Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩২

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩২

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩২
সিমরান মিমি

স্পর্শীয়া বাড়িতে যেতে যেতে সন্ধ্যা নামিয়ে ফেললো। হাতের ব্যাগটা অযত্নে হাতের মুঠোয় কুচকে ধরে এলোমেলো পায়ে গেটের ভেতরে প্রবেশ করলো। বিরক্তি এবং হতাশায় মেজাজ হয়ে আছে উত্তপ্ত। লোকটা তাকে অসুন্দর, কুৎসিত বলে অপমান করেছে, হেসেছে, তাচ্ছিল্য করেছে — এতে তার প্রতি বেজায় রাগ এবং বিরক্তি। অন্যদিকে প্রথমবার কোনো পুরুষ তাকে এভাবে এভোয়েড করলো। নাকটা উঁচু করে কি সুন্দর অবলীলায় বলে দিলো – স্পর্শীয়ার প্রতি ফিলিংস কাজ করে না। চরম হতাশায় নিজের প্রতিই ঘৃণা হচ্ছে। কোন আক্কেলে যে এই লোকের সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতে গেলো! এবার নিশ্চয়ই সে ভাববে, স্পর্শী তার প্রেমে পাগল।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন শামসুল সরদার। খলিলুর সহ আরো কয়েকজন লোক সেখানে উপস্থিত। সামনে নাস্তার ট্রে। পরশু নির্বাচন। সে কারনেই হয়তো আলোচনায় বসেছেন। স্পর্শীয়া বাড়িতে ঢুকে চুপচাপ হেঁটে গেলো সিঁড়ির দিকে। বাবা একা থাকলে হয়তো পাশে এসে খানিকক্ষণ বসতো। বুকে মাথা রেখে মনের এই অস্থিরতা দূর করতো। শামসুল সরদার হঠাৎ আলোচনা রেখে মেয়ের দিকে তাকালেন। ঝরঝরে কন্ঠে বললেন,

— কাল থেকে বাইরে কোথাও গেলে আছরের আগে বাড়িতে আসবে। সামনে নির্বাচন, পরিস্থিতি ভালো না। বুঝেছো?
স্পর্শী পা থামিয়ে বাবার কথা শুনলো। দ্বিমত পোষণ না করে বললো,
— ঠিক আছে আব্বু।
মন , মেজাজ বড্ড খারাপ। সে আর নিজের ঘরে গেলো না। সিঁড়ির পাশেই আর্শিয়ার ঘর। ভেতরে লাইট জ্বলছে না। তবে দরজা হা করে খুলে রাখা। ভর সন্ধ্যাবেলায় মেয়েটা কি এখনো ঘুমিয়ে আছে? স্পর্শীর কৌতূহল বাড়লো। এমনিতেও খুব একটা কথা বলা হয় না। প্রয়োজন ছাড়া কখনোই আলাপ হয়নি। যতটুকুও বা হয়েছে তাতে শুধু হু, হা উত্তর এসেছে। আর্শির আচরণে শুধু অসস্তি আর জড়তা প্রকাশ পেয়েছে। যা দেখে পরবর্তীতে আর কথা বলার ইচ্ছে জাগেনি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কোনোভাবে নাস্তা সেড়ে কলেজে চলে যায়। দুপুরে এসে সেই যে ঢোকে, প্রায় সময়েই সোনালী খাবার টা আর্শির রুমে দিয়ে যায়। এরপর সারা বিকেল বসে থাকে বদ্ধ ঘরে। কখনো সন্ধ্যার দিকে একবার ড্রয়িং রুমে নেমে চক্কর কাটে, আবার কখনো কখনো রাতের খাবারের টেবিলে ছাড়া দেখাই যায় না। এভাবেই চলছে তাদের সম্পর্ক।

স্পর্শীয়া কৌতূহল বশত খোলা দরজার ভেতরে উঁকি মারলো। নাহ, আর্শি ঘুমিয়ে নেই। তার শরীর নড়ছে। কম্ফোর্টারের উপর দিয়েই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ভ্রুঁ কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে রইলো স্পর্শী। ঘরের আলো নেভানো, দরজা এভাবে খোলা। জানালা টাও কিঞ্চিৎ ফাঁক আছে। সেখান থেকে হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে ভেতরে। অথচ তাও বন্ধ করছে না। তাহলে নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে আছে। এদিকে শরীরটাও হালকা নড়ছে। আবার ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে এমন করছে না তো?
মনে সন্দেহ জাগতেই সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো ভেতরে। আলো না জ্বালিয়েই আলগোছে মাথার কাছে দাঁড়ালো। গায়ে হাত ছুঁইয়ে বলে উঠলো,
—তুমি কি ঘুমিয়েছো?
আচমকা শিয়রের কাছে স্পর্শীর আওয়াজ শুনতেই বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হওয়ার ন্যায় ছিটকে খাটের ওপাশে গিয়ে বসলো। ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে তার। হাতের ফোন চিৎ হয়ে পড়ে আছে পাশেই। আর্শি ফোনের দিকে তাকিয়ে আরো ঘাবড়ে গেলো। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে পাভেলর ফটো। সে তড়িঘড়ি করে ফোন চেপে ধরে কম্ফোর্টারের মধ্যে লুকালো। এরপর ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো স্পর্শীর দিকে। যদি সে সত্যিই ছবিটা দেখে ফেলে, তাহলে কি উত্তর দেবে আর্শি??

এখনো ঘটনার কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না স্পর্শী। তাকিয়ে আছে এক ভাবেই। তার কন্ঠ শুনে আর্শি এমন ভূত দেখার মতো চমকে যাওয়া বড্ড ভাবাচ্ছে। আবার ফোন লুকিয়ে ফেলা, ঘাবড়ে গিয়ে তাকানো — এসব বড্ড সন্দেহজনক। স্পর্শী নিজের চাহনি স্বাভাবিক করলো। ফোনের স্ক্রিনে একটা ছেলের ছবি ছিলো, বড্ড পরিচিত। তবে উলটো দিকে দাঁড়িয়ে থাকায় খুব একটা বুঝে উঠতে পারে নি। এরমধ্যেই লুকিয়ে ফেলেছে ফোন টাকে। তবে কি ছেলেটা আর্শির প্রেমিক? এই বয়সেই মেয়েটা প্রেম করে বেড়াচ্ছে! তার ইচ্ছে করলো একবার জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু লজ্জায় পারলো না। যদি আর্শিয়া সত্যিই বলে বসে, হ্যাঁ সে প্রেম করছে। তবে বড় বোন হয়ে তা কিভাবে কান দিয়ে শুনবে? এতো বড় হওয়ার পরেও কপালে প্রেম জুটলো না। যাও ভেবেছিলো, একজন ফাঁদে পড়েছিলো — তাও আবার ফেক। উলটো তাকেই ফাঁদে ফেলার চেষ্টায় ছিলো ওই আহাম্মক ব্যাটা।
— আমাকে দেখে এতো ঘাবড়ানোর কিছু নেই। জানালা ভালোভাবে আটকে নাও, বাতাস ঢুকছে। আর দরজাও চাপিয়ে রাখো। পারলে এসব এখন বাদ দিয়ে রুমের আলো জ্বালিয়ে পড়তে বোসো।
ঝরঝরে কন্ঠে কথাগুলো আর্শির উদ্দেশ্যে বলে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো স্পর্শীয়া।

আজ বুঝি মন খারাপের দিন। উহু, মন খারাপ নয় ; মেজাজ খারাপের দিন। পরশ শিকদারেরও মেজাজ ভালো নেই। হনহন করে প্রবেশ করলো শিকদার বাড়িতে। কারো সাথে কোনো কথা না বলে, কারোর দিকে না তাকিয়েই সোজা চলে গেলো নিজের ঘরে। সকলে তা সন্দেহের চোখে দেখলো। কিছু কি হয়েছে? — এই চিন্তায় চা রেখে উঠে দাঁড়ালেন পিপাসা। তিনি এক্ষুণি পরশের ঘরে যাবেন, গিয়ে কারন জিজ্ঞেস করবেন – এই রাগের। কিন্তু পারলেন না। তাকে বাঁধা দিলো পাভেল। মায়ের আগে এগিয়ে এসে বললো,
— তোমার যাওয়ার দরকার নেই। রেগে আছে, এক্ষুণি কিছু জিজ্ঞেস করলে ধমক মারতে পারে। তার চেয়ে আমিই যাই। এ বাড়িতে যত ধমক, ঝাড়ি-জুরি সব তো আমার উপরেই বর্তায়। আমিই বরং খেয়ে আসি।
পাভেল দ্রুত পায়ে দোতলায় উঠলো। পরশের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি মারলো ভেতরে। কেউ নেই। এরমানে ওয়াশরুমে গেছে। সে নাক ছিটকালো। বিরবির করে বললো, “ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে কেউ এভাবে রেগে যায় নাকি? আজব।”

খাটের কোনায় পড়ে আছে ফোন। দেখে বোঝাই যাচ্ছে কেউ ছুড়ে মেরেছে। গায়ের পাঞ্জাবিটাও ফ্লোরে পড়ে আছে। কি অদ্ভুত! পাভেল কোনো কারন খুঁজে পেলো না। চুপ করে বসে রইলো বিছানায়। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলো পরশ। চোয়াল এখনো শক্ত। আয়নার সামনে এসে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কয়েক সেকেন্ড ভেবে- চিনতে ইনিয়েবিনিয়ে বলে উঠলো,
— এতোই যখন চেপেছে, তবে বাড়ি আসতে গেলি কেনো? সদরেও তো ওয়াশরুম ছিলো নাকি! হুদাই তোকে নিয়ে চিন্তা করছে সবাই।
তড়িৎ পেছনে ঘুরলো পরশ। কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে দেখলো। তার গা পুরো খালি। পড়নের প্যান্ট বিনা আর কিচ্ছু নেই। গলার কাছের অংশ লাল হয়ে আছে। গরম কফির অনেকটা এখানেই পরেছিলো। ঘরের কৃত্রিম আলোয় স্পষ্ট সেদিকে নজর পড়লো পাভেলের। সে হা হয়ে লাল হয়ে যাওয়া অংশ টুকু দেখলো। খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ওভাবেই চেয়ে রইলো। পরপরই বিছানা ছেড়ে ভাইয়ের কাছে এলো। কাছ থেকে অতি সুক্ষ ভাবে ছুয়েও দেখলো। মুহুর্তে’ই বিরক্তির সুরে পরশ বললো,

—উহু! ছুবি না, জ্বলছে।
পাভেল আবারো আহত হলো। জরাজীর্ণ হৃদয় খানি নিয়ে অস্ফুটস্বরে বললো,
— লাল হয়ে আছে, তার মানে এটা লাভ বাইট। কে দিয়েছে, চড়ুই?
পরশ মেজাজ ধরে রাখতে পারলো না। সহসা এক হাতে পাভেলের বুকের উপর ধাক্কা মেরে বললো,
—মেজাজ খারাপ করিস না। দূর হ!
তাল সামলাতে না পেরে পাভেল পুণরায় খাটের উপর বসে পড়লো। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে আবারো চেয়ে রইলো গলার দিকে। যন্ত্রণায় চোখ কুচকে বন্ধ করে ফেললো। বললো,
— ঠিকই তো বড় বড় কথা বলিস। স্পর্শীকে তোর পছন্দ না, তার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ ডেটে তো হুমড়ি খেয়ে চলে গেছিস। আবার প্রেমিকার দাঁত গলায় বসিয়ে বাড়িতে ফিরেছিস। ছি! আব্বুর সামনে বসে আবার গলাবাজি করিস……

মেজাজ টা তরতর করে বাড়ছে। এরকম চলতে থাকলে যে-কোনো সময় চড়-থাপ্পড় বসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তা করা যাবে না। একটা সস্তা মেয়ের জন্য ভাইয়ে – ভাইয়ে মারামারি করবে? অসম্ভব। পরশ টেনে তুললো পাভেলকে। ঘাড় ধরে রুম থেকে বের করে দেওয়ার প্রয়াস করতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো। আমজাদ শিকদার দরজায় দাঁড়িয়ে। তিনি মূর্তির ন্যায় অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। পরশ নিজেও হতভম্ব। আপনা আপনি হাতের জোর কমে এলো। ছেড়ে দিলো পাভেলকে। বাবার সামনে বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
আমজাদ মাথা নিচু করে ফেললেন। দুপাশে মাথা নাড়িয়ে আহত কন্ঠে বললেন,
—ছি ছি ছি! এই দিনটাও দেখতে হলো আমাকে! এতো সাবধান করার পরেও কেউ মূল্য দিলো না আমায়। ছিহ!!!
তিনি আর সেখানে দাঁড়ালেন না। সোজা চলে গেলেন নিজের ঘরে। ভঙ্গুর হয়ে বসে রইলেন চেয়ারে। এতোসবের মধ্যে পিপাসা আহাম্মক হয়ে একেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে। পাভেলের মুখ ফ্যাকাসে, চোখ লাল। এভাবেই কাউকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে গেলো। এদিকে পরশ রেগে বেহাল অবস্থা! ধড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে। ভেতর থেকে ভাঙচুরের আওয়াজ আসছে। হয়তো কিছু একটা ধরে ছুড়ে মেরেছে। তবে তা একবার’ই। পরবর্তীতে সব শান্ত। পিপাসা দিশা খুঁজে না পেয়ে স্বামীর নিকট ছুটলেন। কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললেন,

— আমাকে কেউ কিছু বলে না! কি হইছে তোমাদের, সবাই এভাবে রেগে গেলে কিভাবে হবে?
আমজাদ চাপা রাগ নিয়ে স্ত্রী’র দিকে তাকালেন। বললেন,
—কিছু বুঝো না তুমি? আক্কেল জ্ঞান হারাইছো?
—আজব তো! না বললে বুঝবো কিভাবে?
— কি বুঝাবো তোমারে আমি? তোমার ছেলে বাড়ির বাইরে মেয়ে নিয়া রঙ্গলীলা করে, এসব বোঝাবো? ছি ছি ছি! এতো করেও বোঝাতে পারলাম না! আমার’ই ভুল। ভেবেছিলাম, বিয়ে-শাদির ব্যাপারে নির্বাচনের পর বলবো। কিন্তু সে ধৈর্য কি আর আছে? শেষ অবধি ওই মেয়ের বসে গেলোই গেলো। এতো সাবধান করলাম, তবুও শুনলো না। ওই শামসুলের মেয়েটা ওর মাথা চিবিয়ে খেয়েছে। বাপ হয়ে মেয়েটাকে এভাবে লেলিয়ে দিলো, তাও শুধুমাত্র আমার ছেলেটাকে ডোবানোর জন্য। ছিহ! বাপের মতোই চরিত্রহীন। এখন, এখন কি হবে? ওই মেয়ে যদি পরশের নামে কেস দেয় উল্টোপাল্টা বলে? যদি দুদিন পর এসে মিডিয়ার সামনে বলে সে গর্ভবতী।
থেমে চেচিয়ে বললো – হারামির বাচ্চা, আমার কথা কানেই তুললো না। তোর ক্যারিয়ার শুরুর আগে ধ্বংস হবে, মিলিয়ে নিস।

পিপাসার মাথা ঘুরছে। এসব কি ধরণের কথা! তার ছেলেতো এমন নয়। এ সব কিছু ভুল হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে পরশের কাছেও বা কি জিজ্ঞেস করবে? মা হয়ে কিইবা করবে সে!
আমজাদ ক্রমশ রাগে গোঙরাচ্ছে। মাথাটা ফেটে যাচ্ছে রাগে। আর সইতে পারলেন না। দ্রুত ফোন তুলে নিলেন হাতে। শামসুল সরদারের নাম্বার টা তার সংরক্ষণেই আছে। দ্বিধা না করে সরাসরি কল বরলো।
— সরদারদের রক্তেই কি দোষ আছে?
শামসুল স্তব্ধ হয়ে গেলো। নাম্বারটা অপরিচিত হলেও কন্ঠটা নয়। দীর্ঘ দিন পর আমজাদ শিকদারের কন্ঠ শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো। বললো,
— বোন তো তোমার একটাই ছিলো। যার চরিত্রের দোষে, শেষে আমার ঘাড়ে চাপিয়েছো। এখন আবার কিসে ঠেকলো, যে সেধে ফোন দিয়েছো?
গর্জে উঠলো আমজাদ। বহুদিন পর বোনের শোক টা আবারো জেগে উঠলো।

— চরিত্রে সমস্যা তোর। এতোটাই জঘন্য চরিত্র যে মেয়েটাকে লেলিয়ে দিতেও ভুললি না। কি ভেবেছো, আমার ছেলের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে ওর ক্যারিয়ার ধ্বংস করবে। দুদিন পর নষ্ট চরিত্রটা নিয়ে আমার পরশের গলায় ঝোলার চেষ্টা করবে? অসম্ভব! আমি আমজাদ শিকদার বেঁচে থাকতে তা কখনোই হবে না। শুনে রাখো, সাবধান করছি তোমায়। নিজে ঠিক হও,মেয়েকে সামলাও — নাহলে আমার কথাটা কানে ঢুকিয়ে নাও। পরশ শিকদারকে গোবেচারা ভাবিও না। আমার ছেলে ওরকম দশটা মেয়েকে একসাথে ব্যবহার করে, আবার ছুড়েও ফেলতে পারে। তাতে তার কিচ্ছু ছিড়বে না। কিন্তু তোমার মেয়ে ঠিক’ই কলঙ্কিনী হবে।
শামসুল ছটফট করে উঠলেন। আদরের মেয়ের সম্পর্কে এমন বিশ্রী কথা শুনে তার গা গুলিয়ে উঠলো। রক্ত টগবগ করে ফুটলো। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে ড্রয়িং রুমের কাছের টেবিলটাতে হাকিয়ে লাথি বসালেন।। টুকরো টুকরো হয়ে গেলো কাচ। স্যান্ডেল ভেদ করে আঘাত লাগলো পায়েও। তবুও দমলেন না। চেঁচিয়ে বলে উঠলেন,

— খোদার কসম! আমার মেয়েকে নিয়ে আর একটা কথা বললে তোর জিভ আমি কেটে ফেলবো আমজাদ। রাজনীতি আমার সাথে কর, কিন্তু আমার মেয়েকে জড়াবি না। জেল কম খাটি নি। প্রয়োজনে এই শেষ বয়সে তোকে খুন করে তবেই জেলে যাবো। চরিত্র তোর ছেলের খারাপ। জানোয়ারের বাচ্চা আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, আমার মেয়েকে বিয়ে করবে। ওর বিয়ের সাধ আমি ঘোচাবো।
আমজাদ বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালে।। পরশ শামসুলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব অবধি দিগেছে? শামসুল সরদারের কাছে? যার জন্য আজ এতোকিছু? এসব জানার আগে সে মরে গেলো না কেনো? রাগে চোখের কোণে পানি জমে গেছে। তবুও দমলো না। বললো,
— আমার ছেলের মাথা তোর মেয়ে খেয়েছে। জিজ্ঞেস কর ওই চরিত্রহীন মেয়েকে, “ বিকেলে সে কোথায় ছিলো, কার কাছে ছিলো, কিভাবে ছিলো? ” শেষ কথা শুনে রাখ, আমার ছেলেকে আমি বিয়ে দিয়ে দিবো। কিন্তু তোর মেয়ের এরপর কি অবস্থা হবে, কে ঘরে তুলবে এই নষ্টা মেয়েকে, সে ভার আমার বা আমার ছেলের নয়। আরো শুনে রাখ…..
কথা শেষ করার পূর্বেই পরশ ছিনিয়ে নিলো ফোনটা। রেগে ছুড়ে মারলো দেয়ালে। হতবাক, হতবিহ্বল হয়ে ভঙ্গুর কন্ঠে বললো,

— এসব কি বলেছিলে তুমি? কে বলেছে এসব? বিকালে কোথায় ছিলাম, কার কাছে ছিলাম, সেসবের তুমি কি জানো? না জেনে শুনে আমার চরিত্র নিয়ে এতোগুলো কথা কেনো বলবা তুমি?
পরশ দিশা খুঁজে পাচ্ছে না কোনো। কি থেকে কি হয়ে গেলো, মুহুর্তেই। কোথা থেকে কিইবা ভেবে নিলো সবাই। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
— আরে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি আমি। পাভেল কি থেকে কি বলেছে, আর সেসব বিশ্বাস করে আমার চরিত্র নিয়ে কথা তুলছো। অবশ্য আমার চরিত্র নিয়ে তো আগেই সন্দেহো করেছো। সে তুমি করো, হাজার বার করো। তোমার ছেলে, তুমি যা ইচ্ছা বলো। কিন্তু তাই বলে অচেনা, অজানা একটা মেয়ের চরিত্র নিয়ে এতোগুলো কথা বললে কেনো? কোন আক্কেলে বললে, তাও ওর বাবার কাছে। আমি জাস্ট নিতে পারছি না এসব। বাইরের একটা মেয়েকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে এতো ঝামেলা হবে কেনো? কেনো হবে? এসব জঘন্য আলোচনা বাইরের মানুষ শুনলে ওই মেয়েটাকে কতটা সাফার করতে হবে, তুমি আন্দাজ করতে পারছো?
পিপাসা হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। স্বামীর অপমান সইতে পারলেন না। বললেন,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩১

— একটা বাইরের মেয়ের জন্য তুই নিজের বাবার সামনে, এভাবে ধমকে ধমকে কথা বললি?
পরশ বজ্রকন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো। গলা দেখিয়ে বললো,
— হ্যাঁ বলছি। কারন গলাটা পুড়ে গেছে, গরম কফি পড়েছে। কোনো মেয়ের সাথে ছিলাম না আমি।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৩৩