Home এক প্রণয় রাত্রি এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৫

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৫

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৫
আসিফা খান

লাজুকতায় ভরপুর মুখশ্রী নিয়ে সিড়ি বেয়ে ধীর গতিতে নেমে আসছে ইয়ানা।। শরীর জুড়ে এখনও বয়ে চলেছে শীতল স্রোত,,,মনে পড়ছে এই বেসামাল ছোঁয়া। রিফাত এর বলা প্রত্যেকটা কথা যেনো ইয়ানার কান কে ঝালাফালা করে দিয়েছে,,,তার কর্ণ গ্রন্থি থেকে গরম ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। পারছেনা মাটির ভিতরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে।। সেই মানুষটার কাছে কিভাবে যাবে ইয়ানা, সে যে লজ্জায় মিশে যাবে। ইস,, এতো সুখও ইয়ানার ভাগ্যে ছিল? নাকি এটা তার স্বপ্ন যাহ চোখ মেললেই ধোঁয়া হয়ে যাবে?,,, ইয়ানা ঘাবরিয়ে গেল,,,অজানায় নিজের হাতের দুই আঙ্গুল দ্বারা স্পর্শ করল নিজের ঠোঁট যাহ কিছু প্রহর আগে রিফাত এর দখলে ছিল।। শুভ্র গাল লালিমায় ছেয়ে গেল,,,মুখ চেপে হেসে ফেললো।

ইয়ানার ভাবনা চিন্তার মুহূর্ত বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।। কেও তাকে হাক দিয়ে ডাকলো,,, ইয়ানা সামনে তাকাতেই দেখল ইব্রাহিম সাহেব এর একমাত্র বোন ইসরাত বেগম সোফায় বসে আছে। ইয়ানা ঠোটে হাসি ফুটিয়ে এগিয়ে গেলো তাঁর দিকে।,,সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করলো। ইসরাত বেগম ইয়ানা কে টেনে নিজের পাশে বসিয়ে দিয়ে পান চিবাতে চিবাতে বললো,,,”কি?,,,স্বামীকে নিয়ে ঘরেই ব্যাস্ত,,,এখানে যে দাদী এসে কখন থেকে বসে আছে তার ঠিক নেই।”
ইয়ানা ইসরাত বেগম এর কথায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে,,,চারিদিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল,,,”তুমি যাহ ভাবছি সেরকম কিছুনা না দাদী,,,আসলে,,,,”
“থাক থাক আর আসলে নকলে বলতে হবে না,,,বুঝি আমি।। চার বছর পর বরকে কাছে পেয়ে কে বা হাত ছাড়া করতে চায়”
ইয়ানার কান গরম হয়ে আসছে। ছিঃ ছিঃ। দাদির এরকম লজ্জাহীন কথায় ইয়ানার অবস্থা কাহিল।।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ইয়ানাআআআআআ”
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আফিয়া। ইয়ানা দৌড়ে গিয়ে আফিয়া কে জড়িয়ে ধরে সাথে আফিয়া ও।। সম্পর্ক কি শুধুই রক্তের হয়,, না সম্পর্ক হয় ভালোবাসার ,, অনুভূতির।। আফিয়া ইয়ানার থুতনি ধরে বললো,,,
“কেমন আছেন মিসেস ইয়ানা রিফাত হোসেন?”
“ধুর আপি তুমিও না,,,ভিতরে আসো,,,সামিয়া কই?”
“আমি তো এথানেই থালামনি।”

সামিয়ার মিষ্টি আওয়াজের পিছন ফিরে তাকালো ইয়ানা।। মুহূর্তেই কোলে তুলে নিলো সামিয়া কে,,, মেতে উঠলো খুনসুটিতে। আফিয়া এগিয়ে ইসরাত বেগম এর সালাম করলো,,,সবার সাথেই কুশল বিনিময় করে সোফায় বসলো। আলেয়া ও নাচতে নাচতে এগিয়ে আফিয়ার সাথে গা ঘেসে বসে গল্প জুড়িয়ে দিলো।। ইয়াসমিন বেগম আর আসফিয়া মিলে হালকা পাতলা নাস্তার আয়োজনে লেগে গেল। ইব্রাহিম সাহেব রুমে বসে তাসবিহ পড়ছে আর আফতাব নিয়ে একটু বেরিয়েছে কোনো কাজের জন্য।। ড্রইং রুম জুড়ে কোলাহল। গল্পের সমাহার।। ইব্রাহিম সাহেব এর অনুনয়ে ইসরাত বেগম এসেছেন,,,তার বড়ো ছেলে তাকে ছেড়ে গেছেন মামা বাড়িতে। অনেক দিন বোনকে দেখে না ইব্রাহিম সাহেব,,,এই বুড়ো বয়সে ভাই বোন মিলে কিছুটা সময় কাটালে দোষ কিসের? চা খাবে আর গল্প করবে।। তাদের গল্প জুড়ে থাকে তাদের কয়েক যুগ আগে আল্লাহর প্রিয় হয়ে যাওয়া মা আব্বার কথা, তো আবার ছোটো বলার কিছু মধুর স্মৃতিচারণ, ব্যাস এটুকুই তো।

শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে মেনে আসছে রিফাত। একসাথে অনেকগুলো মেয়েলি আওয়াজ ভেসে আসছে। এক মনে ড্রইং রুমের দিকে তাকালো। ঠোটের কোনে হাসি ফুটিয়ে আপন মানুষদের দিকেই এগিয়ে গেলো রিফাত।। ইসরাত বেগম কে সালাম দিল। সালাম গ্রহণ করে রিফাত কে পাশে বসতে বললো।। রিফাত ও বাধ্য ছেলেদের মত তাঁর পাশে বসে। মাথা নাড়িয়ে সুষ্ঠু ভঙ্গিতে ইসরাত বেগম এর কথার উত্তর দিচ্ছে রিফাত।।
কথার এক ফাঁকে ইসরাত বেগম এর চোখ যায় আফিয়ার দিকে,,, কিছুক্ষণ সূক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সন্ধিহান চিত্তে জিজ্ঞাসা করল,,,,,

“এ্যাই আপিয়া তুই কি পোয়াতি?”
ইসরাত বেগমের এহেন কথায় আফিয়া হকচকিয়ে গেল। কিছুটা লজ্জাও বোধ করল,,,এই ভাবে কেও জিজ্ঞাসা করে! আফিয়া জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে কোনো রকম বললো,,,”জ জ্বী দাদী।”
ইসরাত বেগম এবার তেতে উঠল আলেয়ার ওপর,,,যে কিনা এতক্ষণ আফিয়ার গায়ের সাথে হেলান দিয়ে তার কাঁধে মাথা রেখে গল্প করছিলো,,
“এই আলেয়া,,,,সর ওর গায়ের উপর থেকে। মেয়েটা পোয়াতি তার উপর ঢলে পড়ে গল্প করতে হবে কেনো হ্যাঁ? দূরে সর,,,,”
ইসরাত বেগমের ঝাড়ি শুনে আলেয়া মুখ গোমরা করে সোফায় ঠিক ভাবে বসলো।। কি সুন্দর গল্প করছিল সে,,,তার গল্পের মুড এর তেরোটা বাজিয়ে দিলো ইসরাত বেগম।। আফিয়া আলেয়ার গোমরা মুখ দেখে দাদির উদ্দেশ্যে মিন মিন করে বললো,,,
“থাক না দাদি আমার তো অসুবিধা হচ্ছিল না!”
হয়তো আফিয়ার কথা ইসরাত বেগমের কান অব্দি পৌছালো না।। হাতে চায় ট্রে নিয়ে হাজির হলো ইয়াসমিন বেগম ।। এক এক করে সবার হাতে চা তুলে দিয়ে নিজেও ইসরাত বেগমের পাশে বসলেন।। চায় চুমুক দিয়ে ইসরাত বেগম, ইয়াসমিন কে বললেন,,,

“এবার তোমার মেয়েটাকে বল একটা বাচ্চাকাচ্চা নিতে।। বিয়ে তো হয়েছে কয়েক বছর,,, এখনো আমার দাদাটা নাতির ঘরের ছেলে মেয়েদের মুখ দেখতে পারলো না! তোমারও তো ইচ্ছা হয় নাকি ইয়ানার ঘরের বাচ্চা কাচ্চার মুখ দেখতে? নানী ডাক শুনতে। ,,, এই আপিয়া কেই দেখো বিয়ের সাথে সাথেই একটা বাচ্চা নিয়েছে তার বয়েস এখন পাঁচ বছর আর এখন আবারও পোয়াতি।।,,, এখনই তো সঠিক সময় রিফাত আর ইয়ানার বাপ-মা হবার।। বুঝিনে বাপু আজকালের ছেলে মেয়েদের কি হয়! বাচ্চা কাচ্চাই নিতে চাই না!”

ইসরাত বেগমের কথায় পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল নিস্তব্ধতা।। ইয়াসমিন বেগম শুধুই শুনে গেলেন পরিপেক্ষিতে একটা কথা উচ্চারণ করলেন না।মেয়ে জামাইয়ের সামনে এরকম কথার উত্তরে সে কিই বা বলবে? এদিকে আফিয়া মুখ টিপে হাসছে। রিফাত তার নিচের ঠোঁট কামড়িয়ে চুপ চাপ বসে আছে তো আবার চায়ের কাপে চুমুক বসাচ্ছে চিরো গম্ভীর চেহারায়,,,ভাব এমন যেনো সে ইসরাত বেগম এর কথা শুনতেই পাইনি।। এদিকে ইয়ানা নিরব,,, বুকের ভেতর কেমন ছলাত ছলাৎ শব্দ হচ্ছে। পেট কি রকম মোচড় দিয়ে উঠছে। এই লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলিয়ে রাখা বড়ই কঠিন হয়ে পড়ছে ইয়ানার জন্য।। শিরা উপশিরা বেয়ে শীতল স্রোত খলবলিয়ে উঠছে ।। কেন সবাই আজকে তাকে লজ্জা দিচ্ছে? কেন সবাই বুঝছে না ইয়ানা লজ্জায় ভেতর থেকে নেতিয়ে পড়ছে, গুম হয়ে যাচ্ছে সে অজানা অচেনা অনুভূতির রাজ্যে!
ইয়ানা না চাইতেও চোখ তুলে তাকায় রিফাতের দিকে আর সঙ্গে সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায় দুজনের। ইয়ানা দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। শুকনো ঢোক গিলে নিজেকে এই দুর্বিসহ পরিস্থিতি থেকে কোনরকম বাঁচানোর চেষ্টা করে।। রিফাত চা শেষ করে উঠে দাড়ালো,,,গলা কেশে গম্ভীর স্বরে বলল,,,

“আমি আসছি,,, ফিরতে লেট হবে।”
রিফাত এক পলক ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেল। ইয়ারা শান্তির নিঃশ্বাস ফেললো এতক্ষণে।। জমিয়ে রাখা রুদ্ধশ্বাস গুলো পেটের মধ্যে কাবাডি খেলছিল যেনো।। তারপর আবারও সবাই মশগুল হয়ে পড়ল গল্পের আসরে।। রাতের খাবার টাও সবাই এক সাথেই খেলো।।

বেশ রাত করে বাড়িতে ফিরলো রিফাত হঠাৎ নার্সিংহোম থেকে এমার্জেন্সি ফোন কর আশায় তাকে যেতে হয়েছিল। রোগীর অবস্থা অনেক ক্রিটিকাল থাকার তার বাড়ির লোক রিফাত কে দিয়েই তার চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন।। ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারার সাথে রুমে প্রবেশ করলো রিফাত।। আলো নিভিয়ে রাখা কিন্তু জ্বলছে মৃদু আঁচের রাতের বাতি।। রিফাত সুইচ অন করে লাইট জ্বালাতেই তার চোখ পরল বিছানার উপর । যেখানে এলোমেলো অবস্থায় ঘুমিয়ে আছে ইয়ানা,,হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ঘূমে বিভোর সে।। প্লাজো উঠে গিয়ে প্রায় হাঁটু ছুই ছুই অবস্থা ,,,কুর্তির ফালি সরে গিয়ে পেটের কিছুটা অংশ রিফাতের চোখে পড়তেই চোখ সরিয়ে নেয় সে। ঠোট চোকো করে প্রশ্বাস ছাড়লো।। হাত বাড়িয়ে কোনরকম ইয়ানার কাপড় ঠিক করে চলে গেল ওয়াশরুমে।। ফ্রেশ হওয়াটা এখন বেশি দরকার তার কাছে।।

রিফাত দেরি করে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েই ইয়ান আঁগেভাগে রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়ে। ইয়ানা কোনভাবেই চাইনি সে স্বজ্ঞানে রিফাতের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে,,,তাই এই কারসাজি।। রিফাত ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে কাপড় পাল্টে, বাতি নিভিয়ে বিছানার উপর এসে শুয়ে পড়ে।
কিছু প্রহর অতিবাহিত হওয়ার পরেই রিফাতের ঠোটে আপনা আপনি বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে।। সে হয়তো জানতো এরকমই কিছু একটা হবে। ইয়ানা ঘুমের ঘোরে নিজের থেকেই রিফাতকে জড়িয়ে ধরে। বুকে মাথা রেখে গুঁটি শুটি মেরে বিড়াল ছানার মতো শুয়ে থাকে একান্ত তোর জায়গায়। রিফাত ও হাত বাড়িয়ে ইয়ানা কে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।। মেয়েটার ঘন নিঃশ্বাস রিফাতের বুকে আচড়ে পড়ছে,,,যাহ মুহূর্তেই তোলপাড় শুরু করেছে রিফাত এর হৃদ মাঝারে।। মনে হলো ইয়ানা যেনো কিছু একটা বির বির করে বলছে,,,রিফাত ভ্রু কুঁচকে কান পেতে শুনতেই কানে আসলো শুধু এই টুকু শব্দ,,,
“আমার আপনিকে আমি কাওকে দেবো না।”

সকালের হালকা আলোয় ইয়ানার ঘুম ভেংগে যায়। চোখ মেলে তাকাতেই নিজেকে আবিষ্কার করে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির বহু ডোরে। এক রাশ লাজুকতা এসে ভর করে ইয়ানার ছোট্ট নরম শরীরে যাহ এখন রিফাত এর দখলে। ঘড়িতে সাড়ে সাতটা,,, ইয়ানা নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গেলেই রিফাত এর চোখ খুলে যায়,,,তন্দ্রায় ঘোর এখনও কাটেনি রিফাত এর। চোখ মুখ কুচকে ঘুমে বুদ কন্ঠে সুধালো,,
“নড়ছো কেনো?”
ইস,,এই মানুষটার ঘুমে আচ্ছন্ন কণ্ঠ ও কি হৃদয় নাড়ানো! নিদ্রায় নিমজ্জিত চেহারা,ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সব মিলিয়ে ইয়ানার কাছে রিফাত কে ভীষণ আদুরে লাগছে,,,মনে হচ্ছে হাত বাড়িয়ে একটু আদর করে দিতে। ইয়ানা নিজের ভয়ংকর ভাবনা কে দূরে সরিয়ে আমতা আমতা করে বলল,,,,

“উঠবো,,,”
“পরে।”
কথাটি বলেই রিফাত ইয়ানা কে বালিশে শুইয়ে নিজে উপুড় হয়ে ইয়ানার ছোট্ট দেহের ওপর শুয়ে পড়লো আর মুখ গুজে দিল ইয়ানার কাধে।। ইয়ানা কেপে উঠল খানিকটা। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল প্রচন্ড।। রিফাত এর দাড়ি,উষ্ণ নিঃশ্বাস সব ইয়ানার ঘাড়,কাধ দখল করেছে।। ইয়ানা এবার চোখ বুজে কোনো রকম বললো,,
“আপনি ভারী অনেক,,,আমি উঠবো।”
“আমি ভারী না তুমি একটু বেশিই রোগা। আমি ছাড়বো তারপর উঠবে।”
“কিন্তু!”
“বরের কথা অমান্য করা পাপ,,, জানো না?”

রিফাত ওই ভাবেই থেকে কথা গুলি বললো। ইয়ানা এবার দমে গেল কিছুটা। সে পাপী হতে চায় না। তাই চুপ চাপ শুয়ে রইলো ওই ভাবেই।। ছোট্ট দেহ খানির উপর রিফাত এরকম স্পর্শে ইয়ানার ব্যাক্তিত্ব চঞ্চল হয়ে উঠলো।। ইয়ানা ভারী শ্বাস ছাড়লো ,,,রিফাত এর দাড়ি ফুটছে তার নরম কাধে যাহ তাকে আরো বেশি অস্থির করে তুলছে।। ইয়ানা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,,,
“আপনার দাড়ি অনেক বাজে,,,আমায় জ্বালাচ্ছে।”
রিফাত এবার মাথা তুললো,,, ইয়ানার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,,,”আর দাড়ির মালিক,,,সে?”
রিফাত এর এহেন কথায় ইয়ানা বোকা বনে গেল।। কিছুক্ষন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল,,,কিছু মুহূর্ত পর রিফাত এর কথার সারমর্ম বুঝতে পেরে চোখ নুয়ালো,,,ঠোঁট কাপীয়ে বললো,,,
“এত দিন ভাবতাম সে শান্ত শিষ্ট,ভদ্র,প্রখর ব্যাক্তিত্বের অধিকারী,,,কিন্তু এখন,,,”
“শেষ করো,,,কিন্তু এখন,,,,কি?”

ইয়ানা কে আলগোছে টেনে নিল আরো কাছে।। কিঞ্চিৎ বুকটা কেঁপে উঠলো ইয়ানার।। রিফাত এর গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার সাহস তার নেই। চোখ বন্ধ করে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল। তত্পর রিফাত এর থেকে নিজেকে গুটিয়ে আনতে চেষ্টা করে বললো,,,
“কিন্তু এখন বুঝেছি,,,সে শুধু শান্ত নয় বেপরোয়া ও, ভদ্র নয় অশালীন ও, প্রখর ব্যাক্তিত্বের অধিকারী নয় বরং হৃদয় কাপানো ছন্নছাড়া মানুষ আপনি।”
রিফাতের থেকে ইয়ানার নিজেকে গুটিয়ে আনার চেষ্টা রিফাত মুহূর্তেই গুছিয়ে ফেলল সান্নিধ্য বাড়িয়ে,,, মনোহর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মেয়েটার পানে। ইয়ানা কে এর একটু লজ্জায় ফেলতে,,,বললো,,,
“এই অপবাদ গুলো কি কালকের চুমুর পরিপেক্ষিতে বলছো,,,ইয়ানা?”

ইয়ানার এবার লজ্জায় যাচ্ছেতাই অবস্থা। চুপসে গেল একদম। কিছুই মাথায় আসছে না তার। রিফাত যে কতটা ঠোঁট কাটা মানুষ তাহ ইয়ানা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। গম্ভীর রিফাত এর একদম উল্টো পিঠ দেখছে ইয়ানা। রিফাত এবার আলগোছে ছুয়ে ইয়ানার চুল কানের পিছে গুজে দিল। ইয়ানা চঞ্চল হৃদয় কুকড়ে উঠলো।। দেহময় শিঃশিড়ানি ছুটে গেলো।। রিফাত বুঝলো ইয়ানার মনুভূতি,,,মেয়েটার এরকম লাজুক মুখ দেখতে বেশ ভালই লাগছে রিফাত এর।। মেয়েটার মধ্যে এক আলাদায় প্রশান্তি অনুভব করে রিফাত। যেমন কাল রাতে আগবাড়িয়ে ইয়ানা তাকে আকড়ে ধরার মাধ্যমে রিফাত যেনো তার সব ক্লান্ত নিমিষেই ভুলে গেছিলো।। কি আছে মেয়েটার মধ্যে,,, যাহ রিফাত কে বার বার কাবু করে ফেলে।।
ইয়ানা এবার মিন মিন করে বললো,,,”আমি যাবো।”

“যাও।”
বলেই রিফাত উল্টো ঘুরে আবার শুয়ে পড়লো। ইয়ানা হা করে তাকিয়ে রইল কিছু সময় তারপর ধির গতিতে নেমে দাড়ালো। চুল হাত খোঁপা করে বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে রিফাত ইয়ানাকে ডেকে উঠলো,,,ইয়ানা পিছন ফিরে তাকালো,,,জিজ্ঞাসা করলো,,,”কিছু বলবেন?”
“ইসরাত দাদিমা এখন থাকবে,,,তাই তার কোনো কথা নিয়ে নিজের ছোট্ট মাথা ঘামাবে না। যা বলবে শুনবে কিন্তু তাহ বাস্তবে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করবে না। সমস্ত কিছুর একটা সঠিক সময় আছে,,,সেই সময়ের অপেক্ষা করবে। কি বলছি বুঝেছ?”

ইয়ানা হাবলার মত মাথা নাড়ালো। মানে বুঝেছে। রিফাত আবারও শুয়ে পড়লো,,,দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে নার্সিংহোম যাবে সে তাই এখন একটু রেস্ট করবে।। ইয়ানা বাথরুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছে আর রিফাতের প্রত্যেকটা কথা মনে মনে আবার রিপিট করছে।। একটা সময় তার চোখ আপনা আপনি বড় হয়ে যায়,,, রিফাতের কথার সারংশ এখন তার মস্তিষ্কে ঢুকেছে ,বুঝতে পেরেছে রিফাত কি বলতে চেয়েছে। ইয়ানা মুখ ঢেকে ফেলে। উফ এই ভয়ংকর অনুভূতি ইয়ানা কোথায় লুকাবে?

নাস্তার টেবিলে সবাই বসলেও পাওয়া গেলো না রিফাত কে।। যাহ দেখে ইব্রাহিম সাহেব ইয়ানা কে জিজ্ঞাসা করলেন,,,
“ইনু রিফাত কে ডেকে আনো! নাস্তা করবে।”
ইব্রাহিম সাহেব এর এর প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে ইয়ানা বলে,,,”উনি এখন খাবে না দাদু,,,।”
ইয়ানার কথা শুনে আর কেও কিছু বললেন না।। নাস্তা করার শেষে যে যার কাজে চলে গেল। ইয়ানা টেবিল পরিষ্কার করে ইয়াসমিন বেগম এর হাতে কিছু সাহায্য করছে। আসফিয়া এক কাপ চা ইয়ানার হাতে দিয়ে বলল,,,
“ইনু,,,তোর ইসরাত দাদী কে চা ত দিয়ে আয় তো।”
ইয়ানা সম্মতি পোষণ মাথা নাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে গেলো তার জন্য বর্ধিত রুমের দিকে।
দরজার কাছে এসে ইয়ানা বললো,,,”দাদী আসবো!”
“হ্যাঁ হ্যাঁ আয়,,,,”

ইয়ানা চায়ের কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো,,,”তোমার চা।”
ইসরাত বেগম চায়ের কাপ হাতে নেয়।। ইয়ানা চলে যেতে নিলে ইসরাত বেগম তাকে আটকিয়ে দিলো। ইশারায় নিজের পাশে দাঁড়াতে বললে ইয়ানা বিনা বাক্যে তাই করে। এবার ইসরাত বেগম ইয়ানার মাথার ওপর গুছিয়ে রাখা ওড়না সরিয়ে দিতেই তার চোখ মুখ এর অদল পরিবর্তিত হলো। ভারী কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলো,,,
“তোর চুল ভিজে নেই কেনো? সকালে গোসল করিসনি?”
ইয়ানা বোকার মতো উত্তর দেয়,,,”গোসল করবো কেনো দাদী?”
“হায় হায়,,,এই মেয়ে বলে কি?,,,আমার পাশে বস দেখি।”
ইয়ানা তাই করে,,, ইসরাত বেগম এবার সন্দেহ চক্ষু নিক্ষেপ করে ইয়ানার ওপর। তত্পর সংশয় প্রকাশ করে বলেন,,,”সত্যি করে বলতো,,,তোর আর রিফাত এর মধ্যে সব কিছু ঠিক আছে তো?”
“হ্যাঁ দাদী সব ঠিক আছে।”
“তাহলে সকালে গোসল করার মতো কোনো লক্ষ্যন খুজে পাচ্ছি না কেনো? রাতে তোদের মাঝে কিছু হয়নি?”
“মানে।”

“এখনি কি তোকে মানে বোঝাবো! এক জন স্বামী স্ত্রির মাঝে যা হয়,,,তাহ হয়নি?”
ইয়ানা হা হয়ে যায় ইসরাত বেগম এর কথায়। কি নির্লজ্জ বুড়ি মাইরি! ইয়ানা চোখ সাধারণত তুলনায় বড় আকার ধারণ করে। দোনোমোনো করছে ইয়ানা। উত্তরে কি বলবে সেটা মস্তিষ্কে সাজাতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এক মনে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে।। তাদের মধ্যে এখনও সেই সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি এটাই সত্য,,,এই সত্য কে ইয়ানা কোনো ভাবেই ধামা চাপা দিতে পারবে না।। ইয়ানার চুপ চাপ বসে থাকা দেখে ইসরাত বেগম যেনো একটু রূষ্ট হলেন। বুঝে গেলেন তার সন্দেহ সঠিক।

“স্বামীর ভালবাসা পেতে গেলে কিছুটা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। দাম্পত্য জীবনের মূলমন্ত্র হলো পুরুষ মানুষের সুখ,,,যাহ তারা না পেলে বাহিরে উকি ঝুঁকি মারে।। তখন আবার মাথা ঠুকো না!”
ইয়ানা ফট করে তাকালো ইসরাত বেগম এর দিকে। মনের মধ্যে তৈরি হলো এক অজানা ভয়। সত্যি তো রিফাত তাকে কেনো অপূর্ণ রেখেছে এখনও! কেনো তাকে কাছে টানে না রিফাত! নিজের ভাবনায় হারিয়ে যায় ইয়ানা। ঘোর কটে ইসরাত বেগম এর আওয়াজে,,,
“আর এ সব কি পড়িস বাড়িতে। শাড়ি পড়বি,,,সব সময় সেজে গুজে থাকবি। তাহলে তো রিফাত পা বাড়াবে তোর দিকে।”

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৪

ইয়ানা একনজর নিজের ওপর চোখ বুলালো। সাধারণ সুতির ট্রাই পিস পরে আছে সে। মনের ভয় যেনো আরো একগুন বেড়ে গেলো তার।। এরই মাঝে শোনা যায় রিফাত এর কণ্ঠস্বর যে একপ্রকার জোড় গলায় ইয়ানাকে ডেকে তার কফি নিয়ে আসতে বলল রুমে।। ইয়ানা জোরে নিঃশ্বাস ফেলে। ইসরাত বেগম আবার বলে,,,
“যা তার কি লাগে দেখ।। আর শোন গোসল করে আমার কাছে আসবি। একটা শাড়ি এনেছিলাম তোর জন্য ভেবেছিলাম যাওয়ার আগে দিয়ে যাব কিন্তু তা দেখছি এখনই দিতে হবে।”
ইয়ানা মাথা এদিক ওদিক নড়লো। তত্পর দ্রুত গতিতে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।।

এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ২৬