Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৬৭

যাত্রাপথ পর্ব ৬৭

যাত্রাপথ পর্ব ৬৭
মাশফিত্রা মিমুই

শ্রাবণের বৃষ্টিমুখর দিন। উত্তর পাড়ার জমিতে টিন দিয়ে চারিদিকে বেড়া দেওয়া হচ্ছে। গতকাল সকালে কাজ শুরু হয়েছিল। ইতোমধ্যে অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে। ধারণা করা যায়, বাকি কাজ আজকের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ আগেই ঘাটে বালু ভর্তি লঞ্চ এসে থেমেছে। শ্রমিকরা মাথায় পাতি ভরে বালু এনে রাখছে খালি জমিতে। রড, সিমেন্ট গত রাতে আনা হয়ে গেছে। সামাদ মিয়ার আবার বড়ো কারবারিদের সঙ্গে উঠাবসা। নাজির নতুন ঘর তুলে পৈতৃক ভিটে থেকে আলাদা হয়ে যাবে শুনেই লোকটা মহাখুশি। ইট আসবে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে।
নাজিরের অনেক তাড়া। পারলে যেন আজই নতুন বাড়ি তুলে ও বাড়ি ছেড়ে দেয়। কিন্তু তা কী আর এত সহজ? তবুও যত দ্রুত করা যায়। অভিশপ্ত বাড়ি আর মানুষগুলোর থেকে যে করে হোক সরে আসতে হবে, অভিমানী স্ত্রীকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে হবে। অনাগত সন্তানকে একটা সুন্দর পরিবার দিতে হবে।

বৃষ্টির পানিতে মাটির ঘরের সদ্য তোলা দেয়াল ভিজে বেহাল অবস্থা। মিল্টন সকালে এসে নীল পলিথিনে ঢেকে দিয়ে গেছে। আপাতত কয়েকদিন কাজ বন্ধ। এই ধরণের বাড়ি হাতে অনেক সময় নিয়ে করতে হয়। বিশেষ করে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, চৈত্রে করলে ভালো হয়। মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়।
মিষ্টি কুমড়ার গাছটা গোড়া থেকে তুলে ফেলা হয়েছে। মর্জিনার তা নিয়ে আফসোসের শেষ নেই। তাঁর খুব পছন্দের সবজি হওয়ায় প্রতি বছর মিষ্টি কুমড়ার চাষ করেন মুমিনুল শাহ। তা নিয়ে নাজিরের সাথে সকালে ঝগড়া হয়েছে। শাড়ি কোমরে গুঁজে কিছুক্ষণ চিৎকার করলেন,“গোলামের পুত, আমার লাউ ক্ষেত নষ্ট করলি ক্যান? সবে কুঁড়ি ধরছিল। পরশু বিহালেও গিয়া কলসি ভইরা পানি দিয়া আইছি। মনে এত রং লাগছে কইত্তে? এই ঘর দিয়া হয় না?”
নাজিরও কম যায় না। পাল্টা জবাব দিলো,“আমনে গো মুখ দেখতে আর ইচ্ছা করে না। তাই একেবারে আলাদা হইয়া যামু।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“এতদিন তো ঠিকই দেখছোস। তহন এই ইচ্ছা কই আছিলো? নিমকহারাম।”
“এতদিন তো আর আমনেগো আসল রূপ দেহি নাই। এহন দেখছি, তাই এহন যামু গা। নিমকহারাম কারে কন? কী নিমকহারামি করছি আমনেগো লগে?”
“আবার মুখে মুখে চোপা! খাওয়াইয়া, পড়াইয়া এর লাইগা বড়ো করছি?”
“এমনি এমনি কেউ কাউরে খাওয়ায়? কয়দিনই বা কেডায় খাওয়াইছে, দায়িত্ব লইছে? নিজের পেট তো নিজেরেই চালাইতে হইছে। মুখ খুলাইয়েন না, চাচী। নিজেরে এত চালাক মনে করেন অথচ জামাইয়ের কুকীর্তি তো কিছুই জানেন না। জানেন না, নাকি না জানার ভান ধইরা থাকেন? ফরিদা বানুর মতন ভালা মানুষ সাজেন?”
“কীয়ের কুকীর্তি? কী না জানার ভান ধইরা থাকি? একদম বড়ো জনের লগে তুলনা দিবি না।”
“এই যে আমার আম্মায় পলায় নাই, আমনের ভাসুর, জা, জামাইরা মিল্যা খুন করছে। আমনের শ্বশুররেও হেরাই খুন করছে। জানেন না কিচ্ছু? এও বিশ্বাস করমু? সব কয়ডা একরকম। মাঝখান থাইক্যা শুধু আমি ঠইক্যা গেলাম। এইগুলারেই নাকি মায়ের স্থানে বসাইছিলাম।”

রাগের মাথায় কিছু না ভেবেই যা তা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো নাজির। মর্জিনা ওখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলেন। বারান্দায় বসা ফরিদা ছুটে এসে দাঁড়ালেন উঠোনে। তাঁর সন্দেহই তবে ঠিক। নাজির সব জানে। মর্জিনা জায়ের উদ্দেশ্যে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“ওয় কী কইয়া গেলো, বুবু? কী কইলো এইসব?”
ফরিদার এখন আর ভয় নেই, হারানোর কিছু নেই। নিঃশ্বাস ছাড়া সব হারিয়ে বসেছেন তিনি। তাই মুখ ফিরিয়ে নিলেন। গাছাড়া ভাব নিয়ে বললেন,“যেই জামাই লইয়া এত বছর তোর গর্ব আছিলো তারে গিয়া জিগা।”

হতভম্ব মর্জিনার মনে হলো ফজরের নামাজ আদায় করতে পারেননি বলেই হয়তো আজকের দিনটা খারাপ। এতদিনের বিশ্বাসে খোদাই করা পাথরে যেন ফাটল ধরেছে। তবুও মন মানে না।‌ এত নিখুঁত অভিনয় মুমিনুল শাহর পক্ষে করা সম্ভব নয়। নাজিরের মতো বদমেজাজি, ঘাড়ত্যাড়া ছেলের কথা বিশ্বাস করার মানেই হয় না। একসঙ্গে, এক বিছানায় কয়েক যুগ কাটিয়ে দেওয়া স্বামীকে তিনি চিনবেন না এমনও কী হয়?
দুপুরের শেষ প্রহরে রোদ উঠেছে। কাজকর্ম তদারকি করতে গিয়ে শ্বশুরের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। কাশেম আলী দুই হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে দেখছেন সব। তাকে সালাম দিয়ে পাশে দাঁড়ালো নাজির। জিজ্ঞেস করল,“খবর কী?”

“আল্লাহর রহমতে ভালাই।”
“আমার বউ কেমন আছে?”
“ওইতো বাড়ি দেহা যায়। গিয়া দেইখা আয়।”
“গেলেই আওয়ার লাইগা বায়না ধরবো।”
“ধরবো না, আমি বুঝাইছি।”
“ওইখানে থাকার কথা কইবো।”
“আমিও‌ এইডাই কই। হেইদিন ভাইজানও কইলো।”
নিরুত্তর রইল নাজির। কাশেম আলী পুনরায় নরম স্বরে বললেন,“কই থাহোস, কী খাস না খাস খবর নাই। আমগো বাড়ি কী কম বড়ো? কয়ডা দিন থাকলে কী হইবো? বাড়ি করতেও তো অনেক সময় লাগবো।”

“যহন আমনেরা আছিলেন না তহন থাকি, খাই নাই?”
“তহন আর এহনের পরিস্থিতি এক? বুইঝাও অবুঝের লাহান করলে মেজাজ খারাপ হইয়া যায়।”
“আমগো বংশের কেউ শ্বশুরবাড়ি থাহে না।”
“হ, তুমগো বংশের মাইনষেরা খালি রাইত বিরাইতে খুন করে।”
“আর শ্বশুর, হালারা সেই লাশ গুম করতে সাহায্য করে। বউরা সাক্ষী থাকে।”
কাশেম আলীর চোয়াল ঝুলে পড়ার মতো অবস্থা। পায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,“জুতা খুলমু?”
“মানহানির মামলা করমু।”
“বেয়াদব।”
“আমনেগো ঘরের কাম কতদূর?”
“প্লাস্টার করতাছে। ইট, বালু হেই কবে আনছি কিন্তু কাম ধরতে ধরতে দেরি হইয়া গেলো।”
“হেরপরেও তাড়াতাড়িই হইছে।”
“তা হইছে, ছাদ দেই নাই যে। তুই তো আবার ছাদ দিবি।”
“হ।”

“নওশাদের কী খবর? ট্যাহা পয়সা পাডায়?”
“যা পাঠাইছে তা দিয়া ওর বিদেশ যাওয়ার ঋণ শোধ করছি। কইয়া দিছি, পরের মাস থাইক্যা শুধু বউয়ের খরচ পাঠাবি।”
“তুই কী ওর পিছনে কম খরচ করছোস? লেখাপড়া করাইলি, থাকা খাওয়া থাইক্যা শুরু কইরা সংসারডা পর্যন্ত তোর পয়সায় চলছে। হেইডা শোধ করবো কেডা? ওর কোনো দায়িত্ব নাই?”
“ওইগুলা বাদ দিয়া দিছি। যহনি ট্যাহা পয়সার সমস্যা দেহা দিছে ওর ভাগের জমি বন্ধক রাখছি, চাষবাস করছি। এত হিসাব রাখলে হইবো? জীবনে যাতে কেউ কইতে না পারে, নাজির আমার পয়সায় চলছে। এতটুকু বড়াই করতে চাই।”
“এই বাড়ির খরচ?”
“আমারই, আল্লাহর নাম নিয়া কামে নাইম্মা পড়ছি। যা জমানো আছিলো তাই ভাঙতাছি। ওরে কইয়া দিছি, নিজের ব্যবস্থা কইরাই দেশে আইবি। আমি আর আগে পরে নাই।”
কাশেম আলী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই ছেলে কখনো অন্যের কাছে নত হওয়ার নয়। জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যবসার ভাগটা আর পাইবি না?”

“ওই ব্যবসা পানিত ভাইসা যাক। হেগো মাঝেই এহন ঝামেলা চলতাছে। আমি আমারটা লইয়া ব্যস্ত।”
আরো কিছুক্ষণ তাদের মধ্যে কথাবার্তা চললো। নাজির একসময় তাড়া দেখিয়ে বললো,“আইচ্ছা যাইগা, গোসল কইরা একটু হাটে যাইতে হইবো। আমনের মাইয়ারে কানতে নিষেধ কইরেন। রাইতে আইমু।”
কাশেম আলী বেজায় খুশি হলেন। বাবা বেঁচে থাকতে দুই ভাই নতুন ঘর তৈরির চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন। তা প্রায় শেষের দিকে। এখন শুধু মেয়েটাকে নিয়ে যা চিন্তা। ছেলেদের তো একটা গতি করে দিয়েছেন। বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই ছোটো ছেলের বিয়ে দেবেন ভেবেছেন। এবার মেয়ের সংসারটা গোছানো শেষ হলেই শান্তি।
গোসল সেরে বারান্দার সিঁড়িতে বসে আছে মিছরি। পারুল ভাতের থালা আর পানির গ্লাস নিয়ে বসলেন সামনে। ভাত মাখিয়ে বললেন,“আইজ দেশী মুরগির গোশ রানছি। চুপ কইরা খাইয়া লইবি।”
নাখরা না করে হা করল মিছরি। আজকাল তার মধ্যে মাতৃত্ব জেগে উঠেছে। সন্তানের জন্য সব অনিয়ম বাদ দিয়েছে। এক লোকমা খেয়েই নাকমুখ কুঁচকে অভিযোগ জানালো,“ঝাল হয়নি।”

“ঝাল খাওয়া আবার শুরু করলি কবেত্তে?”
“বিয়ের পর থেকে। উনি ঝাল ছাড়া খেতে পারেন না। তাই আমারও এখন ভালো লাগে।”
“হ, উনিই মাথাডা খাইছে। খালি জামাই জামাই করে। কী অবস্থা হইছে আমার মাইয়াডার!”
“তুমি যখন আব্বার বকা খেয়েও করো? তার বেলা কিছু না?”
পারুল চোখ রাঙিয়ে মেয়েকে খাওয়াতে লাগলেন। খাওয়ানো‌ শেষে এঁটো থালা নিয়ে চলে গেলেন কলপাড়। কিছুক্ষণ পর কোথা থেকে যেন মাসুম এসে উপস্থিত হলো সেখানে। হাতে গাছপাকা পেয়ারা। বোনের সামনে ঝুলিয়ে বললো,“হরবি ভর্তা খাবি?”

“মাত্র ভাত খেয়েছি। রেখে দাও, বিকেলে খাবো।”
“তাইলে এনে বইয়া রইছোস ক্যান? ঘরে গিয়া ঘুমা। সারাক্ষণ দেহি বইয়া থাহে।”
“চুকা পাতা ভর্তা খাবো।”
“এহন না ভাত খাইলি?”
“রাতে খাবো।”
“আইচ্ছা, কালু গো ক্ষেত থাইক্যা আইনা দিমু না হয়। চাচী ভর্তা করবো। আর কিছু?”
“না।”
“আওয়ার সময় আব্বার লগে দেখা হইছে। কইলো, তোর জামাই রাইতে আইবো। যা ঘুমা এহন।”
চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো মিছরির। উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“সত্যি?”
“হ, বেয়াদবটারে একদম ভাউ দিবি না। আইলে কাইজ্জা লাগবি। কত্ত বড়ো সাহস আমার বোইনরে দুঃখ দেয়!”
মিছরি মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। ঘরের দিকে যেতে যেতে চেঁচিয়ে ডাকলো,“শালিক আপা! বেঁচে আছিস নাকি ঘুমিয়ে গেছিস?”

ধরণীতে রাতের অন্ধকার নেমেছে। আকাশে তারার মেলা আর আধ খাওয়া একটি চাঁদ। প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা সেরে থলে হাতে হাট থেকে বাড়ির পথে যাচ্ছে নাজির। অবশ্য নিজের বাড়ি নয়। আজ তার গন্তব্য শ্বশুরবাড়ি। বহুদিন পর তার চলতি পথের সঙ্গী হয়েছে বুস নামের কুকুরটি। লেজ নাড়িয়ে পাশাপাশি হাঁটছে। ওই পাড়ার মেয়ে কুকুরের সাথে এতদিন প্রেমে মজেছিল বুস। তাই দিন দুনিয়া ভুলে সেখানেই রাতদিন পড়ে থাকতো। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে নারী কুকুরটি তাকে ধোঁকা দিয়ে সন্ধি বেঁধেছে ঘরহীন কালো কুকুরটির সঙ্গে। তা নিয়ে বেচারা বুসের দুঃখের অন্ত নেই। নাজির হাঁটতে হাঁটতে সান্ত্বনা দিয়ে বললো,“থাক, মন খারাপ করিস না। মাইয়া মানু ভালা না রে, বুস। ভালা না। দুনিয়াত যেই রূপে থাকুক না ক্যান। বিয়া করাও ভুল, না করাও ভুল। তুই তো তাও পিরিত করছোস।”
বুস কী বুঝলো কে জানে? ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। নাজির মাথা নাড়ালো,“ঠিক কইছোস। জীবনে যা গো শত্রু মানছি, যা গো বাড়ির পোলাগো হুমকি ধামকি দিছি, খেলার মাঠে পিডাইছি এহন তাগো বাড়িতই যাইতাছি। এই দুঃখ কই রাখমু আমি?”

হাট থেকে বেরোনোর অভিমুখে তার ধানের মিল। এই রাতেরবেলা সেখানে আলো জ্বলতে দেখে পথ বদল করল নাজির। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখতে পেলো কেদারায় বসে থাকা মুমিনুল শাহকে। বসে চা খাচ্ছে আর খোশগল্প করছে। মিল্টন সামনে দাঁড়ানো। তাকে কিছুটা ধমকের সুরে নাজির বললো,“এইডা কী চা পানের দোকান? তোরে কহন কইছিলাম দোকান বন্ধ কইরা বাড়িত যাইতে?”
মিল্টনের হাস্যোজ্জ্বল মুখখানায় আঁধার নেমে এলো। আমতা আমতা করে কিছু বলতে যেতেই মুমিনুল শাহ থামিয়ে দিয়ে বললেন,“ওরে বকিস না, বাপ। ওয় সব গোছগাছ কইরা যাইতাছিল গা। আমারে দেইখা আর পারে নাই। কই গেছিলি তুই? বাজারে করতে নাকি? তোর ছুডো চাচী পাঠাইছে? সকালে নাকি কাইজ্জা করছোস?”
নাজির উত্তর দিলো না। থলেটা মেঝেতে টেবিলের পাশে হেলান দিয়ে রাখলো। সকালের ঝগড়ার খবর তবে ব্যাটার কান পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। তার জন্যই নিশ্চয়ই এসেছে। বললো,“শ্বশুরবাড়ি যামু।”

“তোর বউয়ের জানি কয় মাস চলে? হুদাই এত জলদি বাপের বাড়ি পাঠাইয়া দিছোস।”
“হঠাৎ এনে আইলেন যে?”
“আইলাম আরকি।” কাপে অর্ধেক চা রেখে উঠে গেলেন তিনি। দোকান থেকে বেরিয়ে ছোটো কদমে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,“ভাইজানের মরণের পর সামিউলডা বেশি উজাইয়া গেছে। চাচাও মানে না, ভাইও মানে না। ব্যবসা বাণিজ্য লইয়া কী যে চিন্তায় আছি! কেমনে আলাদা হমু ক তো?”
নাজির মিল্টনকে ইশারা দিলো,“ব্যাগ লইয়া তুই হাঁটা ধর। তালা ভালা কইরা লাগাইস। আমি কথা কইয়া আইতাছি।” তারপর নাজিরও চাচার পিছুপিছু হাঁটতে লাগলো। কটাক্ষের সুরে বললো,“বিষধর সাপের ঘরে তো সাপই হয়। রক্ত বইল্যা একটা কথা আছে না?”
“তোর রক্ত আলাদা?”
“বাপ তো আলাদা।”
“ভালা আর কই? শাহ বংশের সবই এক। আমার বাপই ক আর তোর বাপই ক।”
“আমনেগো দুই ভাইয়ের থাইক্যা বহু গুণে ভালা।”

দুর্বোধ্য হাসলেন মুমিনুল শাহ,“আমার বাপে আধা খুন কইরা সোনা গহনা লইয়া ভাগছিল। হের ঘরের পোলাপাইন আর কত ভালা হইবো? আকবর বুইড়ার বাপের হাতে পড়ছিল দেইখা এতকিছু কইরা খাইতে পারছে। আর তোর বাপ! থাউক, বেচারা মেলা শাস্তিই ভোগ করছে। মরা মানুষ লইয়া আর কী কমু?”
“নিজের কথা কইলেন না যে?”
“নিজের গুণগান নিজে গাইতে হুনছোস?”
“গুণগানই তো। বাপ, ভাই মারা কী কম ভালা কাজ? কয়জন পারে?”
“কেডায় বাপ মারছে? আমি?” পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালেন তিনি।
নাজির ভ্রু কুঁচকে নিলো,“অস্বীকার কইরেন না তো। মিছা কথা আর ভাল্লাগে না। সবাই জানে।”
“আমিই যে মারছি এইডা জানে?”
“মারেন নাই কইতাছেন?”
“মারার একটা কারণ দেহা।”
“সম্পত্তি।”

শব্দ করে হেসে উঠলেন মুমিনুল শাহ। জনমানবশূন্য অন্ধকার রাস্তায় বড়োই বিদঘুটে শোনালো সেই হাসি। বললেন,“এহন বুঝি সম্পদে গড়াগড়ি খাইতাছি? ভাই আমরা তিনজন আছিলাম। এহন যেমন দুই ভাগ হইছে, তহন হইতো তিনভাগ। তাতে কী কম পড়তো? মানলাম বিয়ার আগে আমি খারাপ আছিলাম, বড়ো ভাইজানের সঙ্গ পাইয়া আকাইম্মাগিরি করতাম, জুয়া খেলতাম, এর ওর ছাগল চুরি করতাম, আব্বার ঘরে চুরি করতাম। কিন্তু বিয়ার পর আমি ঠিকই নিজেরে বদলাইয়া নিছিলাম। তোর চাচীরে পাওয়ার লাইগা যে কতকিছু করছি তা আমার বাপ আর আমার শ্বশুরই জানে। মাসের পর মাস তাবলিগে পইড়া রইছি। এই পরিবর্তন দেইখাই আমার উপরে আব্বার সব রাগ সন্তুষ্টিতে রূপ নিলো। কথাও দিছিলো, সম্পদের ভাগ সমান সমান দিবো। তাইলে সেই বাপরে মারমু ক্যান? অমানুষ লাগে আমারে?”

“খুনী দুইজন আছিলো। একজন আমিরুল শাহ, আরেকজন আমনে না তো কেডা?”
“আমিই যে হেইডা কেমনে নিশ্চিত? সিরাজ উল্লাহ হইতে পারে না?”
নাজির চমকে তাকালো। এখানেও সিরাজ উল্লাহ? মুমিনুল শাহ আচমকাই মিইয়ে যান। কণ্ঠস্বর বদলে যায়। বলেন,“একসময় আমগোও সুখী, সুন্দর একটা পরিবার আছিলো। কোনো কিছুর অভাব আছিলো না। আমার আব্বা রাগী মানুষ হইলেও আমগোরে খুব ভালোবাসতেন। সমান সমান। কিন্তু পার্থক্য করতো আম্মায়। মেজো ভাইজান তো আব্বার ন্যাওটা, আমি হইলাম বড়ো ভাইজানের। আর তিনি আম্মার। আম্মা কহনো আমগো শাসন করে নাই, বিপথে যাইতাছি জাইনাও মারে নাই। আব্বার থাইক্যা সব দোষত্রুটি আড়াল রাখতো। ওই গালমন্দ করা পর্যন্তই। একটু পর আবার আদর কইরা খাওয়াইতো। অথচ আম্মায় যদি শুরুতেই একটু মারতো, বুঝাইতো তাইলে হয়তো এই দিন দেখা লাগতো না। বড়ো ভাইজান বউ লইয়া বাড়ি আওয়ার পর আম্মার কথায় গইলা না গিয়া আব্বায় যদি তাগো তাড়াইয়া দিতো তাইলেও এইদিন দেখা লাগতো না। বাপ-মা সঠিক সময়ে যদি সন্তানের হাল না ধরে তাইলে সন্তান যাইবো কই?”

নাজির কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। মুমিনুল শাহ পুনরায় বলেন,“আমার জীবনে আর আফসোস নাই। এলাকার অনেক মানুষ আমগো হিংসা করতো। সেই হিংসা থাইক্যাই ভাইজানরে কুবুদ্ধি দিয়া নষ্ট করছে। আর বিয়ার পর নষ্ট করছে তার বউ আর শালায়। সিরাজ উল্লাহ তহন দিন আনে দিন খায়। বোইনের শ্বশুরবাড়ির সম্পদ দেইখা তার লোভ হইলো। দুই ভাই-বোইনে শলা পরামর্শ করল। লগে প্রতিশোধও কইতে পারোস। আমগো আব্বায় হেরে বাড়ি আইতে দিতো না, বড়ো ভাইজানরে আর আমারে ব্যবসার ভাগও দিতে চান নাই। আমার আবার ব্যবসার প্রতি তেমন লোভ আছিলো না। তোর চাচীরও না। কিন্তু তাগো লোভ হইলো। সেই লাভ থাইক্যাই দুইজনে মিল্যা আমার আব্বারে…

“নাটক কম করেন। সব জাইনাও সেই খুনির লগেই তো হাত মিলাইছিলেন। আমার মায়রে মারছেন।”
“আর তোর বাপ ভালা? নাকি জানতো না কিছু? হেরও লোভ কম আছিলো না। আমি বন্দর থাইক্যা ফেরার পথে বড়ো ভাইজান আর সিরাজ উল্লাহরে আইল ধইরা দৌড়াইতে দেখলাম। হাতে রক্তমাখা কাস্তে, দা। মুখ বান্ধা থাকুক, শরীর আর হাঁটাচলা তো চিনি। ডাকলাম, হুনলো না। হেরপর গেরামে ঢুকতে না ঢুকতেই হুনি আব্বার মরার খবর। আসল কাহিনী বুঝতে আর বাকি থাকলো না। হেই রাইতে আমার জ্বর আইলো। কিছুতেই সত্য মাইনা নিতে পারি না। চাইরদিনের দিন তোর বাপরে আড়ালে ডাকলাম। তারে ছাড়া আর কারে বিশ্বাস করমু? কাইন্দা কাইন্দা কইলাম,’মেজো ভাইজান, এই কাম বড়ো ভাইজান ছাড়া আর কেউর না। ভাইজানে হের শালারে লইয়া আমগো আব্বারে মাইরা লাইছে। আমি নিজ চোখে হেগো পলাইতে দেখছি।’ কথা হুইন্না থম মাইরা বইয়া রইল সে। আমার রক্ত তহন গরম, ভিতরে আগুন জ্বলতাছে। তোর বাপে সায় দিলে হেই মুহূর্তেই জানোয়ারটারে মাইরা ফেলাইতাম। কিন্তু হেয় কী কইলো জানোস?”

“আব্বায় জানতো?”
মুমিনুল শাহ শূন্যে তাকিয়ে রইলেন। উত্তর না পেয়ে অধৈর্য হয়ে নাজির জিজ্ঞেস করল,“সব জাইনা কী কইলো আব্বায়?”
“কইলো, যা হওয়ার হইয়া গেছে। পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আগে আমগো নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে হইবো। না হইলে ওরা সব দখল কইরা নিবো, মান সম্মান যাইবো। ভাবতে পারতাছোস, বাপ মরার কষ্ট থাইক্যা তহনো হের সম্পদের লোভ বেশি। এই যে মাস্টর বাড়ির বুইড়া যহন জেলে গেলো তহন তোর বাপ কই আছিলো? ক্যান আটকাইলো না?”

নাজিরের বিশ্বাস হলো না। চাচা নিশ্চিত সত্য মিথ্যে মিলিয়ে বলছে। বললো,“সব দোষ আমার বাপের। তাইলে আমনে কই আছিলেন? নিজে পুলিশের কাছে গিয়া নালিশ করেন নাই ক্যান? লোভ আমনের কম আছিলো? আমনে আমার মায়ের লাশ গুম করছেন, বাপের ওই অবস্থা করছেন। বাইশ বছর পরে মরুক আর আগে মরুক, খুনের লগে আমনেও জড়িত। এত কাল ধইরা নিজের বাপের খুনিগোই পা চাটছেন।”

“আমি নিরুপায় আছিলাম। নিজের জীবন বাঁচানো ফরজ। তোর চাচীর পেডে তহন শাহরিয়ার, নাজমুল একেবারে ছুডো। হেরে লইয়া থাকে বাপের বাড়িত। জানোস নিশ্চয়ই? আমি সেই রাইতে শ্বশুরবাড়ি থাইক্যা ফিরছি। আমি যে আইমু বাড়ির কেউ জানতো না। ভুল সময়েই মনে হয় আইয়া পড়ছিলাম। যহন আইছি ততক্ষণে তোর মায় আর দুনিয়াত নাই। ঢোকা মাত্র হুনি মোতালেব চাচা আর হের বউরে ফরিদা বানু তাঁর ভাইয়ের লগে মিল্যা হুমকি দিতাছে। হেরা আমারে দেইখা ফেলল। জান বাঁচানের লাইগা মাথায় যা আইছে তাই করছি। কথায় আছে না, নিজে বাঁচলে বাপের নাম? হেইদিন আমি ওই কাম না করলে তোর বাপের জায়গায় আইজ আমি থাকতাম। আর আমার বউ পোলাপাইন থাকতো তগো জায়গায়। নিজের জান বাঁচানো অপরাধ?”
“ভালা মানুষ সাইজেন না তো। চাইলে অনেক কিছুই করতে পারতেন। আশেপাশের মানুষ জড়ো করতে পারতেন। আসলে আমনে তাগো বাঁচাইতে চান নাই।”

“এতকিছু জানছোস কইত্তে, নাজির? তুই চালাক জানি কিন্তু এত চালাক হইবি বুঝতাম পারি নাই। এই যে এত বড়ো বড়ো কথা কইতাছোস, এহনো বাইচ্চা আছোস কেমনে? এই প্রশ্ন মাথায় আইয়ে নাই? যারা তোর বাপ-মা মারছে তারা কী তগো দুই ভাইরে মারতে পারতো না? ছুডো কালে কোনো হেডাম তোর আছিলো?”
নাজির নির্লিপ্ত ভঙিতে অন্ধকারে হাঁটতে লাগলো। মনে কোনো প্রশ্ন নেই, আকবর মিয়া আগেই সব জানিয়েছে তাকে। রাগে শরীর কাঁপছে। ইচ্ছে করছে লোকটাকে এখানেই মেরে দিতে। কথা বলতে বলতে কখন যে শুনশান জায়গায় চলে এসেছে খেয়াল নেই। শোনা যাচ্ছে ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ। এখান থেকে ঘাট কাছে।
মুমিনুল শাহ বললেন,“সম্মুখ শত্রু থাইক্যা বন্ধু রূপী শত্রু অনেক ভয়ংকর রে, নাজির। এত বছর বাপের খুনির লগে থাইক্যা বিশ্বস্ত এমনি এমনি হই নাই। হেইদিন পুলিশের হাতে ধরাইয়া দিয়া কী লাভ হইতো? প্রমাণ আছিলো কোনো? ঠিকই কয়দিন পর ছাড়া পাইয়া যাইতো। আমগো চরিত্রহীন চেয়ারম্যান হের পক্ষে আছিলো। ওরে আমি নিজ হাতে একটু একটু কইরা ধ্বংস করতে চাইছিলাম। তগোরে তো এর লাইগাই বাঁচাইয়া রাখছিলাম। কিন্তু জানোয়ারডা মইরা গেলো।”

“জন্ম, মৃত্যু, ভালা, মন্দ সব আল্লাহর হাতে। আমনে বাঁচানের কেডা?”
মুমিনুল শাহ হাসলেন,“তাও ঠিক, আমি বাঁচানের কেডা? তবে তোর মরণ মনে হয় আমার হাতেই লেখা আছে। বাইচ্চা আর কী করবি? কী কাম আছে তোর এই দুনিয়াতে? হুদাই আমার পিছন মারতাছোস। বুইড়া কালে আরো খারাপ বানাইতে চাস আমারে?”
লোকটা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গিয়েছে। নাজিরের হাতে আর সময় নেই। মিছরি বোধহয় তার অপেক্ষায় বসে আছে। জানোয়ারটাকে পরে দেখে নেবে। তার জন্য সুন্দর একটা পরিকল্পনা আর নির্দিষ্ট দিনক্ষণের প্রয়োজন। চুলে হাত বুলিয়ে বললো,“আকাম কুকাম কইরা মাথা খারাপ হইয়া গেছে নাকি? বাড়িত গিয়া বউরে জড়াইয়া ধইরা ঘুমান। এহনো অনেক কিছু সহ্য করা বাকি।”

যাওয়ার জন্য পিছু ফিরলো নাজির। কয়েক কদম এগোতেই আড়াল থেকে বেরিয়ে তার পথ রোধ করে দাঁড়ালো নাজমুল, শাহরিয়ার। নাজির আশ্চর্য হলো। ব্যাটা একেবারে ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে এসেছে? ধমক দিয়ে বললো,“এনে ক্যান তোরা? সামনে থাইক্যা সর। এমনিতেই মেজাজ ভালা না।”
মুমিনুল শাহ যেতে যেতে বললেন,“আইজ মনে হয় শ্বশুরবাড়ি যাইতে পারবি না। তোর বউরে সাদা শাড়ি আমিই না হয় কিন্না দিমু।”

“আমারে মাইরা কেডায় আমার বউরে সাদা শাড়ি পরাইবো? এই দুই গোলামের পুতে? এত সাহস হেগো? কী রে মারতে আইছোস নাকি মরতে?”
মুমিনুল শাহ অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন একসময়। নাজমুলের শরীর কাঁপছে, ভয়ে মুখমন্ডলে জমেছে ঘাম। শাহরিয়ারের চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন। পেছন থেকে দুজনেই বের করল কাস্তে আর কোঁচ। এদের সাহস দেখে রাগে কাঁপতে লাগলো নাজির। ওদের কী প্রাণের ভয় নেই? নাজির শাহ কে তা কী জানে না ওরা? কিছু বলার পূর্বেই তাদের ঠেলে সামিউল এসে দাঁড়ালো সামনে। আচমকাই হেসে উঠলো নাজির, “এর লাইগাই তো কই এই হারামজাদা দুইডা এত সাহস পাইলো কইত্তে? একজনের লাইগা তিনজন?”

সামিউল রামদা নিয়ে কাছে এসে দাঁড়ালো,“গরু জবাই করার সময় মানুষ একটু বেশিই লাগে।”
“তুমি বুঝি কুত্তা? না, কুত্তাও তুমগো থাইক্যা বিশ্বস্ত। একটা রুটি খাওয়াইলেও প্রতিদান দিতে জানে।”
রেগে গেলো সামিউল। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নাক বরাবর ঘুষি মারতে এলো। নাজির ধরে ফেলল সেই হাত। মুচড়ে দিয়ে বললো,“বাপের হেডমে চলা হাত আর কাস্তে চালানো হাতের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আগেও না চেষ্টা করছিলা, পারছিলা কী? এইসব তোমারে দিয়া হইবো না। ওই হারামজাদা, বাড়িত যা। ঝামেলা করার ইচ্ছা নাই। আরেকদিন আহিস।”

তাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো নাজির। এমনিতেও সে অস্ত্রহীন, জায়গাটা শুনশান, ফাঁকা। চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পাবে না। তাই এদের সঙ্গে একার পক্ষে তার পেরে ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু বেশিদূর সে যেতে পারলো না। আচমকা পেছন থেকে আক্রমণ হলো। মাথায় শক্ত কিছুর আঘাত লাগতেই চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেলো। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে হাত রেখে পিছু ফিরতেই নাজিরের পেটের বাম পাশে প্রথম কোপটা বসালো সামিউল।

গলগল করে সেখান থেকে রক্ত বেরিয়ে শার্ট ভিজে যেতে লাগলো। ক্ষত স্থানের পাশেই পরপর আরো একবার আঘাত লাগলো। এবার আঘাত করেছে শাহরিয়ার। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ আর্তনাদ বেরিয়ে এলো নাজিরের। সে আরো একবার টের পেলো, দিনশেষে রক্তই বেঈমানি করে। পৃথিবীতে কেউ কারো আপন নয়।
অস্ত্র দুটো একসঙ্গে বের করার সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল নাজিরের ভারী দেহ। শুকনো পাতায় ঝনঝন আওয়াজ হলো। ঠোঁটের কোণ দিয়েও গড়িয়ে পড়ল রক্ত। কম্পিত নাজমুলও এবার এগিয়ে এলো শেষ আঘাতের মাধ্যমে নাজির শাহর অস্তিত্ব পৃথিবী থেকে মিটিয়ে দিতে। এগিয়ে এলো বললে ভুল হবে। দুই ভাই জোর করে তাকে ঠেলে দিলো সামনে।

যাত্রাপথ পর্ব ৬৬

নাজিরের মনে হলো, বেঁচে থাকার থেকে মৃত্যু কঠিন। আজই হয়তো স্বার্থপর দুনিয়াতে তার শেষদিন। সে কথা রাখতে পারেনি। তার সন্তানকে সুন্দর একটা পৃথিবী, সুন্দর একটা পরিবার দিতে পারেনি। তার আর বাবা ডাক শোনা হবে না, প্রিয় সঙ্গিনী মিছরিকে আর বোধহয় কখনো জড়িয়ে ধরতে পারবে না। সে ব্যর্থ স্বামী, ব্যর্থ পিতা।
তবুও এই বিপদের দিনে, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে এসে মন থেকে আল্লাহকে ডেকে উঠলো নাজির। বাঁচার জন্য আকুতি করল। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল অশ্রু। আবছা চোখে ভাসলো বহুদূরে জ্বলতে থাকা এক খন্ড হলদে রং। এ রং নয়; আগুন। এদিকেই কী এগিয়ে আসছে? আর তাকিয়ে থাকতে পারল না নাজির। শেষ আঘাতের আগেই চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে গেলো।

যাত্রাপথ পর্ব ৬৮