রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৮
রিক্তা ইসলাম মায়া
তারপর? তারপর দিনগুলো সুন্দরই যাচ্ছে। রিদ মায়ার মেজবানের অনুষ্ঠানের পর রিদ মায়াকে নিয়ে ঢাকা চলে যায় খান বাড়িতে। রিদ নিজের বাড়ি ছেড়ে ঢাকার খান বাড়িতে উঠেছে। একাকী মায়া রিদের সঙ্গে খান বাড়িতে থাকছে। দুজনের টুনটুনির সংসার বেশ সুন্দর সুখময়। মায়ার মাঝে বেবিকে নিয়ে কষ্ট ব্যতীত সে বেশ ভালোই আছে স্বামীর ঘরে। রিদ জেদি মানুষ, সে নিজের বউকে অন্যত্রে দিতে চায় না। মায়াও নিজের স্বামীকে ছাড়া কোথাও যায় না। এমনকি নিজের বাপের বাড়িতেও না। শফিকুল ইসলাম, জামাল ইসলাম দুজন মায়াদের মেজবানের অনুষ্ঠানের পরদিন চট্টগ্রামে গিয়েছিল জুঁইয়ের মা হবার সংবাদ শুনে। একরোখা জামাল সাহেবও নানা হবেন সেই খুশিতে জুঁই ও আয়নকে মেনে নিয়ে ওদের দাওয়াত করেন আশুগঞ্জ যেতে।
আয়ন, জুঁই দুজনেই জামাল সাহেবের সঙ্গে অতীতের সকল মনোমালিন্য ভুলে সম্পর্ক ঠিক করে নেন। কিন্তু রিদ এই ব্যাপারে উদাসীন। সে সহজে কারও অপমান ভুলে তাঁকে এক্সেপ্ট করতে পারে না। মায়ার পরিবারের সাথে রিদের ঝামেলাও ছিল বড়সড়। শফিকুল ইসলাম, জামাল ইসলাম দুই ভাইই খান বাড়ির সবার কাছে অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন। রিদ সেদিন খান বাড়িতেই ছিল, কিন্তু মায়ার বাপ-চাচার আগমনে সে নিশ্চুপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, কেউ ঠাহর পর্যন্ত করতে পারেনি। তাই শফিকুল ইসলাম আর তার ভাই জামাল ইসলামের আদৌও ক্ষমা চেয়ে রিদের মুখোমুখি হতে পারিনি রিদ সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না। রিদ যে ব্যাপারটা এড়িয়ে যাচ্ছে, সেটা দুই পরিবারের সবাই বুঝেছে, এমনকি মায়াও বুঝেছে। কিন্তু এই ব্যাপারটা নিয়ে মায়া আপাতত বাড়াবাড়ি করেনি।
রিদ যে কাউকে সহজে ক্ষমা করতে পারে না, এটা মায়াও জানে। রিদ মায়াকেও কখনো ক্ষমা করত না, যদি না রিদ মায়াকে ভালোবেসে বাধ্য হতো। রিদ খান পারলে মায়াকেও নিজের জীবন থেকে দূরে রাখত, যদি সে মায়াকে ভুলে থাকতে পারত। রিদ খান নিজের মনের সাথে পেরে ওঠে না বলেই সে বউকে ছাড়া কিছু বুঝে না। তাই মায়াও রিদের বাধ্য বউ হতে চায়। আজকাল রিদের সঙ্গে বেবি নিয়ে মায়া বাড়াবাড়ি করে না। তবে বেবির আশাও মায়া ছেড়ে দেয়নি। মায়া অন্য ফন্দিতে আছে। রিদ যেহেতু বেবি চাচ্ছে না, তাই মায়া রিদকে না জানিয়েই ডাক্তারের কাছে যাবে চিন্তা করছে। মায়ার একা ডাক্তারের কাছে যাওয়া সম্ভব না। সেজন্য সুফিয়া খান কিছুদিনের মধ্যে ঢাকা আসলে উনাকে নিয়ে যাবেন। মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় মায়ার ঘোর কাটিয়ে হঠাৎ গাড়ির হর্ন দিল ড্রাইভার। মায়াকে ডেকে বলে…
‘ম্যাডাম আমরা স্যারের অফিসে আইয়া পড়ছি।
মায়া গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। রিদের অফিসের ছয় তলা ভবনের সামনে গাড়িটি পার্ক করা। ড্রাইভার গাড়ির দরজা টেনে ধরতে মায়া গাড়ি থেকে নেমে ভবনের ভেতরের দিকে হাঁটে। লিফটের ভেতর ঢুকে তৃতীয় ফ্লোরে বাটন চেপে কাঁধের কলেজ ব্যাগটা টেনে দাঁড়ায়। দুপুর ১:৪৫ মিনিট। কলেজ শেষ করে মায়া সোজা রিদের অফিসে চলে এসেছে। খালি বাড়িতে মায়ার মন টেকে না। সেজন্য মায়া কলেজ শেষ করে মাঝেমধ্যে রিদের অফিসে চলে আসে। দুপুরে রিদের সঙ্গে লাঞ্চ করে আবার বিকেলে চলে যায়। রিদ রাতে বাসায় ফেরে। মায়া রাতে রিদের জন্য রান্না করে রাখে। এটাই তাদের টুনাটুনির সংসার।
রিদের বউ হিসেবে মায়াকে রিদের অফিসে সবাই চেনে। মায়া অফিসে ঢুকতেই ছোট-বড় সকল স্টাফরা মায়াকে ম্যাডাম ম্যাডাম বলে সালাম দেয়। এতে মায়া প্রথম প্রথম অস্বস্তিতে পড়লেও আজকাল সে মানিয়ে নিয়েছে। স্বামী বস হলে তো বউকে সবাই সালাম দিবেই স্বাভাবিক। মায়া তৃতীয় ফ্লোরে রিদের অফিসের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতে রিদকে কক্ষে কোথাও দেখতে পেল না। পুরো অফিস খালি। মায়ার পিছন পিছন একজন পিয়ন মায়াকে দেখে দ্রুত এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। রিদের কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে…
‘ম্যাডাম আসব?
মায়া পিছন ঘুরে তাকায়। মুখ ঢাকা মাস্কে। মায়া সম্মতি দিয়ে মিহি স্বরে জানতে চায়…
‘ উনি কোথায়?
মায়ার ‘উনি’ শব্দটা বুঝে পিয়ন কামেশ মায়ার জন্য আনা পানির গ্লাসটা সোফার টেবিলের উপর রেখে বলে…
‘স্যার চতুর্থ ফ্লোরে গেছেন। এক্ষুনি আইয়া পড়ব ম্যাডাম।
‘আচ্ছা আপনি যান।
‘জি।
কামেশ চলে যায়। মায়া কাঁধের কলেজ ব্যাগটা সোফার উপর রেখে ওয়াশরুম যায়। গায়ের কালো বোরখাটাও খোলেনি। যাওয়ার আগে মুখের মাস্কটা খুলে ব্যাগের উপর রেখে যায়। রিদ মিনিট সময় পরই নিজের কেবিনে ঢুকে মায়ার ব্যাগ সোফায় পড়ে থাকতে দেখে আশেপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মায়ার খোঁজ করে। ওয়াশরুমের পানির শব্দে বুঝতে পারে মায়া ওয়াশরুমে। রিদ টেবিলের উপর থেকে ফোনটা নিয়ে দুজনের খাবার অর্ডার করে। এর মাঝে মায়া ওয়াশরুম থেকে বেরোতে রিদ পিছনে তাকায়, দুজনের চোখাচোখি হয়। রিদ মায়ার দিকে তাকিয়ে কানের ফোনটা নামিয়ে টেবিলের উপর রাখে। মায়া সোফার টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাত-মুখ ধোয়ার ফলে গায়ের বোরখা-হিজাব ভিজিয়ে ফেলেছে। মায়া মাথার হিজাবের পিন খুলতে খুলতে সোফার টেবিলের উপর রেখে বলে….
‘আমি এখানে আসলে কি আপনি বিরক্ত হন?
‘না।
‘যদি কখনো বিরক্ত হন তাহলে আমাকে জানাবেন, আমি আর আসব না আপনার অফিসে।
‘হঠাৎ এই কথা কেন? কি হয়েছে?
‘ কি হবে? কিছু হয়নি, আপনি তো অনেক মুডি মানুষ, সবসময় মুড নিয়ে চলেন। আপনার বউয়ের দরকার পড়ে না। সেজন্য আমাকে কখনো নিজের অফিসে ডাকেন না। আমিই বেহায়ার মতো আপনার ডাকার আগে সবসময় নিজে নিজে আপনার অফিসে চলে আসি এজন্য বলছিলাম এতে যদি আপনি বিরক্ত হন তাহলে আমাকে জানাবেন আমি আর আসব না।
রিদ কপালের একপাশ চুলকে মায়ার কথা শুনে, রিদ আসলেই মায়াকে কখনো নিজের অফিসে ডাকে না। মায়া নিজ থেকে সবসময় চলে আসে বলে রিদ অপেক্ষা করে কবে তার বউ আসবে। কিন্তু এই বিষয়টা যে তার বউ ভুল বুঝে অভিযোগ করবে রিদ বুঝতে পারেনি। রিদ টেবিলের উপর লাফিয়ে বসে পা ঝুলিয়ে, মায়াকে কাছে ডেকে বলে…
‘কাছে এসো। কাম।
মায়া হিজাব খোলে রাখে। তারপর একটানে বোরখা খুলে ব্যাগের উপর রাখে। রিদ মায়ার দিকে তাকিয়েই রইল। মায়া আজকাল বোরখা পরে চলাফেরা করে। রিদের আদেশ, মায়ার বোরখা ছাড়া কোথাও চলাফেরা নিষেধ। বেশ অনেকগুলো বোরখা রিদ চট্টগ্রাম থেকে ফিরেই মায়াকে কিনে দিয়েছিল। মায়া সেগুলো পরে। বোরখার ভেতরে সাদা কলেজ ড্রেস পরা। মায়া ঝুকে ব্যাগের চেইন খুলে কলেজের সাদা হিজাবটি নিয়ে গায়ে জড়াতে চাইলে রিদ নিষেধ করে ডেকে বলে…
‘ ঐটার প্রয়োজন নেই। তুমি এদিকে এসো। কাম।
রিদ হাত বাড়িয়ে মায়াকে কাছে ডাকে। মায়া হিজাব ছাড়াই রিদের কাছে যায়। রিদ মায়ার বাহু টেনে মায়াকে নিজের দু-পায়ের মধ্যস্থতায় দাঁড়িয়ে করিয়ে, নিজের দু-পা দিয়ে মায়াকে বাঁধে। মায়া রিদের দু-পায়ের মধ্যস্থতায় আটকে যায়। রিদ পাশ থেকে টিস্যু নিয়ে যত্ন সহকারে মায়ার ভেজা মুখটা টিস্যুতে মুছে দিতে দিতে বলে….
‘আই লাভ মাই বেহায়া বউ। আমি চাই আমার বউ সবসময় বেহায়াদের মতো আমার আগেপিছু ঘুরুক। আমাকে জানুক, বুঝুক, আমাতে সীমাবদ্ধ থাকুক। চালাক বউ হলে তো আমাকে ঠেঙিয়ে চলবে। আমার তো বোকা বউ পছন্দ, জান।
মায়া চোখ তুলে রিদের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়। রিদ একহাতে আলতো করে মায়ার থুতনি চেপে অন্যহাতের টিস্যুতে মায়ার মুখ, গলার পানি পরিষ্কার করে দেয়। মায়া রিদকে প্রশ্ন করে বলে…
‘ আপনি সব থেকে বেশি কাকে ভালোবাসেন নেতা সাহেব?
মায়া মনে করেছিল রিদ নিজের মা-বাবার নাম নিবে। অথচ রিদ মায়াকে ভুল প্রমাণ করে সে নিজের নাম নিয়ে বলে…
‘মাইসেলফ।
মায়া কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করে বলে…
‘আর আমাকে? আপনি আমাকে ভালোবাসেন না?
‘বাসি। আমি আমার জন্য তোমাকেও ভালোবাসি। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারি না বিধায় আমি তোমাকে ততটাই ভালোবাসি।
‘আমাকে ছাড়া আপনি থাকতে পারলে ভালোবাসতেন না নেতা সাহেব?
‘না বাসতাম না।
মায়া রিদের কথায় কষ্ট পেল। সেই সাথে রিদকে হারানোর ভয় মনে জাগলো তীব্রভাবে। মায়া বলে…
‘ আজ আপনি আমাকে ছাড়া থাকতে পারছেন না বিধায় আজ আমি আপনার জীবনে আছি, যদি ভবিষ্যতে আপনি আমাকে ছাড়া থাকতে পারেন তাহলে তখন কি আমাকে ছেড়ে দেবেন?
রিদ মায়াকে ভুল বুঝছে ব্যাপারটা রিদ ঠাহর করতে পেরে রিদ মায়াকে শুধিয়ে বলে..
‘শোনো রিত, এই দুনিয়ায় প্রতিটা মানুষই তার নিজের জন্য অন্যকে ভালোবাসে। একটা ব্যক্তির চোখে যখন অন্যকে ভালো লাগে, মন ঠাঁই দেয়, তখন ওই ব্যক্তিটা সেই মানুষটাকে ভালোবাসে আপন করতে চাই। কিন্তু যখন কারও প্রতি আমাদের মন না টানে তখন আমরা তাঁকে আপন করতে চাই না, আবার ভালোবাসতেও পারি না। ব্যাপারটা মন ঘটিত। তোমার কাউকে ভালো না লাগলে তুমি কখনো তার কাছে যেতে চাইবে?
মায়া মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি দিতেই রিদ ফের বলে…
‘সেটাই! আমাদের নিজের যখন কাউকে ভালো লাগে, তখনই আমরা আরেকটা মানুষের সাথে জড়াই। ভালো না লাগলে জড়াই না। সেজন্য বলতে পারো প্রতিটা মানুষই তার নিজের জন্য আরেকটা মানুষকে ভালোবাসে। যখন ব্যক্তির নিজের মন থেকে ভালোবাসা, মায়া, অনুভূতি শেষ হয়ে যায়, তখনই প্রেমে ব্যাকআপ আর বিয়েতে বিচ্ছেদ ঘটে।
মায়ার চোখে রিদকে হারানোর তাড়না কাজ করে। আহত কণ্ঠে বলে…
‘আমার ভয় করছে নেতা সাহেব। আপনি আমাকে কখনো ছেড়ে দেবেন না তো? আপনার মন আমার থেকে উঠে যাবে না তো আবার?
রিদ মায়ার ভয় বুঝে, মায়ার মুখের উপর ঝুঁকে দু-গালে শব্দ করে চুমু খায়। মায়ার গালে নাক চেপে বলে…
‘তুমি আমার সেই মোহ রিত, যার ঘোর আমি ইহজীবনেও কাটাতে চাইব না। তুমি আমার বেপরোয়া জীবনের একমাত্র পূর্ণতা। যাকে পেয়ে আমি শূন্যতা হারিয়েছি মাই লাভ।
রিদ-মায়া দুজনই সোফার টেবিলে খেতে বসেছে। মায়ার মাছ-ভাত বেশ পছন্দ। কাটার ভয়ে ছোট মাছ খেতে পারে না সে। বড় মাছ খেতে গেলেও মায়ার গলায় মাঝেমধ্যে কাঁটা বিঁধে, তাই মায়া বরাবরই কাঁটাবিহীন চিংড়ি মাছ খেতে বেশ পছন্দ করে। রিদ মায়ার প্লেটে এক্সট্রা চিংড়ি মাছ তুলে দেয়। মায়া সেগুলোই মনোযোগ সহকারে খাচ্ছে। রিদ নিজের খাওয়া ছেড়ে মায়ার জন্য মাছের কাঁটা ছাড়িয়ে প্লেট ভরতি মাছ মায়ার দিকে বাড়িয়ে বলে….
‘এটা খাও।
মায়া ভাত খাচ্ছে না, শুধু চিংড়ি মাছ খাচ্ছে। রিদ মায়ার ভাতের প্লেটটা নিজের কাছে টেনে, মাছ-ভাতের লোকমা বানিয়ে মায়ার মুখে তুলে দিয়ে বলে…
‘হা করো।
মায়া ভাত মুখে নিয়ে চিবোতে থাকে। রিদ নিজেও মায়ার প্লেট থেকে খাবারের লোকমা নিজের মুখে তুলে। দুজনই একই প্লেটে খাচ্ছে। প্রায়ই রিদকে দেখা যায় মায়ার প্লেট থেকে খাবার খেতে। রিদ নিজে খায়, আবার মায়াকেও খাইয়ে দেয়। যে রিদ কখনো নিজের ব্যবহৃত টিস্যুতে অন্যের স্পর্শ পছন্দ করে না, সেই রিদ খান বউয়ের এঁটো প্লেটে খাবার খাচ্ছে নির্দ্বিধায়। এই রিদ খানকে দেখে কেউ বলতে পারবে না সে প্রচণ্ড রাগী আর জেদি মানুষ। এই রিদ খানকে মানুষ দেখলে বলবে সে খুবই যত্নশীল, আর দায়িত্ববান একজন স্বামী। এই রিদ খান ঘর বোঝে, বউ বোঝে, বউয়ের প্রতি যত্ন বোঝে। মায়া খাবার চিবোতে চিবোতে বলে…
‘আম্মা আব্বা ফোন দিয়েছিল, আশুগঞ্জ যেতে বলেছে। আরিফ ভাইয়ার ছেলে হয়েছে, দেখতে যেতে বলেছে। জুঁই, আয়ন ভাইয়াও যাবে।
রিদ মায়ার কথায় তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। ভাতের লোকমা ফের মায়ার মুখে তুলে দিল। মায়া রিদকে চুপ থাকতে দেখে মুখে ভাত চিবোতে চিবোতে অনুনয় গলায় বলে…
‘আমি গেলে আপনি রাগ করবেন?
রিদ মায়ার দিকে পানি এগিয়ে দিয়ে বলে…
‘পানি পান করো।
রিদ প্রসঙ্গ এড়াচ্ছে। মায়া রিদ থেকে পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে ফের অনুনয় করে বলে…
‘আমি যাই নেতা সাহেব?
রিদ কপাল কুঁচকে খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে। তার বউ তার কাছে না থাকলে মেজাজ খারাপ হয়। বিয়ে হয়ে গেলে মেয়েদের বাপের বাড়িতে যাওয়ার কী দরকার? সে তার বউয়ের খেয়াল রাখে না, তাহলে আবার বাপের বাড়ি কেন? সবাইকে দেখতে মন চাইলে সবাইকে বলুক তার বাড়িতে চলে আসতে। তার এত বড় বাড়িতে সবার জায়গা হবে, তাহলে বউ যাওয়ার কী দরকার? রিদ খানিকটা মেজাজ নিয়ে বিরক্তি স্বরে বলে….
‘সন্ধ্যার আগে বাসায় ফেরা চাই। বউ বাড়িতে না পেলে মেজাজ খারাপ হয় আমার।
রিদ সম্মতি দিয়েছে দেখে মায়া বেশ খুশি হয়। তবে ঢাকা থেকে আশুগঞ্জ আসা-যাওয়া দুই ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা চার ঘণ্টা সময় লাগবে। মাঝে কয়েক ঘণ্টা সময় পাবে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর। এত অল্প সময়ে কি মায়ার মন ভরবে পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে? তাছাড়া মায়া সন্ধ্যার আগে ফিরতে না পারলে হয়তো রাতও হতে পারে। মায়া আপত্তি জানিয়ে বলতে চাইল…
‘এত দূরের রাস্তা! আমার যাওয়া-আসাতেই তো চার ঘণ্টা লাগবে। পরিবারের সাথে সময় কাটাতে মাঝে মাত্র আর কয়েক ঘণ্টা সময় পাব, এত অল্প সময়ে আমার পোষাবে বলুন? তাই বলছিলাম যদি সন্ধ্যায় না ফিরতে পারি তাহলে রাত হতে পা….
মায়ার কথা শেষ করতে না দিয়ে রিদ মেজাজি ভঙ্গিতে মায়ার মুখে ভাতের লোকমা তুলে দিতে দিতে বলে…
‘না পোষালে স্বামীর ঘরেই থাকো। কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।
‘রেগে যাচ্ছেন কেন?
‘বাসায় ফিরে তোমাকে দেখতে না পেলে আমার মেজাজ খারাপ হয় রিত। অশান্তি, অস্থির লাগে। এটা তুমি কবে বুঝবে?
রিদের কথায় মায়ার মন চট করে গলে যায়। মায়া আর আপত্তি জানাই না। বরং রিদের কথা মতোই মেনে বলে…
‘আমি কি এখন আর আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাই বলুন? যাই না তো। বরং আপনার কথা মতো চলি। আচ্ছা ঠিক আছে, আপনাকে অফিসে পাঠিয়ে আমি যাব, আবার আপনি ফেরার আগে আমি ফিরে আসব। থাকব না।
রিদ মায়ার কথায় কিছু বলে না। আবার মেজাজও দেখায়নি। নীরবে মায়ার মুখে লোকমা তুলে সে নিজেও খাচ্ছে। রিদকে শান্ত নিশ্চুপতা দেখে মায়া বুঝতে পারল এবার রিদের মর্জি মতো হয়েছে সবটা।
মায়া বাদে মুক্তা, জুঁই, রাফা সবাই প্রেগন্যান্ট। এতে মায়ার কষ্টের শেষ নেই। আবার এই বিষয়ে রিদকে কিছু বললে রিদ পাত্তা দেয় না, না শোনার মতো করে থাকে। জুঁইয়ের তিন মাস চলছে। রাফার সাত মাস, মুক্তার নয় মাস। ফিহার মাত্রই বেবি হলো। আরিফ-ফিহার ছেলের নাম ইফরান। মায়া ফিহার ছেলেকে দেখে এসেছে। ছেলেটা আরিফের মতো দেখতে হয়েছে সুন্দর, কিন্তু গায়ের রঙটা একটু চাপা। মায়ার বেবি নিয়ে হাই-হুতাশ সুফিয়া খানের চোখে পড়েছে। তিনি আরাফ খান আর হেনা খানকে নিয়ে খান বাড়িতে এসেছে মায়ার সংসারে বেড়াতে। এক-দুই মাস গ্যাপে গ্যাপে মায়ার সংসারে শাশুড়ির আগমন ঘটে। সুফিয়া খান দুদিন ধরে রিদের বাড়িতে থাকায় মায়ার বেবিকে নিয়ে দুশ্চিন্তার ব্যাপারটা সুফিয়া খানের নজরে পড়েছে। মায়ার বেবিকে ঘিরে তীব্র আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পেরে তিনি রিদের অনুপস্থিতিতে পরদিন মায়াকে ডাকলেন নিজের কাছে। মায়া সুফিয়া খানের মুখোমুখি হতেই সুফিয়া খান বলল…
‘রিদ তোমাকে কোনো কিছু খেতে দিলে সেটা আর খাবে না, কেমন?
সুফিয়া খানের কথার মানে মায়া প্রথমে বুঝতে না পেরে অবাক সুরে প্রশ্ন করে বলল….
‘কেন আম্মু?
সুফিয়া খান সরাসরি মায়াকে রিদের ব্যাপারে বুঝিয়ে বলল…
‘তোমার বয়স কম। রিদ চায় না তুমি মা হও। যদিও আমি এই বিষয়ে রিদের সঙ্গে একমত পোষণ করছি। তবে দীর্ঘদিন ধরে যদি কেউ প্রেগন্যান্সি রোধের মেডিসিন সেবন করে, তাহলে সেই নারীর মাতৃত্বের সমস্যা দেখা দেয়। সে পরবর্তীতে মা হতে পারে না। তোমরা একত্রে সংসার করছ প্রায় সাত-আট মাসেরও বেশি হয়েছে। সেজন্য আমার মনে হচ্ছে তোমার আপাতত ওইসব মেডিসিন সেবন বন্ধ করা উচিত, নয়তো রিদের ভুলের জন্য তুমি নিজের মাতৃত্বের স্বাদ হারাতে পারো। এজন্য বলছি রিদ তোমাকে কোনো কিছু খেতে দিলে সেটা আপাতত খেয়ো না। আমার মনে হচ্ছে রিদ তোমাকে মাতৃত্ব রোধের মেডিসিন কোনো কিছুর সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়াচ্ছে। রিদকে ব্যাপারটা বলতে যেও না, তবে ওর দেওয়া কিছু খেতে সতর্কতা অবলম্বন করবে, বুঝেছ?
সুফিয়া খানের কথায় মায়ার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতোন মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। এজন্য মূলত মায়া এতদিন যাবত কনসিভ করতে পারছে না! মায়ার এত কান্না, এত আহাজারি কি এই লোকের মন গলাতে পারেনি? এত কিসের জেদ এই লোকের বেবি না নেওয়ার পিছনে?
মায়ার সমবয়সী মেয়েরা কি মা হচ্ছে না? তাহলে মায়ার মা হতে সমস্যা কোথায়? মায়া রিদের প্রতি আকাশ সমান অভিমান থাকার পরও রিদের সামনে সেটা প্রকাশ করল না। যদি মায়া এই মুহূর্তে রিদের সামনে এসব বিষয় নিয়ে রাগ প্রকাশ করে, তাহলে রিদ বুঝে যাবে মায়া জেনে গেছে রিদের গোপন বিষয়টি। তখন রিদ সতর্ক হয়ে মায়াকে আর বেবি নিতে দেবে না। এর থেকে বরং মায়া নিজের রাগ নিজের কাছে পুষে রেখে সে একাই বেবি প্ল্যানিং করুক। যখন মায়া প্রেগন্যান্ট হবে, তখন এই লোকের এমনিতেই শাস্তি হবে। মায়াও দেখিয়ে দেবে মায়ার স্বামীর থেকে মায়াও কম চালাক না, হু। এরপর থেকে মায়া আর রিদকে ‘বেবি চাই, বেবি চাই’ বলে বিরক্ত করে না, আর না রিদের দেওয়া কিছুই খায়। এমনকি পানিটুকু পর্যন্ত নয়। রিদের সামনে খাওয়ার নাটক করলেও মায়া সেটা খায় না। রিদের অফিসেও যায় না। রিদ মায়ার হঠাৎ শান্ত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা প্রথমে সন্দেহ করলেও পরে সে এসব বিষয়ে খুব একটা মনোযোগ দেয়নি। তারপর দিন থেকে মাসগুলো মায়াকে ঘিরে রিদের ভালোই যাচ্ছিল। রিদ নিজের কোম্পানির কাজে দেশে ছেড়ে বিদেশে দুবাই যেতেই মায়াকে চট্টগ্রামে খান বাড়িতে পাঠানো হলো রিদের অনুপস্থিতিতে।
মূলত রিদ দুবাইয়ে সপ্তাহখানেক থাকবে, কিন্তু মায়া একা ঢাকায় থাকতে পারবে না বলেই রিদ মায়াকে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে সে আসিফকে নিয়ে দুবাই চলে যায়। রিদ দুবাই থাকার তৃতীয় দিনের মাঝে রিদের কাছে খবর আসল সে বাবা হবে। রিদের তখন অনুভূতি প্রকাশ করার মতোন নয়। রাদিফের ফোন পেয়ে রিদ কেমন বোবার মতোন ঠাঁই বসে রইল জায়গায়। যখন রিদের হুঁশ ফিরল, তখন সে সেই রাতেই কাজকাম ফেলে আসিফকে নিয়ে বাংলাদেশে ফিরল। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে মায়ার কাছে পৌঁছাল পরদিন ভোর রাতে। বাবা হওয়ার অনুভূতি রিদ প্রকাশ করতে পারল না চট করে, তবে মায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটার দিকে সে বেশ ভাবাবেগ হয়ে তাকিয়ে রইল।
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা খণ্ডাংশ পর্ব ১৭
খান বাড়িতে নতুন অতিথির আগমনে সকলেই খুশি। সুফিয়া খান, হেনা খান, আরাফ খান, নিহাল খান, রাদিফ সকলেই আয়োজন করে এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করলো। মায়ার পড়াশোনার ব্যাপারটাও মাথায় রেখে সুফিয়া খান আরাফ খান আর হেনা খানকে নিয় ঢাকা খান বাড়িতে শিফট হয়ে যান মায়ার জন্য। নিহাল খান, রাদিফ, রিদ ওদের তিনজনের ঢাকা টু চট্টগ্রাম যাতায়াত লেগেই থাকে সময়ে-অসময়ে।
