এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৫
আসিফা খান
“দাদুভাই বাড়ি ফিরবে কখন?”
ঘড়িতে সময় রাত নয়টা পঁয়তাল্লিশ। রিফাত রোগী কে ইনজেকশন পুশ করে বেরিয়েছে মাত্র। দাদুর কথায় ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,,,
“একটু লেট হবে দাদু। কেনো? কোনো প্রবলেম!”
“এবার থেকে লেট করে বাড়ি ফেরা যাবে না দাদুভাই। অসীম দায়িত্ব তোমার এখন।”
“মানে!”
“বাড়ি ফিরে আসো দেখি তাড়াতাড়ি। অবশ্যই দশ কিলো মিষ্টি আনবে।”
“এত মিষ্টি দিয়ে কি হবে!”
“তুমি আসো দেখি আগে,,,দেরি করো না যেনো”
কল কাটে ইব্রাহিম সাহেব। তার খুশি ধরে কে। আনন্দে দিশেহারা তিনি। কেনো আনন্দ হবে না! নাতির ঘরের সন্তান আসতে চলেছে যে।
রাতে ইয়ানার শরীর বেশি খারাপ হয়ে পড়ে। বমির এক পর্যায়ে জ্ঞান হারায় মেয়েটা। সারা বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।মেয়েটার হলো কি! ইয়াসমিন বেগম কেঁদে কুল পায় না। তার এক মাত্র নারী ছেড়া ধন ইয়ানা। নিশানি তার স্বামীর। মেয়ের ছোটো থেকে ছোটো অসুখও তাঁর শরীরে বিধে। ডাক পড়ে হাফিজ এর। ছেলেটা হন্তদন্ত হয়ে ডক্টর ডেকে আনে। চেকআপ এর একক পর্যায়ে জানতে পারে সুখবর। বাড়িতে আগমন হবে এক ছোট্ট পুতুলের। উল্লাস ছড়ায় প্রতিটি মানুষের বুকে। আচ্ছান্ন হয় পরমানন্দে।। অবচেতনা হতে মুক্ত হলে ইয়ানা শোনে তার পেটের মধ্যে রয়েছে ছোট্ট প্রাণ। ফুপিয়ে উঠে মেয়েটা। পেটে হাত রেখে অনুভব করে দেই প্রাণ এর অস্তিত্ব। কিন্তু মনের কোনো এক জায়গায় বাঁসা বাঁধে অফুরন্ত ভীতির, সীমাহীন ত্রাস এর।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রিফাত বাড়িতে প্রবেশ করে। শরীর তার পরিশ্রান্ত। গ্লান তার অনন। তখন মস্তিষ্কের চাপে শরীর পীড়িত হয় তার। আহিল তাকে রেস্ট করতে বলে অর্ধেক কাজ সে নিজেই করে। হাত তার মিষ্টি। পুরো দশ কিলো। দাদুর কথা ফেলতে পারিনি সে। তাই এই মিষ্টির পিছনের কারন না জেনেই সে নিয়ে এসেছে।
ড্রইং রুমে প্রবেশ করতে না করতেই আলেয়া কথা হতে ছুটে আসে,,জড়িয়ে ধরে রিফাত কে। রিফাত মৃদু হেসে মাথায় হাত রাখে বোনের। কিন্তু সেই হাসি স্থাই হয় না বেশিক্ষণ। আলেয়া উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলো,,,
“আমি ফুপি হবো দাভাই। আমার অনেক মজা লাগছে। আমি কিন্তু ওকে শাসন করবো কোনো দুষ্টামি করলে তখন কিন্তু রেগে গেলে চলবে না।”
রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে। কি বলছে মেয়েটা। আলেয়া কে কিছু বলার জন্য উদ্যোগী হতেই মিস্টার আফতাব এসে হাজির হয়। আলগোছে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে,,, কাধ থাপিয়ে বলে,,,
“বাবা হবে,,,এবার বুঝবে আমার অনুভূতি। বাবা দের যে অনেক দায়িত্ব রিফাত। আমি জানি তুমি শ্রেষ্ঠ বাবা হবে।”
রিফাত ভাষা হারায়। ভারিক্কি হয় শাস। কণ্ঠনালী শুষ্ক হয়ে ওঠে। ইব্রাহিম সাহেব বলেন,,,”রুমে যাও রিফাত মেয়েটা খানিক অসুস্থ।”
রিফাত কথা কয় না। ছলাৎ ছলাৎ বুকে এড়িয়ে যায় সে। পা যেনো আজ তার সাথ দিচ্ছে না। কোনো যন্ত্রে মূর্ছা ধরলে যেমন কাজ করা বন্ধ করে দেয় ঠিক তেমনি রিফাত এর পা চলছে না। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে সেই পুরুষের কান্নার আওয়াজ,আহাজারি।। কোনো রকম রুমে প্রবেশ করে দেখে ইয়ানা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে বিছানায়। স্নিধ এই ফুলের প্রতি রিফাত মাতোয়ারা। এই যে চিত্ত চলছে, বেঁচে থাকার ইচ্ছা আছে! শুধু এর রমণীর জন্য,আল্লাহর প্রেরিত এক বান্দির জন্য।
রিফাত ভাবলেশহীন ভাবে সোফায় বসে। পিতপিত করে চোঁখ জ্বলছে। লাল হয় সেই গভীর আঁখি। অপলক তাকিয়ে আছে সেই কাঙ্ক্ষিত মায়াময় রমণীর পানে। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে ইয়ানা চোখ খোলে। সোফায় বসা রিফাত কে দেখেই ইয়ানা চমকায়। বুকের ওঠা নামা বাড়ে বৈ কমে। ওড়না হীনা উঠে আসে বিছানা হতে। ধির পায়ে অগ্রসর হয় রিফাত এর দিকে। একটা সময় হাঁটুর বলে ফ্লোরে বসে একদম রিফাত এর মুখোমুখি। ছেলেটা কেমন করে যেনো তাকিয়ে আছে তার দিকে। ইয়ানা দুই হাত দ্বারা ধরে রিফাত এর অনন।
“আ আমি,,,বলতাম”
“মিথ্যা বললে আমায়!”
রাশভারী শীতল কণ্ঠ রিফাত এর। ইয়ানা এবার ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে ফেলে। রিফাত এর বুক ভারী হয়ে আসে। বিবর্ণ তার মুখায়ব। ভঙ্গুর স্বরে বলে,,,
“আমি যথেষ্ট ছিলাম না ইনু!”
“এরকম বলবেন না রিফাত।”
“কেনো করলে এমন! আমায় নিঃস্ব করার চেষ্টা করছো!”
ইয়ানা নাক টানে। রিফাত এর এহেন বাক্য বিনিময় তাকে পীড়িত করছে। এখন মনে হচ্ছে সে ভুল করেছে। ইয়ানা কিছু বলার জন্য উদ্যোগী হতেই রিফাত আবারও বললো,,,
“বলিনি,,তুমি আমার বেঁচে থাকার খড় কুটো,যাকে আঁকড়ে ধরেই আমার জীবন যাত্রা! বলিনি,,ইয়ানা যে, আমি তোমায় ছাড়া অর্থহীন।”
“আমি আছি তো রিফাত,,,কোথাও যাবো না আপনাকে ছেড়ে।”
রিফাত কথা বলে না। ঠাওর করতে অপরাগ রিফাত এর অনুভূতি। ইয়ানা আরো বেশি সান্নিধ্যে যায় রিফাত এর। ছেলেটার চোখের পার্শ্বদেশ কেমন রক্তিম হয়ে আছে। ইয়ানা রিফাত এর চোখের চশমা খুলে টেবিলে রাখে। নিজে এগিয়ে রিফাত গভীর আঁখিতে চুমু দেয় ,অতঃপর গালের ভাঁজে,চিবুকে। রিফাত এর মনোভাব ভাবলেশহীন। প্রেয়সীর আদর মাখা স্পর্শেও সে প্রাণশক্তিহীন। গভীর চিন্তায় মগ্ন যেনো কোনো বিষয়ে। কিছু হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয় জেঁকে বসেছে তার মন মাঝারে। প্রিয় মানুষদের হারিয়ে যেতে দেখে রিফাত ক্লান্ত। প্রথমে আপন জন্মদাত্রী, দ্বিতীয় জীবনের প্রথম ভালোবাসা। রিফাত এর মাঝে আর সেই শক্তি নেই,নেই সেই অগাধ সহনশীলতা। এবার হারালে রিফাত নিজের মাঝে থাকবে না,,,হয়তো তার স্থান হবে কোনো এক নাম না জানা নির্জন দ্বীপে।
রিফাত নিজেকে ছাড়িয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে অতঃপর বাড়ি থেকে। ইয়ানা শুধুই তাকিয়ে দেখে সব টা। তার চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। অপেক্ষা প্রহর শেষ হয় মধ্য রাতে। রিফাত এর আশায় দুই চোখ এক করতে পারিনি ইয়ানা। মন মস্তিষ্ক এর সাথে যুদ্ধ করে একাকী সময় কাটিয়ে রুমে প্রবেশ করে ইয়ানা কে বিছানায় বসে থাকতে দেখে। রাত বেশ গভীর। অন্য সময় হলে রিফাত ইয়ানা কে ধমক দিত এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকার জন্য। কিন্তু আজ! বাক্যহীন রিফাত। প্রিয় মানুষদের প্রতি আমরা বেশিই আবেগপ্রবণ হই। রিফাত ক্ষেত্রেও তাই। আবেগ, আতঙ্কে বশীভূত হয়ে রিফাত নিশ্চুপ আজ। কোনো কথা না বলে রিফাত সোজা সোফায় গিয়ে বসে। ইয়ানা নেমে আসে। সান্নিধ্য লাভ করে রিফাত এর।
“অপেক্ষা করছিলাম আপনার জন্য।
চলে গেলেন কেনো ওই ভাবে!
আমার খারাপ লেগেছে।
কিন্তু আমি রেগে নেই।
এই রিফাত আমার সাথে কথা বলবেন না!”
রিফাত কথা বলে না। কেমন করে তাকিয়ে আছে ইয়ানার দিকে। ইয়ানার বুক জ্বলে। ইয়ানা রিফাত এর গলার ভাঁজে হাত রাখে। খুবই যত্ন নিয়ে রিফাত এর কপালে চুমু এঁকে মৃদু আঁচে খুবই অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করে বসে,,,
“আপনি কি আমার সাথে অসুখী?”
রিফাত ত্বরিত তাকায়। রিফাত এর গলা জড়িয়ে আসে। তার জীবনে সুখের ওপর নাম ইয়ানা। রিফাত এবার মৌনতা কাটায়। ঠোঁট নেড়ে ফিচলে কন্ঠে বলে,,,
“আমি সর্বসুখি।”
“আপনার অতীত কি বর্তমান এর তুলনায় ভালো?”
কোমড় পেচিয়ে টেনে আনে ইয়ানা কে। চোখে চোখ মেলায়। দৃঢ় হয় চাহনি। রিফাত এর অ্যাডামস এপেল কেপে উঠলো। অনিমেষ স্বরে আওড়ায়,,,
“অতীত যদি মধু হয় তাহলে বলবো আমার বর্তমান অমৃত।। অতীত যদি সুখ হয় তবে বর্তমান শান্তি। অতীত যদি সুন্দর হয় তাহলে বর্তমান রহমত।। ইয়ানা আমার শেষ নারী,,,ইয়ানা আমার পূর্ণ জীবনের অধিকারী।”
ইয়ানা অশ্রুসিক্ত নয়নেও হালকা হাসে। সে জানে,সবটা জানে। রিফাত কে আরো বেশি সাভাবিক করতে বলে,,,
“ভালোবাসেন তো আমায়?”
“তুমি আমার বাম পাঁজরের হাড়।”
“আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না তো !?”
“মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তো না।”
“রাতে যে ভাবে উপেক্ষা করে চলে গেছিলেন,আর ওই ভাবে যাবেন না। আমার কষ্ট হয়!”
“আর যাবো না ওই ভাবে,,,কখনো না।”
“আপনি শুধুই আমার।”
“তুমি কারোর না,,,আমি ছাড়া যেনো তুমি শূণ্য হও।”
ইয়ানা চোখ বুজে ফেললো। নাক ঘষে রিফাত এর গালে। মিনমিনে কন্ঠে বলে,,,
“আমরা একে অপরকে ছাড়া অপূর্ন রিফাত। আল্লাহ আমাদের সহায় হবেন,,,বিশ্বাস রাখুন সব টা ঠিক হবে।। নাতি নাতনী দের বিয়ে না দেখা পর্যন্ত আমি কোথাও যাচ্ছি না আপনাকে ছেড়ে। জান্নাতেও আপনাকে চাই,,,আল্লাহর কাছে আমায় চাইবেন,শুধু আমাকে। হিংসুটে হয়ে যাচ্ছি না আমি?”
এবার রিফাত হাসে খানিক। ইয়ানা তাকিয়ে দেখে তাঁর একান্ত পুরুষ কে। রিফাত বলেছিল যদি কখনো তার ঠোঁটের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় তাহলে যেন ইয়ানা তার চোখের শব্দগুলো পড়ে ফেলে। আজ যেন সেই দিন। সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, রিফাতের চোখের ভাষা ইয়ানা স্পষ্ট ভাবে পড়তে পারছে। চোখের মাঝে খুশির ঝলকানি দেখা গেলেও মনের মাঝে চলা ধুকপুকানি এড়িয়ে যেতে পারে না ইয়ানা। মনে মনে দোয়া করে ইয়ানা,,,আল্লাহ তাকে এই মানুষটার সাথেই রাখুক।তাদের সুখী সংসার হোক একটা। যে সংসারে সে থাকবে,থাকবে তার সন্তান আর রিফাত।
“হিংসুটে হলেও দোষ নেই। আমার বউ আমার প্রতি হিংসুটে,,এটা গর্বের।”
ইয়ানা চোখে হাসে রিফাত এর কথায়। আলগোছে নিজের কামিজ সরায়। উন্মুক্ত পেটে উপর রিফাত এর হাত টেনে রাখে। রিফাত দন্ত কাটে অধরে। তার বুক কাঁপছে, হৃদস্পন্দন বাড়ছে কয়েক গুণ। সুখে আচ্ছন্ন পুরুষ সত্তা উপলব্ধি করতে পারছে জীবনের শ্রেষ্ট অনুভূতি। বাবা হওয়ার অনুভূতি। ইয়ানা কম্পিত কন্ঠে সুধায়,,,
“ও এইখানে আছে রিফাত। এখন অনেক ছোট্ট। ও আমাদের সন্তান রিফাত,,,আমাদের প্রনয়ময় ভালোবাসার অংশ। যদি ও কখনো শোনে,ওর আসার খবর পেয়ে ওর বাবা অসুখী হয়েছিল তাহলে ওর কেমন লাগবে?”
রিফাত এর যেনো চেতনা ফেরে। সত্যিই তো এরকম টা ও ভেবে দেখিনি। এটা তার অংশ। তাদের ভালোবাসার প্রতীক। রিফাত কি ভাবে ভুলে গেলো এই গুলো? ইয়ানা কে উঠিয়ে কোলে বসায় রিফাত,,,অসংখ্য চুমু এঁকে দেয় পেটের চারি পাশে।
রিফাত পেটে মুখ গুজে বসে থাকে বেশ কিছু সময়।
একই অবস্থায় থেকে বলে,,,
“আমি খুশি ইনু। এত সুখের মালিক আমি!?”
ইয়ানা সম্মতি জানায়। অধরে অধর মেলে। শক্ত চুম্বন করে অতঃপর কপাল ঠেকায় রিফাত এর বুকে। সময় যায় নিজের মত। মধ্য রাতের কপোত কপোতী তারা। কোনো এক পুরুষ প্রেয়সী কে চোখে হারাচ্ছে আবার হৃদয়ের কোনো এর জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে সুখের আলো। দোটানা অনুভূতির অধিকারী রিফাত। দুরু দুরু বুকে শুধুই চাচ্ছে প্রিয় মানুষের সুস্থতা।। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতে রিফাত গলা ভেজায় কিছুটা অতঃপর গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,,,
“তো কতদিন ধরে চলছিল এই প্ল্যানিং?”
ইয়ানা বিপাকে পড়ে। আরো লেপ্টে যায় রিফাত বুকে মধ্যে। পাত্তা দেয় না রিফাত, প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি ঘটাতেই ইয়ানা গাইগুই করে বলে,,,
“তিন মাস ধরে।”
রিফাত অবাক এর চরম পর্যায়ে পৌঁছিয়ে যায়। তার চোখের সামনে থেকেই এই মেয়ে তাকেই ঘোল খাইয়ে দিলো। রিফাত জানে ইয়ানার মাথায় এই বুদ্ধি নিজের থেকে আসেনি কারোর দেওয়া এই পরামর্শ।
“কে দিয়েছিল এই বুদ্ধি?”
“বলবো না”
রিফাত রুদ্ধশ্বাস ছাড়ে। এখন বলেও আর কি হবে! যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে। রিফাত নানান ভাবে পরামর্শ কর্তার নাম জিজ্ঞাসা করলেও ইয়ানা জেদ ধরে,, সে বলবে না মানে বলবে না। রিফাত ও হাল ছাড়ে সে জানতে চায় না। রিফাত এবার পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকায় ইয়ানার দিকে। চোখ ছোট ছোট করে বলে,,,
“তাই নিজ থেকে ধরা দিতে আমার কাছে। সময় অসময়ে আবেদনময় রূপ নিয়ে আমার সামনে ঘুরঘুর করতে। তখন বুঝতে পারিনি এখন সব বুঝতে পারছি।। ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে মাইন্ড ডাইভার্ট করতে আমার। কথার জালে ফাঁসিয়ে……………… । সবটা চালাকি ছিলো!
ইয়ানা চোর ধরা পরার ন্যায় গুটিয়ে থাকে। চোখ মুখ তার রংহীন। আরক্ত তার গাল। ইসস,,,এই ভাবে রিফাত বলবে তাহ ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছিলো।ইয়ানা লজ্জায় একাকার। রিফাতের এক একটা কথা সত্য। এই পরামর্শ গুলোও তার আন্টি মায়ের ছিল। ইয়ানা ঠোঁট বাঁকিয়ে চুপ রয়। ভাষা নেই তার। রিফাত আবারও গম্ভীর স্বরে বলে,,,
“মিথ্যা আমার অপছন্দ ইনু।”
ইয়ানার বুক মোচড় দিয়ে উঠলো। ত্বরিত বললো,,,
“মিথ্যা বলতে চাইনি।”
“কিন্তু বলেছো।”
“আর বলবো না,,,কখনোই বলবো না।”
ফুপিয়ে উঠে মেয়েটা। মাথায় হাত রেখে রিফাত। আঁকড়ে ধরে বলে,,,”এবার থেকে আমার সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে ইয়ানা। আমি কোনরকম অবাধ্যতা মেনে নেবো না।”
ইয়ানা ঠোঁট ফুলিয়ে,মিট মিট নজরে তাকায় রিফাত এর দিকে। নিষ্পাপ তার ভঙ্গি। রিফাত সেই মায়াময় রমণীর দিকে তাকিয়ে বললো,,,”এই ভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। এখন তুমি একা নও,,,ভালো করে খাওয়া দাওয়া না করতে বেবির ওয়েট ডেভেলপ হবেনা,,, আনহেলদি বেবি চাও তুমি!”
“নাহ্”
“তাহলে,,,আমার কথা মেনে চলবে?”
“চলবো”
“ডক্টর কি বলেছে?”
“এক মাস আটদিন।”
রিফাত আর কথা বাড়ায় না। হুট করে তার খুব ক্লান্ত লাগছে। ইয়ানা কে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজে মেয়েটার গলায় মুখ গুঁজে একের পর এক ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে বলে,,,
“মাথায় হাত বুলিয়ে দাও?”
ইয়ানা মৃদু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে রিফাত এর। হালকা স্বরে বলে,,,”কিছু দিন পর আমার বুকের মালিক আরেকজন হবে,,,তখন আপনি কোথায় যাবেন!”
“ভাগাভাগি করে নেবো।”
“কি ভাবে!?”
রিফাত এবার বাঁকা হাসলো অগোচরে। ইয়ানার কানের লতিতে আলতো স্পর্শ করে ফিসফিসিয়ে কিছু বলে ওঠে। ছলাৎ করে ইয়ানার চিত্ত।চোখ বড় বড় করে তাকায়। কি সাংঘাতিক কথা! ইয়ানা রিফাত এর চুল টেনে দেয় শক্ত ভাবে, দাঁত খামটি মেরে বলে,,,”বেহায়া”
রিফাত কামিজ সরালো। হাত রাখে উদাম মেয়েলি পেটে। তার অনাগত সন্তান আছে এথায়। কি শান্তি,কি সুখময় অনুভূতি। রিফাত উপলব্ধি করে মিস্টার আফতাব এর আবেগ,,, সে যেমন এখন ফিল করছে সেই একই ফিলিংস মিস্টার আফতাব রোজ ফিল করে। সন্তানেরা বড়ো হয়ে গেলেও বাবা মায়ের কাছে আজীবন ছোটো থাকে। রিফাত নরম ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে দেয় সেথায়। মাথা নামিয়ে নাভির পাশ ঘেঁষে চুমু দেয় মনে মনে আওড়ায়,,,
“আব্বু আমার,,,মা কে বেশি কষ্ট দেবে না। তোমার আব্বু যে তোমার মা প্রেমিক। তুমি আসো নেক সন্তান এবং রহমত হয়ে। ধরণীর বুকে তোমার আগমন হোক তীব্র গরমের মাঝে বৃষ্টির ন্যায়,তুমি আসো আমাদের অন্তর কে শিথিল করে।”
“অনুভূতি” শব্দটা চার অক্ষরের হলেও এর গভীরতা অসীম। অনুভূতি সৃষ্টির কোনো সময় নেই। তার অগমন হয় অনিশ্চিত। এরকমই অনিশ্চিত অনুভূতি এসে হাজির হয়েছিল হাফিজ এর বুকে। যা ধীরে ধীরে বৃহৎ আকার ধারণ করে। পরে যার নাম হয় ভালোবাসা। তবে এই ভালোবাসা যার জন্য সে অনুভূতিহীন। হাফিজ এর প্রতি নেই তার কোনো অনুরাগ। কেনো নেই! তাহ জানা যায়নি। শুধু নেই।
হাফিজ এর শাস নিতে কষ্ট হয় মাঝে মধ্যে। আলেয়ার কথা তাকে ঘুমাতে দেয় না। এই অশান্ত অনুভূতি নিয়ে সে আর এখানে থাকবে না। সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে চলে যাবে আমেরিকার একটি শহর কলাম্বিয়া তে। তার কোম্পানির তরফ থেকে তাকে সেইখানে পাঠেতে চায়। কোম্পানি এই অফার অনেক আগেই হাফিজ কে দিলেও সে নাচক করে দেয়। কিন্তু এখন সে এই অফার একসেপ্ট করে। সে তার ভালোবাসা বুকে নিয়েই চলে যাবে ভিন দেশে। অফারের মেয়াদ 2 বছর। দেখা যাক এই দুই বছরে কোনো অপার্থিব ঘটনা ঘটে কি না! সেই রমণীর বুকে যদি ফোটে হাফিজ এর ভালোবাসার ফুল।
আমারা মাঝে মধ্যে কিছু অনুভূতি মানুষের দূরত্বে উপলব্ধি করতে পারি,,,কাছ থেকে আমরা শুধুই সেই অনুভূতির পরিহাস করে থাকি।
আজ হাফিজ এর যাওয়ার দিন। হোসেন পরিবারের সকলেই উপস্থিত একেত্রে। নেই শুধু আলেয়া। হাফজা বেগম কেঁদে ভাসাচ্ছে। তার এক মাত্র ছেলে,,চোখের মানিক তার। হাফিজ তার মায়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলে,,,
“কাঁদে না আর। অসুস্থ হবে তুমি। আমি চলে আসবো তো,,,মাত্র দুই বছরের ব্যাপার।”
“কত সহজ তোর জন্য এই সব বলা,,,যখন নিজে বাবা হবি তখন বুঝবি আমাদের কষ্ট।”
“আচ্ছা,,,,এখন একটু হাসো দেখি। তোমার হাসি মুখ দেখেই বিদায় নিতে চাই।”
হাফজা বেগম হাসে। ছেলেকে আঁকড়ে ধরে চুমু দেয় কপালে। মা কে ছেড়ে একে একে সবার থেকেই বিদায় নেয় হাফিজ। কিন্তু চোখ তার যাকে খুঁজে চলেছে সেই অনুপস্থিত। শেষে রিফাত কে জড়িয়ে ধরে হাফিজ,,,
“ভাইজান,,,”
“কোনো রকম এর অসুবিধে হলেই আমায় জানাবি। কলাম্বিয়া তে আমার বেশ জানা ফ্রেন্ড আছে।”
“জানাবো ভাইজান,,,ইয়ানা কে দেখে রেখো।”
“আর!”
“আর কি?”
“আমার একটা বোন আছে।”
হাফিজ ফ্যাকাসে হাসে।। বলে,,,,
“রঙিন চশমা পরে পৃথিবী দেখছে ও। আমি চাই তার সেই সুন্দর পৃথিবী সুন্দরই থাক।”
“আমি চাই আমার ভাই এর মনের চাও পূরণ হোক,,,দুই বছর পরেই হোক কিন্তু হোক।”
রিফাত বোঝে ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট। কিন্তু বোনের উপর জোর খাটিয়ে কিছু করতে চায় না সে। ভালোবাসা নিজ থেকে তৈরি হয়,,,জোর করে শুধু বন্দী করে রাখা যায়।
হাফিজ ব্যাগ নিয়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। কি মনে করে হুট করেই রাফাত দের ছাদের পানে তাকায়। দম আটকে আসে এক মুহূর্তের জন্য। অনুভূতির জোয়ার ঝাপটা দেয় চিত্ত মাঝারে। আলেয়া রেলিংয়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি তার হাফিজের পানে। আলেয়া অপলক দেখে গেলো শুধু। কেনো জানি তার খারাপ লাগছে। অসীম পীড়ায় পীড়িত হচ্ছে অন্তর। গলা ভার হয়ে আসছে। সে হাফিজ কে কোনো দিন সেই দৃষ্টিতে দেখেনি। এখানে তার ভুল কোথায়!? তার দোষ কি শুধু এইটাই যে সে হাফিজকে ভালোবাসেনি!
হাফিজ সেই রমণীর পানে চেয়ে আপন মনে সুধায়,,,
“ভালোবাসা মানে শুধুই অধিকারবোধ নয়। ভালোবাসা মানে মুক্ত আকাশ।। আজ মুক্ত গগন উপহার দিলাম তোমায়। অপেক্ষায় থাকবো তোমার ফিরে আসার।”
সময় নাকি সব ঠিক করে দেয়। সমস্ত জখম মুছে ফেলে,,সমস্ত তিক্ততা দুর করে। দেখা যাক এই সময়ের কাছে কি হার মেনে আলেয়ার মনে জন্ম নেয় ভালোবাসার আকাশ নাকি হাফিজ এর ভালোবাসার সুমুদ্রে খড়া পরে।
সাড়ে তিন মাস চলছে ইয়ানার প্রেগনেন্সির। পেট ফুলেছে হালকা। কেউ খুব গভীর ভাবে না দেখলে বোঝা মুশকিল হবে যে, মেয়ে টা গর্ভবতী। ব্যাপারটা খুবই সাধারণ প্রেগনেন্সি বেলি সব মেয়েদের একই হয় না। ইয়ানার শারীরিক পরিবর্তন খুব একটা বেশি দেখা না গেলেও পরিবর্তন ঘটেছে ইয়ানার মানসিক অবস্থার। মাঝের মধ্যে মেয়েটা খুব বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে আবার কখনো রাগে অগ্নিসর্মা হয়ে ওঠে। প্রেগনেন্সির মাঝে মুড সুইং ব্যাপারটা অত্যাধিক নরমাল কিন্তু ইয়ানার জন্য তা অত্যাধিক বেশি দেখা দিচ্ছে। রিফার চেষ্টা করে ইয়ানার সর্ব কথা মেনে চলার।দিন দিন মেয়েটার আবদার বাড়ছে বৈ কমছে। রাত বিরাতে উঠে কাঁদে মেয়েটা আবার মাঝে মধ্যে ঘুমন্ত রিফাত কে তুলে নানান প্রশ্ন, নানান কথা বলে সে,,,রিফাত ও ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়া শরীরে মেয়েটার সমস্ত কথা শোনে, উত্তর দেয় খোশ মেজাজে। আবার কখনো রাত বারোটায় খেয়ে ঘুমালেও দেড়টায় উঠে খেতে চাওয়ার মতো বায়না ধরে ইয়ানা।
রিফাত এর দিন কাটছে চিন্তায়। বুক ভরা ত্রাস নিয়ে চলা ফেরা করছে সাধারণ ভাবে। ইয়ানা কে সর্ব সময় চোখে রাখে। সব দিকে খেয়াল রাখে মেয়েটার। তাহাজ্জুত পড়ে দীর্ঘ মোনাজাত করে স্ত্রির জন্য। আহা,,, কি ভাগ্য ইয়ানার।
গভীর রাতে রিফাত বিছানা হাতড়ায়। মোচড় দিয়ে ওঠে অন্তর। পাশে ইয়ানার অস্তিত্ব নেই বুঝে আসতে তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে বিছানা হতে। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে আসে পাশে তাকাতেই শান্ত হয় চিত্ত। ইয়ানা এলোমেলো অবস্থায় সোফায় বসে আছে। পলকহীন ফ্লোরে তাকিয়ে আছে সে। রিফাত নামে,,,ধির পায়ে হেঁটে ইয়ানা সামনে বসে,,,
“এখানে কেনো ইনু! ঘুম না আসলে আমায় ডাকবে বলেছিলাম না?”
ইয়ানা ঘোর লাগা চোখে তাকায় রিফাত এর দিকে। সময় ব্যায় না করে রিফাত এর বুকের কাছের টি শার্ট টেনে কাছে আনে অতঃপর ঠোঁটের ছোঁয়ায় মত্ত হয় ইয়ানা। রিফাত চমকায়। সরিয়ে আনে না ইয়ানা হতে,,,নিজেও আঁকড়ে ধরে মেয়েটাকে। ইয়ানার অপরিপক্ত চুমুকে নিজেই সামাল দেয়। দীর্ঘ চুম্বনের পর ইয়ানা হাপিয়ে ওঠে,,কিন্তু দমে যায় না। রিফাত এর গলায় ঠোট ছোঁয়াতেই রিফাত চেতনা হারা হয়। আজ ইয়ানা নিজ থেকে এগিয়ে আসছে কিন্তু এটা সঠিক সময় নয়। ইয়ানার প্রেগনেন্সির শুরু থেকেই রিফাত নিজেকে সামলে চলে। সে কোনো রকম রিস্ক নিতে চায় না। ইয়ানার অশান্ত চুমুতে রিফাত দমিয়ে রাখে নিজেকে। ইয়ানার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে চায় কিন্তু মেয়েটা যখন রিফাত এর টি শার্ট খুলে ফেলার চেষ্টা করে তখন রিফাত থামায় তাঁকে।
“ইনু,,, ক্যাম ডাউন। এটা ঠিক সময় না,,,তুমি সিক।আসো আমি আমায় বুকে নিয়ে ঘুমাবো।”
শোনে না ইয়ানা। জেদী হয়ে ওঠে। আঁচড় কাটে রিফাত এর বুকে। দাতে দাঁত পিষে সহ্য করে সেই ব্যাথা।
“এখন না,,,বোঝার চেষ্টা করো প্রেয়সী।”
“এখনি”
সূক্ষ দাঁতের কোমর বসাতেই রিফাত আহ্ করে ওঠে। ইয়ানা কে সরিয়ে ঘাড়ে হাত রেখে তাহ চোখের সামনে ধরতেই রক্তের দেখা মেলে। রিফাত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ইয়ানার হাত টেনে ধরে বলে,,,
“এসো রাত হয়েছে ঘুমাবো,,,”
“আমি চাইছি আপনাকে,,,”
“পরে”
“এখন,,, এখনই।”
“জেদ করছো কেন ইনু?”
এবার যেনো রাগে লাল হয় ইয়ানা।ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে রিফাত এর বুকে ধাক্কা দেয়। তেজে গজগজ করতে করতে বলে,,,”কেনো ভালোবাসেন না আমায়? ওহ পুরনো হয়ে গেছি! আগের মত চিকন নেই তাই! চোখ পড়েছে অন্য করোর উপর। কে সে! সুন্দর নাকি,,,আমার থেকে বেশি সুন্দর। যান তার কাছেই যান। তাই আজ কাল দূরে দূরে থাকেন,,,এড়িয়ে যান আমাকে। বুঝি সব বুঝি,,,,আমি থাকবো না আপনার কাছে,,,চলে যাবো।”
তীব্র ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে নিলেই রিফাত আটকায়। পিছন থেকে আলিঙ্গন করে তার মুখ ঘুরিয়ে চুমু দেয় বউ এর নরম অধরে। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হলে শান্ত হয় ইয়ানা। এবার কেঁদে ওঠে হুঁ হুঁ করে। রিফাত কামিজ সরিয়ে পেটে হাত রেখে বলে,,,
“এখানে বেবি আছে না?”
“হুম”
“আমাদের ছোট্ট একটা ভুলে ও কষ্ট পাবে তুমি কি তাহ চাও!”
“উম হুঁ”
“তাহলে কান্না থামাও। আমার বুকে ঘুমাবে?”
“হুঁ”
“আসো”
“খিদে পেয়েছে”
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৪
ঠোঁট ফুলিয়ে বলে ইয়ানা।। ফোঁস করে শাস ছাড়ে রিফাত। মেয়েটার কপালে চুমু দেয়। ইয়ানা কে বসিয়ে নিজে কিচেনে যায়। পনেরো মিনিট পর গরম টক ঝাল নুডলস্ নিয়ে রুমে প্রবেশ করে। নিজ হাতে ইয়ানা কে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে দেয়। অতঃপর কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে নিজে ইয়ানা কে বুকে টেনে নেয়। মাথায় হাত বুলাতে থাকে যতক্ষণ না ইয়ানার গভীর নিশ্বাস কানে আসলো। চুলের ভাঁজে ঠোঁট ছুঁইয়ে,নাক ডুবিয়ে বলে,,,
“তোমার স্থান আমার বুকেই হোক। আমার প্রতিটা ভোর হোক তোমাকে বুকে নিয়ে,,,প্রতিটা রাত পার হোক তোমার ঘ্রাণে।”
