Home র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩০

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩০

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩০
ইয়ুশরা রিমু

মমতাজ বেগমের বুকের ভেতর তখনও রাগের আ”গুন জ্ব”লছিলো। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ফুলদানির ভাঙা টুকরোগুলোর দিকে তাকালেই যেন তাঁর রাগ আরও বেড়ে যাচ্ছিলো। এত বছর ধরে বুকের গভীরে চাপা দিয়ে রাখা অভিমান, অপমান আর পুরোনো ক্ষ’ত সবকিছু যেন আজ বেলার কয়েকটি কথায় আবার নতুন করে জেগে উঠেছে।
তিনি ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে বললেন,

—আমার সঙ্গেই তর্ক করে! এত বড় সাহস হয় কী করে মেয়েটার? আমার ছেলেকে নিয়ে আমাকে চোখে চোখ রেখে কথা শোনায়!
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেলো। কয়েক মুহূর্ত পর দরজা খুলে সায়র ভেতরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেলো মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ফুলদানির টুকরো, এলোমেলো কুশন আর মায়ের অস্থির মুখের দিকে।সায়র ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে বললো,
—আম্মু, কী হয়েছে? ঘরের এই অবস্থা কেন?
মমতাজ বেগম সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

—কিছু হয়নি।
সায়র ভাঙা ফুলদানির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
—কিছু না হলে ফুলদানিটা নিজে নিজে ভেঙে মেঝেতে পড়ে আছে?
মমতাজ বেগম এবার বিরক্ত হয়ে বললেন,
—তুই এখন এসব নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করিস না।
সায়র কিছুক্ষণ চুপ থেকে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলো,
—বেলা এসেছিল এখানে?
প্রশ্নটা শুনেই মমতাজ বেগমের চোখে আবার রাগের আ’গুন জ্ব”লে উঠলো।
—হ্যাঁ, এসেছিল। আর এসে আমাকে কীভাবে কথা শুনিয়েছে, সেটা যদি তুই শুনতিস, তাহলে হয়তো তোর ওই বেলার প্রতি এত দরদ থাকতো না।
সায়রের মুখের অভিব্যক্তি বদলালো না।

—বেলা তোমাকে কী বলেছে?
মমতাজ বেগম এবার যেন সুযোগ পেলেন। তিনি এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করলেন,
—আমি শুধু ওকে একটু বুঝিয়ে বলেছিলাম, সে যেন নিজের সীমা ভুলে না যায়। কিন্তু সে উল্টো আমাকে অপমান করেছে। বলেছে, আমি নাকি ওর মাকে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছি, আমাকে নাকি কারও জীবন নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দেওয়া হয়নি!
সায়র চুপচাপ শুনতে থাকলো।
মমতাজ বেগম আরও উ”ত্তেজিত হয়ে বললেন,
—আমি তোকে এত কষ্ট করে মানুষ করেছি, তোকে জন্ম দিয়েছি। আমার কি তোর বিষয়ে কোনো কথা বলার সুযোগ নেই বল? ওর কথাবার্তা শুনলে তুই নিজেই বুঝতিস, মেয়েটা কতটা বেয়াদব হয়ে গেছে।
সায়র ধীরে ধীরে মায়ের দিকে তাকালো।
—বেলা তোমাকে অসম্মান করেছে, সেটা ঠিক না। কিন্তু পুরো বিষয়টা না জেনে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নেবো না।
মমতাজ বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,

—-তুই আবার কী দেখবি? তোর তো ওর মুখ দেখলেই সব রাগ চলে যায়। ওর চোখে একটু পানি দেখলেই তুই ভুলে যাস কে ঠিক আর কে ভুল!
সায়র এবার কিছুক্ষণ নীরব রইলো।মায়ের কথার জবাব দেওয়ার মতো অনেক কিছুই তার মাথায় এলো, কিন্তু সে জানতো এই মুহূর্তে তর্ক বাড়ালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাই নিজের কণ্ঠটা যথাসম্ভব শান্ত রেখে বললো,
—আম্মু, আমি তোমার ছেলে। তোমার কষ্ট আমি বুঝি। কিন্তু একটা কথা তোমাকেও বুঝতে হবে।বেলা অতীতের কোনো ঘটনার জন্য দায়ী না।
মমতাজ বেগমের মুখ শক্ত হয়ে গেলো।
—তুই আবার সেই কথা শুরু করলি?আর আজ আমারই ছেলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ওই মেয়ের পক্ষ নিচ্ছি। বাহ্।

—হ্যাঁ, কারণ কথাটা বলা দরকার।
সায়র কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার বললো,
—চাচ্চু আর চাচির সঙ্গে তোমার যে অতীত, সেটা আমি জানি। কী ঘটেছিল, কেন তোমার মনে এত রাগ আর কষ্ট জমে আছে, সেসব আমার অজানা না। কিন্তু বেলা তখন কিছুই জানতো না, সেই ঘটনায় তার কোনো ভূমিকা ছিল না। তাই অতীতের রাগ, অভিমান আর জেদ ওর ওপর দেখিও না।
মমতাজ বেগম যেন ছেলের কথায় আরও আহত হলেন।
—তাহলে এখন তুই আমাকে শেখাবি আমি কাকে কীভাবে দেখবো?
—আমি তোমাকে শেখাচ্ছি না, আম্মু। শুধু অনুরোধ করছি।
—অনুরোধ?
তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,

—তুই আমার ছেলে হয়ে আজ আমার কাছেই ওই মেয়ের জন্য অনুরোধ করছিস!
সায়র এবারও চুপ করে রইলো।
মমতাজ বেগমের কণ্ঠ আরও ভারী হয়ে উঠলো,
—তুই কি জানিস, তোর চাচ্চু একসময় আমার সঙ্গে কি করেছিলো? জানিস কীভাবে সবকিছু আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিলো? জানিস কত বছর ধরে আমি এই অপমান বয়ে বেড়াচ্ছি?
সায়র শান্ত গলায় বললো,
–জানি, আম্মু।
—তাহলে বুঝিস না কেন আমি বেলাকে সহ্য করতে পারি না?
—কারণ তুমি বেলার মধ্যে চাচির ছায়া দেখতে পাচ্ছো।
কথাটা শুনে মমতাজ বেগম থমকে গেলেন।
সায়র ধীরে ধীরে বললো,

—কিন্তু বেলা চাচি না। ওর কোনো অপরাধ নেই। তুমি যদি চাচির ওপর রাগ করো, সেটা তোমার আর চাচির বিষয়। সেই রাগ বেলার ওপর চাপিয়ে দিলে ওর প্রতি অন্যায় হবে।
মমতাজ বেগম রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
—তুই ওর জন্য আমার সঙ্গে তর্ক করছিস!
—আমি তোমার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না।
—কিন্তু করছিস তো!
—কারণ তুমি বেলার সঙ্গে অন্যায় করলে আমি চুপ থাকতে পারবো না।
মমতাজ বেগমের চোখ বড় হয়ে গেলো।
—তাহলে এখন তোর কাছে ওই মেয়েটাই এতো গুরুত্বপূর্ণ?
সায়র কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো। তারপর খুব ধীরে বললো,
—-সে আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে, আম্মু। সেটা তুমি চাও বা না চাও, সত্যিটা বদলাবে না।
মমতাজ বেগমের চোখে ক্ষোভ আরও গাঢ় হয়ে উঠলো।

—-তুই আমাকে হারিয়ে ওকে জিতিয়ে দিবি?
সায়রের বুকটা ভারী হয়ে এলো। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে নরম কণ্ঠে বললো,
—আমি কাউকে হারাতে চাই না। তোমাকেও না, বেলাকেও না। আমি শুধু চাই, তুমি ওকে ওর নিজের পরিচয়ে দেখো। অন্য কারও ভুলের শাস্তি ওকে দিও না।
মমতাজ বেগম মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
—তুই এখন অনেক বড় হয়ে গেছিস। তাই মাকে বোঝাতে এসেছিস।
সায়র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
—আমি তোমাকে বোঝাতে আসিনি। শুধু একটা কথা বলতে এসেছি।চাচি বা চাচ্চুর ব্যাপারে বেলাকে কিছু বলো না। অতীতের কোনো কথা ওর সামনে তুলে ওকে ছোট করো না। ও তখন ছিলোই না।
মমতাজ বেগম তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,
—ওর জন্য তুই এত চিন্তা করিস কেন?
সায়র উত্তর দিলো না।
মমতাজ বেগম এবার ছেলের নীরবতাকেই নিজের উত্তর মনে করে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন,
—দেখেছিস? আমি ঠিকই বলেছিলাম। তুই ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিস। সেই মেয়েটা আসার পর থেকেই তুই বদলে গেছিস!
সায়র শান্তভাবে বললো,

—আমি বদলাইনি, আম্মু। শুধু হয়তো তুমি আমাকে আগের মতো করে দেখতে পারছো না।
কথাটা শুনে মমতাজ বেগম কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
সায়র দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। বের হওয়ার আগে একবার পেছনে ফিরে বললো,
—ঘরটা পরিষ্কার করে নিও। আর হাত-পা যেন কাঁচে না কা’টে।
মমতাজ বেগম সঙ্গে সঙ্গে তীব্র কণ্ঠে বললেন,
—আমার কথা না শুনে এখন তুই বেলার কাছে যাচ্ছিস?
সায়র থেমে গেলো।
—না। আগে বেলার সঙ্গে কথা বলবো না। কিন্তু বিষয়টা আমি দেখবো। সত্যিটা না জেনে কাউকে দোষী করবো না।
মমতাজ বেগম ঠোঁট শক্ত করে বললেন,

—তোর ওই বদমাইশ বউয়ের সামনে গিয়ে আবার সব ভুলে যাস না যেন!
সায়র আর কোনো উত্তর দিলো না। শুধু মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
দরজা বন্ধ হওয়ার পরও মমতাজ বেগম স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখে তখন রাগের সঙ্গে মিশে গেছে গভীর ভয়।যে ভয়টা তিনি কাউকে কখনো স্বীকার করেননি।
তিনি খুব আস্তে বললেন,
—না।আমি আবার কাউকে আমার কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিতে দেবো না।
পুনরায় নিজের ছেলের মুখ থেকে বেলার পক্ষ নেওয়ার কথাগুলো মনে পড়তেই তাঁর বুকের ভেতরটা আবারও জ্বলে উঠলো। এতক্ষণ বেলার ওপর যে রাগ ছিল, তার সঙ্গে এবার যোগ হলো নিজের ছেলের প্রতি অভিমান আর অপমানের তীব্র কষ্ট।তিনি হঠাৎ টেবিলের ওপর থাকা পানির গ্লাসটা তুলে মেঝেতে ছুড়ে মারলেন।

—আমার ছেলেও আজ আমাকে অপমান করে গেল!
গ্লাসটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো।মমতাজ বেগম দ্রুত কয়েক পা হাঁটতে হাঁটতে বললেন,
—যে ছেলেকে আমি এত কষ্ট করে বড় করেছি, আজ সেই ছেলে আমার সামনেই অন্য একটা মেয়ের হয়ে কথা বলে! আমার কষ্টের কোনো মূল্যই নেই তার কাছে!
তিনি থেমে চোখ মুছে আবার বললেন,
—বেলা আসার পর থেকেই সব বদলে গেছে। আগে আমার ছেলে অন্তত আমার কথা শুনতো। এখন আমার সব কথাই ভুল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তাঁর চোখে হঠাৎ অন্যরকম দৃঢ়তা ফুটে উঠলো। তিনি টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলটা তুলে নিলেন। কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে পরিচিত একটি নাম খুঁজে বের করলেন রুপসা।কল দিতেই দ্বিতীয়বার রিং হওয়ার আগেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হলো।

—হ্যালো, আন্টি?
মমতাজ বেগম কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। তারপর ভারী কণ্ঠে বললেন,
—রুপসা, তুই এখন কোথায়?
রুপসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—বাড়িতেই আছি। কেন আন্টি? কিছু হয়েছে?
মমতাজ বেগম নিচু গলায় বললেন,
–হ্যাঁ। অনেক কিছু হয়েছে।
—সায়রের কিছু হয়েছে?
প্রশ্নটা শুনে মমতাজ বেগমের চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠলো।
—সায়র ঠিক আছে। কিন্তু ওর সঙ্গে আজ আমার কথা কা”টাকা’টি হয়েছে।
রুপসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
—কেন?
মমতাজ বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—ফোনে এসব বলা যাবে না। তুই আমার সঙ্গে দেখা কর।
রুপসা কিছুটা দ্বিধায় বললো,

—কোথায়?
—বাড়ির বাইরে কোথাও। এমন একটা জায়গায়, যেখানে আমাদের কথা কেউ শুনবে না।
রুপসার কণ্ঠে এবার কৌতূহল স্পষ্ট হলো।
—এত গোপনীয়ভাবে কেন বলছেন, আন্টি?
মমতাজ বেগম জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,
—- প্রয়োজন আছে।
রুপসা নীরব হয়ে গেলো।মমতাজ বেগম আবার বললেন,
—তুই আজই আমার সঙ্গে দেখা কর। সময় আর জায়গা আমি তোকে মেসেজ করে দেবো।
—ঠিক আছে, আন্টি। আমি আসবো।
ফোন কেটে গেলো।মমতাজ বেগম মোবাইলটা শক্ত করে মুঠোর মধ্যে ধরে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ফিরে এলো।
—এবার আমাকে একাই সব সামলাতে হবে না।
তিনি আবার মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের দিকে তাকালেন।
—যে খেলাটা বেলা তুই শুরু করেছিস , এবার সেটার শেষটা আমি নিজের মতো করেই করবো।

সায়র মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। করিডোর পেরিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখ প্রথমে বিছানার দিকে গেল, কিন্তু বেলাকে সেখানে দেখতে পেলো না। কয়েক মুহূর্ত খুঁজতেই বেলকনির দিকে চোখ পড়লো। বিকেলের নরম আলোয় বেলা একা বসে আছে, হাতে ফোন, আর মাঝে মাঝে অন্যমনস্কভাবে স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছে।
সায়র দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কিছুক্ষণ তাকে দেখলো। মেয়েটার মুখটা স্বাভাবিক দেখালেও, তার ভঙ্গিতে এমন একটা চাপা বিরক্তি ছিলো, যা দেখে সায়র বুঝে গেলো।মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পরও বেলার মনটা ভালো নেই।সে ধীরে ধীরে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক গলায় বললো,

—কী করছিস?
বেলা ফোন থেকে চোখ না তুলেই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো,
—ফোন চালাচ্ছি।
সায়র পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বললো,
—সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি। এত মন দিয়ে কী দেখছিস?
—কিছু না।
—কিছু না দেখে মানুষ এত গম্ভীর মুখ করে বসে থাকে?
বেলা এবার একবার চোখ তুলে সায়রের দিকে তাকালো।
—আপনার সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা নেই আমার।
সায়র মৃদু হেসে বললো,

—ঠিক আছে, তুই কথা বলবি না। আমি একটু বসে থাকি।
বেলা আর কোনো উত্তর দিলো না। আবার ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো।কয়েক মুহূর্ত দুজনের মধ্যে নীরবতা চললো। তারপর সায়র একটু গম্ভীর হয়ে বললো,
—আম্মুর সঙ্গে তর্ক করেছিস কেন?
বেলার আঙুলটা ফোনের স্ক্রিনের ওপর থেমে গেল।
ধীরে ধীরে সে ফোনটা নামিয়ে সায়রের দিকে তাকালো। এতক্ষণ ধরে চেপে রাখা অভিমান যেন মুহূর্তেই চোখেমুখে ফুটে উঠলো।
—বাহ্! ছেলের কাছে নালিশ দেওয়াও হয়ে গেছে?
সায়র ভ্রু কুঁচকে বললো,
—নালিশ?
—হ্যাঁ, নালিশ। আমি ঘর থেকে বের হওয়ার পর নিশ্চয়ই দৌড়ে গিয়ে সব বলে দিয়েছেন আপনার আম্মু। আর এখন আপনি এসে আমাকে জিজ্ঞেস করতে এসেছেন, আমি কেন ওনার সঙ্গে তর্ক করেছি!
সায়র শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললো,
–আমি তো শুধু জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।
বেলা এবার আরও তেতে উঠে বললো,

— মায়ের কাছ থেকেই তো শুনেছেন তাহলে আবার জিগ্গেস করছেন কেন?
—বেলা!!!
—-না, বলুন। উনি নিশ্চয়ই বলেছেন আমি খুব বেয়াদব, আমি ওনার সঙ্গে তর্ক করেছি, ওনাকে অপমান করেছি আর কিছু বাদ রেখেছেন নাকি?
সায়র কিছু বলার আগেই বেলা এক নিঃশ্বাসে বলতে লাগলো,
—আমি কি ইচ্ছে করে ওনার সঙ্গে ঝগড়া করতে গিয়েছিলাম? উনিই আমাকে ডেকে নিয়ে আমার মাকে নিয়ে যা-তা কথা বলেছেন। আমার মাকে নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছেন, আর আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবো? সেটা কি সম্ভব?
সায়র শান্ত গলায় বললো,

—আমি তোকে চুপ থাকতে বলছি না।
—তাহলে জিজ্ঞেস করছেন কেন?
—কারণ আমি পুরো বিষয়টা জানতে চেয়েছি।
বেলা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
—আপনার আম্মু বলছেই তো । আমার কাছে আর কি জানবেন।
সায়র এবার একটু বিরক্ত হয়ে বললো,
–তুই এত উ’ত্তেজিত হচ্ছিস কেন? আমি কি তোকে কিছু বলেছি?
কথাটা শুনে বেলা হঠাৎ থেমে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিলো এবং চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।সায়র তাকে থামাতে চেয়ে বললো,

—বেলা, শোন।
কিন্তু বেলা একটাও কথা বললো না। মুখ শক্ত করে বেলকনি থেকে রুরের ভেতরে চলে গেলো। সায়র কয়েক মুহূর্ত সেখানেই বসে রইলো।তারপর ধীরে ধীরে নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
–বাহ্ শাইবান খান সায়র একদিকে মা, অন্যদিকে বউ। মাঝখানে পড়ে তোর জীবনটাই শেষ!
সে উঠে দাঁড়িয়ে ঘরের ভেতরে গেলো। বেলা তখন বিছানার একপাশে বসে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, ফোনে তার মন নেই।সায়র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকে দেখলো। তারপর নিজের কপাল চা’পড়াতে চা’পড়াতে ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেলো।

—এই যে রাগী মহারানী।
বেলা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।সায়র আরও কাছে এসে বললো,
–একটা কথা বলবো?রাগ করে থাকলে থাক, কিন্তু আমার দিকে একবার তাকাতে তো পারিস।
বেলা এবারও তাকালো না।সায়র দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার পাশে বসে পড়লো।
—মা-বউয়ের ঝামেলায় পড়ে যে পুরুষ মানুষ মানুষের কী অবস্থা হয়, সেটা আজ বুঝতে পারছি।
কথাটা শুনে বেলার ঠোঁটের কোণে অতি সামান্য হাসি ফুটে উঠলো, কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো।সায়র সেটা দেখে মৃদু হেসে বললো,
–হাসলি তো!
—না।
—আমি দেখেছি।
—আপনি ভুল দেখেছেন।
—আচ্ছা, ঠিক আছে। তুই হাসিসনি। আমি ভুলই দেখেছি।
বেলা চুপ করে রইলো।সায়র এবার একটু নরম হয়ে বললো,

—আমি তোকে দোষ দিতে আসিনি, বেলা। সত্যি বলছি। তোর কাছে শুধু জানতে চেয়েছিলাম কী হয়েছে। তুই যদি মায়ের কথায় কষ্ট পেয়ে থাকিস, তার জন্য দুঃখিত।
বেলা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকালো। তার চোখে এখনও অভিমান।সায়র খুব শান্তভাবে বললো,
—আর একটা কথা । চাচির ব্যাপারটা নিয়ে তুই যে রেগে গেছিস, সেটা নিয়েও আমি তোকে দোষ দিচ্ছি না। নিজের মাকে নিয়ে কেউ খারাপ কথা শুনলে চুপ করে থাকা সহজ না।
বেলার অভিমানী মুখটা একটু নরম হয়ে এলো।
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—এখন শুধু এই রাগী মুখটা একটু স্বাভাবিক কর। নাহলে আমাকে সারাদিন কপাল চা’পড়াতে হবে।
বেলা মুখ ফুলিয়ে বললো,
—আপনার জন্যই তো আমার রাগ হয়েছে।
সায়র সঙ্গে সঙ্গে বললো,
—সেটাই তো আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা। তোর রাগও হয় আমার জন্য, আবার সেই রাগ ভাঙানোর দায়িত্বও আমার!
বেলা এবার আর হাসি আটকে রাখতে পারলো না।
সায়র তার মুখের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
—-আহ্, বাঁচলাম! অন্তত আজকের মতো মা-বউয়ের মহাযু’দ্ধ শান্ত করতে পেরেছি।

রেস্টুরেন্টের কাঁচঘেরা কর্নারের টেবিলটায় মুখোমুখি বসে আছেন মমতাজ বেগম আর রুপসা। বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, গাড়ির হেডলাইটের আলো ভেজা রাস্তায় লম্বা রেখা এঁকে যাচ্ছে। ওয়েটার দু’কাপ কফি রেখে চলে যেতেই টেবিলজুড়ে নেমে এলো ভারী নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙলেন মমতাজ বেগম। সে বললো,
—রুপসা, আমি আর পারছি না। চোখের সামনে একটা মেয়ে আমার ছেলেকে ধীরে ধীরে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। আজ সায়র প্রথমবার আমার কথার চেয়ে বেলার চোখের পানি বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একজন মা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আমার কাছে আর কিছু নেই।
রুপসা ধীরে কাপটা হাতে তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ধোঁয়া ওঠা কফির দিকে। তারপর শান্ত, নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে বলল,

—অপমানের জবাব রাগ দিয়ে দিলে মানুষ সতর্ক হয়ে যায়, আন্টি। কিন্তু শাস্তি যদি নীরবে দেওয়া যায়, তাহলে সে বুঝতেই পারে না কখন তার পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে।
মমতাজ বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
—তুই কী বলতে চাইছিস?
রুপসা এবার সামান্য ঝুঁকে এল। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
—বেলাকে সায়রের জীবন থেকে বের করে দেওয়াই একমাত্র লক্ষ্য আমার। কিন্তু আমার কিছুই করতে হবে না। বেলা নিজেই উপলব্ধি করবে সায়রের জীবন থেকে তার সরে যাওয়াই বেটার।
মমতাজ বেগম গভীর মনোযোগে শুনতে লাগলেন।রুপসা আবার বলল,
—আপনি লক্ষ্য করেছেন? বেলা খুব আত্মসম্মানী মেয়ে। তাকে অপমান করলে সে কাঁদে, কিন্তু ভাঙে না। অথচ যদি তাকে বারবার এই বিশ্বাস করানো যায় যে তার জন্য সায়রের ক্যারিয়ার নষ্ট হচ্ছে, সায়র মুখ বুঝে ওকে সহ্য করছে। সেদিন বেলা নিজেই সায়রের জীবন থেকে সরে যাবে।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে মমতাজ বেগম নিচু স্বরে বললেন,

—তুই এখনও সায়রকে ভালোবাসিস?
রুপসার চোখ ভিজলো না, কিন্তু দৃষ্টিটা কঠিন হয়ে উঠল,
—ভালোবাসা কখনো শেষ হয়না, আন্টি। আমি ভেবেছিলাম একদিন হয়তো ভাগ্য আমাকে সায়র কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু বেলা এসে সেই স্বপ্নটাকে নিজের নামে লিখে নিয়েছে। আমি সেটা মেনে নিতে পারবো না।
সে ধীরে ধীরে কথায় যোগ করলো,
—-আমি বেলার ক্ষ’তি করতে চাই না। আমি চাই ও বুঝুক, অন্যর ভালোবাসা ছিনিয়ে নেওয়া কতোটা কষ্টের।
মমতাজ বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—তাহলে আজ থেকে শুরু হোক। তবে মনে রাখিস, এমন কোনো কাজ করবি না যাতে সায়র আমাদের ঘৃণা করে।
রুপসা মৃদু হাসলো সেই হাসি ছিলো প্রতিশোধের। সে বললো,
—সায়র সত্যের মানুষ। তাই আমি কখনও মিথ্যে বলবো না। আমি শুধু বানিয়ে এমন মিথ্যার মুখোমুখি বেলাকে দাঁড় করাব, যেটা ও সহ্য করতে পারবে না। একদিন ও নিজেই সায়রের হাত ছেড়ে চলে যাবে।আর সেদিন কেউ আমাদের দোষও দিতে পারবে না।

সন্ধ্যার চাঁদের নরম আলো জানালার পর্দা ভেদ করে সায়রের ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। বেলা বিছানার ওপর পা গুটিয়ে বসে ফোনে স্ক্রল করছে। ঠিক তখনই আলমারি থেকে কয়েকটা বই বের করে টেবিলের ওপর রাখলো সায়র।
—এই বেলা, আয়। আজ তোকে পড়াবো।
বেলা চোখও তুললো না।
—-আজ পড়বো না।
—-কেন?
—ইচ্ছে করছে না।
সায়র চেয়ারে বসে গম্ভীর গলায় বললো,
—ইচ্ছে না করলেই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় নাকি? পাঁচ মিনিটের মধ্যে এখানে বস।
বেলা মুখ ফুলিয়ে বিড়বিড় করলো,
—আবার শুরু হলো মাস্টারগিরি।
—কী বললি?
—কিছু না…
শেষ পর্যন্ত সায়রের কড়া চোখের সামনে হার মেনে ধীর পায়ে এসে চেয়ারে বসল বেলা। বই খুলে দিল সায়র।

–এই অধ্যায়টা পড়।
বেলা বই খুললেও মনটা কোথাও নেই। কখনও জানালার বাইরে তাকাচ্ছে, কখনও কলম ঘুরাচ্ছে, আবার কখনও খাতায় ফুল আঁকছে।সায়র কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে বললো,
—বেলা, আমি কী পড়াচ্ছি?
বেলা চমকে উঠলো।
—হ্যা মানে এই…
—বল, আমি শেষ তিরিশ মিনিট ধরে কী বুঝিয়েছি?
বেলা মাথা চুলকে নিরীহ মুখে বললো,
–তিরিশ মিনিট?
সায়র কপালে হাত ঠেকালো।

—অসাধারণ! আমি এতক্ষণ দেয়ালকে পড়াচ্ছিলাম নাকি?
বেলা হেসে ফেললো।
—আপনার পড়ানোর সময় খুব ঘুম পায়।
—তাই নাকি?
—হুম।
সায়র বই বন্ধ করে গম্ভীর হয়ে বললো,
—তাহলে আজ আর পড়ানোর দরকার নেই।
বেলা ভেবেছিল বকা শেষ। সে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটতে লাগলো।
—যাই তাহলে।
ঠিক তখনই সায়রের হাত আলতো করে তার কব্জি ধরে ফেললো।বেলা ফিরে তাকাতেই সায়র হালকা টানে তাকে থামিয়ে দিলো। ভারসাম্য হারিয়ে বেলা টলতে টলতে সায়রের একেবারে কোলে এসে পড়লো। সায়র দ্রুত বেলাকে সামলে ধরলো, যাতে সে পড়ে না যায়।দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।বেলার গাল লাল হয়ে উঠলো।মুহূর্তের জন্য দুজনের দূরত্ব মিলিয়ে গেলো।নিঃশ্বাসের উষ্ণতা, থমকে যাওয়া সময়, আর অকারণে বেড়ে যাওয়া হৃদস্পন্দন।বেলা ল’জ্জামাখা মুখে বলে,

—ছাড়ুন…
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—পালিয়ে যাচ্ছিস কেন? আমি কি এত ভয়ংকর?
বেলা নিচু গলায় বললো,
—আপনি বকা দেন।
–মনোযোগ না দিলে মাস্টার তো বকবেই।
বেলা অভিমানী মুখ করে বললো,
— আমি আপনার ছাত্রী না বাসায়। আপনার ….
সায়র একটু ঝুঁকে নরম স্বরে বললো,
— আমার কি???
বেলার অভিমান আর বেশিক্ষণ টিকলো না। সে চোখ নামিয়ে খুব আস্তে বললো,
— কিছু না। আচ্ছা পড়ি।
সায়রের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো।
—এই তো আমার ভালো ছাত্রী।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে বললো,
— ভালো ছাত্রী বলবেন আমাকে, কিন্তু আবার বকা দিলে কথা বলবো না।
সায়র হেসে বললো,

— আচ্ছা। বকবোনা অভিমানী মহারানী আমার।
সায়রের আদুরে মাখা কথা শুনে বেলার বুকের ভেতর অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হলো। তারপর দুজনেই অজান্তেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। সেই ক্ষণিকের চোখে চোখ পড়ার মুহূর্তে যেন ঘরের নীরবতাও অন্যরকম হয়ে উঠলো।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ২৯

বেলার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও স্পষ্ট শোনা গেলো, আর সায়রের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো তৃপ্তির হাসি।জানালার বাইরে সন্ধ্যার বাতাস পর্দা দুলিয়ে গেলো। টেবিল ল্যাম্পের হলদে আলোয় পাশাপাশি বসে রইল দু’জন একজন পড়াচ্ছে, আর অন্যজন এবার সত্যিই মন দিয়ে পড়ছে,অথচ দুজনের অস্থির হৃদস্পন্দন যেন নীরবে লিখে চলেছে এক অনুচ্চারিত প্রেমের গল্প।

র‌ইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩১