে এত আনন্দিত হবে তা ভাবতে পারেনি। সেই আনন্দ দেখে হঠাৎ নওশাদ অনুভব করল, তার সমস্ত মন খারাপ ভালো হয়ে গিয়েছে। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে মুচকি হাসি। তৎক্ষণাৎ তর্জনী আঙুলটা টোলে ছুঁইয়ে বললো,“এটা সুন্দর তো!”
শালিক লজ্জা পেলো। শাড়ি দুটো বালিশের উপর রেখে মাথায় ঘোমটা টেনে দরজার দিকে যেতে যেতে বললো,“ভাত বাড়তাছি, খাইতে আইয়েন। শাড়িডা ওনেই থাউক। খাওয়া শেষে পরমু।”
নওশাদ বিড়বিড় করে বললো,“লজ্জা পেলেও তাকে সুন্দর লাগে।”

নাজির স্ত্রীর জন্য আহামরি তেমন কিছুই আনেনি। এনেছে দুই পদের মিষ্টান্ন আর চানাচুর, বিস্কুট। পেটে সন্তান আসার পর থেকে ভাত খুব কম খায় মেয়েটা। জোর করে একটু বেশিও খাওয়ানো যায় না। বমি করে উগড়ে দেয়। মাঝরাতে ক্ষুধা লাগলেও বলে না। তবে নাজির টের পায়।
মিষ্টি পেয়ে বেজায় খুশি হলো মিছরি। তবে প্রকাশ করল না। স্বামীর উপর থেকে রাগ এখনো পুরোপুরি কমেনি। সাথে চিন্তা তো আছেই। ভাত আর খেলো না সে। মিষ্টি নিয়েই বসে পড়ল। নাজির ধমকালো,“এই ছেরি পেট খারাপ করার পাঁয়তারা করতাছে। ভাত খাইছো তুমি?”

“খেয়েছি।”
“কহন?”
“বারোটায়।”
“এহন কয়ডা বাজে? খাও তো কাওয়ার খাওন। শান্তি দিবা না আমারে? খাইবা আইয়ো।”
“বিরক্ত করবেন না। মিষ্টি খাচ্ছি, দেখছেন না? এটাও একটা খাওয়া। তার আগে বলুন, আবার কোথায় গিয়েছিলেন?”
“তোমার মান ভাঙানের লাইগা এইগুলা আনতে গেছিলাম।”
“বিশ্বাস করলাম না। আপনি যেই ধুরন্ধর লোক!”
“না করো, আমার কী?”
নাজির বাধ্য হয়েই খেতে চলে গেলো। জম্পেশ খিদে পেয়েছে।

আমিরুল শাহর অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। সেই রাতে গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে কীসব বলতে লাগলেন। বহুদিন পর স্বপ্নে বাবা-মাকে দেখলেন, ভাইকে দেখলেন, এমনকি দেখলেন ভাইয়ের স্ত্রীকেও। যার সঙ্গে তিনি কখনো কথা বলেননি। আর পাঁচটা ভাসুরের মতোই এড়িয়ে চলেছেন।
মানুষ যা করে, ভাবে তাই নাকি স্বপ্নে এসে হানা দেয়। লোকটার বয়স কম হয়নি। তিনিও আজ বুড়ো। চুল, দাড়ি পেকেছে। দাদা, নানা হয়েছেন। সামনের দাঁত একটা নড়ে, যেকোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে। টান টান চামড়া কুঁচকে গিয়েছে। পুরোনো জৌলুস, শক্তি দেহে আর অবশিষ্ট নেই। যা আছে শুধু কণ্ঠস্বরে।
ফরিদা স্বামীর শিয়রে বসে অনেকক্ষণ জলপট্টি দিয়ে উঠে গেলেন একসময়। জ্বর কমার বদলে বাড়ছে, লোকটা ছটফট করছে। ছেলেদের ডেকে নিয়ে এলেন তিনি। অসময়ে কাঁচা ঘুম ভাঙায় সামিউল কিছুটা বিরক্ত হলো। ঘরে এসে বাবার বেগতিক অবস্থা দেখে বিরক্তি চিন্তায় রূপ নিলো। বললো,“হঠাৎ এই অবস্থা কেমনে হইলো?”

“জানি না আমি। আড়তে গেছিলো। ফিরাই মাথায় পানি ঢালছে কতক্ষণ। নিষেধ করার পরেও হুনে নাই। আমার কোনো কথাই তো হুনে না। কহন ধইরা যে কী কইতাছে কিচ্ছু বুঝি না।”
পারভেজ বললো,“যেই রোদ আইজ পড়ছে! নিষেধ করছিলাম আমি। উল্টা আমারে ধমক দিয়া পাঠাইয়া দিলো। এর লাইগাই জ্বর আইছে।”
“এহন আর কী করমু কও? সূর্যের আলো ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। সকালে ডাক্তর ডাইকা আনমু না হয়।” সামিউল বললো।

আমিরুল শাহর অবস্থা আরো খারাপ হলো। সকাল হতেই ছেলেরা বাজার থেকে ডাক্তার এনে চিকিৎসা করালো, ওষুধ খাওয়ালো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। নাজির ভাবলো, এবারই বোধহয় এই লোকের কাহিনীর সমাপ্তি ঘটবে। মৃত্যুর দিন গুনতে লাগলো সে। এমনকি এই প্রথম নামাজে বসে কারো মৃত্যু কামনা করে।
নাজিরের সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না। সপ্তাহ খানেক পর আমিরুল শাহ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। জ্বর পুরোপুরি না ছাড়লেও কিছুটা কমেছে বটে। সাথে বাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে বাহ্যিক বয়স। মোটাতাজা দেহ শুকিয়ে গিয়েছে, চোখের নিচে পড়েছে বিশাল এক কৃষ্ণ গহ্বর।

খানিক সুস্থ হতে না হতেই সেদিন ছেলেদের ডেকে ব্যবসার সমস্ত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন তিনি। বিকালের দিকে ডাকলেন ছোটো ভাইকে। অনেক সময় ধরে তাদের মধ্যে আলোচনা চললো। নাজির বাড়িতেই ছিল। এবার কিছুটা হলেও তার মনে ভয়ের সঞ্চার ঘটলো। যদি লোকটা সবাইকে সব জানিয়ে দেয়? যদি বলে দেয়, নাজির সব জেনে গিয়েছে? তবে তো সত্যি সত্যি নওশাদের কথা অনুযায়ী এতগুলো মানুষের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে নাজির শাহর পরাজয় নিশ্চিত। অস্থির হয়ে উঠলো সে। কী করবে, না করবে ভেবে পেলো না। তাড়াহুড়ো করে যা তা করে বসলে নিজেকেই যে ফাঁসতে হবে।

দুদিন এভাবে ছটফট করতে করতে নাজিরের মাথায় হঠাৎ নতুন কোনো বুদ্ধির উৎপত্তি ঘটলো।
দুপুর এগারোটা। বিথী, শিউলি, শালিক নিচু জমিতে কড়ই গাছের শুকনো পাতা ঝাড়ু দিচ্ছে। ফরিদা, মর্জিনা সেখানেই কচু শাক বাছতে বাছতে প্রতিবেশী দুই নারীর সঙ্গে গল্প করছেন। মিছরি একটি কাটা গাছের কান্ডয় বসে চুপচাপ তাদের কাজকর্ম দেখছে। মেয়েটা আগে বাড়ি থেকে বের হতো না, কারো সঙ্গে তেমন মিশতো না। শালিক আসার পর থেকে সব বদলে গিয়েছে, সে-ই জোর করে নিয়ে তাকে বসিয়ে রেখেছে সেখানে। বাড়ির ভেতরের তুলনায় বাতাস সেখানে একটু বেশি। প্রাণ জুড়িয়ে যায় যেন।

সকালের খাবার খেয়ে মিলে গিয়েছিল নাজির। ঘণ্টা তিনেক পর বাড়ি ফিরলো। সতর্ক দৃষ্টিতে চারিদিক দেখে কান পেতে শুনলো দক্ষিণ থেকে ভেসে আসা নারীদের কণ্ঠস্বর। নাজির জানে, বাড়িতে পুরুষ বলতে আমিরুল শাহ ব্যতীত এখন আর কেউ উপস্থিত নেই। কিছুক্ষণ আগে ছোটো চাচাকে ধান ক্ষেতের দিকে যেতে দেখেছে। তাই খুব সাবধানে কাচারি ঘরে প্রবেশ করল সে। ক্যাটক্যাট শব্দে ফ্যান ঘুরছে, টেবিলে এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাগজপত্র।
লেখাপড়া বেশিদূর না করলেও গন্ডমূর্খ সে নয়। খুব ভালো করেই দলিল দস্তাবেজ, হিসাব নিকাশ পড়তে পারে। কাগজপত্রগুলো পড়ে বুঝতে পারলো, ছোটো চাচার অগোচরে ব্যবসা থেকে অনেক টাকাই ধুরন্ধর লোকটা সরিয়ে রেখেছে। সাথে কিনেছে নতুন বেশ কয়েক বিঘা জমি। আধখোলা ড্রয়ারে এখনো দেখা যাচ্ছে কিছু চকচকে টাকার বান্ডিল। নাজিরের রাগ আকাশ ছুঁলো। তাকে পথে বসানোর চক্রান্ত করে নিজে সম্পদের পাহাড় গড়ছে অসৎ লোকটা! অথচ এর ভাগও তার বাবার পাওয়ার কথা ছিল, পাওয়ার কথা ছিল তাদেরও।

কারো পায়ের শব্দে জায়গার জিনিস জায়গায় রেখে দিলো নাজির। আমিরুল শাহ লেট্রিনে গিয়েছিলেন। ফিরে আসতেই বেশ অবাক হলেন। বর্তমানে সোজা হয়ে না দাঁড়াতে পারায় লাঠিতে ভর করে চলেন। দ্রুত এসে কাগজপত্র সরাতে সরাতে বললেন,“তুই এনে ক্যান? আবার কী চাস?”
“আমনের লগে শেষ দেখা করতে আইলাম।”
“শেষ দেখা মানে?” ললাটে ভাঁজ পড়ল।
“মানে কিছু কথা কইতে আইলাম। গুরুত্বপূর্ণ কথা।”

“কীয়ের গুরুত্বপূর্ণ কথা? তোর লগে আমার আর কোনো কথা নাই, কিছু লুকানোর নাই। আমগো সব কথা শেষ।”
উত্তেজিত হয়ে উঠলেন আমিরুল শাহ। দেহ কাঁপছে। নাজির এগিয়ে কেদারা টেনে বসতে দিলো তাকে। জগ থেকে গ্লাসে পানি ভরে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“গলা ভিজান, চাচা। শান্ত হন। এই বয়সে বেশি উত্তেজিত হইলে স্ট্রোক কইরা দাদার কাছে যাইবেন গা।”

আমিরুল শাহ পানি খেয়ে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করেও পারলেন না। নাজির যে তাকে শান্তি দিতে নয় বরং অশান্তি দিতে এসেছে। আজ কোনো কিছু না লুকিয়ে বললো,“আমনেরে আরো কিছু কথা জানানোর বাকি আছিলো। ভাবলাম বয়স্ক মানুষ! কবে না কবে মইরা যান আবার? তার উপরে নাজির তো নিজের প্রতিভা লুকাইতে পারে না।”
আমিরুল শাহ অধৈর্য হয়ে উঠলেন। আরো কী বলার বাকি আছে? যা বলেছে তাতেই তো লোকটার অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে। নাজির আর রাখঢাক না রেখেই বললো,“আমনে জানেন সোহেলরে আমি মারছি। কিন্তু লাশ কেমনে গুম করছি এইডা জানেন? কেমনে আমনেগো নাকের ডগা দিয়া আকামগুলা করছি তা জানেন? এইসব বাদ দেই। কেডায় সাহায্য করছে হেইডা জানেন?

“কেডায় করছে? নওশাদে? নাকি মিল্টন?”
“আরে না, ওই বলদ দুইডার হেডাম আছে? যা করার আমার শ্বশুরে করছে।”
চমকে তাকালেন আমিরুল শাহ। কাশেম সাহায্য করেছে! ওরাও তবে সব জানে? যা তিনি কখনো কল্পনা পর্যন্ত করেননি। কম্পিত কণ্ঠে বললেন, “সিরাজ কই? তুই হেইদিন সিরাজের কথা কইছিলি। ওয় জানে ওর পোলার লগে তুই কী করছোস? সিরাজে কী সব স্বীকার কইরা দিছে?”
লোকটা ভারি বোকা। কে যে কখন তাকে কেমন করে ব্যবহার করে কিচ্ছু বোঝে না। এই যে এখন বুঝছে না আপন ভাতিজা নাজিরকে। আজ আর কিছু গোপন রাখলো না নাজির। মানুষের শেষ সময়ে গোপনীয়তা রেখে কী করবে? বললো,“সবই জানে। হেরেই সবার আগে জানাইছি। একদিন রাইতের আঁধারে শিকারির মতন খপাস কইরা তারে ধরলাম। আগের মতন আর পাখির ডানায় জোর নাই। অথচ আমার মায়রে ওই… ধুর, মুখে আনতেও ঘৃণা করে।”
অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আমিরুল শাহ ভাতিজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। নাজির কোথায় সিরাজকে লুকিয়ে রেখেছে? তারা কেউ খুঁজে পায়নি কেন? ভয়ার্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,“কী করছোস ওর লগে? কথা ক।”

“আমি আর নওশাদে মিল্যা মাইরা দিছি। কেমনে মারছি হুনবেন? কতগুলা টুকরা করছি জানেন? দাঁড়ান গুনি। শালবনে মাংসডি ফালাইছিলাম। শকুন, শেয়ালে খাইয়া লাইছে মনে হয়। কেউ ধরতে পারে নাই, টেরও পায় নাই।”
বর্ণনা শুনে আমিরুল শাহ আর বসে থাকতে পারলেন না। গা গুলিয়ে উঠলো, ঘাম ছুটে গিয়েছে, চোখে সব ঝাপসা দেখছেন, হাত-পা হয়ে আসছে অবশ। বসা থেকে উঠতে গিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। নাজির তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। চোখে কী যেন চকচক করছে। বহু বছর আগে নিজের চোখে এমন ঝলক দেখেছিলেন আমিরুল শাহ। আজ সময় ভিন্ন, মানুষ ভিন্ন, বলির পাঠা স্বয়ং তিনি। নাজির হতাশ কণ্ঠে বললো,“প্রতিপক্ষরে কহনো দুর্বল মনে করতে হয় না, বড়ো চাচা। এমনকি এক পদ্ধতিতে বারবার খেলতেও হয় না। কত সাবধান করলাম আমনেরে! প্রথম যেইদিন নাকের ডগা দিয়া গরু চুরি করছিলাম হেইদিনই বুঝা উচিত আছিলো। সরাসরি যহন হুমকি দিছিলাম, নদীর ধারে যহন সোহেলের ভয়াবহ লাশ পাওয়া গেছিলো তহনি বুঝা উচিত আছিলো। কিন্তু আমনে বোকা মানুষ বুঝলেন না। বুঝলে হয়তো ক্ষেতে আগুন না দিয়া নাজিরের ঘরে দিতেন।”

নাজির উঠে দাঁড়ালো। তাঁর চোখের সামনেই ড্রয়ার থেকে দুই বান্ডিল টাকা নিয়ে লুঙ্গির ভাঁজে গুঁজতে গুঁজতে বললো,“জমি নিছি আমগো বাপের ভাগের পাওনাডা। আর এই ট্যাহাগুলা ফসল পোড়ানের ক্ষতিপূরণ। সামাদ মিয়ার থাইক্যা বন্ধকী জমিডা ছুডাইতে হইবো। কিছু বাঁচলে তা দিয়া চাইল কিনমু না হয়।”
আমিরুল শাহ পেছন থেকে বেশ কয়েকবার তার নাম ধরে ডাকলেন বোধহয়। নাজির সেই ডাকে সাড়া দিলো না, পিছু ফেরার প্রয়োজনবোধ করল না। হাওয়ার মতো যেভাবে ছুটে এসেছিল ঠিক সেভাবেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো।

যাত্রাপথ পর্ব ৬০

আমিরুল শাহ ছটফট করতে করতে লাঠিতে ভর করে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বুকে খুব ব্যথা করছে, গলা দিয়ে আর আওয়াজ বের হতে চাইছে না। নিজের দেহটাই আজ নিজের কাছে ভারী লাগছে। বেশিক্ষণ সেই ভার তিনি বহন করতে পারলেন না। কয়েক কদম এগোতেই দেহের সমস্ত ভারসাম্য হারিয়ে দাঁড়ানো অবস্থা থেকেই মাটিতে ধপ করে পড়ে গেলেন।
কিছু মুহূর্তের ব্যবধানে ব্যথায় ছটফট করতে করতে দুনিয়া লোভী, খুনি আমিরুল শাহ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে গেলেন।

যাত্রাপথ পর্ব ৬২