Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৪

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৪

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৪
সিমরান মিমি

“ আপনি কি সত্যিই কিছু জানেন না, মিস্টার শিকদার?”
পরশ সূচালো দৃষ্টিতে ইনস্পেকটরকে পরোখ করলো। কলমটাকে চার আঙুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
— আমার কি জানা উচিত?
ইন্সপেক্টরের দৃষ্টি নড়বড়ে হলো। তিনি ভাবুক দৃষ্টিতে অন্যদিকে তাকালেন। কেসটার আগা-মাথা কিছুই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বললেন,
— কিন্তু শামসুল সরদার তো আপনার নামেই কেস করেছেন।
— সেটা সম্পুর্ন তার মর্জি। এমনিতেও আমার পেছনে কলকাঠি নাড়ানোর জন্য ভদ্রলোক ওঁৎ পেতে থাকেন। একটা সুযোগ পেয়েছেন, ওমনি তা কাজে লাগিয়েছেন।
— আপনাদের মধ্যকার সম্পর্ক সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট অবগত। এটা কোনো নতুন তথ্য নয়। প্রশ্ন হচ্ছে জলজ্যান্ত মেয়েটা যাবে কোথায়? দেড় দিন ধরে সে নিখোঁজ।
পরশ উত্তর দিতে দু – সেকেন্ডও সময় নিলো না। এরমধ্যেই বলে উঠলো,

— যাওয়ার জায়গার অভাব নেই। বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে পালাতে পারে, বাড়ি থেকে রেগে গিয়ে ভার্সিটিতে যেতে পারে, হলেও থাকতে পারে। তাদের ভেতরকার সম্পর্ক সম্পর্কে না আমি জানি, না তো আপনারা জানেন৷ তাই জলজ্যান্ত মেয়েটা কোথায় যেতে পারে সেটা তার জলজ্যান্ত বাপকে জিজ্ঞেস করুন, আমাকে নয়। আর তাছাড়াও যদি বিপদের কথা বলেন, তাহলেও সেটা অস্বাভাবিক নয়। মারামারি, কোপাকুপি, এর জমি দখল, ওর বাড়ি ভাঙচুর, মার্ডার করা এসব নিত্যদিনের সঙ্গী শামসুল সরদারের। তার প্রতিটা পা ফেলা জমিতেই নতুন করে শত্রুর বীজ জন্মায়। তাই তার মেয়ের ক্ষতি করার লোকের অভাব হবে না। আর সেজন্যই বলছি, আমার পেছনে সময় নষ্ট না করাই উত্তম।
ইনস্পেকটরের সন্দেহ এবারে গাঢ় হলো। তিনি যেনো আসামী ধরে ফেলেছেন। সেই উত্তেজনা নিয়েই বলে উঠলেন,
— আপনার কি মনে হয় – স্পর্শীয়া সরদার ভার্সিটিতে গিয়েছে কি-না, সেই খোঁজ না নিয়েই আমি আপনার কাছে এসেছি? আর যদি শত্রুর কথা বলেন, সেক্ষেত্রে আপনার চেয়ে বড় শত্রু আর কেইবা আছে এমপি সাহেবের?
পরশ তড়িৎ দৃষ্টি ঘুরিয়ে ইনস্পেকটরের দিকে তাকালো। তাচ্ছিল্য নিয়ে ক্ষীণ হেসে পুণরায় গম্ভীর হলো। ভারী আওয়াজে বললো,

— ইনস্পেকটর, ভণিতা কম করে আসল কথায় আসুন।
ইনস্পেকটর দত্ত এ পর্যায়ে নড়েচড়ে বসলেন। কন্ঠে আত্মবিশ্বাস এনে সম্পুর্ন নিশ্চিত হয়ে বললেন,
— নিখোঁজ হওয়ার দিন বিকালে স্পর্শীয়া সরদারকে আপনার সাথে দেখা গেছে, ক্যাফেতে। সেখানে আপনাদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়েছিলো । এমনকি স্পর্শীয়া আপনার গায়ে কফিও ছুড়ে মেরেছিলো। ওখানকার সিসিটিভি ফুটেজ কিন্তু আমাদের কাছেই আছে। এছাড়া ওইদিন সন্ধ্যায় এমপি সাহেবকে কল করে আপনার বাবা হুমকিও দিয়েছিলেন। এরপর পরই মেয়েটা নিখোঁজ। আপনার কাছে কি এসব নিছক কিছু কল্পকাহিনি মনে হচ্ছে?
জিভের ঢগা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো পরশ। মেয়েটা খুব জোড়ালো ভাবে ফ্যাসাদে ফেলেছে। সে এতোকিছুর পরেও দমলো না। একপ্রকার খামখেয়ালি করে বলে উঠলো,

— তো! এর মানে কি আমি স্পর্শীয়াকে কিডন্যাপ করেছি?
— হ্যাঁ, করতেই পারেন। কারন আপনার কাছে সম্পুর্ন মোটিভ আছে। মিস্টার শিকদার, আপনি একজন পাবলিক ফিগার। আমি চাইনা আপনার ইমেজ নষ্ট হোক। ভালোয় ভালোয় স্পর্শীয়া সরদারকে ফিরিয়ে দিন। নাহলে, টেনে – হিঁচড়ে থানায় নিয়ে যাবো।
পরশ ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো। রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে চোয়াল শক্ত করলো। ইচ্ছে করছে একটা ঘুঁষি মেরে নাক ফাঁটিয়ে দিতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আগামীকাল নির্বাচন। এই মুহুর্তে যত শান্ত থাকা যায়, ততই উত্তম। সে উপরন্তু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো। যেনো ইনস্পেকটরের কথায় তার কিছু যায়- আসে না। ঠোঁটে ক্রুর হাঁসি ফুটিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ইনস্পেকটরের কাছে। পেছন থেকে আলতো করে দু কাঁধে একপ্রকার থাবা বসালো। এরপর পানির গ্লাস টা সামনে দিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে বললো,

— মাইন্ড ফ্রেশ করার জন্য আপনার একটা ট্যুর দেওয়া উচিত ইনস্পেকটর। চিন্তিত হবেন না, ছয়মাস অথবা বছর — এটুকু সময় বান্দরবন বা রাঙামাটি থেকে ঘুরে আসেন। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
ইনস্পেকটর সাময়িক সময়ের জন্য ঘাবড়ে গেলেন। তিনি গত দেড় বছর যাবৎ এই থানায় আছেন। এসেই ক্ষমতাসীন দল সরদারদের হাত পড়েছে কাঁধে। তাদের নুন যেমন খেয়েছে, তেমনি গুণও গেয়েছে। বলতে গেলে তিনি প্রশাসনিক কর্মচারী কম, রাজনৈতিক নেতা বেশি। সময়ে- অসময়ে, ঠিক-বেঠিক যেকোনো কাজে সাহায্য করেছেন শামসুল সরদারকে। সে জন্যই এবার পরশ শিকদারকে ধরার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু হুট করে এই হুমকি শুনে কিছুটা চিন্তায় পড়ে যান। অতি দ্রুত শামসুল সরদারকে এই বিষয়ে জানাতে হবে। তিনি কিছুতেই বান্দরবান বা রাঙামাটিতে যেতে চান না। এখানেই তো শান্তিতে আছেন।
ভেতরে ভেতরে ইনস্পেকটর ঘাবড়ে গেলেও উপরন্তু নিজের তেজ নিয়েই থাকলেন। বের হওয়ার পূর্বে বললেন,
— অপেক্ষা করুন। কাল সূর্য ওঠার আগে আপনাকে হাজতে পুরবো।
ইনস্পেকটর বের হয়েই শামসুল সরদারকে কল করলেন। কিন্তু ওপাশ থেকে রিসিভড হলো না। পরপর বেশ কয়েকবার কল দেওয়ার পর রিসিভড হলো। হর্ণের তীব্র আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। শামসুল ব্যস্ত কন্ঠে বললেন

— ইনস্পেকটর, আমার মেয়ের খোঁজ পেয়েছো?
— না এমপি সাহেব। তবে চেষ্টা চালাচ্ছি। এই মাত্র পরশ শিকদারের ক্লাব থেকে কথা বলে বের হোলাম।
চেচিয়ে উঠলেন শামসুল। বললেন,
— বের হইছো মানে? ওই জানোয়ারের বাচ্চা এখনো জেলের বাইরে কেনো?
— গ্রেফতার করবো। আজ রাতের মধ্যেই করবো। আপনি চিন্তা করবেন না। তবে পরশ শিকদার তো আমাকে হুমকি দিয়েছে। বান্দরবান ট্রান্সফার করবে। আপনি একটু বিষয়টা দেখেন, আমি এখান থেকে যেতে চাই না।
শামসুল যেনো শুনেই শুনলেন না। একপ্রকার ধমক দিয়ে বললেন,
—জাহান্নামে যাও সবাই। আমার মেয়েকে আগে খুঁজে দাও।
কেটে গেলো ফোন। ইনস্পেকটর হতাশ হয়ে রওনা দিলেন থানায়। এমপি সাহেব নিশ্চয়ই কোথাও যাচ্ছে। তাড়াহুড়োয় নিশ্চয়ই মাথা গরম। এই সময়ে কথাটা বলা উচিত হয় নি।
ইনস্পেকটর বের হতেই পরশ কাউকে কল করলো। প্রায় দশ মিনিট কথা বলে এরপর ক্লান্ত শরীরটা চেয়ারে হেলিয়ে দিলো। দুহাতে চুলে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো কিছুক্ষণ। এতোটা চাপ নেওয়া যাচ্ছে না আর। দুশ্চিন্তা তারও কিছু কম হচ্ছে না। স্পর্শীয়ার থেকে লাস্ট একটা ভয়েস মেসেজ এসেছে। যেখানে অভিমানী মেয়েটা সম্পুর্ণভাবে তাকে দোষারোপ করেছে। অবশ্য করবেই না কেনো! এখানে যে আমজাদ শিকদারের সামান্য ভুল বোঝাটাই এতোকিছুর কারন, তা কে বোঝাবে। যদিও মেসেজ দেখার পরপরই স্পর্শীয়াকে কল করেছিলো। কিন্তু তাকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। হয়তো নাম্বার টা ব্লক করে দিয়েছে।

তবে এতো কিছুর মধ্যে স্পর্শীয়ার গায়েব হওয়াটা খুব করে ভাবাচ্ছে। তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য বাবা-মেয়ে কেউই এমনটা করবে না। আগামীকাল নির্বাচন৷ অথচ সমস্ত প্রচারণা ছেড়ে গত দেড় দিন ধরেই মেয়েকে খুঁজতে আকুল হয়ে ঘুরেছেন শামসুল সরদার। দলের একটা লোকও বাদ যায় নি। মাইকিং, পত্রিকা, পোস্টার কিছুই বাদ নেই। এটা নাটক হলে কিছুতেই শেষ সময়ে এসে সবটা ছেড়েছুড়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত হতেন না শামসুল।
যতবার’ই মাইকিং বা পোস্টারে ছাপানো ছবিটা চোখে পড়ে, ততবার’ই নিজের কাছে নিজেকে ছোটো লাগে পরশের। নিশ্চয়ই তার বাবার বলা কথাগুলোর পর স্পর্শীয়ার সাথে ঝামেলা হয়েছে শামসুল সরদারের। আর তারপরেই অভিমানী, জেদী মেয়েটা ঘর ছেড়েছে। সারাদিন নির্বাচনের ব্যস্ততায় এসবে মন দেওয়ার সময় পায় না। অন্যদিকে আত্মগ্লানিতে রাতে ঘুম ও হয়না। এক্ষেত্রে কিইবা করতে পারে পরশ? তার হাতেও বা কি আছে? যেখানে তার নিজের বাবা-মা ই জানে না স্পর্শীয়া কোথায় যেতে পারে। সেখানে দুদিনের আলাপে সে কি করে জানবে? তবে পরশ খুব করে চায় স্পর্শীয়া ফিরে আসুক। তার সাথে একবার দেখা করবে পরশ। মেয়েটা হয়তো পুরো সময় ঝগড়া করবে, কিন্তু পরশ নিশ্চুপ হয়ে শুনবে। সবশেষে ছোট্ট করে ‘ সরি’ বলে চলে আসবে।

খলিলুর সরদার ভঙ্গুর হয়ে বসে আছেন সোফায়। পাশে শোকে নিমজ্জিত ছেলেরাও আছে। সিড়ির উপর বসে আছেন সোনালী। কিছুক্ষণ পর পর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন। কেউ বুঝতেই পারছেন না ঘটনা কি হলো? সবটা ঠিকই তো ছিলো। মেয়েটা ঘরে ফিরলো, দরজা বন্ধ করে একাকী সময় কাটালো। এরপর, এরপর রাত দশটার দিকে যখন খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে গেলো। তখন আর নেই।ছাদ, বাগান, সারা বাড়ি খুঁজেও পাওয়া গেলো না। শুধু ক্লাবের ছেলেরা বললো সোভামের ফ্লাট থেকে কাঁদতে কাঁদতে নামছিলো। এরপর উধাও! কোথাও নেই।

খলিলুর সরদার ঠিক কোন শোকে পড়বেন ভেবে পেলেন না। কি হবে আগামীকাল? একদিকে স্পর্শীয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে আগামীকাল ভোট। কি হবে শেষ সময়ে। এতো এতো ছেলেপেলে। একবার ক্ষমতা থেকে ছিন্ন হলে আদৌ কি এই ছেলেগুলো নিজেদের বাড়িঘরে টিকতে পারবে? নাকি শহর ছাড়া হতে হবে। নাকি প্রাণ ও যাবে!
মাত্র’ই পদ্মাসেতু পার হলেন শামসুল। চিত্তে আর প্রগাঢ় আশা। সে সাভারে যাবে, আর সেখানেই দেখতে পাবে স্পর্শীকে। একদম সুস্থ, স্বাভাবিক, হাস্যোজ্জ্বল! নির্বাচনের চিন্তা তাকে ছুতেও পারছে না। দরকাই নেই এই ক্ষমতা। গত পনেরো বছর ধরে এসব আঁকড়ে ধরে ছিলো। এখন শুধু সুস্থ মেয়েটাকে প্রয়োজন। স্পর্শীয়ার নিখোঁজ হওয়ার পর সারারাত ধরে খুঁজেছেন। সে রাতে প্রায় তিন বার শিকদার বাড়ি গেছেন, এবং নিজে থেকে পুরো বাড়ি খুঁজেছেন। কিন্তু পান নি। পুরো সদর তোলপাড় করার পরেও যখন খুঁজে পান নি, তখন জানতে পারলেন সোভামও পিরোজপুরে নেই। কোনো এক কারনে ঢাকায় গেছেন। চোখেমুখে এক চিলতে আশা নিয়ে ছেলের নাম্বারে কল করেছেন। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেলের ফোন নাম্বার বন্ধ ছিলো। ভেবেছিলেন, দু- ভাই বোন ই তাদের মায়ের কাছে ফিরে গিয়েছেন। যেহেতু স্পর্শীয়া বাবার উপর রেগে বের হয়েছে, এর মানে সে অভিমান করে আছে এবং ফোন বন্ধ রেখেছে। এতোটুকু সান্ত্বনা দিয়ে সে রাত টা পার করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু মাঝরাতে সোভামের কলে সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা ভেঙে যায়।
এমনিতেই ছেলেটা কথা বলতে চায় না। এর মধ্যে কথা হয়েছে মাত্র চল্লিশ সেকেন্ড। স্পর্শীয়ার কথা জানতে চাওয়ায় বলেছে,

— আম্মু এক্সিডেন্ট করেছে, আমি তার কাছেই আছি। এখানে চড়ুই নেই। আর এতো চিন্তার কিছু নেই, মা অসুস্থ চড়ুই তা জানে।
‘চিন্তার কিছু নেই’ কথাটা শোনার পর থেকে আরেকটু সস্তি পেয়েছেন শামসুল। স্পর্শী ঢাকায় গেছে এ ব্যাপারে সোভাম অস্বীকার করেছে, আবার চিন্তা করতেও বারণ করেছে — এর মানে স্পর্শীয়া ওখানেই আছে, নাহয় কোথায় আছে সেটা সোভাম জানে।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ! এতোবছর পর সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে মেয়েটা তার কাছে এসেছে, অথচ সামান্য একটু বিষয়েই চলে গেলো। আবার দূরত্ব বাড়ুক, তা শামসুল চায় না। তাই সকালেই রওনা দিয়েছে ঢাকার উদ্দেশ্যে। তবে সবচেয়ে অগোচরে যে আকাঙ্ক্ষা টুকু রয়েছে, তা হলো তৃষ্ণা। এতোদিন ভালো থাকুক, মন্দ থাকুক — এ ব্যাপারে কিছুই জানতো না। কিন্তু এখন তো জানে তার তৃষ্ণা এক্সিডেন্ট করেছে। এটা শোনার পরেও কি করে না যেয়ে থাকবে। মেয়ের বাহানা দিয়ে নাহয় এক পলক দেখে আসুক। দু দিনের প্রচারণা বন্ধ হলেই কি ভোটার কমে যাবে? গেলে যাক। ভাগ্যে থাকলে ক্ষমতা হাতে আবারো আসবে।

সোভাম ভাবুক হয়ে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। মাথার মধ্যে চিন্তারা ভোঁ ভোঁ করছে। মাত্র’ই এক কলিগ ফোন দিয়ে স্পর্শীয়ার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা জানালো। মাইকিং হচ্ছে, পোস্টার ছাপিয়েছে এমনকি পুলিশ কেস ও হয়েছে। এগুলো তো আর ফেলনা হয়। তার মাথাটা এখন ফাঁকা লাগছে। মাকে দেখার লোক মাত্র দুজন। বিপাশা আর সে। সারাদিন বিপাশা মায়ের কাছে থাকে, সন্ধ্যার আগে সোভাম চলে আসে। আবার সকালে বিপাশা আসে, সে চলে যায় সারাদিনের জন্য ঘুমাতে। কাল সারাদিন ঘুমিয়েই ছিলো। অন্যদিকে ফোনটাও সুইচ অফ করে চার্জে দিয়ে রেখেছিলো বিধায় শামসুলের ফোন ধরেনি। সন্ধ্যার দিকে শামসুলের এতোগুলো কল দেখে ইচ্ছে করেই ব্যাক করেনি। ভেবেছিলো, মায়ের এক্সিডেন্টের কথা স্পর্শীয়া তাকে জানিয়েছে। তা জেনেই মায়ের সাথে কথা বলা বা তাকে দেখার জন্য সোভামকে ফোন দিচ্ছে। একপ্রকার রেগে সম্পুর্ন ভাবে অবজ্ঞা করেছিলো বাবাকে। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপে এতোগুলো কল দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারেনি। চিন্তা বাড়ছিলো তার। শেষমেশ নিজে থেকেই মাঝরাতে কল দেয়। তবে কথা বলে খুব অল্প সময়ের জন্য। শামসুলের প্রথম প্রশ্নই ছিলো,

“স্পর্শীয়া কি ঢাকায় গেছে, তোমার কাছে আছে?”
সরাসরি না করে দিয়ে ফোন রেখে দেয় সে। বুঝতেও পারেনা তার বোন গত দুদিন ধরে নিখোঁজ। ভেবেছিলো, হয়তো সকালে না বলে ঢাকা এসেছে। মা আসতে বারণ করেছে বলে হয় বাসায়, নাহয় খালামনির বাসায় আর নয়তো হলে উঠেছে। এই ভেবেই বাবাকে চিন্তা করতেও বারণ করেছিলো। তবে ওতো রাতে কাউকে আর বিরক্ত করেনি। কারন, বোনের ব্যাপারে একপ্রকার নিশ্চিত’ই ছিলো।
সকাল হলে বাসায় গিয়ে বোনের খোঁজ নেয়। সেখানে নেই স্পর্শীয়া। তা দেখে খালামনির কাছে ফোন দিয়ে জেনে নেয়। সেখানেও নেই। এরমানে নিশ্চিত রেগে-মেগে হলে উঠেছে। এটা নতুন কিছু না। এর পূর্বেই একটু হলেই রেগে হলে উঠেছে মেয়েটা। সারারাত নির্ঘুম থাকায় অবশেষে এ ব্যাপারে আর খোঁজ খবর নিলো না সোভাম। ঘুমিয়ে পড়লো। ঠিক সাড়ে বারোটার সময় উঠে খাবার নিয়ে হস্পিটালে পৌঁছালো। মাকে খাবার খাইয়ে, ওষুধ খাইয়ে ঘন্টাখানেক থাকবে পাশে। কিন্তু এর মধ্যেই কলিগের ফোন। পাশেই বসে আছে পিপাসা। ছেলের চিন্তিত মুখ দেখে কয়েকবার জানতে চেয়েছে কারন। কিন্তু প্রতিবার’ই কিছু না, কিছুনা বলে এড়িয়ে গেছে সোভাম।
এ পর্যায়ে মায়ের দিকে ঘুরে তাকালো। ব্যস্ত কন্ঠে বললো,

— আম্মু, উঠে বসো। তোমায় খাইয়ে আমি এক জায়গায় যাবো।
— কোথায়?
— একটা ফ্রেন্ডস আসবে। দেখা করতে যাবো।
চিন্তিত হলো পিপাসা। বাচ্চাদের মতো বলে উঠলো,
— ওই দিশার পাল্লায় কি আবার পড়েছিস নাকি?
সোভাম বিরক্ত হলো। বস্তুত সে ক্যাম্পাসে যাবে। হলে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে দেখে আসবে স্পর্শী ওখানে আছে কি-না। না হলে চিন্তায় শ্বাস নিতে পারবে না আর। ভেতরটা কেমন করছে। মাকে তাড়াহুড়ায় খাইয়ে কেবিন থেকে বের হতে যাবে, ওমনি নিস্তেজ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। দুবার পিছনে ফিরে পিপাসার অভিব্যক্তি দেখে নিলো সোভাম। তার মা যেনো মূর্তি হয়ে গেছে। শ্বাস টুকুও পড়ছে না। সময়টা থেকে গেছে ওই মুহুর্তে। শামসুল পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে চলে গেছেন। তার চোখের সামনে কিচ্ছু নেই। ঝাপসা দৃষ্টিতে শুধুমাত্র একটা নারী অবয়ব। আর কিচ্ছু নেই। হস্পিটালের বেডে মাথায়, হাতে ব্যান্ডেজ নেওয়া সেই ছোট্ট দেহটা — যা ছিলো তার কাছে রত্নের মতো। অথচ ভাগ্য তার নিখাদ ভালোবাসা টুকুকে এতোটাই কলঙ্কিত করেছে, যে তার মুখ থেকে ভালোবাসা শব্দটা শুনেও যে কেউ ঘৃণা করবে।

— আপনি এখানে কেনো এসেছেন? কে দিয়েছে এড্রেস?
শামসুল চমকে ছেলের দিকে তাকালেন। চোখের জলটুকুকে আড়াল করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে বললেন,
— স্পর্শীয়া বলেছিলো। বাসায়’ই গেছিলাম। পাশের ফ্লাটের দারোয়ান বললো এই হস্পিটালে আছো।
— এসেছেন কেনো?
সোভামের কন্ঠে হুংকার। তার মা নিস্তেজ হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে দুচোখ বন্ধ করে। এতোটা প্রেশার সে নিতে পারছে না। বেশ কয়েকজন রোগী, নার্স উঁকি দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, বিশৃঙ্খলা করলো না। বললো,
— স্পর্শীয়া কোথায়? আমি ওকে জিজ্ঞেস করবো – বাবাকে এতোটা কষ্ট দেওয়ার কারন কি? আমাকে বলে আসলে কি আমি বাঁধা দিতাম।
পিপাসা চমকে ছেলের দিকে তাকালো। বললো,
— স্পর্শীয়া, স্পর্শীয়া এখানে এসেছে? কই, হস্পিটালে তো আসে নি।
— না আম্মু। স্পর্শীয়া আসেনি। ওর ফোন ই বন্ধ।
সোভামের কথা শুনে শামসুল হতভম্ব হয়ে গেলেন। চিৎকার করে বললেন,
— আসে নি মানে? ও এখানে আসেনি, তাহলে কোথায় গেছে? পিরোজপুরের কোথাও নেই। গত দু দিন ধরে নিখোঁজ। পুলিশ ও কিচ্ছু বলতে পারছে না।
পিপাসা যেনো জ্ঞান হারাবেন। খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেড থেকে নামলেন। চেঁচাচ্ছেন কম কাঁদছেন বেশি। এভাবেই অস্পষ্ট শব্দে বললেন,

— আমার মেয়ে দুদিন ধরে নিখোঁজ, আর আপনি এখন জানাচ্ছেন? ওতো আপনার কাছে ছিলো। তাহলে গেলো কোথায়? আমার স্পর্শী কোথায়? সোভামম!!!!!
সোভাম এবার নিজেই দিশেহারা। কাকে সামলাবে সে? এদিকে শামসুল বসে পড়েছেন টুলে, নিথর হয়ে। তাদেরকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে বললেন,
— আচ্ছা, আচ্ছা, চিন্তা কোরো না। চড়ুই মনে হয় হলে উঠেছে। আমি খোঁজ নিচ্ছি।
সে কদম বাড়াতেই শামসুল বাঁধা দিলেন। বললেন,
— হলে নেই। পুলিশ খোঁজ নিয়েছে। আমার মেয়েটা গেলো কোথায়? ও কোথায় যেতে পারে!!!
পিপাসা আর ভর রাখতে পারলেন না। ভেঙেচুরে বসে পড়লেন ফ্লোরে। শামসুলের দিকে তর্জনী উঁচিয়ে বললেন,
— এই লোকটার কাছে ছিলো আমার মেয়ে। কি করেছেন ওকে। এক্ষুণি খুঁজে দিন।
এরপর সোভামের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— এই লোকের নিজের’ই কোনো নিরাপত্তা নেই। ঘরের মধ্যেও শত্রু। যে কোনো দিন, যে কোনো জায়গায় গুলি খেয়ে মরতে পারে। তুই জেনেবুঝেও আমার মেয়েটাকে কেনো রেখে এলি? আমার, আমার স্পর্শীয়া বেঁচে আছে তো!
শামসুল প্রত্যুত্তর করলেন না। তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। শরীরটা অবশ হয়ে যাচ্ছে, যেনো এক্ষুণি মরে যাবেন। শুধু অসহায় কন্ঠে ছোট্ট করে বললেন,

— স্পর্শীয়া কোথায় যেতে পারে?
সোভাম নিজেকে আর সামলাতে পারলো না। চেঁচিয়ে উঠে বললো,
— আমার বোন কোথায় যেতে পারে, সেটা আপনি জানবেন। কত শত শত্রু বানিয়ে রেখেছেন তা আপনি জানেন। ওর এইটুকু খেয়াল রাখতে পারবেন না তো দায়িত্ব কেনো নিয়েছিলেন। আমায় বলে দিতেন, যে আমি অক্ষম। ছেলেমেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারবো না। তুমি তোমার বোনকে নিয়ে যাও।
ঘরটা মিনিট খানেকের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রত্যেকেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বসে রইলো। এরইমধ্যে শামসুল সরদারের ফোন বেজে উঠলো। কিন্তু তা তোলার শক্তি পেলেন না তিনি। সোভাম এগিয়ে এসে ফোন হাতে নিলো। রিসিভড করে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কন্ঠে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৩

— এমপি সাহেব, আমি ইনস্পেকটর দত্ত বলছি। এখানে গাবখান ব্রিজের নিচে একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। মুখটা এতোটা ভয়ংকর ভাবে থেবড়ে আছে যে চেহারা বোঝা যাচ্ছে না। আপনি একটু আসবেন। আশা করছি, এটা স্পর্শীয়া নয়।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৫