এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৬
আসিফা খান
ইয়াসমিন বেগম এবং মিসেস আশফিয়ার সাথে কিচেনে কাজের সাহায্য করছে ইয়ানা। তারা বারংবার না করার শর্তেও ইয়ানা যেতে ইচ্ছুক নয়। সে কি বেশি কাজ করছে নাকি? সে তো শুধু সবজি কাটতে, ধুতে সাহায্য করছে কেবল। সারা দিন,রাত রুমে বসে থাকতে কার ভালো লাগে? যতক্ষণ রিফাত থাকে ভালো লাগে কিন্তু মানুষটার কি কাজ নেই! তাও দিনের বেশিরভাগ সময়ই সে ইয়ানা দেয়। খেয়াল রাখে,সেবা করে। ইয়ানার নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। আয়নায় নিজেকে দেখলেও হিংসে হয় তার।।
“ইয়ানা,,,রুমে যা নাহলে ড্রইং রুমে বস। ঘেমে যাচ্ছিস। রিফাত দেখলে রাগারাগি করবে।”
“তোমার ছেলে রাগে না কখন? রাগ তার ছায়া সঙ্গী।”
মিসেস আসফিয়া ঠোঁট চেপে হাসে। ইয়ানা সত্যিই ঘেমে উঠেছে। গলা ,ঘাড় ঘামে মাখামাখি। রান্না ঘরে গরম হয় এটাই স্বাভাবিক তাও রিফাত এটাকে অস্বাভাবিক নেয়। ইয়ানা ধির পায়ে হেঁটে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে বেসিন এর নিকট যায়। পানি ছেটায় আরক্ত মুখে। দুই দিন ধরে মটন ইয়াখনি পুলাও খেতে মন চাইছে ইয়ানার তারই প্রিপারেশন চলছে রান্না ঘরে। রিফাত গিয়েছে মটন আনতে। চল্লিশ মিনিট এর উর্ধে রিফাত গিয়েছে এবার হয়তো চলেই আসবে। ইয়ানা বকা খেতে চায় না তাই ভালো মেয়েদের মত ড্রইং রুমের সোফায় বসলো। পায়ের ব্যাথা বাড়ছে তরতর করে। কিচেনে এতক্ষণ দাড়িয়ে থাকার কারণে হয়তো। ক্লান্ত তার অবয়ব।
এরই মাঝে আগমন ঘটে রিফাত এর। রোদে ঘেমেছে বেচারা। হাতের ব্যাগে প্রায় কেজি খানেক মাংস বোঝা যাচ্ছে। আরো কিছু জিনিস পত্র আছে। সোফায় বসা ইয়ানার দিকে এক পলক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অতঃপর কিচেনে রেখে এলো ব্যাগ পত্র। কিছুক্ষণ পর রিফাত ও ইয়ানার সামনের সোফায় বসলো কপালে পড়ে থাকা ঘামে ভেজা চুল ঠেলে দিল পিছন দিকে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“পানি খাবেন?”
ইয়ানা প্রশ্ন করলেও উত্তর আসলো না ওই পাস থেকে। রিফাত তখনও কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইয়ানার পানে মেয়েটাও যত সম্ভব নিজ ব্যাথাতুর ভঙ্গি লুকাতে ব্যস্ত। রিফাত গম্ভির গলায় বলে,,,
“ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি আনবে।”
ইয়ানা চমকায়,, সে ভেবেছিল তার সামনের টি টেবিলে রাখা পানির জগ থেকে পানি ঢেলে দেবে রিফাত কে। সে যদি এখান থেকে ওঠে তাহলে পায়ের ব্যথায় সে আবারও বসে পড়বে। ব্যাথাটা বাড়ছে বৈ কমছে। রিফাতের ভঙ্গিমা তখনও একই রকম। ইয়ানা আলতো হেসে সোফা থেকে সুন্দরভাবে ওঠার চেষ্টা করলেও চোখ মুখ খিচে ব্যথার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েই ফেলে,,,তখনই তেতে ওঠে রিফাত। আর ইচ্ছাকৃত ভাবে বলা কথাটি কাজে লাগছে। এক প্রকার তেড়ে যায় ইয়ানার কাছে,,,বাহু ধরে আবার বসিয়ে দেয়। খ্যাপাটে গলায় বলে,,,,
“সাহস বেড়েছে না!? কিছু বলিনা দেখে মাথা কিনে নিয়েছ স্টুপিড। এই বলে যায়নি আমি রুমে থাকতে? বলো,,,বলে যায়নি?”
ইয়ানার চোখ ভিছে আসে তাহ তোয়াক্কা করে না রিফাত। মাথা তার বেজায় গরম। ইয়ানার অশ্রু সিক্ত নয়ন দেখে রিফাত আরো বেশি চটে। মৃদু চিৎকার দিয়ে বলে,,,,”খবরদার যদি চোখ থেকে এক বিন্দু পানি পড়ে। কিছু বললেই কেঁদে ভাসাবে। এখন পায়ের ব্যথা কার হচ্ছে? কে কষ্ট পাচ্ছে? হুম?”
ইয়ানা কোনো রকম উচ্চারিত করে,,,”আমি কিছুই করিনি শুধুই দাড়িয়ে ছিলাম।”
রিফাত ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে। মেয়েটা আজ কাল বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পরে না তাও এই মেয়ের ত্যাড়ামী দেখে রিফাত এর মেজাজ তুঙ্গে ওঠে।
“এই শুধু দাড়িয়ে ছিলে মানে কি? আমি যাওয়ার পর থেকেই দাড়িয়ে আছো? তাকাও,,, তাকাও আমার দিকে!”
ইয়ানা হাচকি তুলে। নাকের পাটা ফূলেছে তার। ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকায় কোনো রকম। পায়ের ব্যাথা সাথে রিফাত এর বকুনি সব মিলিয়ে নাজুক অবস্থা। কাহিল রিফাত ও। ইয়ানা কে নিয়ে প্রতিটা মুহূর্তে সংশয়ে থাকে রিফাত। মেয়ে টা তার প্রাণ। ইয়ানার ছোটো থেকে ছোটো ব্যাথাও রিফাত কে উন্মাদ করে। এই যেমন এখন ইয়ানার ব্যথায় তার বুক কাপছে। রিফাত এর কন্ঠে রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে আসফিয়া।
“কি হলো রিফাত?”
রিফাত চোয়াল শক্ত রেখেই বলে,,,”এতক্ষণ দাড়িয়ে থেকে পায়ের ব্যাথা বাড়িয়েছে। কাল রাতে ও ব্যথায় ঘুমায়নি,,,আজ আবারও। কথা শোনে না মোটেও।”
“ওকে রুমে রিয়ে যাও,,,আমি তেল গরম করে নিয়ে যাচ্ছি মালিশ করে দেবো।। আমি কতবার বললাম বাতাসে বসতে শুনলই না।”
“শুনবে কেনো? নিজের ইচ্ছাই হচ্ছে ওর কাছে সব।”
রিফাত এর এহেন কথায় খারাপ লাগল ইয়ানার। অশ্রু নদী হয়ে বইতে চাইলো তাহ আটকালো বহু কষ্টে। ইয়ানা কে ধীর স্থির ভাবে তুললো সোফা হতে। সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে রুমে নিয়ে গেলো তাকে।
রিফাত কতবার ইয়ানা কে নিচের রুমে শিফট হওয়ার কথা বলেছে কিন্তু ইয়ানা তাহ শুনিনি। তার মতে ‘ তাদের রুমে রিফাত এর গন্ধ আছে,তাদের খুনসুটির প্রেমময় মুহূর্ত আছে যাহ ইয়ানা ফিল করতে পারে। রিফাত চলে গেলে রুমের মধ্যে পায়চারি করে,সব অনুভব করে। রিফাত তাকে বিছানায় বসিয়ে পকেট থেকে ফোন,ওয়ালেট বের করে টেবিলে রাখে। ইয়ানা মথা নিচু করে বসে রইল চুপ চাপ। রাগান্বিত রিফাত কে তার বড়ই ভয় করে। এরই মধ্যে বাটিতে রসুন সরিষার তেল গরম করে নিয়ে এলো আসফিয়া।
“আমি মালিশ করে দিচ্ছি।”
রিফাত বিনয়ের সঙ্গে বললো,,,”আমি করতে পারবো,,,আপনি তেল টেবিলে রেখে দিন।”
মুচকি হেসে তাই করলো মিসেস আসফিয়া। রিফাত ইয়ানার সামনে বসে। শাড়ি পা হতে উপরে তুললেই ইয়ানা চমকায়। পা সরিয়ে নিতে চাইলেই রিফাত দেয় এক রাম ধমক,,,
“এই সমস্যা কি? পা দেখাও। মাথা থেকে আঁচল সরাও,,,ঘেমে একাকার হয়েছে।”
ইয়ানা এবার হুঁ হুঁ করে কেঁদে ওঠে। রিফাত ইয়ানার আঁচল সরিয়ে দেয়। কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে ইয়ানা কান্না আটকায়। পানি খাওয়ায় ইয়ানাকে,,,হিশহিসিয়ে বলে,,,
“কাঁদলে খবর আছে? ”
“কাঁদবো না,, সরি।”
“সরি শুনে লাভ? ব্যাথা কমবে এতে!”
ইয়ানা উত্তর দিলো না। রিফাত গরম তেল হাতে মাশা করে ইয়ানার পা মালিশ করে দিতে লাগলো। আরাম লাগছে সাথে ব্যাথাও করছে সামান্য। পায়ের উপরি ভাগ ফুলেছে।
“বেশি ব্যাথা?”
“উম,,,”
গুনগুন শব্দ ইয়ানার। বেশ কিছুক্ষণ মালিশ করে রিফাত উঠতে নিলেই ইয়ানা তার বহু টেনে আটকায়। রিফাত ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই ইয়ানা ঝাপটে ধরে রিফাত কে। পেটে মুখ গুজে দিয়ে ভাঙ্গা কন্ঠে বলে,,,,
“আপনি রেগে থাকবে না আমার থেকে।”
“রেগে নেই ছাড়ো।”
“নাহ আপনি রেগে, আমি জানি।”
“যখন জানো আমি রেগে যাবো তাহলে এমন কাজ করো কেনো?”
“আর করবো না,,,ওয়াদা।’
রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছাড়ে। মেয়েটা তাকে রেগে থাকতে দেয়না। এই যে এখন,বিড়াল ছানার মত তাকে জড়িয়ে ধরে আছে এতে করে কি রিফাত রেগে থাকতে পারে? নাহ কখনোই পারে না। রিফাত আগলে ধরে তার বোকা প্রেয়সী কে। মাথার উপর ভাগে ঠোঁট ছোঁয়ায় পর পর। মৃদু স্বরে সুধায়,,,
” নাইন মান্থ চলছে ইনু। বোঝো সর্বদা কত টেন্স থাকি আমি! মন বসে না কোনো কিছুতে।।”
“আমি আপনাকে অনেক কষ্ট দিই তাই না?”
“তুমি আমার কষ্ট না সুখ। নিজের অস্তিত্বের যত্ন নিতে কষ্ট হয়না বরং সুখ লাগে অন্তরে। তুমি আমার জীবন যাত্রার শেষ ঠিকানা।।
দ্বিতীয় বার এরকম কথা বললে দাত ভেঙ্গে দেবো।।”
“বাবু দেখছে যে,আপনি আমায় বকছেন।”
“দেখুক যে,তার মা কত পাজি। অনেক বেশি বুঝে ফেলেছে সব। যত্ন কে কষ্ট বলছে সে।। এতক্ষণ দাড়িয়ে থেকে যে নিজের কষ্ট বাড়ালো সে দিকে তার হুস নেই।”
ইয়ানা আরো মিশে যায় রিফাত এর সত্তায়। নাক ঘষে আলতো করে। হঠাৎ রিফাত এর চোখ আটকায় ইয়ানার উন্মুক্ত মেয়েলি ঘাড়, কাধে,বুকের কিনারে। সেথায় তার দেওয়া চিন্হ সদা সর্বদা জ্বলজ্বল করে। রিফাত চুম্বনে সীমাবদ্ধ থাকলেও ইয়ানা এই টুকু ভালোবাসা নিজ দায়িত্বে আদায় করে নেয়।। ইয়ানা জানে রিফাত তাকে নিয়ে অনেক চিন্তিত থাকে। ইয়ানা বোঝে। রিফাত এর পেটে থুতনি ঠেকিয়ে মাথা তুলে ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,,,
“আর দাঁড়াবো না বেশিক্ষণ। এবার ঠোটে চুমু দিন।”
রিফাত ভ্রু কুঞ্চিত করে হেসে ফেলে। মেয়েটা দিন কে দিন আরো বেশি আদুরে হয়ে যাচ্ছে। আজ কাল লজ্জা পায় কম। ইয়ানা যখন ফুলে ওঠা পেটে,কোমরে হাত রেখে রুম জুড়ে হেঁটে চকলেট খায় রিফাত এর তখন মনে হয় মেয়েটা বুকে পুড়ে রাখতে। রিফাত শক্ত চুমু এঁটে দেয় ইয়ানার নরম ঠোঁটে। অতঃপর শাড়ির আঁচল টেনে দেয়।
“চলো গোসল করবে।”
ইয়ানা মাথা নাড়ায়। ভালো মেয়ের মত রিফাত এর সাথে ওয়াশরুম যায়। রিফাত ওকে গোসল করিয়ে জামা পড়তে সাহায্য করে। ভিজে চুল শুকিয়ে দেয়। ইয়ানা উযু করে চিয়ারে বসে নামাজ আদায় করে। ইতিমধ্যে রিফাত গোসল সেরে মসজিদে যায়। নামাজ পড়ে এসে দেখে ইয়ানা বিছানায় বসে কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করছে। রিফাত কে দেখে মৃদু হেসে শেষ করে পড়া। রিফাত ইয়ানার কপালে চুমু এঁকে বলে,,,
“খিদে পেয়েছে ইনু?”
“পেয়েছে।”
ইয়ানা সম্মতি জানাতেই রিফাত নিচে যায়। এতক্ষণে তৈরি হয়ে গেছে মটন ইয়াখনি পুলাও। রিফাত নিজ হাতে ওকে খাইয়ে দেয়। ইয়ানা ও ভীষণ তৃপ্তি সহকারে খায়। খাওয়া শেষে ইয়ানা কে শুইয়ে রিফাত সব নিচে রেখে আসে। নিজেও শুয়ে ইয়ানা কে বুকে লেপ্টে নেয়। হুট করেই ইয়ানা ব্যাথাতুর শব্দ তোলে,,,”আহ্”
বিচলিত হয় রিফাত। তড়িঘড়ি করে বললো,,,”কি হলো ইনু? পেটে ব্যাথা করছে! বলো,,”
ইয়ানা নাক টেনে বলে,,,”লাথি দেয় দুষ্টু টা।”
সহসা রিফাত ইয়ানার গালে নাক ঘষে চুমু খায়। হাতের চালান হয় উন্মুক্ত পেটে,,,সেথায় নরম ভঙ্গিমায় হাত বুলিয়ে আদর মাখা কন্ঠে বলে,,,”মায়ের মত দুষ্টু হয়েছে।”
“মোটেও না,,,আব্বুর মত”
“আব্বুর মত হলে তুমি কাহিল হবে ইনু,,,দুই জনের দুই রকম আদরে তুমি শেষ।”
ইয়ানা মৃদু হাসে। রিফাত এর দাড়ি যুক্ত গালে নিজের নরম গাল ঘষে বলে,,,”আপনি আমি ছাড়া কারোর সাথে এই রকম আদুরে গলায় কথা বলবেন না রিফাত। আপনি জানেন না আপনার এই কন্ঠে কতটা মাদকতা আছে।”
রিফাত বিস্তার হাসে। বলে,,,”হিংসুটে ইনু।”
“উম হুঁ,,,আপনার বউ”
হেসে ওঠে ইয়ানা। রিফাত দেখে এই মায়াময় হাসি।
পাঁচ মাসের রুশা কে নিয়ে খেলতে ব্যাস্ত আতিকা। ছোট্ট মেয়েটা অত্যাধিক আদুরে,শুধুই কোলে নিয়ে চুমু খেতে মন চায়। তাই তো সময় পেলেই আহিল কে নিয়ে দানিশ দের বাড়ি হাজির হয়। সময় কাটায় দানিশ আর রুতবার মেয়ে রুশার সাথে। যেমন এখন মেয়েটাকে কোলের উপর বসিয়ে কাতুকুতু দিচ্ছে আর দুইজনের হেসে উঠছে উচ্ছ্বাস কন্ঠে। হঠাৎ কথা থেকে একটা টিকটিকি তাদের পাশে পড়তেই রুশা ভয় খামচে ধরলো আতিকার উন্মুক্ত বুক। বাচ্চাটির ধারালো নখের আঁচরে ছিলে যায় খানিক অংশ। জ্বালা করে ওঠে জায়গাটায়। ব্যাথা পেলেও উফফ করে না আতিকা। টিকটিকির ভয়ে দুই জনের চিৎকারে হন্তদন্ত হয়ে রুতবা প্রবেশ করে রুমে, আতিকা মেকি হেসে বলে,,,”আপি টিকটিকি।”
রুতবা হেসে বলে,,,”এত ভয়!”
আতিকা কিছু বলে না রুতবা আবারও বলে,,,”দানিশ কল করেছিল একটু আগে, আহিলের সাথে তার নাকি কথা হয়েছে। একটু পরে আসবে তোমাকে নিতে।”
আতিকা অসন্তুষ্ট কণ্ঠে বললো,,,”রুশা কে নিয়ে যাই আমার সাথে!”
“ও এখনো ব্রেস্ট মিল্ক খায়। আরেকটু বড় হোক তারপর তোমাদের কাছে দিয়ে আসবো ঠিক আছে!”
এরই মাঝে কলিংবেল বেজা ওঠে। আতিকা ভাবে আহিল এসেছে তাই খাটের মাঝে রুশাকে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে।। ঠিক কিছুক্ষণের মাঝেই আহিল রুমে প্রবেশ করে। ছোট্ট মেয়েটা আহিকে দেখে তার দুটো হাত বাড়িয়ে দেয় তার দিকে। আহিল ও মেয়েটাকে কোলে নিয়ে আদর করে বেশ খানিকক্ষণ। কোণা চোখে তাকায় আতিকার দিকে, দেখে মেয়েটার ছোট্ট মুখখানা। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ে ছেলেটা। কিছুক্ষণ পর রুশাকে রুতবা নিয়ে যায়,,, আহিল কে বলে বসতে সে নাস্তা তৈরি করছে সন্ধ্যার।
আহিল এগিয়ে আসে আতিকার দিকে। মেয়েটাকে সময় দেওয়া হয়না মোটেই। নাস্তা করেই যে বের হয় আসে বেশ রাত করে। মেয়েটা তার অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে যায়।। আহিল পাশে বসতেই আতিকা সরে যায়। খারাপ লাগে আহিল এর। অভিমান করেছে মেয়েটা।
“কথা বলবে না।”
“ব্যাস্ত মানুষ দের বিরক্ত করতে নেই।”
আতিকা উঠে যেতে নিলেই আহিল আটকায়। নিজের কাছে নিয়ে আসে। চোখ যায় বুকের দিকে,,,খামচির স্থানে। আঙ্গুল দ্বারা সেথায় স্পর্শ করতেই চোখ খিচে নেয় আতিকা। আহিল বোঝে এটা কার কাজ। মাথা নামিয়ে গাঢ় চুমু দিতেই আতিকা কেপে উঠে। এবার ঠোঁটের কাছে ঠোঁট আনতেই আতিকা বলে ওঠে,,,
“বাড়ি যাবো। চলুন।”
“এড়িয়ে যাচ্ছো।”
“আপনাকে এড়িয়ে যাই কি করে? আপনার বাড়ি থাকি, খাই আপনাকে কি এড়িয়ে যেতে পারি! শুধু বলছি বাড়ি যাবো। তারপর আপনার যা ইচ্ছা করবেন।”
“এভাবে বলছো কেনো আতু?”
“খারাপ লাগল? দুঃখিত। স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে নেই। দাড়ান, রুতবা আপিকে বলে আসি আমাদের কিছুক্ষন ডিস্টার্ব না করতে।”
“আতিকা!”
“আপনি বসুন আমি আপির কাছ থেকে একটা বিছানার চাদর নিয়ে আসছি এটা নোংরা হলে ওটা পেতে দেব। আর আপনি তো ভীষণ সেফটি মেন্টেইন করেন। এখন হবে কিনা আমি জানিনা। দাঁড়ান আমি আসছি।”
আহিল থ মেরে রয় আতিকার কথা শুনে। সেই লাজুক লজ্জাবতী মেয়েটা কোথায় গেলো? লজ্জা পায় আহিল নিজেই।। আতিকার শান্ত ,শীতল কন্ঠ। হয়তো অভিমান বেশি হয়ে গেলে অভিযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আতিকা কথাটি বলেই যেতে নিলে আহিল থামায়। অবাক হয়ে ধমকায়,,,
“কি করছো কি!”
“আপনিই তো এখন,,,,,,*”
“চুপ,,,পাগল হলে! আমি কি তোমার সাথে সব সময় ইন্টিমেট হওয়ার কথা বলি? আমি জাস্ট একটা কিস করতে চাইছিলাম।”
“ওহ”
আতিকার ছোট জবাবে আহিল আহত হয়। আহিল মেয়েটার গালে হাত রাখে। কপালে চুমু এঁকে,নিজের কপাল ঠেকায়। ভারিক্কি নিঃশ্বাস ফেলে বলে,,,”অভিযোগ করো আতু, বলো আমায় তোমার মনের রাগ। কথা বলো প্লিজ।এরকম আচরন কোরো না জান।”
আতিকা এবার ছল ছল দৃষ্টি মেলে তাকায় আহিল এর পানে। মুহূর্তে যেতেই আহিল হতে নিজেকে সরিয়ে আনে,,,কম্পন যুক্ত ক্রন্দনরত স্বরে সুধায়,,,
“কি বলবো আপনেকে! আপনার কি সেই সময় আছে? মনে করুন তো শেষ কবে এক সাথে বোসে রাতের ডিনার করেছি? শেষ কবে আপনাকে আরামে জড়িয়ে ধরেছি? আপনার তো আমার দিকে এক পলক তাকানোর ও সময় নেই।। এত ব্যস্ততার মাঝে একটাই জিনিস আপনার দ্বারা হয়েছে, সেটা হল ক্লান্ত হয়ে গভীর রাতে আমাকে টেনে নেওয়া আর আমিও নির্দ্বিতায় আপনার কাছে নিজেকে দিয়ে দিতাম।। রাতের অন্ধকারে নিজের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে আপনি সকাল হতেই চলে যেতেন। আর কি শুনবেন আপনি?”
আহিল স্তব্ধ হয়ে রয়। আতিকার এক একটা কথা তার হৃদয় খানখান করেছে। অবহেলায় তার বউ! এত অবহেলা করতে পারলো আহিল? হ্যাঁ পেরেছে বলেই তো তাদের মাঝে এই দূরত্ব। আহিল আতিকার দুই হাত ধরে মাথা নিচু করে বলতে আরম্ভ করে,,,
“আই এম সো সরি, আমায় মাফ করে দাও আতু। এত ব্যাস্ততার মাঝে আমি যেনো সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছিলাম। মাফ করো জান।এত অভিমান করে থেকো না। প্লিজ”
আতিকার চোখের পানি মুছিয়ে দেয় আহিল। চোখের পাতায় চুমু দিয়ে বলে,,,”আর কেঁদো না। এত অবহেলায় রাখার জন্য অনেক সরি।”
“——————–”
“কথা বলো জান।”
“সরি একটা শর্তে এক্সসেপ্ট হবে”
“সব মানবো।”
“প্রমিজ!?”
“পাক্কা প্রমিজ।”
“একটা বেবি এনে দিন।”
“কোথায় পাবো?”
আহিল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আতিকার দিকে।
ছেলেটার প্রশ্নে আতিকা লজ্জা পায়। কোনো রকম নিজেকে সামলায়। আহিল এর হাত টেনে নিজের পেটের উপর রেখে ইশারা করতেই আহিল রুদ্ধ শ্বাস ছাড়ে।
“এখন না,,,ঠিক সময়ে”
“আপনি প্রমিজ করছেন।”
আহিল বোঝে,আবেগের বশে প্রমিজ তো করে ফেলেছে সে,,এখন আতিকা সেটা আদায় করেই দম নেবে। আহিল আলতো হেসে আতিকার কোমর টেনে ধরে। কানে ফিসফিসিয়ে বলে,,,
“ইটস এ লং প্রোসেশ। তার জন্য আমাদের আগে বাড়ি যেতে হবে।”
আতিকার কান গরম হয়ে আসে। লাজে রাঙা হয়ে মুখ লুকায় স্বামীর প্রশস্থ বুকে।
ঘড়িতে সময় আটটার কাছা কাছি। ইয়ানা কে কিছু মুহূর্ত আগেই দেখে গেছে আতিকা আর আহিল। সময়টা বেশ কেটেছে ইয়ানা আর রিফাত এর। আযান এর আওয়াজ শুনতেই ইয়ানা ওয়াশরুম যাবে বলে উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করে। বিশাল পেট নিয়ে উঠতে বসতে অসুবিধীর সম্মুখীন হয় ইয়ানা। কিন্তু সেই অসুবিধে কখনো বুঝতে দেয়না রিফাত।। ফোনের বর্তালাভ সেরে রুমে প্রবেশ করে দেখে ইয়ানা বিছানা ছেড়ে দাঁড়াতে চাইছে। রিফাত দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সাহায্য করে। ইয়ানা বলে,,,
“আমি পারবো তো যেতে।”
“হ্যাঁ সেটা তো আমি দেখাতেই পাচ্ছি।”
ইয়ানা কে ওয়াশরুম রেখে বেরিয়ে আসতে আসতে বলে,,,”খুলে রাখো,,, সিটকানি দেবে না। আমি খাবারের প্লেট নিচে রেখে আসছি এখনই।”
ইয়ানা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। সময় নিয়ে ফ্রেশ হয় ইয়ানা। ওযু শেষে বেরিয়ে এসে চিয়ারে বসে। নিচে বসে নামাজ আদায় করতে তার কষ্ট হয় । রিফাত নিজেও রুমে এসে এক পলক ইয়ানা কে দেখেই টুপি নিয়ে চলে যায় মসজিদের উদ্দেশে।
ইয়ানা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করছে। সে আর আগের ইয়ানা নেই। যথেষ্ট শরীরের উন্নতি হয়েছে। গাল কেমন ফুলে আছে তার। গোলুমোলু হয়েছে অনেক। রিফাত ওরেঞ্জ জুসের গ্লাস নিয়ে রুমে প্রবেশ করেই দেখতে পায় তার অর্ধাঙ্গিনী কে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় গলার কিনারে। ইয়ানা শিউরে ওঠে। রিফাত এর হাতের উপর হাত রেখে মাথা এলিয়ে দেয় বুকে।
“আমাদের একটা ছেলে হলে কেমন হয় রিফাত?”
“ভালই হবে কিন্তু আল্লাহ যা দেবেন তাতেই আমি খুশি।”
“আমি আগের তুলনায় মোটা হয়ে গেছি তাই না!”
“প্রেগনেন্সিতে এরকম শারিরীক পরিবর্তন সাভাবিক ইনু।”
“আপনি আর আমাকে ভালোবাসেন না তাই না।”
“তুমি আমার গোপন সুখ ইয়ানা। তোমায় ভালোবাসা আমার আসক্তি।”
ইয়ানা এবার ঘুরে দাঁড়ায়। রিফাত এর চোখে চোখ রেখে বলে,,,”আমার কিছু হয়ে গেলে বাবু কে দেখবেন। আর আমি ব্যতীত অন্যকাউকে ভালোবাসা হারাম করলাম আপনার জন্য।”
রিফাত ইয়ানা কে দূরে সরায়। চোখ মুখে কাঠিন্য ভাব ফুটে ওঠে রিফাত এর। ইয়ানা কে হাজার বার বারণ করেছে এরকম কথা বলতে,,, তাও মেয়েটা একই কাজ করে। রিফাত এর বুক পুড়ে যায় মেয়েটা কি তাহ বোঝে? রক্তিম হয় রিফাত এর চোখ। জুসের গ্লাস ইয়ানার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,,,
“শেষ করো।”
“আমি খাবো না।”
“মেজাজ খারাপ করেছো,,, রাগ ওঠার আগে শেষ করো।”
ইয়ানা জুস রেখে এগিয়ে এলো রিফাত এর দিকে। নিজ দায়িত্বে রিফাত এর শার্টের সামনের দুইটো বোতাম খুলে ফেললো। রিফাত দেখলো কিছু বলল না। অতঃপর,শার্ট সরিয়ে নিজের ধরলো দাঁতের সূচালো কামড় বসালো সেথায়। রিফাত চোখ বন্ধ করে উফ বলে উঠলো। কিন্তু সরিয়ে দিলো না ইয়ানা কে। ইয়ানা ক্ষান্ত হতেই নিজেই সরে এলো। নিজেই ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,,,
“কামড় দিলাম কেনো?”
রিফাত রুদ্ধ শ্বাস ছেড়ে বললো,,,”কারণ আমি পাগল।”
“ব্যাথা করে??”
“না না,,আরাম লাগছে ভীষন।”
ইয়ানা দাঁত কেলিয়ে হাসে। নিজে থেকেই জুস শেষ করে রিফাত এর হাত টেনে বলে,,,” বুকের ধুক ধুক শব্দ শোনার মেশিন বের করুন। বাবুর হৃদস্পন্দন শুনবো।”
অজ্ঞতা তাই করলো রিফাত। মাস চারেক আগে থেকেই ইয়ানা আর রিফাত এর অভ্যেসে পরিণত হয়েছে তাদের অনাগত সন্তানের হৃদস্পন্দন শোনার। সেই মৃদু ধুকপুকানি কর্ণ গ্রন্থিতে আঘাত করতেই রিফাত এর শরীর হিমশীতল হয়ে যায়। তারও হৃদয় ছলাৎ করে ওঠে পিতৃ অনুভূতিতে।
রাতের খাবার শেষে রিফাত প্লেট নিচে রাখতে যায়। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হয় ইব্রাহিম সাহেব এবং আফতাব মিয়ার সাথে কথপোকথনে।
এদিকে ইয়ানা ধীর গতিতে হেঁটে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। ফ্রেশ হওয়া উচিত। কেনো জানি তার শরীর সকাল থেকেই খারাপ লাগছে। কেমন অস্থির অস্থির অনুভব হচ্ছে তার। পেটের নিচটায় চিন চিন ব্যাথা করছে। মাঝেমধ্যেই তা বাড়ছে কিন্তু এই সমস্ত কিছু সে কাউকেই বলেনি। এই ছোটো খাটো বিষয় নিয়ে সে কাউকেই উত্তেজনায় ফেলতে চায় না। এমনিতেই সবাই অনেক চিন্তায় থাকে তাকে নিয়ে। তাইতো দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ঘুমাবে সে। রিফাত এর বুকে লোম্বা একটা ঘুম দেওয়ার পরিকল্পনা তার। কিন্তু এই পরিকল্পনা, কল্পনাই রয়ে যায়।
হঠাৎ পেটের তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো ইয়ানা। নিশ্বাসের গতি তিরতির করে বাড়ছে। শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে যেনো। পেটের নিচটায় ব্যাথায় ছেড়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ ইয়ানার শরীরের হাড় গুলো এক এক করে ভাঙছে। তবে কি এটাই সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত! ইয়ানা কেঁদে উঠলো হু হু করে। কোনো রকম কোমোড – এ পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়লো মেঝেতে। এতক্ষণে ওয়াশরুমের মেঝে রক্তে রঞ্জিত। দুই পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তিম তরল। চেঁচিয়ে উঠলো ইয়ানা। বুকের ওঠা নামা অস্বাভাবিক। কিন্তু তার সেই স্বর এতই চিকন যে তাহ শুধু রয়ে গেলো চার দেওয়ালের মাঝেই। পেটে হাত রেখেই ইয়ানা “মা গো ” বলে চিৎকার দিতেই হাঁপিয়ে উঠলো।গাল হা করে নিশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলো কোনো রকম। কি মনে করে দ্রুত হাতে পাজামা খুলে ফেললো। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এই কঠিন মুহূর্তে সে একা। একদম একা। ইয়ানা অনুভব করলো কিছু। শরীর অস্বাভাবিক কাপছে তার। লোমকূপ সজাগ হলো। বুজে আসা চোখ টেনে টুনে
খোলে। বির বির আওড়ায়,,,,
“ও আসছে,,, ও আসছে”
রিফাত রুমে প্রবেশ করা মাত্র তার হৃদয় ব্যাকুল হয় আচানক। ইয়ানা অস্তিস্থ খুজতে এদিক ওদিক চোখ বুলাতে কানে আসে কারোর গোঙরানির শব্দ। ধক করে উঠল তার অন্তরস্থল। ওয়াশরুমের দরোজায় সজোরে ধাক্কা দিতেই তাহ খুলে গেলো।
সামনে তাকাতেই তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। ঝিম ধোরে গেলো গেলো মাথা। বুকের বাম পাশটায় যেনো কেউ খামচে ধরলো। রক্তে রঞ্জিত মেঝে দেখেই রিফাত এর অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। সে যেনো ভুলেই বসলো সে একজন ডাক্তার। শাসনালী তে কেউ যেনো কাটা গেঁথে দিয়েছে। ঝাপসা চোখে প্রিয়তমার দিকে তাকাতেই হুস হারায় যেনো রিফাত,,,চিৎকার করে বলে,,,
এক প্রণয় রাত্রি পর্ব ৪৫
“আমার ইয়ানা।”
তারপর সব শান্ত। একদম নীরব। ঠিক যেনো প্রবল ঝড় আসার আগে পরিবেশের নীরবতা। কিছু গল্পের সম্মতি হয়না। রিফাত এর ভয় কি আজ বাস্তবে রূপ নিলো! জানা নেই। মেয়েটা তার প্রাণ,তবেকি আজ তার প্রাণ নাশ হলো?
