Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৬৮

যাত্রাপথ পর্ব ৬৮

যাত্রাপথ পর্ব ৬৮
মাশফিত্রা মিমুই

নাজমুল লক্ষ্যপথে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালো। অন্ধকার ভেদ করে শাবল হাতে দৌড়ে আসছে এক যুবক। তার পেছনে আরো কিছু অবয়ব দেখা যাচ্ছে। কারো হাতে হারিকেন, কারো হাতে লাঠি। আগুনের বহ্নি শিখায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো যুবকের মুখ। সে আর কেউ নয়, মিল্টন। দূর থেকেই গর্জন দিয়ে বললো, “জানোয়ারের বাচ্চা, আমার ভাইজানের কিছু হইলে সবার লাশ পড়ব এইহানে।”

শাহরিয়ার বিস্ময়ে পিছিয়ে গেলো। বড়ো ভাইয়ের হাত টেনে ধরে বললো,“ওরা জানলো কেমনে?”
নাজমুল বিচিত্র এক ঘোরের মধ্যে বন্দি। কোনো কথা তার শ্রবণালীতে পৌঁছাচ্ছে না। বাপ, ভাইদের মগজ ধোলাইয়ের চক্করে কী যে করতে এসেছে নিজেই যেন বুঝতে পারছে না। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, কলের পুতুল। মিল্টন প্রায় তাদের কাছাকাছি চলে এসেছে। সংখ্যায় অধিক মানুষ দেখে পালানোর পথ খুঁজতে লাগলো শাহরিয়ার। বললো,“পালা, ভাই।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তারপর লুঙ্গি হাঁটু পর্যন্ত তুলে ঢালু পথে নিচের দিকে দৌড়ালো সে। নাজমুলের ধ্যান ভাঙলো। পরিস্থিতি আঁচ করে ছোটো ভাইয়ের পিছুপিছু সেও দৌড়ালো। সামিউল পালাতে পারলো না। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই মাসুম এসে তার ঘাড়টা চেপে ধরলো। তাদের সাথে সুজন, তালেব, মোখলেছও রয়েছে। তালেব দাঁতে দাঁত পিষে বললো,“কুত্তার বাচ্চাডা যাতে পলাইতে না পারে, মাসুম। বাড়িত নিয়া বাইন্ধা রাখ। ওর ব্যবস্থা পরে করতাছি। ভাই হইয়া ভাইয়ের পেডে অস্ত্র চালায় কেমনে? বিশ্বাসঘাতক!”
নিজেকে ছাড়ানোর অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো সামিউল। দুই হাত রক্তে মাখা। তেজ কমেনি এখনো। বিশ্রী গালি দিয়ে বললো,“ছাড় আমারে, ছাড়। দরদ উতলাইয়া পড়তাছে? ফল ভালা হইবো না কিন্তু! ছাড় কইতাছি।”
মাসুম সপাট ঘুষি মেরে দিলো তার নাক বরাবর। সুজনও এসে চেপে ধরলো দুই হাত। শাসিয়ে বললো, “অনেক ক্ষমতা দেখাইছোস। বাপ, চাচা ছাড়া তুমি আমগো বালডাও না। নিজের বিপদ নিজে ডাইকা আনছো। আইজ মজা বুঝবা।”

একপাশে শাবল ফেলে হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ল মিল্টন। কাঁদতে কাঁদতে কয়েকবার ডাকলো, “ভাইজান গো, কী হইছে আমনের? ওঠেন, ভাইজান। এই দেহেন আমরা আইয়া পড়ছি। আর কিচ্ছু হইবো না। এইটুকুতে আমনের কিছু হইতে পারে না। কত রক্ত পড়তাছে! আল্লাহ গো, রক্ষা করো।”
নাজিরের জ্ঞান নেই। শ্বাস চলছে, তবে ধীরে। চোখ দুটো আধ বোজা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে শুকনো মাটি।এভাবে কতক্ষণ বাঁচবে তারও ঠিক নেই। তালেব তাড়া দিয়ে বললো,“বেশি দেরি করা যাইবো না। ওরে হাসপাতালে নিতে হইবো। ক্যান এই বিশ্বাসঘাতক গো লগে একলা একলা এতদূর আইতে হইবো? ওয় জানে না ওরা কেমন?”
মোখলেছ বললো,“এই রাইতের আন্ধারে গাড়ি পামু কই?”

“গাড়ি লাগবো না, উডা ওরে। ঘাটে নাউ, ট্রলার যা পামু তাই সই। ওই পাড়েই হাসপাতাল।”
কাঁদতে কাঁদতে মিল্টনের হেঁচকি উঠে গেছে। রক্ত পড়া বন্ধ করার জন্য কাঁধের গামছাটা শক্ত করে ক্ষত স্থানে বাঁধলো। তারপর তালেব আর মোখলেছ মিলে ধরাধরি করে নাজিরকে নিয়ে গেলো ঘাটে।
ধান মিলে তালা দিয়ে বাজারের ব্যাগ হাতে নাজিরের ঠিক পেছনেই ছিল মিল্টন। মুমিনুল শাহর সাথে কথা বলায় এতই মগ্ন ছিল যে তার উপস্থিতি হয়তো টের পায়নি দুজনের একজনও। তারা নির্জনে এসে থামতে মিল্টনও থামলো। তবে তাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে।‌ একপর্যায়ে সামিউল, নাজমুল, শাহরিয়ারকে অস্ত্র হাতে এদিকে ছুটে আসতে দেখে অসনি সংকেত পেয়ে গেলো তার মন। সামিউলের আসল রূপ তার অজানা নয়। ধান মিলে আগুন দিতে যাওয়ার পর থেকেই মিল্টন জানে, এরা কেউ নাজিরের ভালো চায় না। এগিয়ে যেতে গিয়েও পিছিয়ে এলো সে। একা একা এত মানুষের সাথে পেরে ওঠা সম্ভব নয়। তাই সর্বপ্রথম সেখান থেকে দৌড়ে বাড়িতে গিয়ে ভাই মোখলেছকে ডেকে আনলো মিল্টন। আসার পথে দেখা হয়ে গেলো মাসুমের সঙ্গে।

খাবার না খেয়ে স্বামীর অপেক্ষায় বসে ছিল মিছরি। বোনের এত অপেক্ষায় বিরক্ত হয়ে নাজিরকে খুঁজতে‌ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল মাসুম। পেলেই যেন ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে যেতো বাড়ি। মিল্টনদের লাঠিসোটা হাতে হন্তদন্ত হয়ে কোথাও যেতে দেখে পিছু ডেকে জিজ্ঞেস করল,“তগো নাটের গুরু কই? আমার বোইনডারে আশা দিয়া কই উড়াল দিছে?”
মিল্টন থামলো না। যেতে যেতে উত্তর দিলো,“আইজ বিরাট ফাডাফাডি হইবো। ওরা আমগো ভাইজানরে মারতে আইছে। সবকয়ডারে পিডামু আইজ।”

“কেডায় আইছে? কী রে, মিল্টন? ওই! কইয়া যা।”
দৌড়ে গিয়ে মিল্টনকে চেপে ধরলো মাসুম। সব শুনে ভীষণ অবাক হলো। আর না দাঁড়িয়ে তখনি বাড়িতে চলে এলো। রাতের ভোজন শেষে সুজন আর তালেব উঠোনে হাঁটাহাঁটি করছিল। তাদের বিষয়টা জানাতেই আর এক মুহূর্তও দেরি করল না কেউ। হাতের কাছে যা পেলো তা নিয়েই বাপ-চাচাদের আড়ালে বেরিয়ে পড়ল তিনজন।
তালেব আগে থেকেই ভেতরকার গন্ডগোল সম্পর্কে কিছুটা অবগত। তাই সে বুঝে গেলো, যে সে নয় বরং খারাপ কিছুই যে হতে চলেছে। নাহলে নাজির কথা দিয়ে কথা না রাখার ছেলে নয়। কিন্তু আসতে যেন খানিকটা দেরিই করে ফেলল সবাই।

বাড়ির অনেকেই নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে পলিও ঝিমুচ্ছে। সৈয়দুন নেছা তো এশার নামাজ পড়ে খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে যান। শুধু পারুল, মিছরি আর কাশেম আলী জেগে আছে। ছেলেদের বেরোতে দেখেই আর ঘুমাতে যাননি স্বামী-স্ত্রী। বসে আছেন বারান্দায়। ঘরে বিছানার উপর আধশোয়া মিছরি। বাড়ন্ত পেটে হাত বুলাতে বুলাতে অভিযোগ করছে,“তোর বাপ খুব খারাপ মানুষ। আজকাল কথা দিয়ে কথা রাখে না। আমার অনুভূতি, অপেক্ষার কোনো মূল্য নেই তার কাছে। এমন পাষাণ কবে হলো? তাকে এবার আর মাফ করবো না। আসুক একবার, কথা বলবো না। তোকেও দেখতে দেবো না। বাজে লোক।”

কেঁদে ফেলল একসময়। অনুভব করল গর্ভে নড়তে থাকা সন্তানকে।প্রথম প্রথম যখন লাথি মারতো, ভয়ে মিছরি কেঁদেই ফেলতো। মায়ের আঁচলে মুখ গুঁজে ফুঁপাতে ফুঁপাতে একদিন বললো,“পেটে কী যেন ঢুকেছে মা। হঠাৎ লাথি মারে। এখন আমার কী হবে? মরে যাবো না তো?”
মেয়ের কথায় দিলারা, জেসমিন, পলি কী হাসাই না হেসেছিল! পারুল মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বুঝিয়ে বললেন,“ধুর বলদ মাইয়া, পোলাপাইনে আস্তে আস্তে বড়ো হইতাছে। হেয়ই লাত্থি মারে। ডরের কারণ নাই। তুই আমার পেডে থাকতে কত লাত্থি মারছোস!”

ধীরে ধীরে সেই ভয় এখন কাটিয়ে উঠেছে মিছরি। বরং একদিন বাচ্চা না নড়লে নিজেই চিন্তায় অস্থির হয়ে যায়। বিছানা আজ ফাঁকা। ক’দিন ধরে শালিক এ ঘরে তার সঙ্গেই ঘুমায়। তবে ভাসুরের আসার কথা শুনে আজ নানীর সাথে ঘুমিয়েছে। মেয়েটার কোনো কিছু নিয়েই চিন্তা নেই যেন।
শুনশান নীরবতার মধ্যে হঠাৎ বাইরে হট্টগোল শোনা গেলো। সুজন, মাসুম মিলে সামিউলকে টেনে হেঁচড়ে বাড়িতে ঢোকালো। ঘটনাস্থলেই কয়েক ঘা দিয়ে মুখ লাল করে ফেলেছে। হাত-পা ছিঁলে গেছে। কাশেম আলী দালানের ফটক খুলে বেরিয়ে এলেন।

“কী হইতাছে এইসব? এইডা কেডা? সামিউল!”
“একটা দড়ি আনেন, চাচা। হারামজাদারে আগে বাইন্ধা লই।”
“ক্যান বাঁধবি? কী করছে? তহন তিন ভাইয়ে জোট বাইন্ধা কই গেছিলি তোরা? তালেব কই?”
তাদের চেঁচামেচির শব্দে রুহুল ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। কোনো প্রশ্ন না করে নিজেই ভাইদের হাতে দিলো মোটা পাটের দড়ি। তার পিছুপিছু মিছরিও ছুটে এসেছে। গ্ৰিল ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছে। দড়ি দিয়ে সামিউলকে জলপাই গাছের সাথে বাঁধা হলো। এটা সেই জলপাই গাছ, যেখানে গত বছর পারভেজকে বাঁধা হয়েছিল। ভাগ্যের ফেরে সেখানে আজ বাঁধা হয়েছে তারই বড়ো ভাই সামিউলকে।
কী ঘটছে, কেন ঘটছে উপস্থিত কেউই বুঝতে পারছে না। একসময় নজরুল আলমও চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়ে এলেন। সামিউলের চোখে ভয় নেই, জ্বলজ্বল করছে শুধু হিংস্রতা। মিছরির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সে বিশ্রীভাবে হেসে উঠলো। চিৎকার করে বললো, “রঙিন কাপড় পইরা ঘুরে ক্যান এই মাইয়া? মাইয়ারে সাদা শাড়ি পরাও, কাশেম। আমি তোমার মাইয়ার বিধবা হওয়ার ব্যবস্থা কইরা আইছি। তোমার নাতি পেটে থাকতেই এতিম হইয়া গেছে। ওই হারামজাদায় আর বাঁচতো না।”

মুহূর্তেই জায়গাটিতে বিস্ফোরণ ঘটলো। মাসুম তেড়ে গিয়ে সামিউলের মুখ বরাবর আরো একটা প্রকাণ্ড ঘুষি মারলো। তৎক্ষণাৎ দাঁতের সাথে ঠোঁট কেটে বের হতে লাগলো রক্ত। মাসুম মায়ের উদ্দেশ্যে গর্জে উঠে বললো,“এনে হা কইরা দাঁড়াইয়া রইছো ক্যান? মিছরিরে লইয়া ঘরে যাও।”
পারুল নিজেও বিস্মিত। ধরার আগেই মাথার ঘোমটা কপাল পর্যন্ত টেনে বেরিয়ে এলো মিছরি। কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“কী বললেন আপনি? বিধবা করে এসেছেন মানে? কোথায় উনি? কী হচ্ছে এসব? কেউ আমায় জানাও।”

মায়ের ভরসা না করে মাসুম নিজে এসেই বোনের হাত চেপে ধরলো। টেনে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বললো,“পাগলের কথা হুনতে হইবো না। কারো কিছু হয় নাই। সারাক্ষণ ফাল পারলে পোলাপাইনের ক্ষতি হইবো না?”
মিছরি সেকথা শুনতে নারাজ। তার মন বিকেল থেকেই কু ডাকছিল। এখন তো ভাসুরের কথা শুনে সন্দেহ আরো তীব্র হয়েছে। তবে ভাইয়ের শক্তির সঙ্গে পেরে উঠলো না। তাকে দাদীর ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে মাসুম চেঁচিয়ে বললো, “শালিক! ওই শালিক! মিছরিরে সামলা।”
সামিউলের লুঙ্গিতে রক্ত লেগে আছে।‌ বাপ, চাচাকে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বললো সুজন। কাশেম আলী ওখানেই বসে পড়লেন। এমন কিছু হবে বা হতে পারে তা কস্মিনকালেও তিনি ভাবেননি। নজরুল আলম জিজ্ঞেস করলেন,“এহন কী অবস্থা?”

“জানি না, আব্বা। তালেব, মিল্টন আর মিল্টনের ভাই মিল্যা হাসপাতাল লইয়া গেছে। আমিও এহন যামু। এই জানোয়ারের লাইগা যাইতে পারি নাই। বাকি দুইডা তো পলাইছে।”
“আমিও যামু, আমারে লইয়া যা।”
“সবাই গেলে কেমনে হইবো, চাচা? বাড়িত পুরুষ মানু থাকা প্রয়োজন।”
“না, আমি যামু।”
রুহুল আশ্বস্ত করে বললো,“তুমি আর চাচায় যাও। আমি আর আব্বা বাড়িত আছি।”
সুজন পোশাক বদলে এলো। মাসুমকে বলতেই মাসুম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“মন তো যাইতে চাইতাছে কিন্তু কেমনে যাই? মিছরিডা জানলে কী হইবো? ওরে কেডায় সামলাইবো? তোমরা আইলে না হয় আমি যামু।”
আর কথা না বাড়িয়ে তখনি কাশেম আলী আর সুজন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।

ইঞ্জিন চালিত মাছ ধরার নৌকায় করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে নাজিরকে। সংকটাপন্ন অবস্থা দেখে তৎক্ষণাৎ তাকে জরুরি বিভাগে স্থানান্তর করলেন চিকিৎসকরা। রাত বেশি থাকায় হাসপাতালে চিকিৎসক কম। মিল্টন, তালেব আর মোখলেছের পরিধেয় পোশাক রক্তে মাখামাখি।
মিল্টন ছেলেটা একেবারে দুর্বল হয়ে মেঝেতেই বসে পড়েছে। বাচ্চাদের মতো সারাটা পথ কেঁদেছে। সেই কান্না এখনো থামেনি। তালেব অবাক চোখে তাকেই দেখছে। যেখানে নিজের আপন চাচাতো ভাইয়েরা নাজিরকে রক্তাক্ত করল সেখানে কোথাকার কে তার জন্যই ফেলছে চোখের পানি। দুনিয়া কত বিচিত্র। সাথে বিচিত্র দুনিয়ার মানুষগুলোও।

রক্ত পড়া কোনোমতে বন্ধ করা হয়েছে। তবে অবস্থা আশঙ্কাজনক। আদৌ বাঁচবে কিনা বলা যাচ্ছে না। এ ধরণের রোগী সময় মতো উন্নত চিকিৎসার অভাবে অনেক সময় মারা যায়। আবার কেউ কেউ বা আল্লাহর দয়ায় বেঁচেও যায়।‌ সদর হাসপাতালে বেশি সময় তাকে রাখা হলো না। সেই রাতেই অ্যাম্বুলেন্সে করে জ্ঞানহীন, মৃত্যু পথযাত্রী নাজিরকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো সুদূর ঢাকা মেডিকেলে। কাশেম আলী আর সুজন গেলো তার সঙ্গে। মিল্টন, তালেবকে নেওয়া হলো না। রক্তে তাদের শরীর ভেজা। বাড়ি গিয়ে পরিষ্কার হতে বলা হলো।
মিল্টনকে জোর করেই বাড়ি নিয়ে গেলো মোখলেছ। তার আহাজারিতে পাড়া প্রতিবেশীদের ঘুম একসময় ভেঙে গেলো।

বনখড়িয়া গ্ৰামে নাজিরকে চেনে না এমন কাউকে বোধহয় পাওয়া যাবে না। জোয়ান থেকে বুড়ো সবার সঙ্গেই তার গলায় গলায় ভাব। সময় পেলে বাচ্চাদের সাথে মাঠে বসে ডাঙ্গুলী বা মার্বেল খেলতেও ভুলে না। তাই তার গুরুত্বর অবস্থার খবরটা সহজেই রাতের আঁধারে নদী তটের মানুষদের নিকট পৌঁছে গেলো।
যার নৌকায় করে হাসপাতালে পৌঁছেছে সে-ই জনে জনে খবরটা পৌঁছে দিলো। যারা জানে না তারা জানলো সকালে। জানলো, চাচা আর চাচাতো ভাইরা রাতের আঁধারে মিলে যে এতিম ছেলেটাকে হত্যার চেষ্টা করেছে। এও জেনে গেলো, দীর্ঘ বছর আগে ফতেহ আলী শাহকে আর কেউ নয় বরং তাঁর বড়ো পুত্র এবং পুত্রের শ্যালক মিলেই হত্যা করেছে। শেষে দোষ চাপিয়ে মাস্টার বাড়ির উপরে। সম্পত্তির লোভে ছাড়েনি নিজ ভাই সুবহান আলী শাহকেও। দোকান পাড়ে খবরটা নজরুল আলম ছড়িয়েছে।
মুমিনুল শাহ রাতে ফিরে পেট পুরে খেয়ে জম্পেশ ঘুম দিয়েছিলেন। ছেলেরা ফেরেনি সেই খবর জানেন না। তাঁর ঘুম ভাঙলো স্ত্রীর ভয়ংকর গর্জনে। আধ বোজা চোখে তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বললেন,“বেইন্নাকালে এমনে ডাকো ক্যান, বউ? তোমার কোন পাকা ধানে মই দিছি?”

“আমনের ডুগটা চিপ দিয়া ধরার দরকার আছিলো। কিন্তু আমি এহনো মুখে কথা কইতাছি।”
“আমি আবার কী করছি?”
“আমনের বড়ো দুই পোলায় কই?”
“ক্যান? ঘরে।”
“ঘরে নাই। সারা রাইত কুত্তার বাচ্চাগুলা বাড়িত আইয়ে নাই।”
ঘুম ছুটে গেলো মুমিনুল শাহর,“ফিরে নাই মানে?”
“এই প্রশ্ন তো আমার করার কথা। কই গেছে আমার পোলারা? ঘরে বউ রাইখা বাহিরে রাত কাটানের পোলা তো আমার নাজমুলে না। আর নাজিরে কই? সবাই কী কওয়াকওয়ি করতাছে এইসব? এহন পর্যন্ত কত মাইনষে বাড়িত আইছে জানেন?”
মুমিনুল শাহ শোয়া থেকে উঠে বসলেন। দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করলেন,“কও কী? কেডায় আইছে? কী কওয়াকওয়ি করতাছে? আমি তো কাইল রাইতে আইয়া যে ঘুমাইলাম, এইমাত্র উঠছি।”
“ভালায় ভালায় হাছা কথা কন। আইজ একটা মিছা কথা কইলে বাড়িত কিন্তু কেয়ামত হইয়া যাইবো নাজমুলের বাপ। আমনে জানেন আমি কেমন।”

“না কইলে জানমু কেমনে? আর তোমারেই হাছা কমু কেমনে?”
“বেইন্নাকালে কলিমের মায় আইয়া কইলো দোহান পাড় দিয়া নাকি আলোচনা চলতাছে, কাইল রাইতে লোকচক্ষুর আড়ালে নাজিররে আমনে জঙ্গলের মিহি ডাইকা লইয়া গেছিলেন। হেরপরে সামিউল, নাজমুল আর শাহরিয়ার মিল্যা ওরে মারছে। মিল্টনে আর মাস্টর বাড়ির পোলারা মিল্যা নাকি হাতেনাতে তাগো ধরছে‌। সামিউলরে এহন ওই বাড়িত আটকাইয়া রাখা হইছে, এহনো ওই জায়গায় রক্ত লাইগা আছে। আমি কিচ্ছু বুঝাতাছি না, মাথামোতা আর কাম করে না।একটু পরপর মানুষ বাড়িত আইয়া আমনেরে খুঁইজা যাইতাছে। নাজিররেও হাসপাতালে লইয়া যাওয়া হইছে। বাঁচবো কিনা কওয়া যাইতাছে না।”

কথায় বিরতি টানলেন মর্জিনা। কথা বলতে গিয়ে গলায় কান্নারা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। অনুনয় করে বললেন,“হাছা কইরা কন, আমনে এইসবে নাই তো? মাইনষের কথা আমি বিশ্বাস করি না। এর আগে নাজিরও আমারে কইছে, আমনে খারাপ মানুষ। ওর মায়রে নাকি মারছেন। আমি বিশ্বাস করি নাই। কন না, আমনে করেন নাই। আমার পোলা দুইডাও এমন করতে পারে না। নাজির ভাই বলতে তো হেরা পাগল।”
মুমিনুল শাহর মুখমন্ডলে অবিশ্বাস, আতঙ্ক ফুটে উঠেছে। বিছানা থেকে নেমে লুঙ্গি ঠিক করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে স্বামীর যাওয়ার পথে হা করে তাকিয়ে রইলেন মর্জিনা। চোখের সামনে থেকে বিশ্বাসের কালো পর্দা সরে গিয়ে এবার যেন সব স্পষ্ট। তবুও অবচেতন মন মানে না।

মুমিনুল শাহ সাতসকালেই গোসল সেরে ভালো পোশাক পরিধান করলেন। বাড়িতে পুরুষ বলতে শুধু পারভেজ আর জাহিদ। পারভেজের কানে সব খবরই এসেছে। তবুও সে নির্লিপ্ত। আপন ভাইকে ছাড়াতেও যায়নি। নাজিরের অবস্থা জানতে গিয়েছিল মিল্টনের কাছে। মিল্টন বাড়িতে নেই। ভোর থেকে মাস্টার বাড়ি বসেছিল। তারপর তালেবের সঙ্গে রওনা হয়েছে শহরে। মোখলেছও দূর দূর করে পারভেজকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তার মতে, সেও দুধে ধোয়া তুলসী পাতা নয়‌। ঘটনাস্থলে না থাকলেও ষড়যন্ত্রে সে লিপ্ত ছিল। যা পুরোপুরি মিথ্যে। পারভেজ জানতো না কিছু। জানলে কখনোই এমন কিছু হতে দিতো না। সাবধান করতো।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার অভিমুখে মুমিনুল শাহকে আটক করে ফেলল নজরুল আলম, রুহুল আর মাসুম। ভয়ে ঘাম ছুটে গেলো লোকটার। আমতা আমতা করে বললেন,“তোরা এই সময় এনে ক্যান? যা এনতে।”
নজরুল আলম হাসলেন,“জীবনে তো কম অত্যাচার জুলুম অন্যের উপরে করোস নাই। এহন অতিরিক্ত চালাকি করতে গিয়া কেমনে ফাঁসলি, দ্যাখ। আল্লাহ ছাড় দেয় কিন্তু ছাইড়া দেয় না। রুহুল, মাসুম ওরে ধর তোরা। না হইলে শয়তানডায় পলাইবো। ওয় ভুইল্যা গেছিলো কার পিছনে যে লাগছে।”

যাত্রাপথ পর্ব ৬৭

গ্ৰামের দরিদ্র মানুষেরা অনেক আগে থেকেই এদের দুই ভাইয়ের উপর নারাজ। তাই তারাও সুযোগটা হাতছাড়া করল না। শেষ মুহূর্তে মুমিনুল শাহ আর পালাতে পারলেন না। তাকে ধরে নিয়ে বাঁধা হলো বটতলায়।
সেই বটতলা যেখানে সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এতকাল তারা গ্ৰামের নারীদের বিচার করেছে, নিজ স্বার্থে একঘরে করেছে বহু পরিবারকে।
বেলা বাড়তেই চেয়ারম্যান নুরুজ্জামানকে খবর দিয়ে আনা হলো। তিনি সব শুনে পুলিশে খবর দিয়ে তাকে আর সামিউলকে পুলিশের হাতে তুলে দিলেন। এই প্রথম শাহ বাড়ির কোনো বউ শালিস সভায় এসে আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদলো। এভাবেই বুঝি কর্ম ফিরে আসে?

যাত্রাপথ পর্ব ৬৯