রং পর্ব ৬
তন্নী তনু
বিকেলের শেষ ভাগে ইরফাদ একটু ফ্রি হলো। অফিসের জন্য ব্যবহৃত ফোনটা সব সময় সচল থাকে।আর তার পারসোনাল ফোনের নাম্বার সকল রিলেটিভস কে দেয়া। সেখানে অসংখ্য ফোন আসে, অসংখ্য মেসেজ আসে।সময়ের অভাবে কখনো দেখা হয়ে ওঠে না অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে ফোন ওপেনও করা হয় না। সেদিনের আসা কল সে ভুলেই গেছে। কতো মানুষ ই তো ফোন দেয়।সময়ের অভাবে কল ব্যাক করা হয়ে ওঠে না। তবে আজ ফোন অন করেই, একটি মেসেজ চোখে পড়লো তার।–” আমি মরে গেলাম ইরফাদ সাহেব।”
এই কথার পড়ে প্রথমেই সকালে দেখা ঘটনাটা মনে পড়লো তার। কয় তারিখের মেসেজ তা দেখা হলো না। সে ভাবলো, “মেয়েটা কি ঐ সময়ে বাঁচার জন্যে তার কাছে আকুতি প্রকাশ করেছে?” কিন্তু সে তো মেসেজ ই দেখেনি! তার কি একবার যাওয়া উচিত? তার কি মেয়েটি’কে সাহায্য করা উচিত? দু’মিনিট বসে কারাগারের দিকে গেলো ইরফাদ। গারদের ওপারের শক্ত মেঝেতে হাঁটুতে মুখ গুঁজে আছে সিনথিয়া। লম্বা চুল গুলো বাঁধন মুক্ত হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। ইরফাদ হালকা করে গলা খাকারি দিলো।মেয়েটির কোনো নড়চড় হলো না।ইরফাদ শীতল কন্ঠে ডাকলো,
— সিনথিয়া…
হীমশীতল মিষ্টি স্বরটি দেয়ালে এসে যেন বারি খেলো। তারপর প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।”সিনথিয়া..থিয়া..থিয়া..” সিনথিয়া মুখ তুলে তাকালো। গারদের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষটিকে চোখ মেলে দেখলো সিনথিয়া। টানা টানা মায়াবী চোখ দুটোতে বিস্মন্নতা আর অসহায়ত্ত্বের প্রতিচ্ছবি। একদৃষ্টিতে স্মৃতিহারা মানুষের ন্যায় তাকে স্মৃতিচারণ করতে না পেরে যেনো একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে । সেটি বুঝতে পেরে ইরফাদ আরেকবার ডাকলো,
— এই!
সিনথিয়া!!
শোনো…
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মেয়েটির চোখে ইরফাদ এর অস্তিত্ব যেন এইবার ধরা দিলো।মাঝ সমুদ্রে হাবুডুবু খেয়ে ঘন হয়ে আসা শ্বাস যখন খঁড়কুটোর সন্ধান পেয়ে স্বস্তিতে হাফ ছাড়ে। তারপর প্রাণপণে ছুটে এসে ঝাপটে ধরে সে খড়কুটোকে। সে রকম করেই যেনো ছুটে এলো সিনথিয়া। তারপর দুহাতে খামছে ধরলো লোহার গারদ। দুচোখে রক্ত ছলকে উঠলো। বাঁশির মতো সরু নাকের ডগা লাল হয়ে উঠছে ক্রমেই।
ঘটে যাওয়া অসম্ভাব্য, অনিশ্চিত ঘটনার বাস্তবায়ন তার ভিতরে যে ব্যথার পাহাড় গড়েছে তা চোখ ফেটে রক্ত আকারে বের হতে চাইছে! এতো সময়ের জমিয়ে রাখা যন্ত্রণার চিহ্ন ফুটে উঠছে ছোট ছোট বিন্দু আকারে -থুতনির ভাজে ভাজে। দু’চোখের জল বাঁধ দিয়ে আটকে রাখতে গিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছে অধর যুগল। বাঁধ ভাঙা নদীর জলের ন্যায় চোখের স্বচ্ছ জল মূহুর্তেই গড়িয়ে পড়লো। মেয়েটি’কে গ্রেফতার এর পর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন তো এভাবে কাঁদেনি।তবে তার চোখ দু’টো অবলীলায় বলে দিচ্ছে, “এই একটা সুযোগের অপেক্ষায় ই ছিলো এতোক্ষণ”। ইরফাদ যেনো পুরো সিনথিয়াকে একচোটে পড়ে নিলো। মেয়েটি শেষ ভরসা হিসেবে তার প্রতীক্ষায় সময় গুণেছে।অথচ সে কি না! বলে এলো “এই কেস নিয়ে কাজ করবে না।”
চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাচ্ছে প্রভাতরঞ্জন সরকার। এই কাজ রিজভী শিকদারকে দিলে সমাধান যে হবে না- তা তিনি ভালো করেই জানেন। আর একবার না করে দিয়ে, ইরফাদ যে কখনোই এই কাজ করবে না – তা’ও সে ভালো মতোই জানেন। কি করবেন তিনি ভেবে পাচ্ছেন না।
অশ্রুসিক্ত নয়নে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সিনথিয়া। তার চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে গলায় পেঁচানো ওড়নার উপরের অংশ। পলক ফেলার আগেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রুকণা। এ অবস্থা দেখে,দায়িত্ব রত মহীলা কে তালা খুলে দিতে বললো ইরফাদ।তারপর তার কেবিনে নিয়ে যেতে বললো। ফেরার সময় ডিআইজি’র ফোনে ফোন দিলো ইরফাদ,
— “কেসটা আমি দেখবো। তবে নেক্সট যেনো এর মধ্যে আগাছা না আসে।” ডিআইজি’র উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোনটা কেটে দিলো ইরফাদ। এমন অসম্ভাব্য কথা শুনে প্রভাতরঞ্জন নিজেই হতভম্ব হলেন!এই প্রথম তিনি ইরফাদের মত পরিবর্তন হতে দেখলেন! তবে মনে মনে খুব খুশি হলেন।
—–
ইরফাদ সিনথিয়াকে সামনের চেয়ারে বসতে বললো। তারপর বললো,
— রাফি সম্পর্কে যা জানো নিজে থেকেই বলবে। এতো প্রশ্ন যেনো না করতে হয়।
সিনথিয়া মাথা নাড়ায়।কিন্তু মুখে কিছু বলে না। মাথা নিচু করে থাকে। তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ইরফাদ বলিষ্ট হাতে হালকা করে চাপড় দেয় টেবিলে। সিনথিয়া নড়েচড়ে বসে। তারপর ধীর গলায় বলে,
–কি বলবো?
— আমি বলে দিবো?
পিনপতন নিরবতা। ইরফাদ বুঝে নেয়,এই মেয়ের সাথে নিজে থেকে কথা না বললে দিন গড়িয়ে রাত হবে -তবুও কথা বের হবে না। তার কাছে এতো সময় নেই।উপায়ান্তর না দেখে নিজেই বললো,
— রাফি জবলেস ছিলো! জানো?
— হুম।
— “ইনভেস্টিগেশন এ জানা গেছে, ওর ব্যাংক লোন নেয়া আছে। ইটস অ্যা বিগ এ্যমাউন্ট। ইউ নোউ?” সিনথিয়া চুপ করে থাকে। উত্তর না পেয়ে ইরফাদ বলে,
— ইয়েস অর নো?
–নো!
ইরফাদ জিজ্ঞেস করে,
— ” বাজে কোনো নেশা ছিলো ?” সিনথিয়া চোখ নামিয়ে নেয় পূণরায় । ধীর গলায় উত্তর দেয়।
— শুনিনি কখনো।
— নেশা বা অন্যকিছু?
— না,,
–ওনার সাথে তোমার পরিচয়?
— একটা ফ্রেন্ডের মাধ্যমে।
— ডিটেইলস বলো! নিজে থেকে।
–ও আমাদের কলেজে আসতো। ওর ছোট বোনকে কলেজ দিতে আসতো।ওখান থেকেই পরিচয়। তারপর ধীরে ধীরে…
— রায়হান রাফির কোনো ফ্রেন্ডের সাথে যোগাযোগ আছে?
— না!পারসোনাল বিষয় শেয়ার ওর পছন্দ ছিলো না।
— এমন কোনো কিছুই কি নেই!তাকে সন্দেহ করার মতো?
— না! তবে কয়েকদিন ধরে একটা কথা মনে হচ্ছে। একটা মেয়ে ছিলো! অনেক আগে ম্যাসেঞ্জারে নক করেছিলো। মেয়েটি বলেছিলো! আমার সাথে কথা আছে। কিন্তু আমার পাসওয়ার্ড রাফির কাছে ছিলো।তাই রাফি মেসেজ দেখেই- তাকে ব্লক করে দেয়। এবং আমাকে বলে, “মেয়েটি খারাপ।” অন্য আইডি থেকে নক দিলে-যেনো তাকে জানাই।এবং কথা না বলি।”
— তারপর?
— তারপর আর কথা বলিনি।
— মেয়েটির নাম?
— মনে নেই। তবে আইডি’তে ব্লকলিস্টে থাকতে পারে।
— “পাসওয়ার্ড!”ইরফাদের বলা পাসওয়ার্ড শব্দে খানিকটা অবাক হয় সিনথিয়া।এখন তাকে পাসওয়ার্ড ও দিতে হবে। প্রাইভেসি ব্রেক করতে হবে। ঐখানে আর কিছু না থাকুক। রাফির সাথে বলা কনভারসেশন তো আছে, কিছু ছবিও আছে।
ইরফাদ আবার বলে,
— “পাসওয়ার্ড!!”একই শব্দ পূনরায় জোড়ালো ভাবে উচ্চারিত হওয়ার সিনথিয়া মৃদু কেঁপে ওঠে।যে পাসওয়ার্ড দেয়া আছে,সেটিই বা মুখে কি করে বলবে। সিনথিয়া বলে, –লিখে দেই বা টাইপ করে দেই?
— “ও হ্যালো!এতো ভাবার কিছু নেই। কাজ শেষে লগআউট করে দিবো।”
সিনথিয়া নড়েচড়ে বসলো। কি ছিলো ইরফাদ সিনহার কথার মধ্যে। এমন তো সে ভাবেনি! তার মতো তুচ্ছ সিনথিয়ার আইডিতে নজর দেয়ার সময়-একজন “এসপি”র আছে নাকি! সিনথিয়া একচোটে পাসওয়ার্ড বললো,
— “লাভ ইউ,রাফি” ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নেয় ইরফাদ। বাম হাতে হাফ ফোল্ড করে নেয় ল্যাপটপ।একপলক তাকায় সিনথিয়ার দিকে। নিজেকে চিড়িয়াখানায় বাদর মনে হয় সিনথিয়ার। ইরফাদে’র তাচ্ছিল্যের চাহুনিতে চোখ সরিয়ে নেয় সিনথিয়া। ইরফাদ তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
— “শখ মেটেনি??” ইরফাদে’র এই কথা শুনে একঝাক মৌমাছি চাক ভেঙ্গে এসে যেনো সিনথিয়ার মাথায় একনাগাড়ে কামড়াতে থাকে। এমন লজ্জার মুখোমুখি তাকে হতে হলো? সিনথিয়া মাথা নুইয়ে ফেললো।এই জন্যেই বলতে চাচ্ছিলো না সে। লজ্জার থেকেও নিজেকে ছোট লাগছে এখন! কি ভাবছে মানুষটা? যার জন্যে জীবনের এতো অধঃপতন!আত্মসম্মান, মানসম্মান সব শেষ!সেই নাম দিয়ে পাসওয়ার্ড। ছি!ছি!ছি!ঐদিকে ইরফাদ ব্লকলিস্ট চেক করলো। সিনথিয়া তার মধ্যের কয়েকটা আইডি থেকে “বৃষ্টি ভেজা মন ” আইডিটা দেখালো। ইরফাদ ব্লক ছাড়িয়ে একটা টেক্সট করলো,
— “এসপি সিনহা বলছি! মেসেজটি দেখা মাত্র’ই আপনি *** থানায় দেখা করবেন।”
এরপর ইরফাদ সিনথিয়ার আইডি’র পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করলো। তারপর সিনথিয়াকে বললো,
— “এরপর ফাস্ট সেন্টেন্স দিয়ে লগইন দিবে। শুধু রাফি ওয়ার্ড টা রিমুভ করা হয়েছে।”
পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করার কথা শুনে- সিনথিয়া অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। তার কাছে না শুনে পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করলো?
আইডি’র মালিক দু’ঘন্টার মধ্যেই থানায় হাজির হলো। এর পরের কথোপকথন,
— হু ইজ রায়হান রাফি?ডু ইউ নোউ মিস বৃষ্টি?
— ইয়াহ! আই নোউ এবাউট হিম। বাট হোয়াই?
পুরো গল্পটা যথাসম্ভব সংক্ষেপে বললো ইরফাদ। সবশেষে রাফির সম্পর্কে বললো,
— তিনি বিয়ে করেছেন। বিষয়টি হাইড ও রেখেছেন। নিখোঁজের আগে সিনথিয়ার সাথে দেখাও করেছেন।
এ কথা শুনে বৃষ্টি যেনো খানিকটা অবাক হলো,
–ও বিয়ে করেছে!নাকি ফেঁসে গিয়েছে?ও করবে বিয়ে! ও তো মেয়েবাজ!রায়হান রাফির সাথে শুধু আমার সম্পর্ক ছিলো এমন নয়!অনেক মেয়ের সাথেই তার সম্পর্ক ছিলো। ও একটা ফ্রড। আগের গার্লফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকআপ হওয়ার পর আমার সাথে রিলেশন হয়। আবার আমার সাথে ব্রেকআপ এর পর সিনথিয়ার সাথে সম্পর্ক হয়। এভাবেই চলে আসছে।অনেক মেয়ের জীবন সে নষ্ট করেছে।আমার সাথে ব্রেকআপ এর পরে সেগুলো জানতে পেরেছি। তখন আর কিছুই করার নেই। তবে সিনথিয়া মেয়েটার ব্যপারে আমি জানতে পেরেছিলাম।তাই ভেবেছিলাম বড় বোন হিসেবে এলার্ট করতে।
রাফি অনেক জেদি। ও ছিনিয়ে আনা জিনিস খুব পছন্দ করে। তৃপ্তি পায়। আমার যখন এনগেইজমেন্ট হয়। তারপরে আমার সাথে ওর পরিচয়। আমি তো আগের এনগেইজমেন্ট ভেঙ্গে ওর সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম। ওর জন্যে নিজের ক্যারিয়ার, ফিউচার সব নষ্ট করেছি। প্রত্যেকটা মেয়ের জীবন ও এভাবেই নষ্ট করেছে।
— আপনি কোনো স্টেপ নেন নি?
— স্যার! ডোন্ট মাইন্ড! জোর করে ইন্টিমেট হলে তাকে রে/প বলা যায়। কিন্তু কেউ যদি ভালোবাসার জালে পা দিয়ে সেচ্ছায় ইন্টিমেট হয়। তাহলে কি তা রে/প হয়? আমরা প্রত্যেকটা মেয়েই এক’ই কাজ করেছি। তাই ওর বিরুদ্ধে কি স্টেপ নিবো? থানায় এসে কি বলবো? দোষ তো আর ওর একার না। আমারা’ও দোষী।
মেয়েটি দীর্ঘশ্বাস ফেললো, তারপর আবার বললো,
— তবে একটা কথা কি! রাফি যদি কোনো মেয়ের দিকে নজর দেয়। তাহলে ছলেবলে কৌশলে শেষ অবধি বিছানায় আনে। তবে, সে জোড় করে কিছু করবে না-এটা সিউর। যা হবে দু’জনের সম্মতিতে!
শেষের কথা গুলোতে ইরফাদের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। মুষ্টি হয়ে আসে বলিষ্ট হাতের আঙ্গুল, চোখের শিরাগুলো লাল হয়ে ওঠে। দাঁতে দাঁত পিষতে পিষতে অস্ফুট আওয়াজ করে বলে,
— “স্কাউনড্রেল!”
বৃষ্টি চলে যাওয়ার পর। সিনথিয়াকে আবার কেবিনে ডাকা হয়। সিনথিয়া বসে সামনের চেয়ারে। ইরফাদের শরীর হীম করা গলা,
— “হ্যাভ ইউ গট ইনটিমেট উইথ রাফি?”
আচমকা এমন একটা প্রশ্নে ভড়কে গেলো সিনথিয়া। এমন আপত্তিকর একটা প্রশ্নের সাথে সে পরিচয় নয়। অন্য পুরুষের সাথে এইসব আলোচনা তার কাছে তো ভিষন লজ্জার, আপত্তিকর।কেসের সাথে এসবের কি সম্পর্ক?সে যেন ভাষা হারিয়ে ফেললো। এরপর যদি তাকে প্রশ্ন করে, তার সাথে আর কি কি হয়েছে? কি উত্তর দিবে সে?
ইরফাদের বরফের মতো ঠান্ডা গলা,
— আই সে,হ্যাভ ইউ গট ইনটিমেট উইদ হিম ?
সিনথিয়া চুপচাপ মাথা নিচু করে রইলো। তার জীবনে আর কি কি দেখা বাকি আছে। আর কতো কিছুর সম্মুখীন হবে সে? আর কতো লজ্জা পেতে হবে? আর কতো সহ্য করতে হবে তাকে। তার তো আর সহ্য হয় না। আর কত খেসারত সে দিবে! মুখটা ছোট হয়ে আসে তার। কিভাবে কি বলবে সে? তবুও জড়িয়ে আসা গলাটা ছিড়ে ছিড়ে বলে,
–“ও তো ভদ্র-সভ্য ছিলো।ও আমাকে ভালোবাসতো। এমন কিছু ও করবেনা যাতে আমার সম্মানহানি…” বাকিটা আর বলা হলো না। ইরফাদে’র ঝাঝালো গলা,
— ভালোবাসা’র এই নমুনা! আই সে ইউ!হ্যাভ ইউ গট ইন্টিমেট উইদ হিম? ইয়েস অর নো?” সিনথিয়া ইরফাদে’র দিকে তাকালো। ইরফাদে’র মুখাভঙ্গী বদলে গেছে। বদলে গেছে তার গলার স্বর। তার সাথে বলা ক্ষণিকের নরম গলা’টা কেবল এক মুখোশ। এই যে রাগী,ফুলে-ফেঁপে ওঠা গরম চোখের মানুষটা’ই যে আসল সে কেনো বারবার ভুলে যায়। “এসপি” কি রাফি’কে নিয়ে সাফাই শোনার জন্যে বসে আছে। রাফি তার চোখে কেমন? তা’ কি সে জানতে চেয়েছে? তাহলে এই বিশ্বাসঘাতক মানুষটা’র সাফাই কেনো করছে সে? সিনথিয়া নিজের বেহায়া মনকে দু’চাপড় বসিয়ে উত্তর দিলো,
— না!এসব কোনো দিন হয়নি।
ইরফাদে’র পাল্টা প্রশ্ন,
— ডিড হি টাচ ইউ?
এই ভয়টাই তো পেয়েছিলো সে! এই মূহুর্তে কি বলবে সে?যদি বলে “টাচ করেনি কখোনো।” কিন্তু সেইটা তো মিথ্যা হবে। আর যদি সত্যি বলে! তাহলে যদি প্রশ্ন করে, “কি কি করেছো?” তাহলে কি করে বলবে, “রাফি তাকে চুমু খেয়েছিলো”। এমন কথা বলার আগে সে মরে যাবে। তবুও বলতে পারবেনা।
ইরফাদ সিনহা আবার বললো,
— “ইয়েস অর নো?” এবারের গলার স্বরটা যেনো কাচের মতো সোজা গিয়ে দেয়ালে লাগলো তারপর ভেঙে চুরচুর করে মেঝেতে পড়লো। গলার টোন শুনেই ভড়কে গেলো সিনথিয়া। দম টা যেনো ফাঁসির দড়িতে আটকে গেলো। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। হঠাৎ এসব কেনো জিজ্ঞেস করছেন তিনি। এসব কি কেসের জন্যে খুব দরকার?ইরফাদ সিনহার আবারও সেই হীমশীতল গলা। যা সিনথিয়াকে বরফের মতো জমিয়ে দিচ্ছে,
— “ইটস অ্যা সিম্পল কোয়েচ্শেন সিনথি!এ্যানসার মি!ইয়েস অর নো!…”
সিনথিয়া কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,
— “ইয়েস..”
ইরফাদে’র দাঁতে দাঁত পিষে বের হওয়া চাপা স্বর ,
–গেট আউট ফ্রম হিয়ার! আউট….
সিনথিয়া চেয়ারে শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে, ভাবছে! ইরফাদ সিনহা “তার উপর কি রেগে গেলো?” এখন যদি উঠে না যেতে পারে! এসপি কি বেশীই রেগে যাবে?কিন্তু এক ধমকে যে তার পায়ের শক্তি যে শেষ।
অন্ধকারের ডুবে আছে গারদে’র চার দেয়াল। পাহাড় ধসের মতো নেমে আসা ক্লান্তিতে ঘুমের অতলে ডুবে গেছে সিনথিয়া।বহুদিন তার চোখে ঘুম নেই। তবে আজ শরীর তাকে ছুটি দিয়েছে। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেছে তার থেকে অনুমতি না নিয়েই।নিস্তব্ধ, নিশব্দ, নিঝুম রাত পোঁছে গেছে শেষের ঠিকানায়। সিনথিয়া ঘুমে আছন্ন। গারদের লোহার দরজাটা হঠাৎ টুং করে উঠে।ঘুম হালকা হয়ে আসে। ভেসে আসে বহু সাবধানে ফেলা পায়ে’র মৃদু আওয়াজ।গভীর ঘুম বন্য হরীণের ন্যায় ছুটে পালিয়ে যায়।
রং পর্ব ৫
তার অনুভূতি নাড়া দিয়ে বলে- কেউ যেনো তার দিকে’ই গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। তুষারপাতের ন্যায় হীমশীতল হয়ে আসে তার শ্বাস। ঘন হয়ে আসে বুকের মধ্যে। চোখ দু’টো ভয়ে কোটরে লুকাতে চায়।চোখ টেনে তাকানোর সাহস হয়ে ওঠে না। চোখ খুলে কাকে দেখবে সে? জীবনের টানাপোড়েনে আর কতো কি দেখবে সে? এই বদ্ধ চার দেয়ালের ঘরে অচেনা মানুষের অস্তিত্ব টের পেয়ে ভেতরে ভেতরে ভেঙ্গে পড়ে!সে ডাঙায় উঠে আসা মাছের মতো ভেতরে ছটফট করে! মুখ দিয়ে কিছু বলতে পারে না!শ্বাস চেপে রাখে শব্দ হওয়ার ভয়ে। ঠিক তখনই তার খুব কাছে ঘন হওয়া বরফের ন্যায় শীতল শ্বাস তার চোখে মুখের উপর ঠিকড়ে পড়ে। অন্ধকার ঠেলে ভয় ভীতি ছুড়ে ফেলে লাফিয়ে ওঠে সিনথিয়া। তারপর কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
— কে!!
