রুপুর বিয়ে পর্ব ১
Bobita Ray
বিয়ের পর প্রথমবারের মতো শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেই তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো রুপুর। নতুন বউয়ের মুখ দেখেই শাশুড়ীমা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। এই বউ কিছুতেই সে বরণ করে ঘরে তুলবে না। রুপুর বাড়ির লোক নাকি তাদের কঠিন ভাবে ঠকিয়েছে। সুন্দর ছবি দেখিয়ে কালো মেয়ে তাদের ছেলের সাথে গছিয়ে দিয়েছে। অথচ রুপুর স্পষ্ট মনে আছে। ওনারা ঘটা করে একদিন সন্ধ্যায় সপরিবারে রুপুকে দেখতে গিয়েছিল। রুপুকে সামনাসামনি দেখে পছন্দ করে তবেই বিনয়ের সাথে রুপুর বিয়ে ঠিক করেছে। রুপুর ক্যামেরা ফেস সুন্দর। এতে তো আর রুপুর কোনো হাত নেই। তবে রুপুকে যে ওনারা দেখতে গিয়েছিল এই কথাটা দিব্যি অস্বীকার করে ফেলল। রুপুর নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। সবাই খুব অদ্ভুত ভাবে রুপুকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। আর ফিসফাস করে কী সব বলাবলি করছে। রুপুর ভালো লাগছে না। ইচ্ছে করছে একছুটে বাড়ি চলে যেতে। পাশে রুপুর বর বিনয় নেই। সে নাকি মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আনতে গেছে। এভাবে খোলা আকাশের নিচে একদল মানুষের সামনে মাথা নিচু করে বসে থাকতে ভালো লাগছে না। ভাগ্যিস মাথায় আধমাথা ঘোমটা টানা ছিল। নাহলে লজ্জায় এতক্ষণে মরেই যেত রুপু।
রুপুর শাশুড়ীমা রুপুকে বরণ করতে এলো না।
তার বদলে এলো রুপুর মাসি শাশুড়ী। ভদ্রমহিলা বরণ করে ওদের ঘরে তুলল।
ঘড়িতে রাত কয়টা বাজে কে জানে! রুপুর খিদেয় পেট ফেটে যাচ্ছে। কেউ ভুলেও রুপুকে খাওয়ার কথা বলল না। এই বাড়িতে পা রাখার পর বিনয়ের সাথে একবারও দেখা হয়নি রুপুর। আশেপাশে তেমন চেনা কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। এখন কার কাছে একটু খাবার চাইবে রুপু? বিয়ের চত্ত্বরে দুদিন ধরে বলতে গেলে একদম না খাওয়া রুপু। বাসি বিয়ের পর ওদের ভাত খেতে দেওয়া হয়েছিল। বহুদিনের চেনা ভুবন, প্রিয়জন ছেড়ে আসার কষ্টে কাঁদতে কাঁদতে দুই গালের বেশি ভাত খেতেই পারল না রুপু। কে জানতো এই বাড়িতে এসেও ওর কপালে খাবার জুটবে না। যদি আগে থেকে জানা যেত, তাহলে বাপের বাড়ি থেকে ভরপেট ভাত খেয়ে আসত রুপু।
রাত তিনটের সময় রুপুর শোবার ব্যবস্থা করা হলো। একটা পনেরো বছরের মেয়ে রুপুর সাথে শুয়েছে ঘরের মেঝেতে। খাটে চার/পাঁচজন মহিলা আড়াআাড়ি ভাবে শুয়েছে রুপু তাদের কাউকেই চিনে না। রুপু দেখল, মেয়েটি জেগে আছে। ফিসফিস করে বলল,
“তোমার নাম কী?”
“রিতা। সম্পর্কে আমি তোমার ননদ। বিনয়দাদা আমার মামাতো দাদা।”
“ওহ।”
“তুমি ভাত খেয়েছ রিতা।”
“খেয়েছি তো। তুমি খাওনি?”
“না।”
“খাওনি কেন?”
“কেউ তো আমাকে খেতেই ডাকল না।”
“মাকে একবার বলতে শুনেছি নিয়ম অনুযায়ী তুমি আজরাতে এইবাড়ির ভাত খেতে পারবে না। কাল বৌভাতের পরে খাবে।”
“ওহ।”
চিড়বিড়ে খিদেটা অনেক আগেই মরে গেছে।
খালি পেটে পর পর দুই গ্লাস জল খাওয়ার জন্যই নাকি কে জানে! পেট পাকিয়ে বমি আসছে।
হঠাৎ রিতা রুপুর একহাত চেপে ধরল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কিছু মনে করো না বউদি। তোমার জন্য পাশের বাড়ি থেকে ভাত আনানো হয়েছিল। মামী মানে তোমার শাশুড়ী মা তোমাকে দেখে পছন্দ না হওয়ার কারণে অতিরিক্ত রাগের মাথায় ভাতগুলো ফেলে দিয়েছে।”
রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে শুলো। বিয়ের শুরুতেই ওর সাথে এত কুৎসিত একটা ঘটনা ঘটল। বাকি দিনগুলো কীভাবে কাটবে কে জানে!
খিদে পেটে সারারাত একফোঁটা ঘুম হলো না রুপুর। সকালে বাসি বিছানা গুছিয়ে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা কেমন চক্কর দিয়ে উঠল।
বিনয়ের সাথে রুপুর দেখা হলো সকাল এগারোটার পরে। নিয়ম অনুযায়ী আজও একসাথে স্নান করতে হবে। ওরা দুজন বাথরুমে ঢুকতেই বিনয় নিচু কণ্ঠে বলল,
“মায়ের ব্যবহারে কিছু মনে করো না রুপু। মা খুব সেনসেটিভ মনের মানুষ। অল্পতেই রেগে যায়। আবার অল্পতেই খুশি হয়ে যায়। মায়ের এতটাই মন খারাপ ছিল৷ মাকে ফেলে রাতে আর তোমার কাছে আসতেই পারলাম না। তবে মা রেগে থাকলে কী হবে। তোমার জন্য পাশের বাসা থেকে ভাত চেয়ে এনে মাসিকে দিয়ে পাঠাল। ভালো কথা রাতে ভাত খেয়েছিলে তো? দুপুরে এত কান্নাকাটি শুরু করলে ঠিকমতো ভাত খেতেই পারলে না।”
রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ রুপু যদি এখন বলে আমাকে কেউ ভাত খেতে দেয়নি। তাহলে কী বিনয় বিশ্বাস করবে? জীবনেও করবে না। উল্টো রুপুকেই ভুল বুঝবে। যে বা যারা বিনয়ের সামনে এত নিখুঁত ভাবে অভিনয় করতে পারে। তারা নিশ্চিত ভাতের ব্যাপারটা অস্বীকার করতেও দুবার ভাববে না। উল্টো সবার সামনে রুপুকেই মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেবে। কী দরকার যেচে পড়ে আরও একবার অপমানিত হবার।
স্নান করে রুপুকে পার্লারে সাজানোর জন্য পাঠানো হলো। রুপু বাড়ির গেইটের সামনে এসে লাইটিং করা তিনতলা বাড়িটার দিকে মাথা উঁচু করে তাকাল। এত সুন্দর করে ছিমছাম সাজানো গোছানো বাড়িটার দিকে তাকাতেই রুপুর চোখের কোণে জল এসে গেল। বাড়িটা যতটা সুন্দর। বাড়ির মানুষগুলোর ব্যবহার ততটাই কুৎসিত। খাবারের কথা মনে পড়তেই খিদেয় নাড়িভুড়ি উল্টে যাবার জোগাড় হলো। চোখে-মুখে অন্ধকার দেখছে রুপু। রাস্তায় মাথা ঘুরে পরে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। শক্তি দাও ঠাকুর।
পার্লারে রুপুর সাথে বিনয়ের মামাতো বোনেরা এসেছে। কিছু কিনে খাবার ইচ্ছে থাকলেও সাহসে জোগাল না। নতুন করে আর কোনোরকম অশান্তি চায় না রুপু।
বিনয় যখন ভাত-কাপড়ের থালা নিয়ে রুপুর সামনে দাঁড়াল। সাদা শুভ্র ফুলের মতো ভাত দেখে রুপুর চোখে জল এসে গেল। জীবনে কত ভাত যে নষ্ট করেছে রুপু। একে একে সব চোখের পাতায় ভেসে উঠল। তবে কী ভাতগুলো রুপুকে অভিশাপ দিয়েছে? কী জানি! বিনয় ভাত কাপড়ের থালাটা রুপুর হাতে তুলে দিয়ে দুজনে ভাত খেতে বসল। ভাত দেখে মনে হলো রুপু সবগুলো ভাত একাই খেতে পারবে। শুধু কী একথালা ভাত। এক গামলা ভাতও খেয়ে ফেলতে পারবে। অথচ চার/পাঁচ গাল ভাত খাওয়ার পর আর ভাত খেতে ইচ্ছে করল না।
বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষ করে রাতে ওদের শোবার ব্যবস্থা করা হলো। ঠিক তখনই বিনয়ের মা বিনয়ের একহাত ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। ছেলে পর হয়ে যাওয়ার দুঃখে। এদের দুঃখ দেখে রুপুর হাসি পেয়ে গেল। পৃথিবীতে কী ছেলের অভাব পড়েছিল? বেছে বেছে রুপুর কপালে মা ভক্ত ছেলেই কেন জুটল?
রুপু বিড়বিড় করে বলল,
“মা ভক্ত ছেলে যেন প্রতিটা মায়ের কোলে জন্ম নেয়। তবে এমন ছেলে যেন কোনো মেয়ের কপালে স্বামী হয়ে না জুটে।”
লেখাটা কোথায় যেন পড়েছিল রুপু।
ফুলসজ্জার ঘরে অনেক রাত পর্যন্ত রুপু একাই বসে রইল। বিনয় মাকে সান্ত্বনা দিয়ে যখন রুপুর কাছে শুতে এলো। তখন মধ্যরাত। ঘুমে রুপুর দুচোখ বুঁজে আসছে। বিনয় এসেই রুপুর পাশে বসে তেলতেলে হাসি দিল। রুপুর একহাত ধরে বলল,
“আসলে মা আমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। মায়ের ধারণা বিয়ের পর সব ছেলেই পর হয়ে যায়। মায়ের আঁচল ছেড়ে বউয়ের আঁচল ধরে। আমিও হয়তো.. মাকে কিছুতেই বুঝাতে পারছিলাম না। আমি বাকি পাঁচটা ছেলের মতো না।”
“তুমি সত্যিই বাকি পাঁচটা ছেলের মতো না। তবে মাকে শুধু শুধু কষ্ট না দিয়ে বাকি রাতটা মায়ের কাছেই থাকতে পারতে।”
“আশ্চর্য আমি আজকের মতো এত স্পেশাল একটা রাতে মায়ের কাছে থাকব কেন? তুমি কী কোনো কারণে আমার উপরে রেগে আছো রুপু?”
রুপু হাসল। বলল,
“এত সহজে রাগ করা আমার ধাতে নেই। আমি যদি তোমার মায়ের মতো হুটহাট রাগ করতাম তোমার কিন্তু বড্ড যন্ত্রণা হয়ে যেত। এসে থেকে তো দেখছি, মায়ের রাগ ভাঙিয়েই তো কূল পাচ্ছ না। বউয়ের রাগ ভাঙাতে কখন?”
“রুপু শোনো? তুমি যা ভাবছ ব্যাপারটা আসলে তেমন না। আমার মা খুব ভালো একজন মানুষ। আসলে…
“অনেক রাত হয়েছে। আমার প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে।”
“তুমি এভাবে কথা বলছ কেন?”
রুপু কোনো কথা না বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। বিনয় কী করবে ঠিক বুঝতে পারল না। আজকের রাতকে ঘিরে ওর অনেক স্বপ্ন ছিল। রুপুর জন্য একটা গিফটও এনেছে। পাঞ্জাবির পকেটে আছে। রুপুকে ডেকে কী গিফটা দেবে?
“রুপু…রুপু…. আশ্চর্য এত তাড়াতাড়ি একটা মানুষ ঘুমিয়ে গেল কীভাবে?”
