রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৮
ইয়ুশরা রিমু
রাত আরও গভীর হয়েছে। দেয়ালঘড়ির কাঁ’টা নীরব ছন্দে সময়ের অগ্রযাত্রা ঘোষণা করে চলেছে,অথচ ড্রয়িংরুমের প্রাণখোলা আড্ডায় তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি। তাদের কথার রেশ থামার কোনো লক্ষণ নেই। প্রসঙ্গের পর প্রসঙ্গ বদলে যাচ্ছে অবলীলায়। কখনো অতীতের দুরন্ত দিনগুলোর স্মৃতিচারণ, কখনো কর্মজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, আবার কখনো বহুদিন আগের কোনো তুচ্ছ ঘটনার উল্লেখেই সমস্বরে ভেসে উঠছে অট্টহাসি।
সবার সঙ্গে একই জায়গায় বসে থেকেও বেলার মনে হচ্ছিলো, সে যেন অন্য এক জগতে আটকে আছে। চারপাশের প্রতিটি শব্দ তার কানে পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু কোনোটাই মন ছুঁতে পারছে না। সে এখনও যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে যাচ্ছে। মনে মনে নিজেকেই বারবার শক্ত করে বুঝিয়ে বলছে,
—কথা কম বলবি,চোখ তুলে তাকাবি না, কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে,স্বাভাবিক থাক,একদম স্বাভাবিক বেলা।
কিন্তু মানুষ যতই নিজের অনুভূতিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুক না কেন, হৃদয় যেন ঠিক ততটাই অবাধ্য হয়ে ওঠে। নিজের অজান্তেই তার দৃষ্টি বারবার সায়রের দিকেই চলে যেতে চাইছে। আর প্রতিবারই সে তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, যেন নিজের মনকেই অপরাধে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে।
সেই সময় সায়র পাশের টেবিল থেকে নিজের চায়ের কাপটা তুলতে গিয়ে অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে বেলার সামনের কাপটার দিকে তাকালো। অন্য সবার কাপ প্রায় খালি, অথচ বেলার কাপে এখনও প্রায় অর্ধেক চা পড়ে আছে। চায়ের ওপরের হালকা ধোঁয়া অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের ওপর পাতলা আস্তরণ জমে বুঝিয়ে দিচ্ছে, কাপটায় এক-দু’চুমুকের বেশি পড়েনি।
সায়র খুবই স্বাভাবিক গলায় বললো,
— চা খাচ্ছিস না কেন বেলা?
প্রশ্নটা এতটাই সহজ ছিল যে, কেউ চাইলে গুরুত্বই দিতো না। কিন্তু কথাটা শোনা মাত্রই ঘরে বসে থাকা প্রায় সবাই একবার ঘুরে বেলার দিকে তাকালো। হঠাৎ এতগুলো দৃষ্টি নিজের ওপর এসে পড়ায় বেলা ভেতরে ভেতরে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। তবু বহু কষ্টে মুখের অভিব্যক্তিটা আগের মতোই শান্ত রেখে ছোট্ট করে উত্তর দিলো,
—এমনি ইচ্ছে করছে না।
সায়র আর কিছু বললো না। জোর করলো না, দ্বিতীয়বারও জানতে চাইলো না। শুধু এক মুহূর্তের জন্য বেলার কাপটার দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন এর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন সে অনুভবই করেনি।
অথচ এই সামান্য প্রশ্নটুকুই বেলার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন তুলে দিলো। এত মানুষের ভিড়ে, এত কথাবার্তার মাঝেও সায়রের চোখ এড়ায়নি যে তার চা শেষ হয়নি। এতটুকু খেয়াল করাটাও কেন জানি তার কাছে অমূল্য মনে হলো। বুকের গভীরে লুকিয়ে রাখা অনুভূতিগুলো আবারও নিঃশব্দে মাথা তুলে দাঁড়ালো। ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ এক হাসি এসেও মুহূর্তেই মিলিয়ে গেলো। সে দ্রুত নিজের দৃষ্টি নিচের দিকে নামিয়ে আনলো, যেন কেউ তার চোখের ভাষা পড়ে ফেলতে না পারে।
ঠিক তখনই পরিবেশটা আবারো মাতিয়ে তুললো বিহান। চেয়ারে হেলান দিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু ভঙ্গিতে বললো,
— শুনে রাখো সবাই, কাল কিন্তু কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। যে আজ এত আরাম করে বসে বসে খাচ্ছো, কাল কিন্তু সবাইকে কাজ করতে হবে। কেউ শুধু খেয়ে উঠে পালাতে পারবে না।
কথাটা বলেই সে একবার করে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগলো, যেন এখনই কে কী অজুহাত দেয় সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে। সবাই হেসে উঠলেও বেলা চুপ করেই রইলো।আজ তার যেন কথা বলার শক্তিটুকুও নেই।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা ছুঁইছুঁই। কিছুক্ষণ আগেও যে বাড়িটা হাসি-ঠাট্টায় মুখর ছিল, এখন সেখানে ধীরে ধীরে নেমে এসেছে গভীর নীরবতা। একতলার সব লাইট নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, শুধু করিডোরের হলুদাভ আলোটা এখনও জ্বলছে। রান্নাঘর গুছিয়ে নাজনীন সুলতানাও নিজের রুমে চলে গেছে। মমতাজ বেগম নিজের রুমে এসে আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে শুকনো কাপড় ভাঁজ করতে করতে গভীর চিন্তায় ডুবে রইলো। সন্ধ্যা থেকে একাধিকবার তিনি খুব সূক্ষ্মভাবে একটি বিষয় লক্ষ করেছেন। সায়র আর বেলা কেউই একে অপরের সঙ্গে তেমন কথা বলেনি, অথচ সুযোগ পেলেই অজান্তে দুজনের দৃষ্টি একে অপরের দিকে চলে যাচ্ছিলো। চোখাচোখি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার দুজনেই এমনভাবে দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছিলো, যেন কিছুই ঘটেনি।মমতাজ বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— বেলা হয়তো ছোট। ওর আচরণকে সবাই দুষ্টুমি বলেই উড়িয়ে দেয়। কিন্তু সায়র ? মা হয়ে ছেলের চোখের ভাষা পড়তে ভুল হবে আমার?
পরমুহূর্তেই নিজের মনকেই ধমক দিলেন তিনি,
—না হয়তো আমি অকারণেই বেশি ভাবছি। তবু বিষয়টা নজরে রাখতে হবে।
মুখে সেই আগের মতোই শান্ত হাসিটা ফুটিয়ে তিনি ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন। বাইরে থেকে তাকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই নেই, হাসিমুখের আড়ালে তার মনের ভেতরে তখন অসংখ্য প্রশ্নের ঢেউ উঠছে।
অন্যদিকে নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলো বেলা। সারাদিনের ক্লান্তি থাকলেও আজ ঘুম যেন কিছুতেই তার চোখে আসছে না। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে তার মাথায় বারবার ঘুরে বেড়াতে লাগলো দিনের প্রতিটি মুহূর্ত। বিশেষ করে বিকেলের সেই ছোট্ট ঘটনাটা হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে নেওয়া, সায়রের হাতে ভর পেয়ে নিজেকে সামলে নেওয়া, আর তারপর ধৈর্য নিয়ে ওড়নাটা ঘড়ি থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া।বালিশটা বুকে চেপে ধরে হালকা হেসে বললো সে,
— উফ! মানুষটা এতো হ্যান্ডসাম কেন?
পরক্ষণেই ফোনটা হাতে তুলে নিজের সেই বিখ্যাত ফেক আইডিতে লগইন করলো।অনেক ভেবে প্রথম মেসেজটা পাঠালো,
—শুনুন, আপনার সন্তান আজকে আমার সঙ্গে খুব রাগ করেছে। বলছে, তার বাবা নাকি সারাদিন মুখ গোমড়া করে থাকে।
কয়েক মিনিট পরই রিপ্লাই এলো,
— আগে সন্তানটাকে পৃথিবীতে আসতে বলো। তারপর ওর অভিযোগ শুনবো।
বেলা ঠোঁট চেপে হাসলো।আবার লিখলো,
— না, আগে প্রতিশ্রুতি দিন। ও কিন্তু খুব আদুরে হবে। একদম বকা দেওয়া চলবে না। ওকে অনেক ভালোবাসতে হবে ।
সায়রের উত্তর এলো,
— অসম্ভব। বেশি দুষ্টুমি করলে অবশ্যই বকা খাবে।
বেলা দ্রুত টাইপ করলো,
— যদি দেখতে আমার মতো হয়? তখনও বকা দেবেন?
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
—তাহলে তো আরও বেশি সাবধান থাকতে হবে। একজন দুষ্টুই সামলানো কঠিন, দুজন হলে পুরো পৃথিবীকেই বিপদে ফেলবে।
বেলা এবার বালিশে মুখ গুঁজে হাসতে লাগলো,
—আচ্ছা, আপনার সন্তান যদি রাতে ঘুমাতে না চায়?
— তাহলে তার মা’কে শুদ্ধ রাস্তায় ফেলে আসবো।
বেলা আরো কিছু উল্টাপাল্টা কথা লিখলো কিন্তু অনেক্ষণ কোন রিপ্লাই আসলো না। প্রায় অনেকটা সময় পর ছোট্ট একটা রিপ্লাই এলো,
—এত পরিকল্পনা বাদ দিয়ে এবার ঘুমাও। রাত অনেক হয়েছে। আর অকারণে মানুষকে জ্বা’লানোর অভ্যাসটা একটু কমাও।
বেলা ঠোঁট ফুলিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো,
—হিটলার একটা!
তারপরও শেষবারের মতো লিখে পাঠালো,
—শুভরাত্রি সায়র সাহেব।
আর কোনো উত্তর এলো না।ফোনটা বুকের ওপর রেখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করলো বেলা। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের জগতে ডুবে গেলো।
পরদিন সকাল।ফজরের নামাজ পড়ে আবার কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলো বেলা। পরে জুম্মার দিনের আলাদা একটা ভালো লাগা নিয়ে ঘুম থেকে উঠে ধীরে ধীরে নিজের সকালটা শুরু করলো। ফ্রেশ হয়ে হালকা রঙের একটি সুন্দর থ্রি-পিস পরে চুলগুলো আঁচড়ে পরিপাটি করে নিলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে মুচকি হেসে বললো,
—আজকে কিন্তু একদম ভদ্র মেয়ে লাগছে তোকে বেলা।
কথাটা বলেই হঠাৎ তার নাকে যেন কল্পনায় ভেসে এলো গতকালের সেই পরিচিত পারফিউমের সুবাস।মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক নেমে এলো।
— যদি একটু মাত্র পারফিউম ব্যবহার করি? উনি বুঝতেও পারবেন না।
চারদিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে চুপিচুপি নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এল সে। করিডোর দিয়ে বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে সায়রের রুমের সামনে এসে প্রথমে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো।ঘরটা ফাঁকা।বিছানার ওপর সুন্দর করে ভাঁজ করা জামাকাপড় রাখা। কিন্তু সায়রের কোনো দেখা নেই।বেলার মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটে উঠলো।
— নিশ্চয়ই নিচে গেছে।
ধীরে ধীরে দরজাটা আরেকটু খুলে ভেতরে ঢুকে পড়লো সে।ঘরের চারপাশে একবার তাকিয়েই ড্রেসিং টেবিলের ওপর পরিচিত সেই পারফিউমের বোতলটা দেখতে পেলো।তার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠলো।বোতলটা হাতে নিয়ে খুব সাবধানে ঢাকনাটা খুলে নিজের ওড়নার কাছে একবার স্প্রে করতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে যাওয়ার শব্দ।বেলার হাত মুহূর্তেই থেমে গেলো।ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো, সদ্য গোসল সেরে ভেজা চুলে তোয়ালে মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে সায়র। তার পরনে ছিল শুধু একটি লুঙ্গি, কাঁধে ঝোলানো সাদা তোয়ালে দিয়ে সে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে চুলের পানি মুছছিলো।অপ্রত্যাশিত সেই দৃশ্য দেখে বেলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড যেন সে নড়তেই ভুলে গেলো।পরের মুহূর্তেই বাস্তবতা মনে পড়তেই তার বুক ধকধক করে উঠলো। মনে মনে বললো,
—ইয়া আল্লাহ্ আমি তো ধরা পড়ে গেলাম!
আর ঠিক তখনই সায়রের দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামলো কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেলার দিকে।
মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো ঘরটা অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেলো। জানালার দিয়ে আসা সূর্যের আলোয় সায়রের ভেজা চুলের ফোঁটাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সদ্য গোসল করে বের হওয়ায় তার শরীর থেকে এক অদ্ভুত সতেজ ঘ্রান ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘরে।
বেলার ডান হাতে শক্ত করে ধরা পারফিউমের বোতলটা। হাত কাঁপছে এতটাই যে বোতলটা হাত থেকে পড়ে যাবে কি না, সেই ভয়ও কাজ করছে। বুকের ভেতরটা এমন জোরে ধুকপুক করছে যেন ওর কাছে মনে হচ্ছে হৃদস্পন্দনের শব্দ পুরো ঘর শুনতে পাচ্ছে। সে একবার দরজার দিকে তাকালো, আরেকবার সায়রের দিকে। পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে, অথচ পা যেন মেঝের সঙ্গে আটকে গেছে।
সায়র কোনো তাড়াহুড়ো করলো না। কাঁধে ঝোলানো সাদা তোয়ালে দিয়ে ধীরে ধীরে ভেজা চুল মুছতে মুছতেই কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে বেলার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে বিস্ময়ের ছাপ থাকলেও অযথা রাগ বা উত্তেজনার কোনো প্রকাশ নেই। বরং সে যেন পুরো ঘটনাটা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে।কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শান্ত, স্থির কণ্ঠে বললো,
—আমার রুমে কী করছিস?
মাত্র চারটি শব্দ। কিন্তু সেই চারটি শব্দই বেলার সমস্ত সাহস মুহূর্তের মধ্যে গলিয়ে দিলো।সে শুকনো ঢোক গিলে তোতলাতে তোতলাতে বললো,
—- আমি মানে আসলে আমি…
এরপর আর কোনো শব্দ বের হলো না। এতক্ষণ মাথার ভেতর যত অজুহাত ঘুরছিল, সব যেন এক নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো।সায়র এবার ধীরে ধীরে তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো। দুজনের মাঝের দূরত্বটা অনেকটাই কমে এসেছে। বেলা অজান্তেই এক পা পিছিয়ে যায়।
—আমি মানে কী বল দ্রুত?
গলায় আগের মতোই শান্ত ভাব। কিন্তু সেই শান্ত স্বরেই এক ধরনের দৃঢ়তা ছিলো, যা মিথ্যা বলার সুযোগই দিচ্ছিলো না।বেলা তাড়াহুড়ো করে পারফিউমের বোতলটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দিলো। তারপর জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বললো,
— রুমটা দেখছিলাম।
কথাটা বলেই নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে গেলো। এত বড় বাড়িতে হঠাৎ কারও ঘর দেখতে আসা এই অজুহাত যে একেবারেই হাস্যকর, বিশেষ করে সায়রের রুমের কোথায় কি আছে তার একদম মুখস্থ। সায়র ভ্রু সামান্য উঁচু করলো।
— তাই নাকি? আমার ঘরে এমন কী আছে, যা এত মনোযোগ সহকারে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে এসেছিস?
বেলা এবার চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য গভীর নিঃশ্বাস নিলো। তারপর মনে মনে বললো,
—মিথ্যা বলে আর লাভ নেই। ধরা তো পড়েই গেছি।
ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে খুব আস্তে বললো,
—আপনার পারফিউমটা একটু ব্যবহার করতে এসেছিলাম।
কথাটা শেষ করেই সে দাঁত দিয়ে নিজের নিচের ঠোঁট কাম’ড়ে ধরলো। মনে হচ্ছিল, এখনই হয়তো সায়র রাগে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দেবে।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ধমক এলো না।বরং কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে সায়র খুব শান্ত গলায় বললো,
—এতটুকু ব্যাপারের জন্য লুকিয়ে আসার দরকার ছিল?
বেলা মাথা তুলে তাকিয়ে বলে,
— আপনার কাছে চাইলে তো দিতেন না।
— কে বলেছে?
বেলা মন খারাপ স্বরে বলে,
— আপনি সব সময় বকা দেন আপনারা রুমের কোনো জিনিস ধরলে।
সায়র হালকা নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর ওর হাত থেকে পারফিউমটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে অনেকক্ষণ বোতলটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এরপর বললো,
—একটা কথা জানিস?
— কী কথা?
— মানুষকে দূর থেকে দেখে সব সময় ঠিকভাবে বোঝা যায় না। অনেক সময় আমরা নিজেরাই অন্যদের সম্পর্কে এমন কিছু ধারণা তৈরি করি, যেটার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিলই থাকে না।
বেলা নির্বাক হয়ে শুনতে লাগলো।সায়র আবার বললো,
— কোনো কিছু দরকার হলে সরাসরি বলবি। চু’রি করে নেওয়ার মতো করে লুকিয়ে আসার দরকার নেই।
বেলা তাড়াতাড়ি প্রতিবাদ করলো,
— আপনি আমাকে চো’র বলছেন? আমি তো চু’রি করতে আসিনি!
সায়রের ঠোঁটের কোণে খুব হালকা হাসি ফুটে উঠলো,
—তাহলে?
— শুধু একটু ব্যবহার করতাম। তারপর আবার রেখে দিতাম।
— সেটা তো চু’রিরই আরেক রকম সংজ্ঞা।
বেলা মুখ ফুলিয়ে বিড়বিড় করে বললো,
— উফ! আপনি সব কথার উল্টো মানে বের করেন।
সায়র আর কথা বাড়াল না।সে ধীরে ধীরে বেলার কাছাকাছি এসে বললো,
— ওড়নাটা ঠিক করে ধর ।
বেলা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলো,
— কী?
— ওড়নাটা সামনে ধর ইডিয়েট।
সে কোনো কথা না বলে ওড়নার এক পাশ এগিয়ে ধরলো।
পরের মুহূর্তেই সায়র খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ওড়নার ওপর দুবার পারফিউম স্প্রে করে দিলো। চারদিকে সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো মা’দকতাময় সুবাস।বেলা একদৃষ্টিতে সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই ছোট্ট ঘটনাটাও তার কাছে যেন অদ্ভুত মূল্যবান হয়ে উঠলো। কারণ সে বুঝতে পারছিলো, মানুষটা মুখে যতটা কঠোর, আচরণে ঠিক ততটা নয়।সায়র বোতলটা আবার জায়গামতো রেখে বললো,
— এবার হয়েছে?
বেলা ধীরে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলে,
— ধন্যবাদ।
— নিজের রুমে যা। আমি রেডি হবো একটু পর মসজিদে যাব। বাঁদরামি ছেড়ে পরিপাটি হয়ে নামাজ আদায় করবি।
বেলা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোধক বোঝিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলো। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছে আবার থেমে গেলো।কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পেছন ফিরে তাকালো। সায়র তখন আলমারি খুলে জামা বের করছে।বেলা মৃদু হেসে বললো,
—একটা কথা বলবো?
–বল।
—আপনার এই পারফিউমটা আমার খুব প্রিয়।
সায়র কোনো উত্তর দিলো না।বেলা এবার একটু সাহস নিয়ে যোগ করলো,
— তবে পারফিউমের ঘ্রানের চেয়েও একটা জিনিস বেশি ভালো লাগে।
সায়র ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
— কী?
বেলা ল’জ্জায় চোখ নামিয়ে খুব আস্তে বললো,
— যিনি এই পারফিউমটা ব্যবহার করেন… সেই হিটলার বেটাকে।
কথাটা শেষ করেই সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না। প্রায় দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সায়র কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।বেলার শেষ কথাগুলো যেন বারবার কানে বাজতে লাগলো। বিরক্তিতে কপালের র’গ ফুলে উঠলো। চোখ দুটো বুজে ধীর একটা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো সে। তারপর মাথা নেড়ে দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বললো,
—একবার তোকে একা পাই।এই ভালো লাগার ভূতটা স্কেল দিয়ে মে’রে তাড়াবো! ইডিয়েট একটা!
করিডোরে পা রাখতেই মমতাজ বেগমের দৃষ্টি গিয়ে থামলো বেলার ওপর। মেয়েটা সায়রের রুমের দিক থেকে প্রায় ছুটে নিজের ঘরের দিকে চলে যাচ্ছে। মুখটা অস্বাভাবিক লাল, চোখ নিচু, আর হাঁটার ভঙ্গিটা এমন যেন কোনো বড় অপরাধ করে ধরা পড়ে যাওয়ার ভ’য়ে পালাচ্ছে।তারপরই সে দ্রুত এগিয়ে গেলো সায়রের রুমের দিকে। দৃষ্টি গিয়ে থামলো সায়রের আধখোলা দরজায়।ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে সায়র। সদ্য গোসল সেরে জামা বের করছে। ড্রেসিং টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে পারফিউমের বোতল।মুহূর্তের মধ্যেই মমতাজ বেগমের চোখ-মুখ কঠিন হয়ে উঠলো।গত রাতের প্রতিটি দৃশ্য যেন একে একে মনে পড়ে গেলো। আড্ডার মাঝখানে বেলার অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে থাকা, সায়রের বারবার ওর দিকে খেয়াল করা, আর আজ সকালে এই দৃশ্য।তিনি দাঁত চেপে মনে মনে বললেন,
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৭
— আমি যা ভেবেছিলাম, তাহলে কি সেটাই সত্যি? না এটা আমি কখনোই হতে দেব না।বেলার দুষ্টুমি, ছেলেমানুষি আর বেহিসেবি স্বভাব দেখে সবাই হয়তো নিছক বয়সের দোষ বলে এড়িয়ে যাবে। কিন্তু আমি পারবো না। আমার ছেলের জীবন নিয়ে সামান্যতম ঝুঁ’কিও নিবো না । কখনোই না।
