Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৩

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৩

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৩
সিমরান মিমি

সন্ধ্যা পরবর্তী সময়। শীতের ঠান্ডা হাওয়া শরীরকে হিম করে দিচ্ছে। ক্ষীণ শিশিরও পড়তে শুরু করেছে ধরণীতে। তবুও বারান্দা থেকে সরলেন না শামসুল সরদার। গায়ের চাদর টা এলোমেলো ভাবে কাধে পড়ে আছে। কিন্তু তাও ঠিক করছেন না। যেনো হিমশীতল এই ঠান্ডা আবহাওয়া তাকে ছুতে পারছে না। হৃদয়ের বিষাদ আর ক্রোধের সামনে সবই মাথা নুইয়ে পড়েছে। এমন সময় দরজায় খুট করে আওয়াজ হলো। স্পর্শীয়া অতি সাবধানে ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিলো। সারা রুমে চোখ বুলিয়েও যখন বাবাকে দেখলো না, তখন নজর দিলো বারান্দার দিকে। দরজা পুরোপুরি খোলা। হুরহুর করে ভেতরে বাতাস ঢুকছে। স্পর্শীয়া এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালুতে ঘষে শীতের উপস্থিতি জানান দিলো। জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে প্রবেশ করলো বারান্দায়। পরপর’ই চমকে উঠলো। বাবাকে এই ঠান্ডায় অন্ধকার বারান্দায় দেখে সে আঁতকে উঠলো। শাসনের সুরে বললো,

— একি! তুমি এই ঠান্ডায় বারান্দায় বসে আছো কেনো? আব্বু, ভেতরে আসো। ঠান্ডা লাগবে।
আদরের মেয়ের এতটুকু যত্ন টলাতে পারলো না শামসুলকে। তিনি পূর্বের ন্যায় গম্ভীর হয়ে রইলেন। চোখমুখে কাঠিন্য, চোয়াল শক্ত। বসে আছেন নির্বিকার হয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে। স্পর্শীয়া এবারে বাবার কাধে হাত রাখলো। বললো,
— আব্বু, রুমে চলো। কি হয়েছে তোমার? কোনো কিছু নিয়ে কি চিন্তিত? আরে বাবা, দুশ্চিন্তার সাথে ঠান্ডায় বসে থাকার কি সম্পর্ক?
শামসুলের থেকে কোনো উত্তর এলো না। তবে চেয়ার থেকে উঠলো ঠিকই। চাদর টাকে গায়ে জড়িয়ে চুপচাপ চলে এলো রুমে। খাটে বসে গম্ভীর হয়ে বললেন,
— দরজা দিয়ে এখানে বসো।
স্পর্শীয়া তাই করলো। দরজা দিয়ে ফুরফুরে মন নিয়ে এসে বসলো খাটে। বললো,
—হ্যাঁ, এবার বলো।
— বিকালে কোথায় ছিলে?
স্পর্শীয়ার কলিজাটা খামচে ধরলো হঠাৎ। শামসুলের প্রশ্ন শুনে ঘাবড়ে গেলো তৎক্ষণাৎ। বাবা কি তবে কিছু জেনে ফেলেছে? — প্রশ্নটা উদয় হলো মস্তিষ্কে। সে এলোমেলো কন্ঠে বললো,

— এই তো বাইরে ছিলাম। একটু ঘুরতে বেরিয়েছিলাম।
— কার সাথে?
এবারে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলো স্পর্শী। মন বলছে বাবা সব জানে। এ নিয়ে মিথ্যা বললে সে অবিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু ঘটনাটাই এমন যে তা স্বীকারও করা যাবে না। সে ইনিয়েবিনিয়ে বললো,
— একটা ফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গেছিলাম, আব্বু।
শামসুল সন্দেহের চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন। তিনি আমজাদকে বিশ্বাস করেন না। কিন্তু হুট করে এতোবছর পর এমন জোর খাটিয়ে কেউ মিথ্যাও বলবে না। পুরোটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। মেয়ের সম্পর্কে এমন বাজে- ঘৃণ্য শব্দগুলো হজম করতে পারছেন না। কিন্তু স্পর্শীয়ার এমন হালকা ভাবে প্রশ্নের উত্তর দেওয়াও সন্দেহজনক। তিনি কন্ঠে জোর আনলেন। বললেন,

— আমি সেই ফ্রেন্ডের ব্যাপারেই জানতে চাইছি। কে সে?
— আব্বু, তুমি চিনবে না। আর এসব কথা কেনো বলছো হুট করে?
শামসুল মেয়ের ঘাবড়ানো মুখশ্রী দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তবুও জোড়ালো ভাবে প্রশ্ন করে বললেন,
— তুমি কি বিকালে পরশ শিকদারের কাছে ছিলে? হ্যাঁ বা না।
মাথা নুইয়ে ফেললো স্পর্শীয়া। বুকের ভেতরটা ধুকপুক ধুকপুক করছে। সে মাস্ক পড়ে গেছিলো। তবুও কি কেউ চিনতে পেরেছিলো! উফফফ! এভাবে ধরা পড়ে যাবে তা কল্পনায়ও ভাবে নি। সে উপরনিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। মেয়ের সম্মতি পেয়ে শামসুল বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে। তবে তা রাগে নাকি মেয়ের প্রতি অভিমানে, বোঝা গেলো না। শামসুল বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। বললো,
—পরশের সাথে তোমার কি সম্পর্ক?
স্পর্শীয়া আঁতকে উঠলো। বাবা কি তবে সন্দেহ করছে। কিন্তু এমন তো কিছুই নেই। সে ব্যস্ত কন্ঠে বললো,
— আব্বু, কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের।
— তবে দেখা কেনো করতে গেছিলে?

এই প্রশ্নের উত্তরে আটকে গেলো স্পর্শী। কি বলবে বাবাকে? এটাই যে তারা দুজনেই একটা প্রেম, প্রেম খেলায় মেতে উঠেছিলো। এমন হলে তো শামসুল সরদার দাবানল বাঁধিয়ে দেবে। স্পর্শী কোনো কথা ভেবে পেলো না। মেয়ের নিরবতা দেখে শামসুল আবারো নিঃশ্বব্দে চেয়ে রইলেন। তবে কি আমজাদ ভুল নয়। স্পর্শী কি আসলেই তার ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে? উফফ! বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠলো শামসুলের। তিনি মেয়েকে বুঝদার ভেবেছিলেন। অথচ সবটা জানার পরেও তার মেয়েটা বুঝলো না। একবারও চিন্তাও করলো না – এই সম্পর্ক একটা ভয়ংকর ফাঁদ। শুধুমাত্র আয়জার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য স্পর্শীয়াকে ফাঁসিয়েছে। যাতে শামসুলের বুকটা পদে পদে রক্তাক্ত করতে পারে।
তিনি আবারো বললেন,

— ওর সাথে দেখা করেছো, সেটা আমার কাছে লুকালে কেনো?
স্পর্শী মাথা নিচু করে ভাঙা কন্ঠে বললো,
— তুমি রাগ করবে তাই।
আর মেজাজ সামলাতে পারলেন না শামসুল। সশব্দে চেচিয়ে উঠে বললেন,
— যদি জানোই আমি রেগে যাবো তাহলে সম্পর্কে জড়ালে কেনো? জানো, তোমার জন্য কতটা বিশ্রী কথা শুনতে হয়েছে আমাকে?
স্পর্শী বাবার শাসনে অভ্যস্ত নয়। সদ্য আদরে মজে থাকা মেয়েটা হঠাৎ’ই শামসুলের শাসন এবং রাগের সামনে পড়ে গুমরে উঠলো। ভাঙা গলায় বললো,
— বিশ্বাস করো আব্বু, পরশ শিকদারের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
— আমি বিশ্বাস করলে কি এসে যায়? কেনো তুমি ওই ছেলের সাথে দেখা করতে যাবে? আর কেনোই বা আমি শিকদারদের নোংরা কথা শুনতে যাবো?

এই বলে তিনি ফোনটা ছুড়ে মারলেন বিছানায়। এরপর বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। স্পর্শী হু হু করে কেঁদে উঠলো। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখলো, সেখানে কল রেকর্ডিং চলছে। সে তৎক্ষণাৎ ফোন হাতে নিলো। কে কল দিয়েছিলো? আর কিইবা বলেছে? বাবাই বা কেনো রেকর্ড টা তাকে শোনানোর জন্য ফোন ফেলে গেছে। সে পুণরায় শুরু থেকে রেকর্ডিং ছাড়লো। পুরোটা শোনার পর স্তব্ধ হয়ে গেলো। লজ্জায়, ঘৃণায় গুমরে উঠলো। তার বাবার কাছে তার সম্পর্কে এতোটা নোংরা কথা বলেছে, তা ভাবতেই গা গোলাচ্ছে। সে তৎক্ষনাৎ রেকর্ডিং টা নিজের ফোনে নিয়ে বাবার ফোন থেকে ডিলিট করে দিলো। এতোসব ঘটনা কি তবে তার বাবা বিশ্বাস করে নিলো? না করলেও, এসব শোনার পর কি করে বাবার সামনে দাঁড়াবে স্পর্শী? লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। দ্রুত ছুটে নিজের ঘরে চলে গেলো। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বসে পড়লো ফ্লোরে। রাগে, ঘেন্নায় সারা শরীর কাঁপছে। ফোনটা হাতে নিয়ে রেকর্ড টা পরশ শিকদারকে পাঠালো। সাথে ছোট্ট করে ভয়েস দিলো —

— ছিহ! তবে এই ছিলো আপনার পরিকল্পনা? কতটা জঘন্য, নিচু আপনি। এতোটা নোংরা কথা কিভাবে বললেন আমার সম্পর্কে? তাও নিজের বাবাকে দিয়ে। লজ্জা করলো না? চরিত্রহীন, অসভ্য, বর্বর। বেজন্মার মতো ভাবনা — চিন্তা। শুনে রাখুন, আমি কখনোই ক্ষমা করবো না আপনাকে। এই ঘটনার বিপরীত প্রতিক্রিয়া ঠিক পাবেন, তাও খুব ভয়ংকর ভাবে।
স্পর্শীয়া ওভাবেই ঠান্ডা ফ্লোরের উপর বসে রইলো। কিছুক্ষণ কাঁদলোও। মনটা ভালো লাগছে না। মাকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ বসে থাকলে মনটা হালকা হতো। এতোগুলো বছর পর বাবা নামক বটগাছটা পেলো, তাও সকলের বিরুদ্ধে গিয়ে। অথচ এই কটা দিনেই সবটা শেষ হয়ে গেলো। নিজের সম্মান টুকু ধরে রাখতে পারলো না। তার করা হটকারি সিদ্ধান্তের কারনে অন্যকেউ বাবার দিকে আঙুল তুললো, তার মেয়েকে নিয়ে নোংরা কথা বললো। অথচ সে কোনো কিছুই ভুল প্রমাণিত করতে পারলো না। করবেই বা কিভাবে? সে তো যেচে পরে ভুলগুলো করেছে। এখন এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পূর্বের মেসেজ বা কল রেকর্ড গুলো যদি ফাঁস করে দেয়— যেখানে পরশকে ফাঁদে ফেলার জন্য নানাভাবে নরম, প্রেমময় বাক্যলাপ করেছে স্পর্শীয়া। তবে? তবে তো কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। স্পর্শীয়ার নিজের প্রতি ঘৃণা ক্রমশ বাড়তে লাগলো। বাবা কি সত্যিই ভাবছেন, তার মেয়ে চরিত্রহীন। সে তার সম্মান রক্ষা করতে পারে নি।

এসব ভেবে স্পর্শীর আরো উৎকন্ঠা বাড়তে লাগলো। কি করে ওই মানুষটার মুখোমুখি হবে? স্পর্শীয়া কি আদৌ বাবার সাথে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে আর? শামসুলও কি মেয়েকে আর বিশ্বাস করবে, চোখ তুলে দেখবে মেয়েকে। পূর্বের মতোই ভরসা রাখবে!!!
নাহ! এভাবে আর সম্ভব নয়। আত্মগ্লানিতে ভুগে একসময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো স্পর্শীয়া। সাথে কিছু টাকা আর ফোন। সঙ্গে বাবার জন্য ছোট্ট একটা চিরকুট। যাতে লেখা –
“ আমায় অবিশ্বাস করো না আব্বু, প্লিজ! মানছি, আমি ভুল করেছি। তোমাকে কিছু না জানিয়েই হুট করে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। তোমার প্রতি শিকদার দের করা অত্যাচার গুলো মেনে নিতে পারনি। ভেবেছিলাম, পরশ শিকদারের সাথে ভালো সম্পর্কের অভিনয় করে তাকে ফাঁদে ফেলবো। এরপর ছেড়ে দেবো। আর সেই সম্পর্কের মায়া ভুলতে না পেরে আমজাদ শিকদার সহ সবাই যেনো সরদার বাড়িতে এসে তোমার পায়ের কাছে থাকে। কিন্তু হুট করে মনে হলো আমি বাচ্চামি করছি। এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হয়নি। তাই আজ বিকালে দেখা করে সমস্ত টা ভেঙে দিয়েছি। এর বেশি আর কিচ্ছু নয়। মাত্র অল্প কয়েকদিনের সিদ্ধান্ত। আর আজকেই প্রথম দেখা করছি। এ ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। প্লিজ তুমি ওদের কথা বিশ্বাস করো না। ”
চিঠি’টা ভাজ করে শামসুল সরদারের ফোনের নিচে রেখেছে স্পর্শীয়া। এরপর চুপচাপ বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে।

রাত প্রায় সাড়ে আট’টা। শীতের আকাশটা ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে আছে। যেনো দূরের কোনো দিগন্তে আগুন লেগেছে প্রবল ভাবে। কুয়াশার আস্তরণে চাঁদটাও দেখা যাচ্ছে না। স্পর্শীয়া রিকশা ধরে সদরে চলে এলো।। সোভামের বিল্ডিং এর সামনে এসে গেটের চাবি বের করলো। তার কাছে এই গেটের ডুপ্লিকেট চাবি রয়েছে। আজ বাড়িতে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। প্রচুর অসস্তি হচ্ছে। ফ্লাটের সামনে বড় একটা তালা ঝুলে আছে। স্পর্শীয়া খানিক বিরক্তি নিয়ে তাকালো। না জানি কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে! সে দাঁড়িয়ে রইলো দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে। প্রায় দশ মিনিট অপেক্ষা করার পর মনে প্রশ্ন জাগলো — আসলেই কি সোভাম অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরবে? নাকি কোথাও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে গেছে। স্পর্শীয়া আর কালক্ষেপন করলো না। দ্রুত কল লাগালো ভাইয়ের নাম্বারে। রিসিভড হতে বেশ বেগ পোহাতে হলো স্পর্শীয়াকে। প্রায় পাঁচ – ছয়বার কল করতে হয়েছে। সোভাম তাড়াহুড়ো কন্ঠে বললো,

— কি হয়েছে? বল।
— তুই আছিস কোথায়? বাসায় আসতে কি দেরি হবে?
সোভাম ভণিতা করলো না। বললো,
— সাভারে আছি। কবে ফিরবো জানিনা।
“ এই ওষুধ’টা খাও ” — সোভাম কাউকে এ কথা বললো। তা শুনে স্পর্শীয়া আরো চমকালো। কপাল ঘুচিয়ে বললো,
— সাভার মানে? তুই হুট করে ওখানে কেনো গেলি? কি হয়েছে?
— আম্মু এক্সিডেন্ট করেছে।
স্পর্শীয়া আঁতকে উঠলো। আর্তনাদ করে বললো,
— এক্সিডেন্ট করেছে! কবে করেছে, কিভাবে? আমাকে জানালি না কেনো? তুই আমায় ফেলে রেখে একা কেনো গিয়েছিস?
সোভামের সারামুখ বিরক্তিতে ছেয়ে এলো। সে ধমক মেরে বললো,

— কেনো? তোকে জানানোর কি আছে? আম্মু জানাতে চায় নি, তাই বলি নি। এখন রাখ। আনি ব্যস্ত আছি।
স্পর্শীয়া দ্বিমত করলো না। কাউকে টু শব্দটিও অভিযোগ করলো না। তার কান্না পাচ্ছে। এতোটাই পর হয়ে গেছে যে, এক্সিডেন্টের কথা টুকুও জানালো না। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলো। ধরা গলায় বললো,
— আচ্ছা, কোন হস্পিটাল সেটা বল। আমি এক্ষুণি রওনা দিচ্ছি।
স্পিকার লাউডে দেওয়া ছিলো। স্পর্শীয়ার সমস্ত কথাপোকথন শুনলো পিপাসা। যখনই দেখলো স্পর্শীয়া আসছে, তখন অভিমানে আটখানা হলো। চেঁচিয়ে উঠে বললো,
— কোনো দরকার নেই। তুই আসবি না। সোভাম৷ ওকে হস্পিটালের ঠিকানা দিবি না। তাহলে ওষুধ খাবো না আমি। আমার কোনো মেয়ে নাই। আমার শুধুমাত্র একটা ছেলে।
স্পর্শীয়া হু হু করে কেঁদে উঠলো। বললো,

— আম্মু প্লিজ! একটু শান্ত হও। আমার তোমাকে অনেক কিছু বলার আছে।
— আমি তোর থেকে কিছু শুনতে চাই না। আল্লাহ যেনো তোকে আমার জীবিত মুখ না দেখায়। তোর মতো মেয়ের মুখও যেনো আমি আর না দেখি। তুই সাভারে আসার আগেই যেনো আমি মরে যাই। তুই আসবি না। সোভাম, ও যেনো না আসে।
পিপাসা ক্রমশ ছটফট করে উঠছে। জমিয়ে রাখা অভিমান টুকু আজ প্রবল ভাবে গ্রাস করেছে। সোভাম তাকে শান্ত করতে বললো,
— শান্ত হও। আসবে না ও। ওকে এড্রেস দিবো না।
এরপর স্পর্শীর উদ্দেশ্যে থমথমে গলায় বললো,
— তোর এখানে আসার কোনো দরকার নেই। আমি আছি। তাছাড়া রাহুল, খালামনিও আছে। মা অসুস্থ, শুধু শুধু এখন এসে অসুস্থ মানুষ টাকে আরো অসুস্থ করে দিস না।
স্পর্শীয়া ইতোমধ্যে প্রায় বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌছেছে। সোভামের লাস্ট কথা টুকু শুনে গম্ভীর হয়ে গেলো। অস্ফুটস্বরে বললো,
— ওহহহ!
এরপর অভিমানে জর্জরিত হয়ে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩২

— তুই চাইলেই আমাকে সঙ্গে নিতে পারতিস। আসলে মেইন সমস্যাই হচ্ছে তোর। তুই না নিজে কিছু বুঝতে চাস, আর না তো মাকে কিছু বোঝাতে চাস। তুই কখনোই চাস না — মা একটা সংসার পাক। তার ফেলে রাখা সাজানো সংসারটাতে আবার ফিরে আসুক।। নিজের মনে সাজিয়ে রাখা একটা ভ্রান্তি থেকে বের হয়ে আসুক। আব্বু শেষ বয়সে স্ত্রী- সন্তান নিয়ে একটু ভালো থাকুক। কিচ্ছু চাস নি তুই। কিচ্ছু না। তোর উদ্দেশ্য আজীবন মা সাভারের একটা ভাড়া বাসাতে থাকুক। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত পার্লারের ঘানি টেনে সংসার সামলাক। আর তুই নিজের চাকরি সুত্রে একেক জায়গায় যা, আর সেখানে সংসার পাত। সার্থপর তুই! তুই মায়ের ভালো টা কখনো দেখলি না। কই, এখন তো আপত্তি করিস না মায়ের পার্লার নিয়ে? অথচ গার্লফ্রেন্ড থাকাকালীন তার কথায় প্রতিদিন এ নিয়ে ঝগড়া করতি। আজ মা পার্লারে যেতে – আসতেই এক্সিডেন্ট টা করেছে। তোর জন্য হয়েছে এসব!!!

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৪